দুনিয়ার অপকারিতাঃ

হযরত আলী (رضي الله عنه) একদা তাঁর একটি ভাষণে বলেছিলেন, বিশ্বাস কর, অবশ্যই তোমরা মরবে, মৃত্যুর পর আবার তোমাদের জীবিত করা হবে, তোমাদের আমলসমূহের হিসাব হবে এবং সে আমলের প্রতিদান দেওয়া হবে। অতএব, দুনিয়ার জীবন তোমাদের যেন ধোকাগ্রস্ত না করে। এই দুনিয়া সম্পূর্ণ বিপদঘেরা, ধ্বংসশীল বলে পরিচিত, গাদ্দার নামে অভিহিত। দুনিয়ার মধ্যকার সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। এখানে কেবলই পালাবদল হতে থাকে, এখন কারো হাতে, তখন কারো হাতে। দুনিয়ার কোন অবস্থাই স্থায়ী থাকে না। দুনিয়াতে যারা অবতরণ করে তাদের কেউই তার অনিষ্ট হতে রক্ষা পায় না। এখানে কোনকিছুর স্থিতি নাই, এই সুখ, এই মুসীবত। প্রাচুর্যও ক্ষণস্থায়ী। এখানের জীবনটাই কলুষতাপূর্ণ। দুনিয়াবাসীদের প্রত্যেকে আপন আপন লক্ষ্যের দিকে ছুটে চলেছে, কেউ একদিকে, কেউ আর একদিকে। কিন্তু সকলের মৃত্যু নির্ধারিত। ভাগ্যও নির্ধারিত। হে আল্লাহ্ বান্দারা। যে দুনিয়ায় তোমরা বাস করছ, তোমাদের পূর্বে এখানে ঐ সকল লোকেরা বাস করেছে যারা তোমাদের চেয়ে অনেক বেশী বয়স পেয়েছিল, তোমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী, অধিক খ্যাতিসম্পন্ন। তারা দুনিয়াকে তোমাদের চাইতে বেশী আবাদ করেছে। কিন্তু তাদের আওয়াজ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের প্রতাপ নিভে গেছে, মহাকালের গর্ভে তারা হারিয়ে গেছে। তাদের দেহসমূহ পচে গেছে, তাদের বাড়ীঘর, প্রাসাদমালা, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, তাদের সকল কীর্তি ও নিদর্শনাবলী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সু-উচ্চ প্রাসাদমালা, খাট-পালঙ্ক ও দামী দামী শাল ও বিছানার বদলে পাথর আর মাটির পালঙ্কে ঘুমিয়ে আছে। আজ তারা কবরদেশে বন্দী। তাদের আবাসস্থল দূরে নয়। কিন্তু তারা নিকটবর্তী ও দূরবর্তী সকল জনপদে অপরিচিত হয়ে গেছে। মহল্লাবাসীরাও তাদের কোন খবর রাখে না। তারা চিন্তা করে না যে, এখানে আর একটা জনপদ আছে। ঘরবাড়ী নিকটে হওয়া সত্ত্বেও তারা এদের প্রতি ভ্রাতৃত্ব ও প্রতিবেশীসুলভ ব্যবহার করে না। আর তাদের মধ্যে সম্পর্ক থাকবেই বা কিরূপে? কারণ, পাথর, মাটি আর কীটপাল যে তাদের খেয়ে শেষ করেছে। আনন্দময় জীবনের অবসানের পর তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে, টুকরা টুকরা হয়ে গিয়েছে। বন্ধু-বান্ধবদের শোকাহত করে তারা মাটির নীচে গভীর নিদ্রামগ্ন। আর কোনদিন ফিরে আসবে না। হায় আফসোস্! পবিত্র কুরআন এ' কথাই তো বলেছে: 'কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তারা বরযখে পড়ে থাকবে।' মনে মনে ধ্যান কর যে, তোমরাও যেন তাদের মত বিপদের সম্মুখীন হয়েছ, কবরের বিজন ঘরে পৌছেছ, সেই নিদ্রালয়ে শুয়ে আছ। হায়! তখন কি অবস্থা হবে, যখন তোমরা আযাবের ভয়ংকর দৃশ্য দেখতে পাবে, কবর হতে পুনরুজ্জীবিত করা হবে, অন্তরের গোপন বিষয়াদিও প্রকাশ হয়ে যাবে, তোমার কর্মের রিপোর্টের জন্য প্রতাপশালী বাদশার সম্মুখে খাড়া করা হবে? যখন পাপাচারের ভয়ে কাঁপতে থাকবে, পর্দাসমূহ সরিয়ে দেওয়া হবে এবং তোমাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য তামাম দোষ প্রকাশ হয়ে যাবে? যখন সবাইকে তার কর্মফল ভোগে বাধ্য করা হবে? যেমন খোদ আল্লাহ্ পাক বলেছেন:

ليَجْزِيَ الَّذِينَ اسَاؤُوا بِمَا عَمِلُوا وَيَجْزِيَ الَّذِينَاحْسَنُوا بِالْحُسْنَى 

'আল্লাহ্ পাক পাপীদেরকে তার কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিবেন এবং নেক্কারদিগকে নেক্ কাজের প্রতিদান দিবেন।' (সূরা নাজম, আয়াত নং - ৩১)

তিনি আরও বলেছেন:

و وُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ

'এবং আমলনামা খুলে দেওয়া হবে। তুমি দেখবে, তখন পাপীরা সে আমলনামার অবস্থা দেখে ভীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।' (সূরা কাহফ, আয়াত নং - ৪৯)

আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে এবং তোমাদেরকে তাঁর কিতাব মুতাবিক আমলের তৌফিক দিন, তাঁর ওলীদের অনুসরণের তওফীক দিন, যাতে তাঁর করুণায় আমরা বেহেশতবাসী হতে পারি। আল্লাহ্ বড়ই প্রশংসিত ও পরম সম্মানিত।

তথ্যসূত্রঃ ❴ মুকাশাফাতুল কুলুব, খন্ড : ১ম, অধ্যায় : ৩২, পরিচ্ছেদ : দুনিয়ার অপকারিতা, পৃষ্ঠা নং :  ২৮১-২৮৩ ❵
Top