মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে ফেকাহশাস্ত্র ও ফকীহ ইমামগণের মর্যাদা (পর্ব ২) :- | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস


১ম পর্বের পর :-




পূর্ববর্তী ইমামদ্বয়ের পূর্বে কুফার বিশিষ্ট ইমাম ও শায়খ ইবরাহিম নাখয়ি রহ. এ ব্যাপারে নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

★ খতিব বাগদাদি তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন, একদা মুগীরা যাব্বি তাঁর মজলিশে আসতে বিলম্ব করলো। ইবরাহিম নাখয়ি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, মুগীরা, তুমি দেরি করলে কেন? তিনি বললেন, আমাদের কাছে একজন মুহাদ্দিস এসেছেন। তাঁর কাছ থেকে আমরা হাদিস লিখছিলাম। তখন ইবরাহিম নাখয়ি রহ. বললেন, আমরা তো কেবল তার কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করতাম যার ব্যাপারে নিশ্চিত হতাম যে, সে হালাল ও হারামের মাঝে উত্তমরূপে পার্থক্য করতে পারে। তুমি এমন মুহাদ্দিস দেখবে যে সে হাদিস বর্ণনা করছে কিন্তু হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল বলছে। অথচ সে জানে না যে সে কী করছে।
খতিব বাগদাদি রহ. আল-ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ-এ ইমাম শাফেয়ির রহ. বিশেষ ছাত্র ও ইলমের উত্তরাধিকার ইমাম মুযানির রহ. দীর্ঘ একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। বক্তব্যের শেষে ইমাম মুযানি রহ. বলেছেন,

فانظروا رحمكم الله على ما في أحاديثكم التي جمعتموها ، واطلبوا العلم عند أهل الفقه تكونوا فقهاء إن شاء الله

“তোমাদের উপর আল্লাহ তায়ালা রহমত বর্ষণ করুন। তোমরা তোমাদের সঙ্কলিত হাদিসের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখো এবং ফকিহগণের কাছ থেকে ইলম অন্বেষণ করো। ইনশাআল্লাহ তোমরাও ফকিহ হয়ে যাবে।[১৮]

★ বোখারি শরীফের বিখ্যাত ব্যাখ্যাতা ইমাম কাসতাল্লানী রহ.তাঁর লাতাইফুল ইশারাতে লিখেছেন,

ويرحم الله إمام دار الهجرة مالك بن أنس ، فقد روي عنه فيما ذكره الهذلي أنه سأل نافعا الإمام المقري عن البسملة فقال: السنة الجهر بها فسلم إليه مالك وقال كل علم يسأل عن أهله

আল্লাহ তায়ালা ইমামু দারিল হিজরা ইমাম মালেক রহ.এর উপর রহমত বষর্ণ করুন। তাঁর থেকে ইমাম হুযালি বর্ণনা করেছেন, তিনি একবার ইমাম নাফে’ রহ.কে বিসমিল্লাহ সম্পর্র্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেন, বিসমিল্লাহ উচ্চ আওয়াজে পড়া সুন্নত। ইমাম মলেক রহ. তাঁর কাছে সালাম পাঠালেন এবং বললেন, প্রত্যেক ইলম তার উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে জিজ্ঞাসা করা হয়।[১৯]

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে হাদিসের প্রতি দৃষ্টি দেয়ার পাশাপাশি ফকিহদের মতামতের প্রতি দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। পূর্ববর্তী ইমামদের বক্তব্য থেকে কখনও প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে, শুধু হাদিস সহিহ হলেই তা আমলের জন্য যথেষ্ট। বিষয়টি আরেকটু বিস্তারিতভাবে তুলে ধরছি। এতে তাদের দাবির ভ্রান্তি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠবে।
সাহাবায়ে কেরাম রা. থেকে শুরু করে পূর্ববর্তী কেউ-ই শুধু হাদিস বর্ণনা আমলের জন্য যথেষ্ট মনে করতেন না। বরং তারা দেখনতেন, হাদিসের উপর আমল করা হয়েছে কি না?

★ পূর্বে আল্লামা যাহেদ আল-কাউসারি রহ. এর বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, ফিকাহের থেকে বিচ্ছিন্ন অনেক রাবির ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে। তারা কোন হাদিস আমলযোগ্য এবং কোনটি আমলযোগ্য নয়, তা পার্থক্য করতে পারত না।”[২০] এটি একটি বিস্তর বিষয়।

★ এ বিষয়ে ইমাম ইবনে আবি যায়েদ কাইরাওয়ানী রহ. (৩৮৪ হি:) এর বক্তব্য কিতাবুল জামে থেকে উল্লেখ করবো। সেই সাথে কাজি ইয়াজ রহ. এর বক্তব্যও তারতিবুল মাদারেক থেকে উদ্ধৃত করবো। এখানে তারা সালাফে সালেহিনের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। সালাফে-সালেহিন কেবল সেসব হাদিসের উপর আমল করতেন, যার উপর পূর্বে কেউ আমল করেছে। কিন্তু যেসব হাদিসের উপর কেউ আমল করেনি, হাদিসগুলো বিশ্বস্ত সূত্রে বর্ণিত হলেও তারা তার উপর আমল করতেন না।
ইমাম ইবনে আবি যায়েদ রহ. আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আক্বিদা, আদর্শ ও রীতির আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন,

والتسليم للسنن لا تعارض برأي ولا تدافع بقياس، وما تأوله منها السلف الصالح تأولناه وما عملوا به عملناه وما تركوه تركناه ويسعنا أن نمسك عما أمسكوا، ونتبعهم فيما بينوا، ونقتدي بهم فيما استنبطوه ورأوه في الحوادث، ولا نخرج من جماعتهم فيما اختلفوا فيه أو في تأويله، وكل ما قدمنا ذكره فهو قول أهل السنة وأئمة الناس في الفقه والحديث على ما بيناه وكله قول مالك، فمنه منصوص من قوله، ومنه معلوم من مذهبه

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদিস গ্রহণ করতে হবে। যুক্তি দ্বারা হাদিসের বিরোধিতা করা যাবে না। কিয়াস দ্বারা হাদিস প্রত্যাখ্যান করা হবে না। পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম যার উপর আমল করেছেন, আমরাও তার উপর আমল করি। তারা যার উপর আমল করেননি, আমরাও তার উপর আমল করি না। তারা যা থেকে বিরত থেকেছেন, তা থেকে বিরত থাকা আমাদেরও কর্তব্য। তারা যেসব বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা করেছেন, আমরা তার আনুগত্য করি। তারা বিভিন্ন বিষয়ে যেসব মাসআলা গ্রহণ করেছেন, আমরা তার অনুসরণ করি। যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করেছেন কিংবা যার ব্যাখ্যায় মতানৈক্য হয়েছে, সেক্ষেত্রে আমরা পূর্ববর্তীদের জামাত থেকে বের হই না।
উপর্যুক্ত বক্তব্যগুলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বক্তব্য। এটি ফিকাহ ও হাদিসের ইমামগণের অভিমত। এগুলো ইমাম মালেকেরও বক্তব্য।

কিছু বিষয় সরাসরি তাঁর থেকে বর্ণিত এবং কিছু বিষয় তাঁর গৃহীত মাজহাব থেকে আহরিত।
ইমাম মালেক রহ. বলেন, একটি হাদিসের উপর ফকিহদের মতানুযায়ী আমল করা নিজস্ব মতানুযায়ী আমলের চেয়ে শক্তিশালী। তিনি আরও বলেন, আমি যেসব হাদিসের উপর আমল করি, তার ব্যাপারে একথা বলা কঠিন যে, আমার কাছে এর বিপরীত অমুক অমুক বর্ণনা করেছে। কেননা তাবেয়িদের অনেকের কাছে বিভিন্ন সূত্রে হাদিস বর্ণিত হলেও তারা বলতেন, “আমি হাদিসটি সম্পর্র্কে সম্যক অবগত আছি। কিন্তু এর বিপরীত আমল চলে আসছে।”
মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর ইবনে হাযাম রহ. তাঁর ভাইকে কখনও কখনও বলতেন, তুমি এ হাদিস অনুযায়ী কেন ফয়সালা করলে না? তিনি উত্তর দিতেন, আমি মানুষকে এর উপর আমল করতে দেখিনি।
ইবরাহিম নাখয়ি রহ. বলেন, আমি যদি সাহাবাগণকে কব্জী পর্যন্ত ওজু করতে দেখতাম, তবে আমিও তাই করতাম; যদিও আমি কনুই পর্যন্ত ওযুর আয়াত পাঠ করি। কেননা তাদের ব্যাপারে সুন্নত পরিত্যাগের অভিযোগ করা সম্ভব নয়। তারা ইলমের দিক থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণের ব্যাপারে সর্বাধিক আগ্রহী। সুতরাং নিজ ধর্মের ব্যাপারে সন্দেহপোষণকারী ছাড়া কেউ তাদের ব্যাপারে এ অভিযোগ করার দু:সাহস দেখাবে না।
ইমাম আব্দুর রহমান ইবনে মাহদি বলেন, মদিনাবাসীর মাঝে প্রচলিত সুন্নত, হাদিসে বর্ণিত সুন্নত থেকে উত্তম। ইমাম ইবনে উয়াইনা বলেন, ফকিহগণ ব্যতীত অন্যদের জন্য হাদিস ভ্রষ্টতার কারণ। এর দ্বারা তিনি উদ্দেশ্য নিয়েছেন, অন্যরা হাদিসকে তার বাহ্যিক অর্থের উপর প্রয়োগ করে। অথচ অন্য হাদিসের আলোকে এ হাদিসের বিশেষ ব্যাখ্যা রয়েছে। অথবা, হাদিসের বিপরীতে সূক্ষ্ম দলিল রয়েছে যা তার কাছে অস্পষ্ট। হাদিসটি অন্য কোন দলিলের আলোকে পরিত্যাজ্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এ সব বিষয়ে গভীর পান্ডিত্যের অধিকারী ফকিহ ছাড়া অন্যরা অবগত নয়।
ইমাম ইবনে ওহাব রহ. বলেন, যে মুহাদ্দিসের কোন ফকিহ ইমাম নেই, সে ভ্রষ্ট। আল্লাহ পাক যদি আমাদেরকে ইমাম লাইস ইবনে সা’য়াদ ও ইমাম মালেকের দ্বারা মুক্তি না দিতেন, তবে আমরা পথভ্রষ্ট হয়ে যেতাম।[২১] ইমাম ইবুন আবি যায়েদ বলেন, ইমাম মালেক রহ. বলেছেন, মদিনায় এমন কোন মুহাদ্দিস ছিলেন না, যিনি কখনও দু’টি পরস্পর বিরোধী হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইমাম আশহাব বলেন, ইমাম মালেক রহ. এর দ্বারা উদ্দেশ্য নিয়েছেন, কোন মুহাদ্দিস এমন হাদিস বর্ণনা করতেন না, যার উপর আমল করা হয় না।[২২]

★ কাজি ইয়াজ রহ. তারতিবুল মাদারেক-এ লিখেছেন,

باب ما جاء عن السلف والعلماء في الرجوع إلى عمل أهل المدينة في وجوب الرجوع إلى عمل أهل المدينة وكونه حجة عندهم وإن خالف الأكثر روي أن عمر بن الخطاب رضي الله تعالى عنه قال على المنبر: احرج بالله على رجل روى حديثاً العمل على خلافه.قال ابن القاسم وابن وهب رأيت العمل عند مالك أقوى من الحديث، قال مالك: وقد كان رجال من أهل العلم من التابعين يحدثون بالأحاديث وتبلغهم عن غيرهم فيقولون ما نجهل هذا ولكن مضى العمل على غيره، قال مالك: رأيت محمد بن أبي بكر ابن عمر بن حزم وكان قاضياً، وكان أخوه عبد الله كثير الحديث رجل صدق، فسمعت عبد الله إذا قضى محمد بالقضية قد جاء فيها الحديث مخالفاً للقضاء يعاتبه، ويقول له: ألم يأت في هذا حديث كذا؟ فيقول بلى.فيقول أخوه فما لك لا تقضي به؟ فيقول فأين الناس عنه، يعني ما أجمع عليه من العلماء بالمدينة، يريد أن العمل بها أقوى من الحديث، قال ابن المعذل سمعت إنساناً سأل ابن الماجشون لمَ رويتم الحديث ثم تركتموه؟ قال: ليعلم أنا على علم تركناه.

পরিচ্ছেদ: অধিকাংশের আমল বিপরীত হওয়া সত্ত্বেও মদিনা বাসীর আমল গহণ ও তা হুজ্জত হওয়া প্রসঙ্গে উলামায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহিনের বক্তব্য।
বর্ণিত আছে, হজরত উমর রা. মিম্বারে ভাষণ দেয়ার সময় বলেছেন, আল্লাহর শপথ, আমি ঐ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করবো, যে এমন হাদিস বর্ণনা কওে যার উপর সাহাবাদের আমল নেই।
ইমাম ইবনে কাসেম ও ইবনে ওহাব রহ. বলেন, ইমাম মালেক রহ. এর কাছে প্রচলিত আমল বর্ণিত হাদিস থেকে অধিক শক্তিশালী। ইমাম মালেক রহ. বলেন, অনেক তাবেয়ি এমন ছিলেন যারা হাদিস বর্ণনা করতেন, এরপর তাদের কাছে এর বিপরীত হাদিস উল্লেখ করা হলে তারা বলতেন, আমি হাদিসটি সম্পর্র্কে সম্যক অবগত আছি। কিন্তু এর বিপরীত আমল চলে আসছে।
ইমাম মালেক রহ. বলেছেন, আমি মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনে হাযাম রহ. কে দেখেছি, তিনি একজন বিশিষ্ট কাজি ছিলেন। তাঁর ভাই আব্দুল্লা ছিলেন সত্যবাদী ও বড় মাপের মুহাদ্দিস। মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রহ. যখন এমন কোন ফয়সালা করতেন, যার বিপরীতে হাদিস রয়েছে, তখন আব্দুল্লাহ রহ. তাকে ভর্ৎসনা করে বলতেন, এ ব্যাপারে তো এই হাদিসটি বর্ণিত আছে? তিনি বলতেন, হ্যাঁ। আব্দুল্লাহ রহ. জিজ্ঞাসা করতেন, তাহলে এ অনুযায়ী বিচার করলেন না কেন? তিনি বলতেন, এ ব্যাপারে মদিনাবাসীর আমল কি? অর্থাৎ মদিনার আলেমগণ কোনটির উপর আমলের ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্য হলো, মদিনার  আলেমগণের মাঝে প্রচলিত ঐকমত্যপূর্ণ বিষয়ের উপর আমল করা হাদিসের উপর আমলের চেয়ে শক্তিশালী।

ইমাম ইবনুল মুয়াজ্জাল বলেন, এক ব্যক্তি ইবনুল মাজিশুনকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমরা হাদিস বর্ণনা করে তা পরিত্যাগ করো কেন? তিনি উত্তর দিলেন, যেন লোকদেরকে এ বিষয়ে জানিয়ে দেই যে, হাদিসটি সম্পর্র্কে আমাদের অবগতি থাকা সত্ত্বেও আমরা তার উপর আমল করিনি।
ইমাম ইবনে মাহদি রহ. বলেন, মদিনাবাসীর মাঝে পূর্ব থেকেই প্রচলিত সুন্নত হাদিস থেকে উত্তম। তিনি আরও বলেন, একটি বিষয়ে অনেক হাদিস আমার সংগ্রহে থাকে। কিন্তু ইসলামের শুরু থেকে প্রচলিত আমল যদি এর বিপরীত হয়, তখন হাদীসগুলি আমার কাছে দুর্বল বিবেচিত হয়।
ইমাম রবীয়া’ রহ. বলেন, আমার কাছে এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির বর্ণনার চেয়ে এক হাজারের লোক থেকে অপর এক হাজার লোকের বর্ণনা অধিক উত্তম। কেননা আমার আশঙ্কা হয় এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির বর্ণনা তোমাদের থেকে সুন্নত ছিনিয়ে নেবে।
ইবনে আবি হাযেম রহ. বলেন, আবু দারদা রহ. কে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করা হতো। তিনি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতেন। অত:পর তাঁকে বলা হতো, আমাদের কাছে তো এই হাদিস এভাবে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলতেন, আমিও হাদিসটি শুনেছি, কিন্তু প্রচলিত আমল এর বিপরীত।
ইমাম ইবনে আবিয যিনাদ রহ. বলেন, উমর বিন আব্দুল আযিয রহ. ফকিহদেরকে একত্র করতেন। যেসব হাদিস ও সুন্নতের উপর আমল করা হয়, তাদেরকে সেসম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন। এরপর তিনি তাদের বক্তব্য অনুযায়ী ফয়সালা করতেন। যেসব হাদিসের উপর আমল করা হয় না, সেগুলো পরিত্যাগ করতেন, যদিও তা বিশ্বস্ত সূত্রে বর্ণিত হতো।[২৩]


★ এবার খতিব বাগদাদি রহ. এর বক্তব্যের প্রতি লক্ষ করুন। তিনি আল-ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ-এ শিরোনাম দিয়েছেন, “যেসব কারণে খবরে ওয়াহিদকে পরিত্যাগ করা হবে।” তিনি ইমাম মুহাম্মাদ বিন ঈসা তাব্বা’ রহ. এর বক্তব্য দিয়ে পরিচ্ছেদটি শুরু করেছেন। ইমাম মুহাম্মাদ বিন ঈসা রহ. ছিলেন ইমাম মালেক রহ. এর বিশিষ্ট ছাত্র; একজন বিশিষ্ট ফকিহ ও মুহাদ্দিস। তিনি বলেন,
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত প্রত্যেকটি হাদিসের উপর আমলের ব্যাপারে কোন সাহাবি থেকে যদি কোন বর্ণনা না পাওয়া যায়, তবে হাদিসটি পরিত্যাগ করো।”[২৪]

★ ইবনে খাল্লিকান রহ. শাফেয়ি মাজহাবের বিশিষ্ট ইমাম আবুল কাসেম আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লাহ আদ-দারকী রহ. (৩৭৫ হি:) এর জীবনী আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “তাঁর কাছে যখন কোন মাসআলা জিজ্ঞাসা করা হতো, তিনি দীর্ঘ সময় তা নিয়ে চিন্তা করতেন। এরপর ফতোয়া প্রদান করতেন। কখনও কখনও তিনি ইমাম আবু হানিফা রহ. ও ইমাম শাফেয়ি রহ. এর মবের বিপরীত ফতোয়া দিতেন। এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন, তোমাদের ধ্বংস হোক, অমুকে অমুকে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদিস গ্রহণ করা ইমামদ্বয়ের বক্তব্য গ্রহণ থেকে উত্তম।[২৫]

★  ইমাম যাহাবি রহ. উক্ত বক্তব্যটি সিয়ারু আ’লামিন নুবালা-তে উল্লেখ করে মন্তুব্য লিখেছেন,

قُلْتُ:هَذَا جَيِّدٌ، لَكِنْ بِشَرْطِ أَنْ يَكُونَ قَدْ قَالَ بِذَلِكَ الحَدِيْثِ إِمَامٌ مِنْ نُظَرَاءِ الإِمَامَيْنِ مِثْلُ مَالِكٍ، أَوْ سُفْيَانَ، أَوِ الأَوْزَاعِيِّ، وَبأَنْ يَكُونَ الحَدِيْثُ ثَابِتاً سَالِماً مِنْ عِلَّةٍ، وَبأَنْ لاَ يَكُونَ حُجَّةُ أَبِي حَنِيْفَةَ وَالشَّافِعِيِّ حَدِيْثاً صحيحاً معَارضاً للآخَرِ.أَمَّا مَنْ أَخَذَ بِحَدِيْثٍ صَحِيْحٍ وَقَدْ تنكَّبَهُ سَائِرُ أَئِمَّةِ الاِجتهَادِ، فَلاَ

“আমি বলব, এটি উত্তম। কিন্তু শর্ত হলো, ইমামদ্বয়ের সমতুল্য কোন আলেম যেমন ইমাম মালেক, সুফিয়ান সাউরি অথবা ইমাম আওযায়ী রহ. এর মতো বড় কোন ইমাম উক্ত হাদিস অনুযায়ী ফতোয়া দিতে হবে; হাদিসটি সব ধরনের ত্র“টি থেকে মুক্ত ও বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হবে। সাথে সাথে, ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ি রহ. এর দলিলটি এমন কোন সহিহ হাদিস হবে না, যা আলোচ্য হাদিসের বিপরীত। কিন্তু কেউ যদি এমন হাদিস গ্রহণ করে, যা সব মুজতাহিদ পরিত্যাগ করেছেন, তাহলে তার বক্তব্য গ্রহণ করা হবে না।” [২৬] আবু যুরয়া দিমাশকী তাঁর তারিখে এবং ইমাম রামাহুরমুযি আল-মুহাদ্দিসুল ফাযেলে ইমাম আওযায়ী রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
“আমরা যখন কোন হাদিস শুনতাম, তা আমাদের সাথিদের কাছে পেশ করতাম। যেমন ভেজাল নির্ণয়ের জন্য দেরহাম পেশ করা হয়। হাদিসটি যদি তাদের কাছে ত্র“টিমুক্ত হতো, তখন তা গ্রহণ করতাম। যেই হাদিস সম্পর্র্কে তারা আশ্বস্ত হতেন না, সেটা আমরা পরিত্যাগ করতাম।[২৭]


★ ইমাম তকিউদ্দীন ইবনে তাইমিয়া রহ. আল-মুসাওয়াদা-তে লিখেছেন,

“ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. যেসব হাদিস ও আসার বর্ণনা করেছেন, সেটি তার মাজহাব হিসেবে গণ্য হবে। কোন হাদিসকে সহিহ, হাসান বললেও সেটি তার মাজহাব হিসেবে পরিগণিত হবে। এমনকি যেসব হাদিসের সনদের ব্যাপারে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তাঁর কিতাবে লিখেছেন সেগুলোও তাঁর মাজহাব। এভাবে যেসব হাদিস তিনি প্রত্যাখ্যান করেননি বা এর বিপরীত ফতোয়া প্রদান করেননি, সেগুলোও তার মাজহাব হিসেবে গণ্য হবে। কেউ কেউ বলেছেন, এগুলো তার মাজহাবের অন্তর্ভূক্ত হবে না”[২৮]

★ এখানে আমাদের উদ্দিষ্ট বক্তব্য হলো, “যে হাদিস তিনি প্রত্যাখ্যান করেননি বা এর বিপরীত ফতোয়া দেননি” এ অংশটি। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. ও অন্যান্য ইমামগণ কখনও একটি হাদিস সহিহ সত্ত্বেও পরিত্যাগ করেছেন। এর পরিবর্তে অন্য হাদিসের উপর আমল করেছেন। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, হাদিস সহিহ হলেই তার উপর আমল করা জরুরি নয়।
একজন আলেমের সৌন্দর্য হলো, সে হাদিস ও ফিকাহ উভয়ের প্রতি সমান দৃষ্টি রাখে। সে একটির উপর আমল করতে গিয়ে অন্যের উপর জুলুম করে না।
ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া লাইসী রহ. ইমাম মালেক রহ. থেকে মুয়াত্তায়ে মালেক বর্ণনা করেছেন। কাজি ইয়াজ রহ. তাঁর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন,

قال يحيى: كنت آتي عبد الرحمان بن القاسم، فيقول لي من أين يا أبا محمد؟ فأقول له: من عند عبد الله بن وهب. فيقول لي: اتق الله، فإن أكثر هذه الأحاديث ليس عليها العمل. ثم آتي عبد الله بن وهب، فيقول لي من أين؟ فأقول له:من عند ابن القاسم، فيقول لي اتق الله، فإن أكثر هذه المسائل رأي ثم يرجع يحيى فيقول: رحمهما الله فكلاهما قد أصاب في مقالته. نهاني ابن القاسم عن إتباع ما ليس عليه العمل من الحديث، وأصاب. ونهاني ابن وهب عن كلفة الرأي، وكثرته، وأمرني بالإتباع وأصاب. ثم يقول يحيى: إتباع ابن القاسم في رأيه رشد. واتباع ابن وهب في أثره هدى

ইমাম ইয়াহইয়া বলেন, আমি আব্দুর রহমান ইবনুল কাসেমের নিকট আগমন করতাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন, হে আবু মুহাম্মাদ, কোথা থেকে এলে? আমি উত্তর দিতাম, আমি আব্দুল্লাহ বিন ওহাবের নিকট থেকে এলাম। তিনি বলতেন, আল্লাহকে ভয় করো। কেননা এসব হাদিসের অধিকাংশের উপর মদিনাবাসীর আমল নেই। এরপর, আব্দুল্লাহ বিন ওহাবের নিকট আসতাম। তিনি জিজ্ঞাসা করতেন, কোথা থেকে এলে? আমি বলতাম, আবুল কাসেমের নিকট থেকে এলাম। তিনিও আমাকে বলতেন, আল্লাহকে ভয় করো। কারণ, তাঁর এসব মাস-আলার অধিকাংশ হলো যুক্তি।
অত:পর ইমাম ইয়াহইয়া স্বগতোক্তি করে বলেন, আল্লাহ তায়ালা উভয় ইমামের উপর রহমত বর্ষণ করুন। প্রত্যেকেই তাদের বক্তব্যে সঠিক অবস্থানে রয়েছেন। ইমাম ইবনুল কাসেম আমাকে যেসব হাদিসের উপর আমল করা হয় না, তা থেকে নিষেধ করেছেন। তিনি সঠিক কাজ করেছেন। ইমাম ইবনুল ওহাব আমাকে অপ্রয়োজনীয় ও অধিক কিয়াস থেকে নিষেধ করেছেন। তিনিও সঠিক বলেছেন। অত:পর ইমাম ইয়াহইয়া বলেন, ইমাম ইবনুল কাসেমের বক্তব্যের অনুসরণের মাঝে যেমন উত্তম নির্দেশনা ও হেদায়াত রয়েছে, তেমনি ইমাম ইবনুল ওহাবের অনুসরণের মাঝেও রয়েছে উত্তম পথ-নির্দেশনা।[২৯]

★ ইমাম আবু নুয়াইম নিজ সূত্রে ইবরাহিম নাখয়ি রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন,

لا يستقيم رأي إلا برواية ولا رواية إلا برأي

অর্থাৎ হাদিস ব্যতীত কোন কিয়াস গ্রহণযোগ্য নয়। আবার সঠিক কিয়াস ব্যতীত হাদিসের কোন আমল গ্রহণযোগ্য নয়।[৩০]

★ একই ভাবে ইমাম মুহাম্মাদ বিন হাসান শাইবানী রহ. লিখেছেন,

لا يستقيم العمل بالحديث إلا بالرأي ولا يستقيم العمل بالرأي إلا بالحديث

প্রয়োজনীয় কিয়াস ছাড়া হাদিসের উপর বিশুদ্ধ আমল সম্ভব নয়। আবার হাদিস ব্যতীত কোন ক্বিয়াসও গ্রহণযোগ্য নয়।[৩১]

★ কাজি রামাহুরমুযি রহ. (৩৬০হি:) আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল এর ভূমিকায় তার সমযুগীয় বাগদাদের অধিবাসী এক আলেমকে নসীহত করেছেন। এই আলেম মুহাদ্দিসগণের ব্যাপারে অশোভনীয় কথা বলেছিল। তাঁকে নসীহত করে বলেছেন,
“তুমি ইলমের আদবের প্রতি কেন লক্ষ করো না? ইলমের সাথে সংশ্লিষ্টদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন তোমার কর্তব্য নয় কি? ফকিহদেরকে যথার্থ মূল্যায়ন করো। হাদিস বর্ণনাকারী রাবীদেরকেও উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করো। রাবীদেরকে ফিকাহ অর্জনের প্রতি এবং ফকিহদেরকে হাদিস অর্জনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করো। উভয়ের মর্যাদার স্বীকৃতি প্রদান করো। উভয়ের অনুসৃত পথ থেকে উপকৃত হও। ফকিহ ও মুহাদ্দিস ঐক্যবদ্ধ থাকার মাঝেই তাদের পরিপূর্ণতা। অনৈক্য উভয়ের জন্যই হানিকর।”[৩২]



All References :



[১৮] আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কীহ, খ.২, পৃ.১৫-১৯।
[১৯] লাতাইফুল ইশারাত, খ.১, পৃ.৮০, ৯৮।
[২০] ইমাম হাযেমী রহ. কৃত শুরুতুল আইম্মাতিল খামসা এর উপর ইমাম যাহেদ আল-কাউসারী রহ. এর টীকা সংযোজন। পৃ.৩৬।
[২১] কিতাবুল জামে, পৃ.১১৭।
[২২] কিতাবুল জামে’. পৃ.১৪৬।
[২৩] তারতীবুল মাদারেক, খ.১, পৃ.৬৬।
[২৪] আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কীহ। খ.১, পৃ.১৩২।
[২৫] ওফায়াতুল আ’য়ান, খ.৩, পৃ.১৮৮-১৮৯।
[২৬] সিয়ারু আ’লামিন নুবালা। খ.১৬, পৃ.৪০৪।
[২৭] তারীখে আবু যুরআ,খ.১, পৃ.২৬৫। আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল, পৃ.৩১৮।
[২৮] আল-মুসাওয়াদা, পৃ.৫৩০।
[২৯] তারতীবুল মাদারেক। খ.২, পৃ.৫৪১।
[৩০] হিলয়াতুল আওলিয়া, খ.৪, পৃ.৩২৫।
[৩১] ইমাম সারাখসী রহ. তার উসুলুস সারাখসীতে এটি বর্ণনা করেছেন। খ.২, পৃ.১১৩। তার সমযুগীয় আলেম ফখরুল ইসলাম বাযদাবী উসুলুল বাযদাবীতে এটি উল্লেখ করেছেন। পৃ.৫। দেখুন, শরহু আব্দিল আযীয আল-বোখারী আলা উসুলিল বাযদাবী। খ.১, পৃ.১৭-১৮।
[৩২] আল-মুহাদ্দিসুল ফাসিল, পৃ.১৬০।