মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে ফেকাহশাস্ত্র ও ফকীহ ইমামগণের মর্যাদা (পর্ব ৩) :- | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস


★ ইমাম আবু সুলাইমান খাত্তাবি রহ. (মৃত:৩৮৮ হি:) আবু দাউদ শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ মায়ালিমুস সুনান এর ভূমিকায় লিখেছেন,
“বর্তমান সময়ে আলেমদেরকে দু’ভাগে বিভক্ত দেখি। একদল হলেন মুহাদ্দিস। অপরদল হলেন, ফকিহ। এক দল অপর দল থেকে বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্যের কারণে পৃথক নয়। উদ্দেশ্য অর্জনে কেউ কারও থেকে বিমুখ হতে পারবে না। কেননা হাদিস হলো মূল ও ভিত্তি। ফেকাহ হলো শাখা ও অবকাঠামো। যেই ভবন মজবুত ভিত্তি ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটি অল্পদিনেই ধ্বসে পড়ে। আর যেই ভিত বা মূলের কোন ভবন বা কাঠামো নেই, তা কোন মূল্যই রাখে না।[৩৩]

★ হাফেজ সাখাবি ফাতহুল মুগীসে গরীব হাদিস প্রসঙ্গে আলোচনার শেষে লিখেছেন,
“পূর্বে উল্লেখিত বিষয় ছাড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, হাদিসের বুঝ ও ফিকাহ অর্জন এবং হাদিস থেকে বিধি-বিধান আহরণ। এ বিষয়ের গুরুত্ব খুবই স্পষ্ট। এটি বিখ্যাত ইমামদের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যও। যেমন, ইমাম মালেক, শাফেয়ি, আহমাদ, হাম্মাদ ইবনে সালামা, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, সুফিয়ান সাউরি, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ইসহাক ইবনে রাহওয়াই, ইমাম আওযায়ীসহ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অসংখ্য ইমাম। এ বিষযে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিতাব রচিত রয়েছে।

★ ইমাম ইবনে আসাকির তাঁর তারিখে ইমাম আবু যুরয়া রাযি রহ. এর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ইমাম আবু যুরয়া রহ. বলেন, আমি এক রাতে হাদিসের বর্ণনাকারীদের সম্পর্র্কে অনেক চিন্তা-ফিকির করছিলাম। ইতোমধ্যে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দেখলাম, এক ব্যক্তি আওয়াজ করে বলছে, হে আবু যুরয়া, হাদিসের মূল পাঠ নিয়ে গবেষণা, মৃত ব্যক্তি তথা হাদিস বর্ণনাকারীদের জীবনী নিয়ে গবেষণার চেয়ে উত্তম।
এ কারণে আবু যুরয়া রাযি রহ. নিজে বলতেন,

عليكم با لفقه ، فإنه كالتفاح الجبلي يطعم سنته

“তোমাদের জন্য ফিকাহ অর্জন করা আবশ্যক। কেননা ফিকাহ ঐ পাহাড়ি আপেলের ন্যায় যার স্বাদ নির্দিষ্ট মৌসুমে সবচেয়ে বেশি হয়।”[৩৪]

★ ইমাম হাকেম রহ. তাঁর মুকাদ্দামায় ইলমে হাদিসের বিভিন্ন প্রকারের মাঝে একটি প্রকার উল্লেখ করেছেন ‘হাদীসের বুঝ অর্জন’। এখানে তিনি হাদিসের বুঝ অর্জনের প্রতি খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। এরপর তিনি সেসব বিখ্যাত মুহাদ্দিসের আলোচনা করেছেন, যারা ফকিহ হিসেবেও প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি লিখেছেন,

النوع العشرين من هذا العلم معرفة فقه الحديث إذا هو ثمرة هذه العلوم وبه قوام الشريعة فأما فقهاء الإسلام أصحاب القياس والرأي والاستنباط والجدل والنظر فمعروفون في كل عصر وأهل كل بلد ونحن ذاكرون بمشيئة الله في هذا الموضع فقه الحديث عن أهله ليستدل بذلك على أن أهل هذه الصنعة من تبحر فيها لا يجهل فقه الحديث إذا هو نوع من أنواع هذا العلم

ইলমুল হাদিসের বিশতম প্রকার: হাদিসের ফিকাহ বা বুঝ অর্জন। কেননা এটি ইলমুল হাদিসের ফলাফল। এর উপরই শরিয়ত প্রতিষ্ঠিত। ইসলামের প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক দেশে প্রসিদ্ধ অনেক ফকিহ ইমাম ছিলেন। যারা আসহাবুল কিয়াস, আসহাবুর রায়, আসহাবুল জাদাল, আসহাবুন নজর ওয়াল ইস্তেম্বাত নামেও প্রসিদ্ধ ছিলেন। এ বিষয়েও আমরা আলোচনা করব যে, হাদিসের বুঝ অর্জনের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসরাও এগিয়ে এসেছেন। একারণে তাদের মতামতের প্রতিও লক্ষ রাখা উচিত। এর দ্বারা স্পষ্ট হবে যে, মুহাদ্দিসগণ হাদিসের বুঝশূন্য নন। তারাও এবিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখতেন। কেননা হাদিসের বুঝ অর্জন, ইলমুল হাদিসেরই একটি বিশেষ প্রকার।[৩৫]


ইমাম ইবনে হিব্বান রহ. হাদিসের বুঝ অর্জনের উপর দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। এখানে তিনি হাদিস বর্ণনাকারীদের ভুল বুঝ এবং তাদের অসতর্কতা সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। খতিব বাগদাদি রহ. আল-কিফায়া এর শুরুতে এ বিষয়ে খুবই দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তাঁর এ বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য সেটিই, যা পূর্বে ইমাম ইবরাহিম নাখয়ি ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর বক্তব্য থেকে আলোচনা করেছি। যারা এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য পূর্ণভাবে আয়ত্ব করতে পেরেছেন, তারাই বিশিষ্টজনদের অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে তার সন্তুষ্টির পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।

★ ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি রহ. ফাজলু ইলমিস সালাফ আলাল খালাফে লিখেছেন,

أما الأئمة و فقهاء أهل الحديث فإنهم يتبعون الحديث الصحيح حيث إذا كان معمولا به عند الصحابة و من بعدهم أو عند طائفة منهم فأما ما اتفق علي تركه فلا يجوز العمل به لأنهم ما تركوه علي علم أنه لا يعمل به

“প্রসিদ্ধ ইমাম ও হাদিস বিশারদ ফকিহগণ কোন একটি হাদিস সহিহ হলে কেবল তখনই এর উপর আমল করতেন, যখন তার উপর কোন সাহাবি, তাবেয়ি, অথবা তাদের নির্দিষ্ট একটি দল নিয়মিত আমল করেছেন। আর সাহাবায়ে কেরাম (রা:) যে হাদিসের উপর আমল না করার উপর একমত হয়েছেন, তার উপর আমল করা জায়েয নয়। কেননা এর উপর যে আমল করা যাবে না, সেটা জেনেই তারা হাদিসটি পরিত্যাগ করেছেন।”[৩৬]

★ উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. বলেন,
“ ফিকহ থেকে সেসব বিষয় গ্রহণ করো, যা পূর্ববর্তীদের আমলের সদৃশ। কেননা তারা তোমাদের চেয়ে জ্ঞানী ছিলেন।”
অত:পর ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি রহ. লিখেছেন,
বড় বড় ইমাম যেমন ইমাম শাফেয়ি রহ. ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর পরে নতুন নতুন মতবাদের আবির্ভাব হয়েছে। এসব মতবাদ সম্পর্র্কে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। যেমন হাদিস ও সুন্নাহ অনুসরণের নামে যাহেরী মাজহাবের আবির্ভাব হয়েছে। অথচ এরাই হাদিসের সবচেযে বড় বিরোধী। কেননা তারা ইমামগণের বুঝ থেকে সরে এসেছে এবং নিজস্ব বুঝকে যথেষ্ট মনে করেছে। ফলে সে ইমামগণ যেই মত অবলম্বন করেছেন, তার বিপরীত মতটি নিজের জন্য পছন্দ করেছে।[৩৭]


★ ই’লামুল মুয়াক্বিয়ীনে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর উক্তি বর্ণনা করা হয়েছে,

“إذا كان عند الرجل الكتب المصنفة فيها قول رسول الله صلى الله عليه وسلم واختلاف الصحابة و التابعين فلا يجوز أن يعمل بما شاء ويتخير فيقضي به ويعمل به حتى يسأل أهل العلم ما يؤخذ به فيكون يعمل على أمر صحيح”

যদি কারও নিকট রসুল (স:) এর লিখিত হাদিসের কিতাবসমূহ, সাহাবা, তাবেয়ি, তাবে-তাবেইনদের মতপার্থক্য সম্বলিত বর্ণনা থাকে, তবে তার জন্য যে কোন একটা গ্রহণ করা বৈধ হবে না। সে এর উপর আমল করবে না। এর দ্বারা বিচার করাও জায়েয হবে না। মতবিরোধপূর্র্ণ বিষয়ের কোনটি গ্রহণ করবে সে ব্যাপারে আলেমদেরকে জিজ্ঞাসা করবে। এবং সঠিকটা জেনে তার উপর আমল করবে।[৩৮]

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. উক্ত বক্তব্যের প্রতি লক্ষ করুণ। তিনি বলেছেন, সে যেন উলামায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করে যে কোনটির উপর আমল করবে। এখানে সতর্ক করেছেন যে, কখনও একটি হাদিস সহিহ হতে পারে; যেহেতু হাদিস সহিহ হওয়াটা তার উপর আমলের জন্য যথেষ্ট নয়, একারণে সে উক্ত হাদিস অনুযায়ী ফতোয়া দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে না। সহিহ হাদিস পেলেই তার উপর ফতোয়া দেয়ার ব্যাপারে তিনি সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব, হাদিসটির উপর আমল করা যাবে কি না এবিষয়ে উলামায়ে কেরাম তথা ফকিহগণকে জিজ্ঞাসা না করে হাদিস অনুযায়ী ফতোয়া দেয়া বৈধ নয়। উলামায়ে কেরাম তাকে বলে
 দেবেন, কখন হাদিসের উপর আমল করা হবে এবং কখন আমল থেকে বিরত থাকা হবে।




[৩৩] মায়ালিমুস সুনান. খ.১, পৃ.৩।
[৩৪] ইবনে বাশকুয়াল কৃত আস-সিলাহ, খ.২, পৃ.৪২৯।
[৩৫] মা’রেফাতু উলুমিল হাদীস, পৃ.৬৩।
[৩৬] ফাজলু ইলমিস সালাফ আলাল খালাফ। পৃ.৯।
[৩৭] ফাজলু ইলমিস সালাফ আলাল খালাফ, পৃ.১৩।
[৩৮] ই’লামুল মুয়াক্বিয়ীন, খ,১, পৃ.৪৪