💠 মাসআলা-৫ঃ চার রাকাআত সুন্নাত নামায পড়ার পর ভুলক্রমে আবার চার রাকাআত সুন্নাত নামাযের নিয়ত করে নিল


৭ রবিউল আখির শরীফ ১৩২০ হিজরী। সুদৃঢ় ইসলাম ধর্মের ওলামা-ই কেরামের এ বিষয়ে অভিমত কি যে, এক ব্যক্তি যোহরের নামায পড়ার জন্য দন্ডায়মান হলো। সে চার রাকাআত সুন্নাত নামায পড়ার পর ভুলক্রমে আবার চার রাকাআত সুন্নাত নামাযের নিয়ত করে নিল। চার রাকাআত ফরয নামায পড়া উচিত ছিল। দু'রাকাআত নামায আদায় করার পর মনে পড়ল যে, এখন আমার ফরয পড়া দরকার। অতঃপর সে নিজের অন্তরে এ বলে ফরয রাকাআতের নিয়্যত করে নিল যে, আমি ফরয নামায পড়তেছি। সে নিয়্যত সহকারে ভুলক্রমে পূর্বের দু'রাকাআত নামায সুন্নাত হিসেবে আদায় করেছে এবং পরের দু'রাকাআত শুধুমাত্র আলহামদু (সূরা ফাতিহা)'র সাথে ফরযের নিয়্যতে পড়েছে। এ নিয়মে পড়লে এখন তার নামায ফরয হিসেবে গণ্য হবে না কি সুন্নাত? সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ এ নামায ফরয বা সুন্নাত কোনটাই হয়নি। ফরয এ জন্য হয়নি যে, প্রথম দু'রাকাতের মধ্যে ফরয নামাযের নিয়্যত করেনি আর কাজ শুরু হয়ে গেলে নিয়‍্যতের কোন ধর্তব্য হয় না।

وفي الدُّرِ الْمُخْتَارِ لا عَبْرَة بنية متاخرة عنها على المذهب

অর্থাৎ দুররুল মুখতারে আছে-মাযহাব মতে কোন কাজ পরবর্তী নিয়্যতের সাথে ধর্তব্য হয় না।

পরবর্তী দু'রাকাআতে সে যদি ফরযের নিয়্যতটা তৃতীয় রাকাআতের প্রথম তাকবীরের সময়ে দন্ডায়মানাবস্থায় না করে, তবে এ নিয়্যতই অনর্থক। যদি সে ঐ সময়ে করে তবে উহা প্রথম নিয়্যত থেকে ফরয নামাযের দিকে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। চার রাকাআত পুরোপুরি পড়ে নিলে ফরয আদায় হয়ে যেতো। কিন্তু সে দু'রাকআতে নিয়্যত পরিবর্তনের মাধ্যমে নামায ছিন্ন করে দিয়েছে। সেজন্য ইহাও ফরয হিসেবে আদায় হয়নি।

في الدر المختار يُفْسِدُهَا انْتِقَالُهُ مِنْ صَلُوةٍ إِلَى مُغَايَرَتِهَا في رد المحتار بأن ينوى بِقَلْبِهِ مَعَ التَّكْبِيرَاتِ الانْتِقَالَ المذكور قَالَ في النهريان صلى ركعة من الظهر مثلاً ثم افتتح العصر أو التطوع بتكبيرةٍ فَإِنْ كَانَ صَاحِبٌ ترتيب كَانَ شَارِعًا فِى التطوّع عِنْدَهُمَا خِلَافًا لِمُحَمَّدٍ أَوْلَمْ يَكُنْ بِأَنْ سَقَطَ للضَّيْقِ أَوْ لِلْكَثرَتِ صَحٌ شروعة في العصر لِأَنَّهُ نَوى تحصيل مَا لَيسَ بحاصل فَخَرَجَ عَنِ الأَوْلِ فَمُنَاطُ الخُرُوجِ عَنِ الأَوَّلِ صِحَةُ الشروع في المُغَايِرِ وَلَوْ مِنْ وَجْهِ الخ -

অর্থাৎ দুররুল মুখতারে আছে-কোন ব্যক্তি তার এক নামায থেকে অন্য নামাযের দিকে পরিবর্তনের দ্বারা নামাযকে ফাসিদ করে দেয়-যা প্রথম নামাযের বিপরীত। ফতোয়া-ই শামী'র মধ্যে আছে-যেমন মানুষ নিজের অন্তরে কয়েক তাকবীরের সাথে উল্লেখিত নিয়্যত স্থানান্তরের মনস্থ করে। 'নাহর' কিতাবের মুসান্নিফ বলেছেন, যেমন কোন নামাযী ব্যক্তি যোহরের এক রাকাআত নামায পড়েছে। অতঃপর আসরের নামায শুরু করে দিয়েছে অথবা তাকবীরের সাথে নফল নামায আরম্ভকরেছে। ফলে যদি সে সাহেবে তারতীব (যার একাধারে পাঁচ ওয়াক্ত নামায কাযা নেই) হয় তাহলে শায়খাইন তথা ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) এর মতে সে নফল নামায আরম্ভকারী হবে। ইমাম মুহাম্মদের অভিমত এর বিপরীত। অথবা সাহেবে তারতীব নয়, এভাবে যে-সময়ের সংকীর্ণতার কারণে বাদ পড়ে গেছে অথবা সময়ের ব্যাপকতার কারণে আসরের সময়ে তার আরম্ভ হওয়া শুদ্ধ হবে। কেননা সে এমন বস্তু অর্জন করার নিয়্যত করেছে-যা তার অর্জিত হয়নি। ফলে প্রথম নামায হতে সে বের হয়ে গেছে। কাজেই প্রথম নামায থেকে বের হয়ে যাওয়াতে এর বিপরীত নামায শুরু করা শুদ্ধ হয়েছে। যদিও তা এক প্রকারের পরিবর্তন।

সুন্নাত হিসেবে আদায় না হওয়াটা সুস্পষ্ট। কারণ সে সুন্নাত পড়ে নিয়েছে। যদি সুন্নাত নাও পড়ে থাকে এবং তৃতীয় অথবা কোন রাকাআতের প্রথম তাকবীরের সময় ফরয নামাযের নিয়্যত করে নেয় তখনও সুন্নাত হবে না। উহা ঐ নিয়্যতের কারণে ফরয নামাযের দিকে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। অবশ্যই এ রাকাআতসমূহ নফল হিসেবে পরিগণিত। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৬ঃ কোন ব্যক্তি ফরয নামায পড়তেছে এবং সে ভুলক্রমে পরের দু'রাকাআতে 'আল হামদু' (সূরা ফাতিহা) এর পর একটি সূরা মিলায়ে পড়েছে। সম্পন্ন করার পর এখন তার নামায কি ফরয হয়েছে না কি সুন্নাত?

৮ রবিউল আখির শরীফ ১৩২০ হিজরী।

ওলামা-ই দ্বীন ও সুদৃঢ় শরীয়তের মুফতিগণ কি বলেন? এ মাসআলার ব্যাপারে যে, কোন ব্যক্তি ফরয নামায পড়তেছে এবং সে ভুলক্রমে পরের দু'রাকাআতে 'আল হামদু' (সূরা ফাতিহা) এর পর একটি সূরা মিলায়ে পড়েছে। সম্পন্ন করার পর এখন তার নামায কি ফরয হয়েছে না কি সুন্নাত? যে রকম হয় সেরূপই চূড়ান্ত ফয়সালা দিবেন। যদি সাহু সাজদা করে নেয় তবে তার নামায ফরয হিসেবে আদায় হয়ে যাবে কি না? সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ ফরয আদায় হবে। নামাযে এমন কোন ত্রুটি আসেনি যার কারণে তার উপর সাজদা সাহু ওয়াজিব হয়। বরং ইচ্ছাকৃতভাবেও যদি ফরয নামাযে পরের রাকাআতসমূহে সূরা মিলিয়ে নেয় তবে কোন অসুবিধা নেই; শুধু উত্তমতার বিপরীত হয়। বরং কোন কোন ইমাম তা মুস্তাহাব হওয়ার সুষ্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। অধমের নিকট প্রকাশ্যভাবে এ মুস্তাহাব হওয়াটা একাকী নামায পড়ুয়াদের বেলায় প্রযোজ্য। ইমামের জন্য অবশ্যই মাকরূহ; বরং যদি মুক্তাদিগণের নিকট ইমামের কিরাত পৌঁছে গেলে হারাম। । দুররুল মুখতারে আছে-

ضُمَّ سُورَةٌ فِي الأَولَيْنِ فِي الفرضِ وَهَلْ يُكْرَهُ فِي الْأَخِرَينِ المختار لا

অর্থাৎ ফরয নামাযের প্রথম দু'রাকাআতে সূরা মিলানো হয়। তার পরের দু'রাকাআতে সূরা মিলানো কি মাকরূহ হবে? পছন্দনীয় মত হল মাকরূহ নয়।

রাদ্দুল মুহতারে আছে-

اى لا يُكْرَهُ تَحْرِيمًا بل تنزيها لأنه خِلَافَ السُّنَّةِ قَالَ فِي الْمُنِيَّةِ وَشَرحِهَا فَإِنَّ ضَمَّ السُّورَةِ إِلَى الفَاتِحَةِ سَاهِيًا تَجِبُ عَلَيْهَا سَجْدَنَا السَّهْوَ فِي قول ابى يُوسُفَ لِتَاخِيرِ الركوع عَنْ مُحلّه وَفِي أَظْهَرِ الرِّوَايَاتِ لَا تَجِبُ لان القراءة فِيهِمَا مَشْرُوعَة من غير تقدير والاقْتِصَارُ عَلَى الفَاتِحَةِ مَسَّنُونَ لَا وَاجِبُّ اه وَفِي البَحْرِ عَنْ فَخْرِ الإِسْلَامِ إِنَّ السورة مشروعة في عة في الأخريين نفلاً وفي الذخيرة انه المختار وفي المحيط هو الأصح اه والظاهر ان المراد بقوله نَفْلًا بِجَوَازِ المَشْرُوعِيةِ بِمَعْنى عدم الحرمةِ فَلَا يُنافي كونه خلاف الأولى كَمَا أَفَادَهُ فِي الحَلِيَّةِ اه ما فى رُدَّ الْمُحْتَارِ أَقُولُ لَفَظَ الحَلِيةِ ثم الظاهر ابَاحَتُهَا كَيْفَ لا وقد تَقَدَّمَ مِنْ حَدِيثِ أَبِي سَعِيدِ الخدري في صَحِيح الْمُسْلِمِ وغيره أنه صلى الله تعالى عليه وسلم كَانَ يَقْرُو فِي شرحصلوة الظهر في الركعتين الأوليين قَدْرَ تَلْبَين آية وفي الآخريين قد رخمسة عشراية أو قال نصف ذلك فلا جُرم إن قال فخر الإسلام في رح جامع الصغير وأما السُّورَة فَإنها مشروعة نقلاً في في الأخريين الأخر حتى قلنا فيمَن قَرة في الآخريين لم يلزمة سجدة السهو انتهى تم يمكن أن تقال الأولى عدم الزيادَةِ وَيُحمل على الخُرُوجِ مَخْرَجَ الْبَيَانِ لِذَلِكَ الحديث أبي قتادة رضى الله تعالى عنه ( يُرِيدُ مَا تَقَدَّم برواية الظهر الصحيحين أن النبي صلى الله تعالى عليه وسلم كان يقرؤ في ا في الأوليين بأم القرآن وسورتين، وفي الركعتين الأخريين بأم الكتاب الحديث قول المصنف المذكور (اى ولا يزيد عليهما شيئًا ) وقول غير واحد من المشائخ كَمَا فِي الْكَافِي وَغَيْرِهِ وَيُقْرُقُ فيهما بعد الأوليين الفاتحة فقط ويحمل على بيان مجرد الجواز حديث أبي سعيد رضي الله تعالى عنه قول فخر الإسلام فأن النبي صلى الله تعالى عليه عليه وسلم وسـ يفعل الجائز فقط في بَعْضِ الْأَحْيَانِ تَعْلِيمًا لِلْجَوَارِ وَغيرِه مِنْ غَيْرِ كَرَاهِيَة فِي حقه صلى الله عليه وسلم كَمَا يَفْعَلُ الْجَائِرُ الأُولَى فِي غَالِبِ الأحوال والنقل لا يُسَافِي عَدْمَ الأولوية فَيَنْدَفِعُ بِهَذَا مَا عَسَاهُ يُخَالُ مِنَ الْمُخَالَفَةِ بين الحديثين المذكورين وبين اقوال المشائخ والله سبحانه أعلم اه ولعلك لا يخفى عليك أن حمل المشروع نقلاً على المكروه تنزيها مستبعد جدا و قراة السورة في الأخريين ليست فعلا مستحبا مستقلا يعتبر عدم الأولوية لعارض كصلوة نافلة مع بعض المكروهات وإنما المستفاد من السفلية ههنا فيما يظهر هو استحاب فِعْلُهَا فَكَيفَ يُجَامِعُ عَدْمَ الأولوية والذي يظهرُ لِلْعَبْدِ الضَّعِيفَ ان سنته الاقتصار على الفاتحة إِنَّمَا تثبت عن المصطفى صلى الله عليه وسلم في الْإِمَامَةِ فَإِنَّهُ لَمْ يُعْهْدَ مِنْهُ صلى الله تعالى عليه وسلم صلوة مكتوبة الا إِمَامًا الأَنَادِرًا فِي غَايَةُ المَدْرَةِ فَيُكْرَهُ للإمامِ الزيادة عَلَيْها لإطالة على المُقْتَدِينُ فَوْقَ السَّنَةِ بَلْ أَوْ أَطَالَ إِلَى حَدٍ الاستثقال كَرِهَ تَحْرِينَا أَمَّا الْمُنْفَرِدُ فَقَالَ فِيهِ النَّبِيُّ صلى الله تعالى عليه وسلم فَلْيَطول مَا شَاء وَزِيَادَةُ القِرَاء ةِ زِيَادَةٌ خَيْرٍ وَلَمْ يَعْرِضُهُ مَا يُعَارِضُ خَيْرِيَّتَهُ فَلَا يَبْعُد أَنْ يكونَ نَفْلاً فِي حَقَّهُ . فَإِنْ حَمَلْنَا كَلَامَ أَكثَرِ المَشَائِخ على الإمامَةِ وَكَلامَ الإِمَامِ فَخْرِ الإسلام وتصحيح الذخيرة والمحيط على المنفرد حصَل التوفيق وبالله التوفيق. هذا ما عندي والله سبحانه وتعالى أعلم

অর্থাৎ মাকরূহে তাহরিমা নয়; বরং তানযিহী। কেননা ইহা সুন্নাতের বিপরীত। ইহা মুনিয়া এবং এর শরাহ'র মধ্যে বলেছেন। যদি সে ভুলক্রমে ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলিয়ে পড়ে তবে তার উপর সাহু সাজদা ওয়াজিব হবে। ইহা ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) এর বর্ণনা মতে। রুকূকে তার স্থান হতে দেরী করার কারণে। যাহির রেওয়ায়েতে আছে সাহু সাজদা ওয়াজিব নয়। কেননা এ দু'রাকাআতে কিরাত অনির্ধারিতভাবে প্রচলিত। এখন বাকী আছে সূরা ফাতিহার উপর সংক্ষেপন করাটা। ফাতিহার উপর সংক্ষেপ করা সুন্নাত; ওয়াজিব নয়। 'বাহর' গ্রন্থে আছে-ইমাম ফখরুল ইসলাম হতে বর্ণিত যে, পরের দু'রাকাআতে ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলানো নফল হিসেবে জায়েয। যখীরা'য় আছে ইহাই পছন্দনীয় অভিমত। মুহীত্ব'এ আছে ইহাই অধিক শুদ্ধ। প্রকাশ থাকে যে, ইমাম ফখরুল ইসলামের অভিমত অনুযায়ী কিরাত নফল হিসেবে জায়েয হওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে হারাম না হওয়া। এ অভিমত শেষের দু'রাকাআতে কিরাত 'খেলাপে আওলা' হওয়ার বিপরীত নয়। যেমন 'হুলিয়া' নামক কিতাবে ইহা বর্ণনা করা হয়েছে।

আমি বলছি হুলিয়ার বর্ণনানুপাতে- শেষ দু'রাকাতে কিরাত কিভাবে বৈধ হবে না? যার বর্ণনা প্রথমেই অতিবাহিত হয়েছে। সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত, নিশ্চয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহরের নামাযে প্রথম দু'রাকাআতে ত্রিশ আয়াত পরিমাণ পড়তেন এবং শেষের দু'রাকাআতে পনের আয়াত পরিমাণ। অথবা তিনি বলেছেন উহার অর্ধেক পরিমাণ পড়তেন। ইমাম ফখরুল ইসলাম 'শরহে জামিউস সাগীর'এ তা নিঃসন্দেহে বলেছেন। সূরা পড়া শেষের দু'রাকাআতে নফল হিসেবে অনুমোদিত। এমন কি আমরা ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে বলছি-যে শেষের দু'রাকাআতে কিরাত পড়েছে, সে জন্য তার উপর সাহু সাজদা আবশ্যক নয়।

এটা বলার সম্ভাবনা রয়েছে যে, উত্তম হচ্ছে অতিরিক্ত না হওয়া এবং এটাই নিষ্কৃতির উপায়। কারণ আবু কাতাদা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু'র হাদীসে এরূপ রয়েছে। (এটা দ্বারা ঐ হাদীস উদ্দেশ্য-যা সহীহাইন তথা বুখারী-মুসলিম'র বরাতে পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে)। নিশ্চয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহরের প্রথম দু'রাকাআতে সূরা ফাতিহা ও দু'টি সুরা পড়তেন এবং শেষের দু'রাকাআতে সূরা ফাতিহা পড়তেন। এটাই একাধিক মাশায়েখ'র উক্তি, যেমন কাফী এবং অন্যান্য গ্রন্থে রয়েছে। প্রথম দু'রাকাআতের পর শেষের দু'রাকাআতে শুধুমাত্র সূরা ফাতিহা পড়া হবে। আবু সাঈদ খুদরী'র হাদীস এবং ফখরুল ইসলাম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা'র উক্তি শুধুমাত্র বৈধতা বর্ণনার উপর প্রয়োগ করা হবে। কেননা নিশ্চয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কোন সময় তার নিজের বেলায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে জায়েয কাজ করতেন-বৈধতা ও অন্যান্য বিষয় শিক্ষা দেয়ার জন্যে। অধিকাংশ অবস্থায় উত্তমতার উপর আমল করতেন। নফল কাজ করলে তা অনুত্তমতার বিপরীত হয় না। এভাবে হাদীসদ্বয় ও মাশায়েখ কেরামের উক্তির মধ্যে দ্বন্ধ মিটে যায়। সম্ভবত তোমার কাছে এ কথা গোপন নয় যে, নফল হিসেবে অনুমোদিত বিষয়কে মাকরূহে তানযিহীর উপর প্রয়োগ করা খুবই দুষ্কর। আর শেষের দু'রাকাআতে সূরা পড়া এমন স্বতন্ত্র কোন মুস্তাহাব কাজ নয়-যা কোন প্রতিবন্ধকতার কারণে না করলে অনুত্তমতার মধ্যে গণ্য করা হবে। যেমন নফল নামায কিছু মাকরূহ সহকারে আদায় করা। এখানে নফলিয়া বলতে মুস্তাহাবই বুঝায়। এ অর্থের ভিত্তিতে তা কিভাবে খেলাপে আওলা (উত্তমতার বিপরীত)'র সাথে একত্রিত হতে পারে? এ অধম দূর্বল বান্দার নিকট যা সুষ্পষ্ট হয়েছে তা হল-শেষের দু'রাকাআতে সুরা ফাতিহার উপর সংক্ষিপ্ত করা সুন্নাত-যা ইমামতি অবস্থায় স্বয়ং নবী মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত। কেননা হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে ইমামতি অবস্থা ব্যতীত ফরয নামায আদায় করার প্রমাণ মিলেনি। জামাত ছাড়া নামায আদায়ের ব্যাপারটি খুব দূর্লভ। কাজেই ইমামের জন্য শেষের দু'রাকাআতে সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সুরা অতিরিক্ত করা মাকরূহ মুক্তাদিগণের সাথে নামায সুন্নাতের অতিরিক্ত লম্বা করার কারণে। বরং যদি সে এত লম্বা করেছে যে, মুক্তাদিগণের নিকট ভারি মনে হয় তবে তা হবে মাকরূহে তাহরিমা।

একাকী নামায আদায়কারীর ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-সে যতটুকু চায় কিরাত লম্বা করবে, কিরাত লম্বা করা অতি উত্তম। এখানে উত্তমতার প্রতিবন্ধক হবে এমন কিছু নেই। তার ব্যাপারে ইহা নফল হওয়া স্বাভাবিক। যদি আমরা অধিকাংশ মাশায়েখের উক্তিকে ইমামত'র উপর এবং ফখরুল ইসলামের তাসহীহুয যাখীরাহ ও মুহীত্ব'র উক্তিকে একাকী নামায আদায়কারীর উপর প্রয়োগ করি তবে উভয় উক্তি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যাবে। আল্লাহই তাওফীক দাতা। এটা আমার অভিমত অনুসারে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৭ঃ এক ব্যক্তি বিছমিল্লাহ বলে একটি শিকারীর উপর বন্দুক চালিয়েছে। সেটার কাছে গিয়ে দেখে এতে প্রাণ থাকার কোন চিহ্ন ও নড়াচড়া কিছুই নেই। তবে ওটাকে যবেহ করলে তা থেকে বেশ রক্ত বের হয়। এ শিকার কি হালাল না কি হারাম?

৯ রবিউল আখের শরীফ, ১৩২০ হিজরী।

ওলামা-ই দ্বীন ও সুদৃঢ় শরীয়তের মুফতীগণ এ মাসআলা প্রসংগে কি বলেন যে, এক ব্যক্তি বিছমিল্লাহ বলে একটি শিকারীর উপর বন্দুক চালিয়েছে। সেটার কাছে গিয়ে দেখে এতে প্রাণ থাকার কোন চিহ্ন ও নড়াচড়া কিছুই নেই। তবে ওটাকে যবেহ করলে তা থেকে বেশ রক্ত বের হয়। এ শিকার কি হালাল না কি হারাম? রক্ত বের না হলে তখন বিধান কি জবাব লিখবেন। সুষ্পষ্টভাবে বর্ণনা করুন, প্রতিদান প্রাপ্ত হবেন।

জাওয়াবঃ যবেহ করার পর যদি সাব্যস্ত হয় যে, যবেহ করার সময় উহাতে প্রাণ

ছিল। যেমন-নড়াচড়া, লাফিলাফি বা পাখা ঝাঁপটাতে লাগল অথবা যবেহ করার সময় ছটফট করল, যদিও রক্ত বের না হয়। অথবা রক্ত এভাবে গেছে যেভাবে যবেহকৃত জন্ত হতে বের হয় যদিও নড়াচড়া না করে। অথবা অন্য কোন চিহ্নের দ্বারা জীবন আছে বলে সুষ্পষ্ট হয়ে যায় তখন তা হালাল। বন্দুকের গুলি ছোঁড়ে দিয়েছে যবেহ করেনি, অথবা যবেহ করেছে; কিন্তু যবহের সময় উহাতে প্রাণ আছে বলে সাব্যস্ত হয় নি তবে তা হারাম। মূলোদ্দেশ্য হল-যবেহ করে নিলে এবং যবহের সময় উহাতে শেষ নিঃশ্বাস বাকী থাকলে, যদিও তা নড়চড়া না করে ও রক্ত না ঝরে তবে হালাল নতুবা হারাম।

দুররুল মুখতারে আছে-

ذبَحَ شَاةٌ مَرِيضَةً فَتَحَرَّكَتْ أَوْ خَرَجَ الدَّمَ حَلَّتْ وَإِلَّا لَا إِنْ لَمْ تَدْرِ حَيَاتَهُ عندَ الذَّبْحِ وَإِنْ عَلِمَ حَيَاتَهُ حَلَّتْ مُطلَقًا وَإِنْ لَمْ تَتَحَرَّكَ وَلَمْ يَخْرَجِ الدَّمَ وَهُذَا يَتَأَتَى فِي مَنْخَنِقَةٍ وَمُتَرَدِّيَةٍ وَنَطِيحَةٍ وَالَّتِي فَقَرَ الذِّئْبُ بَطْنَهَا فَذَكَاةُ هذِهِ الْأَشْيَاءِ تَحْلَّلُ وَإِنْ كَانَتْ حَيَاتَهَا خَفِيفَةً وَعَلَيْهِ الْفَتَوَى لِقَوْلِهِ تَعَالَى الا مَا ذَكَيْتُمْ مِنْ غَيْرِ فَصْلِ اه وَفِي رَبِّ الْمُحْتَارِ عَنِ الْبَزَازِي عَنِ الْإِسْبِيجَابِى عَنِ الْإِمَامِ الْأَعْظَمِ رضى الله تعال عنه خُرُوجَ الدَّمِ لَا يُدل على الحَيُوةِ إِلَّا إِذَا كَانَ يَخْرُجُ كَمَا يَخْرُجُ مِنَ الْحَيِّ قَالَ وَهُوَ ظَاهِرَ الرَّوَايَةِ.

অর্থাৎ কেউ রুগ্ন ছাগী যবেহ করল। আর তা নড়চড়া করেছে অথবা উহা থেকে রক্ত বের হয়েছে তাহলে তা হালাল, নতুবা হালাল হবে না। যদিও যবহের সময় উহাতে প্রাণের অস্তিত্ব না থাকে। যদি যবহের সময় প্রাণ আছে বলে প্রতীয়মান হয়, তবে সাধারণত তা হালাল। যদিও নড়াচড়া না করে এবং রক্তও বের না হয়। শ্বাস রুদ্ধ করে মারা পশু, ওপর থেকে পতিত পশু, শিংয়ের আঘাতে আহত পশু এবং ঐ পশু-যার পেট বাঘে ছিঁড়ে ফেলেছে এগুলোর উপর পূর্বোল্লেখিত হুকুম প্রযোজ্য। উল্লেখিত অবস্থায় ঐ পশুগুলোকে যবেহ করলে ঐ গুলো হালাল হয়ে যাবে, যদিও ঐ পশুগুলোতে প্রাণ সামান্যই থাকে। আল্লাহর বাণী الا ماذكيتم (কিন্তু যেগুলো তোমরা যবেহ করে নিয়েছ) এর কারণে এরই উপর ফতোয়া। রাদ্দুল মুহতারে বর্ণিত আছে-ইমাম বায্যাযী হতে, তিনি ইস্পাহানী হতে, তিনি ইমামে আ'যম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম হতে বর্ণনা করেছেন যে, শুধু রক্ত বের হওয়া জীবন্ত হওয়ার উপর বুঝায় না, তবে হ্যাঁ, জীবন্ত হওয়ার উপর বুঝাবে যখন রক্ত এমনভাবে বের হয়-যেভাবে জীবিত প্রাণী হতে বের হয়। তিনি বলেছেন- এটাই যাহির রেওয়ায়াত।

উহার 'শিকার অধ্যায়ে' আছে-

د در زما المعتبرة في المتردية وأخواتِهَا كَنَطِيحَةٍ وَمُوْقُونَةٍ وَمَا أَكَلَ السَّبَعَ وَالْمَرِيضَةَ مُطَلِقُ الْحَيَاةِ وَإِنْ قَلَتْ كَمَا أَشَرْنَا إِلَيْهِ عَلَيْهِ الْفَتْوَى

অর্থাৎ উঁচু স্থান থেকে পতিত পশু-যার মৃত্যু নিকটবর্তী এবং সে জাতীয় পশুসমূহ যেগুলো পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে যেমন نطيحة (শিং ওয়ালা প্রাণীর গুতোয় আহত পশু) مَوْقُوْدَةٌ (লাঠি, পাথর ইত্যাদি দ্বারা আহত পশু) এবং যা হিংস্র প্রাণী ভক্ষণ করেছে ও রুগ্ন পশুগুলো সাধারণভাবে জীবন্ত। যদিও প্রাণ সামান্যই থাকে। যেমন আমরা এর প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছি। এর উপরই ফতোয়া।

'মাদারিকুত তানযীল'র মধ্যে আছে-

الْمَوْقُوذَةُ اسْخَنُوهَا ضَرْبًا بِالْعَصَا أَوْ حَجَرٍ.

অর্থাৎ موقوذة ঐ প্রাণী-যাকে সে লাঠি বা পাথর দিয়ে আঘাত করেছে।

'মুয়ালিম'এ আছে-

قَالَ قَتَادَةَ كَانُوا يَضْرِبُونَها بِالعَصا فَإِذَا مَاتَتْ أَكْلُوهَا إِهِ قُلْتُ فَظَهَرَ أَنَّ الْمَضْرُوبَ كُلَّ مِثْقِل كَالبَنْدقَةِ وَلَوْ يُنْدَقَةُ الرَّصَاصِ كُلَّهُ مِنَ الْمُوْقُوذَةِ فَيُحِلُّ بِالزَّكَاةِ وَإِنْ قَلَتِ الْحَيَاةُ.

অর্থাৎ হযরত কাতাদা (রাঃ) বলেছেন তারা (কাফিররা) পশুকে লাঠি দিয়ে এমনভাবে মারত যে উহা মরে যেত। উহা মরে গেলে তারা তা খেত।

আমি বলছি তা হতে সুষ্পষ্ট হয়ে গেল যে, প্রত্যেক ভারী বস্তু দ্বারা প্রহৃত জন্ত যেমন বন্দুক, যদিও সীসার গুলিযুক্ত বন্দুক হয়, এগুলো সব موقوذة এর অন্তর্ভুক্ত। ইহা যবেহ করার মাধ্যমে হালাল হয়ে যাবে, যদিও যবহের সময় তাতে প্রাণ সামান্যই থাকে।

রাদ্দুল মুহতারে আছে-

لا يَخْفَى أَنَّ الْجُرْحُ بِالرَّصَاصِ إِنَّمَا هُوَ بِالْإِحْرَاقِ وَالنَّقْلِ بِوَاسِطَةِ إِنْدِفَاعِهِ

العَنِيفِ إِذْ لَيْسَ لَهُ حَدَّ فَلَا يَحِلُّ وَبِهِ أَفْتَى ابْنُ نُجَيْمِ

অর্থাৎ এটা গোপনীয় নয় যে, নিশ্চয় সীসার গুলিতে আঘাতপ্রাপ্ত পশু যে আঘাত জ্বালানো ও ভারী বস্তু হওয়ার কারণে হয় যেহেতু এ রকম গুলিতে ধার নেই সেহেতু সজোরে নিক্ষেপ করলেও তা হালাল হবে না। ইবনু নুজাইম সেরূপ ফতোয়া দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালাই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা-৮: এক ব্যক্তি সখ করে প্রতিদিন বন্দুক শিকার করে। পবিত্র শরীয়তের হুকুম অনুযায়ী কত পরিমাণ এবং কখন শিকার করতে পারে? শিকারী প্রতিদিন শিকার করলে গুনাহগার হবে কি না?

১০ রবিউল আখির শরীফ, ১৩২০ হিজরী।

ওলামা-ই কেরামের অভিমত কি? এক ব্যক্তি সখ করে প্রতিদিন বন্দুক শিকার করে। পবিত্র শরীয়তের হুকুম অনুযায়ী কত পরিমাণ এবং কখন শিকার করতে পারে? শিকারী প্রতিদিন শিকার করলে গুনাহগার হবে কি না? বিস্তারিত বর্ণনা করে অধিক প্রতিদান প্রাপ্ত হোন।

জাওয়াবঃ এমন শিকার যা চিত্ত বিনোদন সৌখিনতার উদ্দেশ্যে হয়-যা এক প্রকার খেল-তামাসা বুঝা যায়। তাইতো তাকে শিকার খেলা বলা হয়। বন্দুক দিয়ে পশু শিকার হোক, চাই মাছ শিকার হোক, প্রতিদিন-সবসময় হোক, চাই মাঝে মাঝে হোক; সাধারণতঃ সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। ওই শিকার বৈধ যা খাওয়ার উদ্দেশ্যে বা ঔষধ বা অন্য কোন উপকারার্থে বা কোন ক্ষতি এড়ানোর জন্য হয়।

আজকাল বড় মাপের শিকারিরা এমন লাজুক যে, বাজার থেকে নিজের খাওয়া বা পরার বিশেষ প্রয়োজনীয় বস্তু আনতে যাওয়াকে নিজের মর্যাদাহানী বলে মনে করে। অথবা এমন সুখী যে, দশ কদম রোদে হেঁটে মসজিদে নামাযের জন্য উপস্থিত হওয়াকে মুসীবত বলে মনে করে অথচ সে দুপুরের তাপে প্রচণ্ড গরম বাতাসে উত্তপ্ত বালির উপর চলাচল এবং গা জ্বালানো বিদগ্ধ বাতাসে মুখ থুবড়ানোকে সহ্য করে। দিনের পর দিন শিকারের জন্য ঘর-বাড়ি ছেড়ে দেয়। তা কি খাদ্য যোগানোর উদ্দেশ্যে? কখনো না; বরং খেলা জমানো। তা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। এর একটা বাস্তব অভিজ্ঞতা যে, এ সব শিকারীদের যদি বলা হয়-এ সব মাছ বাজারে পাওয়া যায়, সেখান থেকে নিয়ে নাও, সে কখনো তা মানবে না। অথবা যদি বলা হয় যে, আমরা আপনার জন্য নিয়ে আসি, সে কখনোই রাজী হবে না। শিকার করে সে উহা খাওয়ার উদ্দেশ্যে রাখেও না, ভাগ করে দিয়ে দেয়। জানা গেল যে, নিশ্চিত তা চিত্ত বিনোদন ও আমোদ-প্রমোদ। তা-ই হারাম।

দুররুল মুখতারে আছে - (الصَّيْدَ مَبَاحُ إِلَّا لِلتَّلَهَى كَمَا هُوَ ظَاهِرُ) খেল তামাশা ব্যতিত প্রয়োজনে শিকার বৈধ, যেভাবে তা সুষ্পষ্ট। আশবাহ, বাযযাযিয়া, মাজমাউল ফাতাওয়া, গুনিয়া, তা-তারখানিয়া ও রাদ্দুল মুখতারসহ অন্যান্য গ্রন্থসমূহে তার বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

মাসআলা-৯ঃ তামার পাত্র থেকে অযু করলে কেন তা অসম্পূর্ণ হবে?

১২ রবিউল আখির শরীফ, ১৩২০ হিজরী।

ওলামা-ই দ্বীন ও সুদৃঢ় শরীয়তের মুফতিগণ অভিমত কি? শরয়ে মুহাম্মদী'র আটাশতম অধ্যায়ে بيان مكروهات الوضوء এর মধ্যে আছে-

تیسر ے تانبے کے برتن سے اگر ہے وضو نا قص کرے گا جو بشر

অর্থ-তৃতীয়তঃ যদি কোন তামার পাত্র হতে অযু করে, তবে মানুষ ঐ অযুকে অসম্পূর্ণ করে দিবে।

এটা বুঝে আসে না যে, তামার পাত্র থেকে অযু করলে কেন তা অসম্পূর্ণ হবে? আজকাল অনেক মানুষ তামার বদনা হতে অযু করে থাকে। তাহলে কি এদের সবার অযু অসম্পূর্ণ হবে? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ তামার পাত্র হতে অযু করা, ওটাতে খাওয়া-দাওয়া, পানাহার সব

জায়েয। কোন মাকরূহ হবে না। অযুতে কোন ক্ষতি হবে না। তবে বার্নিশ করার পর অযু, পানাহার ইত্যাদি করা চাই। বার্ণিশহীন পাত্রে পানাহার করা মাকরূহ। ইহা শারীরিক ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। তাই মাটির পাত্রের ব্যবহার তামার পাত্র হতে উত্তম। ওলামা-ই কেরাম অযুর শিষ্টাচার ও মুস্তাহাবসমূহের মধ্যে মাটির পাত্র হওয়াকে গণ্য করেন। অযুর পাত্র মাটির হতে হবে। এতে পানাহার করা বিনয় নম্রতার অধিক নিকটবর্তী।

রাদ্দুল মুহতারে ফাতহুল কাদীর'র রেফারেন্সে বর্ণিত-

مِنْهَا ( اي مِنْ آدَابِ الْوُضُوءِ) كَوْنَ اَنِيَةٍ مِنْ خَزَفٍ

অর্থাৎ অযুর শিষ্টাচারসমূহ থেকে একটি হচ্ছে অযুর পাত্র পোঁড়া মাটি হতে হওয়া।

উহাতে اختیار شرع مختار হতে উল্লেখ আছে-

اتخَاذَ ( أَيْ أَوَانِي الْأَكْلِ وَالشَّرْبِ) مِنَ الْخَزَفِ أَفْضَلَ إِنَّ لَا صَرْفَ فِيهِ وَلا مَخِيلَة وفي الحديث مَنِ اتَّخَذَ أَوَانِي بَيْتِهِ خَزَفًا زَارَتُهُ المَلَائِكَةَ وَيَجَوْزَ اتِّخَانَهَا مِنْ نَحَاسٍ أَوْ رَصَاصِ

পানাহারের জন্য পোঁড়া মাটির পাত্র বানানো উত্তম। কেননা এতে নেই কোন খরচ ও অহংকার। হাদীস শরীফে আছে-যে ব্যক্তি ঘরে মাটির পাত্র রাখবে, ফিরিশতা ওই ঘরে যিয়ারত করে থাকে। তামা অথবা সীসার পাত্র ব্যবহারও জায়েয।

তাতে আরো আছে-

يُكْرَهُ الْأَكْلُ فِي النَّحَاسِ الْغَيْرِ الْمُطَلِّي بِالرَّصَاصِ لِأَنَّهُ يَدْخُلُ الصَّدَاءُ فِي الطَّعَامِ فَيُوْرِثُ ضَرَرًا عَظِيمًا وَمَا بَعْدَهُ فَلَا مُلَخَصًا

সীসা দ্বারা বার্নিশহীন তামার পাত্রে খাবার খাওয়া মাকরূহ। কেননা তাতে খাবারে মন্দ প্রভাব পড়ে থাকে-যা বড় ক্ষতিতে ফেলে। নিকেল করায় ঐ মন্দ প্রভাব বিদূরিত হয়ে যায়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

মাসআলা-১০ঃ ১৩ রবিউল আখির শরীফ, ১৩২০ হিজরী।

কিছু লোক বলে যে, অমুক গাছের উপর শহীদ নিহিত আছে এবং অমুক খিলানে শহীদ থাকে। উক্ত গাছ ও খিলানের নিকট গিয়ে প্রতি বৃহস্পতিবার শিরনী, চাল ফাতিহা, হার ঝুলায় এবং আগরবাতি জ্বালিয়ে নিজের মনোবাসনা পূরণের প্রার্থনা করে। এ রকম রীতি-নীতি শহরের অনেক স্থানে দেখা যায়। আসলে শাহাদাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ কি গাছ এবং খিলানসমূহে অবস্থান করে? যারা এ সব বিশ্বাস করে সে ব্যক্তিবর্গ কি সত্য পথে না ভ্রান্ত পথে? এ প্রসংগে ওলামা-ই আহলে সুন্নাতের অভিমত কি? দস্তখতসহ সবিস্তারে জানাবেন। বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ এ সবগুলো বাজে কাজ, অশ্লীল, অনর্থক, অজ্ঞতাপূর্ণ, নির্বুদ্ধিমূলক ও অসার। এগুলোর বিরূদ্ধে সোচ্চার হওয়া আবশ্যক।

مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍ

আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেন নি। লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাহ বিল্লাহিল আলীয়্যিল আযীম। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-১১ঃ পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের সন্তানদের উপর পিতা-মাতার কি হক থাকে?

১৪ রবিউল আখের শরীফ, ১৩২০ হিজরী।

আপনার মতামত কি? (আল্লাহ তায়ালা আপনাকে রহম করুন) এ মাসআলার ব্যাপারে যে, পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের সন্তানদের উপর পিতা-মাতার কি হক থাকে? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ (১) মৃত্যুর পরে সর্বপ্রথম হক হলো তাদের লাশের গোসল, কাফন, নামায ও দাফনের ব্যবস্থা করা। এ সব কার্যাবলীতে এমন সুন্নাত ও মুস্তাহাব বিষয়সমূহের প্রতি মনোযোগ দেয়া যা তাদের জন্য অতি উত্তম, বরকত, রহমত ও আরামের আশা করা যায়।

(২) তাদের জন্য সর্বদা দো'আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকা। তা থেকে কখনো অমনোযোগী না হওয়া।

(৩) দান-সদকা এবং ভাল কাজসমূহের ছাওয়াব তাদের জন্য পৌঁছাতে থাকা। যথাসাধ্য তাতে কমতি না করা। নিজের নামায আদায়ের সময়ে তাদের জন্যও নামায পড়া, নিজের রোযার সাথে তাদের জন্যও রোযা রাখা। যে সমস্ত ভাল কাজ করা হয়, সব কিছুর ছাওয়াব তাদের উপর এবং সমস্ত মুসলমানদের উপর দান করা। এদের সবার নিকট ছাওয়াব পৌঁছে যাবে এবং ছাওয়াবে কমতি হবে না, ফলে অনেক সমৃদ্ধি লাভ হবে।

(৪) তাদের নিকট কারো ঋণ পাওনা থাকলে তা আদায়ে যথা সম্ভব তাড়াতাড়ি চেষ্টা করা এবং নিজের সম্পদ থেকে তাদের ঋণ আদায় করাকে উভয় জগতের কল্যাণ মনে করা। নিজের সামর্থ্য না থাকলে অন্যান্য প্রিয় বন্ধু-বান্ধব, নিকট আত্মীয়, অতঃপর অপরাপর শুভাকাঙ্খীগণের নিকট কর্য আদায়ে সাহায্য নেয়া।

(৫) তাদের কোন ঋণ থাকলে যথাসাধ্য উহা আদায়ের প্রতি প্রচেষ্টা চালানো। তারা হজ্ব না করে থাকলে নিজে তাদের পক্ষ থেকে হজ্ব করা বা বদলি হজ্ব করানো। যদি যাকাত অথবা ওশর অনাদায় থাকে, তবে ঐগুলো আদায় করা। নামায, রোযা বাকী থাকলে উহার কাফ্ফারা দিয়ে দেয়া, এভাবে তাদেরকে প্রত্যেক বিষয়ে জিম্মা মুক্ত করার চেষ্টা করা।

(৬) তারা যে শরীয়ত সম্মত জায়েয অসীয়ত করেছে তা যথাসম্ভব বাস্তবায়ন করা, যদিও শরীয়তের দিক দিয়ে তা বাস্তবায়ন নিজের উপর আবশ্যিক নয়। যদিও নিজের উপর বোঝা হয়। উদাহরণ স্বরূপ-তারা সম্পত্তির অর্ধেক ওয়ারিছ নয় এমন কোন প্রিয় বন্ধু-বান্ধবের জন্য অসিয়ত করে গেছে। শরয়ীভাবে সম্পদের এক তৃতীয়াংশের বেশি নিজ ওয়ারিছগণের সম্মতি ব্যতীত অসিয়ত সংঘটিত হয় না। কিন্তু সন্তানদের জন্য উপযোগী হচ্ছে যে, তাদের অসিয়তনামা এবং তাদের মনঃতুষ্টের জন্য নিজের মনোবাসনাকে অগ্রাধিকার না দেয়া।

(৭) কৃত প্রত্যয় তাদের মৃত্যুর পরও বাস্তবায়ন রাখা। উদাহরণ স্বরূপ-মা অথবা বাবা শপথ করেছে যে, আমার পুত্র অমুক জায়গায় যাবে না, অথবা অমুকের সাথে মেলামেশা করবে না, অথবা অমুক কাজ করবে। তাদের মৃত্যুর পর এ খেয়াল না করা যে, এখন তো তিনি নেই। শুধু শপথ নয়; বরং তার এমনই বাধ্য থাকা যেমনি তাদের হায়াতে জিন্দেগীতে ছিল, যতক্ষণ কোন শরয়ী অসুবিধা না থাকে। সীমাবদ্ধ কিছু কাজে নয়; বরং প্রত্যেক জায়েয বিষয়ে তাদের মৃত্যুর পরও তাদের মর্জি মোতাবেক কাজ করা।

(৮) প্রত্যেক জুমা'য় তাদের কবর যিয়ারতের জন্য যাওয়া। সেখানে কুরআন শরীফ এমন আওয়াজে পড়া যাতে তা শুনতে পায় এবং উহার ছাওয়াব তাদের রূহে বখশিশ করা। কখনো তাদের কবরের পাশ দিয়ে সালাম ও ফাতিহা পড়া ছাড়া অতিক্রম না করা।

(৯) তাদের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে আজীবন সদাচরণ করে যাওয়া।

(১০) তাদের প্রিয়জনদের সাথে বন্ধুত্ব বজায় রাখা। সর্বদা এদের প্রতি সম্মান ও ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা।

(১১) কারো পিতা-মাতাকে মন্দ বলে এর প্রতি উত্তরে তাদেরকে গালমন্দ না শুনানো।

(১২) সব হকের বড় হক হল-কোন গুনাহ করতঃ কখনো তাদের কবরে দুঃখ না পৌঁছানো। সন্তানের ভাল-মন্দ কর্মের প্রভাব মা-বাবার নিকট পৌছে থাকে। তারা নেক আমল দেখলে আনন্দিত হয়, তাদের চেহারা আনন্দে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। পাপ কাজ দেখলে তারা অসন্তুষ্ট হয়, তাদের অন্তরে আঘাত লাগে। মা-বাবার প্রতি সন্তানের হক হল কবরেও তাদেরকে অশান্তি না দেয়া।

ক্ষমাশীল, দয়ালু, পরাক্রমশালী মহান আল্লাহ জাল্লা জালালুহু তাঁর প্রিয় হাবীব রাউফুর রাহীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওসাল্লাম'র ওসীলায় আমরা সকল মুসলমানদেরকে নেক আমল করার তাওফীক দিন।

حسبنا الله ونعم الوكيل ونعم المولى ونعم النصير، ولا حول ولا قوة الا بالله العلى العظيم وصلى الله تعالى على الشفيع الرفيع النصير الغفور الكريم الرؤوف الرحيم سيدنا محمد واله وصحبه اجمعين. والحمد لله رب العالمين

এখন ঐ হাদীসসমূহ যেগুলো থেকে অধম মাসআলা উদঘাটন করেছি সেগুলো হতে নূন্যতম পরিমাণ কতিপয় হাদীস উল্লেখ করব।

হাদীস-১ঃ এক আনসারী সাহাবী হুযুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'র পবিত্র খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন-হে আল্লাহর রাসুল! মা-বাবার ইন্তিকালের পরও তাদের সাথে ভাল আচরণের কোন পন্থা অবশিষ্ট আছে কি? যা আমি সম্পাদন করব। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

نَعَمْ أَرْبَعَةُ: الصلاة عليها والاستغفارُ لَهُمَا وَإِنْفَاذُ عَهْدِهِمَا مِنْ بَعْدِهِمَا وَإِكْرَامَ صَدِيقِهِمَا أَوْ صِلَةَ الرَّحْمِ التّى لَا رِحْمَ لَكَ إِلَّا مِنْ قَبْلِهِمَا فَهُذَا الَّذِي بَقِيَ مِنْ بِرْهِمَا بَعْدَ مَوْتِهِمَا.

হ্যাঁ! চারটি কাজ-তাদের জন্য নামায পড়া, তাদের জন্য দোয়া ও মাগফিরাত কামনা করা, মৃত্যুর পর তাদের অসীয়ত বাস্তবায়ন করা, তাদের বন্ধুদেরকে সম্মান করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় রাখা। অতএব তা ঐ সদাচরণ-যা তাদের মৃত্যুর পরও বাকী থাকে। ইবনু নাজ্জার হযরত আবু উসাইদ আস-সায়েদী'র সূত্রে তা বর্ণনা করেছেন। ইমাম বায়হাকী স্বীয় সুনানে একই হাদীস ভিন্ন শব্দে বর্ণনা করেছেন-

قَالَ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم لَا يُبْقَى لِلْوَلَدِ مِنْ بِرِّ الْوَالِدِ إِلَّا أَرْبَعُ الصلاة عليه والدعاء له وانفاذ عَهْدِهِ مِنْ بَعْدِهِ وَصِلَةٌ رَحْمَةٍ وَإِكْرَامُ

صديقه.

সন্তানের উপর পিতার জন্য চারটি অধিকার বহাল থাকে। তার জন্য রহমত কামনা, দোয়া করা, অসীয়ত পূরণ, আত্নীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তার বন্ধুকে সম্মান করা।

হাদীস-২ঃ ম হানবী হযরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ

করেন-

استغفارُ الْوَلَدِ لِأَبِيهِ بَعْدَ الْمَوْتِ مِنَ الْبَرِّ

মাতা-পিতার সাথে উত্তম আচরণ থেকে একটা এ যে, তাদের মৃত্যুর পর সন্তান তাদের জন্য দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।

হাদীস শরীফখানা ইবনু নাজ্জার রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আবু উসাইদ মালিক বিন যারারাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন।

হাদীস-৩ঃ

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

إِذَا تَرَكَ الْعَبْدُ الدُّعَاءُ لِلْوَالِدَيْنِ فَإِنَّهُ يَنْقَطِعُ عَنْهُ الرِّزْقُ

মানুষ যখন মাতা-পিতার জন্য দোয়া করা ছেড়ে দেয় (অর্থাৎ দোয়া না করে) তখন তার রিযিক কর্তন হয়ে যায়।

উহাকে ইমাম ত্বাবরানী তারীখে এবং ইমাম দায়লামী হযরত আনস বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন।

হাদীস-৪ ও ৫ঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

إِذَا تَصَدَّقَ أَحَدَكُمْ بصَدقَةٍ تطوعًا فَلْيَجْعَلَها عَنْ ابَوَيْهِ فَيَكُونُ لَهُمَا أَجْرُهَا وَلَا يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِهِ شَيْئًا.

যখন তোমাদের মধ্যে কেউ কোন কিছু নফল দান-খয়রাত করে, তবে সে যেন উহা তার মাতা-পিতার পক্ষ থেকে করে। ফলে ছাওয়াব নিজে পাবে এবং তার ছাওয়াব থেকে কোন কিছু ঘাটতি হবে না। ত্বাবরানী, ইবনু আসাকির ও দায়লামী।

হাদীস-৬ঃ এক সাহাবী উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন-হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার পিতা জীবিতাবস্থায় তাঁর সাথে সদাচরণ করেছিলাম। তিনি ইন্তিকাল করার পর তার সাথে সদ্ব্যবহারের উপায় কি? ইরশাদ করেন-

ان من البرِّ بَعْدُ الموتِ أَنْ تُصَلَّى لَهُمَا مَعَ صَلُوتِكَ وَتَصُومُ لَهُمَا مَعَ صِيَامِكَ

(পিতা-মাতার) মৃত্যুর পর সদ্ব্যবহারের নিয়ম এ যে, তুমি নামায আদায়ের সময় তাদের জন্য নামায পড়া এবং তোমার রোযার সাথে তাদের জন্য রোযা রাখা। দারু কুতনী।

যখন নিজে ছাওয়াব পাওয়ার জন্য নফল নামায পড়বে বা রোযা রাখবে তখন কিছু নফল নামায ও রোযা তাদের উপরও ছাওয়াব পৌঁছানোর জন্য তাদের পক্ষ থেকে সম্পাদন করবে অথবা নামায রোযা যে-ই উত্তম আমল করবে সাথে সাথে তাদের উপর ছাওয়াব পৌঁছানোরও নিয়্যত করবে। তাদেরও ছাওয়াব মিলবে এবং তোমার ছাওয়াবেও কম হবে না। দ্বিগুন ছাওয়াব পাওয়া যাবে।

ফতোয়ায়ে তা-তারখানিয়া ও রাদ্দুল মুহতারে আছে-

الْأَفْضَلُ لِمَنْ يَتَصَدَّقُ نَفْلًا أَنْ يَنْوِى لِجَمِيعِ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ لِأَنَّهَا تصل إليهم ولا ينقصُ عَنْ أَجْرِهِ شَئى.

'নফল সদকাকারীর জন্য উত্তম হল সকল নর-নারীর নিয়্যত করা। কেননা তাতে ওদের প্রতি ছাওয়াব পৌঁছে এবং তাদের ছাওয়াবেও কম হবে না।

হাদীস-৭ঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

منْ حَجَّ عَنْ وَالدِّيهِ أَوْ قَضَى عَنْهُمَا مَغْرِمَا بَعَثَهُ اللَّهُ تَعَالَى يَوْمُ القِيَامَةِ مُعَ الابرار

যে ব্যক্তি তার মাতা-পিতার পক্ষ থেকে হজ্ব করে অথবা তাদের পক্ষ থেকে ঋণ আদায় করে আল্লাহ তায়ালা তাকে কিয়ামতের দিন পুণ্যবান ব্যক্তিদের সাথে উঠাবেন। এটা ইমাম তাবরানী আউসাত্ব-এ এবং দারু কুতনী সুনানে হযরত ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা হতে বর্ণনা করেছেন।

হাদীস-৮ঃ আমীরুল মু'মিনীন হযরত ওমর ফারুকে আযম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর উপর আশি হাজার ঋণ ছিল। মৃত্যুর নিকটবর্তী সময়ে তিনি তাঁর পুত্র হযরত আবদুল্লাহ ইবনু ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমাকে ডেকে বললেন-

بع فِيهَا أَمْوَالَ عُمَرَ فَإِنْ وفَتُ وَإِلَّا فَسَلُ ابْنَ عَدِى فَإِنْ وَفَتْ وَإِلَّا فَسَلْ قَرِيْشًا وَلَا تَعْدِ عَنْهُمْ

আমার ঋণ আদায়ে প্রথমে আমি ওমর'র সম্পদ বিক্রি কর, যদি পরিপূর্ণ ঋণ আদায় হয়ে যায় তাহলে উহার মাধ্যমে আদায় কর। আর যদি না হয় তবে আমার সম্প্রদায় বনী আদ্দী থেকে চাও। উহাতেও পরিপূর্ণ না হলে কুরাইশদের নিকট চাও। এরা ছাড়া কারো নিকট চেয়ো না।

সাহেবজাদা হযরত ইবনু ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা বলেছেন- إضمنها আমাকে ঋণের যামানত দিয়ে দেন। তিনি জিম্মাদার হয়ে গেছেন। হযরত আমীরুল মু'মিনীন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু'র দাফনের পূর্বে হযরত ইবনু ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আনসার ও মুহাজিরগণের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে সাক্ষী করে বললেন-উক্ত আশি হাজার আমার উপর। এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি তা পরিশোধ করে দিলেন। উক্ত হাদীস শরীফখানা ইবনু সা'দ 'তাবাকাত'র মধ্যে হযরত ওছমান ইবনু উরওয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন।

হাদীস-৯ঃ জোহায়না গোত্রের এক বিবি হুযুর সায়্যিদে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'র পবিত্র খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা! আমার মা হজ্ব করার জন্য মান্নত করেছিলেন তিনি আদায় করতে পারেন নি। তিনি মৃত্যু বরণ করেছেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্ব করব? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

نعم حَجَى عَنْهَا أَرَأَيْتَ لَوْ كَانَ عَلَى أُمِّكَ دَيْنَ أَكُنتَ قَاضِيةً اقْضُوا اللَّهُ فَاللَّهُ احَقُّ بِالْوَفَاءِ

হ্যাঁ! তার পক্ষ থেকে হজ্ব কর, তুমি কি মনে কর যদি তোমার মায়ের উপর কোন ঋণ থাকত তবে তুমি কি তা আদায় করতে কি না? এভাবেই খোদার ঋণ আদায় কর। কারণ আল্লাহই তা আদায়ের হকদার। ইমাম বুখারী হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আন্‌হুমা হতে তা বর্ণনা করেছেন।

হাদীস-১০ঃ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

إِذَا حَجَّ الرَّجُلُ عَنْ وَالدِّيهِ تُقْبَلُ مِنْهُ وَمِنْهَا وَابْتَشَرَبِهِ أَرْوَاحُهُمَا فِي السَّمَاءِ وَكُتِبَ عِنْدَ اللهِ بُرا

মানুষ যখন নিজ মাতা-পিতার পক্ষ থেকে হজ্ব করে, তখন ঐ হজ্ব তার পক্ষ থেকে এবং স্বীয় মাতা-পিতার পক্ষ থেকে কবুল করা হয়। এতে তাদের রূহসমূহ আসমানে আনন্দিত হয়ে উঠে। এ ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার নিকট মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহারকারী হিসেবে লিখিত হয়। হাদীস শরীফখানা দারু কুতনী হযরত যায়দ বিন আরকাম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন।

হাদীস-১১ঃ সরকারে দো'আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

منْ حَجَّ عَنْ أَبِيهِ أَوْ عَنْ أُمِّهِ فَقَدْ قَضَى عَنْهُ حُجَّتُهُ وَكَانَ لَهَ فَضْلُ عَشْرُ بحج

যে ব্যক্তি তার পিতা অথবা মাতার পক্ষ থেকে হজ্ব করবে তবে তার পক্ষ থেকে হজ্ব আদায় হয়ে যাবে এবং সে দশটি অতিরিক্ত হজ্বের ছাওয়াব পাবে। দারু কুতনী হযরত জাবির বিন আব্দিল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে উক্ত হাদীস শরীফখানা বর্ণনা করেছেন।

হাদীস-১২ঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা বলেছেন-

مَنْ حَجَّ عَنْ وَالدَيْهِ بَعْدَ وَفَاتِهِمَا كَتَبُ اللَّهُ اعْتِقَا مِنَ النَّارِ وَكَانُ لِلْمُحْجُوجٍ عنها اجر حجة تامة من غير أن ينقص من أجورهما شئي.

যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের পক্ষ থেকে হজ্ব করে, আল্লাহ তায়ালা উভয়কে দোযখ থেকে মুক্তি দেন। তাদের উভয়ের জন্য পূর্ণ হজ্বের ছাওয়াব হবে-যাতে দু'জনের ছাওয়াব হতে মূলতঃ কোন কিছু কমতি হবে না। উক্ত হাদীস শরীফখানা ইমাম রাগিব ইস্পহানী তারগীব'র মধ্যে ও ইমাম বায়হাকী শোয়াবুল ঈমানে হযরত ইবনু ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন।

হাদীস ১৩ঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা বলেছেন-

مَنْ بَرَ قَسَمَهُمَا وَقَضَى دَيْنَهُمَا وَلَمْ يَسْتَب لَهُمَا كُتِبَ بَارًا وَإِنْ كَانَ عَاقَا فِى حياته وَمَنْ لَمْ يُبَرٌ قَسَمُهُما وَيَقْضِ دَيْنَهُمَا وَاسْتَسَبَ لَهُمَا كُتِبَ عَاقَا وَإِنْ كان بارا في حياته

যে ব্যক্তি স্বীয় মাতা-পিতার মৃত্যুর পর তাদের শপথ সত্যে পরিণত করে এবং তাদের ঋণ আদায় করে। কারো মাতা-পিতাকে গালমন্দ করে স্বীয় মাতা-পিতাকে গালি শোনায় না, তাকে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারকারী হিসেবে লিখা হয়; যদিও সে তার হায়াতে জিন্দেগীতে অবাধ্য ছিল। আর যে তাদের শপথ পূর্ণ করে না, তাদের ঋণ আদায় করে না এবং অন্য জনের মা-বাবাকে গালমন্দ বলে তাদেরকে গালি শোনায় তাকে পিতামাতার অবাধ্য হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়; যদিও সে তার জীবনে নেক্কার ও সদাচরণকারী ছিল।

উক্ত হাদীস শরীফখানা ইমাম ত্বাবরানী আউসাতে হযরত আবদুল্লাহ বিন সামুরা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন।

হাদীস-১৪ঃ হুযুর, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

منْ زَارَ قَبْرَ أَبَوَيْهِ أَوْ أَحَدِهِمَا فِي كُلِّ يَوْمٍ جَمَعَةٍ مَرَّةً غَفَرَ اللَّهُ لَهُ وَكَتَبَ بُرا

যে ব্যক্তি প্রতি জুমাবার একবার তার মাতা-পিতা বা উভয়ের যে কোন একজনের কবর যিয়ারতের জন্য উপস্থিত হয় আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারকারী হিসেবে লিখে দেন।

উক্ত হাদীস শরীফখানা ইমাম তিরমিযী, আরিফ বিল্লাহ হাকীম নাওয়াদিরুল উসুল গ্রন্থে হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন।

হাদীস-১৫ঃ রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

من زار قبر وَ الدَيْهِ أَوْ أَحَدِهِمَا يَوْمَ الجُمُعَةِ فَقَرُهُ عِندَهُ يُسَ غَفِرُ لَهُ رواه بن عدى عن الصديق الاكبر رضى الله تعالى عنه . وفي لفظ مَنْ زَارَ قَبْرَ وَالدَيْهِ أَوْ أَحَدِهِمَا فِي كُلِّ جَمَعَةٍ فَقْرُهُ عِنْدَهَ يُسَ غَفَرَ اللَّهُ بِعَدَدِ كُلَّ حَرُفٍ منها.

যে ব্যক্তি জুমাবার তার পিতা-মাতা অথবা উভয়ের যে কোন একজনের কবর যিয়ারত করে এবং তার নিকট সূরা ইয়াসিন পড়ে, তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। ইহা ইবনু আদী হযরত ছিদ্দীকে আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেন। অন্য বর্ণনায় অন্য শব্দে আছে-যে ব্যক্তি প্রতি জুমায় তার পিতা-মাতা অথবা উভয়ের যে কোন একজনের কবর যিয়ারত করে এবং তার নিকট সূরা ইয়াসিন পড়ে তবে ইয়াসিন শরীফে যতগুলো হরফ রয়েছে তার সমপরিমাণ আল্লাহ তায়ালা তার জন্য গুনাহ ক্ষমা করবেন। ইবনু আদী, খলীলী, আবুশ শায়খ, দায়লামী, ইবনু নাজ্জার, রাফেয়ী প্রমুখ হযরত আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে, তিনি স্বীয় পিতা আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন।

হাদীস-১৬ঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

مَنْ زَارَ قَبْرَ أَبَوَيْهِ أَوْ أَحَدِهِمَا احْتِسَابًا كَانَ كَعَدْلٍ حَجَةٍ مُبْرُورَةٍ وَمَنْ كَانَ زوارًا لَهُمَا زَارَتْ الملئكة قبره

যে ব্যক্তি ছাওয়াবের নিয়্যতে তার মাতা-পিতা উভয় অথবা যে কোন একজনের কবর যিয়ারত করে, সে মকবুল হজ্বের সমপরিমাণ ছাওয়াব পাবে। যে ব্যক্তি বেশি বেশি তাদের কবর যিয়ারত করবে ফিরিশতাগণ তার কবর যিয়ারত করতে আসবে।

উক্ত হাদীস শরীফখানা হাকীম, ইমাম তিরমিযী ও ইবনু আদী হযরত ইবনু ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন। 'উয়ূনুল হেকায়াত' গ্রন্থে ইমাম ইবনুল জাওযী মুহাদ্দিস মুহাম্মদ ইবনুল আব্বাস (রাঃ) ওয়ারাক সূত্রে তা রেওয়ায়াত করেছেন। এক ব্যক্তি তার পুত্রের সাথে সফরে যায়। পথিমধ্যে রাস্তায় পিতা মৃত্যু বরণ করেন। জঙ্গলে গোগল গাছের নিচে পিতাকে দাফন করে পুত্র যেখানে যাওয়ার সেখানে চলে গেছে। পুনর্বার আসার সময় রাত্রে সে স্থানে পৌঁছলে শুনতে পায় কোন এক আহবানকারীর কন্ঠে নিম্নের পংক্তি অনুরণিত হচ্ছে-

رائیک تطوی الدوم لیلا ولا تری = علیک لاہل الدوم وان تتكلما و بالدوم تاولو ثويت مكانه = ومر بابل الدوم عاد فسلما

আমি তোমাকে দেখেছি যে, তুমি রাত্রে এ জঙ্গল অতিক্রম করছো। সে জঙ্গলবাসীর সাথে কথা বলাকে তুমি আবশ্যক মনে করো নি। অথচ সে গাছের মাঝে তিনি লুকায়িত আছেন। যদি তুমি তদস্থলে থাকতে তাহলে তিনি রাস্তা অতিক্রম করার সময় উল্টো ফিরে সালাম করতেন।

হাদীস ১৭ঃ সরকারে দো'আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

مَنْ أَحَبُّ أَنْ يَصِلَ آبَاهُ فِي قَبْرِهِ فَلْيَصِلْ إِخْوَانَ أَبِيْهِ مِنْ بَعْدِهِ

যে ব্যক্তি পিতার কবরের মধ্যে তার সাথে সদ্ব্যবহার করতে চায় তবে সে তার পিতার মৃত্যুর পর তার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে যেন সুসম্পর্ক রাখে।

হাদীস শরীফখানা আবু ইয়ালা ও ইবনু হাব্বান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা ইবনু ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন।

হাদীস-১৮ঃ

হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

منَ الْبُرَآنَ تَصِلَ صَدِيقَ أَبِيكَ

পিতার সাথে সদ্ব্যবহারের একটি হল তুমি তোমার পিতার বন্ধুর সাথে সুসম্পর্ক রাখবে।

হাদীস-১৯:

হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

إِنْ أَبْرَارَ الْبِرِّ أَنْ يَصِلَ الرَّجُلُ أَهْلَ ذِي أَبِيهِ أَنْ يَوَلَّى الْأَبُ

নিশ্চয় পিতার সাথে উত্তম আচরণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উত্তম আচরণ এ যে, পিতার প্রস্থানের পর তার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। হাদীস শরীফখানা ইমাম আহমদ, বুখারী আদাবুল মুফরাদ'র মধ্যে, ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ মুসলিম, ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম তিরমিযী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম হযরত ইবনু ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন।

হাদীস-২০ঃ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

احفظ ود أبيكَ لَا تُقْطَعهُ فَيَطْفِى اللَّهُ نُورَك

তোমার পিতার বন্ধুত্বকে সংরক্ষণ কর, উহাকে বিচ্ছিন্ন করো না। অন্যথায় আল্লাহ তোমার আলো নিভিয়ে দেবেন। হাদীস শরীফখানা ইমাম বুখারী আদাবুল মুফরাদ'র মধ্যে, ইমাম তাবরানী আওসাত্ব'র মধ্যে আর ইমাম বায়হাকী শোয়াব'র মধ্যে হযরত ইবনু ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন।

হাদীস-২১: হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

تَعْرَضُ الْأَعْمَالَ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ وَالْخَمِيسِ عَلَى اللَّهِ تَعَالَى وَتَعْرَضَ عَلَى الأنبياء وعلى الأباء والأمهاتِ يَوْمَ الجَمْعَةِ فَيَفْرَحُوْنَ بِحَسَنَاتِهِمْ وَتَزْدَادَ وَجَوْهُهُمْ بَيَاضًا وَإِشْرَاقَا فَاتَّقُوا اللَّهُ وَلَا تُوْذُوا أَمْوَاتُكُمْ

প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার আল্লাহ তায়ালার নিকট মানুষের আমলসমূহ পেশ হয়ে থাকে এবং আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালাম ও মা-বাবার নিকট পেশ হয় প্রতি জুমাবারে। তারা তাদের সন্তানদের ভাল কাজের উপর সন্তুষ্টি হন এবং তাদের চেহারার চাকচিক্য ও দ্যুতি বৃদ্ধি পায়। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের নিকট কষ্ট পৌঁছায়ো না।

সারকথা-মাতা পিতার হক থেকে মানুষ কখনো কর্তব্যমুক্ত হবে না। মাতা-পিতা তার জীবন ও অস্তিত্ব লাভের কারণ। তুমি দ্বীনি ও দুনিয়াবী যত নিয়ামতসমূহ পেয়ে থাকো সব তাদের মধ্যস্থতায়। কারণ প্রত্যেক নিয়ামত ও পরিপূর্ণতা অস্তিত্বের উপর নির্ভরশীল। অস্তিত্বের লাভের একমাত্র মাধ্যম তারাই। সুতরাং শুধু মা অথবা বাবা হওয়াটাই এত বড় হকের কারণ-যা থেকে কখনো মুক্ত হওয়া যায় না। এজন্য কোন তুলনা হতে পারে না যে, সন্তানদের লালন পালনে তাদের প্রচেষ্টা, তার আরামের জন্য তাদের কষ্ট স্বীকার, বিশেষ করে পেটে গর্ভধারণ, প্রসব করা, দুধ পান করানোর সময় মায়ের অবর্ণনীয় কষ্টসমূহ শ্রমের কৃতজ্ঞতা কতদূর আদায় করা যায়। মূলকথা, তাদের জন্য আল্লাহ জাল্লা ওআ'লা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'র রহমতের ছায়া এবং এ প্রতিপালন তাদের রহমতের বহিঃপ্রকাশ।

এ জন্য কুরআনে আযীমে আল্লাহ জাল্লা জালালুহু স্বীয় হকের সাথে তাদের কথা উল্লেখ করে বলেন-

أَنِ اشْكَر لِي وَلِوَ الدِّيْكَ 

অর্থাৎ আমার এবং তোমার মাতা-পিতার শুকরিয়া আদায় কর।

হাদীসে আছে, এক সাহাবী রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা'র দরবারে উপস্থিত হয়ে আরয করলেন-হে রাসুলাল্লাহ! এমন উত্তপ্ত মরুময় পাথরের রাস্তার উপর দিয়ে ছয় মাইল পর্যন্ত আমার মাকে নিজের কাঁধে আরোহন করে নিয়ে গিয়েছিলাম-যদি ওটার উপর মাংসের টুকরা রাখা হত তাহলে তা কাবাবে পরিণত হত। এখন কি আমি তার হক আদায় করতে পেরেছি? তার কিছু হক কি আদায় হয়ে গেছে? রাসূল খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন- 

لعله ان يَكُوْنَ بِطَلْقَةٍ وَاحِدَةٍ 

তোমার জন্ম হওয়ার সময় যে প্রচণ্ড ব্যাথা সহ্য করেছিল সম্ভবতঃ ইহা একটি ঝটকার বদলা হতে পারে।

হাদীস শরীফখানা ইমাম ত্বাবরানী আউসাত'র মধ্যে হযরত বুরাইদাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহ আযযা ওয়াজাল্লা অবাধ্যতা থেকে বেঁচে রাখুক এবং মাতা-পিতার হকসমূহ আদায় করার তওফীক দিন। আমিন।

امين برحمتك يا ارحم الراحمين وصلى الله تعالى على سيدنا ومولانا محمد واله وصحبه اجمعين امين والحمد لله رب العالمين

💠 মাসআলা-১২ঃ  এক ব্যক্তি বিতরের নামাযের তৃতীয় রাকাআতে আল হামদু (সূরা ফাতিহা) ও সূরা ইখলাস'র পর তাকবীর বলে দু'আ কুনূতের পরিবর্তে তিনবার قُلْ هُوَ اللهُ শরীফ পড়েছে। দু'আ কুনূত তার স্মরণ আসছে না। তার বিতরের নামায কি শুদ্ধ হবে?

১৭ রবিউল আখির শরীফ, ১৩২০ হিজরী।

আহলে শরীয়তের হুকুম কি? এ মাসআলার ব্যাপারে যে, এক ব্যক্তি বিতরের নামাযের তৃতীয় রাকাআতে আল হামদু (সূরা ফাতিহা) ও সূরা ইখলাস'র পর তাকবীর বলে দু'আ কুনূতের পরিবর্তে তিনবার قُلْ هُوَ اللهُ শরীফ পড়েছে। দু'আ কুনূত তার স্মরণ আসছে না। তার বিতরের নামায কি শুদ্ধ হবে? যদি সে প্রতিদিন সাজদা সাহু করে নেয় তবে কি তার বিতরের নামায শুদ্ধ হবে? বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কথা নয়। ভুলক্রমে কোন ওয়াজিব বাদ পড়েনি বিধায় সাহু সাজদার স্থান নয়। দো'আ কুনূত যদি মুখস্থ না থাকে তবে মুখস্থ করে নেওয়া উচিত। কারণ খাস করে তা পড়া সুন্নাত। যতদিন পর্যন্ত মুখস্ত না হবে ততদিন-

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.

(হে আমাদের প্রভু! দুনিয়াতে আমাদেরকে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতে কল্যাণ দান করুন। আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে বাঁচান।) পড়ে নিবে। যদি মুখস্ত না হয় তবে اَللّهُمَّ اغْفِرْ لِي তিনবার বলবে। তাও না পারলে শুধুমাত্র তিনবার يارب বললে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। বাকী কথা হল যে, قُلْ هَوَ اللَّهُ শরীফ পড়াতে ও কি ওয়াজিব আদায় হয়েছে কি না; যদি না হয় তবে ঐ দিনগুলোর বিতরের নামায পূর্ণবার পড়া কি আবশ্যক? সুষ্পষ্ট কথা হল-আদায় হয়ে গেছে। কারণ উহা আল্লাহর প্রশংসা আর প্রত্যেক প্রশংসাই দো'আ।

بلْ قَالَ العَلامَةَ القَارِى وَغَيْرَه مِن العُلَمَاءِ كُلَّ دُعَاء ذِكْرَ وَكُلٌّ ذِكْرِ دَعَاءُ وَقَدْ قال صلى الله عليه وسلم أَفْضَلَ الدُّعَاءِ الْحَمْدُ لِله

মোল্লা আলী ক্বারী ও অন্যান্য ওলামা-ই কেরাম বলেছেন-প্রত্যেক দোয়া যিকির, আর প্রত্যেক যিকির দোয়া। নবীজি সাল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন- সব চেয়ে উত্তম দোয়া হচ্ছে আলহামদু লিল্লাহ। উক্ত হাদীস শরীফখানা নাসায়ী, তিরমিযী, ইবনু মাযা, ইবনু হাব্বান এবং হাকিম হাসান সূত্রে বর্ণনা করেছেন। হাকিম উহাকে জাবের বিন আবদুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বিশুদ্ধভাবে বর্ণনা করেছেন। এটা স্মরণ রাখ। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-১৩ঃ ঘুড়ি উড়ানো কি জায়েয? উহার রশি বা সুতা লুঠ করা জায়েয কি না? ঐ লুঠ করা সুতা দিয়ে কাপড় সেলাই করতঃ নামায পড়লে তার নামায শুদ্ধ হবে কি না?

১৯ রবিউল আখির শরীফ, ১৩২০ হিজরী।

ওলামা-ই কেরাম কি বলেন এ ব্যাপারে যে, ঘুড়ি উড়ানো কি জায়েয? উহার রশি বা সুতা লুঠ করা জায়েয কি না? ঐ লুঠ করা সুতা দিয়ে কাপড় সেলাই করতঃ নামায পড়লে তার নামায শুদ্ধ হবে কি না? সবিস্তারে বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ ঘুড়ি, উড়ানো একটা খেলা এবং খেলা জায়েয নেই। হাদীস শরীফে আছে-

كُلَّ لَهُوَ الْمُسْلِمِ حَرَامُ إِلَّا فِي تَلْثٍ

মুসলমানদের জন্য তিনটি বস্তু ছাড়া অন্যান্য সকল খেলা হারাম।

ঘুড়ির সুতা লুণ্ঠন করা ডাকাতি-হারাম।

نَهى رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم عن النهبي

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা লুন্ঠন করা থেকে বারণ করেছেন। লুঠ করা সুতার মালিককে চিনতে পারলে তবে তা তাকে দিয়ে দেয়া ফরয। যদি না দেয় এবং তার অনুমতি ছাড়া উহা দিয়ে কাপড় সেলাই করে তবে ঐ কাপড় পরা হারাম। উহা পরে নামায পড়া মাকরূহে তাহরীমা। যা পুনরায় পড়া ওয়াজিব।

للا شتِمَالِ عَلَى الْمُحْرِمِ كَالصَّلُوةِ فِي أَرْضِ مَغْصُوبَة.

হারামকে শামিল করার কারণে জবর দখলকৃত জমিতে নামায পড়ার বিধানের মত। মালিক পাওয়া না গেলে তা لقطة অর্থাৎ হারানো বস্তুর মত। উহার মালিক পাওয়া যাওয়ার আশা ক্ষীণ হওয়া পর্যন্ত তা প্রচার করা আবশ্যক। এ সময় যদি এ ব্যক্তি ধনী হয়ে থাকে তবে তা গরীবকে দিয়ে দিবে আর যদি ফকির হয় তবে নিজ ব্যবহারে রাখতে পারবে। অতঃপর মালিক পাওয়া গেলে সে যদি ফকিরের দ্বারা ব্যবহারকৃত জিনিষ নিতে রাজি না হয় তাহলে ফকির নিজের পক্ষ থেকে ওটার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যেরূপভাবে ফিকহের মধ্যে লুকতাহ'র হুকুমে বর্ণিত আছে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-১৩ঃ কুকুর পালন করা কি জায়েয? ছেড়ে না দিয়ে বাঁধা অবস্থায় কবুতর পোষা, মোরাগবাজি, লড়াইবাজ পক্ষী, শিকারী প্রাণী পোষা এবং এগুলোর মাধ্যমে শিকার করানো বৈধ কি না? সে শিকারকৃত প্রাণী খাওয়া বৈধ কি না? 

২০ রবিউল আখির শরীফ, ১৩২০ হিজরী।

ওলামা-ই দ্বীন কি বলেন এ মাসআলার ব্যাপারে যে, কুকুর পালন করা কি জায়েয? ছেড়ে না দিয়ে বাঁধা অবস্থায় কবুতর পোষা, মোরাগবাজি, লড়াইবাজ পক্ষী, শিকারী প্রাণী পোষা এবং এগুলোর মাধ্যমে শিকার করানো বৈধ কি না? সে শিকারকৃত প্রাণী খাওয়া বৈধ কি না? সবিস্তারে বর্ণনা করে প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ শিকারী প্রাণী পোষা জায়েয। এগুলোর মাধ্যমে শিকার করা এবং শিকারকৃত প্রাণী খাওয়াও বৈধ। কেননা আল্লাহর বাণী وَمَا عَلَمْتُمْ مِنَ الْجَوَارِحِ তবে শিকারের ক্ষেত্রে জরুরী হল-শিকার খাওয়া বা ঔষধ অথবা কোন উপকারের উদ্দেশ্যে হতে হবে। শুধু আনন্দ আহ্লাদ, খেল তামাশার উদ্দেশ্যে যেন না হয়। এ উদ্দেশ্যে হলে হারাম ও, সে গুনাহগার হবে। এ ক্ষেত্রে যখন শিকারী প্রাণী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয় এবং پشم الله বলে তা ছাড়া হয় তবে তা হালাল হয়ে যাবে। যদিও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিকারী প্রাণী কর্তৃক শিকারকৃত জন্তু মারা যায়।

فَإِن حَرْمَةَ الإِرسال بِنِيَّةِ اللهو لا يُنَا فِي كَوْنَهُ زَكَاةَ شَرْعِيَّةٌ كَرْسَمَى اللَّهُ تعالى وَضَرَبَ الغُنَمَ مِنْ قَفَاهُ حَرَّمَ الفِعْلِ وَحِلَّ الْأَكْلِ

নিশ্চয় খেল তামাশার নিয়্যতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাণী ছেড়ে দেয়া অবৈধ। তা শরয়ী যবহের বিপরীত নয়। যখন কেউ আল্লাহ তায়ালার নাম নিয়ে বকরীকে গলার পেছনের দিক থেকে আঘাত করে। এ রকম কাজটা হারাম তবে তা খাওয়া হালাল।

ছাগল খেলা, মোরগ খেলা এবং এরূপভাবে যে কোন জন্তুর লড়াই দেওয়া যেমন-মানুষেরা ভেড়ার লড়াই দিয়ে থাকে, শিশুর লড়াই (বলি খেলা) এর আয়োজন করে থাকে, এমনি হাতির মধ্যেও লড়াই দেয়া হয়-সাধারণতঃ তা হারাম। কারণ এটা কোন কারণ ছাড়াই বাক শক্তিহীন প্রাণীদের কষ্ট দেয়া। হাদীস শরীফে এসেছে-

 نَهى رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم عن التحريش بين البهائم 

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা জন্তুদের মধ্যে লড়াই দেয়া থেকে নিষেধ করেছেন।

হাদীস শরীফখানা ইমাম আবু দাউদ, ইমাম তিরমিযী (রাঃ) হযরত উবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা হতে বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী বলেছেন হাদীস শরীফখানা হাসান ও সহীহ।

কবুতর পোষা যদি মনোরঞ্জনের জন্য হয় এবং কোন প্রকার না-জায়েয কাজের দিকে ধাবিত না হয় তবে তা জায়েয। যদি ছাদে ওঠে উড়ায়-যাতে অপর মুসলমানদের রমণীদের দিকে দৃষ্টি পড়ে অথবা ঐ কবুতর উড়ানোর জন্য কংকর নিক্ষেপ করে-যা কারো কাঁচে পড়ে কাঁচ ভেঙ্গে দেয়, কারো চোখে আঘাত করে অথবা অপরের কবুতর ধরে অথবা ঐগুলোর শ্বাস প্রসারিত করানো নিমিত্তে এবং নিজের খেল তামাশার জন্য দিনের পর দিন ঐগুলোকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় উড়ায়, উড়তে চাইলে ইচ্ছামত উড়তে না দেয়া ইত্যাদি উদ্দেশ্যে তা পোষা হারাম।

দুররে মুখতার এ রয়েছে-

وَيُكْرَهُ (يَكْرَهُ إِمْسَاكَ الْحَمَامَاتِ ) وَلَوْ فِي بَرْجِهَا إِنْ كَانَ يَضْرِبَ النَّاسَ) بنظرِ أَوْ جَلْب ( فَإِنْ كَانَ يُطِيرُهَا فَوْقَ السطح مطلقًا عَلَى عَوْرَاتِ المُسْلِمِينَ وَيُكْسِرُ زَجَاجَاتِ النَّاسِ بِرَمية تلْكَ الحَمَامَاتِ عَزْرُ وَمَنعَ أَشَدَّ الْمَنْعِ فَإِنْ لَمْ يَمْتَنِعُ ذَبحها المُحتسِبَ) وَأَمَّا لِلْإِسْتِنَاسِ فَيُمَاحَ اه باختصار.

কবুতরগুলোকে শুধু বেঁধে রাখা মাকরূহ যদিও এগুলোর খাঁচায় হয়। যদি মানুষের অসুবিধা হয় দেখার দিক দিয়ে অথবা অন্যের কবুতর আটকানোর ক্ষেত্রে। যদি উহাকে ছাদের ওপর উড়ায়-যাতে মুসলমানদের পর্দাহানী হয় এবং কবুতরের দিকে কংকর নিক্ষেপের দ্বারা মানুষের কাঁচ ভেঙ্গে যায় তবে কবুতর যে উড়ায় তার উপর শাস্তি আরোপিত হবে। তা থেকে দৃঢ়ভাবে নিষেধ করা হবে। যদি সে নিষেধ না মানে তবে পুলিশ উহাকে যবেহ করে দিবে। যদি উড়ানোর জন্য না হয়; শুধুমাত্র কবুতর প্রীতির কারণে হয় তবে তা পোষা জায়েয।

সহীহ বুখারী শরীফ ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা এবং সহীহ ইবনু হাব্বানে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেছেন-

دَخَلَتِ النَّارُ إِمْرَأَةَ فِي هِرَةٍ رَبَطَهَا فَلَمْ تُطْعِمُهَا تَأْكُلُ مِنْ خَشَاشِ الْأَرْضِ

একটি বিড়ালের কারণে একজন মহিলা দোযখে গেছে। কারণ সে উহাকে বেঁধে রেখেছে। সে একে খাবার-দাবার দেয় না। তাকে ছেড়েও দেয় না-যাতে উহা জমির ইঁদুর খেতে পারত।

ইবনু হাব্বান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু'র হাদীসে আছে-

ففَهِيَ تَنْهَشَ قَبْلَهَا وَدَبَرَها 

ঐ বিড়াল দোযখে সে মহিলার সামনে পেছনে নখ দিয়ে আঁচড়াতে থাকবে।

এক হাদীসে আছে যে, তোমরা যে সমস্ত পশু পালন কর প্রতিদিন উহাকে সত্তর বার দানা-পানি দাও। এ নয় যে, ঘণ্টার পর ঘন্টা তাকে ক্ষুধার্ত-পিপাসার্ত রাখবে। নিচে আসতে চাইলে আসতে দেবে না।

ওলামা কেরাম বলেছেন যে, জন্তুর উপর জুলুম করা কাফির জিম্মির উপর জুলুম করার চেয়েও অধিক মারাত্নক। জিম্মি কাফিরের উপর জুলুম করা মুসলমানদের উপর জুলুম করার চেয়েও অধিক বড় জুলুম। যেরূপ রাদ্দুল মুহতার ও অন্যান্য গ্রন্থে রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেছেন-

الظَّلْمَ ظَلْماتُ يَوْمِ القِيَامَةِ

জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকাররাশি হয়ে দাঁড়াবে।

আর আল্লাহ তায়ালা বলেন-

الا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ

শুনে নাও! জুলুমকারীদের উপর আল্লাহর অভিশাপ।

কুকুর পোষা হারাম। যে ঘরে কুকুর থাকবে ঐ ঘরে রহমতের ফিরিশতা আসে না। প্রতিদিন ঐ ব্যক্তির নেক আমলসমূহ কমে যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

لا تَدْخُلَ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبُ وَلَا صَورَة

ঐ ঘরে ফিরিশতা প্রবেশ করে না যে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে।

বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনে মাজা হযরত আবু তালহা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে তা বর্ণনা করেছেন।

রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

من اقتنى كلبا الأكلب ماشيةٍ أَوْ صَائِداً نَقَصُ مِنْ عَمَلِهِ كُلَّ يَوْمٍ قِيرَاطَانِ

'যে ব্যক্তি কুকুর পোষে পাহাদার কুকুর ও শিকারী কুকুর এর অন্তর্ভুক্ত নয় প্রতিদিন তার নেক আমল থেকে দু'ক্বীরাত পরিমাণ কমতে থাকে।' এ ক্বীরাতের পরিমাণ আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ভাল জানেন।

তবে শুধুমাত্র দু'রকমের কুকুর পালনের অনুমতি রয়েছে। এক শিকারী কুকুর-যা খাবার বা ঔষধ বা অন্যান্য বিশুদ্ধ উপকারী বস্তু শিকারের জন্য প্রয়োজন হয়। চিত্ত নিবোদনের শিকার নয়; কারণ উহা একেবারে হারাম। দ্বিতীয় ঐ কুকুর-যা ক্ষেত-খামার অথবা ঘর পাহারা দেয়ার জন্য পোষা হয়। পাহারা দেয়ার যদি সত্যিই প্রয়োজন হয়। যদি প্রয়োজন না হয়, ঘরে এমন কোন কিছু নেই যা চোর চুরি করে নিয়ে যাবে অথবা স্থানটা সংরক্ষিত যাতে চুরির আশংকা না থাকে। মোটকথা যেখানে নিজের অন্তরে ইহা ভালভাবে জানা আছে যে, তা হেফাজতের বাহনা মাত্র। মূলতঃ এটা কুকুর প্রীতি তা পালন করা জায়েয নেই। আশপাশের অন্যান্য ঘরওয়ালা নিজের হেফাজতের জন্য জরুরী মনে করলে এবং কুকুরের পাহারা প্রয়োজন হলে তবে তারাও পালত। সারকথা-আল্লাহ তায়ালা নির্দেশের ক্ষেত্রে যেন বাহানা করা না হয়। কারণ তিনি অন্তর্যামী। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-১৪: কুকুর কর্তৃক ধরা শিকার মুসলমান খেতে পারে কি না?

২১ রবিউল আখির শরীফ, ১৩২০ হিজরী।

ওলামা-ই দ্বীন এ মাসআলার ব্যাপারে কি বলেন? কুকুর কর্তৃক ধরা শিকার মুসলমান খেতে পারে কি না? খরগোশকে কুকুর এভাবে পাকড়াও করেছে যে, উহার দাঁত খরগোশের শরীরে বিদ্ধ হয়ে গেছে এবং উহার শরীরের অনেকাংশে ক্ষত হয়ে গেছে। খরগোশের শরীরে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। এখনো প্রাণ বাকী আছে। তখন ওটাকে যবেহ করে খেতে পারবে কি না? সবিস্তারে বর্ণনা করে প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ যদি বুদ্ধি সম্পন্ন মুসলমান বা কিতাবী (পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবের অনুসারী) এমতাবস্থায় যে, সে ইহরায় পরিহিত না হয়, বিসমিল্লাহ বলে তার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরকে (যা শিকার করে মালিকের জন্য রেখে দেয়, নিজে খায় না) হেরমের বাইরে হালাল বন্য জন্তুর উপর ছেড়ে দেয়, যে জন্তু নিজ পালক বা পায়ের শক্তিতে ভর করে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে শক্তিমান। কুকুরকে মালিক ছেড়ে দেয়ার পর সরাসরি শিকারের দিকে যায় অথবা শিকার ধরার তাদবীরে মশগুল হয়ে গেল। অন্যত্র ব্যস্ত না হয় এবং ঐ কুকুর শিকারকে আঘাত করে মেরে ফেলে অথবা এমন আঘাত করল যে, উহার মধ্যে এতটুকু জীবন বাকী আছে-যতটুকু যবেহকৃত পশুর মধ্যে থাকে। যবহের পর কিছুক্ষণ নড়াচড়া করে ঠান্ডা হয়ে যায়। কুকুর ছাড়ার ক্ষেত্রে কোন কাফির, অগ্নিপূজক, বৃতপূজারী বা নাস্তিক অথবা মুরতাদ। যেমন-বর্তমানের অধিকাংশ নাসারা, রাফেযী এবং সাধারণ ন্যাচারী ও অন্যান্যগণের কুকুর যেন না থাকে। মোটকথা- মুসলমান বা কিতাবী ব্যতীত অন্য কেউ শরীক ছিল না। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কুকুর শিকার হত্যার ক্ষেত্রে অন্য কোন অপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর অথবা অন্যান্য কোন নতুন জন্তুও শরীক ছিল না-যার শিকার নাজায়েয। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরকে যে ব্যক্তি শিকারের জন্য লেলিয়ে দেয়, পাঠানোর পরের সময় থেকে শিকার পাওয়া পর্যন্ত সে ব্যক্তি তার প্রতি মনোযোগ রাখল। মধ্যখানে অন্য কোন কাজে মশগুল না হয়ে পড়ে তবে ঐ কুকুরের শিকারকৃত জন্ত যবেহ ব্যতীত হালাল। উল্লেখিত চৌদ্দটি শর্ত থেকে একটিতেও যদি ঘাটতি হয় এবং জন্তু যবেহ ব্যতীত মারা যায় তবে হারাম। আর হেরমের শিকারকৃত জন্ত যবহের মাধ্যমেও হালাল হয় না। বাকী অন্যান্য পন্থাসমূহে শরয়ী যবহের মাধ্যমে হালাল হয়ে যায়।

তানভীরুল আবসার, দুররুল মুখতার ও রাদ্দুল মুহতারে আছে-

الصَّيْدُ مُبَاحَ بِخَمْسَةَ عَشَرَ شَرْطًا خَمْسَةٌ فِي الصَّائِدِوَهُوَ أَنْ يَكُونَ مِنْ اَهْلِ الذَّكَاةِ وَانْ يُوجَدَ مِنْهَ الإِرْسَالَ وَأَنْ لَا يَشَارِكَهُ فِي الْإِرْسَالَ مَنْ لَا يُحِلُّ صَيْدَهُ وَأَنْ لَا يَتْرُكَ التسمية عَامِدًا وَأَنْ لَا يَشْتَعَلَ بَيْنَ الْإِرْسَالِ والأخذ بِعَمَلٍ أَخَرُ وَخَمْسَةٌ فِي الْكَلْبِ أَنْ يَكُونَ مَعَلَّمًا وَأَنْ يَذْهَبُ عَلَى سَنَن الإرسال وأنْ لَا يُشَارِكَهُ فِى الاخذ ما لا يُجِلَّ صَيْدُهُ وَأَنْ يَقْتَلَهُ جَرْحًا وَأَنَّ لا ياكل مِنْهُ وَخَمْسَة في الصيد أنْ لا يَكُونُ مِنَ الحَشَرَاتِ وَانْ لا يكونَ عَنْ نبات الماء الا السَّمَكَ وَأَنْ يَمْنَعَ نَفْسُهُ بِجَنَاحَيْهِ أَوْ قَوَائِمِهِ أَنْ لَا يَكُونُ متقوّتًا بِنَا بِهِ أَوْ بِمِخْلِبِه وانْ يَمُوتُ بهذا قَبلَ أَنْ يُصِلَ إِلَى ذَبْحِهِ اهِ قُلْتُ و معنى قوله أن يَمُوتُ أى حقيقة أو حكماً بِإِن لَا يُبْقَى فِيهِ حَيَاةٌ فوق المذبوح كَمَا نَصَّ عَلَيْهِ فِي الدُّرِّ وَصَحْحَهُ الْمُحْشَى

অর্থাৎ শিকার ১৫টি শর্ত সাপেক্ষে মুবাহ। পাঁচটি শিকারীর মধ্যে আর তা- (১) শিকারী যবহের উপযুক্ত হওয়া। (২) শিকারীর পক্ষ থেকে পাঠানো পাওয়া যাওয়া। (৩) তার ঐ কাজে এমন কোন পশু অংশীদার না হওয়া যার শিকার হালাল নয়। (৪) ইচ্ছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ বর্জন না করা। (৫) শিকারী জন্ত পাঠানো এবং ধরার

মাঝখানে অন্য কোন কাজে মশগুল না হওয়া।

আর পাঁচটি শর্ত কুকুরের ক্ষেত্রে। (১) কুকুর প্রশিক্ষিত হওয়া। (২) পাঠানোর পর

সরাসরি শিকারের দিকেই যাওয়া। (৩) শিকার ধরার মধ্যে এমন কোন কুকুর শরীক না হওয়া যার শিকার হালাল নয়। (৪) শিকারকে আঘাত করে হত্যা

করা। (৫) ওটাকে কুকুর নিজে ভক্ষণ না করা।

আর পাঁচটি শর্ত শিকারের মধ্যে- (১) শিকার কীট পতঙ্গের অন্তর্ভুক্ত না হওয়া। (২)

মাছ ব্যতীত অন্য কোন জলজ প্রাণী না হওয়া। (৩) সে জন্ত নিজেকে নিজের ডানা বা পায়ের শক্তি দিয়ে রক্ষা করতে সক্ষম হওয়া। (৪) সে জন্ত নিজ পাঞ্জা দ্বারা খাদ্য

গ্রহণ না করা। (৫) শিকারী যবহের দিকে নিয়ে যাওয়ার পূর্বে মারা যাওয়া।

আমি বলছি গ্রন্থকারের উক্তি أَن يَمُونَ তথা মারা যাওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য প্রকৃত অথবা হুকুমীগত মারা যাওয়া অর্থাৎ উহার মধ্যে এতটুকু জীবন অবশিষ্ট থাকা-যতটুকু যবহেকৃত জন্তুর মধ্যে বিদ্যমান থাকে। যেমন দুররুল মুখতারে উহার সুষ্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে এবং টীকাকার ওটাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

এতে রয়েছে-

شَرْطَ كَوْنِ الذَّابِحِ مُسْلِمًا حَلَالًا خَارِجَ الْحَرَمِ إِنْ كَانَ صَيْدًا فَصَيْدُ المُحْرِمِ لا تَحِلّهُ الذكاةُ مُطلقًا ( اوْ كِتَابِيًّا وَلَوْ مَجْنُونَا) الخ . در ملخصا والمراد به المَعْتَوهُ كَمَا فِي الْعِنَايَةِ عَنِ النَّهَايَةِ لأَنَّ الْمُجْنُونَ لَا قَصْدَ لَهُ وَلَا نِيَّةٌ لأَن التسمية شرط بالنص وهي بالقصد وَصحَةَ القَصْدِ بِمَا ذَكَرْنَا يُعنى قُوْلَهُ إِذَا كَانَ يَعْقِلُ التسمية والذبيحة ويُضبط اه.

অর্থাৎ যবেহকারী মুসলিম হওয়া, গায়রে মুহরিম (ইহরাম মুক্ত) হওয়া এবং শিকার হেরমের বহির্ভূত হওয়া শর্ত। হেরমের শিকার যবেহ করা জায়েয নেই। সাধারণ যবেহকারী হোক অথবা কিতাবী হোক, যদিও সে পাগল হয়। পাগল দ্বারা উদ্দেশ্য ঢিলে হওয়া। যেমন নেহায়া হতে এনায়াতে বর্ণিত আছে। কেননা, পাগলের কোন সংকল্প বা নিয়্যতই নেই। যেহেতু বিসমিল্লাহ পড়া কুরআনের সুষ্পষ্ট আয়াতের দ্বারা ফরয সাব্যস্ত। তা সংকল্প দ্বারা হতে পারে। নিয়‍্যতের বিশুদ্ধতা তারই মাধ্যমে হয়ে থাকে-যা আমরা উল্লেখ করেছি। অর্থাৎ তার উক্তি-যখন সে বিসমিল্লাহ এবং যবেহের নিয়মকে ভালভাবে বুঝে স্মরণ রাখবে। এ সমস্ত শর্তাবলী সহকারে কুকুর যে খরগোশকে হত্যা করে তা সাধারণ হালাল। যদি যবেহযোগ্য প্রাণীর চেয়ে এখনো অধিক জীবন বাকী থাকে তবে তা যবেহ করার পর হালাল হবে। ওটার দাঁত শরীরে বিদ্ধ হয়ে যাওয়া তো বাঁধার কারণ হতে পারে না। পবিত্র কুরআনে সে শিকার হালাল বলে ঘোষণা দিয়েছেন। শিকার আঘাত ছাড়া হয় না আর আঘাত যখনই হবে তার দাঁত ঐ প্রাণীর শরীরে ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করবেই। এমতাবস্থায় তার নাপাক লালা শিকারকৃত জন্তর শরীরকে নাপাক করে দিবে এমন ধারণা দু'কারণে ভুল।

প্রথমতঃ শিকার রাগতঃ অবস্থায় হয়ে থাকে আর রাগান্বিত অবস্থায় তার লালা শুষ্ক হয়ে যায়।

وَلِذَا فَرَقَ جَمْعُ مِنَ الْعُلَمَاءِ فِي أَخْذِهِ طَرْفَ الثَّوْبِ مَلَا طِفًا فَيُنْجِسُ أَوْ به غضبان فلا .

এ জন্য ওলামা-ই কেরাম কুকুর দয়ার সাথে কাপড়ের পার্শ্ব কামড়িয়ে ধরা এবং ক্রোধের সাথে কামড়িয়ে ধরার ক্ষেত্রে পার্থক্য করেছেন। প্রথম অবস্থায় কাপড় নাপাক, দ্বিতীয় অবস্থায় কাপড় পাক থাকবে।

দ্বিতীয়তঃ লালা লাগলেও অসুবিধা নেই। শরীর থেকে রক্তও তো বের হয়-যে প্রবাহিত রক্ত নাপাক তাহলে তা কিভাবে পবিত্র থাকবে? ওটা যদি পবিত্র হয়ে যায় তবে তাও পাক হয়ে যাবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-১৬ঃ নামাযরত ব্যক্তির সামনে অতিক্রমকারী গুনাহগার হবে কি না? তার নামাযে কোন ত্রুটি সংঘটিত হবে কি? আর নামাযি ব্যক্তির সামনে কত পরিমাণ দূরত্ব পর্যন্ত অতিক্রম করা যায় না?

২৩ রবিউল আখির শরীফ, ১৩২০ হিজরী।

শরীয়তের ওলামাগণ কী বলেন? নামাযরত ব্যক্তির সামনে অতিক্রমকারী গুনাহগার হবে কি না? তার নামাযে কোন ত্রুটি সংঘটিত হবে কি? আর নামাযি ব্যক্তির সামনে কত পরিমাণ দূরত্ব পর্যন্ত অতিক্রম করা যায় না? সবিস্তারে বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ নামাযে কোন ত্রুটি হবে না। অতিক্রমকারী গুনাহগার হবে। যদি কোন ছোট স্থান বা ছোট মসজিদে নামায পড়ে তবে সামনের দেওয়াল পর্যন্ত অতিক্রম করা জায়েয নেই। যতক্ষণ মধ্যখানে প্রতিবন্ধক (সুতরা) না হয়। যদি ময়দান বা বড় মসজিদে নামায পড়ে তবে শুধুমাত্র সিজদার স্থান পর্যন্ত বের হওয়ার অনুমতি নেই। এর বাইরে অতিক্রম করতে পারে। সিজদার স্থান বলতে মানুষ যখন নামাযের ক্বিয়ামে বিনয়ী বান্দাগণের ন্যায় নিজ দৃষ্টি খাস সিজদার জায়গার উপর অর্থাৎ যেখানে সিজদার সময়ে তার কপাল পড়বে তা বুঝায়। তবে দৃষ্টি বলতে-যখন সামনে প্রতিবন্ধক না থাকে তখন যেখানে দৃষ্টি নিবন্ধিত হয় উহা থেকে সামান্য সামনে দৃষ্টি বাড়িয়ে পড়ে। দৃষ্টি যতটুকু সামনে বাড়িয়ে পড়ে, তা সবটাই সিজদার স্থান। তার ভেতরে অতিক্রম করা হারাম। তবে এর বাইরে জায়েয।

দুররুল মুখতারে রয়েছে-

مرور مَا فِي الصَّحْرَاءِ أَوْ فِي مَسْجِدٍ كبير او في مسجد كبير بموضع سجوده في الاصح أو    مروره بَيْنَ يَدَيْهِ إِلى حَائِط القبلة في بَيْتِ مَسْجِدٍ صَغيرِ فَإِنَّهُ كَبَقْعَة واحدة

ময়দানে অথবা বড় মসজিদে সিজদার জায়গা দিয়ে অতিক্রমকারী রাস্তা অতিক্রম করা বিশুদ্ধ মত অনুসারে অথবা ঘরে, ছোট মসজিদে নামাযরত ব্যক্তির সামনে হতে ক্বিবলা দিকের দেওয়াল পর্যন্ত স্থান দিয়ে হেঁটে যাওয়া অবৈধ। কেননা ওটা একটি জায়গার মতই।

রাদ্দুল মুহতারে রয়েছে-

قَوْلُهُ بِمَوْضِعِ سُجُودِهِ أَيْ مِنْ مُوضَعَ قَدَمِهِ إِلَى مَوْضَعَ سُجُودِهِ كَمَا فِي الدرر وهذا مع القيود التي بعده إنما هو للاثم وَإِلَّا فَالفَسَادُ مُنتَفِ مطلقاً قولة في الأَصحَ صَحْحَهُ التمرتاشى وَصَاحِبُ الْبَدَائِعِ وَاخْتَارَهُ فَخُرُ الاسلام ورجحه في النهاية والفتح أَنَّهُ قَدْرَ مَا يُقَعُ بَصَرُهُ عَلَى الْمَارِ لَوْ صَلَّى بِخَشَوْعِ أَيْ رَامِيًا ببصره إلى موضع سجوده اه مختصرا

অর্থাৎ তার উক্তি (بِمَوْضَع سُجُورٍ) এর দ্বারা উদ্দেশ্য-তার পায়ের স্থান থেকে নিয়ে সিজদার জায়গা পর্যন্ত। যেমনিভাবে তা দুররে আছে। আর ইহার পরের শর্ত শুধুমাত্র অতিক্রমকারীর গুনাহ প্রকাশ করার জন্য। নামায সাধারণত ফাসেদ হয় না। তার উক্তি شى الأصح ইহাকে 'তামারতাসী ও বাদায়ি' গ্রন্থকার বিশুদ্ধ বলেছেন। ফখরুল ইসলাম ওটাকে গ্রহণ করেছেন। নেহায়া ও ফাতহ গ্রন্থে তা অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। অবশ্যই এর অনুমান এ যে, যতটুকু পরিমাণ তার দৃষ্টি অতিক্রমকারীর উপর পড়ে- খোদা ভীতির সাথে নামায আদায়কারীর দৃষ্টি সিজদার স্থানে নিবিষ্ট করার সময় যতটুকু দেখা যায়।

তাজনীস হতে মিনহাতুল খালিক-এ বর্ণিত আছে,

الصحيح مقدار مُنتَهى بَصْرَهُ وَهُوَ مَوْضَعُ سُجُودِهِ قَالَ أَبو نصر مقدار ما بين الصف الأول وبَيْنَ مُقام الإمام وهذا عَيْنُ الأول ولكن لعبارة أخرى اوْ فِيْمَا قُرْآنًا عَلَى شَيْخنَا مِنهاج الائمة رحمة الله تعالى أن يمر بحيث يقع اوْ فِيْمَا قُرْآنًا عَلَى شَيْخنَا مِنهاج الأئمة رحمة الله تعالى ان يمر بحيث بصَرَهُ وَهُوَ يُصَلَّى صَلوةَ الخَاشِعِينَ وَهُذا العبارة أَوْضَحُ

তার দৃষ্টি সীমার চুড়ান্ত স্থানই তার সিজদার স্থান। আবু নসর বলেছেন উহার পরিমাণ এতটুকু দূরত্ব যে, যতটুকু ইমাম এবং প্রথম কাতারের মাখখানে হয়ে থাকে। তা হুবহু প্রথম কথা। কিন্তু অন্য ইবারতে আছে অথবা উহার মধ্যে যা আমরা আমাদের শায়খ মিনহাজুল আইম্মা রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি'র নিকট পড়েছি-ঐ স্থান দিয়ে অতিক্রম করা যেখানে নামাযি ব্যক্তির দৃষ্টি পতিত হয় বিনয়ের সাথে নামায পড়া অবস্থায়। এ ইবারত প্রথমটার চেয়ে অধিক সুষ্পষ্ট।

আল্লামা শামী রহমাতুল্লাহি তায়ালা আলাইহি বলেন-

فَانْظُرْ كَيْفَ جَعَلَ الْكُلَّ قَوْلاً وَاحِدًا وَإِنَّمَا الْإِخْتِلَافُ فِي الْعِبَارَةِ لَا فِي المعنى

লক্ষ্য করুন-তিনি কিভাবে সব কথাকে একীভূত করেছেন। আর মতবিরোধ শুধুমাত্র শব্দে, অর্থের মধ্যে নয়।

রাদ্দুল মুহতারে আছে-

(قَوْلُهُ فِي بَيْتٍ) ظَاهِرَةٌ وَلَوْ كَبِيرًا فِي القَهَستَانِى وَيَنْبَغِي أَنْ يَدْخُلَ فِيهِ اي في حكم المسجد الصغير الدارُ والبَيْتُ

তাঁর উক্তি 'ঘরের মধ্যে' এর বর্ণনা সুস্পষ্ট যে, ঘর যদিও বড় হয়। কাহাস্তানীর মধ্যে আছে- ছোট মসজিদের হুকুমে বাসভবন ও বাড়ি অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।

আর ছোট মসজিদ ও বড় মসজিদের মধ্যে পার্থক্য কি? ফাযেলে কাহাস্তানী লিখেছেন যে, ছোট মসজিদ-যা চল্লিশ গজের চেয়ে কম হয়।

وَفِي رَبِّ المُحْتَارِ مَسْجِدٌ صَغِيْرَ هُوَ أَهْلَ مِنْ سِيِّينَ ذِرَاعًا وَقِيلَ مِنْ أَرْبَعِينَ وهو المختارُ كَمَا أَشَارَ إِلَيْهِ فِي الْجَوَاهِرِ

রাদ্দুল মুহতারে রয়েছে-ছোট মসজিদ-যা ষাট গজের চাইতে কম হয়। কেউ কেউ বলেছেন-চল্লিশের চেয়ে কম। এটাই পছন্দনীয় অভিমত। যেমন ওটার প্রতি জাওয়াহির কিতাবে ইঙ্গিত রয়েছে।

আমি বলেছি-এখানে গজ দ্বারা জমি পরিমাপের গজ হওয়া উচিত।

لأَنَّهُ الْأَلْبَقُ بِالْمُمْسُوحَاتِ كَمَا قَالَ الْإِمَامِ قَاضِي خَانَ فِي الْمَاءِ فَهُهُنَا هُوَ المتعين بالأولى 

কেননা, এটাই দূরত্ব সম্পন্ন বস্তুর সাথে অধিক উপযুক্ত। যেমন- ইমাম কাযীখাঁন রহমাতুল্লাহি আলাইহি পানির ক্ষেত্রে বলেছেন। কাজেই এখানে উত্তমতার সাথে তা-ই নির্ধারিত হবে।

গজ বলতে আটচল্লিশ আঙ্গুলি পরিমাণ অর্থাৎ তিন ফুট বা এক গজ দু'গিরা এবং দু'তৃতীয়াংশ গিরা।'

كَمَا بَيِّنَاه في بَعْضٍ فَتَاوَانا

যেভাবে আমরা আমাদের কোন কোন ফতোয়ায় বর্ণনা করেছি।

পরিমাপের দিক থেকে চল্লিশ বর্গগজ। আমাদের হিসেব মতে চুয়ান্ন গজ সাত গিরা এবং এক গিরার নবমাংশ-যা গণিতবিদদের নিকট সুস্পষ্ট। তাই আল্লামা শামী'র ঐ ধারণার ভিত্তিতে আমাদের গজে চুয়ান্ন বর্গগজ সাত গিরা হলে ছোট মসজিদ ধরা হবে। সাড়ে চুয়ান্ন বর্গগজ বড় মসজিদ। এটাই আল্লামা শামী'র অভিমত।

আমি বলছি-সন্দেহ হতে পারে যে, এটা জাওয়াহের থেকে উৎকলিত। জাওয়াহেরের ইবারত ঘর সম্বন্ধে, মসজিদ সম্পর্কে নয়।

বড় মসজিদ শুধু ওটাই যার মধ্যে ময়দানের মত কাতারসমূহের সংযুক্তকরণ শর্ত।

যেমন-খাওয়ারিযমের মসজিদ-যা ষোল হাজার স্তম্বের উপর নির্মিত। বাকী অন্যান্য মসজিদ যদিও দশ হাজার বর্গগজ হয় তবুও ছোট মসজিদ। আর এগুলোতে কিবলার দেওয়াল পর্যন্ত আড়াল ব্যতীত অতিক্রম করা না জায়েয। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-১৭ঃ কতেক লোক এক স্থানে বসে আছে এবং এক ব্যক্তি এসে বললো  السَّلَامُ عَلَيْكُمْ (আস্‌সলামু আলাইকুম) তার সালামের প্রত্যুত্তরে আদব বা নমস্কার বা তাসলীমাত অথবা কুর্নিশ অথবা এক ব্যক্তি তার হাত মাথা পর্যন্ত উঠাল আর মুখে জবাব দিল না। এমতাবস্থায় উল্লেখিত ব্যক্তিদের জিম্মা থেকে কি ফরযে কিফায়া আদায় হয়ে যাবে? 

২৪ রবিউল আখির শরীফ, ১৩২০ হিজরী।

কতেক লোক এক স্থানে বসে আছে এবং এক ব্যক্তি এসে বললো  السَّلَامُ عَلَيْكُمْ (আস্‌সলামু আলাইকুম) তার সালামের প্রত্যুত্তরে আদব বা নমস্কার বা তাসলীমাত অথবা কুর্নিশ অথবা এক ব্যক্তি তার হাত মাথা পর্যন্ত উঠাল আর মুখে জবাব দিল না। এমতাবস্থায় উল্লেখিত ব্যক্তিদের জিম্মা থেকে কি ফরযে কিফায়া আদায় হয়ে যাবে? এ মাসআলার ক্ষেত্রে ওলামা-ই দ্বীনের অভিমত কি? সবিস্তারে বর্ণনা করুন প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ না, সবাই গুনাহগার হবে। যতক্ষণ তাদের মধ্যে কেউ وَعَلَيْكُمُ السلام বা وَعَلَيْكَ السلام অথবা السلام عليكم বলবে না। কারণ নমাস্কার, আদব তাসলীমাত এ রকম অন্যান্য শব্দাবলী সালামের অন্তর্ভুক্ত নয়। শুধুমাত্র হাত উত্তোলন করা কোন কিছু নয় যতক্ষণ উহার সাথে সালাম জাতীয় শব্দ যুক্ত না হয়।

যাহরিয়া থেকে রাদ্দুল মুহতারে বর্ণিত আছে-

لفظ السلام في المواضع كلها السلام عليكم وبالتنوينِ وَبِدُونَ هَذَينِ كَمَا يقول الجهال لا يكونُ سَلَامًا الخ. أقُولُ فَلَا يَكُونُ جَوَابًا لأَنَّ جَوابٌ السلام ليس الا بالسلام أمَّا وَحدَهُ أَوْ بِزِيَادَةِ الرَّحْمَةِ وَالْبَرَكَاتِ لِقَوْلِهِ تعالى اذا حييتم بتحية فحيوا باحسن منها او ردوها ومعلوم أن ما اخترعوا من الالفاظ او الاجتزاء بالايماء اما ان يكون تحية اولا على الثاني عدم براءة الذمة ظاهر لان المامور به التحية وعلى الاول ليس عين السلام وهو ظاهر ولا احسن منه فان المخترع لا يمكن ان يكون احسن من الموارد فخرج عن كلا الوجهين وبقى الواجب الكفائي على كل عين.

অর্থাৎ সমস্ত স্থানে সালামের শব্দ السلام عليكم বা তানবীনের সাথে হবে এবং এ দু'টা পদ্ধতি ব্যতীত সালাম হবে না, যেমনটা অজ্ঞরা বলে থাকে। আমি বলছি-এরূপ হলে জবাবও হবে না। কেননা সালামের জবাব হয়তঃ শুধু সালামের সাথে হবে বা রহমত ও বরকত বৃদ্ধির সাথে হবে। যেহেতু আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-

 اذاً حييْتُمْ بِتَحِيَّةٍ فَحَيوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْرُدُّوهَا 

যখন তোমাদেরকে কোন অভিবাদন দেয়া হয় তোমরা উহার চেয়ে উত্তম অভিবাদন দাও অথবা তা-ই ফিরিয়ে দাও। জ্ঞাতব্য যে, ঐ সমস্ত লোক যা নতুন উদ্ভাবন করেছে শব্দ হোক বা ইশারা হোক, হয়তঃ তা হবে অভিবাদন বা অন্য কিছু। দ্বিতীয়াবস্থায় অর্থাৎ সালাম না হওয়া অবস্থায় দায়িত্বমুক্ত না হওয়াটা স্পষ্ট। কেননা আদিষ্ট বিষয় হচ্ছে সালাম। আর প্রথম অবস্থায় এ সমস্ত নব উদ্ভাবন না হুবহু সালাম; না উহা থেকে উত্তম। কেননা নব উদ্ভাবিত বিষয় শরীয়ত আরোপিত বিষয় হতে উত্তম হতে পারে না। ফলে উভয় দিক থেকে তা সালামের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে বের হয়ে গেছে এবং ওয়াজিব কিফায়া তাদের প্রত্যেকের জিম্মায় বাকী রয়ে গেছে।

মিরক্বাত শরীফে আছে-

قد صح بالأحاديث المتواتر معنى أنه السلام باللفظ سنة وجوابه واجب كذالك

অসংখ্য মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা বিশুদ্ধতার সাথে সাব্যস্ত হয়েছে যে, সালামের শব্দ দ্বারা সালাম দেয়া সুন্নাত এবং এর জবাব দেয়া ওয়াজিব। এভাবে হাদীস শরীফে আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَهُ بِغَيْرِنَا لَا تُشْبِهُوا بِالْيَهُودِ وَلَا بِالنَّصَارَى فَإِنَّ تَسْلِيمُ اليهود الإشارة بالاصابع وتسليم النصارى الاشارة بالأكف رواه الترمذي عن عبد الله ابن عمر رضى الله تعالى عنهما وقال اسناده ضعيف . قال العلامة القارى لعل وجهه انه عن عمرو بن شعيب عن ابيه عن جده وقد تقدم الخلاف فيه وان المعتمد ان سنده حسن لا سيما وقد اسنده السيوطي في الجامع الصغير الى ابن عمر و فارتفع النزاع وزال الاشكال . اهـ

اقول رحم الله مولانا القارى انما احاله الامام السيوطي على ت يعني الترمذى فيضم يرتفع النزاع ويزول الاشكال ثم ليس تضعيف الترمذى لما ظن فان الجمهور ومنهم الترمذى على الاحتجاج بعمرو بن شعيب و برواية عن ابيه عن جده بل الوجه انه من رواية ابن لهيعة انه يقول الترمذى حدثنا فتيبة ابن لهيعة

অর্থাৎ সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে আমাদের বিরোদ্ধবাদীদের সদৃশ হয়। তোমরা ইহুদী বা নাসারার সদৃশ হয়ো না। কেননা ইহুদীদের সালাম হল আঙ্গুলির দ্বারা ইশারা আর নাসারাদের সালাম হাতের তালু দ্বারা ইশারা করা। ইমাম তিরমিযী ইহাকে আবদুল্লাহ ইবনু ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন উহার সনদ দূর্বল।

আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেন-সম্ভবত উহার (দুর্বল হওয়া) কারণ উহা عمرو بن شعيب عن أبيه عن جده নিশ্চয় এ সম্পর্কে মতবিরোধ পূর্বেই অতিবাহিত হয়ে গেছে। এ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কথা হলো তার সনদ হাসান। বিশেষত যখন ইমাম সুয়ূতী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জামেউস সাগীরে এ হাদীস ইবনু ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। কাজেই তর্ক-বিতর্ক এবং আপত্তি দূরীভূত হয়ে গেল।

আমি বলছি-আল্লাহ তায়ালা মোল্লা আলী ক্বারীর উপর রহম করুন, ইমাম সুয়ূতী উক্ত হাদীসের বরাত (ت) অর্থাৎ তিরমিযী দিয়েছেন। তিনি মিলায়েছেন-

 يرتفع النُزَاعُ وَيَزُولُ الْإِشْكَالُ

(তর্ক তিরোহিত, আপত্তি দূরীভুত হল)। ইহা তিরমিযীর বৃদ্ধিকরণ নয়-যেভাবে তিনি ধারণা করেছেন। কেননা, অধিকাংশ আলেমগণ যার মধ্যে ইমাম তিরমিযী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুও শামিল আছেন তাঁরা এ কথার 

عمرو بن شعيب عن ابيه عن جده 

সূত্র নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেছেন মর্মে দলীল গ্রহণ জায়েয। বরং দূর্বলতার কারণ এ রেওয়ায়াতটা ابن لهيعة থেকে।

ইমাম তিরমিযী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেন-

حدثنا قتيبة ابن لهيعة عن عمرو بن شعيب عن ابيه عن جده أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قَالَ فَذَكَرَه قَالَ التِرْمِذِي هُذَا حَدِيثُ اسناده ضعيف وروى ابن المبارك هذا الحديث عن ابن الهيعة قلم يرفعه اه وقد قال في كتاب النكاح باب ما جاء فى مَنْ يَتَزَوج المرأة ثُمَّ يُطلقها قَبْلَ أَنْ يدخل بها لحديث رَوَاهُ بِعَيْنِ السَّنَدِ هذا حَدِيثُ لا يصح ابن لهيعة يُضعف في الحديث اه مختصراً وكَذَا ضَعْفَهُ فِي غَيْرِ هُذَا المَحَلَّ فَإِلَيْهِ يُشِيرُ لَهُهَنَا نعم الاظهر عندى أن حديث ابن لهيعة لا ينزل عن الحسن وقد صرح المناوي في التيسيران حديثه حسن

অর্থাৎ আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেছেন-কুতাইবাহ ইবনু লুহাইআ' তিনি আমর ইবনু শোআইব থেকে, তিনি তার পিতা থেকে তিনি তার দাদার সূত্রে বর্ণনা করেছেন। নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-তিনি উহাকে উল্লেখ করেছেন। ইমাম তিরমিযী বলেছেন এ হাদীসের সনদ দূর্বল। ইবনুল মুবারক এ হাদীস ইবনু লুহাইআ' থেকে রেওয়ায়াত করেছেন। তিনি মারফু হিসেবে বর্ণনা করেননি। অবশ্যই তিনি كتاب النِّكَاحِ অধ্যায়ে 

بَابٌ مَا جَاءَ فِي مَنْ يَتَزَوج المرءة ثمَّ يَطلَّقَهَا قَبْلَ أَنْ يُدْخُلْ بِهَا

বলেছেন- যে ব্যক্তি কোন মহিলাকে বিবাহ করে তার সাথে সহবাসের পূর্বে তালাক দিয়ে দিল। এমন হাদীসের কারণে যা হুবহু সে সনদে বর্ণনা করেছেন। এ হাদীস সহীহ নয়। ইবনু লুহাইআ'র হাদীসে ضعيف বাড়ানো হয়েছে। অনুরূপভাবে তাকে এ স্থান ছাড়াও আরো কয়েক স্থানে ضعيف স্থির করা হয়েছে। তারই দিকে এখানে ইঙ্গিত করেছেন।

হ্যাঁ! আমার নিকট সুষ্পষ্ট যে, লুহাইআ'র হাদীস হাসান স্তরের চেয়ে কম নয় এবং مناوی তাইসীর গ্রন্থে তার হাদীস হাসান হওয়ার উপর সুষ্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন।

হ্যাঁ! সালাম শব্দের সাথে হাতের ইশারাও যদি হয়, তবে ক্ষতি নেই।

أخرج الترمذي قال حدثنا سويدنا عبد الله بن المبارك نا عبد الحميد بهرام انه سمع شهر ابن خوشب يقول سمعت اسماء بنت يزيد تحدث ان رسول الله صلى الله تعالى عليه وسلم مُرفِي الْمَسْجِدِ يَوْمًا وَعُصْبَةٌ مِنْ النساء قعود فَالْوَى بيدِه بالتسليم وأشار عبد الحميد بيده هذا حديث حسن الخ قال الامام النووى وهو محمول على انه صلى الله تعالى عليه  وسلم جمع بين اللفظ والاشارة ويدل على هذا ان اباداؤد روى هذا الحديث وقال في رواية فسلم علينا اه قال العلامة القارى بعد نقله قلت على تقدير عدم تلفظه عليه الصلوة والسلام بالسلام لا محذور فيه لانه ما شرع السلام على مَنْ مَرّ عَلى جَمَاعَةٍ مِنَ النِّسْوَانِ وَإِنَّ مَا عَنهُ عَلَيْهِ الصلوة والسلام مِمَّا تَقَدَّمَ مِنْ إسلام المصرح فهو من خصوصياته عليه الصلوة والسلام فَلَه أَنْ يُسلم وأنْ لا يُسلّم وان يشير ولا يشير على انه قد يراد بالاشارة مجرد التواضع من غير قصد السلام الخ اقول منبى كله على انه لم يرد السلام ولا يظهر فرق بين ماذكر أولا ومازاد في العلاوة سوى انه ذكر فيها للاشارة محملا وهو التواضع وهنده شاهدة الواقعة سيدتنا اسماء رضى الله تعالى عنها شاهدة بانه صلى الله تعالى عليه وسلم فان لم يحمل على التلفظ لزم ان تكون نفس الاشارة تسليما وهو معلوم الانتفاء من الشرع فوجب الحمل على الجمع تامل لعل لكلامه محملا لست احصه والله سبحنه وتعالى اعلم وعلمه وجل مجده اتم واحكم 

অর্থাৎ ইমাম তিরমিযী হাদীস বর্ণনা করে বলেছেন আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেছে সুয়াইদ, তাঁকে আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক, তাঁকে আবদুল হামীদ বাহরাম বর্ণনা করেছেন। নিশ্চয় তিনি শাহর ইবনু খাওশাবকে বলতে শুনেছেন যে, আমি আসমা বিনতে ইয়াযীদকে এ হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি যে, নিশ্চয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা একদিন মসজিদে উপবিষ্ট একদল মহিলাদের পাশ দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করতেছিলেন। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা হাতের ইশারায় সালাম করলেন এবং আবদুল হামীদ তার হাতের দ্বারা ইশারা করলেন। এ হাদীস শরীফখানা হাসান। ইমাম নববী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেন এ হাদীস এটার উপর প্রযোজ্য যে, নিশ্চয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা সালামের শব্দ ও ইশারা একত্রিত করেছেন। এ কথার দলীল যে, আবু দাউদএ হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন এবং তিনি অন্য এক বর্ণনায় বলেছেন فَسَلَّمَ عَلَيْنَا অর্থাৎ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা আমাদের উপর সালাম পেশ করেছেন।

আল্লামা আলী ক্বারী (রাঃ) ইহা নকল করার পর বলেছেন- আমি বলছি-হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা'র সালামের শব্দ উচ্চারণ না করা অবস্থায়ও কোন আপত্তি নেই। কেননা মহিলাগণের দলের পাশ দিয়ে অতিক্রমকারীর জন্য মহিলাদের সালাম করা তখনো শরীয়তে প্রচলিত ছিল না। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা মহিলাদের সালাম করাটা নিজ বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সালাম করা না করা এবং ইশারা করা বা না করার স্বাধীনতা রাসুলের ছিল। এগুলো ব্যতীত কোন কোন সময় ইশারা দ্বারা সালাম উদ্দেশ্য হয় না, বরং শুধুমাত্র বিনয়-নম্রতা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে।

আমি বলছি, এ সমস্ত আলোচনার ভিত্তি এ কথার উপর যে, সালামের উত্তর হয়নি। পূর্বের বর্ণনা ও আলাওয়া মধ্যস্থিত বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট নয়। তবে এতটুকু পার্থক্য যে, তার মধ্যে ইশারা করার এক অস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। অর্থাৎ তা বিনয়-নম্রতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে। ঐ ঘটনার সাক্ষী হযরত হিন্দা। আসমা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা সালাম করেছেন। যদি উহাকে সালাম শব্দের উপর প্রয়োগ করা না হয় তবে পরে ইশারাকে সালাম মানতে হবে। ইশারায় সালাম না হওয়া শরীয়তে সাব্যস্ত হয়ে গেছে। কাজেই ওটাকে ইশারা ও সালাম উভয়কে একত্রিকরণের উপর প্রয়োগ করা ওয়াজিব। চিন্তা করুন! সম্ভবত তাঁর কথা অস্পষ্ট-যা আমি বুঝতে পারছি না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-১৮ঃ ঢোল বাজনা ও কাওয়ালী

২৯ রবিউল আখির শরীফ, ১৩২০ হিজরী।

ইমামে আহলে সুন্নাত মুজাদ্দেদে দ্বীনো মিল্লাত'র মহান খেদমতে প্রার্থনা যে, আজ আমি যে সময় আপনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মাগরিবের নামাযের জন্য মসজিদে গেলাম। মাগরিবের নামাযের পর আমার এক বন্ধু আমাকে বলল-চলরে, এক স্থানে ওরছ আছে। আমি গিয়ে দেখছি বহু লোকের সমাবেশ। কাওয়ালী এ পদ্ধতিতে চলছিল যে, এক ঢোল ও দু'টা সারঙ্গী বাজছিল। কয়েকজন কাওয়াল পীরানে পীর দস্তগীর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু'র শানে কবিতা পরিবেশন করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা'র প্রশংসা সম্বলিত কবিতাবলী এবং আউলিয়া কেরামের শানে কবিতা গাচ্ছিল। সাথে ঢোল ও সারঙ্গী বাজছিল। এ রকম বাজনা শরীয়তে অকাট্য হারাম। তাহলে ঐ কাজের কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ও অলি-আল্লাহ সন্তুষ্টি হবেন? মজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ কি গুনাহগার হবে? এ রকম কাওয়ালী জায়েয কি না? যদি জায়েয হয় তবে কীভাবে? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ এ রকম কাওয়ালী হারাম। মজলিসে উপস্থিতবর্গ সবাই গুনাহগার। এদের সবার গুনাহ ওরছ আয়োজনকারী ও কাওয়ালদের উপর বর্তাবে। কাওয়ালদের গুনাহও সে ওরছ আয়োজকদের উপর বর্তাবে। ওরছ আয়োজনকারীরা গুনাহগার হওয়াতে কাওয়ালদের গুনাহ কম হবে না। অনুরূপভাবে আয়োজক ও কাওয়ালদের জিম্মায় গুনাহ বর্তানোর কারণে উপস্থিতগণের গুনাহে কোন হ্রাস পাবে না; রবং উপস্থিতগণের প্রত্যেকের উপর তাদের পূর্ণ গুনাহও কাওয়াল, উপস্থিতি ও ওরশ আয়োজনকারীদের পৃথকভাবে গুনাহ হবে। এমন ওরশ আয়োজকদের নিজ নিজ গুনাহ আলাদাভাবে, কাওয়ালদের সমান গুনাহ পৃথকভাবে আর সকল অংশ গ্রহণকারীদের সমান পৃথকভাবে বর্তাবে। কারণ উপস্থিত শ্রোতাদেরকে ওরছকারীরা আমন্ত্রণ করেছে। তাদের কারণে এ গুনাহের উপকরণ বিস্তার লাভ করেছে। কাওয়ালরা তাদের শ্রোতাদের শুনায়েছে। যদি ওরছের আয়োজন না করতো এবং কাওয়ালরা সে উপকরণ না আনত আর এ ঢোল সারঙ্গী বাদ্য-বাজনা না শোনাত। তারা আয়োজন না করলে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ গুনাহে কিভাবে লিপ্ত হত? এ জন্য এদের সবার গুনাহ এ দু'গোষ্ঠির উপর বর্তালো। কাওয়ালদের এ গুনাহের ভাগিদার ওরছকারীরা হয়েছে। সে ওরছ না করত, আমন্ত্রণ না দিত তবে তারা কিভাবে বাদ্য-বাজনা করার জন্য আসতে পারত? এ জন্য কাওয়ালদের গুনাহও ঐ আমন্ত্রণকারীর উপর বর্তাবে।

كَمَا قَالُوا فِي سَائِلِ قُوِى ذِي مِرَّةٍ سَوَى أَنَّ الْأَخْذُوا الْمُعْطَى أَيْمَانِ لَأَنَّهُمْ لولَمْ يُعْطُوا لَمَا فَعَلُوا فَكَانَ العَطَاءُ هُوَ الْبَاعِثُ لَهُمْ عَلَى الاسْتِرْسَالِ فِي التَّكَدِّى وَالسُّؤالِ وَهُذَا كُلَّهُ ظَاهِرُ عَلَى مَنْ عَرَفَ الْقَوَاعِدَ الكَرِيمَة الشَّرْعِيَّةَ، وَبِاللَّهِ التَّوْفِيقُ

অর্থাৎ যেমন ফোকাহা-ই কেরাম বলেছেন-এমন ভিক্ষুকের ব্যাপারে যে শক্তিমান, সুস্থ হয় তবে এমন ব্যক্তি ভিক্ষা গ্রহণ করা এবং এরূপ ব্যক্তিকে যে ভিক্ষা দেয় উভয়েই গুনাহগার। কেননা যদি দাতা না দিত তাহলে সেও এ রকম নিন্দনীয়-ঘৃনিত কাজের প্রার্থনা করত না। সুতরাং দাতাদের দানই তাদের ভিক্ষাবৃত্তির কারণ হয়েছে। তা শরয়ী কানুন সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তিবর্গের নিকট সুষ্পষ্ট। আল্লাহই তাওফীক দিয়ে থাকেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أَجَوْرٍ مِّنْ تَبِعَهُ لَا يَنقُصُ ذَلِكَ مِنْ أجُورِهِمْ شَيْئًا وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلَالَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الْإِثْمِ مِثْلَ أَنَامِ مِّنْ تَبِعَهُ لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أَنَامِهِمْ شَيْئًا

অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন হেদায়ত বিষয়ের প্রতি আহবান করে যতজন তার অনুসরণ করবে সে তাদের সবার সমান ছাওয়াব পাবে। উহাতে তাদের ছাওয়াবের কোন ঘাটতি হবে না। যে কোন গোমরাহী বিষয়ের প্রতি আহবান করে যতজন তার আহবানে সাড়া দিয়ে তার অনুসরণ করবে, সে তাদের সবার সমান গুনাহে বেষ্টিত হবে। তাদের গুনাহকে হালকা করণের কোন রাস্তা পাবে না।

উক্ত হাদীস শরীফখানা ইমাম আহমদ, মুসলিম ও ইমাম চতুষ্টয় হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

বাদ্য-বাজনা হারাম হওয়া সম্পর্কে অনেক হাদীস এসেছে। এগুলোর মধ্যে অতি উচ্চ ও সুমর্যাদাবান হাদীস গ্রন্থ সহীহ বুখারী শরীফ-যাতে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

لِيَكُونَنَّ فِي امَتِي أَقْوَامَ يَسْتَحِلَّوْنَ الْحُرَّ وَالْحَرِيرُ وَالْخَمْرُ وَالْمَعَارِفَ

নিশ্চয় আমার উম্মতের মধ্যে এমন অনেক সম্প্রদায় আসবে যারা মহিলাদের লজ্জাস্থান তথা যেনা, রেশমি কাপড়, মদ এবং বাদ্য-বাজনাকে হালাল জানবে। এ হাদীস শরীফখানা 'মুত্তাসিল'। তা বিশুদ্ধ সূত্রে ইমাম আহমদ, আবু দাউদ, ইসমাইলী ও আবু নু'আইম বর্ণনা করেছেন-যা সমালোচনার উর্ধে। ইমামগণের আরেকটি দল যেমন ইমাম ইবনে হাজর স্বীয় 'কাফফুর রুআ' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।

কতেক জ্ঞানশূন্য, মস্তিষ্ক বিকৃত, অজ্ঞলোক, যৌনপূজারী, নীম মোল্লা অথবা মিথ্যুক সুফী দরবেশ কুপ্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে সুদৃঢ়, মারফু, বিশুদ্ধ অনেক হাদীসের বিপরীতে কিছু দুর্বল কাহিনী বা সন্দেহপূর্ণ বর্ণনা অথবা মুতাশাবিহ (অস্পষ্ট অর্থবোধক) প্রমাণ হিসেবে পেশ করে থাকে। তারা কাণ্ড জ্ঞানহীন বা ইচ্ছাকৃতভাবে অজ্ঞ সেজেছে। অন্যথায় সহীহ'র সামনে দুর্বল, মুতা'আইয়্যান (সুনির্দিষ্ট অর্থবোধক)'র সামনে মুহতামাল (সন্দেহযুক্ত হাদীস), মুহকাম (সুদৃঢ়)'র উপস্থিতিতে মুতাশাবিহ অবশ্যই বর্জনীয়। কোথায় হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা'র বাণী আর কোথায় কর্মমূলক বর্ণনা! কোথায় হারামকারী, কোথায় মুবাহকারী! প্রত্যেক অবস্থায় মূলনীতি অনুপাতে দূর্বলের বিপরীতে সবল আমলযোগ্য ও প্রনিধানযোগ্য। কিন্তু কুপ্রবৃত্তি পূজারীদের চিকিৎসা কার কাছে আছে? আহা! যদি গুনাহকে গুনাহ বলে জানতো! স্বীকার করতো! আফসোস! গুনাহ করে এবং গুনাহকে জেনেশোনে স্বীকৃতি দেয়া অত্যন্ত নির্লজ্জতা। জঘন্যতম কথা হলো যে, তাদের ধমকি শক্ত; অথচ মস্তিষ্ক বিকৃত ও জেদী। নিজের জন্য হারামকে হালাল বানাবে। এতটুকুতে সমাপ্ত নয়; বরং আল্লাহর আশ্রয়! তাদের অপবাদ মাহবুবানে খোদা সিলসিলায়ে আলীয়া চিশতিয়া'র পূর্বসূরী মাশায়েখে কেরামের উপর আরোপ করে। তারা না খোদার ভয় করে, না বান্দাদের সমীহ করে। অথচ স্বয়ং হুযুর মাহবুবে ইলাহী সাইয়্যিদী মাওলায়ী নেযামুল হক ওয়াদ-দ্বীন সুলতানুল আউলিয়া (রাঃ) 'ফাওয়াইদুল ফাওয়াদ' শরীফে বলেছেন-

مزامیر حرام ست

(বাদ্যযন্ত্র হারাম)।

মাওলানা ফখরুদ্দীন যারাবী-যিনি হুযুর সাইয়্যিদুনা মাহবুবে ইলাহী'র খলিফা, তিনি হুযুর মাহবুবে ইলাহী'র পবিত্র যামানায় স্বয়ং হুযুরের নির্দেশে সেমা'র মাসআলা

সম্পর্কে كَشْفُ القِنَاعِ عَنْ أَصَوْلِ السَّمَاعِ নামক এক পুস্তক লিখেছেন।

এতে পরিস্কারভাবে বলে দিয়েছেন-

أمَّا السَّمَاعَ مُشَائِخنا رضى الله تعالى عنهم فَبُرِى عَنْ هُذِهِ التَّهْمَةِ وَهُوَ مجرد صوتِ القَوالِ مَعَ الْأَشْعَارِ المَشْعِرَةِ مِنْ كَمَالِ صُنْعَةِ اللَّهِ تَعَالَى .

অর্থাৎ আমাদের মাশায়েখ কেরামদের সেমা এ সমস্ত বাদ্য-বাজনার অপবাদ থেকে মুক্ত। তা শুধু কাওয়ালগণের আওয়াজ-যা কবিতাসমূহের সাথে আল্লাহ তায়ালার আশ্চার্য সৃষ্টি বা শৈল্পিকতা সম্পর্কে অবহিত করে। ন্যায়পরায়নতা আল্লাহরই! এ মহান ইমাম খান্দানে আলীয়া চিশতীয়া'র বাণী গ্রহণযোগ্য না কি বর্তমানকার অজ্ঞ-মুর্খদের ভিত্তিহীন অপবাদ গ্রহণযোগ্য হবে? এটা সুস্পষ্ট ফ্যাসাদ।

লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

হুযুর পুরনূর শায়খুল আলম ফরীদুল হক ওয়াদ-দ্বীন গঞ্জে শকর'র মুরীদ ও হুযুর সায়্যিদুনা মাহবুবে ইলাহী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু'র খলিফা সাইয়্যিদি মাওলানা মুহাম্মদ ইবনু মুবারক ইবনে মুহাম্মদ আলাভী কিরমানী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাঁর সুদীর্ঘ কিতাব 'সিয়রূল আউলিয়া'তে বলেছেন-

حضرت سلطان المشائخ قدس سرہ العزیز می فرمود که چند ایس چیز می باید تا سماع مباح می شود مسمع و مستمع و مسموع و آله سماع مسمع یعنی گوینده مرد تمام باشد ، کودک نباشد و عورت نباشد ، مستمع آنکه می شنود از یاد حق خالی نباشد و مسموع آنچه بگویند نخش و مسترگی نیاشد و آلہ سماع مز امیر ست چوں چنگ و رباب و مثل آن می باید که در میان نباشد این چنیں سماع حلال ست

অর্থাৎ হযরত সুলতানুল মাশায়েখ কাদ্দাসাল্লাহু সিররাহুল আযীয বলেছেন যে, কতেক শর্ত পাওয়া গেলে সেমা মুবাহ। কিছু শর্ত যিনি শুনান তার ক্ষেত্রে আর কিছু শর্ত শ্রোতার জন্য, কিছু শর্ত শুনানোর ক্ষেত্রে হয় এবং কিছু শর্ত সেমার যন্ত্রের ক্ষেত্রে।

অর্থাৎ যিনি শুনান তিনি কামিল ব্যক্তি হওয়া, চ্যাংরা ছেলে এবং মহিলা না হওয়া। শ্রোতা খোদার স্মরণ থেকে অমনোযোগী না হওয়া, যে বাক্য পড়বে তা অশ্লীল ও ঠাট্টাত্বক না হওয়া। সেমার বাদ্যযন্ত্র যেমন-সারেঙ্গী, হারমুনিয়াম, বেহালা ইত্যাদি বস্তুসমূহ থেকে কোন কিছু না থাকা চাই। এ রকম সেমা হালাল।

মুসলিম ভাইয়েরা! তা সিলসিলায়ে আলিয়া চিশতিয়া'র সর্দার হযরত সুলতানুল আউলিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু'র ফতোয়া। এরপরও কি অপবাদ দানকারী প্রতারকদের মুখ দেখানোর ক্ষমতা আছে?

সিয়রূল আউলিয়া' শরীফে আরো আছে-

یکے بخدمت حضرت سلطان المشائخ عرض داشت که در یں روز ها بعضی از درویشان آستانه دار در مجمعے کہ چنگ در باب ومزامیر بود رقص کردند فرمود نیکو نکرده اند آنچه نامشروع ست نه است نا پسندیده است. بعد ازاں یکے گفت چوں ایس طائفہ ازاں مقام بیرون آمدند بایشان گفتند که شما شما چه کردید، در آن مجتمع مزامیر بود سماع چگونه شنیدید و رقص کردید ایشان جواب دادند که ما چناں مستغرق سماع بودیم که ندانستیم که اینجا مزامیر است یا نہ حضرت سلطان المشائخ فرمود ایں جواب ہم چیزی نیست این سخن در همه معصیتها بیاید.

এক ব্যক্তি হযরত সুলতানুল মাশায়েখের খেদমতে আরজ করলেন-এ যুগে কিছু আস্তানাদার দরবেশ এমন সমাবেশে নৃত্য করেছে যেখানে বীনা, সেতার, সারিন্দা, কাঁসা ও অন্যান্য বাদ্য যন্ত্র রয়েছে। তিনি বলেছেন-সে ভাল কাজ করেনি। তা শরীয়তে অবৈধ ও অপছন্দনীয়। এরপর একজন বলল-যখন এ দল ঐ স্থান থেকে বেরিয়ে আসল লোকজন তাদেরকে বললো-তোমরা কি করেছো? এতে তো বাদ্যযন্ত্র ছিল। তোমরা কেন সেমা শুনেছো এবং নৃত্য করেছো? তারা জবাব দিল যে, আমরা সেমাতে এভাবে মশগুল ছিলাম যে, আমাদের তা জানাই ছিল না। এখানে বাদ্যযন্ত্র ছিল কি না? সুলতানুল মাশায়েখ বললেন-এ জবাব কিছু নয়।

এভাবে তো সমস্ত গুনাহের ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে।

মুসলমানগণ! বাদ্যযন্ত্র নাজায়েয হওয়ার ক্ষেত্রে কেমন পরিস্কার দিক নির্দেশনা!

আমাদের মশগুল থাকার কারণে বাদ্যযন্ত্রের খবর হয়নি! এ ওযর কী মুখ বন্ধকারী জবাব? এ ছলনা প্রত্যেক গুনাহের ক্ষেত্রে চলতে পারে। মদ পান কর এবং বলে দিবে যে, অধিক মশগুল থাকার কারণে আমাদের তা খবর হয়নি যে, তা কি মদ না পানি। যেনা করে এ কথা বলে দিবে-অবস্থার প্রাধান্যতার কারণে আমি ভেদাভেদ করতে পারিনি যে, নিজ স্ত্রী না অপরিচিতা মহিলা।

ঐ কিতাবে আছে-

حضرت سلطان المشائخ فرمود من منع کرده ام که مز امپر ومحرمات در میان نباشد و در یس باب بسیار غلو کرد تا بخد یکه گفت اگر امام را سهو افتد مرد سی اعلام ک بیج اعلام کند و زن سبحان الله نگوید زیرا که نشاید آواز آن شنودن پس پست دست بر کف دست زند و کف دست بر کف دست نزند که آن بلهو می ماند تا ایس غایت از ملاهی و امثال آں پر ہیز آمده است پس در سماع بطریع اولی که از میں بابت نباشد یعنی در منع دستک چند میں احتیاط آمده است پس در سماع مزامیر بطریق اولی منع است او باختصار .

অর্থাৎ হযরত সুলতানুল মাশায়েখ বলেছেন-আমি বারণ করে রেখেছি যে, বাদ্যযন্ত্র ও অন্যান্য নিষিদ্ধ বস্তুসমূহের মাধ্যমে যেন সেমা না হয়। তিনি এ কথার ক্ষেত্রে অধিক জোর দিয়েছেন। এমন কি তিনি বলেছেন-যদি ইমাম সাহেব নামাযে ভুল করে তবে পুরুষ 'সুবহানাল্লাহ' বলে ইমামকে স্মরণ করিয়ে দিবে এবং মহিলা 'সুবহানাল্লাহ' বলবে না। কারণ তার আওয়াজ গোপন করা চাই। এক হাতের তালু অপর হাতের তালুর উপর মারবে না। এভাবে হলে এটা খেলায় পরিণত হবে; বরং এক হাতের পিঠ অপর হাতের তালুর ওপর মারবে। যখন এতটুকু পর্যন্ত খেল-তামাশার বস্তু ও এগুলোর ন্যায় অন্যান্য বস্তু থেকে বাঁধা এসেছে তবে সেমা আরো অধিক উত্তম ভাবে নিষেধ।

হে মুসলমানেরা! যেখানে তরীকতের ইমামগণ এতটুকু পর্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করেছেন যে, তালির আওয়াজ পর্যন্ত নিষেধ করেছেন, সেখানে আল্লাহর পানাহ! অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের অপবাদ কেমন বোকামী? আল্লাহর ওয়াস্তে ইনসাফ করুন।

আল্লাহ যেন শয়তানের অনুসরণ থেকে রক্ষা করেন এবং এ সব মাহবুবানে খোদার সত্যিকারের অনুসরণ করার তাওফীক দান করেন। আমীন বিহুরমাতে সায়্যিদিল মুরসালীন। অনেক সুদীর্ঘ কথা আছে তবে সুবিবেচক বন্ধুর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-১৯: আযান বা খুতবার মধ্যে যে সময় আঁ হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা'র পবিত্র নাম আসে চুম্বন করে থাকে। তা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয কি না?

২৯ রবিউল আখির শরীফ, ১৩২০ হিজরী।

ওলামা-ই দ্বীন ও সুদৃঢ় শরীয়তের মুফতীগণ! এ মাসআলার ক্ষেত্রে অভিমত কি? হুযুর মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা'র পবিত্র নাম নেয়ার সময় নখগুলো চুম্বন করা। যেমন-আযান বা খুতবার মধ্যে যে সময় আঁ হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা'র পবিত্র নাম আসে চুম্বন করে থাকে। তা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয কি না?

জাওয়াবঃ আযানে হুযুর সায়্যিদে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা'র পবিত্র নাম শুনে নখ চুম্বন করে চোখে লাগানোকে আলেমগণ মুস্তাহাব বলেছেন।

দুররুল মুখতারে রয়েছে-

يَسْتَحَبُّ أَنْ يُقَالَ عِنْدَ سَمَاعِ الْأَوْلَى مِنَ الشَّهَادَةِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ الله وَعِنْدَ الثَّانِيَةِ مِنْهَا فَرَّتْ عَيْنِي بِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُمَّ مُتَعْنِي بالسَّمْعَ وَالْبَصَرِ بَعْدَ وَضَعَ ظَفَرَى الإِبْهَامَيْنِ عَلَى الْعَيْنَيْنِ فَإِنَّهُ صَلَّى الله تعالى عليه وسلم يَكُونُ قَائِدًا لَهُ إِلى الجَنَّةِ كَذَا فِي كُنْرُ العِبَادِ اه قهستانی ونحوه في الفتاوى الصوفية

অর্থাৎ মুস্তাহাব যে, যখন আযানে প্রথমবার اشهد ان محمد رسول الله শুনবে তখন صلى الله عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ বলা। যখন তা দ্বিতীয়বার শুনবে 

قرت عيْنِى بِكَ يَا رَسُولُ اللَّهِ

(আপনার মাধ্যমে আমার, চোখ শীতল হোক- এয়া রাসুলুল্লাহ!) বলা। অতঃপর اللَّهُمَّ مَتَعْنِى بِالسَّمْعَ وَالْبَصْرِ (হে আল্লাহ! আমাকে কর্ণ ও চক্ষে শক্তি দিন) বলবে আঙ্গুলির নখ চোখের উপর রেখে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা তাঁর পবিত্র জামিনে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। এ ভাবেই 'কানযুল ইবাদ'এ আছে। এটা আল্লামা কাহিস্তানীর জামেউর রামুয'র বিষয়বস্তু। এ রকম ফাতাওয়া-ই সুফিয়ার মধ্যেও রয়েছে।

অধম এ মাসআলার ব্যাপারে বিস্তারিত কিতাব

منير العَيْنِ فِي حُكْمِ تَقَبَّل الإِبْهَامَيْنِ

লিখেছি। যেখানে বিরুদ্ধবাদীদের সকল সন্দেহ আল্লাহ'র ফযলে দূর করা হয়েছে। উলূমে হাদীসের আলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু খুৎবার সময় চুম্বন না করা চাই। কেননা ওটাতে রয়েছে শুধুমাত্র নিশ্চুপ থাকার হুকুম। যেভাবে আমি আমার ফতোয়ায় বর্ণনা করেছি। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-২০ঃ আউলিয়ায়ে কেরামের মাযারসমূহে বাতি জ্বালানো এবং বুযর্গানে দ্বীনের কবরসমূহের উপর আলোকসজ্জা করা কি জায়েয?

ওলামা-ই দ্বীন! এ মাসআলার ব্যাপারে কি বলছেন? আউলিয়ায়ে কেরামের মাযারসমূহে বাতি জ্বালানো এবং বুযর্গানে দ্বীনের কবরসমূহের উপর আলোকসজ্জা করা কি জায়েয? বুযর্গদের যিয়ারতে বাজনাসহ চাদর চড়ানো যেমন- বর্তমান কালের রীতি। প্রত্যেক বৃহস্পতিবারে বাতি জ্বালায়, বাজনাসহ লাল, সবুজ, রঙিন চাদর নিয়ে তা চড়ায় এবং নানা রকম শিরনী, পিন্নী এদের কবরসমূহে রেখে ফাতিহা দেয়া হয়। তা কুরআন-হাদীসের ভিত্তিতে জায়েয কি না? 

জাওয়াব : আল্লাহরই তাওফীকে বলছি, মূলনীতি হল-কর্মের ছাওয়াব নিয়তের উপর নির্ভরশীল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন إنما الاعمال بالنيات যে কাজ ধর্মীয় ও দুনিয়াবী বৈধ উপকার থেকে খালি হবে তা নিরর্থক। অনর্থক কাজ স্বয়ং মাকরূহ। এতে সম্পদ খরচ করা অপব্যয়। অপব্যয় হারাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّ اللهَ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ

তোমরা অপব্যয় করো না। নিশ্চয় আল্লাহ অপব্যয়কারীকে ভালবাসেন না। মুসলমানদের উপকার করা নিঃসন্দেহে ইসলামের পছন্দনীয় রীতি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يُنْفَعُ أَخَاهُ فَلْيُنْفَعُهُ.

তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ আছে স্বীয় ভাইয়ের নিকট উপকার পৌঁছাতে সে যেন উপকার পৌঁছায়। হাদীস শরীফখানা ইমাম মুসলিম হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন।

ধর্মীয় মহোত্তম, বস্তুসমূহের সম্মান করা অকাট্যভাবে বাঞ্চনীয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 وَمَنْ يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوى القلوب

অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে সম্মান করে তবে তা অন্তরের পরহেজগারী।

وَمَنْ يُعْظِمْ حُرِمَاتِ اللَّهِ فَذَالِكَ خَيْرٌ لَهُ عِنْدَ رَبِّهِ

যে ব্যক্তি আল্লাহর পবিত্র বস্তুসমূহের সম্মান করে স্বীয় প্রতিপালকের নিকট তার জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।

আউলিয়ায়ে কেরামের কবরসমূহ এবং শুধু আল্লাহর আদরনীয় বান্দাগণ নয় বরং সাধারণ মুমিনগণের কবরসমূহ সম্মানের যোগ্য। এজন্য এগুলোর উপর বসা, চলাফেরা করা ও পা রাখা নিষেধ। এমনকি এগুলোতে হেলান দেওয়াও নিষেধ। ইমাম আহমদ, হাকিম ও ত্বাবরানী মুসনাদে মুসতাদরাক কবীরে ওমারাহ বিন খেরম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে হাসান সূত্রে রেওয়ায়েত করেছেন-

رَأَنِي رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم جَالِسًا عَلَى قَبْرٍ فَقَالَ يَا صَاحِبَ القبر انزل من القبر لا تُؤْذِى صَاحِبَ القبر وَلا يُؤْذِيكَ

অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা আমাকে একটা কবরে বসা অবস্থায় দেখে বলেন-হে কবরওয়ালা! কবরের উপর থেকে নেমে পড়। তুমি কবরবাসীকে কষ্ট দিও না আর সে তোমাকে কষ্ট দিবে না।

ইমাম আহমদ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর রেওয়ায়াতে এভাবে আছে-

رَأَنِي رَسُولُ الله صلى الله تعالى عليه وسلم مَتَّكِنَّا عَلَى قَبْرٍ فَقَالَ لَا تؤدى صَاحِبَ هذا القبراً و لَا تُؤْذِه

অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা আমাকে কবরের উপর ঠেস লাগানো অবস্থায় দেখে বললেন-এ কবরবাসীকে কষ্ট দিও না। অথবা বলেছেন-তাকে কষ্ট দাও না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা বলেন-

لأن أَمْشِي عَلَى جَمْرَةٍ أَوْسَيْفِ أَوْ أَخْصَفٍ نَعْلَيَّ بِرِجْلِي أَحَبُّ إِلَى مِنْ أَنْ أَمْشِيَ عَلَى قَبْرٍ مُسْلِمٍ

আমি কোন মুসলমানের কবরের উপর চলা থেকে আমার নিকট অতি পছন্দনীয় হল আগুন বা তরবারীর উপর চলা বা জুতাকে আমার দু'পায়ের সাথে সেলাই করে চলা। উক্ত হাদীসখানা ইমাম ইবনু মাযা বিশুদ্ধ ও উত্তম সনদ সহকারে ওকবা বিন আমির রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেছেন।

এ পাঁচটি শরীয়াতের মূলনীতির উপর জিজ্ঞাসিত মাসআলাসমূহের বিভিন্ন অবস্থার হুকুম নির্ভরশীল। কবরের উপর বাতি জ্বালানো হতে যদি উহার প্রকৃত অর্থ উদ্দেশ্য হয় অর্থাৎ সোজা কবরের উপর চেরাগ রাখা বুঝায় তবে সাধারণত তা নিষিদ্ধ। আউলিয়ায়ে কেরামের মাযারসমূহে তা আরো জগন্যভাবে নাজাযেয়। এটা বেআদবি, অভদ্রতা এবং মৃতের অধিকারে হস্তক্ষেপ ও অনধিকার চর্চা।

'ক্বানিয়া' ও অন্যান্য গ্রন্থে আছে-

يأتم بوطء القُبُورِ لِأَنَّ سَقْفَ القَبْرِ حَقُّ الْمَيْتِ

কবরের উপর পায়চারী করা পাপ। কেননা কবরের ছাদ রক্ষা করা মৃত ব্যক্তির অধিকার। হাদীস الْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا المَسَاجِدَ وَالسِرَاجٌ এ প্রকৃত অর্থ তা-ই। على القبر এর মূল অর্থ- বিশেষ করে কবরের উপর।

তাই কবরের পার্শ্বে মসজিদ তৈরী করা কখনো নিষিদ্ধ নয়; বরং সৎ বান্দার মাযার হতে বরকত হাসিল করা যদি উদ্দেশ্য হয় তবে তা অতি প্রশংসনীয়।

'মাজমাউ বিহারিল আনোয়ার'এ আছে-

من اتخذ مسجدًا جوار صالح او صلى فى مقبره قاصدا به الاستظهار بروحه او وصول اثر من اثار اوته اليه لا التوجه نحوه والتعظيم له فلا حرج فيه الا يرى أنَّ مَرْقَدُ إِسْمَاعِيلَ عليه الصلوة والسلام في الحجر المسجد الحرام والصلوة فيه أفضل

অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন সৎ বান্দার মাযারের নিকট মসজিদ তৈরী করে অথবা কবরস্থানে এ উদ্দেশ্যে নামায পড়ে যে, মৃতের রূহের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করবে অথবা তার ইবাদতের বরকতের প্রভাব ঐ মৃত ব্যক্তি পর্যন্ত পৌঁছাবে। এটা নয় যে, নামাযে মৃতের দিকে মুখ করবে অথবা নামাযের মাধ্যমে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। এ উদ্দেশ্য না হলে তবে তাতে কোন অসুবিধা নেই। সে কি দেখে না যে, সাইয়্যিদুনা ইসমাঈল আলাইহিস সালাম'র মাযার পাক মসজিদে হারাম শরীফের পবিত্র হাতীমের মধ্যে। উহাতে নামায পড়া সমস্ত মসজিদ হতে উত্তম।

উল্লেখিত হাদীসের বিশুদ্ধতা মেনে নেওয়া হলে এ বিধান মানতে বাধ্য। এটাকে ইমাম তিরমিযী হাসান সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

যদি কবর থেকে আলাদাভাবে আলোকিত করা হয় এবং উহাতে কোন মসজিদ না থাকে, কেউ কুরআন মজীদ তেলাওয়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনে না বসে। ঐ কবর রাস্তার মাথায় নয় ও কোন সম্মানিত ওলী বা আলেমে দ্বীনের মাযার অবস্থিত নেই।

মোটকথা যদি কোন উপকারের আশা না থাকে তবে এ রকম বাতি জ্বালানো নিষেধ। সাধারণত মানুষ কোন উপকার না পেলে-তা অপচয়। উপকারে না আসলে এবং অপচয় হলে তা নাজায়েয।

বিশেষতঃ যখন ওটার সাথে এ অজ্ঞতাসূলভ ধারণা হয় যে, এ বাতির মাধ্যমে মৃতের নিকট আলো পৌঁছবে আর না হয় অন্ধকারে থাকবে। তখন অপচয়ের সাথে তার বিশ্বাসও ফাসিদ হলো। আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় চাই।

যদি সেখানে মসজিদ থাকে বা কোরআন তেলাওয়াতকারী অথবা আল্লাহর যিকরকারীগণের জন্য আলোকিত করে অথবা কবর চলাচলের রাস্তার ধারে অবস্থিত এবং এ নিয়ত করা হয়েছে যে, পথ অতিক্রমকারী রাস্তা দেখবে। সালাম ও ঈসালে ছাওয়াব থেকে নিজেও উপকার পাবে এবং মৃতের উপরও ফায়দা পৌঁছাবে, অথবা

ঐ কবর কোন ওলী বা আলেমে দ্বীনের মাযার হলে আলোকিত করে জনসাধারণের দৃষ্টিতে উহার আদব, সম্মান ও মহত্ব সৃষ্টি করা উদ্দেশ্য হয় তবে তা কখনো নিষিদ্ধ নয়। বরং উপরোল্লেখিত চার মূলনীতির ভিত্তিতে তা মুস্তাহাব ও মানদূব। তবে শর্ত হলো যেন সীমা লংঘন না হয়।

মাজমাউল বিহারে রয়েছে

إن كَانَ ثُمَّ مسجدًا أو غيره لينفع فيه للتلاوة والذكر فلا بأس بالسراج فيه

যদি সেখানে মসজিদ বা অনুরূপ অন্য কোন এমন বস্তু থাকে-যাতে ঐ বাতি জ্বালালে তেলাওয়াত ও যিকির করতে ফায়দা দেয় তবে বাতি জ্বালানোতে কোন অসুবিধা নেই।

ইমাম আল্লামা আরিফ বিল্লাহ সায়্যিদি আবদুল গণি নাবুলুসী (কুদ্দিসা সিররুহুল কুদসী) 'হাদীকায়ে নাদিয়া'র মধ্যে বলেছেন-

هذا كله إذا خلا من فائدة واما اذا كان موضع القبور مسجدا او على طريق او كان هناك احد جالس او كَانَ قَبْرُ وَلِي مِنَ الْأَوْلِيَاءِ أَوْ عَالِمٍ مِنَ المحققين تعظيما لروحه المشرفة على تراب جسده كاشراق الشمس على الارض اعلامًا للناس انه ولى ليتبركوا به ويدعوا الله تعالى عنده فيستجاب لهم فهو أمر جائز لا منع منه والاعمال بالنيات

অর্থাৎ কবরসমূহে বাতি জ্বালানোর নিষিদ্ধতা শুধুমাত্র ঐ অবস্থায় যখন সম্পূর্ণ উপকার বিহীন হয়। আর না হয় যদি কবরস্থানে মসজিদ থাকে বা কবর রাস্তার ধারে হয় অথবা ঐখানে কেউ বসা থাকে। অথবা কোন ওলী বা মুহাক্কিক আলিমের মাযার থাকে। তাঁর রূহ মুবারক স্বীয় শরীরে মাটির উপর এভাবে পরে রয়েছে যেভাবে সূর্য যমীনের উপর থাকে, রূহের সম্মানার্থে বাতি প্রজ্বলিত করা যেন মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, ইনি আল্লাহর ওলী ও তা মাযার। যাতে তারা তা থেকে বরকত হাসিল করতে পারে এবং উহার পাশে আল্লাহ তায়ালার নিকট দোয়া প্রার্থনা করে। তাদের অসীলায় দোয়া কবুল হলে তবে তা জায়েয কাজ। যাতে মূলতঃ নিষেধ নেই, আর কাজ নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল। ফকীর (আহমদ রেযা আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন) 'ত্বাওয়ালিউন নূর ফী হুকমিস সুরূজে আলাল কুবুর' নামক কিতাবে এ মাসআলা সম্পর্কে সবিস্তারে লিখেছি। আল্লাহই তওফীক দাতা। ঐ মূলনীতির ভিত্তিতে আউলিয়া কেরামগণের মাযারসমূহে চাদর চড়ানোও জায়েয সাব্যস্ত হয়। সাধারণ লোকের নিকট আম মুসলমানের কবরের ইজ্জত থাকে না। স্বচক্ষে দেখেছি-নাপাক জুতা পরে অবাধে মুসলমানের কবরে চলা ফেরা করছে। অন্তরে এ ভাবনাও আসছে না যে, কোন প্রিয় বান্দার দেহ তার পায়ের নিচে? অথবা এক সময় তাকেও এ মাটিতে শুইতে হবে। বারংবার দেখেছি- মুর্খরা কবরের উপর বসে জুয়া খেলছে, অশ্লীল কথাবার্তা বলছে, হাসাহাসি করছে। কেমন দুঃসাহস! আল্লাহর আশ্রয়! মুসলমানের কবরের উপর অনেকে প্রস্রাব করছে। এর অশুভ পরিণাম অবশ্যই আছে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন।

এজন্য ধর্মানুরাগীগণ একদিকে আউলিয়ায়ে কেরামের মাযারসমূহকে তাদের দুঃসাহস থেকে রক্ষা করার জন্য, আর ওদিকে মুর্খ লোকদেরকে তাঁদের সাথে বেয়াদবির মহা বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য উপকারী ও শরীয়তের প্রয়োজন মনে করেছেন-পবিত্র মাযারসমূহ অন্যান্য কবরসমূহ থেকে স্বতন্ত্র থাকবে, যাতে জনসাধারণের দৃষ্টিতে ভীতি ও মহত্ত্ব সৃষ্টি হয় এবং দুঃসাহসিক আচরণ করে বরবাদ হওয়া থেকে বিরত থাকে।

0

তাই নিষ্প্রয়োজনে আলেমগণ কুরআন শরীফকে স্বর্ণ ও অন্যান্য বস্তু দিয়ে সজ্জিত করাকে মুস্তাহসান বলেছেন। যেন প্রকাশ্যে এ রকম বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে শ্রদ্ধা করে। গভীর চিন্তা করলে বুঝা যায়-কা'বা মুয়াযযামায় গিলাফ পরানোর মধ্যে এক বড় হেকমত তা-ই।

তবে এখানে শুধুমাত্র অসম্মান নয় বরং আল্লাহর আশ্রয়! তাঁদের ক্ষেত্রে তীব্র বেয়াদবিরও সম্ভাবনা ছিল। চাদর চড়ানো, আলোকিত করা, পার্থক্যকরণ চিহ্ন স্থাপন করা, জনসাধারণের অন্তরে সম্মান সৃষ্টির জন্য সেগুলো অতীব প্রয়োজন। তা থেকে নিষেধকারীরা হয়তঃ অত্যাধিক স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন বোকা, অজ্ঞ এবং যুগের অবস্থা সম্পর্কে একেবারে বেখবর। নতুবা বঞ্চিত বেয়াদব যাদের অন্তরে আউলিয়ায়ে কেরামের সম্মান-মহত্ত্বের প্রতি কুটিলতা রয়েছে। জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর নিকট আশ্রয়!

অধম (আহমদ রেযা-আল্লাহ তায়ালা তাঁকে ক্ষমা করুন) উল্লেখিত রিসালায় এ সমস্ত মাসআলাগুলোকে আয়াতে করীমা 

 ذلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ 

এর মাধ্যমে উদঘাটন করেছি। আলহামদু লিল্লাহ!

সাইয়্যিদী আল্লামা মুহাম্মদ ইবনু আবেদীন শামী تنقيح الفتاوى الحامدية এর মধ্যে আল্লামা নাবুলুসী'র লিখিত كشف النور عن اصحاب القُبُور এর রেফারেন্সে বর্ণনা করেছেন-

لكن نحن الآن نقول ان كان القصد بذالك التعظيم في اعين العامة حتى لا يحتقروا صاحب هذا القبر الذي وضعت عليه الثياب والعمائم لجلب الخشوع والادب ولقلوب الغافلين الزائرين لان قلوبهم نافرة عند الحضور فى التادب بين يدى اولياء الله تعالى المدفونين في تلك القبور كما ذكرنا من حضور روحانيتهم المباركة عند قبورهم فهو أمر جائز لا ينبغى النهى عنه لأن الأعمالُ بِالنِّيَاتِ وَلِكُلِّ امْرِئٍ مَانَوى

কিন্তু আমরা বলি যে, যদি তা দ্বারা জনসাধারণের দৃষ্টিতে আউলিয়ায়ে কেরামগণের

মাযারের প্রতি সম্মান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হয়, সে মাযারের উপর কাপড়, পাগড়ি দেখে তা ওলীর মাযার জেনে ওটার প্রতি তুচ্ছ জ্ঞান করা থেকে বিরত থাকে। যেন যিয়ারতকারী গাফেলদের অন্তরে ভয়ভীতি ও আদব থাকে। কারণ মাযারে শায়িত আউলিয়ায়ে কেরামের প্রতি উপস্থিতগণের অন্তর আদব সহকারে কোমল হয় না। অথচ আমরা বর্ণনা করেছি যে, মাযারসমূহে আউলিয়ায়ে কেরামের রূহ মোবারক উপস্থিত হয়। তাই এ নিয়্যতে চাদর চড়ানো একটা জায়েয কাজ, তা থেকে বারণ করা উচিত নয়। সমস্ত আমল নিয়্যতের উপর নির্ভলশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তির তা-ই মিলে যা তার নিয়্যতে আছে।

চাদর সবুজ-লাল হওয়াতেও কোন অসুবিধা নেই বরং রেশমী কাপড় হওয়াও বৈধ। কারণ তা পরিধান নয়। অবশ্যই বাদ্যযন্ত্র নাজায়েয। চাদর বর্তমান থাকা অবস্থায় তা পুরানো বা নষ্ট না হলে পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। তরপরও চাদর চড়ানো অনর্থক কাজ। বরং যে টাকা এতে খরচ হবে তা ওলী-আল্লাহর রূহ মোবারকের ঈসালে ছাওয়াবের জন্য গরীবদেরকে সাদকা করে দিবে। তবে হ্যাঁ, যেখানে এ রীতি রয়েছে যে, বিছানো চাদর যখন প্রয়োজনাতিরিক্ত হয়ে পড়ে তখন খাদেমগণ, মিসকীন, গরিবরা নিয়ে নেয়। এ নিয়্যত করে চাদর চড়ালে কোন অসুবিধা নেই। তাও সদকা হয়ে গেল।

ফাতিহার খাবার কবরের উপরে রাখা এ রকমই নিষেধ যে রকম উহার উপর বাতি রেখে জ্বালানো নিষেধ। কবর থেকে আলাদা রাখলে অসুবিধা নেই। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-২১ঃ কেউ কেউ নাম রাখে যে-তাজুদ্দীন, মহিউদ্দীন, নেযামুদ্দীন, আলীজান, নবী খাঁন, মুহাম্মদ জান, মুহাম্মদ নবী, মুহাম্মদ ইয়াসীন, মুহাম্মদ ত্বহা, গাফুরুদ্দীন, গোলাম আলী, গোলাম হোসাইন, গোলাম গাউস, গোলাম জীলানী, হিদায়ত আলী। এ রকম নাম রাখা কি জায়েয নেই?

২ জমাদিউল উলা, ১৩২০ হিজরী।

ওলামা-ই দ্বীন ও সুদৃঢ় শরীয়তের মুফতীগণ! এ মাসআলার ব্যাপারে অভিমত কি? কেউ কেউ নাম রাখে যে-তাজুদ্দীন, মহিউদ্দীন, নেযামুদ্দীন, আলীজান, নবী খাঁন, মুহাম্মদ জান, মুহাম্মদ নবী, মুহাম্মদ ইয়াসীন, মুহাম্মদ ত্বহা, গাফুরুদ্দীন, গোলাম আলী, গোলাম হোসাইন, গোলাম গাউস, গোলাম জীলানী, হিদায়ত আলী। এ রকম নাম রাখা কি জায়েয নেই? মৌলভী আবদুল হাই সাহেব লক্ষ্ণৌভী তার ফাতওয়াতে হিদায়াত আলী নাম রাখা নাজায়েয বলেছেন। এতে সত্য কোনটি?

জাওয়াবঃ মুহাম্মদ নবী, আহমদ নবী, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার উপর অগণিত দরূদ, এ পবিত্র শব্দসমূহ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা'র উপরই প্রযোজ্য এবং তাঁরই জন্যই উপযুক্ত।

অন্যদের এ নাম রাখা হারাম। কারণ এগুলোতে প্রকৃতপক্ষে নবুয়তের দাবী না হওয়া প্রমাণিত, না-হয় আস্ত কুফুরী হত। কিন্তু নবুওয়ত দাবীদারের ভাব পাওয়া যায়। তাও নিশ্চিতভাবে হারাম ও বর্জনীয়। এ ধারণা করলে যে, নামসমূহে প্রথম অর্থ ধর্তব্য হয় না। শরয়ী ও প্রচলিত রীতিতে তা গ্রহণীয়। প্রথম অর্থ উদ্দেশ্য না হওয়াতে সন্দেহ নেই। কিন্তু একেবারে যে দৃষ্টি এড়ানো যাবে তাও ভুল।

অনেক সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা এমন অনেক নাম পরিবর্তন করে দিয়েছেন, যেগুলোতে মূল অর্থের দিক দিয়ে কোন খারাবি ছিল।

জামে তিরমিযীতে উম্মুল মুমিনীন আয়িশা ছিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত-

أن النبي صلى الله عليه وسلم كَانَ يُغَيِّرُ الْاسْمُ الْقَبيح

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা'র মহান উদার অভ্যাস ছিল যে, তিনি খারাপ অর্থবোধক নামকে পরিবর্তন করে দিতেন।

সুনানু আবি দাউদে আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা 

عتله عزيز، عاصى، شيطان، حكم عراب، حساب، شهاب

নাম পরিবর্তন করে দিয়েছেন। 

قال تركت اسانيدها للاختصار

(তিনি বলেছেন সংক্ষিপ্ত করণের জন্য আমি ঐগুলোর সনদ ছেড়ে দিয়েছি। احرم (আহরাম) নাম পরিবর্তন করে زرعه (যুরআ') রেখেছেন। উসামা বিন আখযরী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তা বর্ণনা করেছেন।

عاصِيّة (আসিয়া) এর নাম বদল করে جميلة (জামীলা) রেখেছেন। ইমাম মুসলিম হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা থেকে তা বর্ণনা করেছেন।

بره (বিররা) এর নাম زيْنَبٌ (যায়নাব) দিয়ে বদল করে বলেছেন-

لا تُزَكُوا أَنْفُسَكُمُ اللَّهُ أَعْلَمُ بِأَهْلِ الْبِرِّ مِنْكُمْ

তোমরা নিজেদেরকে নিজে ভাল বলোনা, আল্লাহই অধিক অবগত আছেন যে, তোমাদের মধ্যে কে নেক্কার। ইমাম মুসলিম যায়নাব বিনতে আবী সালমা হতে তা বর্ণনা করেছেন। بره এর অর্থ-সৎ বা নেক্কার মহিলা। তা আত্নপ্রশংসামূলক হওয়ার কারণে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

إِنَّكُمْ تَدْعُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِأَسْمَائِكُمْ وَأَسْمَاءُ أَبَائِكُمْ فَأَحْسِنُوا أَسْمَائِكُم

নিশ্চয় তোমরা কিয়ামতের দিন নিজেদের এবং তোমাদের পিতার নামে আহূত হবে। সুতরাং তোমরা স্বীয় নাম সুন্দর করে রাখ।

আহমদ, আবু দাউদ- আবু দারদা রাদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু হতে উত্তম সনদে বর্ণনা করেছেন।

যদি মূল অর্থ একেবারে ধর্তব্য না হতো তবে অমুক নাম ভাল, অমুক নাম মন্দ হওয়ার কি অর্থ! পরিবর্তনের উদ্দেশ্য কি? আত্মপ্রশংসা কোথায়? নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর বুঝানোর ক্ষেত্রে সব এক বরাবর। এতদসত্ত্বেও ঐ লোকদের নিকট জিজ্ঞাসা করে দেখ- আপনার সন্তানের নাম শয়তান মালউন, রাফেযী, খাবীস, শুকর ইত্যাদি রাখতে পছন্দ করবে? কখনো না। কাজেই মূল অর্থ বিবেচনা করা হয়। কোন মুখে নিজে নিজেকে এবং স্বীয় সন্তানদেরকে নবী বলবে ও বলার সুযোগ করে দেবে? কোন মুসলমান নিজের বা স্বীয় পুত্রের নাম রাসূলুল্লাহ, খাতিমুন্নবীয়্যিন বা সায়্যিদুল মুরসালীন রাখা বৈধ মনে করবে? কখনো না। সুতরাং মুহাম্মদ নবী, আহমদ নবী, নবী আহমদ কেমন করে বৈধ হয়?

এমন কি অনেক খোদার শত্রুকে নবীযুল্লাহ নাম রাখতে শুনেছি। লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! রিসালাত ও খতমে নবুয়াত'র দাবী করা হারাম আর স্বয়ং নবী দাবী কি হালাল? মুসলমানদের উপর আবশ্যক যে, এ রকম নামসমূহ পরিবর্তন কর। তাদেরকে ধিক্কার দিয়ে বলি-

هیچ پسند خرد جاں فروز - تاجے شہے بر سرک کفش دوز

আশ্চার্যের ব্যাপার যে, এ সব জটিল ব্যাখ্যা করে হীনমন্য লোকেরা পরিষ্কারভাবে রাব্বুল আলামীন নাম রাখতে শুরু করবে। এ কথা বলবে যে, নামে মূল অর্থ ধর্তব্য নয়। 

নাউযুবিল্লাহ!

এভাবে নবীজান নাম রাখা অনুচিত। যদি 'জান' একটা শব্দ মহব্বতের দৃষ্টিতে আলাদাভাবে এ মনে করে বৃদ্ধি করে-যেমনটি বেশির ভাগ তা-ই হয় তখন সুষ্পষ্টভাবে প্রকাশ্য নবুওয়াতের দাবীদার হয়েছে। আর যদি تركيب مقلوب (উল্টো বাক্য বিন্যাস্ত করণ) মনে করা হয়, অর্থাৎ جان نبی (জানে নবী) তবে তা আত্ম পবিত্রতা ঘোষণা ও আত্মপ্রশংসা'র ক্ষেত্রে بره শব্দ হতে আরো মারাত্নক।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা তা পছন্দ করেননি। এটা কিভাবে পছন্দ হতে পারে? 

এখানে নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বড় কোন অসুবিধা নেই। একটা 'ه' শব্দ বৃদ্ধিকরণের দ্বারা গুনাহ হতে রক্ষা পাবে এবং সুন্দর বিশেষত জায়েয নাম লাভকরবে- نبيه جان، نبيه احمد، احمد نبيه، محمد نبيه বলা ও লেখা চাই। نبيه অর্থ সজাগ, হুশিয়ার।

এ ভাবে ইয়াসীন, ত্বা-হা নাম রাখা নিষেধ। কারণ তা আল্লাহ ও হুযুর মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা'র নামসমূহের মধ্যে এমন নাম যেগুলোর অর্থ অজ্ঞাত।

কী আশ্চার্য! এগুলোর এমন অর্থ হতে পারে-যা খোদা ও রাসূল ভিন্ন অন্য অর্থে প্রযোজ্য হতে পারে না। সুতরাং এমন শব্দ বর্জন করা আবশ্যক। যেভাবে অজ্ঞাত অর্থ বিশিষ্ট তাবীয-মন্ত্র জায়েয হয় না। কেননা আল্লাহ না করুক যদি কোন শিরক ও গোমরাহীর অর্থকে শামিল করে।

ইমাম আবূ বকর ইবনুল আরাবী কিতাবু আহকামিল কুরআন এ বলেছেন-

روى اشهب عن مالك لا يتسمى احد يسين لانه اسم الله تعالى وهو كلام بديع وذلك أن العبد يجوز له أن يسمى باسم الرب اذا كان فيه معنى منه كعالم وقادر و انما منع مالك من التسمية بهذا الاسم لانه من الاسماء التي لا يدرى ما معناها فربما كان ذلك معنى ينفرد به الرب تعالى فلا ينبغى ان يقدم عليه من لا يعرف لما فيه من الخطر فاقتضى النظر المنع منه .

অর্থাৎ আল্লামা আশহাব ইমাম মালিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, কেউ যেন ইয়াসিন নাম না রাখে। কেননা তা আল্লাহ তায়ালার নাম। তা আল্লাহর গুণ প্রকাশ কালামে বদী'। তাহলে এরূপ হবে যে, বান্দার জন্য আল্লাহ তায়ালার নামে নাম রাখা জায়েয! যখন উহার মধ্যকার অর্থ তার মধ্যে পাওয়া যায়। যেমন-আলিম, কাদির (জ্ঞানী, সামর্থবান)। ইমাম মালিক এ নাম থেকে এজন্য নিষেধ করেছেন যে, এটা এমন নামের অন্তর্ভুক্ত-যার অর্থ অজানা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থ এমন যে, যা একমাত্র আল্লাহ তায়ালাকে বুঝায়। ক্ষতির হওয়ার কারণে যা অপরিচিত ওটাকে তার উপর অগ্রগামী না করা উচিত। সুতরাং তা নিষেধ করার কারণে চিন্তা গবেষনার দাবী রাখে।

আল্লামা শিহাবুদ্দীন আহমদ খাফফাজী হানাফী মিসরী نسيم الرياض شرح شفائے امام قاضی عیاض এর মধ্যে উহা বর্ণনা করে বলেছেন-

وهو كلام نفیس

তা কালামে নাফসী। অধম পাদটীকায় লিখেছি-

قد كانَ ظَهَرَ لى المنع عنه لعين هذا المعنى لكن نظر الى انه اسم النبي صلى الله عليه وسلم ولا ندرى معناه فلعل له معنى لا يصح في غيره صلى الله عليه وسلم الخ ولعل هذا أولى وما تقدم لان كون اسم النبي صلى الله عليه وسلم اظهر واشهر فلا يَكُونُ لَهُ مَعْنَى يَنْفَرِدُ بِهِ الرَّبُ عز وجل

অর্থাৎ আমার নিকট স্পষ্ট হচ্ছে যে, তা হতে নিষেধ এসেছে হুবহু এ অর্থ হওয়ার কারণে কিন্তু অন্য দৃষ্টিতে নিষেধ এজন্য যে, নিশ্চয় তা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা'র নাম। আমরা এ অর্থ বুঝতে সক্ষম নই। সম্ভবতঃ তার এমন অর্থ আছে-যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ব্যতীত অন্য কারো জন্য শুদ্ধ নয়।

কাজেই তা উত্তম-যা আগে অতিবাহিত হয়েছে। কেননা তা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা'র নাম হওয়া অধিক প্রসিদ্ধ ও প্রকাশ্য। সুতরাং তার জন্য এমন অর্থ হবে না যা শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাথে প্রযোজ্য। আল্লাহই ভাল জানেন।

হুবহু এ অবস্থা ত্বা-হা নামেও। বর্ণনা ও দলীল প্রয়োজন। শোনেন! পবিত্র শব্দ 'মুহাম্মদ' এগুলোর সাথে জুড়ে দিলে নিষিদ্ধতার ক্ষতিপূরণ হয় না। কেননা ইয়াসীন, ত্বা-হা এখনো অজ্ঞাত অর্থ বিশিষ্ট।

যদি এ নির্দিষ্ট অর্থ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা'র পবিত্র সত্ত্বার সাথে বিশেষিত হয় তবে 'মুহাম্মদ' মিলানোতে এরূপ হবে যে, কারো নাম রাসুলুল্লাহ না রেখে মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ রেখেছে। এ সবগুলো পরিস্কার হারাম।

অনুরূপ غَفُورُ الدِّينِ (গাফুরুদ্দীন) ও অধিক নিকৃষ্ট ও জঘন্য। غَفُورُ এর অর্থ বিমোচনকারী, গোপানকারী। আল্লাহ তায়ালা غفور الذنوب তথা পাপ বিমোচনকারী। অর্থাৎ আল্লাহ নিজ রহমতে স্বীয় বান্দাদের গুনাহসমূহ বিমোচন করেন এবং দোষ গোপন করেন। সুতরাং গাফুরুদ্দীন'র অর্থ হলো ধর্মের বিমোচনকারী। এটা এমন হলো যেমনি শয়তান নাম রাখা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা এ সব পরিবর্তন করে দিয়েছেন। এতো ধর্মীয় পোষাক পরে ধর্মকে নষ্ট করা। তা তো বগলে ইট মুখে শেখ ফরিদ।

এমন হয়েছে যে, যেমনি রাফেযী নাম রাখা। যা হোক তা অত্যাধিক জঘন্য। উহা থেকে عاصيه (আসিয়া) নাম অনেক হালকা ছিল যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা পরিবর্তন করে দিয়েছেন। কেননা প্রচলিত রীতি অনুযায়ী معاصی (গুনাহ) এর প্রয়োগ কর্মের উপর আর দ্বীন মোচনকারীর প্রয়োগ অর্ধম ও বদআকাঈদ'র উপর। নাউযু বিল্লাহ! হাদীস শরীফে রয়েছে- الْقَالُ موكل بالمنطق ছিল। কথায় মঙ্গলামঙ্গল নিহিত। কিছু মন্দ নামের পরিবর্তনের উদ্দেশ্য তা-ই

মাওলানা আলী ক্বারী 'মিরকাতে' বর্ণনা করেছেন-

إِنَّ الْأَسْمَاءِ تَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ

নামসমূহ আসমান হতে অবতীর্ণ হয়।

অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রে اسم (নাম) ও سَمَّى (নামকৃত স্বত্তা) এর মধ্যে সামঞ্জস্য গায়েব হতে নির্ধারিত হয়ে থাকে। অভিজ্ঞ লোকেরা বলেছেন-কুধারণায় মঙ্গলও অমঙ্গল হয়। হে আল্লাহ! আমাদেরকে রক্ষা করুন এবং রহম করুন। অধম নিজ চোখে এ রকম মন্দ নামের মন্দ প্রভাব পড়তে অনেক দেখেছি। এ দোয়া করি-

نسأل الله العظيم العفو والعافية . اللهم يا قدير يا رحمن يا رحيم يا غزیز يا غفور صل وسلم وبارك على سيدنا ومولانا محمد واله وصحبه وثبتنا على دينك الحق الذي ارتضيته لانبيائك ورسلك وملائكتك حتى نلقاك به وعافنا من البلاء والبلوى والفتن ما ظهر ومنها وما بطن وصل وسلم وبارك على سيدنا محمد واله وصحبه اجمعين. وارحم عجزنا وفاقتنا بهم يا ارحم الراحيمن امين والصلوة والسلام على الشفيع الكريم واله وصحبه اجمعين والحمد لله رب العالمين. امين.

একটা বড় আপদ এ যে, এ রকম মন্দ নামধারীরা নিজেদের নামের সাথে প্রচলন অনুযায়ী পবিত্র নাম 'মুহাম্মদ' মিলিয়ে লিখে ও বলে থাকে। অন্যের নিকট ব্যক্ত করে যে, যদি কেউ পুত পবিত্র নাম 'মুহাম্মদ' বিহীন শুধু নিজের নাম লিখে তবে কেমন যেন নিজের অপমান বলে জানে এবং অর্ধনাম বুঝে। অথচ এ রকম নিকৃষ্ট অর্থবোধক শব্দের সাথে ঐ পবিত্র নাম মিলানো খোদ ঐ পবিত্র নামের সাথে বেয়াদবি।

এ সুক্ষ্ম বিষয় স্মর্তব্য যে, এ সমস্ত বিষয়াবলীর প্রতি তারই মনোযোগ থকে যাকে ঈমান ও আদবের একটা বড় অংশ দান করা হয়েছে। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই। এরই ভিত্তিতে অধম (আলা হযরত) এর মতে-কলবে আলী, কলবে হাসান, কলবে হুসাইন, গোলাম আলী, গোলাম হাসান, গোলাম হোসাইন, গোলাম জিলানী ও অন্যান্য নামসমূহের সাথে নামে পাক 'মুহাম্মদ'কে মিলিয়ে বলা অবৈধ।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে সুন্দর আদব দান করুন এবং গযব থেকে রক্ষা করুন।

নিযামুদ্দীন, মুহিউদ্দিন, তাজুদ্দিন এবং এ রকম ঐ সমস্ত নাম যেগুলো ধর্মীয় মর্যাদা সম্পন্ন রবং ধর্মের উপর মর্যাদাবান হওয়া বুঝায়। যেমন- শামসুদ্দিন, বদরুদ্দিন, নুরুদ্দিন, ফখরুদ্দিন, শামসুল ইসলাম, মুহিউল ইসলাম, বদরুল ইসলাম ইত্যাদি। (আমিত্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে হলে) সবগুলোকে ওলামা-ই কেরাম খুব অপছন্দ, মাকরূহ ও নিষিদ্ধ বলেছেন।

আমাদের ধর্মীয় মহান বুযর্গব্যক্তিগণ ইসলামী বিভিন্ন লকবে প্রসিদ্ধ, তা তাঁদের নাম নয়; বরং উপাধি। উচ্চস্থানে পৌঁছার পর মুসলিমগণ গুণাগুণের কারণে তাঁদেরকে ঐ সব উপাধিতে ভূষিত করেছেন। যেমন-শামসুল আয়িম্মা হালওয়ানী, ফখরুল ইসলাম বাযদবী, তাজুস্ শরীয়াহ, সদরুস্ শরীয়াহ, এভাবে মুহিউল হক, মুহিউদ্দ্বীন, হুযুর পুরনুর সায়্যিদুনা গাউসে আযম, মুঈনুল হক ওয়াদ্বীন হযরত খাজা গরীবে নেওয়ায, কুতবুল হক ওয়াদ্বীন বখতিয়ার কাকী, শেহাবুল হক ওয়াদ্দ্বীন ওমর সরওয়ার্দী, বাহাউদ্দীন নক্সবন্দ, শায়খুল ইসলাম ফরীদুল হক ওয়াদ্বীন মাসউদ, নিযামুদ্দীন সুলতানুল আউলিয়া মাহবুবে ইলাহী, মুহাম্মদ নাসীরুল হক ওয়াদুদ্বীন ছেরাগ দেহলভী মাহমুদ এবং অন্যান্যগণ রাদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহুম। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁদের দ্বারা দ্বীন-দুনিয়ায় ফায়দা দান করুক।

হুযুর সায়্যিদুনা গাউসে আযম'র (রাদিঃ) পবিত্র উপাধি মুহীউদ্দীন স্বয়ং রূহানী জগতে ভূষিত হয়েছেন-যার বর্ণনা অত্যন্ত সুপ্রসিদ্ধ। বাহজাতুল আসরার শরীফ ও অন্যান্য ইমাম ও আলেমগণের কিতাবসমূহে উল্লেখিত আছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলছেন- 

لَا تُزَكُوا أَنْفُسَكُمْ 

তোমরা নিজেদের সাফাই গাইও না।

ফুসূলে আল্লামী'র মধ্যে আছে -

لَا يُسَمِّيْهِ بِمَا فِيْهِ تَزكية 

অর্থাৎ যাতে আত্ম পবিত্রকরণ রয়েছে তা দিয়ে নাম রাখবে না।

রাদ্দুল মুহতারে রয়েছে-

يوخذ من قوله ولا بما فيه تزكية المنع عن نحو محى الدين وشمس الدين مع مافيه من الكذب والف بَعْضُ المالكية في المنع منه مولفا وصرح به القرطبى فى شرح الاسماء الحُسْنَى وَأَنْشَدَ بَعْضُهُمْ فَقَالَ

অর্থঃ মুসান্নিফের উক্তি لا يسميه تزكية দ্বারা বুঝা যায় যে, মুহিউদ্দীন, শামসুদ্দীন এরূপ নাম নিষেধ। তাছাড়া এতে মিথ্যাও বিদ্যমান। এক মালেকী আলেম এ রকম

নাম রাখা নিষেধ হওয়ার ব্যাপারে একটা কিতাব লিখেছেন। ইমাম কুরতুবী (রাঃ) তাঁর রচিত গ্রন্থ 'আসমাউল হুসনা'র মধ্যে এ প্রসংগে সুষ্পষ্ট বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ এ সম্পর্কে কিছু কবিতা লিখেছেন। এক কবি বলেছেন-

أرى الدِّينَ يَسْتَحْيِ مِنَ اللَّهِ أَنْ يَرَى = وَهُذَا لَهُ فَخُرُ وَذَاكَ نَصِيرُ.

আমি ধর্মকে দেখেছি যে, তা আল্লাহ তায়ালা হতে লজ্জাবোধ করে যা ভাবার বিষয়। এমতাবস্থায় এটা তার জন্য অহংকার এবং তার সাহায্যকারী।

فَقَدْ كَثُرَتْ فِي الدِّينِ الْقَابُ عُصْبَةٍ = هُمْ مَا فِي مُرَاعَى الْمُنْكَرَاتِ حَمِيرٌ.

অবশ্যই ধর্মের মধ্যে তার সাহায্যকারীদের উপাধি অনেক রয়েছে। এরা ঐ লোক যারা মন্দের প্রতি লক্ষ্য রাখার ক্ষেত্রে গাধা।

وَإِنِّي أَجَلُ الدِّيْنِ عَنْ عِزَّةٍ بِهِمْ وَاعْلَمْ أَنَّ الذِّنْبُ فِيهِ كَثِيرٌ.

নিশ্চয় ধর্মের মৃত্যু এমন লোকদের সাথে যারা ইজ্জতের মধ্যে তাদের মত এবং জেনে রাখো যে, এতে বড় গুনাহ।

ونقل عن الامام النووى أَنه كَانَ يَكْرَهُ مَنْ لَقْبَهُ بِمُحْى الدِّيْنِ ويقول لا اجعل من دعانى به في حل ومال الى ذلك العارف بالله تعالى الشيخ سنان في كتابه تبيين المُحَارِمِ واقام الطامة الكبرى على المتين بمثل ذلك وانه من التزكية المنهى عنها في القرآن ومن الكذب قال ونظيره ما يقال للمدرسين بالتركى افندى وسلطانم ونحوه. ثم قال فان فيل هذه مجازات صارت كالاعلام فخرجت عن التزكية في الجواب ان هذا يرده ما يشاهد من انه اذا نودى باسمه العلم وجد على مَنْ نَادَاهُ بِهِ فَعَلِمَ أَنْ التركية باقية الخ

অর্থাৎ ইমাম নববী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি মুহিউদ্দীন'র সাথে তার উপাধি হওয়াকে অপছন্দ করতঃ বলতেন-যে ব্যক্তি আমাকে এ উপাধির মাধ্যমে ডাকবে আমি তাকে ক্ষমা করব না। সে মতের প্রতি ধাবিত হয়েছেন আরিফ বিল্লাহ শায়খ সিনান তাঁর কিতাব

أقام الطامة الكبرى على المتين ও تبيين المُحارم

এর মধ্যে। নিশ্চয় তা নিজের এমন সাফাই গাওয়ার অন্তর্ভুক্ত যা কুরআন মজীদে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ মিথ্যা বলা হতেও বারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন-তার দৃষ্টান্ত যা বলা হয় তুর্কি শিক্ষকগণের উন্নতির ক্ষেত্রে افندی وسلطانم এবং এ রকম অন্যান্য।

যদি বলা হয়-এগুলো রূপকভাবে ব্যবহৃত যা নামের মত হয়ে গেছে। কাজেই তা আত্নপ্রশংসামূলক নয়। জবাব হল যে, আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এ কথাকে রহিত করে। কেননা যদি ঐ ব্যক্তিবর্গকে বিশেষ নাম দ্বারা আহ্বান করা হয়, তখন তারা আহবানকারীদের উপর রাগ করবে। বুঝা গেল যে, এতে আত্নগরিমা বাকী রয়েছে। প্রশ্নকারী সতেরটি নাম জিজ্ঞাসা করেছেন, তম্মধ্যে দশটি না-জায়েয ও নিষিদ্ধ। বাকী সাতটিতে অসুবিধা নেই। আলী জান, মুহাম্মদ জান, এগুলো জায়েয হওয়া স্পষ্ট। কারণ মূল নাম আলী ও মুহাম্মদ, 'জান' শব্দ মহব্বতের দৃষ্টিতে বৃদ্ধি করা হয়েছে। হাদীস শরীফের মাধ্যমে সাব্যস্ত হয় যে, খোদার প্রিয় বান্দাগণ তথা আম্বিয়ায়ে কেরাম ও আউলিয়ায়ে কেরামের (আ.) পবিত্র নামানুসারে নাম রাখা মুস্তাহাব। যখন এ নাম তাঁদের বিশেষত্ব না হয়। হাদীসে আছে-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা বলেন- تَسَمُوا بِأَسْمَاءِ الأَنْبياء তোমরা আম্বিয়াগণের নামে নাম রাখো।

ইমাম বুখারী, আবু দাউদ, নাসাঈ ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে তা বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মদ ও আহমদ নামের ফযীলতের ক্ষেত্রে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

হাদীস-১ঃ সহীহাইন, মুসনাদে আহমদ, জামে তিরমিযী, সুনানে ইবনু মাজা'র মধ্যে হযরত আনাস (রাঃ) হতে একটি হাদীস বর্ণিত।

হাদীস-২ঃ সহীহাইন ও ইবনু মাজা'র মধ্যে হযরত জাবির (রাঃ) হতে অপর একটি বর্ণিত।

হাদীস-৩ঃ মু'জামে কবীর, ত্বাবরানীর মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

سَمُّوا بِاسْمِي وَلَا تَكْنُوا بِكُنِيَّتِي

তোমরা আমার নামে নাম রাখ এবং আমার উপনামে নাম রেখো না।

হাদীস-৪ঃ ইবনু আসাকির ও হাফিয হোসাইন ইবনু আহমদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে বুকাইর হযরত আবূ উমামাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

من ولِدَ مَوْلُودٌ فَسَمَّاهُ مُحَمَّدًا حَبَالِي تَبَرَكَا بِاسْمِي كَانَ هُوَ وَمَوْلُودُهُ فِي الجنة

যার সন্তান পয়দা হয়-সে আমার ভালবাসা ও আমার পবিত্র নাম হতে বরকত হাসিল করার নিমিত্তে তার নবজাতকের নাম 'মুহাম্মদ' রাখে, তবে সে এবং তার সন্তান দু'জনই বেহেশতে যাবে।

ইমাম খাতিমুল হুফ্ফায জালালুল মিল্লাত ওয়াদ্বীন সুয়ূতী (রাঃ)'র মতে-যতগুলো হাদীস এ অধ্যয়ে এসেছে এটা সবচেয়ে উত্তম এবং ইহার সনদ হাসান। আল্লামা শামী ও যুরকানী এ বিষয়ে বিতর্ক করেছেন।

হাদীস-৫ঃ হাফিয আবু তাহের সালাফী ও হাফিয ইবনু বুকাইর হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন- কিয়ামতের দিন দু'ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে উপস্থিত করা হবে। হুকুম করা হবে এদের জান্নাতে নিয়ে যাও। আরজ করবে-হে আল্লাহ! আমরা কোন আমলের কারণে জান্নাতের উপযোগী হয়েছি। আমরা তো জান্নাতের কোন কাজ করিনি। আল্লাহ রাব্বুল ইযযত বলবেন-

ادْخُلَا الْجَنَّةَ فَإِنِّي الَيْتَ عَلَى نَفْسِي لَهُ لَا يَدْخُلُ النَّارُ مَنْ إِسْمَهُ أَحْمَدُ وَلَا محمد.

তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর এ জন্য যে, আমি শপথ করেছি-যার নাম আহমদ বা মুহাম্মদ হবে সে দোযখে যাবে না।

মুমিন হলে সুন্নী মুমিন হও। আর কুরআন, হাদীস ও সাহাবীগণের পরিভাষায় মুমিন তাকেই বলে যে বিশুদ্ধ আক্বীদা সম্পন্ন সুন্নী হয়। যেভাবে তাওযীহ ও অন্যান্য গ্রন্থে ইমামগণ স্পষ্ট বর্ণনা করেছেন। আর না হয়, বদ-মাযহাবীদের জন্য তো হাদীসসমূহে এ ইরশাদ রয়েছে যে, সে জাহান্নামের কুকুর। তাদের কোন আমল কবুল হয় না। বদ-মাযহাবীকে যদি হাজরে আসওয়াদ ও মকামে ইবরাহীমের মধ্যবর্তী স্থানে অত্যাচারিত অবস্থায় হত্যা করা হয় এবং সে ঐ মৃত্যুর উপর ধৈর্য ধারণকারী ও ছাওয়াব অন্বেষণকারী হয়, তবুও আল্লাহ তায়ালা তার কোন কথা শুনবে না। তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

এ হাদীসসমূহ দারু কুতনী, ইবনু মাজা, বায়হাকী, ইবনুল জাওযী এবং অন্যান্যগণ হযরত আবূ উমামাহ খোযাইফা ও আনাস (রা.) হতে বর্ণনা করেছেন। এ অধম নিজ ফতোয়ার অনেক স্থানে তা লিখেছি।

তবে মুহাম্মদ বিন আবদুল ওহাব নজদী ও অন্যান্য পথভ্রষ্টদের জন্য মূলতঃ সুসংবাদ নেই। সৈয়দ আহমদ খাঁনের মত কাফিরদের জন্যও জান্নাতের সুসংবাদ নেই-যার আক্বীদা অকাট্য কুফরী। কাফিরদের জন্য তো জান্নাতের বায়ু পর্যন্ত সুনিশ্চিতভাবে হারাম।

হাদীস-৬ঃ আবু নাঈম 'হুলিয়াতুল আউলিয়া' গ্রন্থে হযরত নবীত্ব বিন শরীত্ব (রাঃ) হতে রেওয়ায়াত করছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

قَالَ اللَّهُ تَعَالَى وَعِزَّتِي وَجَلَالِي لَا عَذَبْتُ أَحَدًا تُسَمَّى بِاسْمِكَ فِي النَّارِ.

রাব্বুল ইযযত আমাকে বলেছেন-আমার ইযযত ও জালালিয়াতের শপথ! যার নাম আপনার নামে রাখা হবে তাকে দোযখের আযাব দেয়া হবে না।

হাদীস-৭ঃ হাফিয ইবনু বুকাইর আমীরুল মুমিনীন মাওলা আলী কাররামাল্লাহু তায়ালা ওয়াজহাহুল করীম হতে রেওয়ায়াত করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা অনুরূপ বলেছেন।

হাদীস-৮ঃ দায়লামী মুসনাদুল ফিরদৌসের মধ্যে মাওকূফ সূত্রে মাওলা আলী হতে বর্ণনা করেছেন।

হাদীস-৯ঃ ইবনু আদী কামিল এবং আবু সাঈদ নাক্কাশ সহীহ সনদ সহকারে তাঁর 'মু'জামুশ শুয়ূখ' গ্রন্থে রেওয়ায়াত করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

مَا أَطْعِمُ الطَّعَامُ عَلَى مَائِدَةٍ وَلَا جَلَسَ عَلَيْهَا وَفِيْهَا إِسْمِي إِلَّا وَقَدْ سُوا كُلَّ يَوْمِ مَرَّتَيْن.

যে দস্তারখানায় মানুষ বসে খাবার খেয়েছে এবং তাদের মধ্যে কারো নাম মুহাম্মদ হয় ঐ ব্যক্তিকে প্রতিদিন দু'বার করে সম্মান করা হয়ে থাকে।

সারমর্ম হল-যে ঘরে এ পবিত্র নামের কোন ব্যক্তি থাকবে, দিনে দু'বার ঐ স্থানে আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয়।

এ জন্য আমীরুল মুমিনীনের হাদীসের শব্দ এ যে,

مَا مِنْ مَائِدَةٍ وُضِعَتْ فَحَضَرَ عَلَيْهَا مِنْ اسْمَهَ أَحْمَدُ أَوْ مُحَمَّدٌ إِلَّا قَدَّسَ اللَّهُ ذالك المُنْزِلَ كُلَّ يَوْمٍ مُرْتُيْنِ.

হাদীস-১০ঃ ইবনু সা'দ তাবাকাতে উসমান আমরী হতে মুরসাল সূত্রে বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ ফরমান-

مَاضَرَ أَحَدُكُمْ لَوْ كَانَ فِي بَيْتِهِ مُحَمَّدٌ وَمُحَمَّدَ إِن وَثُلُثَة 

অর্থাৎ তোমাদের কারো ঘরে কি ক্ষতি হতে পারে? যদি তার ঘরে এক মুহাম্মদ বা দু'মুহাম্মদ অথবা তিন মুহাম্মদ থাকে।

এ জন্য অধম (আলা হযরত) স্বীয় সকল পুত্র ও ভাতিজাদের আক্বীকাতে কেবল 'মুহাম্মদ' নামই রেখেছি। ঐ পবিত্র আদব রক্ষার্থে ও পরষ্পর পার্থক্য করণের জন্য আলাদা ডাক নাম স্থির করেছি। আলহামদু লিল্লাহ! ফকিরের নিকট পাঁচজন মুহাম্মদ বিদ্যমান। এ ছাড়া বাকীরা পরপারে পাড়ি জমায়েছে। আল্লাহ জীবিতদেরকে শান্তিতে রাখুক।

হাদীস-১১ঃ ত্বাবরানী ও ইবনুল জাওযী আমীরুল মুমিনীন মারতযা (কারামাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীম) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

ما اجْتَمَعَ قَوْمٌ قَطَ فِي مَشْوَرَةٍ وَفِيهِمْ رَجُلٌ اسْمُهُ مُحَمَّدٌ لَمْ يَدْخُلُوهُ فِي مَشْوَرَتِهِمْ إِلَّا لَمْ يُبَارَكْ لَهُمْ فِيهِ.

যখন কোন সম্প্রদায় কোন শলা-পরামর্শের জন্য একত্রিত হয় এবং তাদের মধ্যে কারো নাম মুহাম্মদ হয় আর তাকে নিজেদের শলা-পরামর্শে যোগ না করে, তাহলে তাদের জন্য ঐ পরামর্শে বরকত দেয়া হবে না।

হাদীস-১২ঃ ত্বাবরানী কবীরের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন

 مَنْ وَلِدَ لَهُ ثَلَثَةَ أَوْلَادٍ فَلَمْ يُسمَ أَحَدًا مِنْهُمْ مُحَمَّدٌ فَقَدْ جَهِلَ

অর্থাৎ যার তিনজন সন্তান রয়েছে এবং তাদের মধ্য থেকে কারো নাম 'মুহাম্মদ' রাখলো না, তবে অবশ্যই সে মুর্খ।

হাদীস-১৩ঃ হাকিম ও খতীবে তারীখ এবং দায়লামী মসনদের মধ্যে বর্ণনা করেন আমীরুল মুমিনীন মাওলা আলী (রা.) বলেছেন-

إذا سميتم الولد محمدًا فاكر موهُ واوْسَعُوا لَهِ فِي الْمَجْلِسِ وَلَا تَقْبَحُوالَهُ وجها.

তোমরা পুত্রের নাম মুহাম্মদ রাখলে তাকে সম্মান কর, মজলিসে তার জন্য জায়গা প্রশস্ত করে দাও এবং তার জন্য চেহারা মলিন করো না।

হাদীস-১৪ঃ বায্যার মুসনাদে হযরত আবু রাফে' (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন,

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন-

إِذَا سَمَّيْتُم مُحَمَّدًا فَلَا تَضْرِبُوهُ وَلَا تَحْرَمُوهُ

তোমরা সন্তানদের নাম মুহাম্মদ রাখলে তাকে প্রহার করো না এবং তাকে বঞ্চিতও করো না।

হাদীস-১৫ঃ ফাতাওয়ায়ে ইমাম শামসুদ্দীন সাখাবী'তে রয়েছে, আবূ শোআইব হারানী সে ইমাম আত্বা হতে বর্ণনা করেছেন-যিনি মর্যাদা সম্পন্ন তাবেয়ী, ইমামুল আয়িম্মা সায়্যিদুনা ইমামে আযম আবু হানিফা রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু'র সুযোগ্য ওস্তাদ।

مَنْ أَرَادَ أَنْ يَكُونَ حَمْلَ زَوْجَةٍ ذَكَرًا فَلْيَضَعُ يَدَهُ عَلَى بَطْنِهَا وَيَقُلْ إِنْ كَانَ ذكْرًا فَقَدْ سَمَّيْتُهُ مُحَمَّدًا فَإِنَّهُ يَكُونُ ذَكَرًا

যে ব্যক্তি চায় যে, তার স্ত্রীর গর্ভে পুত্র সন্তান হোক, তবে তার উচিত তার হাত স্ত্রীর পেটের উপর রেখে বলা ان كان ذكرًا فقد سميته محمدًا (যদি পুত্র সন্তান হয় তবে আমি তার নাম 'মুহাম্মদ' রাখব)। পরাক্রমশালী আল্লাহ চাহে তো পুত্র সন্তান হবে।

ইমাম মালেক (রাঃ) বলেছেন-,

مَا كَانَ فِي أَهْلِ الْبَيْتِ اسْمٌ مُحَمَّدٍ إِلَّا كَثُرَتْ بُركته

যে ঘর ওয়ালার মাঝে 'মুহাম্মদ' নামের কেউ থাকে ঐ ঘরে অধিক বরকত হয়।

সূত্রঃ মুনাদী ও যুরকানী।

উত্তম হল-শুধুমাত্র মুহাম্মদ বা আহমদ নাম রাখা। ইহার সাথে জান এবং অন্য কোন শব্দ না মিলানো। একক ফযীলতের কথা এসেছে সেই বরকতময় নামসমূহের ব্যাপারে। গোলাম আলী, গোলাম হোসাইন, গোলাম গাউস, গোলাম জিলানী এবং অন্যান্য যেগুলোর মধ্যে খোদ্রার প্রিয় বান্দাগণের নামের দিকে 'গোলাম' শব্দ দ্বারা সম্পর্কিত হয়, সবগুলোর বৈধতাও নিশ্চিতরূপে সুষ্পষ্ট। ফকীর (আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করুক) স্বীয় ফাতওয়ায় এ সমস্ত নামের উপর এক বিরাট ট্রফিক লিখেছি। কুরআন-হাদীস এবং খোদ ওহাবীদের নেতাদের উক্তি হতে বৈধতা প্রমাণ করেছি। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيُطُوفُ عَلَيهِمْ عِلْمًانُ لَهُمْ كَأَنَّهُمْ لُؤْلُوْ مُكُنُون 

তাদের নিকট স্বীয় গোলামগণ প্রদক্ষিণ করবে যেন তারা সংরক্ষিত মুক্তা।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন

لَا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ عَبْدِي كَلَكُمْ عَبِيدُ اللَّهِ وَلَكِنْ لِيَقُلْ غُلَامِي 

তোমরা কখনো নিজেদের অধীনস্তকে আমার বান্দা বলো না, তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা। হ্যাঁ, তবে সে যেন বলে আমার গোলাম। হযরত আবু হুরায়রার সূত্রে বর্ণনাকারী ইমাম মুসলিম।

ওহাবীদের শিরক সর্বদা এ রকমই হয় যে, স্বয়ং তা কুরআন ও হাদীসে ভরপুর থাকে। খোদা ও রাসুল পর্যন্ত, এমন কি তাদের মিত্ররাও শিরকের হুকুম হতে নিরাপদ নয়। বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর আশ্রয়! মজার ব্যাপার হল যে, غلام শব্দের সম্বন্ধ আল্লাহ জাল্লাশানুহুর দিকে করা একেবারে নিষিদ্ধ। গোলামুল্লাহ বলা যাবে না। কেননা গোলামের প্রকৃত অর্থ ছেলে। তাইতো ছোট্ট শিশুকে আদর করে আরবীতে গোলাম বলে। উর্দু ভাষায় 'ছোকরা' বলে। আল্লামা আরিফ বিল্লাহ আব্দুল গণী নাবুলুসী কুদ্দিসা সিররুহুল আযীয 'হাদীকা-ই নাদীয়া' গ্রন্থে এক হাদীসের অধীনে বলেছেন-

وَلكِنْ لِيَقُلْ غُلَامِي وَجَارِيَتِي وَفَتَائِي وَ فَتَاتِي مُرًا عَاةٌ لِجَانِبِ الْأَدبِ فِي حق الله تعالى لأنه يُقَالُ عَبْدُ اللهِ وَامَّةُ اللهِ وَلَا يُقَالُ غُلَامُ اللهِ وَجَارِيَة اللهِ وَلَا فَتَى اللَّهِ وَلَا فَتاةَ اللهِ

অর্থাৎ আল্লাহর অধিকারের প্রতি আদব রেখে গোলামী, জারিয়াতী, পাতায়ী ও পাতাতী বলো। কেননা আব্দুল্লাহ, আমাতুল্লাহ বলা যাবে। তবে গোলামুল্লাহ, জারিয়াতুল্লাহ, পাতাল্লাহ ও পাতাতুল্লাহ বলা যাবে না।

সুবহানাল্লাহ! 'গোলামুল্লাহ' বলা এত বড় আজব শিরক যা খোদ আল্লাহর জন্য বৈধ নয়। বরং তিনি ব্যতিত অন্যের জন্য নির্দিষ্ট। কিন্তু ওহাবীদের ভ্রান্ত ধর্মের মধ্যে মাহবুবানে খোদা তা'আলার নাম কিছু মান-ইজ্জতের সাথে আসলে শিরক বলে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। বাকী ওই কথা আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হওয়া দূরের কথা; আল্লাহর জন্য জায়েয হওয়ার ব্যাপারও কল্পনায় আসতে পারে না। পরিশেষে দেখ নি? তাদের মুনিব'তাকবিয়াতুল ইমান'র মধ্যে কবরে শামিয়ানা টাঙ্গানো ও মোমবাতি জ্বালানোকে শিরক বলে দিয়েছে। পরিস্কারভাবে বুঝা যায়-যা আল্লাহ তা'আলার সম্মানের জন্য খাস তা তাদের জন্যও ব্যবহার্য। যেন আল্লাহ মাবুদ তাদেরকে বলে দিয়েছেন-আমার কবরের উপর সম্মানার্থে শামিয়ানা দাও এবং আমার কবরের উপর মোমবাতি জ্বালাও। লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাহ বিল্লাহ! তা কি শুন নি? সেই গাইরে মুকাল্লিদ সম্প্রদায়ের নৃপতি-নব পেশওয়া ছিদ্দীক হাসান খাঁন কনুজী ভূপালী স্বীয় রিসালা 'কালিমাতুল হক' এ লিখেছেন-

چو غلام افتابم هم از افتاب گویم

যে আমাদের সূর্যের দাস আমরা তাকেও সূর্য বলব।

আল্লাহর শান! গোলাম মুহাম্মদ, গোলাম আলী, গোলাম হাসান, গোলাম গাউছ, মা'আযাল্লাহ! শিরক এবং হারাম। গোলাম আফতাব তথা সূর্যের গোলাম হওয়া কিভাবে দলীলবিহীন বৈধ হল? অথচ ফার্সী ভাষায় গোলাম আফতাবকে আরবীতে আবদে শামস যা মুশরিকদের নাম। সে অর্থে হিন্দি ভাষায় হিন্দুস্থানের কাফিরদের নাম রাখা হয় সুর্য দাস। ভাষা বিভিন্ন ধরনের হলেও মূলার্থ এক। লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ....! হিদায়ত আলী একইভাবে অতি স্পষ্ট-যার মধ্যে মুলগতভাবে না-জায়েয হওয়ার নাম গন্ধও নেই। আল্লাহর মাহবুবগণের নাম শুনলে ওহাবীদের গা জ্বলে। আজ পর্যন্ত তাদের পূর্বসুরীরাও এ সম্পর্কে কোন কথা বলতে পারেনি। অবশ্যই মাওলভী আবদুল হাই লক্ষ্ণৌভী তার 'মাজমুআ-ই ফাতাওয়া' প্রথম খণ্ডের ২৬৪ পৃষ্ঠায় এ নামের ব্যাপারে আপত্তি তুলেছে। প্রথমে এ নাম শুধুমাত্র উত্তম নয় বলেছিল। শেষমেশ না-জায়েয এবং গুনাহ বলেছে। অথচ এটা মারাত্নক ভুল। তার ফার্সী ভাষার বক্তব্যের নির্যাস হল -

প্রশ্নঃ কোন ব্যক্তির নাম হিদায়ত আলী ছিল। বিভিন্ন সন্দেহের কারণে এবং শিরক হওয়ার আশংকায় সে নাম পরিবর্তন করে হিদায়তুল আলী রাখা হয়। এক ব্যক্তি এর উপর আপত্তি করে বলে যে, হিদায়ত শব্দটি মুশতারিক যার মধ্যে দু'টি অর্থ রয়েছে। একটি অর্থ- পথ দেখানো আর দ্বিতীয় অর্থ- গন্তব্যস্থলে পৌঁছিয়ে দেওয়া। অনুরূপভাবে আলী শব্দটিও আলিফ লাম ছাড়া হলে কয়েকটি অর্থ প্রদান করে। আল্লাহর নাম এবং হযরত আলী রাদ্বিআল্লাহু আনহুর নামের মধ্যে মুশতারিক। আল্লাহ তা'আলার নাম প্রসংগে উত্তর প্রদানকারী বলেন-এ পদ্ধতি আমার অভিমতকে শক্তি যোগায়। কেননা যখন هَدَايَتْ এবং على শব্দ দু'টি দু'অর্থকে অন্তর্ভুক্ত করবে তখন চার ধরনের সম্ভাবনা রাখে। (এক) হল এ যে, হিদায়ত থেকে উদ্দেশ্য হবে প্রথম অর্থ তথা পথ দেখানো। আর আলী দ্বারা আল্লাহ জাল্লা শানুহু উদ্দেশ্য হবে। (দুই) হিদায়ত থেকে উদ্দেশ্য হবে দ্বিতীয় অর্থ অর্থাৎ গন্তব্যস্থলে পৌঁছায়ে দেয়া এবং আলী দ্বারা আল্লাহ জাল্লা শানহু। (তিন) হিদায়ত দ্বারা উদ্দেশ্য প্রথম অর্থ আর আলী দ্বারা হযরত আলী। (চার) হিদায়ত দ্বারা উদ্দেশ্য হবে দ্বিতীয় অর্থ আর আলী বলতে হযরত আলীকে বুঝায়। প্রথম তিন অবস্থা শরয়ী নিষিদ্ধ হওয়া থেকে মুক্ত। তবে চতুর্থ অবস্থা নিষিদ্ধতা থেকে মুক্ত নয়। পূর্বোক্ত তিনটি শিরক সম্পন্ন নামের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই শিরক হওয়া না হওয়ার সম্ভাবনাময় নাম বর্জন করা উচিত। যদি কোন ব্যক্তি বিতর্কিত নামের উপর অনুমান করতঃ আব্দুল্লাহ ও আলী নাম রাখা থেকে বাধা দেয় তাহলে তা শুদ্ধ হবে কি না?

আব্দুল হাই সাহেব উত্তর দিয়েছে-আল্লাহ তায়ালার যে 'আলী' নাম রয়েছে তার শুরুতে সম্মানার্থে আলিফ-লাম যোগ হবে। যেমন- الفضلُ ও النَّعْمَانُ ইত্যাদি। তাই আলী দ্বারা যদি হযরত আলী উদ্দেশ্য হয় তখন শুরুতে আলিফ-লাম আসবে না। এ কারণে হিদায়তুল আলী (আলিফ-লামসহ) নাম রাখা উত্তম। কারণ এরূপ রাখলে হযরত আলীর নাম হওয়া শুদ্ধ হবে না। আলিফ-লাম ছাড়া শুধু হিদায়ত আলী নাম রাখলে উভয় অংশে শিরকমূলক অর্থের সম্ভাবনার কারণে তা নিষিদ্ধ।

যে সব নামে শরীয়ত বিরোধী অর্থের সংশয় থাকে তা বর্জন করা দরকার। তাই আলেমগণ আব্দুন্নবী ইত্যাদি নাম রাখা নিষেধ করেছেন। তবে আব্দুল্লাহ ইত্যাদি রাখার মধ্যে শরীয়ত বিরোধী সংশয় নেই। তেমনিভাবে ইয়া আলী! বলে ডাক দিলে তার দ্বারা আল্লাহ পরোয়ার দিগারে আলম উদ্দেশ্য হওয়া কোন বিতর্ক নেই। লেখক- আবুল হাসানাত আব্দুল হাই।

আমি (আলা হযরত) তার অতি সূক্ষ্ণ কয়েকটি উত্তর দিচ্ছি-

প্রথমঃ এ সব কথা বার্তা মনগড়া। কিছু সংশয়ের (ايهامٌ) উপর ভিত্তি। তা সম্ভাব্যতা (إحتمال) নয়। কারণ ঈহাম ও ইহতিমালের মধ্যে আসমান-জমিন পার্থক্য আছে। ঈহাম-নিষিদ্ধ অর্থের দিকে মস্তিষ্ক অতি দ্রুত ঝুঁকে যাওয়াকে বলে। সম্ভাবনাময় কয়েকটি অর্থের উপর তা প্রযোজ্য হয় না। যেমন 'তালখীয' গ্রন্থে আছে-

الايهام أن يُطلق لفظ لَهُ مَعْنِيَانِ قَرِيبٌ وَبَعِيدَ وَيُرَادُ بِالْبَعِيدِ

ঈহাম বলা হয় এমন একটি শব্দ প্রয়োগ করা যার দু'টি অর্থ হবে-একটি নিকটবর্তী আরেকটি দূরবর্তী। উদ্দেশ্য হবে দূরবর্তী অর্থটি। আল্লামা সায়্যিদ শরীফ 'কিতাবুত তা'রীফাত'এ বলেছেন,

الايهام وَيُقَالُ لَهِ التَّحْيِيلُ أَيْضًا وَهُوَ أَنْ يُذْكَرُ لَفَظَ لَهُ مُعْنِيانِ قَرِيبٌ و غريب فَإِذَا سَمِعَه الإنسانُ سَبَقَ إلى فهمه القريبِ وَمُرَادُ المُتكلم الغريب وأكثر المتشابهات من هذا الجنس ومنه قوله تعالى وَالسَّمَاوَاتِ مَطْوِيات بيمينه 

ঈহাম বলা হয় সন্দেহকে। এমন একটি শব্দ উল্লেখ করা যার দু'টি অর্থ থাকে-একটি নিকটবর্তী অপরটি দূর্লভ। মানুষ কোন কথা শোনা মাত্র নিকটবর্তী অর্থের দিকে এগিয়ে যায়; অথচ বক্তার উদ্দেশ্য হয় দূরবর্তী অর্থটি। অধিকাংশ মুতাশাবিহাত তারই অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তায়ালার বাণী-আসমানকে তাঁর কুদরতী ডান হাতে ভাজ করে রাখা হয়েছে।

শুধু সম্ভাব্যতা বা ইহতিমাল যদি নিষিদ্ধ হতো তাহলে জগতে তা থেকে মুক্ত কোন কথাই পাওয়া যাবে না। ধরুন-যায়দ উঠেছে, বসেছে, এসেছে। আমর খেয়েছে, পান করেছে, বলেছে, শুনেছে। উত্তর দাতা প্রশ্ন দেখেছে, উত্তর লেখেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এ সব ইচ্ছাধীন কাজগুলো দু'টি অর্থের অবকাশ রাখে। একঃ যায়দ, আমর ও উত্তর দাতা নিজস্ব স্বত্ত্বাগত শক্তিতে ক্রীয়াগুলো করেছে। দুইঃ খোদায়ী শক্তিতে করেছে। প্রথমটি সরাসরি শিরক। তাহলে তো এ সব শব্দ ব্যবহার করা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। তা থেকে বিরত থাকা বাঞ্চনীয়। ওটা সর্ব সম্মতিক্রমে নিরেট বাতিল। উত্তর দাতা জীবনভর এ ধরনের সন্দেহমূলক শব্দ অহরহ ব্যবহার করেছে। তাহলে তার লেখালেখিতে এ ধরনের হাজারো শিরক বর্তাবে।

দেখুন! নামাযে وَتَعَالَى جَدَّكَ তোমরা পড়ে থাকো। جد এর যে অর্থটি সুপ্রসিদ্ধ (দাদা) তা মারাত্নক কুফরি। কি আশ্চর্যের বিষয়! সংশয় থাকা সত্ত্বেও ওটাকে হারাম বলল না। কোথায় সম্ভাবনা (ইহতিমাল) আর কোথায় সংশয় (ঈহাম)। মুর্খরা উভয়ের মাঝে পার্থক্য না বুঝে ভুল করে বসে।

দ্বিতীয়ঃ এমন সূক্ষ্মদর্শী ব্যক্তিরা শুধু হিদায়ত আলী নামের উপর কেন আপত্তি তুলে? অথচ মাওলা আলী (রা:) এর নাম আরো বেশি আপত্তিকর। পূর্বটিতে চারটি অবস্থা থেকে একটিতে মাত্র শিরক হওয়ার অবকাশ ছিল আর এখানে প্রত্যেকটিতে আপত্তি। আলী'র দু'টি অর্থ-একটি হল স্বত্ত্বাগত-যা আল্লাহর জন্য খাস, আরেকটি তুলনাগত-যা সৃষ্টির জন্য নির্ধারিত। প্রথমটি বান্দার জন্য প্রয়োগ করা অকাঠ্যভাবে শিরক। তাই হিদায়ত আলী'র চেয়ে 'আলী' নামের মধ্যে শিরকের সংশয় আরো বেশি রয়েছে। এরূপ কথাবার্তা জ্ঞানীরা তো দূরের কথা; মুর্খরাও বলবে না।

তৃতীয়ঃ এক 'আলী' নাম কি হয়েছে! যেই নাম স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মধ্যে মুশতারিক যেমন রশীদ, হামীদ, জমীল, করীম, আলীম, রহীম, হালীম ইত্যাদি নাম বান্দার উপর প্রয়োগ তেমনিভাবেই শিরকের সংশয় রাখে যেমনিভাবে হিদায়ত আলীর মধ্যে রয়েছে। অথচ খোদ আল্লাহ তা'আলাই নবীগণের কাউকে একটি নামে আবার কাউকে দু'টি নাম নিজের সুন্দর সুন্দর নামসমূহ থেকে দান করেছেন। হুযুর পুরনূর সৈয়দে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'র পবিত্র নাম মোবারক ষাট থেকে বেশি পাওয়া গেছে। যেমনিভাবে আলেমগণ মাওয়াহেব ইত্যাদি কিতাবে পৃথক পৃথকভাবে বর্ণনা করেছেন। হুযুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই নিজের পবিত্র নাম মোবারক 'হাশির' রেখেছেন। সাহাবা-ই কিরাম, তাবেঈন এবং আইম্মা-ই দ্বীনের মধ্যে অনেক আকাবেরের নাম 'মালিক' ছিল। তাদের কি সংশয় ছিল না? 'দুররে মুখতার' এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য কিতাবের মধ্যে স্পষ্টভাবে বর্ণনা আছে যে, এ ধরনের নাম রাখা জায়েয এবং বান্দার ব্যাপারে অন্য অর্থ গ্রহণ করতে হবে। ওই অর্থ নেওয়া যাবে না যা আল্লাহর শানে প্রযোজ্য। যেমন উদ্ধৃতি রয়েছে-

جاز التسمية بِعَلى وَرَشِيدِ وَ غَيْرِهِمَا مِنَ الْأَسْمَاءِ الْمُشْتَرِكَةِ وَيُرَادُ فِي حَقْنَا غَيْرُ مَا يُرَادُ فِي حَقَّ اللَّهِ تَعَالَى


কেন বলে না যে, অন্য অর্থের অবকাশের কারণে এমন নাম রাখা নাজায়েয? কেননা দ্বিতীয় অর্থের মধ্যে শিরকের সম্ভাবনা রয়েছে। লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!

চতুর্থঃ প্রশ্নকারী নিজের অজ্ঞতার কারণে শুধুমাত্র 'আবদুল্লাহ' নামের মধ্যে শিরকের প্রশ্ন তুলেছিল। উত্তর দাতা হযরত নিজের অজ্ঞতাসারে আরো কয়েকটি নাম বৃদ্ধি করে ফতোয়া দিয়েছে। নিজের নামকে শিরকের সংশয় থেকে রক্ষা করে নিয়েছে বটে; কিন্তু তার দলীলের অসারতা প্রমাণিত হল। 'আবদুল হাই' নামের মধ্যে দু'টি অংশ রয়েছে এবং উভয়টির দু'টি করে অর্থ আছে। এক হল এমন 'আবদ' যা ইলাহ বা মাবুদের বিপরীত। দ্বিতীয় অর্থ যা মুনিবের (আকা) মোকাবিল।

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-

وَأَنْكِحُو الأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ

বিয়ে করে নাও তোমাদের মধ্যে তাদেরই-যারা বিবাহ বিহীন, নিজেদের উপযুক্ত দাস এবং দাসীদেরও।

লক্ষ্য করুন! আল্লাহ তা'আলা আমাদের গোলামদেরকে আমাদের 'আবদ' বলেছেন। এমনিভাবে হাই (حى) এর দু'টি অর্থ। এক-আল্লাহর নাম, হায়াতে জাতিয়াহ আযলিয়াহ আবদিয়া'র প্রতি ইঙ্গিত বাহক। দ্বিতীয় হল আমি, তুমি, যায়দ,

আমর সকলের উপর বার্তাবে। যা تَخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمُيْتِ ইত্যাদি আয়াত দ্বারা প্রকাশ পায়। এখন যদি 'আবদ' এর দ্বারা প্রথম অর্থ এবং 'হাই' অর্থ দ্বিতীয়টা

নেওয়া হয় তাহলে অকাঠ্যভাবে কুফরী হবে। ওখানেই চার অবস্থা এবং এই এক অবস্থা শিরক হবে। কাজেই 'আবদুল হাই' নাম কিভাবে শিরকের সংশয় থেকে রক্ষা পাবে? তাহলে এটাকেও বর্জন করা আবশ্যক। প্রকৃতপক্ষে এ আলোচনা মাওলভী আবদুল হালীম সাহেবের নামের মধ্যেও জারী হয়েছে। ভেবে দেখেছো! এ তাহকীক এবং সূক্ষ্ণ বিশ্লেষণ কতটুকু পর্যন্ত পৌঁছেছে? আল্লাহ হেফাযত করুক।

এ অধমের নিকট প্রকাশ পেয়েছে যে, আলোচ্য যুক্তিভিত্তিক দলীলগুলো উত্তর দাতার কাছে জনাব প্রশ্নকারী থেকে ফয়েয পৌঁছেছে। প্রশ্নকারী উল্লেখ করেছে আর উত্তর দাতা চিন্তাভাবনা ছাড়াই গ্রহণ করে নিয়েছে। অন্যথায় তার জ্ঞান সম্ভবতঃ এমন নিকৃষ্ট দলীলের দিকে কখনো যেত না। যে বর্ণনা দ্বারা নিজেই নিজের নামও নাজায়েয হওয়া এবং তা পরিত্যাগ করা আবশ্যক হয়।

পঞ্চমঃ 'ইয়া আলী' বলে যখন আল্লাহকে ডাকা উদ্দেশ্য হয় তাহলে বিতর্ক হয় না। এখানেও পরিস্কারভাবে দ্বিতীয় অর্থের সম্ভাবনা মজুদ। নিজের ইচ্ছা না হওয়াটা ঈহাম এবং এহতেমাল থেকে কিভাবে মুক্ত হওয়া যথেষ্ট হবে? 'ওয়াহাম' বলতে ওটাকে বলে যে সংশয়পূর্ণ অর্থটি বক্তার উদ্দেশ্য নয়। তালখীস এবং তা'রেফাতের ইবারত এখনই শুনেছো। আর যদি ইচ্ছা বা নিয়্যতের উপর নির্ভর হয় তাহলে হিদায়ত আলীর নামের কি আপত্তি থাকতে পারে? ওখানে কিভাবে শিরকের অর্থ মাকছুদ হবে?

ষষ্ঠঃ (على) শব্দের প্রথমে আলিফ লাম নিলে শিরকের ধরা থেকে রক্ষা পাবে এটা কোন আন্তর্জাতিক পলিসি? (على) শব্দটি নামবাচক হলে এর উপর লাম আসে না এ কথা ভুল। صفة এর উপর লাম আবশ্যিকভাবে আসে। আর (على) শব্দটি অবশ্যই সিফাতে মুশতারিকের অন্তর্ভুক্ত। তাহলে সম্ভাবনা এখনও থেকে যাবে এবং তা বর্জন করা লাযেম হবে। সিরাজিয়া, তা-তারখানিয়াহ এবং মিনহুল গাফফার ইত্যাদি গ্রন্থে প্রকাশ্যভাবে আছে যে, الْعَلِى তথা على এর উপর আলিফ লাম যোগে নাম রাখাটাও বৈধ আছে। 'রাদ্দুল মুখতারে' আছে যে-

في التاتارخانية عن السراجية التسمية باسم يوجد في كتاب الله تعالى كالعلى والكبير والرشيد والبديع جائزة ومثله في المسخ عنها و ظاهره الجوازولو معرفا بال

তা-তারখানিয়া এবং সিরাজিয়া'র মধ্যে আছে-কিতাবুল্লাহর মধ্যে যে নাম পাওয়া যায় সে অনুযায়ী নাম রাখা যায়। যেমন আলী, কবীর, রসীদ, বদী' নাম রাখাটা জায়েয, শেষ পর্যন্ত। তার উদাহরণ মাসখ'র মধ্যে সিরাজিয়া থেকে নকল করা হয়েছে। প্রকাশ্যভাবে তার অনুমতি আছে। যদিও বা আলীফ লাম দ্বারা হয়।

সপ্তমঃ যখন আলোচনা চলছে ইহতিমাল নিয়ে তখন إِبْصَالُ إِلَى المُطْلُوبِ (গন্তব্যে পৌঁছায়ে দেয়া) ও إِرَائَةُ الطريق (রাস্তা দেখানো) এর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের দরকার নেই। কারণ ایصال এবং اراءت উভয়টা দু'অর্থ প্রদান করে-খলক ও তাসাববুব। খলক-বলতে দেখাকে সৃষ্টি করা যা আল্লাহর উপর ব্যবহার্য। তাসাববুব-মাধ্যম বা উপাদান সৃষ্টি করা। উভয়টা আল্লাহর সাথে নির্দিষ্ট। অন্যের কাছে কি এ অর্থ পাওয়া সম্ভব? নবীগণ থেকে ایصال (গন্তব্যে পৌঁছায়ে দেয়া) অর্থাৎ سببيت في الوصول পাওয়া যায়নি? বুঝা যায় হিদায়ত শব্দটি আল্লাহ ও বান্দা উভয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। হ্যাঁ! এটা বলতে পার যে, এদিকে على হল মুশতারিক। ওদিকে হিদায়ত শব্দটি খলক এবং তাসাববুব উভয়ের মধ্যে ব্যবহার হয়। এভাবে চারটি ইহতিমাল হয়েছে। এখন বিরাট সমস্যা সামনে এসেছে যে, যেমনিভাবে খলল্ক অর্থবোধক 'হিদায়ত' আল্লাহ ভিন্ন অন্যের দিকে সম্পর্কিত হওয়া সম্ভব নয়। তেমনিভাবে যে হিদায়ত তাসাবুব তথা 'মাধ্যম সৃষ্টি করা' বুঝায় তা আল্লাহ জাল্লা শানুহুর প্রতি নিসবত করা নিষেধ। অন্যথায় মা'যাল্লাহ! মূল স্রষ্টা এবং দাতা অন্যকে মানা হবে। আর আল্লাহ তা'আলা শুধুমাত্র মাধ্যম বা অসীলা নিয়ে সৃষ্টিকারী। তখন এটা শিরক থেকে আরো মারাত্নক। কেননা শিরকের মধ্যে তো সমতা রয়েছে। এখানে আল্লাহ তা'আলার উপর অগ্রগামী হওয়া আবশ্যক। 'আলী' শব্দের উপর আলিফ লাম এনে শুদ্ধ করে নিয়েছো আর এখানে পরিশুদ্ধতা কিভাবে আসবে? এখন নতুন করে একটি লাম তৈরী করে هدایت এর উপর দাখিল করে দাও যাতে সেই অর্থ খলক'র জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যাবে এবং এহতেমালে তাসাববুব উঠে গিয়ে শিরক এবং শিরক থেকে খারাপ কিছুতে উপনীত না হয়।

অষ্টমঃ শুধু 'হিদায়ত'র মত যত শব্দ ব্যাপক অর্থবোধক রয়েছে সবগুলোতে ওই বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। যেমন-এহসান, এনআম, এযলাল, একরাম, তা'লীম, এফহাম, তা'যীব, ই-লাম, আতা, মানা, এদ্বরার, নফা, কহর, কতল, নসব, 'আযল ইত্যাদি অর্থাৎ দয়া, পুরস্কার, অপমান, সম্মান, শিক্ষা, বুঝ শক্তি, ভদ্রতা-অভদ্রতা, দান, নিষেধ, ক্ষতি, লাভ, রাগ, হত্যা, বংশ, বরখাস্ত করা ইত্যাদি শব্দ মাখলুকের প্রতি সম্পর্ক করা হলে অর্থ হবে শিরকের সম্ভাবনাময়। স্রষ্টার প্রতি নিসবত করা হলে তাসাববুব অর্থের দৃষ্টিতে প্রকাশ্য কুফরী। কোথায় পালাবে! যদি বলা হয় স্রষ্টার প্রতি নিসবত করা হলে খলক অর্থ উদ্দেশ্য হবে। আমি বলব-মাখলুকের প্রতি নিসবত করা হলে তাসাববুব উদ্দেশ্য হবে। অর্থাৎ স্রষ্টা ও সৃষ্টি অনুপাতে অর্থ হবে। এ জন্য সম্মানিত আলেমগণ উপমা হিসেবে বলেছেন- أَنْبَتَ الرَّبِيعُ النقل অর্থ বসন্তকাল সবজি উৎপন্ন করেছে। সবজি উদগত হওয়া বষন্ত কালের আগমন বার্তা বয়ে আনে।

নবমঃ আপনি জানেন, আল্লাহ তা'আলাকে هو المصوب নামে জাওয়াব দাতারা বলে থাকে। এটা কখনো ভ্রষ্ট সম্ভাবনা থেকে খালী নয়। تصویب যেমনিভাবে সঠিক উত্তর দাতাকে বলা হয়। অনুরূপভাবে মাথা নত করাকে। উদাহরণ স্বরূপ যে ব্যক্তি মাথা নত করে বসে আছে তাকে মুসাব্বির (مُصَوْبُ) বলা হয়। উভয় অর্থই হাকিকী। তাহলে আপনার কথার উপর ভিত্তি করে এ শব্দের মধ্যেও সংশয় থাকে। আর আল্লাহর জন্য দেহ সাব্যস্ত করা বুঝায় যা মারাত্নক কুফরী।

দশমঃ যদি মাওলা আলী কাররামাল্লাহু তা'আলা ওয়াজহাহু'র প্রতি হিদায়তের সম্পর্ক করলে বিষয়টি সন্দেহমূলক হয়ে যায় যা বর্জনীয়। তাহলে ইচ্ছাকৃতভাবে এ হিদায়তের সম্পর্ক আল্লাহর দিকে করলে কেন কঠোরভাবে নিষেধ হবে না। এখানে মাওলা আলীকে হাদী তথা পথ প্রদর্শক বলা হারাম হয়ে গেল। অথচ এটা প্রকাশ্যভাবে হাদীস ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইমামগণের ঐক্যমতের ভিত্তিতে খেলাপ। সম্ভবত এ ওযর ছিল যে, 'হিদায়ত' শব্দ খল্ক এর অর্থবোধক হওয়ার কারণে সন্দেহমূলক হওয়াতে নিষেধ ছিল। এ অর্থের উপর ইচ্ছাকৃতভাবে সম্বন্ধ করা অবশ্যই হারাম বরং খুবই পথ ভ্রষ্টতা। কিন্তু এটা ওই মামুলী ওযর যার প্রত্যুত্তর অতিবাহিত হয়েছে। যখন ইচ্ছাকৃতভাবে খোদ মাওলা আলীর প্রতিই সম্বন্ধ করাটা উদ্দেশ্য হয় তাহলে ওই ব্যাপক অর্থের সম্ভাবনা দূর হয়ে সন্দেহমুক্ত হবে। এগারতমঃ নাকি আমীরুল মুমিনীন আলী রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আনহু সহ সকল সম্মানিত নবীগণ, সম্মানিত রাসূলগণ এবং খোদ হুযুর পুরনূর সৈয়দে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম সহ কারো দিকে হিদায়তের সম্বন্ধ একেবারে বৈধ রইল না। দ্বিতীয় অর্থ শিরকের দিকে ধাবিত হওয়ার সম্ভাবনায় এখন তো মুস্তফা সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও হাদী তথা প্রদর্শক বলা তো হারাম হয়ে গেল। আর এটা কুরআনে আযীম, সহীহ হাদীসসমূহ এবং ইজমা-ই উম্মাতের বরং দ্বীনের প্রয়োজনীয় কর্মকান্ডের খেলাপ হল।

বারতমঃ খোদ উত্তর দাতা স্বীয় ফাওয়ার ৩য় খন্ড ৮৬ পৃষ্ঠার মধ্যে এক প্রশ্নের উত্তরে লিখেছেন-

সাওয়ালঃ আবদুন নবী অথবা অনুরূপ নাম রাখা জায়েয আছে কি না?

জবাবঃ যদি বিশ্বাস রেখে কারো নাম আবদুন নবী রাখে যে, সে নবীর বান্দা তাহলে আইনি শিরক। যদি আবদুন্নবী অর্থ গোলাম (মামলুক) নেওয়া হয় তা বাস্তবতার খেলাপ। যদি রূপকভাবে 'আবদ' অর্থ অনুগত নেওয়া হয় তাহলে কোন ক্ষতি নেই। তবে উত্তমতার বিপরীত।

رواه مسلم عن ابي هريرة رضي الله تعالى عنه أَنْ رَسُولُ الله صلى الله تعالى عليه وسلم قَالَ لَا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ عَبْدِي وَأُمَّتِي كُلُّكُمْ عِبَادُ اللَّهِ كُلَّ نِسَاءِ كُمْ إِمَاءُ اللهِ وَلَكِنْ لِيَقُلْ غُلَامِي وَجَارِيَتِي وَفَتَائِي وَفَتَاتِي انتهى

অর্থাৎ ইমাম মুসলিম হযরত অবু হুরাইরা রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন-নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা কখনও নিজেদের মধ্য হতে কাউকে আমার বান্দা, আমার বান্দী বলিও না। তোমাদের সকলেই আল্লাহর বান্দা। প্রত্যেক নারীগণ আল্লাহর বান্দী। যেন বলে- আমার গোলাম, আমার দাসী, আমার চাকর, আমার চাকরানী। এভাবে শেষ পর্যন্ত। আমি বলব- এ জাওয়াব আরোও বিপদজনক। প্রথমতঃ আবদ এবং বান্দা এর মধ্যে শব্দগত পার্থক্য ছাড়া আর কোন পার্থক্য নেই। একটা অপরটার সম্পূর্ণ তরজমা। আবদ এবং বান্দা শব্দ একটা আরবী আরেকটি আজমী। উভয় ইলাহ, খোদা, মাওলা, আকা'র মুকাবেলায় বলা হয়। তাহলে বান্দা অর্থবোধক আবদকে মতলকভাবে আইনি শিরক বলা এ রূপই হয়েছে যে, কেউ বলে- আইন )عین( অর্থ চক্ষু বললে ভুল হবে। আর চশমা (ফার্সী ভাষা, বাঙ্গালায় চক্ষু) উদ্দেশ্য হয় তাহলে শুদ্ধ হবে।

হযরত শেখ সা'দী মাসনবী শরীফে হাদীস বর্ণনা করেছেন, হযরত বেলাল রাদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- যখন আবু বকর ছিদ্দীক রাদ্বিআল্লাহু আনহু হযরত বেলাল রাদ্বিআল্লাহু আনহুকে ক্রয় করে নিলেন এবং দরবারে রিসালতের সামনে উপস্থিত করলে হুযুর আকদস সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন- তুমি তো আমাকে শরীক করলে না। সাথে সাথে ছিদ্দীকে আকবর রাদ্বিআল্লাহু আনহু আরজ করলেন-

گفت ماد و بندگان کوئے تو کردمش آزاد ہم بر روئے تو

তিনি আরো বলেন আমরা দু'জন আপনারই গোলাম, আপনার নূরানী চেহারার সৌজন্যে তাঁকে মুক্ত করেছি। पूजा पाয়র গোলাম, আপনার নূরানা চেহারার

নিঃসন্দেহে বলা যায়-'আবদ'র যে অর্থ 'বান্দা'র অর্থ তা-ই।

দ্বিতীয়তঃ আবদ অর্থ বান্দা ও মালিনাধীন (মামলুক) এর মধ্যে এ পার্থক্য যে, প্রথমটা শিরক, দ্বিতীয়টা বাস্তবতার খেলাপ-এ উদ্দেশ্য ভিত্তিহীন এবং ভ্রান্ত। মামলুকের মধ্যেও জাতী হাকিকী (প্রকৃত মালিকানা) এবং 'আতায়ী মাজাযী (রূপক মালিকানা) উভয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রথমটার মধ্যে অকাট্যভাবে শিরক অর্জিত যা খোদার মোকাবিল, দ্বিতীয়টির মধ্যে অবশ্যই শিরক দূরীভূত।

তৃতীয়তঃ আপনি তো 'আবদ' এর অর্থ মামলুক নেয়াকে বাস্তবতার খেলাপ ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে শিরক থেকে রক্ষা পেতে গিয়ে গুনাহয় লিপ্ত হয়েছেন। কিন্তু ধর্মীয় ইমামগণ, নির্ভরযোগ্য ওলীগণ এবং বিশিষ্ট আলেমগণ এ বিশ্বাস রাখাকে পরিপূর্ণ ঈমান মনে করেন। এর থেকে অমনোযোগী ব্যক্তিদেরকে মনে করেন ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করা থেকে বঞ্চিত।

হযরত ইমামে আজল আরিফ বিল্লাহ সৈয়দী সাহল ইবনে আবদুল্লাহ তাসতরী রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আনহু, ইমামে আজল কাজী আয়ায শেফা শরীফে, ইমাম আহমদ কুসতুলানী মাওয়াহেবে লুদুনীয়া শরীফে তা নকল করেছেন। আল্লামা শিহাব উদ্দীন হাফফাজী মিছরী নাসীমুর রিয়াজে, আল্লামা মুহাম্মদ বিন আবদুল বাকী যুরকানী শরহে মাওযাহেবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বর্ণনা করেছেন-

مَنْ لَمْ يَرُولَايَةُ الرَّسُولِ عَلَيْهِ فِي جَمِيعِ أَحْوَالِهِ وَلَمْ يُرْنَفُسُهُ فِي مِلْكِهِ لَا يَذُوقُ حَلَاوَةَ سَنَتِه

যে ব্যক্তি সর্বাবস্থায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজের অভিভাবক এবং নিজেই নিজকে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'র গোলাম মনে করবে না সে নবী করীম সাল্লল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসল্লাম'র সুন্নাতের স্বাদ পাবে না।

চতুর্থতঃ মাওলানা আবদুল আযীয সাহেব 'তুহফাতু ইছনা আশারা'র মধ্যে নকল করেছেন, আল্লাহ তা'আলা পবিত্র যবুর শরীফে ইরশাদ করেন-

يَا أَحْمَدُ فَاضَتْ الرَّحْمَةُ عَلَى شَفَتَيْكَ مِنْ أَجْلِ ذَالِكَ أُبَارِكْ عَلَيْكَ فَتَقَلَّد السَّيْفَ فَإِن بَهَائِكَ وَ حَمْدُكَ الغَالِبُ ( الى قوله الأمم يخيرون تحتك كتاب حَقَّ جَاءَ اللَّهُ بِهِ مِنَ الْيُمْنِ وَالتَّقْدِيسِ مِنْ جَبَلٍ فَأَرَانَ أَوْ إِمْتَلَاتِ الْأَرْضُ مِنْ تَحْمِيدِ أَحْمَدَ وَتَقْدِيسِهِ وَ مِلْكِ الْأَرْضِ وَرِقَابِ الأُمم

অর্থাৎ হে আহমদ! আপনার ঠোঁটে রহমতের জুশ মেরেছে। এ জন্য আপনাকে বরকত প্রদান করছি। আপনি স্বীয় তলোয়ার বহন করেছেন। আপনার ছমক-দমক এবং আপনার তা'রীফই জয়ী হল। সকল উম্মতগণ আপনার কদম মোবারকে ঝুঁকে গিয়েছে। সত্য কিতাব দিয়েছেন আল্লাহ তা'আলা বরকত এবং পবিত্রতার সাথে যে কারণে মক্কার পাহাড় পর্যন্ত পরিপূর্ণ হয়ে গেল। যমীন আহমদের প্রশংসা এবং তার পবিত্রতা বর্ণনা করছে। আহমদ মালিক হয়েছেন সমস্ত যমীন, সকল উম্মত ও দ্বীনের। পবিত্র যবুর কিতাবের রেফারেন্সকেও মা'যাল্লাহ! বাস্তবতার খেলাপ বলা যাবে কি?

পঞ্চমতঃ ইমাম আহমদ 'মসনদ' এর মধ্যে আবু মাশআরিল বরা'র সূত্রে বর্ণনা করেছেন। সাদকা ইবনে তাইসালা, তিনি হযরত মাআন ইবনে সা'লবা মাযনী, তিনি আ'শা আল মাযনী রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে কাহমস সূত্রে, ইমাম জাফর তাহাবী শরহে মা'আনিল আছার'র মধ্যে আবূ মাশআর'র সূত্রে, আর ইবনে খাসাইমা এবং ইবনে শাহীন ওই সূত্রে এবং বাগবী, ইবনে সুকন, ইবনে ও আবু আসিম জুনাইদ ইবনে আমীন ইবনে যরুরাহ ইবনে নদলাহ ইবনে ত্বরীফ ইবনে বহসল আল হেরমাযীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। নদলাহ হযরত আ'শা রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন-বর্ণনাকারী বলেন যে, হুযুর পুরনূর সৈয়দে আলম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম'র দরবারে স্বীয় আত্মীয়দের পক্ষ থেকে একটি আরজ নিয়ে উপস্থিত হলেন। স্বীয় আরজি কবিতাকারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শুনাইলেন। যার প্রারম্ভিকা নিম্নের শ্লোকের মাধ্যমে হয়েছিল-যাতে নবীজিকে সব কিছুর মালিক বলে সম্বোধন করা হয়েছে।

يَا مَالِكَ النَّاسِ وَدَيَانَ الْعَرَبِ

হে সমস্ত মানুষের মালিক এবং আরবের প্রতিদান প্রদানকারী। হুযুর আকদাস সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের ফরিয়াদ শ্রবণ করে যথাযথ সমাধান করে দিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক ব্যক্তির মালিক বলা তার ধারণার মধ্যে মা'যাল্লাহ মিথ্যা ছিল। এখানে সমস্ত উম্মতের মালিক বলা, সকল মানুষের মালিক বলে হুযুর সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করায় অনেক মিথ্যা একত্রিত হয়েছে। অথচ এ হাদীস বাস্তবে স্বাক্ষী প্রদান করছে যে, সাহাবীগণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লমাকে সমস্ত মানুষের মালিক বলতেন। আর হুযুর আকদাস সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এ উক্তি সাগ্রহে গ্রহণ করেছেন।

ষষ্ঠতঃ পবিত্র ধারণায় মালিক এবং মামলুকের এ অর্থই ছিল যে, যায়দ নামক ব্যক্তি আমরকে কিছু টাকা এবং চাঁদীর কিছু টুকরা দিয়েছে। তুই হতভাগা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মালিকত্বকে বিপরীতভাবে রূপ দিয়েছো। অথচ তোমার এ ধারণা প্রসূত মালিকত্ব অসম্ভব-অবান্তর। সে কথায় প্রাণ সঞ্চার দূরের কথা; রূপসজ্জাও হয় না। সত্যি পরিপূর্ণ মালিকানা সেটাই যা দেহ মন সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে এবং মানব দানব সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে। হুযুর ব্যতিত কারো নিজের প্রাণেরও মূলগতভাবে কোন এখতিয়ার না থাকা। এটাই পূর্ণ, যথাযথ, বাস্তব ও সত্যিকারের মালিকানা। হুযুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মালিকানা হযরত কিবরিয়া আযযা ও আল্লা শানুহু ব্যতিত সমস্ত জাহানে হাসিল রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-

النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهُم

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল ঈমানদারের অত্যধিক শক্তিশালী মালিক এবং মুখতার তাদের প্রাণ অপেক্ষাও। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخَيْرَةُ

مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهُ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا

না কোন মুসলমান পুরুষ, না কোন মুসলমান নারীর জন্য শোভা পায় যে, যখন আল্লাহ ও রাসূল কোন নির্দেশ দেন তখন তাদের স্বীয় ব্যাপারে কোন এখতিয়ার থাকবে! এবং যে কেউ নির্দেশ অমান্য করে-আল্লাহ ও রাসূলের, সে নিশ্চয় সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে পথভ্রষ্ট হয়েছে। (কানযুল ঈমান বঙ্গানুবাদ)

নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

أَنَا أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِم

আমি ঈমানদারের প্রাণের চেয়েও অধিক শক্তিশালী মালিক। সূত্রঃ আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে ইমাম বুখারী, মুসলিম, নাসাঈ ও ইবনে মাজা।

যদি মালিকানার এ অর্থ উত্তর দাতার ধারণার মধ্যে থাকত তাহলে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মালিকত্বকে বাস্তবতার খেলাপ জানত না। নিজেই নিজের প্রাণ এবং সমস্ত জাহানকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মালিকানাধীন মানতো। এর চেয়ে বেশি মর্তবাবান মনে করতো-যাকে বুঝতে অন্তরের কান এবং অন্তর চক্ষুর প্রয়োজন।

وَمَا أُوتِيتُمْ مِنَ العِلمِ إِلَّا قَلِيلًا وَفَوْقَ كُلَّ ذِي عِلْمٍ عَلِيْمٌ وَمَا يُلْقُهَا إِلَّا الَّذِيْنَ صَبَرُوا وَمَا يَلْقَهَا إِلَّا دَوْ حَظٍّ عَظِيمٍ.

তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞান দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক জ্ঞানবানের উপর মহাজ্ঞানী আল্লাহ রয়েছেন। তা সে সকল ব্যক্তির ভাগ্যে ঘটে-যারা ধৈয্যশীল আর সে ব্যক্তির ভাগ্যে জোটে যে মহা ভাগ্যবান।

সপ্তমতঃ সহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসখানা এখানে অপপ্রয়োগ হয়েছে। উক্ত হাদীসের মধ্যে বিনয়ী ও অহংকার বর্জনের শিক্ষা রয়েছে। আমাদেরকে বলা হচ্ছে যে, নিজেদের গোলামদেরকে 'আবদ' বলিও না। এটা নয় যে, গোলামকে নিজের মুনিবের আবদ এবং অন্যান্যদের আবদ বলিও না। কোরআন আমাদের গোলামদেরকে আমাদের 'আবদ' বলে দিয়েছে। কিছু পূর্বে আয়াত অতিবাহিত হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

لَيْسَ عَلَى الْمُسْلِمِ فِي عَبْدِهِ وَلَا فَرْسِهِ صَدَقَةٌ

মুসলমানকে নিজেদের গোলাম এবং ঘোড়ার যাকাত দিতে হয় না। ফকীহগণের সাধারণ পরিভাষা এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্য যে, (اعْتَقَ عَبْدَهُ برَ عَبْدَه) গোলাম আযাদই তার প্রতি সদাচরণ। এখানে 'আবদ' শব্দের প্রয়োগ হয়েছে।

উত্তর দাতা মাওলভী নিজেই নিজের রিসালা 'নাফউল মুফতী' এর মধ্যে জুমার মাসআলা বর্ণনা প্রসংগে বলেছেন- إِذَا أَذِنَ الْمُوْلَى عَبْدَهُ لَهَا يُتَخَيْرُ মুনিব স্বীয় গোলামকে অনুমতি দিলে তার এখতিয়ার থাকবে। ওখানে আরো আছে- وَلِلْمُوْلَى منع عبده মাওলার জন্য তার আবদকে নিষেধ করার অধিকার রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হল-যায়দ, আমর বরং কোন কাফির মুশরিকের গোলামদেরকে তাদের আবদ বলতে দ্বিধাবোধ করে না আর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোলামদেরকে 'আবদ' বলার ব্যাপারে যত সব আপত্তি! শুন, তুমিই ভুলের মধ্যে আছ। ইমাম আবু হুযাইফা ইসহাক ইবনে বশীর ফতুহুশ শাম এবং হাসন ইবনে বিশরান স্বীয় 'ফাওয়ায়িদ'র মধ্যে ইবনে শিহাব যুহরী প্রমুখ আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর ফারুকে আযম রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আনহু মিম্বরে দাঁড়িয়ে এক খুতবায় ইরশাদ করেন-

قَدْ كُنْتُ مَعَ رَسُولِ اللهِ صلى الله تعالى عليه وسلم فَكُنْتُ عَبْدَهُ وَخَادِمُه

আমি হুযুর পুরনূর সৈয়্যেদে আলম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত ছিলাম। অতঃপর আমি হুযুরের গোলাম এবং হুযুরের খাদেম ছিলাম। অনুরূপভাবে ইবনে বিশরান আমালী, আবু আহমদ দাহকান, ইবনে আসাকের তারিখে দামেশক এবং লালিকায়ী কিতাবুস সুন্নাহ'র মধ্যে শ্রেষ্ঠ তাবেঈন সৈয়্যিদুনা সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিব ইবনে হাযন রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আনহুম থেকে বর্ণিত, হযরত ওমর ফারুকে আযম রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আনহু যখন খলিফা হলেন তখন হুযুর সৈয়্যদে আলম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবা দিলেন-

أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي قَدْ عَلِمْتُ أَنَّكُمْ كُنتُمْ تُؤْنِسُوْنَ مِنِّي شَدَّةً وَ غَلْظَةً وَذَا لِكَ إِنِّي كُنْتُ مَعَ رَسُولِ الله (ﷺ)  كُنْتُ عَبْدَهُ وَخَادِمة

'হে লোক সকল! নিশ্চয় আমি জানি তোমরা আমার মধ্যে কঠোরতা এবং ভুল ভ্রান্তি পাবে। এটার কারণ হল যে, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম আর আমি হুযুর সাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবদ এবং খেদমতগার ছিলাম।' এখন প্রকাশ পেল যে, মুসলিম শরীফের হাদীসের সাথে এ মহলের মোটেই সম্পর্ক নেই। ওহাবীরা! শুনে রাখ যে, এ উত্তম হাদীসের মধ্যে আমিরুল মুমিনীন হযরত ফারুকে আযম রাদ্বিআল্লাহু আনহু নিজেই নিজকে আবদুন্নবী, আবদুর রাসূল ও আবদুল মুস্তফা বলেছেন। সাহাবীদের এক দলের সামনে মিম্বরে দাঁড়িয়ে এ কথা বললে সকলেই তা শুনে কবুল করে নিলেন। জনাব হযরত শাহ ওলীউল্লাহ সাহেব দেহলভীও 'ইযালাতুল খিফা'এর মধ্যে হযরত আবু হুযায়ফার উদ্ধৃতি দিয়ে এবং আর রিয়াদুন নাদিরা ফী মানাকিবিল আশারা ( الرياض النضرة في مناقب العَشْرَةِ ) এর মধ্যে সনদ সহকারে উল্লেখ করেছেন। আমীরুল মুমিনীনকে যেভাবে মাআযাল্লাহ! তারাবীহ চালু করাতে গুমরাহী বিদআতী লিখার দুঃসাহস দেখায়েছে। এখানে নাউযু বিল্লাহ! মুশরিক বলে দিবে। তাদের মূলনীতি নেই। লা-মাযহাবের উপর তাদের ভিত্তি। কিন্তু বন্ধুগণ! বুঝার চেষ্টা করুন, শাহ ওয়ালী উল্লাহ সাহেবের হাতও ওই পাথরের নীচে। 

یوں نظر دوڑے نہ برچھی نان کر اپنا بیگانہ ذرا پہچان کر

এমনিতেই এলোপাতাড়ি শেল মেরো না। অপরিচিতকেও একটু চিনে নাও। লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাহ বিল্লাহ। শেষ! আলোচনা অনেক দূরে চলে গেল। عبد এবং جده এর পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণমূলক আহকাম আমার কিতাব مجير معظم شرح اکسیر اعظم এর মধ্যে আলোচনা পাওয়া যাবে। সেখান থেকে দেখার পরামর্শ রইল। এখানে এ গুজারিশ করছি যে, উত্তর দাতা মাওলভী সাহেবের ওই ফাতওয়া সব সন্দেহের অবসান করে দিয়েছে। আবদুন্ নবীর ক্ষেত্রে জনাবের নিকট তিনটি এহতেমাল ছিল। এক শিরক, দুই মিথ্যা, তিন সহীহ। তাহলে না-জায়েয এহতেমাল জায়েযে ভাসিয়ে গেছে। শুধুমাত্র এর হুকুম খেলাপে আউলা বলেছে-যা নিষেধ এবং মাকরূহে তাহরিমী হওয়া দূরের কথা; মাকরূহে তানযিহীও হবে না। যে কোন মুস্তাহাব ত্যাগ করাকে খেলাপে আউলা বলা যায়। কিন্তু ঢালাওভাবে মাকরূহে তানযিহী নয়। সে মতের সমর্থনে রাদ্দুল মুখতারের মধ্যে বাহরুর রায়িক'র হতে বিবৃত-

لا يَلْزَم مَنْ تَرَكَ الْمُسْتَحَب ثبوت الكَرَاهَةِ إِذْ لَا بُدَّلَهَا مِنْ دليل خاص

ওখানে তাহরীরুল উসূল থেকে বর্ণনা করা হয়েছে-

خلافُ أَوْلى مَا لَيْسَ فِيهِ صِيغَةُ نهى كترك صلوةِ الضُّحَى بِخِلَافِ الْمُكْرُوهِ تنزيها.

অতঃপর হিদায়ত আলী'র মধ্যে চারটি এহতেমাল থেকে শুধুমাত্র একটি এহতেমাল হল বাতিল অর্থাৎ জায়েয এহতেমালসমূহ না-জায়েযের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। এটা কিভাবে খেলাপে আউলা হওয়ার কারণে মাকরূহে তানযিহী বর্জনযোগ্য হয়ে গেল? হিসেব মতে তা খেলাপে আওলা দূরের থাক; এর অর্ধেকও হবে না। বরং শুধুমাত্র আট ভাগের তিন ভাগ মুবাহ অর্থাৎ উভয় দিক সমান। বেশিতবেশি খিলাপে আওলা বলা যাবে। তাহলে হিদায়ত আলী'র মধ্যে উত্তমতার বিপরীত পাওয়া যাবে শুধুমাত্র এক ও আধা পোয়া। কারণ তিন ভাগের দুই ভাগ এক সমান চার ভাগের এক (৩/২÷১=৪/১) ফলাফল অশুদ্ধ। চার ভাগের এক ভাগ তিন ভাগের দুই সমান আট ভাগের তিন (৪/১÷৩/২=৮/৩) সঠিক।

এ হিসেব তো গবেষকদের দৃষ্টিকোণে ছিল। সত্য হল যে, হিদায়ত আলী'র মধ্যে কোন কারণ এমনকি মাকরূহে তানযিহীও নেই। পরিহার করার কথাই আসে না। বাস্তবে প্রত্যেক স্বল্পজ্ঞানী লোকও তা বুঝতে পারবে যে, আবদুন্ নবী থেকে হিদায়ত আলীর মধ্যে কি সম্পর্ক রয়েছে। যখন ওটা শুধুমাত্র খেলাপে আওলা। তাহলে এটাকে খেলাপে আওলা বলাও অযুক্তিক। এখানে কথা অনেক বেশি। যতটুকু উল্লেখ করা হল সত্য সন্ধানীর জন্য যথেষ্ট। আল্লাহই সঠিক বলেন এবং সতপথ দেখান। আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা-২২ঃ শীত এবং গরমের মৌসুমে কখন সুর্য ঢলে পড়ে? যদি শীতের মৌসুমে সূর্য ১২টার পূর্বে হেলে পড়ে। আর ১২ টার পূর্বে কোন ব্যক্তি যোহরের নামায পড়লে তার নামায হবে কি না?

৬ মুহাররামুল হারাম ১৩২৭ হিজরী।

ওলামা-ই দ্বীন এবং শরীয়তের গ্রহণযোগ্য মুফতীগণ এ মাসআলার ব্যাপারে অভিমত কি যে, শীত এবং গরমের মৌসুমে কখন সুর্য ঢলে পড়ে? যদি শীতের মৌসুমে সূর্য ১২টার পূর্বে হেলে পড়ে। আর ১২ টার পূর্বে কোন ব্যক্তি যোহরের নামায পড়লে তার নামায হবে কি না? দলীল সহকারে জাওয়াব দিন।

জাওয়াবঃ সৌর ঘড়িতে সূর্য ঢলে পড়ে সর্বদা ১২টা বাজে। কখনো পূর্বে ও পরে হয় না। কিন্তু ঘড়ি অনুপাতে শহরের সময় শুধুমাত্র চারদিন পরিবর্তন হয়। তা হল এপ্রিলের ১৬ তারিখ, জুনের ১৫ তারিখ, সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ এবং ডিসেম্বরের ২৫ তারিখ। এ ছাড়া কোন দিন ঠিক ১২টার সময় সূর্য হেলে যায় না। ঘড়িগুলোর গতি প্রতিদিন এক সমান হয়ে থাকে। আর সূর্যের গতি কখনও এক সমান হয় না। সর্বোচ্চ ৪ জুলাই থেকে সর্বনিম্ন ৩ জানুয়ারী পর্যন্ত তেজালো হতে থাকে। প্রত্যেক দিন প্রথম দিন থেকে বৃত্তের পরিধি অতিক্রম করতে থাকে। এ অতিক্রম প্রতিদিন এক সমান হয় না। বরং দিনের পর দিন তা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত সর্বনিম্মে পৌঁছে যায়। সর্বনিম্ন ৪ জানুয়ারী থেকে সর্বোচ্চ ৩ জুলাই পর্যন্ত ধীর গতিতে চলতে থাকে। প্রত্যেকদিন প্রথম দিন থেকে শ্লথ গতিতে অতিক্রম করে থাকে। প্রতিদিন ওই কমতি এক সমান হয় না। বরং দিনের পর দিন কম থেকে কমই হয়ে থাকে। এমনকি সর্বোচ্চে পৌঁছে একেবারে স্থীর হয়ে যায়। সেখান থেকে গতির সূচনা লক্ষ্য করা যায়। এ বেশকমের কারণে হিন্দুস্থানের মধ্যে সাধারণভাবে রেলওয়ের টাইম প্রচলিত। এটাও সর্বত্র এক বরাবর অবশিষ্ঠ থাকে না; বরং পূর্বপ্রান্তে দ্রাঘিমাংশের তারতম্যের কারণে তা কমে যায়। পশ্চিম প্রান্তে দ্রাঘিমাংশ অনুপাতে সে পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। যেমন বেরিলির জন্য যদি নির্দিষ্ট শহরের সময় প্রদান করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে তা সেখানকার অঞ্চলের জন্য বরাবর হবে। যার মধ্যে হাত ঘড়ি এবং সৌর ঘড়ি উভয়টাতে সূর্য ঢলে পড়াটা ঠিক ১২টায় হয়ে থাকে। যদি রেলওয়ের পক্ষ থেকে সময় দেওয়া হয় তাহলে দূরত্বের তারতম্য অনুপাতে প্রতি দ্রাঘিমাংশে ১২ সেকেন্ড এবং ১২ মিনিট বৃদ্ধি পাবে। কাজেই যে চারদিন উভয় সময়ের গতি ঠিক ১২টায় ছিল তা ১২টা, ১২ সেকেন্ড, ১২ মিনিট হবে। এভাবে অনুমান কর। সাধারণ উপকারের জন্য প্রকৃত দ্বিপ্রহর ও যোহর ওয়াক্ত আরম্ভের একটি পঞ্জিকা তৈরী করেছি। (হিন্দুস্থানের সময় অনুপাতে সে পঞ্জিকাটি প্রণীত বিধায় বাংলাদেশের জন্য তা প্রযোজ্য নয়-অনুবাদক)

কম-বেশি করে রামপুর এবং অন্যান্য শহরের জন্যও এ নকশা অনুযায়ী হিসাব করা যায়। নকশাটি যোহরের প্রাথমিক সময় জানার এক উত্তম যন্ত্র। যোহরের নামাযের জন্য ঘড়ির ১২টা বাজার কোন ধর্তব্য নেই। যদি দিনের অর্ধভাগের পর যোহরের নামায পড়া হয় তাহলে নামায হয়ে যাবে। আর আগে পড়লে নামায হবে না। ২৮শে নভেম্বর বেরেলীর মধ্যে রেলওয়ের সময় অনুপাতে দিনের ১২টার সময় হল দ্বিপ্রহরের সময়। তারপর থেকে ঘাটতি হয়ে ১ ফেব্রুয়ারী থেকে ১২ টা ২৬ মিনিটে দ্বিপ্রহর আরম্ভ হয়। অবশেষে ৮ মে থেকে ১২টা ৮ মিনিটে হয়ে থাকে। তারপর থেকে দিন বাড়তে শুরু করে। এমনকি ১৫ জুলাই থেকে ১২টা ১৮ মিনিটে হয়ে থাকে। তারপর ঘাটতি হয়ে ৭ ই অক্টোবর ঠিক ১২টায় দ্বিপ্রহর হয়। কমতে কমতে ১২টার পূর্বে সময় হয়ে যায়। এমনকি ২৪ অক্টোবর কমানোর শেষ সীমা ১১ টা ৫৬ মিনিট পর্যন্ত পৌছে। এরপর আবার সময় বাড়তে শুরু করে। তারপর ২৮ নভেম্বর ঠিক ১২টা বাজে সূর্য ঢলে পড়ে। অতঃপর ৭ অক্টোবর থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত ঠিক ১২টার সময় অথবা সামান্য পূর্বে; কিন্তু অর্ধ দিনের পর যে ব্যক্তি নামায পড়ে নেয় তার নামায হয়ে যাবে। হ্যাঁ! যে ব্যক্তি সময়ের পূর্বে পড়ে তার নামায হবে না।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-২৩ঃ ঈমানের সংজ্ঞা কি এবং ঈমান কামেল কেমন করে হয়?

১১ ই জমাদিউল উলা ১৩৩৭ হিজরী।

ওলামা-ই দ্বীন! ঈমানের সংজ্ঞা কি এবং ঈমান কামেল কেমন করে হয়?

জাওয়াবঃ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রত্যেক

কথায় সত্য জানা এবং হুযুর সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের সততাকে অন্তর থেকে মেনে নেওয়ার নামই ঈমান। যে ব্যক্তি এটার স্বীকৃতি দেবে তাকে মুসলমান বলতে পারবে যতক্ষণ পর্যন্ত তার কোন কথায় কাজে কোন অবস্থায় আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের অস্বীকার অথবা মিথ্যাচরণ অথবা ধিক্কার পাওয়া না যায়। তার অন্তরে আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পর্ক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এবং আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়ভাজনদের সাথে মুহাব্বত রাখে যদিও বা নিজের দুশমন হয়। আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের শত্রুদের সাথে শত্রুতা রাখে যদিও বা নিজের কলিজার টুকরা হয়।

যা কিছু দেবে আল্লাহ তা'আলার খাতিরে দেবে, যা কিছু রুখবে তাও আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্যে। তাহলে তার ঈমান কামেল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ইরশাদ করেন-

مَنْ أَحَبَ لِلهِ وَأَبْغَضَ لِلَّهِ وَأَعْطَى لِلَّهِ وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدْ اسْتَكْمَلَ الْإِيْمَانَ

যে ব্যক্তি মুহাব্বত, ঘৃনা, কিছু দেওয়া ও বাঁধা দেওয়া সব কিছু আল্লাহর ওয়াস্তে করে বাস্তবিকই সে ঈমানকে পরিপূর্ণতা দান করলো। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-২৪ঃ সাহাবীদের ব্যাপারে

জমাদিউল উলা ১৩৩৭ হিজরী।

ওলামা-ই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআতের প্রতি গুজারিশ যে, আজ কাল অধিকাংশ সুন্নী দল বাতিলের সংস্পর্শে গিয়ে কিছু কিছু মাসআলাতে বদ-আকীদাধারী হয়ে গেছে। যদিও বা হুযুরের তাসনীফসমূহে প্রত্যেক প্রকারের মাসআলাসমূহ মজুদ আছে। কিন্তু অধম প্রশ্নকারীর দৃষ্টিতে এ মাসআলা কখনো চোখে পড়ে নি। এ কারণে তা অত্যন্ত প্রয়োজন। মাসআলা হল-আমীরে মোয়াবিয়া রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আনহু সম্পর্কে যায়দ বলছে-তিনি লোভী ব্যক্তি। তিনি হযরত আলী রাদ্বিআল্লাহু আনহু এবং আওলাদে রাসূল সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ইমাম হাসান রাদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে যুদ্ধ করে খিলাফত ছিনিয়ে নিয়েছেন। শহীদ করেছেন হাজার হাজার সাহাবীদেরকে। বকর বলল-ভ্রান্ত পথে ছিলেন বিধায় তাকে আমীর না বলা উচিত মনে করি। আমরের উক্তি-তিনি বুযর্গ সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত। তার এহানত করা গুমরাহীর নামান্তর। অপর এক সুন্নী নামধারী যে কিছু জ্ঞানও রাখে (সত্যিকার অর্থে সে গণ্ড মুর্খ লোক) সে বলে যে, সকল সাহাবী বিশেষ করে হযরত আবু বকর ছিদ্দীক এবং হযরত ওমর ফারুকে আযম, হযরত ওসমান রাদ্বিআল্লাহু আনহুম (নাউযু বিল্লাহ মিনহা) তাঁরা সকলেই লোভী ছিলেন। কেননা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম'র লাশ মোবারক রেখে দিয়ে তাঁরা নিজেরাই একেকজন খলীফা হওয়ার অভিপ্রায়ে মগ্ন। এ চারজন খলীফা সম্পর্কে কি হুকুম এবং তাদেরকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত বলা যাবে কি না? এ মাসআলার ব্যাপারে হুযুরের অভিমত কি? সপ্রমাণ বর্ণনা করুন।

জাওয়াবঃ আল্লাহ আযযা ওয়াজাল্লাহু সূরা হাদীদে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদেরকে দু'শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। এক-যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ঈমান এনে আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সম্পদ ব্যয় করতঃ জিহাদ করেছেন। দুই-যারা মক্কা বিজয়ের পরে ঈমান এনেছেন-যাঁদের সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন 

وَكُلًّا وَعَدَ اللهُ الحُسْنَى 

উভয় দলের জন্য আল্লাহ তা’আলা কল্যানের অঙ্গিকার করেছেন। যাঁদের প্রসংগে আল্লাহ বলেছেন-

أوْلَئِكَ عَنْهَا مُبْعَدُونَ لَا يَسْمَعُونَ جَسِيْسَهَا وَهُمْ فِي مَا اشْتَهَتْ أَنْفُسُهُمْ خَالِدُونَ لَا يَحْزِنُهُمُ الفَزَعُ الْأَكْبَرُ وَتَتَلقَهُمُ المَلائِكَةُ هَذَا يَوْمُكُمُ الَّذِي كُنْتُمْ توعدون

তাদেরকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হয়েছে। তারা সেটার ক্ষীণ ধ্বনিও শুনবে না এবং তারা তাদের মন যা চাইবে তাতে সর্বদায় থাকবে। কিয়ামতের দিন তাদেরকে কোন চিন্তায় ফেলবে না। ফিরিশতাগণ তাদেরকে এ বলে স্বাগতম জানাবে যে, এটাই হল তোমাদের সে দিন যার সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদের সাথে অঙ্গিকার করেছিলেন। সূরা আম্বিয়াঃ আয়াত-১০১।

0

নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের এ মান-মর্যাদা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলাই বর্ণনা করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি কোন সাহাবীদের শান মানের ব্যাপারে কটাক্ষ করবে সে আল্লাহ তা'আলার রোষানলে পড়বে। কোন কর্মকান্ডে আল্লাহ তা'আলা বিরোধী মিথ্যা কাহিনী বর্ণনা করা মুসলমানের কাজ নয়। আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতের মধ্যে মুখও বন্ধ করে দিলেন যে, উভয় দল সাহাবী রাদ্বিআল্লাহু আনহুমের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা কল্যানের অঙ্গিকার দিয়ে ইরশাদ করেছেন وَاللَّهُ بِمَا تَعْلُونَ خَبِيرٌ 'আর আল্লাহ তা'আলা ভালই জানেন যা তোমরা করে থাকো।' সকল সাহাবীর ব্যাপারে কল্যানের অঙ্গিকার দিয়েছি আমি আল্লাহ। এর পরেও যারা তাদের মানহানী করে তাদের জন্য জাহান্নাম অপেক্ষা করছে। আল্লামা শিহাব উদ্দীন খাফফাজী রহমাতুল্লাহি আলাইহি 'নসীমুর রিয়াজ' শরহে শেফা ইমাম কাজী আয়াজ'র মধ্যে বলেন-

مَنْ يَكُونُ يَطْعَنُ فِي مُعَاوِيَة - فَذَاكَ مِنْ كِلَابِ الْهَاوِيَةِ.

যে হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আনহুর সমালোচনা করতঃ মন্দ বলে সে জাহান্নামের কুকুরগুলোর একটি।

এ চার ব্যক্তির মধ্যে আমরের উক্তি সঠিক। যায়দ এবং বকরের কথা ডাহা মিথ্যা। আর চতুর্থ ব্যক্তি সব চেয়ে খারাপ খবীছ। ইমাম নিয়োগ করা অতি প্রয়োজনীয় বিষয়। সকল দ্বীন এবং দুনিয়ার এন্তেজাম তার সাথে সম্পর্কিত। হুযুর সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের নূরানী জানাযা যদি কিয়ামত পর্যন্ত রাখা হতো তাহলে কোন ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকত না। আম্বিয়া আলাইহিমুস্সালামের পবিত্র শরীর মোবারক কখনও পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না। সৈয়্যিদুনা হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম ইন্তিকালের পর এক বছর পর্যন্ত দন্ডায়মান অবস্থায় ছিলেন। এক বছর পর তাঁকে দাফন করা হয়। পবিত্র লাশ মোবারক হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রাদ্বিআল্লাহু আনহার হুজরা মোবারকের মধ্যে ছিল যেখান তাঁর পবিত্র নূরানী মাযার অবস্থিত। এর বাইরে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি। অতি ছোট্ট হুজরা মোবারকে সকল সাহাবী এ নামাযে আকদাস দ্বারা সম্মানিত হওয়া খুবই দুস্কর ছিল। তাই একেক দল এসে নামায পড়ে বাইরে চলে যেতেন; দ্বিতীয় দল আসতো। এভাবে এ সিলসিলা তিন দিনে শেষ হয়েছিল। যদি তিন বছরে শেষ হতো তাহলে পবিত্র জানাযা মোবারক একই অবস্থায় একই রকম থাকতো। এ কারণে দাফনে আকদাস বিলম্ব করার প্রয়োজন ছিল। ইবলিসের নিকট এটা যদিও বা লোভনীয় ব্যাপার হিসেবে গণ্য। মূলতঃ সাহাবা কেরাম লোভ করেন নি। তবে বড় ধরনের অপবাদ আমীরুল মুমিনীন মাওলা আলী রাদ্বিআল্লাহু আনহুর উপর আরোপিত হয়। তিনি তো লোভী ছিলেন না। কাফনের কাজ ঘরওয়ালাদের সাথে সম্পর্কিত। তিনি কেন তিন দিন পর্যন্ত হাতের সাথে হাত ধরে বসে রইলেন। তাঁরা কি রাসূল সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাফনের পর এ কাজের মাধ্যমে খেদমত আঞ্জাম দিতে পারতেন? সুতরাং বুঝা গেল, এ আপত্তি অভিশপ্ত এবং পবিত্র দেহ মোবারক তাড়াতাড়ি দাফন না করাটাই ছিল ধর্মীয় কল্যানমূলক। যেটার উপর মাওলা আলী এবং সকল সাহাবী ঐক্যমত পোষন করেছেন। কবির ভাষায়-

چشم بد اندیش که بر کنده باد + عیب نماید به نگاهش هزا.

এ খবীছগণ (আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্চিত করুক) প্রকৃতপক্ষে সাহাবীদেরকে কষ্ট দেয়নি বরং তারা আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দিয়েছে।

হাদীস শরীফে আছে-

مَنْ أَذَاهُمْ فَقَدْ أَذَانِي وَمَنْ أَذَانِي فَقَدْ أَذًى اللَّهَ وَمَنْ أَذَى اللَّهَ فَيُوشِكُ اللَّهُ أَنْ ياخذه

যারা আমার সাহাবীদেরকে কষ্ট দিল সে আমাকে কষ্ট দিয়েছে আর যারা আমাকে কষ্ট দেবে বস্তুতঃ তারা আল্লাহকে কষ্ট দেয়। তাহলে অতি শীঘ্রই আল্লাহ তাদেরকে ধরাশায়ী করবে। আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।

💠 মাসআলা-২৫ঃ সুদের ব্যাপারে

২৫ শে জামাদিউল উলা, ১৩৩৭ হিজরী।

এ মাসআলার ব্যাপারে শরীয়তের কি হুকুম যে, যায়দ এক গ্রামবাসীকে ফসল কাটার পূর্বে এ শর্তের উপর কিছু টাকা দিল- যে সময় টাকা দিয়েছে সে সময় গমের বয়স দশ মাস ছিল এবং সে টাকা দিয়েছে ১৪ মাস বয়সী হিসাব করে। এখন ফসল কাটার মৌসুমে বাজার দরের চেয়ে কম-বেশি ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। কিন্তু সে টাকার পরিমাণ অনুপাতে ১৪ মাস বয়সী ফসল নিয়ে নিল। বকর বলল-তোমার সুদ হয়েছে। কেননা বাজার দর থেকে অতিরিক্ত টাকা তুমি গ্রহণ করেছো। এর বিধান কি?

জাওয়াবঃ এটা হল বাইয়ে সলম (যে বেচাকেনার মধ্যে বিক্রেতা ক্রেতা হতে কোন জিনিষের দাম অগ্রিম গ্রহণ করে-অনুবাদক)। যদি এর মধ্যে শর্ত পাওয়া যায় তাহলে নিঃসন্দেহে জায়েয। কোন ধরনের সুদ হবে না। যদিও ১০ সেরের স্থলে ১০ মন নির্ধারণ করে। হ্যাঁ, যদি জবরদস্তিমূলক হয় তাহলে হারাম। যদিও দশ সেরের স্থলে এক সেরও নেওয়া হয়। কেননা আল্লাহ তা'আলার বাণী-

إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةٌ عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ

যদি বেচা-কেনা সন্তুষ্টির মাধ্যমে হয়েছে কিন্তু কোন শর্ত থেকে যায়। যেমন-শষ্য এ জাতীয়, এ প্রকারের, এ গুণের ও এ পরিমাণ হতে হবে বলে নির্দিষ্ট করা না হয়। অথবা ওই জিনিষের উপর চুক্তিবদ্ধ হয় যা চুক্তির সময় থেকে ওয়াদাবদ্ধ সময়ের মধ্যে বাজারে মজুদ না থাকে বা না আসে। বা মেয়াদ অনির্ধারিত রাখল। অথবা ওই বৈঠকের মধ্যে টাকা পুরোপুরি আদায় করে নি। তাহলে অবশ্য সুদ এবং তা হারাম। যদিও বা দর বাজার থেকে সামান্যতমও বেশি ধরা হয়নি। যদি আমি ক্রয় করলাম বা বিক্রি করলাম- বিষয়টি আলোচনায় না আসে। যেমন সে বলল- ১৪ সের নিব। উত্তরে বলল-দেব। তাহলে এটা সুদ এবং হারাম কিছুই নয়। তজ্জন্য কোন শর্তের প্রয়োজন নেই। এ জন্য তার নিকট কোন দাবীও চলবে না। সেটা তার খুশীর উপর নির্ভর। ইচ্ছা করলে দেবে অথবা দেবে না। এটা সরাসরি বেচা-কেনাই হয়নি। শুধুমাত্র অঙ্গিকার হয়েছে। আল্লাহ তায়ালাই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা-২৬ঃ চুক্তিভিত্তিক গম বেচা-কেনা জায়েয হবে কি না?

১৯ জামাদিউল উখরা ১৩৩৭ হিজরী।

শরীয়তের কি ফয়সালা এ মাসআলা প্রসংগে যে, যায়দ বকর থেকে দশ টাকা এ শর্তে চাইল যে-আমি মৌসুমে ১৫ মাস বয়সী গম দেব। আর খালেদ বকর থেকে দশ টাকা এই শর্তে চাইল যে- বাজার দর অনুপাতে দশ টাকার গম দেবো। বকর বলল- আমার নিকট এ সময় টাকা নেই তোমরা উভয়জন দশ টাকার গম নিয়ে যাও যা বাজার দরে দশ সেরের দাম হয়। উভয় জন সন্তুষ্টচিত্তে উপরের শর্তের উপর হিসেব করে গম নিয়ে নিল। বিক্রয়লব্দ দশ টাকা নিজেদের খরচ-পাতির জন্য রাখল। এখন মৌসুমে যায়দের উপর ওয়াদা অনুযায়ী টাকা অনুপাতে ১৫ মাস বয়সী গম এবং খালেদকে ১২ মাস বয়সী গম বাজার দর হিসেবে দিতে হবে। এ বেচা-কেনা জায়েয হবে কি না?

জাওয়াবঃ এ পদ্ধতি অকাট্যভাবে হারাম, স্পষ্ট সুদ। আড়াই মণ গম যা সে দিয়েছে এর থেকে অতিরিক্ত নেওয়া হারাম! হারাম! হারাম। আর যদি টাকা দিত তাহলে এর মধ্যে দু'টি পদ্ধতি ছিল। টাকা কর্জ হিসেবে দিত অথবা এ শর্তে নিত যে, দেওয়ার সময় গম দেবে তাহলে শর্ত বাতিল হত। যায়দ এবং খালেদের উপর শুধুমাত্র তত টাকা আদায় করতে হতো। আর যদি গম বিক্রয় করতো এবং টাকা সামনা-সামনি দিয়ে দিত। তাহলে এ পদ্ধতি বাইয়ে সলম হয়ে যেত। এর মধ্যে শর্তসমূহ পাওয়া গেলে জায়েয হত। অন্যথায় হারাম। আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা- ২৭ঃ শহরের মধ্যে অন্যান্য স্থানে জুমা হওয়াতে কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আছে কি? জুমার জন্য কমপক্ষে কতজন লোকের প্রয়োজন? শহরের কোন মসজিদে বেশি ছাওয়াব?

১ শা'বান ১৩৩৭ হিজরী।

এ মাসআলা প্রসংগে ওলামা-ই দ্বীনের অভিমত কি যে, শহরের মধ্যে অনেক জায়গায় জুমার নামায হয়। অতএব প্রত্যেক ওই মসজিদ যার মধ্যে জুমার নামায হয় তাকে জামে মসজিদ বলা হয়। জামে মসজিদে অনেক ফজিলত আছে। অথবা ওই একটি মসজিদ যা দুর্গের সাথে সম্পৃক্ত তা জামে মসজিদ নামে প্রসিদ্ধ। (ভারতের দিল্লী জামে মসজিদ যার পার্শ্বে দূর্গ অবস্থিত-অনুবাদক) শহরের মধ্যে অন্যান্য স্থানে জুমা হওয়াতে কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আছে কি? জুমার জন্য কমপক্ষে কতজন লোকের প্রয়োজন? শহরের কোন মসজিদে বেশি ছাওয়াব?

জাওয়াবঃ জামে মসজিদ নামে ওই একটি মসজিদই খ্যাত হলেও শহরের অন্যান্য জায়গায় জুমা হওয়াতে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। জুমার জন্য কম পক্ষে ইমাম সাহেব ব্যতীত তিন জন লোক হতে হবে। কিন্তু জুমা এবং দু'ঈদের ইমাম যে কোন ব্যক্তি হতে পারবে না। ইমাম ওই ব্যক্তি হতে পারবে যিনি ইসলামী বাদশাহ তথা মুসলমানদের বাদশাহ হবেন, অথবা তার প্রতিনিধি, অথবা তার অনুমতি প্রাপ্ত ব্যক্তি। আর যদি এর মধ্য হতে কেউ না থাকে তাহলে মুসল্লিরা যাকে ইমাম হিসেবে নির্ধারণ করবে প্রয়োজনে তিনি জুমা এবং দু'ঈদের নামায পড়াতে পারবেন। জুমার ছাওয়াব বেশি হয় জামে মসজিদে। কিন্তু যখন অন্য মসজিদের ইমাম অধিক জ্ঞানী এবং সম্মানিত হবেন তখন সে জামে মসজিদে জুমার নামাযের ছাওযাব বেশি পাওয়া যাবে। আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা-২৮ঃ তালাক কত প্রকার? প্রত্যেক প্রকারের সংজ্ঞা কি? কোন শব্দ দ্বারা তালাক হয়ে যায়? তালাকের পর নিজের বিবাহের অধীনে কিভাবে আনতে হবে?

১৫ শাবান ১৩৩৭ হিজরী।

এ মাসআলা প্রসংগে ওলামা-ই দ্বীনের অভিমত কি যে, তালাক কত প্রকার? প্রত্যেক প্রকারের সংজ্ঞা কি? কোন শব্দ দ্বারা তালাক হয়ে যায়? তালাকের পর নিজের বিবাহের অধীনে কিভাবে আনতে হবে?

জাওয়াবঃ তালাক তিন প্রকারঃ এক- রজয়ী, দুই- বায়েন, তিন-মুগাল্লাযা।

(এক) তালাকে রজয়ী ওই তালাককে বলে-যার কারণে স্ত্রী তৎক্ষণাৎ বিবাহ থেকে বের হয়ে যায় না। ইদ্দতের ভিতর যদি স্বামী আবার ফিরে নিয়ে আসে তাহলে সে স্ত্রী স্বামীর আকদের মধ্যে থাকবে। হ্যাঁ, যদি ইদ্দত চলে যায় এবং ফিরিয়ে না আনে তাহলে সে সময় বিবাহ থেকে বের হয়ে যাবে। তারপরও সন্তুষ্টচিত্তে তাকে আবার বিবাহ করতে পারবে।

(দুই) বায়েন-ঐ তালাক যদ্ধারা স্ত্রী তৎক্ষণাৎ বিবাহ থেকে বের হয়ে যায়। তবে ইদ্দতের মধ্যে বা ইদ্দতের পরে রেজামন্দির সাথে পুনরায় বিয়ে করতে পারে।

(তিন) মুগাল্লাযা-ঐ তালাক যা দ্বারা স্ত্রী বিয়ে থেকে বেরও হয়ে যায় এবং অন্য জনের সাথে বিয়ের মাধ্যমে হালাল না হওয়া পর্যন্ত উভয়ের মাঝে কখনো বিয়েও হতে পারে না। তা তিন তালাকের মাধ্যমে হয়ে থাকে চাই এক সাথে হোক বা অনেক বছর পরে হোক।

তালাকে রজয়ী হোক বা বায়েন বা কতেক রজয়ী আর কতেক বায়েন। তালাকের অনেক শব্দ আছে। কিছু শব্দ দ্বারা রজয়ী, কিছু দ্বারা বায়েন আর কিছু দ্বারা মুগাল্লাযা তালাক পতিত হয়। তালাকে রজয়ী ও বায়েনের আনুমানিক দু'শত শব্দ আছে-যে গুলোকে আমি আমার ফাতওয়া গ্রন্থে উল্লেখ করেছি। আল্লাহ তা'আলাই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসয়ালা-২৯ঃ যাকাতের ব্যাপারে

নিন্মলিখিত মাসয়ালাগুলো প্রসংগে ওলামা-ই কেরামের মত কি?

(১) বর্তমান নিয়মে কি পরিমাণ সম্পদ থাকলে সাহেবে নেসাব হয়?

(২) কারেন্সি নোট এবং রূপিয়ার কি একই হুকুম? নোট তো সোনা-চাঁদী কিছু নয়; বরং কাগজ।

(৩) যাকাত শতকরা কত দিতে হয়?

(৪) যে ব্যক্তির কাছে টাকা পয়সা নেই। সোনা-চাঁদীর কিছু ব্যবহার্য অলংকার আছে, এর পরিমাণ নেসাব সমতুল্য হলে যাকাত দিতে হবে কি না?

(৫) এক বছর যাকাত দেওয়ার পর হুবহু সে সম্পদ রয়ে গেলে দ্বিতীয় বছর আবার বাকী মালের মধ্যে যাকাত দিতে হবে কিনা?

(৬) বেরেলীর ওজন অনুপাতে এক ফিত্রার পরিমাণ কতটুকু হওয়া উচিত?

(৭) রোযাদার-বেরোযাদার ও বালেগ-নাবালেগ সকলের উপর ফিৎরা ওয়াজিব কিনা?

(৮) যে ব্যক্তি দূর্বলতার কারণে রোযা রাখতে পারেনি সে প্রতি রোযার বিনিময়ে কি পরিমাণ খানা মিসকিনকে দেবে? সে মিসকিন রোযাদার হতে হবে না বেরোযাদার হলে চলবে?

জাওয়াবঃ

(১) ইংরেজদের প্রচলিত নিয়মে নেসাব হবে ছাপ্পান্ন রূপিয়া।

(২) কারেন্সি নোট এবং রূপিয়ার কি একই হুকুম হতে পারে না? রূপিয়া চাঁদির-যা জম্মগত মূল্যবান। নোট তো কাগজের-যা পরিভাষায় মূল্য। চালু অবস্থায় কাগজের নোটও পরিভাষায় এক প্রকার মূল্য-যা পয়সার বিধান রাখে।

(৩) প্রতিটি নেসাবে এক চল্লিশাংশ যাকাত দিতে হয়। সাহেবাইনের মতে খুবই সহজ পন্থা যা ফকীরদের জন্য উপকারী তা হল-শতকরা আড়াই টাকা করে যাকাত দেওয়া।

(৪) অবশ্যই অলংকারের মধ্যে যাকাত দিতে হবে।

(৫) দশ বছরও থাকলে প্রত্যেক বছর যাকাত ওয়াজিব। যতক্ষণ তা নেসাব পরিমাণ থাকবে। এটা এ জন্য যে, যখন প্রথম বছর যাকাত দেয় নি। দ্বিতীয় বছর সে পরিমাণ ঋণ হল। এতটুকু বাদ দিয়ে অবশিষ্ট মালের উপর যাকাত দিতে হবে। তৃতীয় বছর পূর্বের দু'বছরের যাকাত তার উপর কর্জ। তার সকল কর্জ একত্রিত করে বাদ দিয়ে বাকী মালের উপর যাকাত দিতে হবে। এটা হবে না যে, পূর্বের সকল বছরের যাকাত বাদ দিয়ে বাকী সম্পদ মিলে নেসাব পরিমাণ হলে যাকাত দিতে হবে অন্যথায় নয়।

(৬) এক আধুলি, উপরে পৌণে দু'সের। (তা আমাদের হিসেব মতে নয়; বরং বেরেলী প্রদেশের নিয়ম অনুপাতে।-অনুবাদক)

(৭) নিজের সদকা ও নিজের নাবালেগ সন্তান যদিও বা এক দিনের হয় তার ফিত্রা আদায় করা নিজের উপর ওয়াজিব। বালেগ সন্তান অথবা স্ত্রী সাহেবে নেসাব হলে তার ফিতরা আদায় করা নিজেদের উপর ওয়াজিব; অন্য কারো উপর নয়। তাদের কোন অবস্থার ব্যাপারে নিজে জবাবদিহি নয়। হ্যাঁ, তাদের অনুমতি সাপেক্ষে তাদের পক্ষ থেকে আদায় করে দিলে বড় ধরনের এহসান হবে।

(৮) প্রত্যেক রোযার জন্য এক আধুলি, তদূর্ধে পৌনে দু'সের গম দিতে হবে। আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা-৩০ঃ মসজিদের আদবের ব্যাপারে

১০ রমযানুল মোবারক, ১৩৩৭ হিজরী।

আহলে শরীয়ত কি বলেন? এ মাসআলার ব্যাপারে যে, আজ কাল সাধারণত অনেক লোক মসজিদে দুনিয়াবী কথা-বার্তা বলে থাকে। কেউ কেউ বেপরোয়া হয়ে অট্টহাসি দিয়ে পরস্পর অন্তর লাগিয়ে কথা বলে। মসজিদের কোন আদব বুঝতে চাই না। এটা যে আল্লাহর ঘর তার কোন খবর নেই। তাদের ব্যাপারে কি হুকুম? আর মসিজদের মধ্যে কথা বলার খারাবী এবং নীরবতা পালন করার সুফল হাদীস শরীফের মাধ্যমে বর্ণনা করুন, যেন এ ধরনের লোক শিক্ষা অর্জন করতে পারে।

জাওয়াবঃ মসজিদের মধ্যে দুনিয়াবী কথাবার্তা বললে তা নেক আমলসমূহকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে যেভাবে আগুন লাকড়িকে ভষ্ম করে দেয়। মসজিদের মধ্যে হাসলে কবর অন্ধকার হয়ে যায়। এ ব্যাপারে হাদীসসমূহ অনেকবার বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু কে শুনে কার কথা? আল্লাহ তা'আলা হিদায়ত দান করুন। আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা-৩১ঃ  নাজায়েয অর্থাৎ সুদের টাকা, মদের টাকা, ঘুষের টাকা ইত্যাদি যদি ভাল কাজ, মসজিদ, মাদরাসা, কুপ, নিয়ায, ফাতিহা, ওরশ ইত্যাদির মধ্যে লাগানো হয়। তাহলে জায়েয হবে কি না?

৬ শাওয়াল, ১৩৩৭ হিজরী।

ওলামা-ই হক্কানীদের অভিমত কি নিচের এ মাসআলার ব্যাপারে যে, নাজায়েয অর্থাৎ সুদের টাকা, মদের টাকা, ঘুষের টাকা ইত্যাদি যদি ভাল কাজ, মসজিদ, মাদরাসা, কুপ, নিয়ায, ফাতিহা, ওরশ ইত্যাদির মধ্যে লাগানো হয়। তাহলে জায়েয হবে কি না? কোন ব্যক্তি সে অবৈধ মালে মসজিদে নামায পড়ে, সে মাদরাসায় ইলম শিক্ষা করে, কূপের পানি পান করে এবং ফাতিহা ওরশের খাবার গ্রহণ করলে-তা জায়েয হবে কি না? আর যদি সে টাকা দান করে ছাওয়াবের আশা করা হয় তাহলে তার হুকুম কি? এ ধরনের টাকাকে শরয়ীভাবে কোন হিলা করে জায়েয করা যাবে কি না? আর যদি যায় তাহলে সেই হিলা কি?

জাওয়াবঃ হারাম উপায়ে অর্জিত টাকা ভাল-মন্দ কোন কাজে ব্যবহার করা জায়েয

হবে না। যার থেকে নিয়েছে তাকে পুনরায় ফিরিয়ে দিতে হবে। অথবা ফকীরদেরকে বন্টন করে দেবে। এ ছাড়া কোন হিলা তা পাক করতে পারবে না। পবিত্র মাল দান করে যেমনিভাবে ছাওয়াব পাওয়ার আশা করা যায় তেমনিভাবে তা দান করে ছাওয়াবের আশা করলে-তা মারাত্মক হারাম। বরং ফকীহগণ কুফরী লিখেছেন। হ্যাঁ, শরীআত হুকুম দিয়েছে যে, হকদারকে পাওয়া না গেলে ফকীরদের মধ্যে দান করে দেবে। এ হুকুম অনুপাতে এর উপর ছাওয়াবের আশা করা যায়। মসজিদ, মাদরাসাতে প্রকৃতভাবে সে টাকা ব্যবহার করা যায় না। বরং এর দ্বারা জিনিষপত্র ক্রয় করতে পারে। ক্রয়ের সময় হারাম মাল দেখে সে বলল- এর পরিবর্তে অমুক জিনিষ দাও। সে দিয়েছে। সে মূল্য পরিশোধের সময় হারাম দিল। তখন যে জিনিস ক্রয় করেছে তা অপবিত্র হবে না। এ অবস্থায় ফাতিহা-ওরশের খাদ্য খাওয়া জায়েয। বেশির ভাগই এরূপ হয়ে থাকে। সে মসজিদের মধ্যে নামায পড়া, মাদরাসায় ইলম অর্জন করা ও কূপের পানি ব্যবহার যে কোন ভাবে জায়েয। যদি ওটার মধ্যে সে ব্যতিক্রম পদ্ধতি পাওয়া যায়। অপবিত্রতা এসেছে সেরূপ মাসআলার মধ্যে; কিন্তু যমীনের মধ্যে নয়। আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা-৩২ঃ নগরশুল্কে (ট্যাক্স অফিসে) চাকরী করা জায়েয হবে কি না? সে সময়কার প্রশাসকের জন্য তা উসুল করা জায়েয হবে কি না?

১১ শাওয়াল, ১৩৩৭ হিজরী।

আহলে শরীয়তের হুকুম কি যে, নগরশুল্কে (ট্যাক্স অফিসে) চাকরী করা জায়েয হবে কি না? সে সময়কার প্রশাসকের জন্য তা উসুল করা জায়েয হবে কি না? এ টাকা জনগণ থেকে নিয়ে জন সাধারণের সুবিধার্থে রাস্তায় আলো ইত্যাদি কাজে লাগানো হয়। নগরশুল্ক অর্জিত টাকা চুরি করা জায়েয হবে কি না?

জাওয়াবঃ কর আদায় করার জন্য ভাল নিয়্যতে নগর শুল্কে চাকরী করা জায়েয

আছে। সে ব্যাপারে দুররুল মুখতার ইত্যাদি গ্রন্থে প্রমাণ রয়েছে। চুরি অর্থাৎ অন্যের রক্ষিত সম্পদ তার অনুমতি ছাড়া তার থেকে গোপন করতঃ অন্যায়ভাবে নেওয়া কারো পক্ষে জায়েয নেই। বৈধ চাকরীর মধ্যে চাকরীর খেলাপ কোন চুক্তি করা অপরাধ। এটাও সাধারণভাবে হারাম। অনুরূপভাবে কোন আইনী অপরাধ করে নিজেই নিজেকে কোন কারণ ছাড়াই শাস্তির অভিপ্রায়ে পেশ করা শরয়ীভাবে অপরাধ। যেরূপ কুরআন-হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়। বাকী রইল ট্যাক্স আদায় করা প্রশাসকের জন্য বৈধ কি না? মূলতঃ এটা প্রশাসক নিয়ে আলোচনা করার বিষয় নয়, আর প্রশ্নকারীও প্রশাসক নয়। আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা-৩৩ঃ কাফির কয় প্রকার এবং প্রত্যেক প্রকারের সংজ্ঞা কি? কোন কাফিরের সংস্পর্শ বেশি ক্ষতিকর?

২২ শাওয়াল, ১৩৩৭ হিজরী।

ওলামা-ই- দ্বীন এ মাসআলা প্রসংগে কি বলেন যে, কাফির কয় প্রকার এবং প্রত্যেক প্রকারের সংজ্ঞা কি? কোন কাফিরের সংস্পর্শ বেশি ক্ষতিকর?

জাওয়াবঃ আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা সকল প্রকার কুফরি ও কাফির থেকে রক্ষা করুক। কাফির দু'প্রকার, আসলী কাফির। মুরতাদ কাফির। আসলী কাফির তারাই যারা শুরু থেকে কাফির ছিল এবং ইসলামের কালিমাকে অস্বিকারকারী। তা দু'প্রকার-(ক) মুজাহের (খ) মুনাফেক। মুজাহের কাফির তারাই যারা প্রকাশ্যে ইসলামের কালিমাকে অস্বীকারকারী।

আর মুনাফেক কাফির তারাই যারা প্রকাশ্যভাবে কালিমা গ্রহণ করে এবং অন্তরে তা অস্বীকার করে। এ প্রকার কাফির পরকালে সবচেয়ে মন্দ-খারাপ হবে। কোরআনে করীমে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-

 إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِى الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ

মুনাফেক কাফির জাহান্নামের একেবারে নিম্নস্তরে অবস্থান করবে।

মোজাহের কাফির চার প্রকার- (ক) প্রত্যেক ওই কাফির যারা আল্লাহকেও অস্বীকার করে।

(খ) মুশরিক- আল্লাহ তা'আলা ওয়াজাল্লাকে ব্যতীত আরো অন্য কাউকে মা'বুদ মনে করে এবং ওয়াজিবুল ওযুদ (যার অস্তিত্ব মেনে নেওয়া আবশ্যক) মনে করে।

যেমন-হিন্দুরা মূর্তিকে ওয়াজিবুল ওযুদ এবং মা'বুদ মনে করে। আর আর্যরা স্বয়ং মুর্তিকে রূহ এবং কায়াকে মা'বুদ মনে করে না; কিন্তু কাদীম (অবিনশ্বর) ও গায়রে মাখলুক মনে করে। উভয়ই মুশরিক। আর আর্যদেরকে একেশ্বরবাদী মনে করা মারাত্মক বাতিল।

(গ) অগ্নিপুজারী। (ঘ) কিতাবী-ইহুদী, নাসারা। এপ্রত্যেক প্রকার কাফির নয়। তাদের মধ্যে প্রথম তিন প্রকারের যবেহকৃত পশু মৃত এবং তাদের মহিলাদের সাথে বিবাহ অবৈধ। আর চতুর্থ প্রকারের মহিলাদের সাথে বিবাহ হলে তা শুদ্ধ হবে। যদিও নিষেধ বা গুনাহ। কাফির মুরতাদ তারাই যারা কালিমা পড়ে কুফরী করে।

সেটাও দু'প্রকার- মুজাহের এবং মুনাফেক।

(ক) মুরতাদ মুজাহের ওরাই যারা প্রথমে মুসলমান ছিল তারপর প্রকাশ্যভাবে ইসলাম থেকে বের হয়ে ইসলামের কালিমাকে অস্বীকারকারী হয়ে গেল। চাই নাস্তিক অথবা মুশরিক অথবা অগ্নিপুজারী যাই হোক।

(খ) মুরতাদ মুনাফেক ওরাই যারা মুখে ইসলামের কালিমা এখনও পড়ছে। তারা নিজেরাই নিজেদেরকে মুসলমানও দাবী করে। আর আল্লাহ আয্যাওয়াজাল্লা অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লম অথবা কোন নবীর এহানত করে। অথবা ধর্মের অবশ্যকীয় বিষয়কে অস্বীকার করে। যেমন-আজ কালের ওহাবী রাফেজী, কাদিয়ানী, ন্যাচারী, ছাকড়ালভী ও ভ্রান্ত ছুফি যারা শরীআতের ব্যাপারে উদাসীন। দুনিয়াবী বিধানে সবচেয়ে খারাপ হল মুরতাদ মুনাফেক। তাদের থেকে কর (ট্যাক্স) নেওয়া যাবে না। তাদের সাথে বিবাহ কোন মুসলমান, কাফির মুরতাদ বা তাদের সমমাযহাবের লোক অথবা মুখালিপ মাযহাবের লোক হোক; এমনকি মানুষ-অমানুষ কারো সাথে হবে না। যার সাথে হবে তা বিবাহ নয়; বরং যেনা হবে। সে মুরতাদ পুরুষ হোক বা মহিলা-একই হুকুম।

মুরতাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হল মুরতাদ মুনাফেক। তারা এমন যে, তাদের সংস্পর্শ হাজার হাজার কাফিরের সংস্পর্শের চেয়েও বেশি ক্ষতিকারক। তারা মুসলমান হয়ে কুফরী শিক্ষা দেয়। বিশেষ করে ওহাবী এবং দেওবন্দীরা-তারা নিজেরাই নিজেদেরকে খাস সুন্নি এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত দাবী করে, হানাফী, চিশতী ও নকশবন্দী দাবী করে। নামায রোযা আমাদের মত আদায় করে। আমাদের কিতাবগুলো পড়ে-পড়ায়; অথচ আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেয়। তারা সবচেয়ে গুরুতর বিষাক্ত বাতিল। হুশিয়ার খবরদার! নিজের দ্বীন এবং ঈমান রক্ষা করতে হবে। আল্লাহই উত্তম হেফাযতকারী, তিনি অতি দয়ালু। আল্লাহই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা-৩৪ঃ মসজিদে নিজের জন্য অথবা অন্যের জন্য ভিক্ষা চাওয়া অথবা ভিক্ষাপ্রার্থীকে দেওয়া নিজের পক্ষ থেকে অথবা কারো পক্ষ থেকে জায়েয হবে কি না?

৫ যিলক্বাদ, ১৩৩৭ হিজরী।

ওলামা-ই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের এ মাসআলা প্রসংগে হুকুম কি যে, মসজিদে নিজের জন্য অথবা অন্যের জন্য ভিক্ষা চাওয়া অথবা ভিক্ষাপ্রার্থীকে দেওয়া নিজের পক্ষ থেকে অথবা কারো পক্ষ থেকে জায়েয হবে কি না?

জাওয়াবঃ সে ব্যক্তি মসজিদে শোরগোল সৃষ্টি করলে, নামাযীদের নামাযে ক্ষতি সাধন করলে, লোকদের গর্দান ডিঙ্গিয়ে কাতার থেকে বের হলে সাধারণভাবে এরূপ করা হারাম। চাই নিজের জন্য হোক বা অন্যের জন্য। হাদীস শরীফে আছে-

جَنَّبُوا مَسَاجِدَكُمْ صِبْيَانَكُمْ وَمَجَانِيْنَكُمْ وَرَفْعَ أَصْوَاتِكُمْ

মসজিদগুলোকে শিশু, পাগল ও উচ্চ আওয়াজ করে কথা বলা ব্যক্তিদের থেকে রক্ষা করো।

সূত্রঃ ইবনে মাযাহ তিনি ওয়াছেলা ইবনে আসকা এবং আবদুর রাজ্জাক, তিনি মা'আয ইবনে জাবাল রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আনহুম থেকে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন। 

হাদীস শরীফে আরো আছে-

مَنْ تَخَطَّى رِقَابُ النَّاسِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ اتَّخَذَ جَسَرًا إِلَى جَهَنَّمَ

যে ব্যক্তি জুমার দিন মানুষের গর্দান সরাবে সে জাহান্নাম পর্যন্ত পৌঁছার পুল তৈরী করল।

নড়াচড়া না হলেও নিজের জন্য মসজিদের মধ্যে ভিক্ষা চাওয়া নিষেধ। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

مَنْ سَمِعَ رَجُلًا يُنْشِدُ فِي الْمَسْجِدِ ضَالَّةً فَلْيَقُلْ لَا أَداهَا اللَّهُ إِلَيْكَ فَإِنَّ المُسَاجِدَ لَمْ تُبْنَ لهذا .

যে ব্যক্তি কাউকে মসজিদে নিজের কোন হারানো জিনিষ চাইতে শুনে তাহলে সে যেন তাকে বলে-আল্লাহ তোমার জিনিষ যেন না মিলাই। মসজিদ এ জন্য তৈরী করা হয়নি। আহমদ, মুসলিম ইবনে মাযাহ, হযরত আবু হুরাইরা রাদ্বিআল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন। যখন এতটুকু কথা বলা নিষেধ করা হয়েছে তাহলে নিজের জন্য মসজিদে ভিক্ষা চাওয়া অবশ্যই হারাম। এটা কিভাবে জায়েয হতে পারে। এজন্য দ্বীনের ইমামগণ বলেছেন-যারা মসজিদে ভিক্ষুককে একটি পয়সা দান করবে সে সত্তর পয়সা আল্লাহর রাস্তায় আরো দিতে হবে যেন এ পয়সা গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়। তবে অভাবীর জন্য সাহায্য করতে বলা অথবা কোন দ্বীনি কাজের জন্য চাঁদা তোলা যার মধ্যে কোন শোরগোল, গর্দান ডিঙ্গানো নেই, কারো নামাযে ক্ষতি হয় না, তাহলে তা নিঃসন্দেহে জায়েয; বরং তা হাদীসে পাকের দ্বারা প্রমাণিত। আর ভিক্ষুক ছাড়া কোন অভাবীকে দেওয়া সম্পর্কে অনেক হাদীস মাওলা আলী রাদ্বিআল্লাহ তা'আলা আনহু থেকে সাব্যস্ত। আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা-৩৫ঃ খাবার ছিটানোর ব্যাপারে

২ মুহররমুল হারাম, ১৩৩৮ হিজরী।

ওলামা-ই-দ্বীনের এ মাসআলা প্রসংগে অভিমত কি যে, আজ কাল লোকেরা দান খায়রাত এমনভাবে করে ছাদ বা প্রাসাদের উপর থেকে রুটি বা রুটির টুকরা অথবা বিস্কুট ইত্যাদি নিক্ষেপ করে। শত শত লোক সেগুলো লুঠে নিয়ে যায়। একজনের উপর একজন পড়ে অনেকের মধ্যে ঝগড়া লেগে যায়। ওই রুটিসমূহ যমীনের উপর পড়ে পায়ে দলিত হয়ে ময়লা হয়ে যায়। অনেক সময় ময়লাযুক্ত নালার ভিতরও পড়ে যায়। রিযিকের মারাত্মক বেয়াদবি হয়। এ অবস্থা শরবতের ক্ষেত্রেও যে, উপর থেকে গ্লাসে ঢেলে দেয়া হয়। গ্লাসে অর্ধেক শরবতও থাকে না বরং সমস্ত শরবত যমীনে পড়ে প্রবাহিত হয়। এ ধরনের খয়রাত বা লঙ্গর জায়েয হবে কি না? না রিযিকের বেয়াদবির কারণে গুনাহ হবে।

জাওয়াবঃ এটা খয়রাত নয়; অকল্যাণ এবং মন্দ কাজ। তা আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য হতে পারে না। এ পদ্ধতি যশ-খ্যাতি এবং লোক দেখানোর জন্য আর তা হারাম। রিযিকের সাথে বেয়াদবি এবং শরবত নষ্ট করা পাপ। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৩৬ঃ মসজিদের ফুল গাছ নিজ বাসাতে ব্যবহার করার ব্যাপারে

২৬ মুহররামুল হারাম, ১৩৩৮ হিজরী।

ওলামা-ই- হক্কানীগণ এ মাসআলার ব্যাপারে অভিমত কি? যে মসজিদের মধ্যে ফিয়ারা, বেল, গোলাপ ইত্যাদি গাছ থাকবে। ইমাম মুয়াযযিন থাকার ঘর এবং গোসলখানা নির্মাণের কারণে এই গাছগুলোকে কাটতে হলে কোন ব্যক্তি এ গাছগুলোকে খনন করে নিজের ঘরের মধ্যে ব্যবহার করতে পারবে কিনা? 

দ্বিতীয় হল এ যে, শুকনো ঘাস অথবা চাটাই শীতকালে যা মসজিদে ব্যবহার করা হয় এবং শীতকাল চলে যাওয়ার পর সেগুলো বের করে ফেলে দেওয়া হয়। কোন ব্যক্তি এ শুকনো ঘাস, লাকড়ি বা চাটাই যা ফেলে দেওয়ার উপযোগী হয়। তখন তা পানি গরম করার জন্য নিয়ে যেতে পারবে কি না?

তৃতীয়ত হল এ যে, মিনার অথবা মসজিদের হাউজ যার উপর ওযূ করে অথবা আযান দেয়া হয়, ওটা মসজিদের হুকুমে পড়বে কি না? মসজিদের বাইরে যে সব কথা বলা যায় ওখানেও তা নিষেধ আছে কি? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ এ গাছগুলোকে মসজিদের পক্ষ থেকে উচিত মূল্য ধরে তা পরিশোধ

করতঃ ব্যবহার করতে পারবে। শুকনো ঘাস অথবা চাটাই যা কোন কাজে আসে না অবশ্যই ফেলে দেওয়া হবে। ফেলে দেওয়ার পর সেখান থেকে নিয়ে ব্যবহার করতে পারবে। মসজিদের হাউজ কোন কোন ক্ষেত্রে কথা বলার ব্যাপারে মসজিদের বিধানের মত। এ'তেকাফকারী প্রয়োজন ব্যাতিরেকে ওখানে যেতে পারবে। ওটার উপর থুথু ফেলা অথবা নাক পরিস্কার করা অথবা কোন নাপাক ফেলার অনুমতি নেই। অনর্থক কথা বার্তা, আট্টহাসি ওখানে না করা উচিত। আর কোন কোন ক্ষেত্রে মসজিদের হুকুমের মধ্যে পড়ে না। ওটার উপর আযান দিতে পারবে এবং হাউজে বসে ওযু করতে পারবে। মসজিদের মধ্যে জায়গা অবশিষ্ট থাকা অবস্থায় সেখানে ফরয নামায আদায় করলে মসজিদের ছাওয়াব পাওয়া যাবে না। দুনিয়াবী জায়েয সম্মত সামান্য কথাবার্তা বলা যাবে, যার মধ্যে কোন ধরনের হইহুল্লা নেই, কোন নামাযী অথবা কোন যিকরকারীর কষ্ট না হয়। তাহলে কোন অসুবিধা নেই। আল্লাহ তায়ালাই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা-৩৭ঃ  মূল্য দিয়ে হাফেজ বা আলেমের মাধ্যমে কোরান পড়ানো যাবে কিনা?

১ রবিউল আওয়াল, ১৩৩৮ হিজরী।

ওলামা-ই দ্বীন এ মাসআলার ব্যাপারে কি বলেন যে, কতেক লোক মৃত্যু ব্যক্তি দাফন করার পর কোরানে হাফেজ নিয়ে তার কবরের উপর তিন দিন পর্যন্ত বা কিছু কম-বেশি দিন পর্যন্ত কুরআন পড়ায় এবং ওই হাফেজ নিজের জন্য প্রতিদান গ্রহণ করে। এ ধরনের মূল্য দিয়ে হাফেজ বা আলেমের মাধ্যমে কোরান পড়ানো যাবে কিনা? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ কোরআন পড়ে তার প্রতিদান দেওয়া-নেওয়া হারাম। হারাম ভোগকারী শাস্তির উপযোগী, নাকি কোন ছাওয়াব পৌঁছবে। এর নিয়ম হল, হাফেজকে নির্দিষ্ট দিনের জন্য নির্দিষ্ট দামে কাজ-কর্ম করার জন্য নিয়োগ দেবে। তারপর তাকে বলবে, তোমার একটি কাজ হল-এতটুকু পর্যন্ত কবরের পাড়ে কোরআন পরে আস। এটা জায়েয। আল্লাহ তায়ালাই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা-৩৮ঃ রোগীর কাপড় বুবহার করার ব্যাপারে

৭ রবিউল আখির শরীফ, ১৩৩৮ হিজরী।

ওলামা-ই দ্বীন এ মাসআলার ব্যাপারে কি বলেন যে, কতেক লোক অসুস্থ লোকের সাথে খাওয়া-দাওয়া থেকে বেঁচে থাকতে চাই এবং সে রোগীর কাপড়-চোপড় পরিধান করে না। এ কথা বলে যে, রোগ একজন থেকে অন্য জনের কাছে ছড়িয়ে পড়বে। হাদীসে পাকের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা এসেছে কি না? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ এটা জঘন্য মিথ্যা কথা যে, একজনের রোগ অন্য জনের গায়ে চলে যাবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা ইরশাদ করেন لا عدوى কোন রোগ ছোঁয়াছে নয়। আরো বলেন যে, فمن اعدل الأوّل এ রোেগ অন্যজনের কাছে লেগে গেলে বলেন তো- এ প্রথম ব্যক্তির কাছে কোথেকে লেগেছে? যে রোগীর শরীর থেকে নাপাক বের হয় এবং তা কাপড়ের মধ্যে লাগে। যেমন আদ্র খোঁস-পাঁচড়া ওয়ালা লোকের অথবা আল্লাহর পানাহ! কুষ্টরোগীর কাপড় পরিধান করবে না। এ ধারণায় নয় যে, রোগ লেগে যাবে; বরং নাপাক থেকে বাঁচার জন্য। আর যার এরূপ হবে না তার কাপড় পরিধান করলে কোন অসুবিধা নেই। তার সাথে খাবার গ্রহণ করতে কোন দোষ নেই। ঈমান শক্তিশালী হতে হবে, যদি মাআযাল্লাহ! আল্লাহর পক্ষ থেকে তার এ রোগ হয়ে যায় তাহলে এ মনে করবে না যে, সাথে খাবার গ্রহণ করাতে অথবা তার কাপড় পরিধান করার কারণে হয়েছে। এ ধরনের না করলে হত না। যদি ঈমান দূর্বল হয় তাহলে সে ওই রোগী থেকে বেঁচে থাকবে। যার সম্বন্ধে সাধারণ লোকের মধ্যে কুপ্রথা চালু রয়েছে। যেমন কুষ্ট রোগী থেকে বেঁচে থাকা এ মনে করে নয় যে, সে রোগ লেগে যাবে। এটা তো অগ্রাহ্য এবং বাতিল। রবং এ খেয়াল রাখতে হবে যে, আল্লাহর কাছে পানাহ চাই! যদি আল্লাহর নির্ধারিত হয় তাহলে তা বাস্তব হবে। বিপরীত ধারণা করলে মনে করবে তার ঈমান শক্তিশালী নয়। শয়তানের কুমন্ত্রণার শিকার। তা প্রতিহত করতে হবে। আর যখন প্রতিহত করতে পারবে না তাহলে ভ্রান্ত আক্বিদায় পড়ে যেতে বাধ্য। এ জন্য তা থেকে বেঁচে থাকা বাঞ্চনীয়। এ ধরনের ব্যাপারে হাদীসের মধ্যে ইরশাদ হয়েছে-

فِرْعَنِ الْمُجْذُومٍ كَمَا تَفرم الأسد

কুষ্টরোগী থেকে পালাও যেমনিভাবে বাঘ থেকে তোমরা পলায়ন কর। আল্লাহ তায়ালাই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা-৩৯ঃ সালাতো সালাম কখন থেকে চালু হয়েছে?

২০ রবিউল আখির শরীফ, ১৩৩৮ হিজরী।

ওলামা-ই আহলে সুন্নাত ওয়ালা জামাআতের খেদমতে আরজ যে, ১১ রবিউল আখির ১৩৩৮ হিজরীতে আমি ষ্টেশন মসজিদে যোহরের নামায পড়তে গেলাম। মসজিদের ইমাম মির্যা সাহেব আযানের পর যোহরের নামায আদায় করলেন। চম্বল নিবাসী এক সঙ্গি মুহাম্মদ নবী আহমদ বলল- আপনি যে দরূদ পড়লেন তা তো বিদআত। কথা বলতে বলতে ওই সাহেব খুবই রাগান্বিত হয়ে গেল এবং বলল-অনেক শহরে গিয়েছি কিন্তু এই পদ্ধতি যা আপনি এখানে করেছেন তা দেখিনি। মির্যা সাহেব বলল-আমি আলেম নই যে আপনাকে বুঝাবো। যদি আপনি এ মাসআলা বুঝাতে চান, তাহলে আপনি আমার পাশ্ববর্তী শহরে চলুন, ওখানকার আলেম আপনাকে বুঝিয়ে দেবে। এতে সে রাজী না হয়ে বিদআত, বিদআত করতে বলল-কোন সাহাবী রাদ্বিআল্লাহু আনহুমের সময় এ দরূদ ছিল না। আমি ওই ব্যক্তিকে বললাম অধিকাংশ শহরে যেমন রামপুর ইত্যাদিতে নামাযের পরে দরূদ শরীফ চালু আছে। আমাদের আকা রাসূলে আকরাম নবী-ই মুআজ্জম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'র উপর দরূদ এবং সালাম পৌঁছানোকে আপনি বিদআত বলতেছেন। সাহাবা-ই কিরামের সময় এ মাদরাসা ও সরাই খানা ইত্যাদি ছিল না। এ গুলোকেও আপনি বিদআত বলবেন? তখন সে উত্তর দিল এটা হল বিদআতে মুবাহ। আমি বললাম-দরূদ শরীফ পড়া বিদআতে হাসনা। যার ছাওয়াব আমরা আহলে সুন্নাতেরই কিসমতে আল্লাহ জাল্লা শানুহু লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন। আর অস্বীকারকারী এ ছাওয়াব থেকে বঞ্চিত। এখন গুজারিশ হল এটাই যে, সালাতো সালাম কখন থেকে চালু হয়েছে? এ সম্পর্কে বিস্তারিত দলীল সহকারে বর্ণনা করবেন। এমন ব্যক্তি যারা আমাদের আক্বার উপর সালাতো সালাম পড়াকে বিদআত বলে, তারা গোমরাহ কি না? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ আপনি সঠিক উত্তর দিয়েছেন। এটা এমন কাজ যার জন্য আল্লাহ জাল্লা শানুহু কোরআনে আজীমের মধ্যে আম হুকুম প্রদান করেছেন এবং নিজের ও ফিরিশতাদের কাজ বলে ঘোষনা করেছেন। তাকে বিদআত বলে নিষেধ করা ওহাবীদের কাজ। আর ওহাবীরা ভ্রান্ত না হলে তো ইবলিশকেও গোমরাহ বলা যাবে না। তাদের গোমরাহী তো আরো মারাত্বক; ইবলীশের গোমরাহী আরো হালকা। সে তো মিথ্যাকে নিজের জন্যও পছন্দ করে না। এ জন্য সে الأعِبَادَكَ مِنْهُمُ المخلصين বলে বাদ করে দিয়েছে। এটা আল্লাহ জাল্লা শানুহুর উপর মিথ্যা অপবাদ দেওয়া। قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنِّي يُؤْفَكُونَ 'আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ধ্বংস করুক, তারা উল্টো কোন দিকে ফিরে যাচ্ছে। আযানের পরে সালাত সালাম দেওয়া অবশ্যই মুস্তাহসান। সাড়ে পাঁচশত বছরের চেয়েও অনেক পূর্বে ইসলামী শহর হারামাইন শরীফাইনে, মিসর, শাম, ইত্যাদি শহরে সালাতো সালাম প্রচলিত ছিল। দুররে মুখতারে আছে-

وَالتَّسْلِيمَ بَعْدَ الْأَذَانِ حَدِثَ فِي رَبِيعِ الْأَخِرِ ٧٨١ سنة سَبْعُ مِائَةٍ وَإِحْدَى وَثَمَانِينَ فِي عِشاء ليلة الإثنين ثُمَّ يَومَ الجُمُعَةِ ثُمَّ بَعْدَ عَشْرَ سِنِينَ حَدِثَ فِي الكُلِّ إِلَّا الْمُغْرِبُ ثُمَّ فِيْهَا مَرْتِينَ وَهُوَ بِدْعَةٌ حَسَنَةٌ

ইমাম সাখাবীর উক্তি

ال والصواب أنه بدعة حَسَنَة يَوْجَرُ فَاعِلَه

সঠিক কথা হল-তা বিদআতে হাসনা যার পালনকারী ছাওয়াবের অধিকারী হবে।

💠 মাসআলা-৪০ঃ তামাক পান করা হারাম না কি মাকরুহ?

২৯ রবিউল আখির, ১৩৩৮ হিজরী

আহলে শরীআতের কি হুকুম যে, তামাক পান করা হারাম না কি মাকরুহ? তামাক দ্বারা পান খাওয়ার অভ্যস্ত ব্যক্তি যদি তামাক দিয়ে পান খেয়ে কোরআন শরীফ পাঠ করে এবং অন্যান্য অযীফাসমূহ ও দরূদ শরীফ পাঠ ইত্যাদি করে তাহলে কেমন হবে? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ বিনা প্রয়োজনে মস্তিষ্কে বিকৃতি ঘটে এমন কিছু খাওয়া হারাম। মুখ দিয়ে গন্ধ বের হলে মাকরূহ। যদি সামান্য বিশেষ করে মেশক ইত্যাদি দিয়ে খুশবু করে পানের মধ্য দিয়ে খায় এবং প্রত্যেক বার খেয়ে ভাল করে কুলি করে মুখ পরিস্কার করে নেয় যে কারণে গন্ধ আসে না। তাহলে বিশদ্ধভাবে মুবাহ। গন্ধ থাকা অবস্থায় কোন অযীফা পড়া উচিত নয়। ভাল করে মুখ পরিস্কার করার পর অযীফা পাঠ করবে। দুর্গন্ধ অবস্থায় কোরআন শরীফ পাঠ করা আরো মারাত্মক। হ্যাঁ, যখন দুর্গন্ধ হবে না তাহলে দরূদ শরীফ, অযীফা ইত্যাদি পড়তে পারে। মুখের মধ্যে পান অথবা জর্দা থাকলে উত্তম হল ভাল করে পরিস্কার করে নেওয়া। কিন্তু কোরআন তেলাওয়াত করার সময় অবশ্য ভাল করে মুখ পরিস্কার করে নিতে হবে। ফিরিশতাদের কোরআন শরীফ পাঠ শুনার খুবই আগ্রহ থাকে। সাধারণ ফিরিশতাদেরকে কোরআন তেলাওয়াতের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। যখন মুসলমান কোরআন শরীফ পাঠ করে তখন ফিরিশতাগণ তার মুখের সাথে মুখ মিলিয়ে তেলাওয়াতের স্বাদ গ্রহণ করে। এ সময় যদি মুখে দুর্গন্ধময় খাদ্য লেগে থাকে তাহলে ফিরিশতাদের স্বাদ গ্রহণ করতে কষ্ট হয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

طَيِّبُوا أَفْوَاهُكُمْ بِالسَّوَاكِ فَإِنْ أَفْوَاهَكُمْ طَرِيقُ الْقُرْآنِ

তোমাদের নিজেদের মুখ মিসওয়াকের মাধ্যমে ভাল ভাবে পরিস্কার কর। কেননা তোমাদের মুখ হল কুরআনের রাস্তা। ইমাম সনজরী হাসান সূত্রে একজন সাহাবী থেকে তা বর্ণনা করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমায়েছেন-

إِذَا قَامَ أَحَدُكُمْ يَصَلَّى مِنَ اللَّيْلِ فَلْيَسْتِكْ إِنَّ أَحَدُكُمْ إِذَا قُرْءَ فِي صَلَاتِهِ وَضَعُ مَلَكَ فَاهُ عَلَى فِيْهِ وَلَا يَخْرُجَ مِنْ فِيْهِ شَيْءٍ إِلَّا دَخَلَ فَمُ الْمُلَكِ

যখন তোমাদের কেউ রাত্রি বেলায় তাহাজ্জুদের নামায পড়তে উঠে সে যেন মিসওয়াক করে। কেননা তোমাদের কেউ নামাযে কেরাত পড়লে ফিরিশতারা তার মুখের সাথে মুখ লাগিয়ে দেয়। তার মুখ থেকে কিছু বের হলে ফিরিশতার মুখে ঢুকে যায়। হযরত জাবির (রাঃ) সূত্রে বায়হাকী ও যিয়া তা বর্ণনা করেছেন। এটা সহীহ হাদীস। অপর হাদীসে আছে-

لَيْسَ شَيْء أَشَدَّ عَلَى الْمُلْكِ مِنْ رِيحِ الثَّمَرِ مَا قَامَ عَبْدُ إِلَى صَلُوةٍ قَط إِلَّا الْتَقَمْ فَاهُ مُلَكَ وَلَا يَخْرُجُ مِنْ فِيْهِ أَيَّةً إِلَّا يَدْخُلُ فِي فِي الْمَلَكَ

ফিরিশতার কাছে খাদ্যের গন্ধের চেয়ে কষ্টকর আর কিছু নেই। যখন বান্দা নামাযে

দাঁড়ায় তখন ফিরিশতা স্বীয় মুখকে তার মুখের সাথে লাগিয়ে দেয়। তার মুখ থেকে কোন আয়াত বের হতেই তা ফিরিশতার মুখে ঢুকে যায়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৪১ঃ মুসলিম প্রতিবেশীর অধিকার কি?

৩ জামাদিউল উলা, ১৩৩৮ হিজরী।

ওলামা-ই আহলে সুন্নাতের খেদমতে গুযারিশ যে, মুসলিম প্রতিবেশীর অধিকার কি? প্রতিবেশী কাফির, রাফেযী ও ওহাবী হলে তাদের অধিকার কি মুসলমানের অধিকারের মত? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ মুসলমান প্রতিবেশীর অনেক হক রয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি

ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ يُوْرِثُهُ

হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালাম আমাকে প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে এমন উপদেশ দিয়ে চলেছেন। এমনকি আমার ধারণা হল যে, তাদেরকে তর্কার উত্তরাধিকারী করে দেবেন। (বায়হাকী)

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো ইরশাদ করেন-

حَقِّ الْجَارِ عَلَى جَارِهِ إِنْ مُرْضَ عَدَتْهُ وَإِنْ مَاتَ شَيْعْتَهُ وَإِنْ اسْتَقْرَضَكَ اقْرَضْتُهُ وَإِنْ أَعْوَرَ سَتَرْتَهُ وَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ هُنَاتُهُ وَإِنْ أَصَابَتُهُ مَصِيبَةٌ عزيْنَهُ وَلَا تَرْفَعْ بِنَاكَ فَوْقَ بِنَاتَهُ فَتَسُدَّدَ عَلَيْهِ الرِّيحُ وَلَا تُؤْذِيهِ بِرِيحِ قَدْرِكَ إِلَّا أَنْ تَعْرِفُ لَهُ مِنْهَا

অর্থাৎ প্রতিবেশীর উপর অপরের হক হল এ যে, যদি তারা অসুস্থ হয় তাহলে তাকে দেখতে যাওয়া। আর ইন্তিকাল করলে তার জানাযায় হাজির হওয়া। সে যদি তোমার কাছ থেকে ধার চায় তাহলে তাকে কর্জ দিবে। তার কোন দোষ জানাজানি হয়ে যায় তাহলে তাকে গোপন করতে হবে। যদি তার কোন কল্যাণ হয় তাহলে ধন্যবাদ জানাবে। যদি কোন বিপদ আসে তাহলে তাকে সান্তনা দিবে। দেওয়াল তার দেওয়াল থেকে এতটুকু উঁচু করবে না যেন তার ঘরের ভিতর বাতাস আসতে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি হয়। নিজের ডেকসির খুশবু দ্বারা তাকে কষ্ট না দেওয়া, কিন্তু এটা করবে যে, ওই খাবার থেকে তাকে কিছু অংশ দেবে। (অর্থাৎ তুমি ধনী সে হল গরীব, তোমাদের ঘরে ভাল খাবার পাকানো হলে সুগন্ধি তার নিকট পৌছে, আর সে উত্তম খাদ্য পাকাতে সামর্থবান নয়, তা থেকে সে কষ্ট পাবে, এ জন্য এর থেকে তাকেও দিতে হবে। যেন এ কষ্ট লাঘব হয়ে যায়। (ত্ববরানী শরীফ)

রাফেজী এবং ওহাবীর কোন হক নেই যে, তারা তো মুরতাদ। কোন কাফির গায়রে যিম্মি এবং সকল কাফিরের একই অবস্থা। তাদের বেলায় শুধুমাত্র এতটুকু থাকবে যে, তাদের সাথে কোন তাল বাহানা ও অঙ্গীকার ভঙ্গ জায়েয নেই। আল্লাহ তায়ালাই ভাল জানেন।

লিখকঃ আবদুহুল মুযনেব আহমদ রেযা উফিয়া আনহু বিমুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

💠 মাসআলা-৪২ঃ নিয়ায ও ফাতিহার মধ্যে পার্থক্য কি? নিয়ায ও ফাতিহা দেওয়ার মুস্তাহাব পদ্ধতি এবং যার নিয়ায-ফাতিহা দেয়া হয় তার নিকট কোন পদ্ধতিতে কিভাবে ছাওয়াব পৌছাবে?

১২ জামাদিউল উলা, ১৩৩৮ হিজরী

দ্বীনের পথ প্রদর্শকগণ ও মজবুত শরীয়তের মুফতিগণের অভিমত কি যে, নিয়ায ও ফাতিহার মধ্যে পার্থক্য কি? নিয়ায ও ফাতিহা দেওয়ার মুস্তাহাব পদ্ধতি এবং যার নিয়ায-ফাতিহা দেয়া হয় তার নিকট কোন পদ্ধতিতে কিভাবে ছাওয়াব পৌছাবে?

সে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি ব্যতীত অন্যান্য মুসলমানদের নিকট কিভাবে ছাওয়াব পৌঁছাবে? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ মুসলমানদের দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর কুরআন মজীদ পড়ে অথবা খাবার ইত্যাদির ব্যবস্থা করে যে ছাওয়াব পৌঁছায় উহাকে ওরফে 'ফাতিহা' বলে। এতে সূরা ফাতিহা পড়া হয়। আউলিয়া কেরামের উপর যে ইসালে ছাওয়াব করা হয় ওটাকে সম্মানার্থে 'নযর নিয়ায' বলে।

সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, তিনবার বা সাতবার অথবা এগার বার সূরা ইখলাস প্রথমে ও শেষে তিন বা এর চেয়ে অধিক বার দরূদ শরীফ পড়বে, এরপর দু'হাত উঠায়ে আরয করবে যে, হে আমার প্রভু! আমার এ পড়াতে (আর যদি খাবার ও অন্যান্য কিছু আয়োজন হয়ে থাকে তবে এগুলোর নামও অন্তর্ভুক্ত করবে। সংক্ষেপে এ পড়াতে ও এ সমস্ত বস্তু ফাতিহাতে) যে ছাওয়াব আমাকে দেয়া হয়েছে আমার আমল অনুপাতে নয়, আপনার মেহেরবানী অনুযায়ী দান করুন। উহাকে আমার পক্ষ হতে অমুক আল্লাহর অলী, যেমন হুযুর পুরনূর সায়্যিদুনা গাউসে আযম (রাঃ) এর দরবারে নযর পৌঁছায়ে দিন। তাঁর পিতা-মাতা মশায়েখে কেরাম ও সম্মানিত আওলাদ, মুরীদগণ, মুহিব্বীনগণ, আমার মাতা পিতা, অমুক অমুক এবং সায়্যিদুনা আদম (আঃ) হতে রোজ কিয়ামত পর্যন্ত যত মুসলমান অতিবাহিত হয়েছে বা হচ্ছে বা কিয়ামত পর্যন্ত হবে সবার উপর। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৪৩ঃ চুলে কলপ লাগানো জায়েয নাকি নাজায়েয?

২৪ জামাদিউল উল ১৩৩৮ হিজরী।

ওলামায়ে আহলে সুন্নাতগণের কি হুকুম যে, চুলে কলপ লাগানো জায়েয নাকি নাজায়েয? কোন কোন আলেমগণ জায়েযের ফতোয়া দেন। বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ লাল ও হলদে খিযাব উত্তম এবং হলদে সবচেয়ে ভাল, কালো খিযাবকে হাদীস শরীফে কাফিরের খিযাব বলা হয়েছে। অন্য হাদীসে আছে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার মুখ কালো করে দিবেন তা হারাম। জায়েযের ফতোয়া বাতিল, বর্জনীয়। আমার ফতওয়ায় এ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহই ভাল জানেন।

💠 মাসআলা- ৪৪:  রাফেযী, ওহাবী, কাদিয়ানীর যবাইকৃত প্রাণী জায়েয- না জায়েয? যখন তারা 'বিসমিল্লাহ' বলে যবেহ করবে, এবং কাফির আহলে কিতাব ঈসায়ী, ইহুদীদের যবেহকৃত প্রাণীর হুকুম কি?

জামাদিউল উলা, ১৩৩৮ হিজরী।

রাহবরানে দ্বীন ও মুফতিয়ানে শরয়ে মতীন কি বলছেন যে, রাফেযী, ওহাবী, কাদিয়ানীর যবাইকৃত প্রাণী জায়েয- না জায়েয? যখন তারা 'বিসমিল্লাহ' বলে যবেহ করবে, এবং কাফির আহলে কিতাব ঈসায়ী, ইহুদীদের যবেহকৃত প্রাণীর হুকুম কি? যখন তারা 'বিসমিল্লাহ' বলে যবেহ করবে। আর মুসলিম মহিলাও যবেহ করতে পারে কি না? যখন কোন পুরুষ ওখানে না থাকে। বিস্তারিত বর্ণনা করুন প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ যবেহ শুদ্ধভাবে হলে মহিলার যবেহকৃত পশু বৈধ। ইহুদীদের যবেহকৃত পশু হালাল যদি আল্লাহর নামে যবেহ করে। অনুরূপ প্রকৃত নাসারাদের যবেহকৃত পশু হালাল। ন্যাচারী ও প্রকৃতিবাদী যারা বর্তমান কালের নব্য নাসারা তাদের যবেহকৃত পশু হালাল নয়। কালিমা পড়ুয়া ন্যাচারী ইসলামের দাবী করলেও তাদের যবেহকৃত পশু মৃতের বিধান রাখে। অনুরূপ রাফেযী তাবাররায়ী (হযরত আলী রাঃ কে প্রধান্য দানকারী), ওহাবী দেওবন্দী, ওহাবী গায়রে মুকাল্লাদ, কাদিয়ানী, ছাকডালভী, ন্যাচারী এসবের যবেহকৃত পশু নাপাক, মৃত ও নিঃসন্দেহে হারাম। লাখো বার আল্লাহর নাম নিলেও, অত্যন্ত পরহেজগারী অবলম্বন করলেও তারা সকলেই মুরতাদ। মুরতাদের যবেহকৃত পশু হালাল নয়। তবে যে রাফেযীরা হযরত আলীকে প্রাধান্য দেয় না তাদের যবেহকৃত পশু হালাল। যদি তারা ধর্মীয় জরুরী বিষয়কে নিজেরা অস্বীকার না করে এবং অস্বীকারকারী রাফেযী ও অন্যান্যদেরকে মুসলমান মনে না করে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৪৫ঃ রাফেযী, ওহাবী, কাদিয়ানীরা কি কাফির কিতাবী থেকেও মারাত্বক?

২৫ জামাদিউল আখির, ১৩৩৮ হিজরী।

আহলে শরীয়তের ওলামা-ই কেরামের অভিমত কি যে, এক রামপুরী ব্যক্তি তার সহকর্মীকে প্রশ্ন করল-তুমি আ'লা হযরত থেকে জিজ্ঞাসা কর-আমি আলেমদের মুখে শুনেছি, কাফির কিতাবীদের সাথে বিয়ে বৈধ তবে রাফেযী তাবাররায়ী, ওহাবী, কাদিয়ানীদের সাথে হারাম। প্রকৃতপক্ষে বিয়ে নয়, তা হবে যেনা। আসলে রাফেযী, ওহাবী, কাদিয়ানীরা কি কাফির কিতাবী থেকেও মারাত্বক? রাফেযীরা খোলাফা-ই কেরামকে অপবাদ দিয়ে, ওহাবীরা নবীর অবমাননা করে এবং কাদিয়ানীরা নবুয়তের দাবী করে কাফির হয়ে গেছে। তারা তো কালিমা পড়ে এবং মুসলমানের মত নামায, রোযা ইত্যাদি আমলও করে। পক্ষান্তরে কাফির কিতাবীরা রাসুলকে মানে না, নামায ও রোযা ইত্যাদি ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অস্বীকার করে। এতদসত্ত্বেও রাফেযী, ওহাবী ও কাদিয়ানীদের বিয়ে নাজায়েয হলে কাফির কিতাবীর সাথে বিয়ে তো উত্তমভাবে নাজায়েয হওয়া উচিত। এ কথা বলা হয়, মুসলিম পুরুষ রাফেযী, ওহাবী ও কাদিয়ানী মহিলাকে বিয়ে করতে পারবে এ ধারণায় যে- সে তো আমার হুকুমের অধীনে থাকবে, তাকে বুঝিয়ে যে কোন ভাবে মুসলমান করে নেয়া যাবে। এ সবের বিধান কি? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ তেত্রিশ নম্বর মাসআলা দেখলে এর উত্তর স্পষ্ট হয়ে যায়। দুনিয়ার

বিধানে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হল মুরতাদ। আর মুরতাদের মধ্যে অতি দুষ্ট মুরতাদ মুনাফিক। রাফেযী, ওহাবী, কাদিয়ানী, ন্যাচারী, ছাকডালভী-যারা মুখে কালিমা পড়ে, নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করে, নামায দোয়া আদায় করে, ওহাবীরা তো কুরআন-হাদীসের শিক্ষা দেয়, দেওবন্দীদের কিতাব-পত্রও মানে, এমন কি চিশতী, নক্সবন্দী দাবী করে পীর-মুরিদীর বেশ ধরে থাকে, আলেম-মাশায়েখদের বুলি উড়ায়। এ সব সত্ত্বেও তারা রাসুলের শানে বেয়াদবি ও মানহানি করে। ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অস্বীকারে করে। মুখে কালিমা পড়ে, মুসলমান দাবী করে, কথায় কাজে মুসলমানী প্রকাশ করার কারণে তারা ইহুদী, নাসারা, বৃতপূজারী, অগ্নিপূজক সকলের চেয়ে মারাত্বক ক্ষতিকর ও দুষ্ট হয়েছে। কারণ তারা ইসলামে ঢুকে ফিরে গেছে, জেনেশোনে উল্টে গেছে, তারা অন্ধ হয়েছে বুঝেসুজে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ذَالِكَ بِأَنَّهُمْ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا فَطِيعُ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ

তা এ জন্য যে, তারা ঈমান এনেছে, অতপর কাফির হয়েছে। তাদের অন্তরে মহর মেরে দেয়া হয়েছে। সুতরাং তারা বুঝছে না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৪৬ঃ মানি চেঞ্জারের কাজ করার ব্যাপারে

৭ রজব, ১৩৩৮ হিজরী।

এ বিষযে হানাফী ওলামা-ই কেরাম কি বলেন যে, যায়দ নিম্ন পদ্ধতিতে মানি চেঞ্জারের কাজ করে-

ক. রূপিয়ার পরিবর্তে চাঁদি লিপি দিয়ে থাকে।

খ. পূরো গিল্টি (এক প্রকারের মুদ্রা) প্রদান করে।

গ. পূর্ণ ষোল আনা পয়সা।

ঘ. চাঁদি, গিল্টি, পয়সা সব মিলিয়ে ষোল আনা দিয়ে থাকে।

ঙ. উপরোল্লেখিত চার পদ্ধতিতে লেনদেনের সময় এক পয়সা করে কম দেয়।

চ. সে পদ্ধতিতে কারেন্সি নোট বা সিকি বা প্রত্যেকটিতে এক পয়সা করে দেয় কম।

ছ. শতে নিরান্নব্বই করে বিক্রি করে আর ক্রেতা স্বাচ্ছন্দে নিয়ে যায়। এ সব পদ্ধতি বৈধ কি না? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ উভয় দিকে চাঁদি হলে দু'টি বিষয় জরুরী। এক. দাঁড়ি পাল্লা দিয়ে সমভাবে ওজন করা। দুই. একই বৈঠকে নগদ আদায় করা। ক্রেতা বিক্রেতাকে দিবে আর বিক্রেতা ক্রেতাকে দিবে। তাতে বেশ-কম হলে হারাম। এক পক্ষে রূপিয়া অপর পক্ষে চাঁদি, গিল্ট, পয়সা বা নোট হতে হবে। তবে যে কোন এক পক্ষ হস্তগত করতে হবে। যদি বেচাকেনা করে আর বিক্রেতা ক্রেতাকে বিক্রিত বস্তু না দেয়, ক্রেতা মূল্য না দেয় তাহলে হারাম। এক পক্ষ কবজা হলে অপর পক্ষ কবজা না হলেও বৈধ। এমতাবস্থায় বেশ-কমে বিক্রি করা জায়েয। উপরোল্লেখিত সকল প্রশ্নের উত্তর হয়ে গেল। তা হল বেচাকেনার বিধান। রূপিয়া, গিল্ট, পয়সা বা নোট কর্জ দিয়ে এক পয়সাও বেশি নিলে তা অবশ্যই হারাম এবং তা সুদ। আল্লাহ তায়ালা বলেন- أَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعُ وَ حَرَّمُ الرَّبُوا আল্লাহ বেচাকেনাকে হালাল ও সুদকে হারাম ঘোষনা করেছেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৪৭ঃ গ্রামে অনেক সময় মুসলমান ছাগল যবেহ করে চলে যায়। গোস্ত ভাগ ভাটোয়ারা করে হিন্দুরা বিক্রি করে। এরূপ গোস্ত খাওয়া মুসলমানের জন্য উচিত হবে কি না?

১৫ রজব, ১৩৩৮ হিজরী।

এ প্রসংগে ওলামা-ই কেরামের অভিমত কি যে, গ্রামে অনেক সময় মুসলমান ছাগল যবেহ করে চলে যায়। গোস্ত ভাগ ভাটোয়ারা করে হিন্দুরা বিক্রি করে। এরূপ গোস্ত খাওয়া মুসলমানের জন্য উচিত হবে কি না? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ হারাম, কাফির যদি বলে যে, এটি সে ছাগল যা মুসলমান যবেহ করেছে, তার কথা আমলে নেয়া যাবে না। কারণ ধর্মীয় বিষয়ে কাফিরের কথা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে যদি যবেহ থেকে বিক্রয় পর্যন্ত মুসলমানের সামনে থাকে। কোন না কোন মুসলমান তা দেখছে। যে কারণে এটা নিশ্চিত যে, তা মুসলমানের যবেহকৃত পশু। তাহলে তা বৈধ। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৪৮ঃ সন্তানের উপর মাতাপিতার কি অধিকার আছে?

২৮ রজব, ১৩৩৮ হিজরী।

সন্তানের উপর মাতাপিতার কি অধিকার আছে? এ প্রসংগে ওলামা-ই কেরামের অভিমত কি? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ সন্তানের উপর মাতাপিতার এত বেশি অধিকার রয়েছে যে কারণে আল্লাহ তায়ালা তাঁর মহান অধিকারের সাথে উল্লেখ করেছেন। ان اشكر لى وَلِوَالِدَيْكَ আমার এবং তোমার মাতাপিতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৪৯: মর্সিয়া (শোক গাঁথা কবিতা) শোনা, নিয়ায নেওয়া বিশেষ করে আটই মুহাররম তাদের অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে কোন কিছু খাওয়া বৈধ কিনা?

আহলে শরীয়তের অভিমত কি যে, রাফেযীদের অনুষ্ঠানে যাওয়া, মর্সিয়া (শোক গাঁথা কবিতা) শোনা, নিয়ায নেওয়া বিশেষ করে আটই মুহাররম তাদের অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে কোন কিছু খাওয়া বৈধ কিনা? মুহাররমে কতেক মুসলমান সবুজ কাপড় বা কালো কাপড় পরিধান করার বিধান কি? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ সেখানে যাওয়া ও মর্সিয়া শোনা হারাম। তাদের নিয়াযের বস্তু গ্রহণ করা যাবে না। তাদের নিয়ায মূলতঃ নিয়ায নয়; বরং নাপাক। অন্ততঃ তাদের নাপাক হত্তির পানি অবশ্যই থাকবে। সেটা অভিশপ্ত জায়গা। অভিশাপের স্বীকার হবে। মুহাররম মাসে সবুজ ও কালো কাপড় পরা শোকের চিহ্ন। তা হারাম। বিশেষতঃ কালো কাপড় পরা দুষ্ট রাফেযীদের বৈশিষ্ট। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৫০: মুহাররম মাসের ব্যাপারে

১১ মুহাররম, ১৩৩৯ হিজরী।

নিম্নলিখিত মাসআলা প্রসংগে ওলামা-ই কেরামের অভিমত কি?

ক. কতেক সুন্নী দশই মুহাররম রুটি পাকানো ও ঝাড়ু দেয়া নিষেধ করে। বলে যে, দাফনের পরের দিন মাতম করা ও বুটি পাকানো যাবে।

খ. দশ দিন পর্যন্ত কাপড় বদলায় না।

গ. মুহাররম মাসে কোন বিয়ে শাদীর আয়োজন করে না।

ঘ. সে দিনগুলোতে ইমাম হাসান ও হুসাইন (রাঃ) ব্যতিত অন্য কারো ফাতিহা-নিয়াযের ব্যবস্থা করে না। এ সব জায়েয কি না? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ প্রথম তিনটি শোক। আর তা হারাম। চতুর্থটি অজ্ঞতা। প্রতি মাসে প্রত্যেক তারিখে অলী ও মুসলমানের ফাতিহা-নিয়ায দেয়া যাবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৫১ঃ  যদি কোন সৈয়দ সাহেব মাথায় এত চুল রাখে যাকে ঝুলন্ত কেশরাজি বলা যায়। এত বেশি দীর্ঘ চুল রাখা বৈধ কি না?

১৫ মুহাররম, ১৩৩৯ হিজরী।

এ মাসআলা প্রসংগে আলেম ও ফকীহগণের অভিমত কি? যদি কোন সৈয়দ সাহেব মাথায় এত চুল রাখে যাকে ঝুলন্ত কেশরাজি বলা যায়। এত বেশি দীর্ঘ চুল রাখা বৈধ কি না? শোনা কথা যে, হযরত ইমাম হাসান ও হুসাইন রাঃ'র কেশরাজি কাঁধ পর্যন্ত ঝুলন্ত ছিল। বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ কাঁধ পর্যন্ত বাবরী চুল রাখা জায়েয; বরং সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত। কাঁধের নীচ পর্যন্ত চুল রাখা মহিলাদের বৈশিষ্ট। পুরুষের জন্য হারাম। নবী করীম (দঃ) ফরমায়েছেন- 

لَعَنَ اللهُ تعالى المتشبهين بالنساء 

আল্লাহ তায়ালা মহিলা সদৃশ আরোপকারীদের লা'নত করেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৫২ঃ ইমামতি কার জন্য জায়েয, কার জন্য নাজায়েয এবং মাকরুহ?

২১ মুহাররম, ১৩৩৯ হিজরী।

ইমামতি কার জন্য জায়েয, কার জন্য নাজায়েয এবং মাকরুহ? কোন ব্যক্তির ইমামতি সবচেয়ে উত্তম। এ সম্পর্কে ওলামা-ই কেরামের অভিমত কি? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ যে কিরাতে এমন ভুল পড়ে যার কারণে অর্থ ফাসিদ হয়, বা অজু-গোসল শুদ্ধভাবে করে না, ধর্মীয় জরুরী বিষয়ের অস্বীকার করা, যেমন-ওহাবী, রাফেযী, গায়রে মুকাল্লাদ, ন্যাচারী, কাদিয়ানী, ছাকডালভী প্রমুখের পিছনে নামায একেবারে বাতিল।

যাদের গোমরাহী কুফরি পর্যন্ত পৌঁছে নি, যেমনঃ ফেরকা-ই তাফযীলিয়া যারা হযরত আলীকে শায়খাইনের উপর প্রাধান্য দেয়। অথবা তাফসীকিয়া-যারা হযরত আমীরে মুয়াবিয়া, আমর বিন আ'স, আবু মুসা আশয়ারী এবং মুগীরা বিন শো'বা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমকে গালমন্দ করে। এ সবের পিছনে নামায মাকরুহ। তাদেরকে ইমাম নিয়োগ দেয়া হারাম। তাদের পিছনে নামায পড়া গুনাহ। পড়িত নামাযকে পুনরায় পড়া ওয়াজিব।

প্রকাশ্য ফাসিক তাদের কাছাকাছি বিধান রাখে। প্রকাশ্য ফাসিক, যেমন-দাড়ি মুন্ডানো, লোম নাশক ব্যবহার করা, শরয়ী সীমা থেকে কর্তন করা, মহিলার মত কাঁধের নীচে চুল রাখা, বিশেষ করে যে খোঁপার উপর বেণী বাধে, রেশমী কাপড় পরিধান করা, পুরো আবৃতকারী টুপি পরা, সাড়ে চার মাশার (তিন রত্তিতে এ মাশা) চেয়ে অধিক ওজনের আংটি পরা, কয়েকটি পাথরের একটি আংটি, বা এক পাথরের দু'টি আংটি যদিও তা সাড়ে চার মাশার চেয়ে কম ওজনের হয়। সুদ খাওয়া বা নাচ গান দেখা। এসব দোষে দোষী ব্যক্তির পিছনে নামায পড়া মাকরুহ। যে প্রকাশ্য ফাসিক নয়, কিরাতে এমন ভুল করে যার কারণে নামায ফাসিদ হয় না, অন্ধ, অজ্ঞ, গোলাম, জারজ সন্তান, চ্যাংরা সুন্দর ছেলে, কুষ্ঠ রোগী, শ্বেত রোগী-যাকে লোকেরা অপছন্দ ও ঘৃনা করে। এ সকল ব্যক্তির পিছনে নামায পড়া মাকরুহে তানযিহী। উত্তমতার বিপরীত, পড়ে থাকলে অসুবিধা নেই। এ প্রকারের ব্যক্তি যদি উপস্থিত লোকের মাঝে জরুরী মাসআলায় ভাল জ্ঞান রাখে তাহলে তাদের ইমামতি উত্তম। প্রথমোক্ত দু'প্রকার তার বিপরীত। যদিও জ্ঞানের সাগর হয়। তবে যদি ঈদ ও জুমা এক জায়গায় হয় আর সেখানে বিদআতী বা প্রকাশ্য ফাসিক ব্যতিত অন্য কোন ইমাম না থাকে তাহলে তাদের পিছনে নামায পড়া যাবে। প্রথম প্রকার তথা দেওবন্দীরা তার বিপরীত। তাদের নামায কোন নামায নয়। তাদের পিছনে কিসের নামায? যদিও তারা জুমা ও ঈদের নামাযে ইমামতি করে আর অন্য ইমাম না থাকে তাহলে জুমা ও ঈদের নামায বর্জন করা ফরয। জুমার বদলা যোহরের নামায পড়বে। ঈদের নামাযের কোন বিকল্প নেই। ইমাম নিয়োগ করতে হবে সুন্নী আকীদাধারী, কিরাত ও পাক-নাপাকের ব্যাপারে শুদ্ধ, নামাযের মাসআলা সম্পর্কে বিজ্ঞ, ফাসিক হতে পারবে না, এমন কোন দৈহিক ও আত্নীক দোষ থাকতে পারবে না যার কারণে মানুষের ঘৃনার উদ্রেক হয়। এটাই উল্লোখিত প্রশ্নের জবাবের সারাংশ। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৫৩ঃ স্বামী-স্ত্রী একে অপরের উপর কি অধিকার রয়েছে?

১ সফর, ১৩৩৯ হিজরী।

স্বামী-স্ত্রী একে অপরের উপর কি অধিকার রয়েছে? এসম্পর্কে ওলামা-ই কেরামের অভিমত কি? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার হল খরচ-পাতি দেওয়া, থাকার ঘরের ব্যবস্থা করা, সময় মত মহর আদায় করা, সদাচরণ করা, শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ থেকে রক্ষা করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالمَعْرُوفِ 

তোমরা তাদের সাথে সদাচরণ করো।

আল্লাহ আরো বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَ أَهْلِيكُمْ نَارًا 

হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও স্বীয় পরিবারকে দোযখ থেকে রক্ষা করো।

স্বামীর অধিকার স্ত্রীর উপর বিশেষ করে দাম্পত্য জীবনের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াদিতে আল্লাহ ও রাসুলের অধিকারের পর এমন কি মাতাপিতার চেয়েও অনেক বেশি। দাম্পত্য জীবন সংক্রান্ত বিষয়ে তার অনুগত হওয়া এবং স্বামীর মান-সম্মানের প্রতি দৃষ্টি রাখা অত্যাবশ্যক। তার অনুমতি ব্যতিরেকে মুহরিমদের নিকট ছাড়া কোথাও যাওয়া যাবে না। মুহরিমদের মধ্যে মা-বাবার কাছে প্রতি আট দিন অন্তর। তাও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। ভাই-বোন, চাচা-চাচী, মামা, খালা, ফুফীদের কাছে বছরের মাথায়। রাত্রে কোথাও যাওয়া যাবে না। নবী করীম (দঃ) ইরশাদ করেন-যদি আমি আল্লাহ ব্যতিত অন্য কাউকে সাজদা করার নির্দেশ দিতাম তবে স্ত্রীকে হুকুম দিতাম যেন সে আপন স্বামীকে সাজদা করে। অপর এক হাদীসে আছে-যদি স্বামীর নাশারন্দ থেকে রক্ত ও পুঁজ প্রবাহিত হয়ে তা পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত দেহে ভরে যায় আর স্ত্রী আপন জিহবা দিয়ে লেহন করতঃ তা পরিস্কার করে দেয়, তবু তার হক আদায় হবে না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৫৪ঃ কতেক লোক খালি মাথায় নামায নিজে পড়ে এবং পড়ায়। দাবী করে-আমরা আল্লাহর সামনে কাকুতি-মিনতি করি। তাতে কোন অসুবিধা আছে কি? আর নামায মাকরুহ হবে কি না?

২৯ সফর, ১৩৩৯ হিজরী।

এ বিষয়ে আহলে শরীয়তের বিধান কি যে, কতেক লোক খালি মাথায় নামায নিজে পড়ে এবং পড়ায়। দাবী করে-আমরা আল্লাহর সামনে কাকুতি-মিনতি করি। তাতে কোন অসুবিধা আছে কি? আর নামায মাকরুহ হবে কি না? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ যদি কাকুতি-মিনতির উদ্দেশ্যে খালি মাথায় নামায পড়ে তবে কোন অসুবিধা নেই। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৫৫ঃ বিছমিল্লাহ পড়ে যবেহ করতেই প্রথম দফা প্রাণীর মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মাথা চামড়ার সাথে কিছুটা লাগানো আছে। এমতাবস্থায় তা খাওয়া বৈধ হবে কিনা?

৬ রবিউল আউয়াল শরীফ, ১৩৩৯ হিজরী।

রাহবরানে দ্বীন ও মুফতিয়ানে শরয়ে মতীন কি বলছেন যে, বিছমিল্লাহ পড়ে যবেহ করতেই প্রথম দফা প্রাণীর মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মাথা চামড়ার সাথে কিছুটা লাগানো আছে। এমতাবস্থায় তা খাওয়া বৈধ হবে কিনা? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ উভয় অবস্থায় জায়েয। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৫৬ঃ ফাতিহার তৃতীয় দিনে চনা সামনে রেখে কালিমা তায়্যিবা পড়িত খাদ্য ভক্ষণ করা কেউ কেউ অপছন্দনীয় মনে করে। বলে বেড়ায় -অন্তর কালো হয়ে যায়। এ কথা শুদ্ধ কি না? সে কথা শুদ্ধ হলে ফাতিহার উক্ত জিনিষ কি করবে?

১২ রবিউল আউয়াল শরীফ, ১৩৩৯ হিজরী।

ওলামা-ই কেরামের অভিমত কি? ফাতিহার তৃতীয় দিনে চনা সামনে রেখে কালিমা তায়্যিবা পড়িত খাদ্য ভক্ষণ করা কেউ কেউ অপছন্দনীয় মনে করে। বলে বেড়ায় -অন্তর কালো হয়ে যায়। এ কথা শুদ্ধ কি না? সে কথা শুদ্ধ হলে ফাতিহার উক্ত জিনিষ কি করবে? এক এলাকায় তৃতীয় দিনের ফাতিহার চনা মুসলমানেরা আপন আপন অংশ নিয়ে মুশরিক ও চামারদেরকে দিয়ে দেয়। সেখানে এ নীতি সর্বদা প্রচলিত। কালিমা পড়িত সে ফাতিহার চনাকে মুশরিক-চামারদেরকে দেওয়া উচিত কি না? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ ফাতিহার বস্তু ধনীরা নেবে না; ফকিরেরা নেবে। যারা সে গুলোর আশায় অপেক্ষা করে আর তা পেয়ে খুশি হয় তাদের অন্তর কালো হয়। মুশরিক ও চামারদেরকে তা দেওয়া গুনাহ! গুনাহ! ফকিরেরা নিজেরা খাবে। ধনীরা নেবে না; নিলেও তা ফকির মুসলমানকে দিয়ে দেবে। এটা সাধারণ ফাতিহার হুকুম। অলীগণের নিয়ায কুলখানি নয়; বরং তাবাররুক। মান্নতে শরয়ী না হলে ধনী-নির্ধন সকলে খেতে পারে। মান্নতে শরয়ী হলে তখন ফকির ব্যতিত অন্য কারো জন্য জায়েয নেই। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৫৭ঃ যবেহ করে পারিশ্রমিক নেয়া জায়েয কি না? তার পিছনে নামায সঠিক হবে কি না? সে ব্যক্তির ইমামতি কেমন হবে?

১৫ রবিউল আউয়াল শরীফ, ১৩৩৯ হিজরী।

সম্মানিত ওলামা-ই কেরাম! এ মাসআলা প্রসংগে আপনাদের অভিমত কি যে, যায়দ গরু-ছাগলকে যবহের স্থানে টেনে নিয়ে যায়। প্রতিটি পশুর বিনিময়ে দু'পয়সা বা এক আনা নিয়ে নেয়। তা দিতে সক্ষম না হলে অনেক সময় যবেহকৃত পশুর মাংস নিয়ে নেয়। সে ইমামতিও করে। এখন প্রশ্ন হল যবেহ করে পারিশ্রমিক নেয়া জায়েয কি না? তার পিছনে নামায সঠিক হবে কি না? সে ব্যক্তির ইমামতি কেমন হবে? কারো মন্তব্য সেই গোস্ত খাওয়া কুরআন-হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নেই। কারো বক্তব্য-নবীজি স্বীয় যামানায় গাভী যবেহ করতঃ তার গোস্ত পাকায়ে তাতে আঙ্গুল ভিজিয়ে তা চোষেছেন। সে সময় নবীজি কয়েক দিনের ভূখা ছিলেন। মানুষেরা গোস্তকে খুব মজাদার খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে বিধায় আপনার থেকে কুরআন হাদীসের দলীলসহ তার বিস্তারিত বর্ণনা কামনা করছি। বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ যবেহ করে পারিশ্রমিক নেয়াতে কোন আসুবিধা নেই। لِأَنَّهُ لَيْسَ بِمُعْصِيَةِ وَ لَا وَاجِبُّ مُتَعَيَّنَ عَلَيْهِ কেননা পাপের কাজ নয়; আর নির্ধারিত কর্তবও নয়। তবে যবেহ করার পর এ পরিমাণ গোস্ত দিতে হবে বলে দাবী করা বৈধ নয়। কিছু দিলে বড় ক্ষতি হবে না। لِأَنَّهُ كَقَفِيزِ الطَّحَانِ তা তো বিস্তৃত ভূমি থেকে এক কফীয নেওয়ার মত। বৈধ যবহের উপর পারিশ্রমিক নিলে তার পিছনে নামায পড়তে সে জন্যে কোন অসুবিধা নেই। তার ইমামতি বৈধ, শরয়ী অন্য কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকলে। গোস্ত খাওয়া কুরআন-হাদীস ও ইজমা-ই উম্মত দ্বারা সাব্যস্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-

ক. كلوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسُ الْفَقِيرُ

তোমরা যবেহকৃত পশু থেকে খাও এবং অভাবী নিঃস্বদেরকে খাওয়াও।

খ. فَمِنْهَا رُكُوبُهُمْ وَمِنْهَا يَأْكُلُونَ

জীবের মধ্যে কিছু রয়েছে সওয়ার হওয়ার এবং কিছু খাওয়ার।

গ. وَمَا لَكُمْ أَلَّا تَأْكُلُوا مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ

যে জীবের উপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়েছে, তা থেকে তোমাদের না খাওয়ার কারণ কি?

নবীজি উপবাস থাকার সে কাহিনীর আগামাথা নেই, তা মিথ্যা, বানোয়াট। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৫৮ঃ শাজরা ও সিলসিলার ব্যাপারে

২৭ রবিউল আউয়াল শরীফ, ১৩৩৯ হিজরী।

এ বিষয়ে ওলামা-ই দ্বীনের অভিমত কি যে, যায়দ বলেছে-শাজরা পড়া একটি ধোকার ফাঁদ। সে প্রসংগে বাহারিস্তানের মাওলানা জামী'র নিম্নলিখিত ইবারত সে নকল করেছে-

از حضرت سید بہاء الدین صاحب نقشبند پرسیدند که از حضرت شجرة شما چیست فرمودند کہ کسے از شجرہ خوانی بجائے نرسد پس خدائے عز وجل را بیگانگی شناسیم و ہمہ انبیاء و اولیاء ایمان اریم و مقید سلسله نیستیم

হযরত খাজা সৈয়দ বাহাউদ্দীন (রহঃ)'র নিকট লোকেরা জিজ্ঞাসা করল- হুযুর আপনার শাজরা কি? কেউ শুধু শাজরা পড়ে কোন উচ্চ মরতবায় পৌঁছতে পারেনি। আমরা আল্লাহকে কোন উপমা ছাড়া চিনতে পারি। আমরা সমস্ত নবী-অলীদের প্রতি বিশ্বাস রাখি। বিশেষ কোন সিলসিলার অনুসারী নই।-এ উক্তি শুদ্ধ কি না? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ এটা নিরেট বাতিল। এ কথায় হাজারো আউলিয়া কেরামের প্রতি হামলা হয়েছে। বাহারিস্তানের যে ইবারত নকল করা হয়েছে তা বানোয়াট, জাল। সেখানে শাজরা পড়ার কোন বিষয় উল্লেখিত হয়নি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব বানানো। বান্দা রাসূল পর্যন্ত সম্পৃক্ত থাকার সনদ হল শাজরা। যেমন হাদীসের সনদ প্রসংগে অনেক আলেম, মুহাদ্দিস, ফকীহগণের পেশোয়া হযরত ইমাম আবদুর রশীদ বিন মুবারক (রহঃ) বলেছেন-

'لولا الْإِسْنَادُ لَقَالَ فِي الدِّينِ مَنْ شَاءُ مَا شَاءُ

সিলসিলার সনদ না থাকলে ধর্মীয় বিষয়ে যে যা ইচ্ছা তা বলতো।

শাজরা শরীফ পড়ার কয়েকটি উপকারিতাঃ

ক. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা নিজের সম্পৃক্ততার সনদ হেফাযত করা।

খ. নেক্কারগণকে স্মরণ করা-যা রহমত নাযিল হবার কারণ।

গ. নেয়ামত প্রাপ্তির মাধ্যমে বুযর্গদের নামে নামে ঈসালে ছাওয়াব করা হয়। ফলে তাদের কৃপাদৃষ্টি পাবার মাধ্যম হয়ে যায়।

ঘ. নিরাপদ থাকাবস্থায় তাদের নাম নিলে তাঁরাও মুসীবতের সময় তাকে রক্ষা করবেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা বলেছেন-

 تَعْرِفُ إلى الله في الرخاء يُعْرِفَكَ فِي الشَّدَّةِ 

আরামের সময় তুমি খোদাকে চিনলে বিপদের সময় খোদা তোমাকে চিনবে। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ)'র সূত্রে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) প্রমুখ থেকে হযরত আবুল কাসেম তা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৫৯ঃ  মসজিদে খানাপিনা বৈধ, মাকরুহ না হারাম? নফল ই'তিকাফের নিয়তে যে ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করেছে সে তাতে খাওয়া-দাওয়া করতে পারবে কি না? খাওয়ার অনুমতি থাকলেও তা কি ঢুকা মাত্রই, না কিছু যিকর-আযকার করার পর?

এ মাসআলা প্রসংগে ওলামা-ই কেরামের অভিমত কি? মসজিদে খানাপিনা বৈধ, মাকরুহ না হারাম? নফল ই'তিকাফের নিয়তে যে ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করেছে সে তাতে খাওয়া-দাওয়া করতে পারবে কি না? খাওয়ার অনুমতি থাকলেও তা কি ঢুকা মাত্রই, না কিছু যিকর-আযকার করার পর? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ যে খানা-পিনা মসজিদে পড়ে ময়লা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তা সাধারণভাবে হারাম; ই'তিকাফকারী হোক বা না হোক। যদি খানা-পিনার কারণে মসজিদে ময়লা হবার আশংকা থাকলে খানা-পিনা উভয়ের একই হুকুম। সে অবকাশ না থাকলে যে ই'তিকাফকারী নয় তার জন্য মাকরুহ। ই'তিকাফকারীর জন্য মুবাহ। বাস্তবিকই ই'তিকাফের নিয়ত করলেই খানাপিনা করতে পারবে। যদি খাওয়া-দাওয়ার উদ্দেশ্যে ই'তিকাফের নিয়ত করলে প্রথমে কিছু যিকর আযকার করে পরবর্তীতে খাবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

💠 মাসআলা-৬০ঃ সহোদর বোনকে বিয়ে করা ও তাহাদের সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি বন্টনের ব্যাপারে

আলেম ও মুফতিগণ! এ মাসআলা প্রসংগে অভিমত কি যে, যায়দ এক মহিলাকে বিয়ে করার পর তার জীবদ্দশায় সে স্ত্রীর ছোট বোনকে বিয়ে করল। দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ কি না? দু'বোন থেকে যে সব সন্তান-সন্ততি জম্ম লাভ করেছে তারা যায়দের পরিত্যাক্ত সম্পত্তি পাবে কি না? উভয়ই মহরের অধিকারী হবে কি না? বিস্তারিত বর্ণনা করুন, প্রতিদান দেয়া হবে।

জাওয়াবঃ যে স্ত্রী দাম্পত্য জীবন বা ইদ্দতের মধ্যে রয়েছে তার বোনকে বিয়ে করা নির্ঘাত হারাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَأَنْ تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأَحْتَيْنِ 

দু'বোনকে একত্রে বিয়ে করা হারাম। তাদের থেকে যে সব সন্তান হবে তা হারামের বাচ্চা; তবে জারজ সন্তান নয়। তাদেরকে জারজ সন্তান বলা বৈধ নয়। দ্বিতীয় বোনের গায়ে স্পর্শ করার পূর্বে প্রথম বোন হালাল ছিল। এর পূর্বে যে সমস্ত সন্তান জন্ম লাভ করেছে তারা হালাল। পরে যে সব সন্তান প্রসব করেছে তারা শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম; তবে জারজ সন্তান নয়। যেহেতু সব সন্তান যায়দ থেকে জম্ম লাভ করেছে, সেহেতু যায়দের তর্কা পাবে। কারণ বংশ সাব্যস্ত আছে। তবে দ্বিতীয় স্ত্রী তর্কা পাবে না। কারণ সে বিয়ে ফাসিদ। উভয় স্ত্রী মহরের হকদার। প্রথমটি বিয়ের কারণে, দ্বিতীয়টি প্রকৃত সহবাসের কারণে। তবে নির্জনতা পাওয়া গেলেও মহর ওয়াজিব হবে না। দ্বিতীয় স্ত্রী মহরে মিছল বা ধার্যকৃত মহরের মধ্যে তুলনামূলক কমটা পাবে। 'দুররুল মুখতার'এ আছে-

يجب مهر المثل فى نكاح فَاسِدٍ وَهُوَ الَّذِي فَقَدْ شَرْطًا مِنْ شَرَائِطِ الصَّحَةِ كَشَهُود و مثله تزوّج الأختين معا ونكاح الاخت في عدة الاخت اه بِالْوَطْ لَا بِغَيْرِهِ كَالخُلُوط وَ لَمْ يَزِدْ مَهْرَ المُثْلِ عَلَى المَسْقَى لرضاها الحط وَلَوْ كَانَ دُونَ الْمُسَمًّى لَزِمَ مَهْرُ المِثْلِ

'ফাসিদ বিয়েতে মহরে মিছল ওয়াজিব। তা হল ঐ বিয়ে যাতে বিয়ে শুদ্ধ হবার শর্ত সমূহ হারিয়ে গেছে। যেমন- সাক্ষী থাকা বিয়ের জন্য শর্ত। অনুরুপভাবে দু'বোনকে এক সাথে বিয়ে করা এবং ইদ্দতের মধ্যে অপর বোনকে বিয়ে করা। সহবাস দ্বারা একমাত্র মহর ওয়াজিব হবে; মেলামেশা বা অন্য কিছু দ্বারা নয়। মহরে মিছল ধার্যকৃত মহর থেকে বেশি হতে পারে না। কেননা মহিলা কমের মধ্যে রাজি আছে। ধার্যকৃত মহর থেকে মহর মিছল কম হলে সেটাই ওয়াজিব।

হেদায়া 'বাবু নিকাহে রাকীক 'এ আছে-

بعض المقاصد فى النكاح الفاسد حاصل كَالنَّسَبِ وَوُجُوبِ المُهْرِ وَ الْعِدَّةِ

ফাসিদ বিয়েতেও কোন কোন উদ্দেশ্য হাসিল হয়। যেমন- বংশ, মহর আদায় ও ইদ্দত সাব্যস্ত হয়।

'দুররুল মুখতার' গ্রন্থে রয়েছে-

يُسْتَحقِّ الإِرْثُ بنكاح صحيح فلا تَوَارَتْ بِفَاسِدٍ وَلَا بَاطِلٍ إِجْمَاعًا

সর্ব সম্মতিক্রমে সহীহ বিয়ে দ্বারা তর্কার হকদার হয়, ফাসিদ ও বাতিল বিয়ে দ্বারা নয়। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।


Top