দলিলসহ নামাজের মাসায়েল (পর্ব ৬৯)বিতর নামায মাগরিবের মত দুই বৈঠক ও এক সালামে

বিতর নামায মাগরিবের মত দুই বৈঠক ও এক সালামে

১. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন:

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : وِتْرُ اللَّيْلِ ثَلاَثٌ كَوِتْرِ النَّهَارِ صَلاَةِ الْمَغْرِبِ.تعليق-١

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: দিনের বিত্র মাগরিব এর মত রাতের বিত্রও তিন রাকাত। [দারাকুতনী হা.১৬৭২]

হাদীসটি হাসান পর্যায়ের। তবে অনেকে এটিকে ইবনে মাসউদ রা. এর বক্তব্য হিসেবে সহীহ বলেছেন। [বিস্তারিত দেখুন পর্যালোচনা অংশে]

২. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন:

عن النبي صلى الله عليه وسلم قال : صلاة المغرب وتر النهار فأوتروا صلاة الليل تعليق-٢

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: দিনের বিত্র হল মাগরিবের নামায। তোমরা রাতের নামাযকেও অনুরূপ বিত্র করে পড়। [মুসনাদে আহমদ হা.৪৮৪৭ এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য: শুয়াইব আরনাউত। ইবনে আবী শাইবা ৪/৪ হা.৬৭৭৩, ৬৭৭৮ আব্দুর রাযযাক হা.৪৬৭৫ তাবারানী: সগীর ও আওসাত। হাফেজ ইরাকী রহ. বলেন: এর সনদ সহীহ, আত্তা‘লীকুল মুমাজ্জাদ পৃ.১৪৭ শরহুয্ যুরকানী আলাল মুয়াত্তা]

মুয়াত্তা মালেকসহ কোন কোন কিতাবে অন্য সহীহ সনদে একই কথা হযরত ইবনে উমরের বক্তব্যরূপে বর্ণিত হয়েছে। সম্ভবত বর্ণানাদুটিই (মারফু ও মাউকুফ) আপন আপন স্থানে সঠিক। আর যদি একে ‘মউকুফ’ তথা ইবনে উমরের বক্তব্যই বলা হয় তবু তা ‘মরফু’ হুক্মী বলে বিবেচিত হবে। কেননা একজন সাহাবী নামাযের মত একটি স্বতসিদ্ধ বিধানের ক্ষেত্রে না জেনে নিজের পক্ষ থেকে এরূপ বক্তব্য দিতে পারেন না। তাই ইমাম মুহাম্মদ রহ. বলেন:

وبهذا نأخذ، وينبغي لمن جعل المغربَ وترَ صلاة النهار كما قال ابن عمر أن يكون وترُ صلاةِ الليل مثلَها لا يفصل بينهما بتسليم كما لا يفصل في المغرب بتسليم وهو قول أبي حنيفة - رحمه الله.

আমরা এ বর্ণনাটি গ্রহণ করি। যে ব্যক্তি ইবনে উমরের বক্তব্য অনুসারে বিতরকে মাগরিবের নামাযের অনুরূপ মনে করে, তার উচিত মাগরিবের মতই বিতর পড়া। যাতে দুই রাকাতের পর সালাম ফিরাবে না। এটিই ইমাম আবুহানীফা রহ. এর মত। [মুয়াত্তা মালেক: ইমাম মুহাম্মদের বর্ণনা পৃ.১৪৯] বর্ণনাদুটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পরিশিষ্টে করা হয়েছে।

৩. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন:

الْوِتْرُ ثَلاَثٌ كَصَلاَةِ الْمَغْرِبِ وِتْرُ النَّهَارِ. تعليق-٣

অর্থ: দিনের বিত্র মাগরিব এর মত রাতের বিত্রও তিন রাকাত । [ইবনে আবী শাইবা ৪/ হা.৬৭৭৯ আল মু‘জামুল কাবীর হা.৯৪২১-৯৪২২ এর বর্ণনাকারীগণ সহীহ হাদীসের মানোত্তীর্র্ণ, মাজমাউয্ যাওয়ায়েদ: হা.৩৪৫৫ বাইহাকী রহ. বর্ণনাটিকে সহীহ বলেছেন। আস সুনানুল কুবরা ৩/৩০]

ইমাম বাইহাকী র.তাঁর সুনানে কুবরায় এর শিরোনাম দিয়েছেন: (باب مَنْ أَوْتَرَ بِثَلاَثٍ مَوْصُولاَتٍ بِتَشَهُّدَيْنِ وَتَسْلِيمٍ.) “দুই বৈঠক ও এক সালামে এক সাথে তিন রাকাত বিত্র অধ্যায়।” এটি বিতর নামাযের সেই পদ্ধতিই যা আমরা এখানে আলোচনা করছি।

৪. উক্বা ইবনে মুসলিম বলেন:

سألت عبد الله بن عمر رضي الله عنهما عن الوتر؟ فقال : أَتَعْرِفُ وِتْرَ النَّهَارِ؟ قُلْتُ : نَعَمْ ، صَلَاةُ الْمَغْرِبِ قَالَ : صَدَقْتَ أَوْ أَحْسَنْتَ . تعليق-٤

অর্থ: আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমরকে জিজ্ঞেস করলাম: বিত্র নামায পদ্ধতি সম্পর্কে। তিনি বললেন: তুমি দিনের বিত্র চেন না? বললাম হাঁ, মাগরিবের নামায। বললেন, ঠিক বলেছ। (রাতের বিত্রও ঠিক এরকমই)। [তহাবী ২/১৯৭]

৫. হাসান বছরী র. বলেন:

كان أبي بن كعب يوتر بثلاث لا يسلم إلا في الثالثة مثل المغرب. تعليق-٥

অর্থ: হযরত উবাই ইবনে কা‘ব রা. তিন রাকাতে বিত্র পড়তেন এবং তাতে মাগরিবের মতই তৃতীয় রাকাতের আগে সালাম ফিরাতেন না। [মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক হা.৪৬৫৯-৪৬৬০ এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য]

ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন:

فإنه قد ثبت أن أبي بن كعب كان يقوم بالناس عشرين ركعة في رمضان ويوتر بثلاث، فرأى كثير من العلماء أنَّ ذلك هو السنة، لأنه أقامه بين المهاجرين والأنصار ولم ينكره منكر، كذا فى الفتاوى الكبرى (২/২৪৫)

অর্থ: বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত, হযরত উবাই ইবনে কা‘ব রা. তাঁর ইমামতিতে লোকদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবীহ, অতঃপর তিন রাকাত বিতর পড়তেন। তাই অনেক উলামা মনে করেন তারাবীহর এটিই প্রকৃত সুন্নত। কারণ তিনি অনেক মুহাজির-আনছারের সামনে এ নামায পড়েছেন। তাঁদের কেউই এর বিরোধিতা করেননি বা একে ভুল আখ্যা দেননি। ]আল-ফাতাওয়াল কুব্রা:২/২৪৫]

৬. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন:

الوتر كصلاة المغرب.تعليق-٦

অর্থ: বিত্র নামায মাগরিবেরই অনুরূপ। ]মুয়াত্তা মুহাম্মদ পৃ.১৫০ কিতাবুল হুজ্জাহ আলা আহলিল মদীনাহ ১/১৩৬]

৭. যিয়াদ ইবনে আবী মুসলিম র.বলেন:

سألتُ أبا العالية وخِلاساً عن الوتر؟ فقالا: اَصْنَع فِيهِ كَمَا تَصْنَعُ فِي الْمَغْرِبِ.تعليق-٧

অর্থ: আমি (প্রসিদ্ধ তাবেয়ী) আবুল‘আলীয়া ও খিলাসকে জিজ্ঞেস করলাম: বিত্র নামায কিভাবে পড়ব? তাঁরা উভয়ে বললেন: মাগরিবের নামাযে যা যা কর বিত্র নামাযেও তাই করবে। [ইবনে আবী শাইবা হা.৬৯০৯ [

৮. আবুখাল্দা আবুল ‘আলীয়াকে বিত্র নামাযের তরীকা জিজ্ঞেস করলেন। তিনি উত্তরে বললেন:

عَلَّمَنَا أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوْ عَلَّمُونَا أَنَّ الْوِتْرَ مِثْلُ صَلَاةِ الْمَغْرِبِ، غَيْرَ أَنَّا نَقْرَأُ فِي الثَّالِثَةِ، فَهَذَا وِتْرُ اللَّيْلِ، وَهَذَا وِتْرُ النَّهَارِ.تعليق-٨

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন: বিত্র নামায মাগরিবের নামাযের মতই; পার্থক্য কেবল এতটুকু যে, আমরা বিত্রের তৃতীয় রাকাতে কেরাত পড়ি (যা মাগরিবে নেই)। এটি রাতের বিত্র, আর মাগরিব হল দিনের বিত্র। [তাহাবী-১/২০৬ সালাতুল বিত্র লিল মারওয়াযী পৃ.২৭৯। এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য: নুখাবুল আফকার ৩/২৭৯ এর সনদ সহীহ: আফগানী]

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনু আব্দিল বার রহ. বলেন:

ومعلوم أن المغرب ثلاث ركعات لا يسلم إلا في آخرهن فكذلك وتر صلاة الليل.

আর এ কথা সর্বজনজ্ঞাত যে, মাগরিবের নামায তিন রাকাত। তিন রাকাত পূর্ণ করেই তবে সালাম ফিরানো হয়। ঠিক তেমনি রাতের বিতরও। [আল-ইসতিযকার ৫/২৮৩]

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কেউ কেউ বলে থাকেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিবের মত বিত্র পড়তে নিষেধ করেছেন, তাই বিত্র এক রাকাত পড়বে। আর তিন রাকাত পড়লেও দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরাবে, অথবা দ্বিতীয় রাকাতে বৈঠক না করে সোজা দাড়িয়ে তিন রাকাত পূর্ণ করেব।

বিত্রের দুই রাকাতে মাগরিবের মতই বৈঠক হবে তবে সালাম ফিরাবে না; এর দলিল পূর্বে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু বিত্রকে মাগরিবের নামাযের মত পড়তে নিষেধ করার উদ্দেশ্য কি, এ বিষয়ে যথার্থ বক্তব্য হল: বিত্রের ক্ষেত্রে শরীয়তের কাম্য এই যে, তা কিছু নফল নামায পড়ার পর আদায় করা। এজন্য নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:

لا توتروا بثلاث تشبهوا بصلاة المغرب و لكن أوتروا بخمس أو بسبع أو بتسع أو بإحدى عشرة ركعة أو أكثر من ذلك.تعليق-٩

অর্থাৎ তোমরা শুধু তিন রাকাত বিত্র পড়ো না, এতে মাগরিবের মত হয়ে যাবে; বরং পাঁচ, সাত, নয়, এগার বা এরও অধিক রাকাতে বিত্র পড়ো। [আলমুসাতদরাক ১/৩০৪ হা.১১৩৭ সুনানে কুবরা-বাইহাকী ৩/৩১, ৩২]

অর্থাৎ বিত্র এর আগে কিছু নফল অবশ্যই পড়: দুই, চার, ছয়, আট, যত রাকাত সম্ভব হয় পড়ে নাও। (বিত্র অধ্যায়ের (ক) এর দ্বিতীয় হাদীসে হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার ও তিন, ছয় ও তিন, আট ও তিন, এবং দশ ও তিন: বিভিন্ন সংখ্যায় রাতের নামায পড়তেন, যেখানে তিন রাকাত ছিল বিত্র)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিত্র নামায সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত হযরত আয়েশা রা. বলেন:

لا تُوتر بِثَلاَثٍ بُتْرٍ، صَلِّ قَبْلَهَا رَكْعَتَيْنِ، أَوْ أَرْبَعًا.تعليق-١٠

অর্থাৎ শুধুই তিন রাকাত বিত্র পড়ো না। এটি অপূর্ণাঙ্গ নামায। বরং এর পূর্বে দুই বা চার রাকাত পড়ে নাও। [ইবনে আবী শাইবা, হা.৬৮৯৮ এর বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত ]

নবীজীর বিত্র নামাযের প্রত্যক্ষদর্শী অপর সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন:

إنِّي لَأَكْرَهُ أَنْ يَكُونَ بَتْرَاءَ ثَلَاثًا، وَلَكِنْ سَبْعًا أَوْ خَمْسًا.تعليق-١١

অর্থাৎ রাতে শুধুই তিন রাকাত নামায পড়া আমি পছন্দ করি না। বরং অন্তত পাঁচ থেকে সাত রাকাত পড়া উচিত। [হাফেজ আইনী রহ. এটিকে সহীহ বলেছেন] ইমাম তহাবী র. এই বর্ণনা উল্লেখ করার পর বলেন:

فهذا عندنا على أَنَّه كَرِه أَنَّه يُوتِرُ وِتْرًا لَمْ يَتَقَدَّمْهُ تطوُّع، وأَحَبَّ أَنْ يكون قَبْلَهُ تَطَوُّعٌ، إمَّا رَكْعَتَانِ وَإِمَّا أَرْبَعٌ.

অর্থাৎ তিনি আগে কোন নফল নামায না পড়ে কেবলই তিন রাকাত বিত্র পড়াকে অপছন্দ করেন। তাঁর মতে বিত্রের পূর্বে অন্তত দুই বা চার রাকাত নফল নামায পড়া উচিত। [তহাবী ১/২০৩]

ঘ. রুকুর পূর্বে দু‘আয়ে কুনূত

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তৃতীয় রাকাতে কেরাত সমাপ্ত করার পর রুকু করার পূর্বে দুআয়ে কুনূত পড়তেন।

১. আসিম আহ্ওয়াল বলেন:

سألتُ أنس بن مالك رضي الله عنه عن القنوت في الصَّلَاةِ، فَقَالَ: نَعَمْ، فَقُلْتُ: كَانَ قَبْلَ الرُّكُوعِ أَوْ بَعْدَهُ؟ قَالَ: قَبْلَهُ، قُلْتُ: فَإِنَّ فُلَانًا أَخْبَرَنِي عَنْك أَنَّكَ قُلْتَ بَعْدَهُ؟ قَالَ: كَذَبَ إِنَّمَا قَنَتَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعْدَ الرُّكُوعِ شَهْرًا أَنَّهُ كَانَ بَعَثَ نَاسًا يُقَالُ لَهُمْ الْقُرَّاءُ - وَهُمْ سَبْعُونَ رَجُلًا - إِلَى نَاسٍ مِنْ الْمُشْرِكِينَ - وَبَيْنَهُمْ وَبَيْنَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَهْدٌ - قِبَلَهُمْ، فَظَهَرَ هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَانَ بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَهْدٌ، فَقَنَتَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعْدَ الرُّكُوعِ شَهْرًا يَدْعُو عَلَيْهِمْ تعليق-١٢

অর্থ: আমি হযরত আনাস রা. কে কুনূত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, হ্যাঁ কুনূত আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম রুকুর আগে না পরে? তিনি বললেন: রুকুর আগে। বললাম একজন আমাকে বলল: আপনি রুকুর পরে কুনূত পড়ার কথা বলেছেন? তিনি বললেন: সে ভুল বলেছে। রুকুর পরে তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু এক মাস কুনূত পড়েছেন। (যা ছিল মূলত কুনূতে নাযেলা)। [সহীহ বুখারী হা.৪০৯৬]

অনুরূপ সাহাবায়ে কেরামও বিত্র নামাযে রুকুর পূর্বে দুআ কুনূত পড়তেন; যা সহীহ সনদে প্রমাণিত। এ ব্যাপারে লা-মাযহাবীদের আস্থাভাজন আলেম স্বয়ং নাসীরুদ্দীন আলবানী সাহেব বলেন:

وذلك أنه قد صح عنه صلى الله عليه وآله وسلم أنه كان يقنت في الوتر قبل الركوع كما يأتي بعد حديثٍ، ويشهدُ له أثار كثيرة عن كِبار الصحابة كما سنُحققه في الحديث الآتي بإذن الله تعالى. والخلاصة أن الصحيح الثابت عن الصحابة هو القنوت قبل الركوع في الوتر وهو الموافق للحديث الآتي، انتهى من إرواء الغليل للألباني (۲/۱٦٦)

অর্থ:... সহীহ সূত্রে প্রমাণিত আছে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিত্র নামাযে রুকুর পূর্বে কুনুত পড়েছেন। যার আলোচনা একটি হাদীস পরেই আসবে। উপরন্তু বিশিষ্ট্য সাহাবীদের থেকে বর্ণিত অনেক আছার এর বিশুদ্ধতার জন্য দলিল। ... সারকথা হল, সাহাবীদের থেকে সহীহ সূত্রে এটিই প্রমাণিত যে, বিত্রের কুনূত রুকুর পূর্বে। [ইরওয়াউল গালীল ২/১৬৬]

মাসরূক, আসওয়াদ ও ইবনে মাসউদ রা. এর আরো কতিপয় শিষ্য বলেন:

كان عبد الله لا يقنت إلا في الوتر ، وكان يقنت قبل الركوع، يكبر إذا فرغ من قراءته حين يقنت تعليق-١٣

অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. শুধু বিত্র নামাযেই কুনূত পড়তেন। আর তা পড়তেন রুকুর পূর্বে। কেরাত সমাপ্ত করার পর তাকবীর বলে কুনূত শুরু করতেন। [মুশকিলুল আছার ১১/৩৭৪ ইবনে আবী শাইবা হা.৭০২১] এর সনদ সহীহ।

ইবনে মাসউদ রা. -এর শিষ্যবর্গও এরূপই আমল করতেন। হযরত আলী রা. থেকেও এরূপ আমল বর্ণিত হয়েছে। [ইবনে আবী শাইবা হা.৭১১৩]

ইমাম তহাবী র. বর্ণনাদুটি উল্লেখপূর্বক বলেন:

فكان هذا مما يعلم أن عليا وعبد الله لم يقولاه استنباطا، ولا استخراجا، إذ كان مثله لا يقال بالاستنباط ولا بالاستخراج، وإنما يقال بالتوقيف الذي وقف رسول الله صلى الله عليه وسلم الناس عليه. تعليق-١٤

“এ থেকে বুঝা যায় হযরত আলী ও ইবনে মাসউদ রা. এর এক কথা নিজ গবেষণাপ্রসূত নয়। কেননা ইবাদতের এধরণের বিষয়গুলো নিজ থেকে বলারও নয়। বরং এগুলো কেবল রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে জেনেই বলা যায়”। [মুশকিলুল আছার ১১/৩৭৪]

তাকবীর বলে হাত তোলা ও হাত বাঁধা বিষয়ক বর্ণনাগুলি পর্যালোচনা অংশে দ্রষ্টব্য।

দু‘আয়ে কুনূত

হাদীস শরীফে এ প্রসঙ্গে একাধিক দু‘আ পাওয়া যায়। তন্মধ্যে

ক.“আল্লাহুম্মা ইন্না নাস্তা‘ঈ নুকা ...”

১. ইমাম ইবনুল মুনযির রহ. বলেন:

وجاء في الحديث عن عمر بن الخطاب أنه كَانَ يقول في القنوت في الوتر: اللهم اغفر للمؤمنين، والمؤمنات، والمسلمين والمسلمات، وألف بين قلوبهم، وأصلح ذات بينهم، وانصرهم على عدوك وعدوهم، اللهم العن كفرة أهل الكتاب الذين يكذبون رسلك، ويقاتلون أولياءك، اللهم خالف بين قلوبهم، وزلزل أقدامهم، وأنزل بهم بأسك الذي لا يرد عن القوم المجرمين،

بسم الله الرحمن الرحيم، اللهم إنا نستعينك، ونستغفرك، ونثني عليك ولا نكفرك، ونخلع ونترك من يفجرك ويكفرك، بسم الله الرحمن الرحيم، اللهم إياك نعبد، ولك نصلي ونسجد، وإليك نسعى ونحفد، نرجو رحمتك، ونخاف عذابك إن عذابك بالكفار يلحق

وكان عبيد بن عمير، وهو راوي هذا الحديث عن عمر بن الخطاب يقول : بلغني أنهما سورتان من القرآن في مصحف ابن مسعود، وأنه يوتر بهما كل ليلة حدثناه إسحاق ، عن عبد الرزاق ، عن ابن جريج ، قال : أخبرنا عطاء، أنه سمع عبيد بن عمير، يأثر عن عمر بن الخطاب، أنه قال ذلك. (قلت: رجاله ثقات

ثم قال: وممن روينا عنه، أنه قنت بالسورتين علي بن أبي طالب، وعبد الله بن مسعود، وأبي بن كعب، وقد رويت في القنوت أخبارا، وقد ذكرتها في كتاب قيام الليل.

অর্থ: হাদীসে এসেছে হযরত উমর রা. বিতরের কুনূতে বলতেন (اللهم اغفر للمؤمنين، والمؤمنات،) “আল্লাহুম্মাগফির লিল মুমিনীনা ওয়াল মুমিনাত...”, (اللهم إنا نستعينك، ونستغفرك،) “..আল্লাহুম্মা ইন্না নাসতা‘ঈ নুকা ...”।

হযরত উমর রা. থেকে এ হাদীসের বর্ণনাকারী উবাইদ ইবনে উমাইর বলতেন: (اللهم إنا نستعينك، ونستغفرك،)এ দুটি দুআ ইবনে মাসউদ রা. এর মুছহাফে কুরআনের সূরা রূপে ছিল (যা পরে রহিত হয়ে গেছে)। তিনি দুআ দুটি দিয়ে প্রতি রাতে বিতর পড়তেন। [আল-আউসাত লি ইবনিল মুনযির ৫/২১৪)

ইমাম মুহাম্মদ ইবনে নাছর আল-মারওয়াজী বর্ণনাটি উল্লেখ করার পর বলেন: অন্য বর্ণনায় বর্ধিতাংশে রয়েছে, ‘বিতরে এ দুআ রুকুর পূর্বে পড়তেন’ ...। [মুখতাছারু কিয়ামিল্লাইল পৃ. ৩২১-৩২২] (টীকা-১৫)

২. আবু-আব্দুর রহমান (আসসুলামী) বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন আমরা যেন কুনূতে নিম্নোক্ত দুআটি পড়ি:

علمنا ابن مسعود رضي الله عنه أن نقرأ في القنوت : اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ، وَنُثْنِي عَلَيْكَ الْخَيْرَ، وَلاَ نَكْفُرُكَ، وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَفْجُرُكَ، اللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ، وَلَكَ نُصَلِّي وَنَسْجُدُ، وَإِلَيْكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ، نَرْجُو رَحْمَتَكَ وَنَخْشَى عَذَابَكَ، إِنَّ عَذَابَكَ الْجِدَّ بِالْكُفَّارِ مُلْحِقٌ.تعليق-١٦

শব্দের সামান্য ব্যতিক্রম সহ অন্যান্য বর্ণনায়ও এ দুআ এসেছ। যেমন: এক বর্ণনায়:ونؤمن بك ونتوكل عليك -এ বাক্য দুটি বর্ধিত এসেছে। [ইবনে আবী শাইবা ১৫/৩৪৪] তহাবীর এক বর্ণনায় ونشكرك -শব্দটিও রয়েছে। [তহাবী ১/১৭৭] এর সনদ সহীহ]

এই বর্ণনাগুলির আলোকে পূর্ণ দু‘আটি এভাবে পড়া যায়:

اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ، ونؤمن بك ونتوكل عليك، وَنُثْنِي عَلَيْكَ الْخَيْرَ، ونشكرك وَلاَ نَكْفُرُكَ، وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَفْجُرُكَ، اللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ، وَلَكَ نُصَلِّي وَنَسْجُدُ، وَإِلَيْكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ، نَرْجُو رَحْمَتَكَ وَنَخْشَى عَذَابَكَ، إِنَّ عَذَابَكَ الْجِدَّ بِالْكُفَّارِ مُلْحِقٌ.

হযরত ইবনে মাসউদ রা. প্রতিদিন বিতর নামাযে এ দুআই পড়তেন। [মুছান্নাফে আব্দুল রাযযাক হা.৪৯৬৯ আল-আউসাত ৫/২১৪ মুখতাছারু কিয়ামিল্লাইল পৃ.২৯৭]

৩. সুনানে বায়হাকীর এক বর্ণনায় এসেছে যে, হযরত জিব্রীল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুনূত শিক্ষা দিয়েছেন। এরপর শব্দের সামান্য তারতম্যসহ উপরোক্ত দুআটি উল্লেখিত হয়েছে। (টীকা-১৭)[বাইহাকী ২/২১০ আল-মুদাওয়ানা ১/১০১] বর্ণনাটি মুরসাল এবং এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য। [নাতাইযুল আফকার লি ইবনে হাজার ২/১১১]

৪. বিখ্যাত তাবেয়ী ইবরাহীম নাখাঈ নিজে বিতরের কুনূতে এ দুআ পড়াকে পসন্দ করতেন এবং অন্যকে পড়তে আদেশ করতেন। [আব্দুর রাযযাক ৩/১২১, ইবনে আবী শাইবা ৪/৫১৮]

৫. আমর বলেন: তাবেয়ী হাসান বসরী র. বিতর ও ফজরের কুনূতে এ দুআটিই পড়তেন। তাঁকে একজন জিজ্ঞেস করল, এই দুআর অতিরিক্ত আর কিছু পড়া যাবে কি? তিনি উত্তরে বললেন:

لا أنهاكم ولكنى سمعت أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم لايزيدون على هذا شيئا، ويغضب إذا أرادوه على الزيادة.تعليق-١٨

অর্থাৎ তোমাদেরকে আমি নিষেধ করব না; তবে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণকে এর অতিরিক্ত কিছু পড়তে দেখিনি। ...। [মুছান্নাফে আর্ব্দুরায্যাক ৩/১১৬]

তাই হানাফী ফকীহগণ ও ইমাম মালিক র. এই দুআকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। ইমাম ইবনে আব্দিল বার র. বলেন:

قال الكوفيون ومالك: وليس فى القنوت دعاء موقت، ولكنهم يستحبون ألا يقنت إلا بقولهم: اللهم إنا نستعينك...انتهى تعليق-١٩

অর্থ: কুফার অধিবাসী আহলে ইলমগণ ও ইমাম মালেক বলেন: দুআ কুনূত সুনির্দিষ্ট নয়। তবে তাঁরা এই দুআটি পড়া উত্তম মনে করেন।

খ. আল্লাহুম্মাহদিনা ফীমান হাদাইতা ...

হযরত হাসান ইবনে আলী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বিত্রে পড়ার জন্য কয়েকটি বাক্য শিক্ষা দিয়েছেন :

اللَّهُمَّ اهْدِنِى فِيمَنْ هَدَيْتَ، وَعَافِنِى فِيمَنْ عَافَيْتَ، وَتَوَلَّنِى فِيمَنْ تَوَلَّيْتَ، وَبَارِكْ لِى فِيمَا أَعْطَيْتَ، وَقِنِى شَرَّ مَا قَضَيْتَ، إِنَّكَ تَقْضِى وَلاَ يُقْضَى عَلَيْكَ، وَإِنَّهُ لاَ يَذِلُّ مَنْ وَالَيْتَ، وَلاَ يَعِزُّ مَنْ عَادَيْتَ، تَبَارَكْتَ رَبَّنَا وَتَعَالَيْتَ تعليق-٢٠

[সুনানে আবু দাউদ: ১/৫২৬; সুনানে নাসায়ী ১/২৫২ জামে তিরমিযী ১/১০৬ হা.৪৬৪ সুনানে ইবনে মাজা ১/১৮৫ মুসনাদে আহমদ হা.১৭১৮]

তাই অনেকেই উভয় দুআ একত্রে পড়তেন। সুফ্ইয়ান ছাউরী বলেন:

كانوا يستحبون أن يجعلوا ، في قنوت الوتر هاتين السورتين : اللهم إنا نستعينك ونستغفرك، ونثني عليك ولا نكفرك، ونخلع ونترك من يفجرك، اللهم إياك نعبد ولك نصلي ونسجد، وإليك نسعى ونحفد، نخشى عذابك ونرجو رحمتك، إن عذابك بالكفار ملحق، وهذه الكلمات : اللهم اهدني فيمن هديت، وعافني فيمن عافيت، وتولني فيمن توليت، وبارك لي فيما أعطيت ، وقني شر ما قضيت، إنك تقضي ولا يقضى عليك، لا يذل من واليت تباركت ربنا وتعاليت، ويدعو بالمعوذتين. تعليق-٢١

অর্থ: আমি আমার পূর্বসূরিদের দেখেছি তাঁরা বিত্রে উপরোক্ত দুটি দুআ পড়াকেই উত্তম মনে করতেন। [সালাতুল বিত্র পৃ.৩০১] মুসান্নাফ গ্রন্থকার ইমাম আব্দুর রাযযাকও তাই করতেন। [আল মুসান্নাফ ৩/১১৬]। শাফেয়ী মাযহাবের বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইমাম নববী র. বলেন: “আমাদের অনেকেই বলেন: উভয় দুআ একত্রে পড়াটাই উত্তম”। [শরহুল মুহায্যাব ৩/৪৭৫-৪৭৮]

পরবর্তী হানাফী ফকীহদের অনেকেই উভয় দুআ একত্রে পড়াকে পছন্দ করেছেন। [দেখুন, মাবসূতে সারাখসী ১/১৬৫ বাদায়েউস সানায়ে ২/২৩২]

Previous Next

نموذج الاتصال