দলিলসহ নামাজের মাসায়েল : (পর্ব ৫৮)ইয়াযীদ ইবনে খুসায়ফা সম্পর্কে জালিয়াতি:

ইয়াযীদ ইবনে খুসায়ফা সম্পর্কে জালিয়াতি:

ইয়াযীদ ইবনে খুসায়ফা র. সম্পর্কে তো তাদের বক্তব্য আরো জঘন্য। ইয়াযীদ ছিলেন প্রসিদ্ধ তাবেয়ী, সিহাহ সিত্তার রাবী। বুখারী র. ও মুসলিম র. তার সূত্রে বহু হাদীস গ্রহণ ও উদ্ধৃত করেছেন। আবূ হাতিম, নাসায়ী ও ইবনে সাদ তাকে ছিকাহ বা নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ইবনে মাঈন বলেছেন, ثقة حجة অর্থাৎ তিনি নির্ভরযোগ্য ও প্রমাণযোগ্য। আছরাম এর বর্ণনা মতে ইমাম আহমাদও তাকে ছিকাহ বলেছেন। অন্য বর্ণনায় তিনি বলেছেন, মুনকারুল হাদীস। এই শব্দটির অর্থ হয়তো তারা করেছেন প্রত্যাখ্যাত। আর তার সকল বর্ণনা কথাটি নিজেদের পকেট থেকে জুড়ে দিয়েছেন। অথচ ঐ শব্দটির সাধারণ অর্থ আপত্তিকর হাদীস বর্ণনাকারী। কেউ কেউ বলেছেন, যদি এমন কোন বর্ণনাকারী হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে নিঃসঙ্গ হন, যার নিঃসঙ্গ বর্ণনা গ্রহণ করা যায় না, তার ক্ষেত্রেই কেবল ইমাম আহমাদ ঐ শব্দ ব্যবহার করেন। ফাতহুল বারীর ভূমিকা গ্রন্থে ইবনে হাজার র. ইয়াযীদের আলোচনাতেই এই কথা পরিস্কার করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ইমাম আহমদ ও অন্যান্য মুহাদ্দিসের মতো ঐ রাবীর ক্ষেত্রে শব্দটি ব্যবহার করেছেন যার থেকে কিছু কিছু ভুল প্রকাশিত হয়েছে।

আবু উসমান প্রখ্যাত হাফেজে হাদীস ছিলেন

বাকি রয়ে গেলেন আবু উসমান। তিনি অস্বীকৃত: এমন কোন কথা কোন কিতাবে নাই। মুবারকপুরী বলেছেন, আমিও দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়ে তার জীবনী সম্পর্কে কিছু উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু এ ব্যর্থতা তাঁর। যারা খুঁজে পেয়েছেন তারা তো আর ব্যর্থ নন। দেখুন, যাহাবী সিয়ারু আলামিন নুবালা: গ্রন্থে তার নাম এভাবে উল্লেখ করেছেন: আল ইমামুল কুদওয়া আয যাহিদ আস সালিহ আবু উসমান আমর ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে দিরহাম আন নায়সাবূরী আল গাযী আল মারূফ বিল বাসরী (১২খ. ৪৭পৃ)। তার নাম আমর ইবনে আব্দুল্লাহ (মৃত্যু ৩৩৪ হি.)। বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আবূ তাহির র., হাসান ইবনে আলী ইবনে মুআম্মাল, ইবনে মানদাহ, হাফেয আবু আলী ও আবু ইসহাক আল মুযাক্কী প্রমুখ তার কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন। তার বর্ণিত বহু হাদীস বায়হাকী র. তার সুনানে উদ্ধৃত করেছেন। কোন মুহাদ্দিসই তাকে যয়ীফ বলেননি। হাফেয যাহাবী র. তার ‘তারীখুল ইসলাম’ গ্রন্থেও তাকে উল্লেখ করেছেন। (৩৪/১০৯) তাযকিরাতুল হুফফায গ্রন্থে হাফেয যাহাবী ৩৩৪ হি. সনে মৃত্যুবরণকারী মুহাদ্দিসগণের আলোচনায় বলেছেন, ومسند نيسابور أبو عثمان عمرو بن عبد الله بن درهم المطوعي অর্থাৎ নিশাপুরের মুসনিদ (যার নিকট উঁচু উঁচু সনদ বিশিষ্ট বহু হাদীস ছিল) আবু উসমান ...। (৩/৮৪৭)

আবু তাহির ছিলেন সুপরিচিত মুহাদ্দিস

মুবারকপুরী ও মুযাফফর বিন মুহসিন এই আবু উসমানের সূত্রে হাদীস বর্ণনাকারী আবু তাহির সম্পর্কেও একই অভিযোগ করেছেন যে, তিনি অপরিচিত ছিলেন। অথচ এই আবু তাহির হলেন ইমাম বায়হাকীর উস্তাদ। হাকেম আবু আব্দুল্লাহ অগ্রণী হয়েও তাঁর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার নাম মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মাহমিশ আয যিয়াদী। ৪১০ হিজরী সনে তার ওফাত হয়। যাহাবী তার সিয়ার (১৩/১৭৩), ইবার (১/৪২০), তারীখুল ইসলাম (৯/১৫৭) ও তাযকিরাতুল হুফফাজ (৩/১০৫১) এই চারটি গ্রন্থে তার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এছাড়া সামআনী তার আল আনসাব গ্রন্থে (৩/১৮৫) ও সুবকী তার তাবাকাতুশ শাফিইয়্যাতিল কুবরা গ্রন্থে (নং ৩৪৮), হাফেজ ইবনে কাছীর তার তাবাকাতুশ শাফিইয়্যীন গ্রন্থে (১/৩৬২) ও ইবনু কাযী শুহবা তার তাবাকাতুশ শাফিইয়্যাহ গ্রন্থে (নং ১৫৫) তার জীবনী আলোচনা করেছেন। তারা সকলেই বলেছেন,كان إمام أصحاب الحديث وفقيههم ومفتيهم بنيسابور بلا مدافعة তিনি ছিলেন নিশাপুরের অবিসংবাদিত মুহাদ্দিসকুল শিরোমনি, ফকীহ ও মুফতী।

এ বর্ণনার ভিন্ন আরেকটি সূত্র

তাছাড়া আবূ উসমানের সূূত্র ছাড়াও হাদীসটির যখন অন্য আরেকটি সহীহ সূত্র আছে, তাই এই সূত্রটি নিয়ে আপত্তি করে কোন লাভ নেই। পেছনে এ সূত্র সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

খ. ইবনে আবূ যুবাবের বর্ণনা

হারিছ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে আবু যুবাব বর্ণনা করেছেন সাইব রা. থেকে। তিনি বলেছেন, وكان القيام على عهد عمر ثلاثة وعشرين ركعة উমর রা.এর যুগে কিয়ামে রমযান বা তারাবীহ ছিল ২৩ রাকআত। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হা. ৭৭৩৩)

এর সনদে হারিছ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে আবু যুবাব আছেন। (মুযাফফর বিন মুহসিন লিখেছেন, আবু যুবাব নামে একজন মুনকার রাবী আছে। এটা ভুল।) তাঁর সম্পর্কে ইবনে মাঈন বলেছেন, তিনি প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। আহমদ ইবনে সালিহ তাঁকে বিশ্বস্ত বলেছেন। ইবনে হিব্বান তাকে ছিকাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি ও হাকেম তার হাদীসকে সহীহ আখ্যা দিয়েছেন। যাহাবী মীযান ও মুগনী গ্রন্থে তাকে বিশ্বস্ত আখ্যা দিয়েছেন। ইবনে হাজার তাকরীব গ্রন্থে বলেছেন,صدوق يهم তিনি সাদূক বা সত্যনিষ্ঠ ছিলেন, তবে ভুলের শিকার হতেন। অথচ এই রাবী সম্পর্কে মুযাফফর বিন মুহসিন শুধু বিরূপ সমালোচনাগুলোই উল্লেখ করে গেছেন।

এই হাদীস থেকে স্পষ্ট হলো, হযরত উমর রা. এর আমলে তাঁরই ব্যবস্থাপনায় সাহাবায়ে কেরাম -যাদের মধ্যে মুহাজির ও আনসার সকলেই ছিলেন- মসজিদে নববীতে বিশ রাকাত তারাবী পড়তেন। এতে তাঁদের কেউ কোন আপত্তি করেননি। এটাকেই সাহাবীগণের ইজমা বা সম্মিলিত কর্মপন্থা বলা হয়।

গ. আবুল আলিয়ার বর্ণনা

আবুল আলিয়া বর্ণনা করেছেন,

أن عمر أمر أبيا أن يصلي بالناس في رمضان فقال: إن الناس يصومون النهار ولا يحسنون أن يقرأوا فلو قرأت القرآن عليهم بالليل فقال: يا أمير المؤمنين! هذا شيئ لم يكن فقال: قد علمت ولكنه حسن فصلى بهم عشرين ركعة.

অর্থাৎ উমর রা. উবাই রা.কে রমযানে লোকদের নিয়ে নামায পড়তে আদেশ দিলেন এবং একথা বললেন যে, লোকেরা দিনভর রোযা রাখে, তারা সুন্দর ভাবে কুরআন পড়তেও পারে না। তাই যদি আপনি রাত্রে তাদের সামনে কুরআন পড়তেন। তিনি তখন বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! একাজ তো ইতিপূর্বে হয় নি। তিনি বললেন, আমি তা জানি। তবে এটা একটা উত্তম কাজ হবে। এরপর উবাই রা. লোকদেরকে নিয়ে বিশ রাকাত পড়লেন। (দ্র, আলমুখতারা, ১১৬১; কানযুল উম্মাল, ৪/২৮৪, মুসনাদে আহমাদ ইবন মানী’র বরাতে।)

এ হাদীসের সনদ হাসান।

এ হাদীসটির একজন রাবী হলেন, আবু জাফর রাযী ঈসা ইবনে আবূ ঈসা মাহান। তার কারণে আলবানী সাহেব এবং তারই অনুসরণে মুযাফফর বিন মুহসিন হাদীসটিকে যঈফ বলেছেন। এই রাবী সম্পর্কে বড় বড় হাদীসবিশারদগণের ভাল মন্তব্যগুলো চেপে রেখে তারা শুধু সমালোচনামূলক মন্তব্যগুলো উল্লেখ করে গেছেন। তাতেও আবার কাটছাট ও অর্থ বিকৃত করার ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

তারাবীহর রাকআত সংখ্যা বইয়ের ৩৮ নং পৃষ্ঠায় মুযাফফর বিন মুহসিন লিখেছেন , ইমাম আহমাদ ও নাসাঈ (রহঃ) বলেন, সে নির্ভরযোগ্য নয়। অথচ তারা বলেছেন, ليس بالقوي তিনি মজবুত নন। এছাড়া ইমাম আহমদ এও বলেছেন, صالح الحديث তিনি সঠিক হাদীস বর্ননাকারী। কিন্তু তার এ মন্তব্যটিও লেখক চেপে গেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার রহ.এর মন্তব্যটি তিনি এভাবে পেশ করেছেন: স্মৃতিশক্তিতে ত্রুটি রয়েছে। অথচ তার পুরো মন্তব্য হলো, صدوق سيء الحفظ তিনি সাদূক বা সত্যনিষ্ঠ তবে দুর্বল স্মৃতির অধিকারী। এমনিভাবে হাফেজ যাহাবীর মন্তব্য এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে: ‘তিনি তার আল কুনা গ্রন্থে বলেন, প্রত্যেক মুহাদ্দিসই তাকে অভিযুক্ত করেছেন। অথচ যাহাবী আল কুনায় তার সম্পর্কে কোন মন্তব্যই করেন নি। করবেন কী করে, তিনি নিজেই তো মুগনী গ্রন্থে বলেছেন, صدوق তিনি সত্যনিষ্ঠ। আর মীযান গ্রন্থে বলেছেন, صالح الحديث তিনি সঠিক হাদীস বর্ণনাকারী। এছাড়া আলী ইবনুল মাদীনী, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, ইবনে সা’দ, ইবনে আম্মার, আবু হাতেম রাযী, হাকেম ও ইবনে আব্দুল বার সকলেই তাকে ছিকাহ বা বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ইবনে আদী আল কামিল গ্রন্থে বলেছেন, أحاديثه عامتها مستقيمة وأرجو أنه لا بأس به তার অধিকাংশ হাদীসই সঠিক, আমি মনে করি তার মধ্যে সমস্যার কিছু নেই। ইমাম বুখারী তার আলোচনা করেছেন আত তারীখুল কাবীর (নং ২৭৯০) ও আল আওসাত (নং ১৯৫৬) গ্রন্থদ্বয়ে। কিন্তু তিনি কোন বিরূপ মন্তব্য করেন নি।

ঘ. ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল আনসারীর বর্ণনা:

ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল আনসারী বর্ণনা করেছেন,

إن عمررض أمر رجلا يصلي بهم عشرين ركعة

অর্থাৎ হযরত উমর রা. জনৈক সাহাবীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সাহাবীদের নিয়ে বিশ রাকাত পড়তে। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ৭৭৬৪।

এই বর্ণাটির সনদ সহীহ। তবে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ যেহেতু হযরত উমর রা. এর যুগ পাননি, আবার কার কাছ থেকে শুনেছেন তাও বলেননি, এই কারণে এটিকে মুনকাতি’ বা সূত্র-বিচ্ছিন্ন বলা হয়। কিন্তু যেহেতু এই ধরণের তাবেয়ীগণের উস্তাদ পর্যায়ে দুর্বল বর্ণনাকারী ছিলনা বললেই চলে, তাই তাদের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য। তদুপরি তিনি একা নন। আরো তিনজন তাবেয়ী একই সাক্ষ্য দিচ্ছেন। তাই এগুলো পূর্ববর্তী সহীহ ও অবিচ্ছিন্ন সূত্রে বর্ণিত হাদীসটির সমর্থক ও অতিরিক্ত সাক্ষী হিসেবে গণ্য হতে পারে।

Previous Next

نموذج الاتصال