কোরআনের মাহাত্ম্য | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

কোরআনের মাহাত্ম্য


কোরআনের মাহাত্ম্য

হজরত ওসমান ইবনে আফফান বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই, যে নিজে কোরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে তা শিক্ষা দেয়। বোখারী, মুসলিম। বায়হাকী তাঁর ‘আল আসমা’ গ্রন্থে অতিরিক্তরূপে সংযোজন করেছেন এই সকল গ্রন্থের উপরে কোরআনের মর্যাদা ওইরূপ, যে রূপ মর্যাদা স্রষ্টার, তার সৃষ্টির উপর।
হজরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, দুই ধরনের লোকের প্রতি ঈর্ষা করা বৈধ। তার মধ্যে এক ধরনের লোক আল্লাহ্‌ যাকে দান করেছেন কোরআন। আর সে দিবারাত্রি জড়িত থাকে কোরআনের সঙ্গে। অপর ব্যক্তি সে, যাকে আল্লাহ্‌ দান করেছেন অঢেল সম্পদ, আর সে তার সম্পদ অকাতরে ব্যয় করতে থাকে আল্লাহ্‌র পথে। বোখারী, মুসলিম।
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৩
হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, প্রতিফল দিবসে তিনটি বস্তু আরশের নিচে স্থান পাবে ১. কোরআন, যার রয়েছে দু’টি দিক, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ২. আমানত ৩. স্বজনবন্ধন। স্বজনবন্ধন তখন চীৎকার করে বলতে থাকবে, শোনো, যে আমাকে জড়িয়ে রেখেছিলো, আজ আল্লাহ্‌ও তাকে তাঁর স্বজন বলে গণ্য করবেন। আর যে আমাকে ছিন্ন করেছিলো, আজ আল্লাহও তাঁর সামীপ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবেন তাকে।
হজরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, মহাবিচারের দিবসে কোরআনের বাহককে বলা হবে, পাঠ করো এবং উন্নতমান হও। আবৃত্তি করো মধুর স্বরে, যেমন মধুর কণ্ঠে আবৃত্তি করতে পৃথিবীতে। সেখানে যেখানে শেষ করেছিলে, সে স্থানই তোমার মাকাম। আহমদ, তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ। হজরত আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. জ্বিন ও মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আল্লাহ্‌ বলেন, যাকে তার কোরআন তেলাওয়াত আমার জিকির থেকে বিরত রাখে, তাকে আমি দান করব প্রার্থনাকারী অপেক্ষা অধিক। সকল বাণীর উপরে আল্লাহ্‌র বাণীর মর্যাদা ওই রূপ, যেরূপ মর্যাদা স্রষ্টার, তাঁর সৃষ্টির উপর।
হজরত ইবনে মাসউদ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআনের একটি অক্ষর পাঠ করে, সে লাভ করে দশটি পুণ্য। আর একটি পুণ্যকে করা হবে দশগুণ। আমি এরকম বলিনা যে, আলিফ-লাম-মীম একটি অক্ষর। বরং আলিফ একটি অক্ষর। তেমনি পৃথক পৃথক অক্ষর লাম ও মীম। তিরমিজি, দারেমী। তিরমিজি বলেছেন, হাদিসটি উত্তম সূত্রপরমžরাগত, বিশুদ্ধ ও বিরল শ্রেণীর। হারেছ ইবনে আওয়ার বর্ণনা করেছেন, আমি একবার এক মসজিদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুনলাম, মসজিদের ভিতরে কিছু লোক হাদিস সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক করছে। আমি খলিফা হজরত আলীর নিকটে উপস্থিত হয়ে ঘটনাটি জানালাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সত্যিই কি তারা এরকম করছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, শোনো, রসুল স. একবার বললেন, সাবধান! অচিরেই ফেৎনার উদ্ভব ঘটবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্‌র প্রিয়তম রসুল! তাহলে আমাদের উপায় কী হবে? তিনি স. বললেন, আল্লাহ্‌র বাণী পাক কোরআন, যাতে রয়েছে অতীতের ইতিবৃত্ত, ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনা। তোমাদের জীবনযাপনের সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে কোরআনে। এ নিয়ে কেউ যেনো কৌতুক না করে। কোনো অত্যাচারীর কারণে যদি কেউ একে পরিত্যাগ করে, তবে আল্লাহ্‌ ওই অত্যাচারীকে ধ্বংস করে দিবেন। কোরআনকে ছেড়ে কেউ যদি অন্য উপায়ে পথপ্রাপ্তির অভিলাষী হয়, তবে আল্লাহ্‌ তাকে বিভ্রান্ত করে দিবেন। এটাই আল্লাহ্‌পাকের সুদৃঢ় রজ্জু। এর মধ্যেই রয়েছে শুভউপদেশমূলক মহাজ্ঞান। এটা এমন মহান গ্রন্থ, যাকে মান্য করে চললে প্রবৃত্তি কখনো বক্র-পথাভিমুখী হবে না। বচনে থাকবে না কোনো দোদুল্যমানতা। জ্ঞানান্বেষীগণ এ গ্রন্থ বার বার পড়েও পরিতৃপ্ত হবে না। পুনঃ পুনঃ পাঠ করলেও
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৪
এর আবেদন কখনো ক্ষুণ্ন হবে না। এর বিস্ময় অনিঃশেষ। এটা ওই গ্রন্থ, যার সংস্পর্শে জ্বিন জাতির ঔদাসীন্য দূরীভূত হয়েছিলো। তারা বলেছিলো, আমরা এমন বিস্ময়কর বাণী শ্রবণ করেছি, যা প্রদর্শন করে সরল পথ। আমরা এর উপরে ইমান এনেছি। এই কোরআনের অনুসরণে যে কথা বলবে, সে সত্য বলবে। যে এর বিধানাবলীর উপরে সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করবে, সে উত্তম বিনিময় লাভ করবে। যে এর আলোকে মীমাংসা করবে, সে সুবিচার করবে। এর প্রতি যে আমন্ত্রণ জানাবে, সে পেয়ে যাবে সরল পথ। তিরমিজি, দারেমী।
হজরত মুয়াজ জুহুনী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করে, কার্যকর করে কোরআনের নির্দেশাবলী, মহাবিচারের দিবসে আল্লাহ্‌ তার পিতামাতার মাথায় পরিয়ে দিবেন এমন মুকুট, যা হার মানাবে দিবাকরের প্রখরতাকেও, যে দিবাকরকে তোমরা প্রত্যক্ষ করো তোমাদের আপন আপন আবাস থেকে। এখন অনুমান করো ওই ব্যক্তিটির মর্যাদা হবে কী রকম? আহমদ, আবু দাউদ।
হজরত উকবা ইবনে আমের বর্ণনা করেছেন, আমি স্বকর্ণে শুনেছি, রসুল স. বলেছেন, কোরআন পাক চামড়ার উপরে রেখে ওই চামড়া আগুনের উপরে রাখলে কোরআনপাক আগুনে পুড়বে না। দারেমী। হজরত আলী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআন মজীদ পাঠ করে এবং একে বানিয়ে নেয় তার পশ্চাতের ঢাল, এতে বর্ণিত হালালকে মেনে নেয় হালাল হিসাবে এবং হারামকে মনে করে হারাম, আল্লাহ্‌ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর তার পরিবারের এমন দশজনের জন্য তাকে শাফায়াত করবার অনুমতি দিবেন, যাদের জন্য অপরিহার্য হয়েছিলো জাহান্নাম। তিরমিজি, আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজা, দারেমী।
জননী আয়েশা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, নামাজের বাইরে কোরআন তেলাওয়াত করা অপেক্ষা, নামাজের অভ্যন্তরে কোরআন তেলাওয়াত উত্তম। আবার নামাজের বাইরে তেলাওয়াত করা তসবীহ, তকবীর অপেক্ষা উত্তম। আর রোজা দোজখ থেকে রক্ষা পাওয়ার ঢাল। হজরত আউস সাকাফী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, না দেখে কোরআন পাঠ করার মর্যাদা এক হাজার। আর দেখে পাঠ করার মর্যাদা তার দ্বিগুণ। হজরত ইবনে ওমর বর্ণনা করেছেন, রসুল স. একবার বললেন, কোনো কোনো হৃদয়ে মরিচা পড়ে যায়, যেমন লোহাতে মরিচা পড়ে পানির পরশে। নিবেদন করা হলো, হে আল্লাহ্‌র রসুল! সে মরিচা পরিষ্কার করার উপায় কী? তিনি স. বললেন, মৃত্যুর স্মরণ এবং কোরআন পাঠ। উপরোল্লিখিত হাদিসত্রয় বায়হাকী সংকলন করেছেন তাঁর শো’বুল ইমানে। হজরত আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, আল্লাহ্‌ এতো অধিক একাগ্রতার সঙ্গে তাঁর নবীর কোরআন তেলাওয়াত শোনেন যে, সেরকম করে অন্য কিছুই শোনেন না। মুসলিম। হজরত আবু হোরায়রার অপর বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ্‌ উৎকর্ণ হয়ে কারো সুললিত স্বরের কোরআন তেলাওয়াত শোনেন না, যেমন উৎকর্ণ হয়ে শোনেন তাঁর নবীর সুললিত স্বরবিশিষ্ট সশব্দ তেলাওয়াত। তিনি আরো বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, ওই ব্যক্তি আমাদের দলভূত নয়, যে সুললিত কণ্ঠে কোরআন আবৃত্তি করে না।
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৫
হজরত জাবের বর্ণনা করেছেন, একবার আমরা কোরআন পাঠ করছিলাম। আমাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলো একজন অনারব গেঁয়ো লোক। এমন সময় রসুল স. সেখানে উপস্থিত হলেন। বললেন, পাঠ করো। তোমাদের প্রত্যেকের পাঠ উত্তম। অচিরেই এমন লোকের আগমন ঘটবে, যারা কোরআনের পাঠপদ্ধতি সোজা করে ফেলবে, যেমন সোজা করা হয় তীর। অর্থাৎ তারা পাঠ করবে অতিদ্রুত। আর এমতো পাঠের বিনিময় তারা এ জগতেই নিয়ে নিবে। পরজগতের পুণ্যলাভের আকাংখাও তাদের থাকবে না। আবু দাউদ, বায়হাকী।
হজরত হুজায়ফা বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, কোরআন আবৃত্তি কোরো আরবী পাঠরীতি ও আরবী স্বরে। গায়কদের রাগ-রাগিনী এবং গ্রন্থধারীদের পাঠপদ্ধতি পরিহার কোরো। আগামীতে এমন কিছুসংখ্যক লোকের প্রাদুর্ভাব ঘটবে, যারা কোরআন আবৃত্তি করবে গায়কী ঢঙে, রাগ-রাগিনী সহযোগে। তাদের তেলাওয়াতের প্রভাব তাদের কণ্ঠনালীর নিচে পৌঁছবে না। তাদের হৃদয় হবে ফেৎনাভরা। তারাও ফেৎনায় পতিত হবে, যারা তাদেরকে ভালোবাসবে। বায়হাকী, ইবনে রযীন। হজরত উবায়দা মুলাইকি বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, ওহে কোরআনের অধিকারী! কোরআন মজীদকে উপাধান বানিয়ো না। দিনে রাতে তেলাওয়াত কোরো। তেলাওয়াতের হক আদায় কোরো। পাঠ কোরো সুললিত কণ্ঠে, বিশুদ্ধ উচ্চারণে। এর প্রচার-প্রসারে সচেষ্ট হয়ো এবং এর বিষয়ে গবেষণাও কোরো, যেনো অর্জন করতে পারো সফলতা। পার্থিব বিনিময়প্রাপ্তির প্রত্যাশায় তাড়াহুড়া করে পাঠ কোরো না। এর প্রকৃত বিনিময় তো লাভ হবে পরকালে। বায়হাকী হাদিসটি উল্লেখ করেছেন তাঁর শো’বুল ইমান গ্রন্থে।
হজরত আলী বর্ণনা করেছেন, রসুল স. বলেছেন, কোরআন পাক হচ্ছেউত্তম প্রতিষেধক। ইবনে মাজা। হজরত ইবনে মাসউদ বর্ণনা করছেন, রসুল স. বলেছেন, মধু ও কোরআন সকল ব্যাধির উপশমক। ওয়াইলা ইবনে আসকা বর্ণনা করেছেন, এক লোক রসুল স. এর সুমহান সান্নিধ্যে উপস্থিত হয়ে তার কণ্ঠনালীর ব্যথার কথা জানালো। তিনি স. বললেন, কোরআন পাঠ করতে থাকো। বায়হাকী। হজরত আবু সাঈদ খুদরী বর্ণনা করেছেন, এক লোক রসুল স. এর সুমহান সংসর্গে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলো, আমার বুকে খুব ব্যাথা। তিনি স. বললেন, কোরআন পাঠ করতে থাকো। আল্লাহ্‌ তো স্বয়ং বলেছেন ‘শিফাউল লিমা ফীস্‌ সুদুর’ (বক্ষে যা আছে তার নিরাময়ক)।
হজরত তালহা ইবনে মাতরাফের বর্ণনায় এসেছে, যখন কোনো রোগগ্রস্ত ব্যক্তির পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করা হয়, তখন দেখা যায় তার রোগের প্রকোপ কমে আসছে। রসুল স. এর যুগেও এরকম বলা হতো। আবু উবায়দা। আল্লাহ্‌ই প্রকৃত পরিজ্ঞাতা।
আলহামদু লিল্লাহি রববিল আ’লামীন ওয়া সল্লাল্লহু তায়ালা আ’লা খইরি খলক্বিহী মুহাম্মাদ ওয়া আলিহী ওয়া আসহাবিহী আজ্বমাঈন। আমিন।
সমাপ্ত
তাফসীরে মাযহারী/৬৫৬