ফিতনা ও বিপর্যয় সম্পর্কিত হাদিস সমূহ | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস


ফিতনা ও বিপর্যয় সম্পর্কিত হাদিস সমূহ

[১] আসমা (রা) বর্ণনা করেছেন যে নবী (সা) বলেছেন : আমি আমার হাউযের পাশে আগমনকারী লোকদের অপেক্ষায় থাকব। তখন আমার সম্মুখ থেকে কতিপয় লোককে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি বলব, এরা তো আমার উম্মত। তখন বলা হবে, আপনি জানেন না, এরা ( আপনার পথ ছেড়ে ) পিছনে চলে গিয়েছিল। (বর্ণনাকারী) ইবন আবূ মুলায়কা বলেন : হে আল্লাহ! পিছনে ফিরে যাওয়া কিংবা ফিতনায় পতিত হওয়া থেকে আমরা আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি।–সহিহ বুখারী:৭৪৮

[২] আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সা) আমাদের বলেছেন : আমার পরে তোমরা অবশ্যই ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা  লক্ষ্য করবে। এবং এমন কিছু বিষয় দেখতে পাবে, যা তোমরা পছন্দ করবে না। তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা)! তাহলে আমাদের জন্য কি হুকুম করছেন ? উত্তরে তিনি বললেন : তাদের হক পরিপূর্ণরূপে আদায় করবে, আর তোমাদের প্রাপ্য আল্লাহর কাছে চাইবে।– সহিহ বুখারী:৭০৫২

[৩] উসায়দ ইবন হুযায়র (রা) থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি নবী (সা)-এর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ ! আপনি অমুক ব্যক্তিকে প্রশাসক নিযুক্ত করলেন, অথচ আমাকে নিযুক্ত করলেন না। তখন নবী (সা) বললেন :

إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ بَعْدِي أَثَرَةً، فَاصْبِرُوا حَتَّى تَلْقَوْنِي

নিশ্চয়। তোমরা আমার পর অগ্রাধিকারের প্রবণতা দেখবে। সে সময় তোমরা ধৈর্য ধারণ করবে, যতক্ষণ না আমার সঙ্গে মিলিত হও।– সহিহ বুখারী:৭০৫৭

[৪] যায়নাব বিনত জাহাশ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী (সা) রক্তবর্ণ চেহারা নিয়ে নিদ্রা থেকে জাগলেন এবং বলতে লাগলেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। অত্যাসন্ন এক দুর্যোগে আরব ধ্বংস হয়ে যাবে। ইয়াজূজ-মা’জূজের (প্রতিরোধ) প্রাচীর আজ এতটুকু পরিমাণ খুলে গেছে। সুফিয়ান নব্বই কিংবা একশতের রেখায় আঙ্গুল রেখে গিঁট বানিয়ে পরিমাণটুকু দেখালেন। জিজ্ঞসা করা হল, আমরা কি ধ্বংস হয়ে যাব অথচ আমাদের মধ্যে নেককার লোকও থাকবে ? নবী (সা) বললেন : হ্যাঁ, যখন পাপাচার বৃদ্ধি পাবে।– সহিহ বুখারী:৭০৫৯

[৫] উসামা ইবন যায়িদ (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একদা নবী (সা) মদীনার টিলাসমূহের একটির উপর উঠে বললেন : আমি যা দেখি তোমরা কি তা দেখতে পাও ? উত্তরে সাহাব-ই-কিরাম বললেন, না। তখন নবী (সা) বললেন :

فَإِنِّي لَأَرَى الفِتَنَ تَقَعُ خِلاَلَ بُيُوتِكُمْ كَوَقْعِ القَطْرِ

নি:সন্দেহে আমি দেখতে পাচ্ছি, তোমাদের ঘরগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ফিতনা বৃষ্টিধারার মতো নিপতিত হচ্ছে।– সহিহ বুখরী:৭০৬০

[৬] আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী (সা) বলেছেন :

يَتَقَارَبُ الزَّمَانُ، وَيَنْقُصُ العَمَلُ، وَيُلْقَى الشُّحُّ، وَتَظْهَرُ الفِتَنُ، وَيَكْثُرُ الهَرْجُ

সময় নিকটবর্তী হতে থাকবে, আর আমল হরাস পেতে থাকবে, কার্পণ্য ছড়িয়ে দেওয়া হবে, ফিতনার বিকাশ ঘটবে এবং হারজ ব্যাপকতর হবে। সাহাবা-ই-কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন, সেটা (হারজ) কি ? নবী (সা) বললেন: হত্যা,হত্যা।– সহিহ বুখারী:৭০৬১

[৭] শাকিক থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ও আবূ মুসা (রা)-এর সাথে ছিলাম। তাঁরা বলেন, নবী (সা) বলেছেন :

إِنَّ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ لَأَيَّامًا، يَنْزِلُ فِيهَا الجَهْلُ، وَيُرْفَعُ فِيهَا العِلْمُ، وَيَكْثُرُ فِيهَا الهَرْجُ

অবশ্যই কিয়ামাতের পূর্বে এমন একটি সময় আসবে যখন সর্বত্র মূর্খতা ছড়িয়ে পড়বে এবং তাতে ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে। সে সময় ‘হারজ’ ব্যাপকতর হবে।

আর ‘হারজ’ হল (মানুষ) হত্যা।– সহিহ বুখারী:৭০৬২

[৮] ইবন মাসউদ (রা) বলেন, আমি নবী (সা)-কে বলতে শুনেছি যে,

مِنْ شِرَارِ النَّاسِ مَنْ تُدْرِكْهُمُ السَّاعَةُ وَهُمْ أَحْيَاءٌ

কিয়ামত যাদের জীবদ্দশায় কায়েম হবে তারাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোক।– সহিহ বুখারী:৭০৬২

[৯] যুবায়র ইবন আদী (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আনাস ইবন মালিক (রা)-এর নিকট গেলাম এবং হাজ্জাজের পক্ষ থেকে মানুষ যে নির্যাতন ভোগ করছে সে সম্পর্কে অভিযোগ পেশ করলাম। তিনি বললেন,

اصْبِرُوا، فَإِنَّهُ لاَ يَأْتِي عَلَيْكُمْ زَمَانٌ إِلَّا الَّذِي بَعْدَهُ شَرٌّ مِنْهُ، حَتَّى تَلْقَوْا رَبَّكُمْ

ধৈর্য ধারণ কর। কেননা, মহান প্রতিপালকের সহিত মিলিত হওয়ার পূর্ব  পর্যন্ত (অর্থাৎ মৃত্যুর পর্যন্ত) তোমাদের উপর এমন কোন যুগ অতিবাহিত হবে না, যার পরবর্তী যুগ তার চেয়েও নিকৃষ্টতর নয়।

তিনি বলেন, এ কথাটি আমি তোমাদের নবী (সা) থেকে শ্রবণ করেছি।– সহিহ বুখরী:৭০৬৮

[১০] নবী পত্নী উম্মে সালাম (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একরাতে নবী (সা) ভীত অবস্থায় নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয়ে বলতে লাগলেন, সুবহানাল্লাহ, আল্লাহ তা’আলা কতই না খাযানা নাযিল করেছেন আর কতই না ফিতনা অবতীর্ণ হয়েছে। কে আছে যে হুজরাবাসিনীদেরকে জাগিয়ে দেবে, যেন তরা নামায আদায় করে। এ বলে তিনি তাঁর স্ত্রীগণকে উদ্দেশ্য করেছিলেন। তিনি আরও বললেন : দুনিয়ার মধ্যে বহু বস্ত্র পরিহিতা পরকালে বিবস্ত্রা থাকবে।– সহিহ বুখারী:৭০৬৯

চলবে ইনশাল্লাহ

১১. আবূ হুরাইরাহ (রা) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন তার অন্য কোন ভাইয়ের প্রতি অস্ত্র উঠিয়ে ইশারা না করে। কারণ সে জানে না হয়ত শয়তান তার হাতে ধাক্কা দিয়ে বসবে, ফলে (এক মুসলিমকে হত্যার কারণে) সে জাহান্নামের গর্তে পতিত হবে।-সহিহ বুখারী৭০৭২
১২. জাবির (রা) হতে বর্ণিত যে, এক লোক কতকগুলো তীর নিয়ে মসজিদে এলো। সেগুলোর ফলা খোলা অবস্থায় ছিল। তখন তাকে নির্দেশ দেয়া হল, যেন সে তার তীরের ফলাগুরো ধরে রাখে, যাতে কোন মুসলিমের গায়ে আঘাত না লাগে।-সহিহ বুখারী৭০৭৪
১৩. আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْر
কোন মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসিকী কাজ (জঘন্য পাপ) আর কোন মুসলিমকে হত্যা করা কুফরী।-সহিহ বুখারী৭০৭৬
১৪.ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন যে, আমার পরে তোমরা পরস্পরে হানাহানি করে কুফরীর দিকে ফিরে যেও না।-সহিহ বুখারী৭০৭৭
১৫. আবূ হুরাইরাহ (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অচীরেই অনেক ফিতনা দেখা দেবে। তখন উপবিষ্ট ব্যক্তি দাঁড়ানো ব্যক্তির চেয়ে উত্তম হবে। দাঁড়ানো ব্যক্তি চলমান ব্যক্তির চেয়ে উত্তম হবে। চলমান ব্যক্তি ধাবমান ব্যক্তির চেয়ে উত্তম হবে। যে ব্যক্তি ফিতনার দিকে তাকাবে ফিতনা তাকে ঘিরে ধরবে। তখন কেউ যদি কোন আশ্রয়ের কিংবা নিরাপদ জায়গা পায়, তাহলে সে যেন সেখানে আত্মরক্ষা করে।-সহিহ বুখারী৭০৮১

১৬.হাসান বসরী (রহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ফিতনার রাতে (অর্থাৎ জঙ্গে জামাল কিংবা জঙ্গে সিফফীনে) আমি হাতিয়ার নিয়ে বের হলাম। হঠাৎ আবূ বকরাহ (রা) আমার সামনে পড়লেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাচ্ছ? আমি বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচাত ভাইয়ের সাহায্যার্থে যাচ্ছি। তখন তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি দু’জন মুসলিম তলোয়ার নিয়ে পরস্পর সংঘর্ষের জন্য মুখোমুখী হয়, তাহলে উভয়েই জাহান্নামীদের মধ্যে গণ্য হবে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, হত্যাকারী তো জাহান্নামী। কিন্তু নিহত ব্যক্তির কী অপরাধ? তিনি বললেন, সেও তার বিপক্ষকে হত্যা করার সংকল্প করেছিল।-সহিহ বুখারী৭০৮৩
১৭. সালামাহ ইবনু আকওয়া’ (রা) হতে বর্ণিত যে, একবার হাজ্জাজ আমার কাছে এলেন। তখন সে তাঁকে বলল, হে ইবনু আক্ওয়া! আপনি আগের অবস্থায় ফিরে গেলেন না কি যে বেদুঈনের মত জীবন কাটাতে শুরু করেছেন? তিনি বললেন, না। বরং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বেদুঈন সুলভ জীবন যাপনের অনুমতি প্রদান করেছেন।
ইয়াযীদ ইবনু আবূ ‘উবাইদুল্লাহ্ বর্ণনা করেন যে, যখন ‘উসমান ইবনু আফ্ফান (রা) নিহত হলেন, তখন সালামাহ ইবনু আকওয়া (রা) ‘রাবাযা’য় চলে যান এবং সেখানে তিনি এক মহিলাকে বিয়ে করেন। সে মহিলার ঘরে তাঁর কয়েকজন সন্তান জন্মে। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি মাদীনায় আসেন। এর আগ পর্যন্ত তিনি সেখানেই বসবাসরত ছিলেন।-সহিহ বুখারী৭০৮৭
১৮.আবূ সাঈদ খুদরী (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
يُوشِكُ أَنْ يَكُونَ خَيْرَ مَالِ الْمُسْلِمِ غَنَمٌ يَتْبَعُ بِهَا شَعَفَ الْجِبَالِ وَمَوَاقِعَ الْقَطْرِ يَفِرُّ بِدِينِهِ مِنْ الْفِتَنِ
শীঘ্রই এমন এক সময় আসবে যখন মুসলিমদের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সম্পদ হবে ছাগল। ফিতনা থেকে দ্বীন রক্ষার্থে পলায়নের জন্য তারা এগুলো নিয়ে পর্বতের চূড়ায় এবং বৃষ্টিপাতের জায়গাগুলোতে আশ্রয় নেবে।-সহিহ বুখারী৭০৮৮
১৯.ইবনু উমার (রা) হতে বর্ণিত যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পূর্ব দিকে মুখ করে বলতে শুনেছেন-
أَلاَ إِنَّ الْفِتْنَةَ هَا هُنَا مِنْ حَيْثُ يَطْلُعُ قَرْنُ الشَّيْطَانِ
সাবধান! ফিতনা সে দিকে যে দিক থেকে শয়তানের শিং উদিত হয়।-সহিহ বুখারী৭০৯৩
২০.আবূ বাকরাহ্ (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একটি কথা দিয়ে আল্লাহ্ জঙ্গে জামাল (উষ্ট্রের যুদ্ধ) এর সময় আমাকে বড়ই উপকৃত করেছেন। (তা হল) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যখন এ খবর পৌঁছল যে, পারস্যের লোকেরা কিসরার মেয়েকে তাদের শাসক নিযুক্ত করেছে, তখন তিনি বললেনঃ
لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ وَلَّوْا أَمْرَهُمْ امْرَأَةً
সে জাতি কক্ষনো সফলকাম হবে না, যারা তাদের শাসনভার কোন স্ত্রীলোকের হাতে অর্পণ করে।-সহিহ বুখারী৭০৯৯

চলবে ইনশাল্লাহ