ইমাম আলা হযরত (রাঃ) কর্তৃক হযরত মা আয়িশা সিদ্দিকাহ (رضي الله عنه)'র শানে অসম্মান করা" মর্মে অভিযোগের ভ্রান্তি নিরসন। | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস



ইমাম আলা হযরত (রাঃ) কর্তৃক হযরত মা আয়িশা সিদ্দিকাহ (رضي الله عنه)'র শানে অসম্মান করা" মর্মে অভিযোগের ভ্রান্তি নিরসন।

অনুবাদকঃ মুহাম্মদ শাহীদ রিজভী


সাইয়েদী আলা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খান আলাইহির রাহমা "হাদায়িক ই বকশিশ খণ্ড ৩"-এ হযরত সাইয়্যিদা মা আয়েশা (রাদ্বিঃ)-কে অসম্মান করেছেন এমন ভিত্তিহীন অভিযোগের জবাব দেওয়া হলোঃ-


আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।


প্রাককথনঃ


আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন খারিজী, দুশমনে আহলে সুন্নাত ও তাদের দোসররা আমাদের আকাবির সুন্নি উলামাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন গীবত ও মিথ্যাচার করা ছেড়ে দিয়ে ভালো কোনো কাজ করতে পারেনি।


এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, তাদের বইসমূহে তাদের আকাবেরদের লেখনীতে তাদের নিজস্ব ভুলে ভরা তথ্য এবং মিথ্যা তত্ব বিশ্বাসকে ঢাকার চেষ্টা করতে গিয়ে ইমাম আহমদ রেজা খান রাদিআল্লাহু আনহুর অবমাননা ও তাঁর রচনাগুলিকে অপব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে এক শতাব্দীর বেশিরভাগ সময় তারা ব্যয় করেছে।


এই ভিত্তিহীন অভিযোগগুলির মধ্যে একটি হ'ল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত এর মহান ইমাম আলা হযরত নাকি তাঁর কবিতায় হযরত সাইয়্যিদা মা আয়েশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহা কে অসম্মান করেছেন। নিচের লিখাটি পড়ার পরে, খারেজী ও তাদের আধুনিক দোসররা সত্যকে আড়াল করতে কতদূর নিচে নেমেছে তা স্ফটিক স্বচ্ছ হয়ে উঠবে।


কিতাবটির প্রকাশ কাল ও আলা হযরত এঁর ইন্তিকালঃ


ইমাম আহমদ রেজা তাঁর ধ্রুপদী কাব্য রচনা "হাদাইক ই বখশিশ" দুটি ভাগে সংকলন করেছেন এবং এটি ১৩২৫ হিজরিতে [১৯০৮ খ্রিস্টাব্দ] প্রকাশিত হয়েছিল। আর ইমাম আহমদ রেজা খান ১৩৪০ হিজরিতে [১৯২১ খ্রিস্টাব্দে] ইন্তেকাল করেছেন।


ইমাম আহমদ রেজা খানের ইন্তেকালের দু'বছর পরে অর্থাৎ ১৩৪২ হিজরিতে [১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে], মাওলানা মাহবুব আলী খান আলা হযরতের রচনার বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছিলেন এবং এটি নাবাহ স্টিম প্রেসকে (পাতিয়ালা, ভারত) প্রকাশের জন্য দিয়েছিলেন। যেহেতু ইমাম আহমদ রেজা খান ইতোমধ্যে ইন্তিকাল করেছেন, তাই মাওলানা মাহবুব আলী খান শিরোনাম পৃষ্ঠায় আলা হযরত এঁর নামের পর ''রাদি আল্লাহু তা'আলা আনহু" শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করেছিলেন এবং হাদাইক ই বখশীশের প্রথম দুটি খন্ড প্রকাশিত হয়েছিল ১৩২৫ হিজরিতে, মাওলানা মাহবুব আলী খান লিখেছেন এই বইয়ের প্রকাশের বছরও ১৩২৫ হি। শিরোনাম পৃষ্ঠায় এটিও লেখা ছিল যে "মুরাত্তিব" (সংকলক) হলেন মাওলানা মাহবুব আলী খান।


অনুসিদ্ধান্তঃ১


উপরের আলোচনা থেকে বিবেচ্য বিষয়টি হ'ল ইমাম আহমদ রেজা নিজেই কখনও "হাদাইক ই বখশিশ খণ্ড ৩" সংকলন করেননি। 


আবারও বলছি, তাঁর জীবদ্দশায় হাদায়িক ই বখশিশ ৩য় খন্ড প্রকাশিত হয়নি। ১ম দুই খন্ড বের হয়েছিল।


মাওলানা মাহবুব আলী খান ইমাম আহমদ রেজার কালামের বিভিন্ন পান্ডুলিপি নাবাহ প্রেসকে (পাতিয়ালা, ভারত) দিয়েছিলেন যিনি এটি সংকলনের পাশাপাশি প্রকাশেরও দায়িত্ব নিয়েছিলেন।


প্রকাশক [জেনেশুনে অথবা অজান্তেই] দুটি পৃথক পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতাগুলো নিয়েছিলেন এবং উম্মে জারার বিষয়ে রচিত দু'টি কবিতাই এতে যুক্ত করা হয়েছিল যা সাইয়্যিদা আয়েশা সিদ্দিকা রাদি আল্লাহু আনহার সম্মানে লেখা হয়েছিল।


অভিযোগ উত্থাপন কালঃ


"হাদাইক ই বখশীশ ৩য় খণ্ড" প্রকাশের বত্রিশ বছর পরে, যা ১৩৭৪ হিজরিতে [১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে], দেওবন্দীরা প্রচার শুরু করে যে মাওলানা মাহবুব আলী খান সাইয়্যিদা আয়েশা সিদ্দিকা রাদি আল্লাহু আনহাকে অসম্মান করেছেন এবং এই অপরাধের কারণে তাঁর আর বোম্বে জামে মসজিদে ইমামতির দায়িত্বে থাকা ঠিক হবে না, ছেড়ে দেয়াই উচিত।


মুফতি ই আজম হিন্দ, মাওলানা মোস্তফা রেজা খান রাদিআল্লাহু আনহু লিখেছেন: "যতদূর আমার মনে পড়ে কাজিম আলী দেওবন্দীই প্রথম কানপুরের এক সভায় এই বিষয়টি প্রকাশ্যে উত্থাপন করেছিলেন"।


[দ্রঃ- মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বাহাওয়ালপুরী, ফয়সালায়ে মুকাদ্দিমা শরিয়াহ কুরআনিয়াহ, মজলিস ই রেজা থেকে প্রকাশিত, লাহোর, ১৯৮৪, পৃষ্ঠা ৮১]


কে দায়ী?


সংকলক এবং প্রকাশক, জেনেশুনে অথবা অজান্তেই [হাদীসে বর্ণিত] এগারো পবিত্র মহিলার জন্য কয়েকটি কবিতা, পাশাপাশি হযরত সাইয়্যিদা মা আয়েশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু তাআলা আনহার প্রশংসা করে লেখা পংক্তি লিখেছিলেন। এই ভুল নিয়েই বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথমে একজন সুন্নি স্কলার আল্লামা মুশতাক নিজামী মুম্বাই থেকে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় এ বিষয়ে মাওলানা মাহবুব আলী খান এর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।।


তাওবাঃ


মাওলানা মাহবুব আলী খান বলছিলেন যে তিনি সাইয়্যিদা আয়েশা রাদি আল্লাহু তালা আনহার অসম্মান করার জন্য এ পংক্তি লেখেননি। যেহেতু এটি তার অবহেলার কারণে, তাই তিনি তাওবা করছেন এবং এই তাওবা মুম্বাই ও লখনউ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।


লখনউ থেকে প্রকাশিত একটি মাসিক পত্রিকা যার নাম "সুন্নি" এর জিলহাজ্জ ১৩৭৪ হিজরীতে প্রকাশিত হয়েছিল।


এই তাওবার বিষয়ে মুফতি মাজহারুল্লাহ সাহেব মন্তব্য করে লিখেছেন, "এটি মাসিক পসবাহান এলাহাবাদ পত্রিকার সম্পাদককে সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে, আজ ৯ জিলক্বাদ ১৩৭৪ হিজরী এই বান্দা তার দোষ ও অসতর্কতা স্বীকার করে আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করেন যেন ক্ষমা করা হয়। আমীন।"


এর পরে তিনি নিজের ভুলের কারণ উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেনঃ


“উম্মে জারার সাথে সম্পর্কিত কবিতাগুলিতে সাতটি পরিচ্ছেদ রয়েছে যা আমি তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছিলাম কারণ আমি এই বিষয়ের জন্য বাকি পংক্তিগুলি খুঁজে পাইনি। প্রতিটি বিভাগের পরে আমি অন্যান্য বিভাগ থেকে এটি আলাদা করতে "আলাইহিদা" লিখেছিলাম। এছাড়াও সাইয়্যিদা আয়েশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু তালা আনহর প্রশংসা করার পংক্তিতিগুলিও অন্যান্য বিভাগে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিছু কারণে আমি এই কাজটি ভালো ভাবে পরিচালনা এবং সম্পাদনা করতে পারিনি এবং এটি নাবাহ স্টিম প্রেসের হাতে দেওয়া হয়েছিল যারা সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। বইটি প্রকাশের পরে আমি "উম্মে জারা" বিভাগের একটি পংক্তি "সায়িদাহ আয়েশা সিদ্দিকা রাদি আল্লাহু আনহার প্রশংসা" বিভাগে পেয়েছি। যখন বইটি প্রকাশিত হয়েছিল এবং ত্রুটিটি আমার দিকে নির্দেশ করা হয়েছিল আমি ভেবেছিলাম বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে আমি এটি সংশোধন করব। আমি আমার ভুল এবং গাফিলতির জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে আমাকে ক্ষমা প্রার্থনা করি।। আমীন। "


[মাসিক "সুন্নি", লখনউ, পৃষ্ঠা ১ - - মুফতি মাজাহারুল্লাহ দেহলভী, ফাতাওয়া মাজাহারী, মদীনা প্রকাশনা সংস্থা, করাচি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৯৩]


এরপরে এটি "তাওবা" শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এটিতে নিম্নরূপ লেখা ছিল:


গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা: (জরুরী এ'লান)


“হাদাইক ই বখশিশ খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৭ এবং ৩৮ পৃষ্ঠা প্রকাশিত হয়েছে কিছু ভুলের সাথে সংমিশ্রিত হয়ে। এই বিনীত ব্যক্তি ইতিমধ্যে তার তাওবা প্রকাশ করেছেন। আল্লাহ তাআলা এই তাওবা কবুল করুন। আমীন।


আমি সকল সুন্নি মুসলিম ভাইদের অনুরোধ করছি আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উসিলায় আমাকে ক্ষমা করুন। আমীন।"


আমার ঠিকানা - আবু জাফর মুহিব্বি রেজা মোহাম্মদ মাহবুব আলী কাদরী বরকতী রজভী মুজাদ্দিদী লখনী, জামিয়া মসজিদ বোম্বাই, জিপ কোড ৮। "


[দ্রঃ- মোহাম্মদ আজিজুর রহমান ভাওয়ালপুরী, ফয়সালা মুকাদ্দাস শরিয়াহ কুরআনিয়া, পৃষ্ঠা ৩২-৩৩]


মাওলানা মাহবুব আলী খান এবিষয়ে বহুবার মৌখিক ও লিখিত তাওবা করেন যা ১৯৫৫ সালের ১০ জুলাই বোম্বাইয়ের অসংখ্য পত্রিকা "সুন্নি" লখনউ থেকে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত হয়েছিল।


[মাসিক রেজা ই মুস্তফা, বোম্বাই, আগস্ট ১৯৫৫, পৃষ্ঠা ১৭]


আরও বিশদ তথ্যের জন্য পড়ুন ফয়সালা মুকাদ্দামায়ে শরিয়াহ কুরআনিয়া - এই বইটি আটানব্বই পৃষ্ঠার সমন্বয়ে সুগঠিত। আহলে সুন্নাহর একশো উনিশজন আলেম মাওলানা মাহবুব আলী খানের এই "তাওবা"-তে স্বাক্ষর করেন। তাঁরা একমত হয়েছিলেন যে মাওলানা মাহবুব আলী খান অনুতপ্ত হয়েছিলেন এবং শরীয়াহ অনুসারে এটি মেনে নিতে হয়েছিল। এতে স্বাক্ষরকারী আলেমদের মধ্যে রয়েছেন:


  • মাওলানা সালিম কাদরী, ইমাম, জামে মসজিদ বানারস।

  • ফকির আবুল ফাতাহ হাশমত আলী খান সাহেব।

  • সাইয়েদ মুহাম্মাদ আশরাফি সাহেব মুফতি মাজাহারুল্লাহ সাহেব।

  • মুফতি ই আজম হিন্দ হযরত মুস্তফা রাজা খান আলাইহিরাহমাহ।

  • হযরত আল্লামা মাওলানা জাফরউদ্দিন বিহারী আলাইহির রাহমাহ।


আমরা আন্তরিকভাবে আশাবাদী যে, এটি ইমাম আহমদ রেজা খান আলাইহির রহমাহর বিরুদ্ধে একটি ভিত্তিহীন অভিযোগের অবসান ঘটাবে। কারণ এটাই স্পষ্ট যে ইমাম আহমদ রেজা খান ১৩৪০ সালে ইন্তিকাল করেছিলেন এবং মাওলানা মাহবুব আলী খানের সংকলিত এই বইটি *হাদাইক ই বখশীশ খণ্ড-৩* প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৪২ সাল। ইমাম আহমদ রেজা খান এই ভুলের সাথে কোনো ভাবেই জড়িত নন, বরং এটি অন্যরা করেছিলেন - যেমনটি উপরে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে।


করণীয় ও শেষকথাঃ


দেওবন্দী মসলক ও তাঁদের সমর্থক ও দোসরদের জন্য উপদেশ হলো, ইমাম আহমদ রেজা খান আলাইহির রাহমা'র বিরুদ্ধে না লেগে তাঁদের নিজস্ব বই যথা "তাহজির উন নাস", "হিফজুল ঈমান" এবং "বারহীন এ কাতিয়া" ইত্যাদি এবং এর মতো আরও শত শত অন্যান্য বইয়ের মধ্যে থাকা ময়লাগুলি সাফ করতে মনোনিবেশ করা উচিত।


جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا -


"সত্য আগমন করেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; এবং নিশ্চয়ই মিথ্যা অপসৃত হওয়ারই ছিলো।"


___________________

মূল লেখকঃ 

  • ফকির মোহাম্মদ শাকিল কাদরী রিযবী (লন্ডন, যুক্তরাজ্য)

  • ৮ ই সফর আল মুজাফফার ১৪৩৬, সোমবার ১ ডিসেম্বর ২০১৪খৃঃ।

  • মুফতি জাহিদ হুসেন আল-কাদরী মূল লেখাটির নজরে সানি করেছেন।


বাংলা অনুবাদঃ 

  • মুহাম্মদ শাহীদ রিজভী,

  • আইনজীবী ও সমাজকর্মী।

  • ঢাকা, বাংলাদেশ।

  • ১৬ অক্টোবর, ২০১৯.