রসুলাল্লাহ সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

 لا اله إلآ الله محمد رسول الله
প্রথম  অধ্যায়ে ইলাহ্  বা আল্লাহর পরিচয় দেয়া হয়েছে এবং  উলুহিয়াতের   ভিত্তি কিসের  উপর তা   বর্ণনা করা হয়েছে।     এবার     আসুন      রাসূল       সম্পর্কে।      কালেমা তাইয়েবা -এর দু'টি অংশ। একটি অংশ হলো- لا إله إلا الله এবং অপর অংশটি হলো- محمد رسول الله

প্রথমটি  হচ্ছে  তাওহীদের  অংশ    এবং  দ্বিতীয়টি    হচ্ছে রিসালাতের অংশ। তাওহীদ ও রিসালাত উভয় অংশের সম্মিলিত  নাম ঈমান।  অর্থাৎ-  তাওহীদ ও  রিসালাতে   বিশ্বাসের     নামই      ঈমান।    তাওহীদ      ও    রিসালাতের গুরুত্বের কারণেই  তা একসাথে  মিশে  কালাম না হয়ে  কালেমা হয়েছে।

এখন  গবেষণার বিষয়  হচ্ছে- রিসালাত   অর্থ  কী   এবং রাসূল   কে  হয়ে    থাকেন?   রিসালাতের  ভিত্তি  ও  স্থিতি কী?

স্মরণ  রাখা  দরকার   যে-    রিসালাত     ও  বি'ছাত   উভয় শব্দের   অর্থই   প্রেরণ   করা।   কিন্তু   গুণগত   দিক   দিয়ে  উভয়   শব্দের   মধ্যে  কিছুটা   পার্থক্য  রয়েছে।  ‘বি’ছাত’ বলা হয়।  সাধারণ প্রেরণ করা এবং রিসালাত বলা  হয় কিছু    দিয়ে    প্রেরণ   করা।    কাজেই    ’রিসালাত’   শব্দটি নবীদের     জন্য    খাস।    কিন্তু    ’বি'ছাত'   হচ্ছে    আম   বা সাধারণভাবে  প্রেরণ  করা।  মোজাদ্দেদগণের  বেলায়ও  বি'ছাত বলা হয়েছে। (হাদীস)।

রাসূল    শব্দের    সংক্ষিপ্ত    শাব্দিক    অর্থ    হচ্ছে-    প্রেরিত  সংবাদদাতা ও ফয়েযদাতা। রাসূল দুই প্রকারের- যথাঃ (১)   বে-ইখতিয়ার   রাসূল   বা     ক্ষমতাহীন    রাসূল   (২) বা-ইখতিয়ার   রাসূল  বা  ক্ষমতাবান রাসূল। ক্ষমতাহীন রাসূল হচ্ছে কতিপয়   ফিরিস্তা।  জিবরাইল  عليه السلام হচ্ছেন     তাদের   সরদার।    আল্লাহ   তায়ালা     কোরআন মজিদে  বে-ইখতিয়ার    রাসূল   উপাবীধারী  ফিরিস্তাদের কথা  সূরা  ফাতির  -এর  ১নং  আয়াতের  মধ্যে  এভাবে  উল্লেখ করেছেন-
جَاعِلِ الْمَلَائِكَةِ رُسُلًا أُولِي أَجْنِحَةٍ
অর্থাৎ-    “আল্লাহ     তায়ালা    অনেক      ফিরিস্তাকে    পাখা  বিশিষ্ট      রাসূল    বা     বার্তাবাহক     বানিয়েছেন”।     (সূরা ফাতির)।

অপরদিকে   মানবজাতির     মধ্য     থেকে   “বা-ইখতিয়ার রাসূল”    বা    ক্ষমতাবান   রাসূল   বানিয়েছেন   আম্বিয়ায়ে কেরাম      আলাইহিমুস   সালামগণকে।    উনারা   ফিরিস্তা রাসূল  হতে উত্তম।  ফিরিস্তা রাসূল শুধু বাণী  বহন করে নিয়ে    আসে-    কিন্তু    তা    বাস্তবায়ন     করতে    পারেনা।  অপরদিকে-     মানুষ     রাসূলগণ     উক্ত     বাণীর     নির্দেশ  বাস্তবায়ন করতে পারেন।

উদাহরণ   স্বরূপ   বলা   যেতে   পারে-   যেমন   বাদশাহর  প্রশাসনিক      নির্দেশ।      তিনি      বাহকের      মাধ্যমে      তা  মন্ত্রীবর্গের      নিকট       পৌঁছিয়ে      থাকেন।       বাহক      শুধু  নির্দেশনামা  পৌছিয়ে  দেয়-  কিন্তু   তা   কার্যকরী   করেন মন্ত্রীবর্গ।   মন্ত্রীবর্গ    উক্ত   নির্দেশ  বাদশাহ  কর্তৃক  প্রদত্ত ক্ষমতাবলে          বাস্তবায়িত          করেন।          উক্ত          আইন  মান্যকারীকে তারা পুরস্কৃত করেন এবং অমান্যকারীকে শাস্তি প্রদানও করতে পারন।

জনসাধারণের প্রতি বাদশাহর নির্দেশনামা  বাহক এবং মন্ত্রী-   উভয়ের   মাধ্যমেই  পৌঁছে   সত্য-   কিন্তু  উভয়ের  মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। বাহক হচ্ছে বে-ইখতিয়ার বা   ক্ষমতাহীন-  কিন্তু  মন্ত্রীবর্গ  হচ্ছেন্ন  বা-ইখতিয়ার   বা ক্ষমতাবান। বাহক হচ্ছে কর্মচারী- আর মন্ত্রীবর্গ  হচ্ছেন প্রশাসনিক  কর্মকর্তা।   বাহককে বলা হয় খাদেম-  কিন্তু মন্ত্রীবর্গকে বলা হয়    প্রশাসক।  মন্ত্রীর   আনুগত্য করলে তা      বাদশাহর      আনুগত্য     বলেই     গণ্য     হয়।     মন্ত্রীর আনুগত্য না  করলে শাস্তির উপযুক্ত হয়ে  যায় এবং  তা বাদশাহর  প্রতিও  বিদ্রোহ  বলে  গণ্য  হয়।  মন্ত্রীদেরকে  প্রয়োজনবোধে শাস্তি দেয়ার ক্ষমতাও  প্রদান করা হয়-  কিন্তু নির্দেশ বহনকারীকে সে  ধরণের ক্ষমতা দেয়া  হয় না।

বুঝার সুবিধার  জন্য  উপরোক্ত উদাহরণ  দেয়া   হলো।  অনুরূপভাবে-  ফিরিস্তা রাসূলগণ শুধু  আল্লাহর  বাণী  ও  নির্দেশ  নবীগণের খেদমতে পৌঁছিয়ে দেয়ার  অধিকারী -এর    বেশী   নয়।   এজন্য   আল্লাহর   বাণীবাহক    রাসূল হওয়া   সত্ত্বেও   ফিরিস্তাদের   কোন   উম্মত   নেই।   তাঁরা  নবীগণের খাদেম স্বরূপ। আল্লাহর কোন নির্দেশ প্রয়োগ করার  ক্ষমতা   তাঁদের   নেই  এবং   কালেমায়ও  তাঁদের নাম    সংযোজিত    হয়    না।     জিবরাঈল,     মিকাইল     ও ইস্রাফীল রাসূল সত্য, কিন্তু তাদের উম্মত নেই।

অপরদিকে আম্বিয়ায়ে কেরামের মর্যাদা হচ্ছে শাসকের মর্যাদা।   উনারা  মহান  রাব্বুল   আলামীনের  পক্ষ   হতে  ক্ষমতাপ্রাপ্ত    হাকিম    স্বরূপ।    এজন্যই   উম্মতের   উপর তাদের  নির্দেশ  প্রয়োগ  করা  হয়  এবং  তাদের  নামের  কালেমাও   পাঠ   করতে   হয়।   এটা   হচ্ছে   আনুগত্যের  শপথ   নামা।  আমাদের  প্রিয়  নবী   সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া  সাল্লাম ছিলেন হাকিম (সূরা  নিসা,  ৬৫ আয়াত)।  ক্ষমতাবান  রাসূল   এবং   ক্ষমতাহীন  রাসূলের  মধ্যকার এইসব  পার্থক্য   স্মরণে  রাখা  সবারই   কর্তব্য।    তা  না হলে       বিভ্রান্তির      বেড়াজালে      আটকে       যাবে।      এবং উল্টা-পাল্টা কথা মুখ থেকে বেরিয়ে আসবে।

আম্বিয়ায়ে      কেরাম      যদি      ক্ষমতাহীন      হন-      তাহলে  রিসালাতে    মোহাম্মদী    এবং   রিসালাতে    জিবরাইলের মধ্যে  পার্থক্য     থাকলো   কোথায়?  আমরা  “মুহাম্মাদুর  রাসুলুল্লাহ” কালেমা পড়ি- কিন্তু ”জিবরাঈলু রাসুলুল্লাহ” পড়িনা   কেন?   ঐ    ক্ষমতাবান    ও   ক্ষমতাহীন   হওয়ার কারণেই একটি পড়ি- অন্যটি পড়িনা। রাসূল মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু   আলাইহি   ওয়া    সাল্লাম    -এর    আনুগত্য   ও  অনুসরণ করা ফরয- কিন্তু রাসূল জিবরাঈলের আনুগত্য ও অনুসরণ করা ফরয নয়। এর একটি প্রমাণ দেখুন!

হাদীসে জিবরাঈলঃ
হযরত   ওমর   রাদিয়াল্লাহু     আনহু    বৰ্ণিত     বুখারী   ও মুসলিম    শরীফের    হাদীসে    জিবরাঈলে   আছে,   তিনি  বলেন-    “একদিন     আমরা    রাসূলে    পাকের     দরবারে উপস্থিত ছিলাম।   এমন সময় এক ব্যক্তির উদয় হলো- যার পোষাক ছিল  ধবধবে সাদা এবং চুল ছিল কুঁচকুচে কালো। ভ্রমণকারীর  কোন  আলামতই  তার  মধ্যে ছিল না-  অথচ আমরা তাকে চিনতেও পারছিলাম না। তিনি আমাদের  পরিচিতও  ছিলেন  না।  তিনি  দো  জানু  হয়ে  আদবের  সাথে শিষ্যের  মত নামাযের বৈঠকের সূরতে  হুযুর করিম  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া  সাল্লামের সামনে নিজের হাঁটুর উপর হাত   রেখে বসে গেলেন। অতঃপর হুযুরের খেদমতে  পাঁচটি  প্রশ্ন রাখলেন। এ পাঁচটি  প্রশ্ন হলো- (১) ইসলাম   কী? (২) ঈমান     কী? (৩) ইহসান বা     ইখলাস    কী?     (৪)    কিয়ামত    কখন    হবে?    (৫) কিয়ামতের আলামত কী?

রাসূল      করীম        সাল্লাল্লাহু        আলাইহি       ওয়া      সাল্লাম আগস্তুকের     প্রত্যেকটি     প্রশ্নের      উত্তর     দিলেন      এবং আগন্তুক  প্রত্যেক   উত্তরের   জবাবে   বললেন-   “আপনি  সত্য এবং সঠিক  বলেছেন- সঠিক  বলেছেন”। এরপর  হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

এ     ঘটনার     কিছু    দিন    পরে     নবী     করিম    সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- “হে ওমর, ইনি ছিলেন জিবরাঈল   (عليه    السلام)।    তিনি   (আমার    মাধ্যমে)   তোমাদেরকে  পরিপূর্ণ    দ্বীন  শিক্ষা  দিতে   এসেছিলেন” (সংক্ষিপ্ত হাদীস)।

-দেখুন,  জিবরাঈল (عليه  السلام)  মানব সূরতে   এসে  সরাসরি   সাহাবায়ে   কেরামকে   সম্বোধন   করে   একথা  বলেন     নি      যে,      আমি     জিবরাঈল      (عليه      السلام)   -তোমাদেরকে  এসব  মাসআলা  শিক্ষা   দিতে   এসেছি- তোমরা আমার থেকে শিখে  নাও।  বরং রাসূলে  করিম  সাল্লাল্লাহু       আলাইহি      ওয়া      সাল্লাম      -এর      দরবারে  সাগরিদের বেশে আদবের  সাথে   বসে প্রশ্ন   করে তার  জবাব   নবীজীর     জবানে     বয়ান   করালেন।    এ    রকম করলেন কেন?  এ  জন্যই এরূপ করেছেন  যে মানুষের উপর  তাঁর  আনুগত্য  ও  অনুসরণ  করা  ফরয    ছিলনা। বরং    নবীজির     কথা    মানাই    ফরয।      তিনি    দরবারে  রিসালাতের  মর্যাদা  এবং আদবও শিক্ষা দিয়ে  গেলেন  তার  আচরণের  মাধ্যমে।  তিনি  একথা  শিক্ষা  দিলেন-  তিনিও     একজন      খাদেম     ও      উম্মত।     এটাই     হচ্ছে বা-ইখতিয়ার        ও    বে-ইখতিয়ার    রাসূলের    মধ্যেকার পার্থক্য।  কিছু   লোক   আজকাল  আম্বিয়ায়ে   কেরামকে  “সম্পূর্ণ দুর্বল বান্দা ও ক্ষমতাহীন সংবাদ  বাহক”   বলে আখ্যায়িত   করছে      এবং    প্রমাণ    স্বরূপ   একটি   ফাঁসী কবিতা আওড়াচ্ছে -

مصطفے ھرگز نه گفتے تانه گفتے جبرائیل
جبرائیل ھرگز نه گفتے تانه گفتے رب الجلیل
অর্থাৎ-  ”নবী  করিম  সাল্লাল্লাহু  আলাইহি   ওয়া   সাল্লাম কখনও     বলতেন     না    যতক্ষণ    না     জিবরাঈল    (عليه السلام) বলতো;  এবং জিবরাঈলও  বলতো  না যতক্ষণ না আল্লাহ্ রাব্বুল বলতেন।

তারা একথার ভুল ব্যাখ্যা করে  বলছে- ”নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হচ্ছেন জিবরাঈল (عليه السلام) -এর   মুখাপেক্ষী আর জিবরাঈল  (عليه السلام)  হচ্ছেন আল্লাহর           মুখাপেক্ষী।           রাসূল          সম্পূর্ণ           অক্ষম” (নাউযুবিল্লাহ)। প্রকৃত মর্ম হচ্ছে- “নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়া  সাল্লাম  যা  কিছু বলতেন   তা  ছিল  ওহী সঞ্জাত- ওহীর বাইরে নয়”। (সূরা আন-নাজম)।