হাকিমুল উম্মাহ মুফতি আহমদ ইয়ার খাঁন নঈমী (রহঃ)

  হাকিমুল উম্মাহ মুফতি আহমদ ইয়ার খাঁন নঈমী (রহঃ)


হিজরী চতুর্দশ শতাব্দিতে শত শত নয়; বরং আপন জ্ঞান-গরিমা-পরহেজগারী, হিদায়েত, সর্বোপরি ন্যায় পরায়ন ভিত্তিক যে কয়জন ক্ষনজন্মা ইসলামী বীর মুজাহিদ ইহধাম ত্যাগ করেছেন, এদের মধ্যে হাকীমুল উম্মাহ মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী আশরাফী বদায়ুনী (রহঃ) এর ব্যক্তিত্ব অত্যাধিক তাৎপর্যপূর্ণ। এই মহান মনীষী স্মরণযােগ্য অসংখ্য অমূল্য কিতাব মহান ইসলামের খেদমতে রেখে যান। পাক বাংলা ভারত উপমহাদেশের আলেম ও বুদ্ধিজীবি সমাজে তার জ্ঞান গভীর, বিচক্ষণতা এবং বাগ্মীতা অবাধে স্বীকৃত।

  হাকিমুল উম্মাহ মুফতি আল্লামা আহমদ ইয়ার খাঁন নঈমী (রহঃ)


জন্ম ও বংশপরিচিতি-

১৯০৬ ইংরেজী সন মােতাবেক ১৩২৪ হিজরীতে ইউ, পির বদাযুন জিলার অন্তর্গত উজানী নামক স্থানে তিনি শুভ জন্ম লাভ করেন। তাঁর বংশ ইউছুফ জী পাঠান বংশের সাথে সম্পর্কিত। তার পিতা মনােয়ার খান সাহেব ইবনে মােল্লা মুহাম্মদ ইয়ার খান সাহেব ছিলেন এলাকার একজন অতি সম্মানিত, দ্বীনদার এবং জমানার সুফি ব্যক্তি।

শিক্ষাজীবন- 

শিক্ষার হাতেখড়ি শ্রদ্ধেয় পিতা মোল্লা মুহাম্মদ ইয়ার খানের হাতেই। ১১ বছর বয়সে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে বদায়ুনের শামসুল উলুম মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে মুফতি আযীয আহমেদ, আল্লামা কাদীর বক্স তাঁর অন্যতম শিক্ষক ছিলেন। এই মাদ্রাসায় ৩ বছর পড়ার পরে আলীগড়ের মাদ্রাসা ই ইসলামিয়ায় ৩ বছর পড়েন। 

এরপরে উচ্চশিক্ষা লাভের আশায় উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠতম বিদ্যাপীঠ জামেয়া নঈমীয়ায় ভর্তি হন। ছদরুল আফাজিল সৈয়দ মুহাম্মদ নঈম উদ্দিন মােরাদাবাদী (রহঃ) সহচর্য পেয়ে তিনি হয়ে উঠেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীন। জানা যায় তিনি ছদরুল আফাজিল সৈয়দ মুহাম্মদ নঈম উদ্দিন মােরাদাবাদী (রহঃ মীরাঠে আরো কিছুকাল পড়ার পরে ২০ বছর বয়সে একজন বিশ্ববরেণ্য আলেম হয়ে শিক্ষাজীবনের ইতি টানেন। এরপর তাঁর উস্তাদ ছদরুল আফাজিল সৈয়দ মুহাম্মদ নঈম উদ্দিন মােরাদাবাদী (রহঃ) তাঁকে পাগড়ী পড়িয়ে দেন সাথে ইমাম ত্বাহাভীর বিখ্যাত সনদটি প্রদান করেন।


কর্মজীবন-

তাঁর কর্মজীবন ছিলো বহুগুণে দীপ্তিমান। ৪৬ বছরের শিক্ষকতা, পাঁচ শতাধিক পান্ডুলিপি রচনা, ফতোয়া-ফরায়েজি প্রদান, ওয়াজ-নসীহত, মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা দিয়ে মুসলিম জনগোষ্ঠির মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। অবহেলিত মুসলিমদের আলোর পথের দিশারী হওয়ায় মুসলিম উম্মাহর কাছে তিনি হাকিমুল উম্মাহ হিসেবে পরিচিতি পান।

তাঁর শিক্ষকতা জীবন নিয়ে কিছু জানা যাক, এর আগে একটা কথা বলে রাখি আপনাদের। বর্তমানের উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের অনেকেই তাঁর ছাত্র। শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে জামেয়া নঈমিয়াতেই শিক্ষকতা শুরু করেন, পাশাপাশি দারুল ইফতার ফতোয়া বিভাগেও দ্বায়িত্ব নেন। এরপর সেখান থেকে চলে গিয়ে উপমহাদেশের বহু মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। সর্বশেষ পাকিস্তানে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে সেখানে ওফাতের আগ পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন।


তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য ছাত্রগণ-

1. হাফিজুল হাদীস, আল্লামা খাদিম হোসাইন রিজভী (তেহরিকে লাব্বাইক ইয়া-রাসুলুল্লাহ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা)
2. মাওলানা মুহাম্মদ নুরুদ্দীন কাশ্মীরী
3. মুহাম্মদ ফাযিল নঈমী
4. শেরে মিল্লাত, মুফতি ওবাইদুল হক্ব নঈমী
5. আল্লামা জালালুদ্দীন আল-কাদেরী (জামেয়ার অধ্যক্ষ ছিলেন)
6. শাইখুল হাদীস গোলাম আলী উকারভী

প্রমুখ। তারা প্রত্যেকেই জগৎ বিখ্যাত আলেমে দ্বীন।


রচনাবলি-

শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি করতেন। এজন্যই তো ১৬ বছর বয়সে ছাত্রবস্থায় 'হাশিয়া-ই সদরা' নামে দর্শনশাস্ত্রের উপর একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেন। ১৭ বছর বয়সে 'ইলমুল মিরাছ'(ফরায়িজ বিষয়ে) আরেকটি গ্রন্থ রচনা করেন। ১৯ বছর বয়সে ফতোইয়া প্রদান করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। জীবনের প্রায় অর্ধশতাব্দি কাল পাক-ভারতে সত্য প্রতিষ্ঠা ও বাতিল প্রতিরােধে অতিবাহিত হয়, যা তার দুর্লভ লিখনী সমূহে প্রতিভাত হয়েছে। চতুর্দশ শতাব্দির মুজাদ্দিদ আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান (রহঃ) এর পরে সংকলন ও রচনায় তিনি যে প্রশংসনীয় খেদমত আনজাম দিয়েছেন তার দৃষ্টান্ত বিরল। ৫০০রও অধিক কিতাব লিখেছেন তিনি। এ পর্যন্ত তার রচিত যে সমস্ত কিতাবাদির নাম জানা যায়, তা'হল-
(১) ইলমুল মিরাছ
(২) শানে হাবীবুর রহমান
(৩) জা আল হক ওয়া যাহাক্বাল বাতিল
(৪) সালতানাতে মােস্তফা
(৫) রহমতে খােদা বা উছিলায় আওলিয়া
(৬) রেছালায়ে নুর
(৭) আমিরে মােয়াবিয়া পর এক নজর
(৮) ইসলামী জিন্দেগী
(৯) আলম আহকাম
(১০) মওয়ায়েজে নঈমীয়া
(১১) নয়ী তাকরিরী
(১২) সফর নামা (ইরান, ইরাক, হেজাজ ইত্যাদি)
(১৩) সফর নামা-১ (১৪) সফর নামা -২
(১৫) আল কালামুল মাকবুল পি তাহারাতে নাহুবীর রসুল
(১৬) ফতওয়ায়ে নঈমীয়া
(১৭) নঈমুল বারী ফি ইনশরাহিল বােখারী
(১৮) নুরুল ইরফান ফি হাশীয়াতিল কোরান
(১৯) তাফসীরে নঈমী
(২০) মিরাতুল মুনাজিহ শরহে মিশকাতিল মাছাবিহ
(২১) দরসে কুরআন
(২২) ইলমুল কুরআন
(২৩) দিওয়ান-ই-সালিক
(২৪) আসরারুল আহকাম
এছাড়া তিনি অধিকাংশ পাঠ্য বইয়ের পাদটিকা লিখে গেছেন, যা অদ্যবধি অপ্রকাশিত।বহু গ্রন্থ এখনো পান্ডুলিপি আকারে রয়ে গেছে। আরো কিছু গ্রন্থ ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগে সময়(হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময়) নষ্ঠ হয়ে গেছে।


কিছু কিতাবের বিবরণ-

তাফসীরে নঈমী- আল-কোরআনুল কারীমের তাফসীর। এটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ তাফসীর। এই তাফসীরের বিষয়ে একটা ঘটনাও আছে। এই কিতাব লিখার আগে তিনি মদীনা শরীফে নবীজীর রওজা জিয়ারত করতে এবং কিতাব লিখার অনুমতি নিতে, একদিন তিনি সেখানকার একটি দোকানে গেলেন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনাকাটার জন্য। একটা কলম তাঁর খুব পছন্দ হলো । কিন্তু দেখা গেলো তার সকল টাকা বই কেনার ফলে খরচ হয়ে যায়। তাছাড়া কলমটার দাম খুব বেশি ছিলো বলে তিনি আর কিনতে পারলেন না। ফজরের ওয়াক্তে, দোকানের মালিক তরুণ ব্যবসায়ী ব্যক্তিটি শাইখ কে মসজিদে দেখলেন, কলমটা বের করে আবেগের সাথে বললেন " আমি জানি না আপনি কে বা কি করেন! কিন্তু গতকাল রাতে আমি প্রথমবার নবীজী ﷺ কে দেখলাম এবং তিনি বললেন, "আমার খাদিম আহমাদ একটা কলমের জন্য তোমার কাছে আসলো। এটা আমার পক্ষ হতে তাকে উপহার দাও!"

রাসূল ﷺ এর সান্নিধ্য কোন প্রেমিক কে কখনো হতাশ করেনি। প্রেমিক মদীনাতে এসেছে এবং অশ্রু বিন্দু পড়তে দেখেছে কিন্তু দয়ার সাগরের গভীরতম প্রবাহ তাকে ভিজিয়ে ধন্য করেছে।

জা-আল হক্ব ওয়া যাহাক্বাল বাতিল- ফিতনা ফ্যাসাদের এ যুগসন্ধিক্ষনে ঈমান-আকীদা নিয়ে টিকে থাকা বড়ই দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের পর দিন ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ভেদাভেদ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রায় জায়গায় নানা মতাদর্শ জনিত বিবাদ-বিসম্বাদ লেগেই আছে। মাঝে মাঝে কোন কোন মহল থেকে এ ভেদাভেদ ভুলে একই পতাকাতলে জমায়েত হবার আহবানও জানানো হয়। কিন্তু দূর্ভাগ্য যে, কেউ এসব দল উপদলের অভ্যূদয় ও ভেদাভেদের মূল কারণসমূহ চিহ্নিত করেনি। এমন সময় তিনি কলম ধরলেন, ঈমান আকিদার উপর একটি উচ্চমানের কিতাব লিখলেন। তখনও তিনি নাম ঠিক করেন নি। তৎকালীন বিখ্যাত আলেম পীর সৈয়দ জামায়াত আলী শাহ এই কিতাবের পান্ডুলিপি দেখে অবিভুত হন, একইসাথে এর নাম "জা'আল হক ওয়া যাহাকাল বাতিল" (সত্যের আবির্ভাবে বাতিল তিরোহিত) রাখার প্রস্তাব দেন। এই কিতাব সুন্নীদের প্রধান হাতিয়ার বললে ভুল হবেনা।

নুরুল ইরফান ফি হাশীয়াতিল কোরান- ইমাম আ'লা হযরতের লিখিত কানযুল ঈমান ফি তরজুমাতিল কোরআনের হাশিয়া। হাশিয়াগুলো এতই উচ্চমানের ছিলো যে একে কোরআনের তাফসীর বললে ভুল হবেনা।

নঈমুল বারী ফি ইনশরাহিল বােখারী- বুখারী শরীফের ব্যখ্যাগ্রন্থ

মিরাতুল মুনাজিহ শরহে মিশকাতিল মাছাবিহ- মিশকাত শরীফের ব্যখ্যাগ্রন্থ। কিতাবটি মোট ৮ খন্ডে রচিত।

ফতওয়ায়ে নঈমীয়া- এটি ফতোয়াগ্রন্থ। হানাফি ফিক্বহের গুরুত্বপুর্ণ কিতাব। এটি ১৭ খন্ডে রচিত।

আসরারুল আহকাম- শরীয়তের বিধিবিধানের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা। যেসব প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে মানুষ নাস্তিকতা বেছে নেয় যেসব প্রশ্নের উত্তর এখানে এতই সুন্দরভাবে দেওয়া হয়েছে যে আমার বিশ্বাস এটা সবার অন্তরকে শীতল করে দিবে। বুঝতেইতো পারছেন এটা কত গুরুত্বপুর্ণ কিতাব।

ওফাত-

অর্ধশতাব্দি পর্যন্ত ইসলামের খেদমতে অতিবাহিত করার পর জীবনের শেষ লগ্নে মুফতি সাহেব রােগে আক্রান্ত হয়ে লাহাের হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি ৩রা রমজানুল মােবারক ১৩৯১ হিজরী মােতাবেক ২৪ শে অক্টোবর ১৯৭১ ইংৱেৰ্তী গুজরাটে মহান প্রভুর সাক্ষাতে পরলােক গমন করেন। গুজরাটেই তিনি সমাধিস্থ হন। জীবদ্দশায় তিনি যে কামরায় দরসে কুরআন পেশ করতেন সেখানেই তার মাজার শরীফ অবস্থিত।



উনাকে নিয়ে গবেষণা করতে গেলে শত শত পিএইডি হবে। কিন্তু উনাকে জানা শেষ হবেনা। তিনি এমন একজন ক্ষনজন্মা মহাপুরুষ ছিলেন। শেষ্মেষ এটাই বলব আমরা যেন এসব মহামানবদের ভুলে না যাই। আল্লাহ তায়ালা উনাকে জান্নাতের উচু মাকাম দান করুক। আমিন।



রেফারেন্স-

1. আমাদের অনন্য সনদঃ ড আব্দুল হালিম (পৃঃ ২১৬)

2. জা-আল হক্ব (পৃঃ১৬)

3. আসরারুল আহক্বাম

ইত্যাদি

Previous Next

نموذج الاتصال