হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) এর মধ্যে ইজতিহাদী মতপার্থক্য | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

দুই বিশিষ্ট সাহাবী আহলে বায়াতের হযরত আলী (রাঃ) ও কাতিবে ওহী হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমার মতপার্থক্য ইজতিহাদী।
প্রিয় পাঠক, মানুষ নিজেদের সকল কাজে নিজস্ব ইজতিহাদ বা গবেষনা বা চিন্তাধারার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে উক্ত কর্ম সম্পাদনে ব্রতী হন। মানুষের গৃহীত সিদ্ধান্ত তার অনুকূলে না হয়ে অনেক সময় প্রতিকূলও হয়।
হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত মুয়াবীয়া (রাঃ) উভয়ই মুজতাহীদ তথা গবেষক সাহাবী ছিলেন।
উভয়ের মধ্যে মতানৈক্যের কারণঃ
হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র মাধ্যমে মতানৈক্যের ব্যাপারে হাকীমুল উম্মত মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত ওসমান ইবনে আফ্ফান রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র বাড়ী বিদ্রোহীরা ঘেরাও করেছিল। তিনদিন বা এর অধিক সময় যাবত পানি অবরোধ করে রেখেছিল, অতঃপর তাঁর ঘরে প্রবেশ করে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর এবং অপর তেরজন বিদ্রোহী তাঁকে নির্দয়ভাবে শহীদ করে। তাঁর শাহাদাতের পর আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু মুহাজীর ও আনসারগণের সর্বসম্মত রায়ে বরহক খলীফা মনোনীত হন।
কিন্তু কয়েকটি কারণে হযরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে তিনি ব্যাবস্থা নিতে পারেন নি।
এ খবর সিরিয়ার আমীরে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র কানে পৌঁছে। তিনি তখন সিরিয়া প্রদেশের গভর্নর। তিনি সংবাদ পাঠালেন যে, মুসলমানদের খলীফাকে স্বয়ং মদীনা শরীফে শহীদ করে দেয়াটা খুবই মারাত্নক ব্যাপার। সুতরাং সবার আগে হত্যাকারীদের উপর কিসাসের হুকুম কার্যকর করা হোক। কিন্তু কয়েকটি অপ্রতিরোধ্য অবস্থার কারণে তিনি হত্যার বদলা (কিসাস) নিতে পারেননি। 
ওদিকে ইহুদি মুনাফীক কুচক্রিমহল গভর্নর হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র মনে এ ধারণাটি বদ্ধমূল করে দেয় যে, হযরত আলী মুরতাদ্বা ইচ্ছাকৃতভাবে কিসাস কার্যকর করতে গড়িমসি করছেন এবং সে হত্যাকান্ডে (নাঊযুবিল্লাহ) তাঁর হাত রয়েছে ।
আমীরে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র তরফ থেকে বারবার হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য দাবি জানানো হয়। তখন খেলাফতে অস্বীকার বা স্বীয় রাজত্ব পৃথক করার কোন খেয়াল তাঁর ছিলনা, কেবল খলিফা হযরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র রক্তের প্রতিশোধের দাবী ছিল। 
শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থা সৃষ্টি হল, হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু মনে করতে লাগলেন যে, হযরত আলী মুরতাদ্বা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু খিলাফতের উপযুক্ত নন এবং তিনি খিলাফতের দায়দায়িত্ব পূর্ণভাবে আদায় করতে পারছেন না। কেননা, তিনি এত বড় একটি হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নিতে পারলেন না, তিনি অন্য দায়িত্ব কীভাবে আদায় করতে পারবেন। মতবিরোধের মূল কারণ ছিল এটাই। অন্যান্য মতভেদ ছিল এ মূলেরই শাখা-প্রশাখা। অন্যদের বিরোধিতার কারণও ছিল এটাই।
[হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু: কৃত মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী (রঃ)।]

এ হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে সাহাবা-ই কেরাম (রাঃ) তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। 
একদল নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন, তারা কারো পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেননি। 
যেমন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমা, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমা, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু প্রমুখ।

একদল হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র বিপক্ষে যান, যেমন আম্মা হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা, হযরত তালহা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু, হযরত জুবাইর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু, হযরত মুহাম্মদ ইবনে তালহা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এবং হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু প্রমুখ।
আর অবশিষ্ট সাহাবীগণ হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু’র পক্ষে ছিলেন।
একটি বিষয় লক্ষনীয় যে, আম্মা হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র বিরুদ্ধে ছিলেন, কিন্তু তাঁর আপন ভাই, উম্মতের মামা হযরত আব্দুর রহমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু, হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন। 
আবার স্বয়ং হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু’র ভাই হযরত আকীল রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু সেই যুদ্ধের (জঙ্গ-ই জামাল) স্বয়ং নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন এবং হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র অনুমতি নিয়ে উম্মতের মামা হযরত মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু’র ঘরে মেহমান হয়ে থাকেন।
অর্থাৎ তা ছিল হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র গবেষণাপ্রসূত ভুল, যা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে গুনাহ তো নয়ই, বরং এ ইজতিহাদগত ভুলের জন্যও একটি পুরস্কারের শুভসংবাদ বর্ণিত হয়েছে।
[সূত্রঃ শরহে মাওয়াকেফ, শরহে আক্বাইদে নাসাফী ও নিবরাস, হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-৬৬ পৃ.।]
___________
হযরত মুয়াবীয়া (রাঃ) এঁর মাজার শরীফ, দিমাশক, সিরিয়া।