হে যুগের তরুণ... | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস


তুমি কি বিবেকবান? এবং কোনো নতুন শায়খের অন্ধভক্ত থাকতে চাও না? কোনো নির্দিষ্ট ফিরকার প্রতি অন্যায় পক্ষপাতীও হবে না? নিজ মতামতের বিপরীত দেখলেই- অন্য মুসলিম ভাইদের প্রতি রাগে ক্ষোভে জ্বলে উঠ না তো? তুমি কি শাখাগত ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল? সত্য জানতে, বুঝতে প্রচণ্ড আগ্রহী? তবে হে বিবেকবান সত্যানুসন্ধানী মুসলিম তরুণ। লেখাটি তোমারই জন্য। শেষ পর্যন্ত পড়। আর দেখ, বিবেক নড়ে উঠে কিনা! ইনশাআল্লাহ, এটি পড়ে বিবেক তোমার কিছুটা হলেও প্রসারিত হবে। চোখে আলো আসবে। অব্দ অব্দ ধরে চলমান সঠিক ইসলামের প্রতি সহনশীল হবে। পড়েই নাও শেষতক। অবশ্য যদি সময় না থাকে, এখানেই থেমে যাও। পরে বেশ কিছুটা সময় নাও। নিরিবিলি হলে ঠাণ্ডা মাথায়, নিরপেক্ষ মন নিয়ে বসো। মনকে বলো, আমি কারো অন্যায় পক্ষপাতী হবো না। কারো প্রভাব প্রতিপত্তি, বক্তব্যের ঝলকানি বা জনপ্রিয়তায় বুঁদ হয়ে থাকবো না। সত্য দেখলে, বুঝলে- বিনা দ্বিধায় মেনে নেব, ইনশাআল্লাহ। তা যত বড় শায়খ কিংবা নব্য স্কলারেরই বিরোধিতা হোক না কেন! এরপর পড়া শুরু কর। অবশ্যই গভীর মনোযোগে, বুঝে বুঝে। কোনো অংশ না বুঝলে আরেকবার পড়। এরপরও না বুঝলে কমেন্টবক্সে যাও। খাঁটি নিয়তে কেবলি জানার জন্য প্রশ্ন কর। অযথা তর্ক থেকে আল্লাহ তায়ালার নিকট আশ্রয় চাও। ইনশাআল্লাহ, সত্য বুঝে আসবে। আল্লাহপাকই সত্য বুঝার মুওয়াফ্ফিক (তাওফীকদাতা)।

()()()()
ছোট বেলা থেকে না জেনেই মাযহাব পালন করেছি। ঘরে থাকা ফিকহী বইগুলির প্রায় সবই ছিল নিউজপ্রিন্টের। সেগুলোতে কুরআন হাদিসের রেফারেন্স ছিলোনা তেমন। ছিল ফতোয়ায়ে আলমগিরি সহ আরো কিছু বইয়ের রেফারেন্স। যেগুলো সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। ধীরে ধীরে বড় হলাম। একসময় আহলে হাদীস ও সালাফিদের বইগুলি হাতে এল। পড়লাম। কুরআন ও হাদিসের প্রচুর রেফারেন্স! মুগ্ধ হলাম। এই মুগ্ধতাকেই কাজে লাগানো হল। বলা হল, "মাজহাবের তাক্বলীদ ছাড়। ইমামদের ফিকহ মানবে কেন, এর চেয়ে ভালো সহীহ হাদিস মানো।" এক্সট্রিমিস্ট কেউ কেউ তো বললো, "তাকলীদ শিরক।"
বুঝালো, "তোমার নিজস্ব বিবেক-বুদ্ধি আছে। তবে তাকলীদ করবে কেন।"
কথাগুলো যৌক্তিক মনে হল। ইচ্ছে করলো, আহলে হাদীস হই। মাজহাবের তাকলীদ ছাড়ি। জাস্ট সহীহ হাদিসের উপর আমল করি। শুরু হল, আহলে হাদীস হবার জোর চেষ্টা।
জোগাড় করলাম সিহাহ সিত্তাহ, বাংলা-আরবী। শুরু হলো পড়া। আবিষ্কার করলাম, নানান হাদীসে প্রিয়নবীর ওযুর নানান বর্ণনা। কোথাও অঙ্গ দুবার করে ধোয়ার কথা তো, কোথাও তিনবার, কোথাও আবার একবারও। দ্বিধায় পড়ে গেলাম। এ কী ব্যাপার? কোনটা মেনে ওযু করবো? দু'বারেরটা? নাকি তিনবার? নাকি একবারই সই? যদি একবার করে ধুই তো দু' বা তিনবারের হাদীসগুলি আমল করা হচ্ছে না। দেখলাম, এক প্রকার বর্ণনা আমল করলে, অন্যগুলি করা সম্ভব না। একটা করলে এর বিপরীতগুলি ছেড়ে দিতেই হয়। অথচ সবগুলোই নির্ভরযোগ্য। 

এ এক অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার। 

শুধু ওযূই নয়, কুরআন-হাদীসের একাধিক ব্যাপারেই এমন দেখলাম। যেমন- 
১. কুরূ অর্থ পবিত্রতাও, হায়েযও। একটা নিলে আরেকটা ছাড়তেই হয়। 
২. সালাতে রফয়ে ইয়াদাইন করা বা না করা। দু'পক্ষেই সহীহ হাদীস আছে। ইত্যাদি ইত্যাদি। 
মনে প্রশ্ন জাগলো- 
এই যে কিছু সহীহ হাদিস আমল করতে যেয়ে অন্য সহীহ হাদিস আমল করছিনা, সেগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে রেফারেন্স দিয়ে কেউ যদি বলে আমি সহীহ হাদিস মানিনা, তা কি ঠিক হবে? এর মানে কি আমি সহীহ হাদিস বিরোধী? মোটেও তো না। অথচ দেখেছি, মাযহাবীদের বিরুদ্ধে এমনই করা হয়। তাদের আমল না করা হাদীসগুলি বেছে নিয়ে বলা হয়, এই দেখো, তারা সহীহ হাদীস মানে না। অথচ তারা যে অন্য হাদীস অনুযায়ী আমল করছে তা আর বলা হয় না।
.........
আচ্ছা থাক, আমার কথা না হয় বাদ। আমি সামান্য পড়াশুনা শিখেছি, আলহামদুলিল্লাহ, কিতাবাদি পাঠেও উৎসাহ আছে। কিন্তু এই যে পাশের বাড়ির চাচা কিংবা দোকানদার শরাফত। অথবা আমার আট বছর বয়সী ছোট ভাই। এদের কারোই তেমন পড়াশুনা নেই। একজনও ঠিকমতো ওযূ জানে না। এখন- 

এদেরকে শেখানোর জন্য যদি বুখারী ও অন্যান্য হাদিস গ্রন্থ নিই। ওযু রিলেটেড সহীহ সহীহ হাদিস সিরিয়ালি পড়ি। এরা কি সেগুলি বুঝে, বিচার-বিশ্লেষণ করে আমল করতে পারবে? জবাব কী? জবাব নিশ্চয়- উঁহু, পারবে না। 

যদি তারা না পারে, না বুঝে, তবে কি তাদেরকে দেখিয়ে দিতে হবে না, কিভাবে ওযু করতে হয়? তখন বুখারী ও অন্যান্য গ্রন্থের ওযু অধ্যায়ে উল্লেখিত সহীহ হাদিসগুলি সমন্বয় করে বা সেখান থেকে বেছে নিয়ে আমার বুঝ অনুযায়ী তাদের শিখাবো। এতে কি তারা প্রত্যক্ষভাবে সহীহ হাদিস মানলো নাকি আমার বুঝ ও ব্যাখ্যা মানলো? এই ব্যাখ্যাই কি ফিকহ না? আর এই ফিকহ মেনে তারা কি মূলতঃ হাদীসের পর্যালোচিত নির্যাসই মানলো না? নিরপেক্ষ বিচারে, এই পর্যালোচিত নির্যাসের সুবিন্যস্ত রূপই তো আসলে মাযহাব। 

যখন হাদীস হতে সমন্বিত বিন্যস্ত ওযূর পদ্ধতিটা তাদেরকে শিখাচ্ছি, তখন হাদিসের টেক্সট ও রেফারেন্স দেয়া কি আমার জন্য জরুরী? বাস্তবেই কি তারা প্রত্যেকটির শিক্ষার পিছনে রেফারেন্স চাইবে? চাইলেও, দেয়া হলেও কীইবা হবে তাতে! তারা কি সেগুলি বুঝার/বিশ্লেষণের যোগ্যতা রাখে? নাকি বলবে, ওযু শিখিয়ে দাও? এই যে তারা আমার উপর নির্ভর করে আমার শিক্ষাটাকে মানলো, এটাই কি তাক্বলীদ না? 
আর এক্ষেত্রে সর্বজন স্বীকৃত মুজতাহিদ ইমামদের তাক্বলীদ করাই কি নিরাপদ নয়? 

চিন্তা করলে, পৃথিবীর তাবৎ মুসলিমই এমন। সবাইই তো নিজের অজানা জিনিস জানতে কাউকে না কাউকে মেনে নেয়। অর্থাৎ সবাই ই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে তাক্বলীদ করেই করে। জ্ঞানের পরিধিভেদে এরও অবশ্য ভেদাভেদ আছে। তাইতো সবার তাক্বলীদ সমান না। সাধারণের তাক্বলীদ একরকম তো, আলিমের তাক্বলীদ আরেকরকম। আলিমের তাক্বলীদ একরকম তো মুজতাহিদদের তাক্বলীদ আরেকরকম। কিন্তু কোনো না কোনো ক্ষেত্রে সবাই-ই তাক্বলীদ করে। করতে বাধ্য। 

যেমন- একটি হাদিস যে সহীহ, এটা কিভাবে বুঝছি ? হ্যাঁ, ব্র্যাকেটে লেখা আছে বলে। আমার যোগ্যতা নেই যে, হাদিস শাস্ত্র ঘেঁটেঘুঁটে বিশ্লেষণ করে সহীহ, যঈফ নির্ণয় করবো। কেউ বিশ্লেষণ করে লিখে দিয়েছে। সেটাই বিনা দ্বিধায় মানছি। এই যে মেনে নেওয়া, ভাই, এটাই কি তাক্বলীদ নয়?

আবার, কেউ বুখারী অনুবাদ করে দিয়েছে, আমি মেনে নিচ্ছি। বিশ্বাস করছি, এটা সঠিক অনুবাদ। কারণ আমার পক্ষে আরবি অনুবাদের ত্রুটি ধরা সম্ভব না। এই যে তাহকীক ও অনুবাদগুলোকে সঠিক মেনে নিচ্ছি- এটাই কি তাকলীদ নয়? 

এমন তাক্বলীদ থেকে কে-ই বা মুক্ত? কেউই তো না। এখন, তাক্বলীদ যদি শিরক হয়, তো, পৃথিবীতে মুসলিম নেই একজনও। সবাই-ই মুশরিক! হ্যাঁ।

যাহোক,
ওযূ তো ওযূ। মুটামুটি সহজ। এতেই যদি এই অবস্থা হয় তো, সালাতের বেলায় কী হবে! এভাবে সাওম, হজ্জ, যাকাতসহ চলার পথে আরো অসংখ্য মাসয়ালা! বিরাট ব্যাপার।
আমাদের মতো স্বল্পজ্ঞানীর পক্ষে কেবল কুরআন আর সহীহ হাদিস পড়ে এতসব বিধিবিধান বের করা সম্ভব? 
নিশ্চয়ই না।
তাইতো অতি অবশ্যই এক বা একাধিক বিশ্বস্ত আলিমের দ্বারস্ত হতে হবে, যিনি বা যারা কুরআন-হাদীস ঘেঁটে বিধি-বিধানগুলো বের করে বলে দেবেন। তাইনা? 

এখন সর্বজনশ্রদ্ধেয় নির্ভরযোগ্য একদল বিশ্বস্ত ওলামা কর্তৃক কুরআন-হাদীস থেকে সমন্বয়কৃত নির্যাস/ফলাফলই যদি ফিকহ বা মাযহাব হয়, তো, এই ফিকহ/মাযহাব মানতে অসুবিধা কোথায়? এই ফিকহ/মাযহাব মানার মাধ্যমে মূলত আমি কি কুরআন আর সহীহ হাদিসই মানছি না?
এরচে সহজ ব্যাপার আর কী হতে পারে!
আসলে প্রতিটি মাযহাবই তো, একদল বিশ্বস্ত স্কলারদের শ্রমের ফসল। কুরআন-হাদীস, ইজমা, ক্বিয়াস দিয়ে বের করা ইসলামি সারনির্যাস।
.................................
(সংগৃহীত, সংস্কারিত)