ইসলাম কি বহুবিবাহে উৎসাহ দিয়েছে...?

---
বিবাহ হচ্ছে নারী-পুরুষের শারীরিক ও জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য ধর্ম ও সমাজ স্বীকৃত বৈধ পন্থা। এর লক্ষ্য হচ্ছে সুন্নাতে নববী ﷺ এর উপর আমল করে কাম প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করে দ্বীনের পথে অটল রাখা; ভরণপোষণের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে নারীর যত্ন নিশ্চিত করা, ঈমানদার সন্তান লাভ করে মানব বংশধারা সংরক্ষণ করা এবং নেককার সন্তানের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতে উপকৃত হওয়া।

ইবাদতের জন্য মানসিক শান্তি ও চারিত্রিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজন। আর বৈবাহিক জীবনের মাধ্যমে অর্জিত পারিবারিক সুখ-শান্তি দ্বারা এটি অর্জন করা যায়। ইসলাম এটাকে দ্বীনের অর্ধেক বলে আখ্যায়িত করেছে। প্রিয় নবী ﷺ বলেনঃ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ দম্পতির পরস্পরের প্রতি যে আন্তরিক প্রেম-ভালোবাসা, তা অন্য (কোথাও) দু’জনের মাঝে তুমি দেখতে পাবে না। (মিশকাত ৩০৯৩, সূনান ইবনে মাজাহ ১৮৪৭); তিনি ﷺ আরো বলেনঃ মানুষ যখন বিয়ে করে তখন সে তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করে, অবশিষ্টাংশ লাভের জন্য সে যেন আল্লাহভীতি অর্জন করে। (মিশকাত ৩০৯৬, শু‘আবুল ঈমান ৫১০০)

প্রিয় নবী ﷺ বলেনঃ মু’মিন বান্দা তাকওয়া অর্জনের পর পূণ্যময়ী স্ত্রী অপেক্ষা অধিক উত্তম অন্য কিছু (নিয়ামত) লাভ করবে না। (তার স্বামী) তাকে যদি কোনো কিছুর আদেশ করে তৎক্ষণাৎ সে তা পালন করে; তার দিকে তাকালে সে (হাস্যমুখে) স্বামীকে খুশি করে দেয়; যদি তার বিষয়ে কোনো শপথ করে, সে তা পূর্ণ করে। আর স্বামীর অনুপস্থিতিতে সে তার নিজের (সম্ভ্রম) ও সম্পদের হেফাযত করে। (সূনান ইবনু মাজাহ ১৮৫৭, মিশকাতুল মাসাবীহ ৩০৯৫)

রসূলুল্লাহ ﷺ আরো বলেন, উৎকৃষ্ট সম্পদ হল যিকরকারী জিহ্বা, কৃতজ্ঞ অন্তর ও ঈমানদার স্ত্রী- যে স্বামীকে দ্বীনদারীর ব্যাপারে (এক বর্ণনায় রয়েছে, দ্বীন ও দুনিয়ার কাজে) সহযোগিতা করে। (সূনান আত তিরমিজী ৩০৯৪, সূনান ইবনু মাজাহ ১৮৫৬, ত্বাবারানী ৭৮২৮, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ৪৪৩০)

এজন্যেই হয়ত প্রিয় নবী ﷺ বলেন, চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয়ঃ তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (সহীহ বুখারী ৫০৯০) [আল্লামা কুরতুবী (রহঃ) বলেনঃ আলোচ্য হাদীসের অর্থে চারটি বৈশিষ্ট্য যা নারীর বিবাহের প্রতি আগ্রহ যোগায়, তা নির্দেশ বা ওয়াজিব নয়। বরং এ বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা বৈধ, তবে দ্বীন-দারীত্ব দেখাটা অধিক অগ্রগণ্য। তিনি আরো বলেন যে, এ হাদীস থেকে এটা মনে করা যাবে না যে, নারী পুরুষের কুফু বা সমতা এ চারটির মধ্যে সীমাবদ্ধ। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫০৯০)] 

আল্লামা কুরতুরী (রহঃ) বলেনঃ সামর্থ্যবান ব্যক্তি যদি বিবাহ ছাড়া নিজের উপর দ্বীনের ব্যাপারে ক্ষতির (যিনা, কুদৃষ্টি, হস্তমৈথুনে লিপ্ত হওয়ার) আশঙ্কা করে এবং বিবাহ ছাড়া যদি এ অবস্থা থেকে মুক্তির সম্ভাবনা না থাকে, তবে তার জন্য বিবাহ করা ওয়াজিব। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হাঃ ৫০৬৫)

আবার, বিবাহের পরও যদি বিবাহের যেসব উদ্দেশ্যসমূহ বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর কোনটি ব্যাহত হয়, তখন একাধিক বিবাহের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আদি যুগে একজন পুরষের জন্য বিবাহের সংখ্যার কোন সীমা নির্ধারিত ছিল না। ফলে কেউ কেউ শত শত এমনকি কেউ হাজারের বেশি বিবাহ করেছে বলেও জানা যায়। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে জাহিলী যুগেও রসূলুল্লাহ ﷺ এঁর সাহাবীগণ চারের অধিক বিবাহ করতেন। কিন্তু মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ, ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান ইসলাম এটাকে চারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছে। ইসলাম-ই হল একমাত্র ধর্ম যা একটি বিবাহের কথা বলেছে (জোর দিয়েছে) এবং বহুবিবাহকে চারটির মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছে (শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দিয়েছে)।

ইবনু উমার (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, যে সময়ে গাইলান ইবনু সালামা আস-সাকাফী রঃ ইসলাম গ্রহণ করেন সে সময়ে তার দশজন স্ত্রী ছিল, যাদের তিনি বিয়ে করেছিলেন জাহিলী যুগের মধ্যে। তার সাথে সাথে তারাও মুসলমান হয়। রসূলুল্লাহ ﷺ তাকে এদের মধ্যে থেকে যে কোন চারজনকে বেছে নেয়ার নির্দেশ দেন। (সূনান ইবনে মাজাহ ১৯৫৩, সূনান আত তিরমিজী ১১২৮)

আল্লাহ পাক বলেন, 

"আর যদি তোমাদের এ আশঙ্কা থাকে, তোমরা এতিম (মহিলা)-দের মাঝে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তাহলে (সাধারণ) নারীদের থেকে তোমাদের যাদের ভালো লাগে তাদের দুইজন, তিনজন কিংবা চারজনকে বিয়ে করে নাও, কিন্তু যদি তোমাদের এই আশঙ্কা হয় যে তোমরা (একের অধিক হলে তাদের মাঝে) ইনসাফ করতে পারবে না, তাহলে (তোমাদের জন্যে) একজনই (যথেষ্ট), কিংবা যে তোমাদের অধিকারভুক্ত। এটা এরই অধিক নিকটে যে, তোমাদের দ্বারা অত্যাচার (সীমালঙ্গন, পক্ষপাতিত্ব) হবে না।" (সূরা নিসাঃ ৩)

ইসলাম মুসলমানদের চারটি বিয়ে করার বাধ্যতামূলক নির্দেশ দেয়নি, বরং শর্তসাপেক্ষে একজন স্বাধীন মুসলমানের জন্য একই সঙ্গে চারটি পর্যন্ত বিবাহের অনুমোদন দিয়েছে। একজন পুরুষের জন্য একজন স্ত্রী-ই যথেষ্ট। কিন্তু কারো যদি একাধিক স্ত্রীর প্রয়োজন হয় এবং তার যদি একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা রক্ষার সামর্থ্য থাকে, তাহলে সে একাধিক বিয়ে করতে পারবে। তবে এর সঙ্গে বিশাল দায়িত্বশীলতা জড়িত। তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে আদায় করতে না পারলে আল্লাহ'র কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এখন, যদি ইসলাম এই অনুমতি না দিতো তাহলো তখন হয়ত কেউ বলত যে, "দেখো ইসলাম কত অমানবিক! লোকটির অঢেল সম্পদ আছে সে ইচ্ছা করলে প্রতিদিন অনেক মেয়ের পেছনে টাকা উড়াতে পারে, কিন্তু ইসলাম তাকে একটির অধিক বিয়ের অনুমতি দেয় নি। এখন সে বাধ্য হয়েই ব্যভিচার করছে! 

একজন নারীর স্বামী যেকোনো সময় যেকোনোভাবে মৃত্যুবরণ করতে পারে। এই স্ত্রীর যদি এক বা একাধিক সন্তান থাকে আর যদি অধিক বিয়ের অনুমতি না থাকে, তাহলে এসব স্ত্রীর জীবন কঠিন হয়ে পড়বে। তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীদের যদি যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পুনর্বাসিত করা না হয়, তাহলে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হতে বাধ্য। এতে বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বে, জীবিকা কঠিন হয়ে পড়বে। স্বামীহীন অবস্থায় তারা সার্বিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হবে। তা ছাড়া মানুষ হিসেবে তাদের মনোদৈহিক চাহিদা মেটানোর তাড়না সৃষ্টি হওয়াও স্বাভাবিক। আর বিবাহিত কোনো নারীকে সাধারণত কোনো অবিবাহিত পুরুষ কখনো বিয়ে করতে চায় না। এমতাবস্থায় নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদের ব্যাপারে সমাজ কোনো পদক্ষেপ না নিলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তারা বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তাদের যদি কুমারীদের মতো স্বাভাবিক বিয়ের সংস্কৃতি না থাকে, তবে সমাজে নারী-পুরুষের ভারসাম্য নষ্ট হয়। বহু বিবাহের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই দেখা যায় যে তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা মহিলারাই দ্বিতীয়, তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে কারো সাথে বিবাহে বসেন। কারণ সাধারণত কুমারী মেয়েদেরকে সতীনের ঘরে দেয়া হয় না। এখন যদি বহু বিবাহের সুযোগ না থাকে তাহলে একজন যুবক ছেলে বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা মহিলাকে বিবাহ করা খুবই দূরহ ব্যাপার এবং নবীজি ﷺও কুমারী নারী বিবাহের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। ফলে সেই মহিলা আজীবন একটি অনিশ্চিত ও কষ্টকর জীবনযাপনে বাধ্য হতো। ইসলাম তাদের কল্যাণের জন্যই শর্ত সাপেক্ষে পুরুষদের বহু বিবাহের অনুমতি দিয়েছে। আর এর ফলে সেই মহিলারও মৃত্যু পর্যন্ত নিশ্চিত সম্মানজনক জীবন-যাপনের সুযোগ হলো।

উইকিপিডিয়ায় পেলাম, শীর্ষস্থানীয় মুসলিম পণ্ডিত যারা নারী অধিকার নিয়ে কথা বলে তাদের মধ্যে 

আমিনা ওয়াদুদ বলেন, কুর'আন তিনটি ক্ষেত্রে বহুবিবাহের অনুমতি দেয়: ১. যদি স্বামী যৌন-সন্তুষ্ট না হন এবং এর জন্য তিনি অন্য সম্পর্ক বা পতিতার কাছে না গিয়ে আরেকজন স্ত্রীর কাছে যেতে পারেন, ২. যদি প্রথম স্ত্রী সন্তানধারণে অক্ষম হয় বা অন্য কোন মায়ের তার সন্তানসহ দেখাশোনার প্রয়োজন হয়, ৩. স্বামী মুসলিম সমাজের অন্য কোন নারীর ভরণপোষণের জন্য অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট সক্ষম হন। ওয়াদুদের মতে, কুর'আন যেরকম বহুবিবাহ সমর্থন করে, তা হচ্ছে "ন্যায়, যেখানে ন্যায় এর সাথে আচরণ করা হয়, ন্যায় এর সাথে অর্থ ব্যবহার করা হয়, অনাথদের সাথে ন্যায় বিচার করা হয় এবং স্ত্রীদের সাথেও ন্যায় বিচার করা হয়।"

আসমা বারলাস, যিনি এর কয়েক বছর পর তার তাত্ত্বিক গবেষণা প্রকাশ করেন, তিনিও একই যুক্তি দেখান। উভয় নারীবাদী পণ্ডিতই সূরা নিসা ৪: ৩ আয়াতে বহুবিবাহ সম্পর্কিত ইসলামী তত্ত্বের উৎস সম্পর্কে বলেন- "কুর'আনের এই আয়াতটি নারীকে শোষণ করার জন্য বহুবিবাহের বিধান দেওয়ার জন্য দেয়া হয়নি বরং নারীর যত্ন নিশ্চিত করতেই এটি দেয়া হয়।"

কিন্তু একাধিক স্ত্রীর মধ্যে অন্য সব বিষয়ে সমতা রক্ষা করতে পারলেও অান্তরিক ভালবাসার বিষয়ে সমতা রক্ষা করা সম্ভব না অর্থাৎ কোন একজনের প্রতি বেশি ভালবাসা সৃষ্টি হবেই কিন্তু আল্লাহ পাক এই বিষয়ে পাকড়াও করবেন না। কিন্তু এই ভালবাসা কিংবা অন্য কোন কারণে যদি কোন একজনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে আর অন্যজনকে ঝুলিয়ে রাখে অর্থাৎ না তালাক দিচ্ছে, না তার হক আদায় করছে- তাহলে তার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

আল্লাহ পাক বলেন, 

"আর তোমরা যতই ইচ্ছে কর না কেন তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার করতে (সবকিছু ন্যায়সঙ্গতভাবে করার পরও আন্তরিক ভালবাসার ক্ষেত্রে সমতা করতে) কখনোই পারবে না, তখন এমন যেন না হয় যে, একজনের দিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পড়বে যার দরূন অপরকে ঝুলানো অবস্থায় রেখে দেবে; যদি তোমরা নিজেদেরকে সংশোধন কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা নিসাঃ ১২৯)

আম্মাজান আয়িশা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী ﷺ তাঁর স্ত্রীদের মাঝে খুবই ন্যায়সংগতভাবে বন্টন করতেন। আর তিনি বলতেনঃ “হে আল্লাহ! আমার সামর্থ্য অনুযায়ী এই আমার বন্টন। যে ব্যাপারে শুধু তোমারই পূর্ণ শক্তি আছে, আমার কোন শক্তি নেই (সবকিছু ন্যায়সঙ্গতভাবে করার পর যদি অন্তরে কারো প্রতি বেশি ভালবাসার সৃষ্টি হয়), সেই ব্যাপারে আমাকে তিরস্কার কর না।” (সূনান আবূ দাউদ ২১৩৪, সূনান আত তিরমিজী ১১৪০, সূনান ইবনু মাজাহ ১৯৭১)

প্রিয় নবী ﷺ বলেনঃ যে ব্যক্তি দুই‘জন স্ত্রী থাকা অবস্থায় তাদের একজনের প্রতি ঝুঁকে পড়লো, কিয়ামাতের দিন সে একপাশ ভঙ্গ (অঙ্গহীন) অবস্থায় উপস্থিত হবে। (সূনান আবূ দাউদ ২১৩৩, সূনান ইবনে মাজাহ ১৯৬৯)

আমার মনে হয়েছে এমন অনেক পুরুষ রয়েছে যারা স্ত্রীর হক সম্পর্কেও সম্পূর্ণরুপে অবগত নয় অথচ এরাই আবার মাসনা সুলাসা রুবায়ার জন্য অতি উৎসাহী। একটাকে সামলাতে যেখানে অনেক ত্যাগ-কষ্ট স্বীকার করতে হয় (তবুও হয়ত ত্রুটি থেকে যায়), সেখানে একাধিক স্ত্রী ও সন্তানের হক আদায় করা, তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা কত কঠিন হতে পারে এটা কি তারা চিন্তা করেনা!! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সতর্কবাণীর কথা কি এদের মনে থাকে না!! দেখা যায় যে, এরা নবীজির বাণীঃ আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো- এটার দোহায় দেয়, কিন্তু আসলেই কি তারা বিয়ে করার পর নবীজির সতর্কবাণীগুলো মনে রাখে!! এছাড়াও এই বাণীর প্রেক্ষাপট কি এটা ছিল যে, একাধিক বিয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে এটা বলা হয়েছে!! 

এক ব্যক্তি নবী ﷺ এঁর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি ﷺ বললেনঃ না। অতঃপর ব্যক্তিটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেনঃ এমন নারীকে বিয়ে করবে যে, প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো। (সূনান আবূ দাউদ ২০৫০)

ইমাম গাজ্জালী রহঃ বলেন, বিবাহ কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করিবার উদ্দেশ্যে নয়, কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য তো কুৎসিত নারী অপেক্ষা সুন্দরী বন্ধ্যা নারীই উৎকৃষ্ট। [কিমিয়ায়ে সাআদাত (সৌভাগ্যের পরশমণি), ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ২৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন]

আবার অনেকেই পুরুষদের জন্য একাধিক বিবাহের অনুমোদনকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারে না। কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তা এই মূহুর্তে সকলের কাছে সম্পূর্ণরূপে বুঝে না আসলেও নিশ্চয়ই একসময় মানুষ বুঝতে পারবে। আ'লিমুল গায়িব আল্লাহ পাক তো অতীত ভবিষ্যত সকল-কিছুর খবর জানেন বলেই এমন বিধানের ব্যবস্থা করে রেখেছেন এবং বুখারী মুসলিমের হাদিস থেকে জানতে পারি আল্লাহ পাক তাঁর অসীম জ্ঞানের ভান্ডার থেকে তাঁর প্রিয় হাবিব ﷺ কে অতীত-ভবিষ্যতের জ্ঞান দান করেছেন, আর তাই-ই প্রিয় নবী ﷺ ইরশাদ করেন,

আবূ মূসা (রঃ) নবী ﷺ থেকে বর্ণনা করেন যে, (এমন একটা সময় আসবে যখন) একজন পুরুষকে দেখতে পাবে তার পেছনে চল্লিশজন নারী অনুসরণ করছে আশ্রয়ের জন্য। কেননা, তখন পুরুষের সংখ্যা অনেক কমে যাবে আর নারীর সংখ্যা বেড়ে যাবে।

আনাস রঃ বলেন, আমি রসূলুল্লাহ্ ﷺ কে বলতে শুনেছি, কিয়ামাতের আলামতের মধ্যে রয়েছে ইলম ওঠে যাবে, অজ্ঞতা বেড়ে যাবে, ব্যভিচার বৃদ্ধি পাবে, মদপানের মাত্রা বেড়ে যাবে, পুরুষের সংখ্যা কমে যাবে এবং নারীদের সংখ্যা বেড়ে যাবে যে, একজন পুরুষকে পঞ্চাশজন নারীর দেখাশুনা করতে হবে। 
[সহীহ বুখারী; অধ্যায়ঃ ৬৭/ বিয়ে (كتاب النكاح),
হাদিস নম্বরঃ ৫২৩১]

এখানে লক্ষনীয় যে, হাদিসখানা ইমাম বুখারী রহঃ বিবাহের অধ্যায়ে এনেছেন। আল্লাহু আকবার। বিবেকবানদের জন্য ইশারায় যথেষ্ট। 

ইসলামের সব বিধান হলো ভারসাম্যপূর্ণ। এতে অনিয়ন্ত্রণও নেই আবার নিয়ন্ত্রণে অতিরঞ্জনও নেই। 

বিয়ে হল একজন দায়িত্ববান পুরুষ ও কর্তব্যপরায়ণ নারীর একসাথে পথচলার বৈধতা। একাধিক বিবাহের অর্থ কেবল আরেকটা স্ত্রী বা আরেকটি অনুষ্ঠান নয়; বরং এক একটি অতিরিক্ত দায়িত্ব, যেটা আল্লাহ দায়িত্ববান এবং শারীরিক, আর্থিক, মানসিক সক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য জায়েজ করেছেন।

কিন্তু একাধিক বিবাহের বিষয়টা বোনদের কাছে অনেক কষ্টের। হ্যা, এমন হওয়াটায় স্বাভাবিক। কোন মেয়েই চাইনা তার স্বামীর ভালবাসায় ভাগ বসাতে দিতে। এমনকি তাদের নিজের মধ্যে অপরাগতা থাকা সত্ত্বেও স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহে রাজি হতে চান না। 
হে বোনেরা! স্বামীর যদি দ্বিতীয় বিবাহের প্রয়োজন হয় আল্লাহ'র সন্তুষ্টির জন্য আপনি মেনে নিন, স্বামীকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করুন। তবে নিজেকে কোনো ভাবেই ব্যর্থ ভাববেন না। আল্লাহ আপনার মর্যাদাকে উন্নত করতে চান, আপনাকে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা দিতে চান আর কারণেই হয়তো এই পরীক্ষার জন্য আপনাকে মনোনীত করা হয়েছে। আল্লাহ যাকে ভালবাসেন তাকে কল্যাণ দান করেন; যাকে কল্যাণ দান করতে চান তাকে দুঃখকষ্টে পতিত করেন যাতে ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তাঁর প্রিয় বান্দারা অফুরন্ত নেকী হাসিল করতে পারে, তাদের গুনাহসমূহের কাফফারা আদায় হয়ে যায়, উচ্চ মর্যাদায় আসীন হতে পারে।

রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ আল্লাহ যে ব্যক্তির কল্যাণ চান তাকে তিনি মুসিবতে (দুঃখকষ্টে) পতিত করেন। 
(সহীহ বুখারী ৫৬৪৫)

এক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ﷺ! মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি মুসিবতের সম্মুখীন হয় কে? তিনি ﷺ বললেনঃ নবীগণ (উল্লেখ্য যে, নবীগণ নিষ্পাপ, উনাদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য, উনাদের মাধ্যমে ঈমানদারদেরকে ধৈর্যের শিক্ষা দেয়ার জন্য... উনাদের উপর মুসিবতের পরীক্ষা), এরপর যারা উত্তম মানুষ তারা, এরপর যারা উত্তম তারা। একজন তার দ্বীনদারীর অনুপাতে পরীক্ষায় নিপতিত হয়। যদি সে তার দ্বীনে মজবুত হয় তবে তার পরীক্ষাও তুলনামূলকভাবে কঠোরতর হয়; আর সে যদি দ্বীনের ক্ষেত্রে দুর্বল ও হালকা হয় তবে সে তার দ্বীনদারীর অনুপাতেই পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। এভাবে বান্দা বিপদ-আপদে পড়তে থাকে শেষ পর্যন্ত সে পৃথিবীতে এমন মুক্তভাবে বিচরণ করতে থাকে যে তার উপর আর কোন গুনাহ'র দায় থাকে না। (সূনান আত তিরমিজী ২৩৯৮, সূনান ইবনে মাজাহ ৪০২৩)

রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মু’মিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তাঁরা আনন্দ (সুখ শান্তি) লাভ করলে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, তা তাঁর জন্য কল্যাণকর হয়, আর দুঃখকষ্টে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করে, এও তাঁর জন্য কল্যাণকর হয়। 
(সহীহ মুসলিম ৭৩৯০)

একজন নারী যিনি নিজেকে দ্বীনদার দাবী করেন, তার উচিৎ সকল কিছুতেই যেন তিনি নিজেকে ইসলামের কাছে সমর্পণ করেন। এছাড়াও যে নারী তার স্বামীকে সত্যিকার অর্থে ভালবাসে, তিনি নিশ্চয়ই স্বামীর ভালো’র জন্য এমন ত্যাগ-কষ্ট স্বীকার করতে দ্বিধাবোধ করবেন না। আর আপনার স্বামী তো আপনাকে ছেড়ে দিচ্ছে না। বিধবা কিংবা তালাকপ্রাপ্তা বোনদের কষ্টের কথাও আমাদের এই বোনদের চিন্তা করা উচিত নয়। তারা নিজেরাও তো এমন পরিস্থিতির স্বীকার হতে পারে। 

আমার কাছে কিছু বোনদের জন্য বড় ভয় হয়, তারা বিষয়টাকে কোনভাবেই মানতে চাইনা, এমনকি আল্লাহ'র আইনের ব্যাপারে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বসে (যা ঈমাম ভঙ্গের কারণ হতে পারে) এবং স্বামীদের প্রতিও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে।

প্রিয় নবী ﷺ বলেন, আমি জাহান্নামের আগুন দেখতে পেলাম। আমি এর পূর্বে কখনও এত ভয়াবহ দৃশ্য দেখিনি এবং আমি আরও দেখতে পেলাম যে, তার অধিকাংশ অধিবাসীই নারী। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, ইয়া রসূলাল্লাহ ﷺ! এর কারণ কী? তিনি বললেন, এটা তাদের অকৃতজ্ঞতার ফল। লোকেরা বলল, তারা কি আল্লাহ'র সাথে নাফরমানী করে? তিনি বললেন, তারা তাদের স্বামীদের প্রতি অকৃতজ্ঞ এবং তাদের প্রতি যে অনুগ্রহ দেখানো হয়, তার জন্য তাদের শোকর নেই। তোমরা যদি সারা জীবন তাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার কর; কিন্তু তারা যদি কখনও তোমার দ্বারা কষ্টদায়ক কোন ব্যবহার দেখতে পায়, তখন বলে বসে, আমি তোমার থেকে জীবনে কখনও ভাল ব্যবহার পেলাম না। (সহীহ বুখারী ৫১৯৭)

অন্যদিকে কোন ভাই যেন কারো রুপ-সৌন্দর্য কিংবা সম্পদের লোভে পড়ে একাধিক বিবাহের দিকে হাত না বাড়ায়। আয়িশা (রঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ তোমাদের মাঝে সে-ই উত্তম যে তার পরিবারের নিকট উত্তম। আর আমি নিজ স্ত্রীর নিকট তোমাদের সর্বোত্তম ব্যক্তি। (সূনান আত তিরমিজী ৩৮৯৫)

আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী (রঃ) বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ ﷺ আসরের নামাজের পর আমাদের মাঝে (আলোচনা করতে) দাঁড়ালেন। এতে কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে সকল কিছু সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেন। সেসব কথা যে স্মরণ রাখল তো রাখল, আর যে ভুলে গেল তো ভুলে গেল। তিনি ﷺ যা কিছু বললেন, এতে এ কথাও ছিল যে, দুনিয়াটা সবুজ-শ্যামল ও সুমিষ্ট (আকর্ষণীয়), আল্লাহ তা‘আলা এতে তোমাদেরকে তাঁর প্রতিনিধি বানিয়ে দিলেন। এরপর তোমরা কি আমল করছ তা তিনি লক্ষ্য করছেন। সাবধান! দুনিয়ার মোহ থেকে বাঁচো এবং বাঁচো নারীদের থেকে।.....(সূনান আত তিরমিযী ২১৯১, মিশকাতুল মাসাবীহ ৫১৪৫)

ইমাম মুসলিম রহঃ আরো উল্লেখ করেন, (রসূলুল্লাহ ﷺ বলেন) তোমরা দুনিয়া ও নারী জাতি থেকে সতর্ক থেকো। কেননা বনী ইসরাঈলের মাঝে প্রথম ফিতনা নারীকেন্দ্রিক ছিল। (সহীহ মুসলিম ৬৮৪১)

আল্লাহ পাক আমাদের ভুল ত্রুটি ক্ষমা করুক। 
আল্লাহ ও তাঁর রসূল ﷺ অধিক জানেন।
Previous Next

نموذج الاتصال