শানে ফারুকে আযম | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস




২৬শে জিলহজ্ব (মতান্তরে পহেলা মুহাররম) ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা, ফারুকে আযম হযরত উমার ইবনুল খ্বত্তাব রদ্বিআল্লাহু আনহু এঁর শাহাদাত দিবস, যাঁর ইসলাম গ্রহণের পর থেকে মুসলমানরা শক্তিশালী হয়ে উঠে, প্রকাশ্যে কাবা শরীফের সামনে নামাজ আদায়ের সুযোগ পায়। যিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে অর্ধ পৃথিবী শাসন করে, শাসকদের জন্য উত্তম আদর্শ হয়ে আছেন।

#ইসলাম_গ্রহণঃ

ইবনে উমর (র.) হতে বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ “হে আল্লাহ! আবূ জাহেল কিংবা উমার ইবনুল খ্বত্তাব- এই দু'জনের মাঝে তোমার নিকট যে বেশি প্রিয়, তার মাধ্যমে তুমি ইসলামকে মজবুত কর ও মর্যাদা দান কর”। ইবনে উমর (র.) বলেন, ঐ দু'জনের মাঝে উমর (র.)-ই আল্লাহ'র প্রিয় হিসেবে আবির্ভূত হন। (সূনান আত তিরমিজী ৩৬৮১)

আবদুল্লাহ্ ইবনে মাস‘ঊদ (রঃ) বলেন, যেদিন ‘উমার (রঃ) ইসলাম গ্রহণ করেন, সেদিন হতে আমরা অত্যন্ত মর্যাদাশীল হয়ে আসছি। (সহীহ বুখারী ৩৬৮৪)

#পরিপূর্ণ_ঈমানদারঃ

আবদুল্লাহ ইবনু হিশাম (রঃ) বলেন, আমরা একদা নবী ﷺ এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি তখন উমর ইবনু খ্বত্তাব (রঃ) এঁর হাত ধরেছিলেন। উমর (রঃ) তাঁকে বললেনঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ ﷺ! আমার প্রাণ ব্যতিত আপনি আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। তখন নবী ﷺ বললেনঃ না, ঐ মহান সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! এমন কি তোমার কাছে তোমার প্রাণের চেয়েও আমাকে অধিক প্রিয় হতে হবে। তখন উমর (রঃ) বললেনঃ এখন, আল্লাহর কসম! আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়। নবী ﷺ বললেনঃ হে উমর! এখন (তোমার ঈমান পূর্ণ হয়েছে)। (সহীহ বুখারী ৬৬৩২)

#পরিপূর্ণ_আমলদারঃ

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রঃ) বলেন, আমি এবং রসূলুল্লাহ ﷺ উভয়ে মসজিদে নববী থেকে বের হচ্ছিলাম। তখন মসজিদের দরজায় এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ﷺ! কিয়ামত কবে সংঘটিত হবে? রসূলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ তুমি কিয়ামতের জন্য কি পাথেয় সঞ্চয় করেছ? রাবী বলেন, তখন লোকটি চুপ হয়ে গেল। এরপর সে বলল, ইয়া রসূলাল্লাহ ﷺ! আমি তো সে জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ নামাজ, রোজা ও সাদকা-খয়রাত সঞ্চয় করিনি। তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রসূল ﷺ কে ভালবাসি। তিনি বললেনঃ তুমি তার সঙ্গেই থাকবে যাকে তুমি ভালবাস। আনাস (রঃ) বলেন, ইসলাম গ্রহণের পরে কোন কিছুতে আমরা এত বেশী খুশি হয়নি যতটা নবী ﷺ এঁর বাণীঃ "তুমি তার সঙ্গেই (থাকবে) যাকে তুমি ভালবাস" দ্বারা আনন্দ লাভ করেছি। আনাস (রঃ) বলেন, আমি আল্লাহ, তাঁর রাসূল, আবূ বকর (রঃ) ও উমার (রঃ) কে ভালবাসি। সুতরাং আমি আশা করি যে, কিয়ামত দিবসে আমি তাদের সঙ্গে থাকব, যদিও আমি তাদের মত আমল করতে পারিনি। (সহীহ মুসলিম ৬৬০৬, ৬৬০৭, ৬৬০৮) (সহীহ বুখারী ৩৬৮৮)

আবূ বকর র. এঁর ওফাতের পর খলিফার আসনে অধিষ্ঠিত হন এবং বিচক্ষণতা, ন্যায়পরায়নতা, সাহসিকতার সাথে অর্ধ পৃথিবী শাসন করেন।

হাদিসে পাকে এসেছে উমার র. হচ্ছেন ফিতনাসমূহ আগমনের সামনে দরজাস্বরুপ। যখনই এ দরজা ভেঙে যাবে অর্থাৎ উমার র. দুনিয়া হতে পর্দা করবেন, ফিতনাসমূহ প্রবেশ করতে থাকবে। (সহীহ বুখারী ৭০৯৬)

#শ্রেষ্ঠত্বঃ

মাওলা আলী রঃ এঁর ছেলে মুহাম্মাদ ইবনু হানাফীয়া (রঃ) বলেন, আমি আমার পিতা ‘আলী (রঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী ﷺ এঁর পর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ কে? তিনি বললেন, আবূ বকর (রঃ)। আমি বললাম, অতঃপর কে? তিনি বললেন, ‘উমার (রঃ)।..(সহীহ বুখারী ৩৬৭১)

ইবনু ‘উমার (রঃ) বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এঁর যুগে সাহাবীগণের পারস্পরিক মর্যাদা নির্ণয় করতাম। আমরা সর্বাপেক্ষা মর্যাদা দিতাম আবূ বকর (রঃ)-কে তাঁরপর ‘উমার ইবনু খ্বত্তাব (রঃ)-কে।..(সহীহ বুখারী ৩৬৫৫)

রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ (জান্নাতে) সর্বোচ্চ সম্মাননায় আসীন লোকদেরকে অবশ্যই তাদের নীচের মর্যাদার লোকেরা দেখতে পাবে, যেমন তোমরা আসমানের দিগন্তে উদিত তারকা দেখতে পাও। আবূ বকর ও উমার তাঁদেরই দলভুক্ত, বরং আরো বেশি রহমত ও মর্যাদার অধিকারী। (সূনান আত তিরমিজী ৩৬৫৮, সূনান ইবনে মাজাহ ৯৬)

#তাঁর_শাহাদাতের_ভবিষ্যদ্বাণীঃ

আনাস ইবনে মালিক (রঃ) হতে বর্ণিত যে, (একবার) নবী ﷺ, আবূ বকর র., উমর র., ‘উসমান র. উহুদ পাহাড়ে আরোহণ করেন। পাহাড়টি নড়ে উঠল। রসূলুল্লাহ ﷺ (পা দ্বারা আঘাত করে) বললেন, হে উহুদ! থামো তোমার উপর একজন নবী, একজন সিদ্দীক ও দু’জন শহীদ রয়েছেন। (সহীহ বুখারী ৩৬৭৫)

#কোন_বিষয়টি_উনার_নিকট_অনেক_বড়_ছিলঃ

ফজরের নামাজে ইমামতিকালীন আবূ লুলু নামে এক অমুসলিম গোলাম উমার রঃ কে আঘাত করে। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রঃ এঁর ইমামতিতে নামাজ সম্পন্ন করা হয়। আহত অবস্থায় উমার রঃ কে বাসায় আনা হয়। লোকজনও আসতে শুরু করে। সকলেই তার প্রশংসা করতে লাগল। তখন যুবক বয়সী একজন এসে বলল, হে আমীরুল মু’মিনীন। আপনার জন্য আল্লাহর সু-সংবাদ রয়েছে; আপনি তা গ্রহণ করুন। আপনি নবী ﷺ এঁর সাহচর্য গ্রহণ করেছেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগেই আপনি তা গ্রহণ করেছেন, যে সম্পর্কে আপনি নিজেই অবগত আছেন অতঃপর আপনি খলীফা হয়ে ন্যায় বিচার করেছেন।...

অতপর তিনি তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ রা. কে বললেন, উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশা (রঃ)-এঁর খিদমতে যাও এবং বল ‘উমার আপনাকে সালাম পাঠিয়েছে। ‘আমীরুল মু’মিনীন’ শব্দটি বলবে না। কেননা এখন আমি মু’মিনগণের আমীর নই। তাঁকে বল ‘উমার ইবনে খাত্তাব তাঁর সাথীদ্বয়ের পাশে দাফন হবার অনুমতি চাচ্ছেন। ইবনে ‘উমার (রঃ) ‘আয়িশা (রঃ)-এঁর খিদমতে গিয়ে সালাম জানিয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, প্রবেশ কর, তিনি দেখলেন, ‘আয়িশাহ (রঃ) বসে বসে কাঁদছেন। তিনি গিয়ে বললেন, ‘উমার ইবনে খাত্তাব (রঃ) আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন হবার জন্য আপনার অনুমতি চেয়েছেন। ‘আয়িশা (রঃ) বললেন, তা আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু আজ আমি এ ব্যাপারে আমার উপরে তাঁকে অগ্রগণ্য করছি।

‘আবদুল্লাহ ইবনে ‘উমার (রঃ), যখন ফিরে আসছেন তখন বলা হল- এই যে ‘আবদুল্লাহ ফিরে আসছে। তিনি বললেন, আমাকে উঠিয়ে বসাও। তখন এক ব্যক্তি তাকে ঠেস দিয়ে বসিয়ে ধরে রাখলেন। ‘উমার (রঃ) জিজ্ঞেস করলেন, কী সংবাদ? তিনি বললেন, আমীরুল মু’মিনীন, আপনি যা কামনা করেছেন, তাই হয়েছে, তিনি অনুমতি দিয়েছেন। ‘উমার (রঃ) বললেন, " الحَمْدُ لِلَّه " এর চেয়ে বড় কোন বিষয় আমার নিকট ছিল না। যখন আমার মৃত্যু হয়ে যাবে তখন আমাকে উঠিয়ে নিয়ে তাঁকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, ‘উমার ইবনু খাত্তাব (রঃ) আপনার অনুমতি চাচ্ছেন। যদি তিনি অনুমতি দেন, তবে আমাকে প্রবেশ করাবে আর যদি তিনি অনুমতি না দেন তবে আমাকে সাধারণ মুসলিমদের গোরস্থানে নিয়ে যাবে।...(সহীহ বুখারী ৩৭০০)

হযরত উমার ইবনুল খ্বত্তাব (রঃ) প্রায়ই এই বলে দুআ করতেন,

اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي شَهَادَةً فِي سَبِيلِكَ وَاجْعَلْ مَوْتِي فِي بَلَدِ رَسُولِكَ

অর্থাৎ

ধন্য আমায় করো প্রভু তোমার পথের শাহাদাতে,
মৃত্যু হয় গো যেন তোমার রসূলের মদীনাতে।
[সহীহ বুখারী ১৮৯০; কিতাবু ফাদ্বায়িলি মাদীনাহ (মদীনার মর্যাদার অধ্যায়)]

#দাফনঃ

ইবনে ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, ‘উমার (রাঃ)-এঁর লাশ (মোবারক) খাটের উপর রাখা হল। খাটটি কাঁধে তুলে নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত লোকজন তা ঘিরে দু’আ পাঠ করছিল। আমিও তাদের মধ্যে একজন ছিলাম। হঠাৎ একজন আমার কাঁধে হাত রাখায় আমি চমকে উঠলাম। চেয়ে দেখলাম, তিনি ‘আলী (রঃ)। তিনি ‘উমার (রঃ)-এঁর জন্য আল্লাহর অশেষ রহমতের দু‘আ করছিলেন। তিনি বলছিলেন, হে ‘উমার! আমার জন্য আপনার চেয়ে বেশি প্রিয় এমন কোন ব্যক্তি আপনি রেখে যাননি, যাঁর কালের অনুসরণ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করব। আল্লাহর কসম! আমার এ বিশ্বাস যে আল্লাহ্ আপনাকে আপনার সঙ্গীদ্বয়ের সঙ্গে রাখবেন। আমার মনে আছে, আমি অনেকবার নবী ﷺ কে বলতে শুনেছি, আমি, আবূ বকর ও ‘উমার গেলাম। আমি, আবূ বকর ও ‘উমার প্রবেশ করলাম এবং আমি, আবূ বকর ও ‘উমার বাহির হলাম ইত্যাদি। (সহীহ বুখারী ৩৬৮৫)

উম্মুল মু'মিনীন আয়িশা (রঃ) এঁর অনুমতিক্রমে উমার রঃ কে তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের পাশেই দাফন করা হয়। আল্লাহ তাআ'লা আমাদেরকে একজন উমররুপী শাসক দান করুক। উনার উসিলায় আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুক।