মুদ্রার পিঠ (দ্বিতীয় পর্ব) | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

২. মুদ্রার মন্দ পিঠ: ফিকাহ্-হাদীসের ইমাম ও স্কলাররা যখন যেটাই বলে গেছেন
সেখানেই কি শেষ?
-----

আহলুস সুন্নাহ্/সাওয়াদে আযম/মধ্যপন্থী দল টিঁকেই আছে ট্র্যাডিশনকে ফলো করে এবং ট্র্যাডিশনাল আলিমদের রেফার করে: তাই পূর্ববর্তী স্কলারদের অনুসরণ না করলে তো শেষই। তবে, পূর্ববর্তী স্কলারদের অনুসরণটা যদি হয় অবিশ্লেষণী, তখনি যত বিপদ।

দেখুন:
আমাদেরই স্কলাররা মাইকে আজানকে কেউ হারাম বলেছেন, কেউ অপছন্দনীয় বলেছেন, কেউ অস্পষ্ট বলেছেন।
এখন আমাদের স্কলাররা কী বলেন? কিছু বলেন না, সারা পৃথিবীতে মাইকের আজান শুনে নামাজে যান।

আমাদেরই স্কলাররা বলেছেন, নারীদের জন্য ভূগোল পড়া হারাম। কেন হারাম? যদি তারা বাইরে বেরুনো শুরু করে? যদি তারা পরীক্ষামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে চলে যায়! সমুদ্রের পাড়ে, পাহাড়ে, জঙ্গলে, মরুভূমিতে বা অন্য শহরে গিয়ে বিপদে পড়ে! আমাদের মেয়েদের তো আমরা বিপদে ফেলতে পারি না।
এখন?

সৌদ রাজার আন্তরিক বিশ্বাস ছিল, দূর থেকে কথা বলা শয়তানি শক্তি।
কারণ তো সহজ, সে লিটারালিস্ট। সে অক্ষরবাদী। বস্তুবাদী। তার আধ্যাত্মিকতায়ও বিশ্বাস নেই, বিজ্ঞানেও বিশ্বাস নেই।
নইলে সূফিরা তো দূর থেকে শোনা ও দূরে বলাতে হাজার বছর ধরেই দক্ষ।
তো, সৌদি রাজা বলল, টেলিফোন অবশ্যই কুফরি শয়তানি শক্তি।
ইঞ্জিনিয়ার টেকনিক করলো। বললো, টেলিফোনে আপনাকে কুরআনের আয়াত পড়িয়ে শোনাই?

সৌদি রাজা কুরআনের আয়াত শুনল। আলহামদুলিল্লাহ্। তবে তো এটা শয়তানি কুফরি শক্তি নয়। কারণ কুরআন শোনা যাচ্ছে।
কথাটা বলার কারণ সৌদ-উষ্মা ঝাড়া নয়। আমরা সবাই কমবেশি এরকম। আমরা সংস্কারবন্দী।
যখন সে টেলিফোন রিসিভ করলো, তখন তার আইনুল ইয়াকিন হল।
নাকি সামাউল ইয়াকিন বলব?
তো, সামনাসামনি দেখা, শোনা ও তত্ত্ব বা থিওরি কপচানোর মধ্যে আসমান জমীন তফাত।
যখন সামনাসামনি আমরা কোন কিছুর মুখোমুখি হই, তখন অনেক বিষয় বদলে যায়। ফতোয়া বিশ্লেষণ তখন বদলাতে হয়।

মাত্র কয়েক দশক আগেও আমাদের স্কলাররা এরোপ্লেনকে বলেছেন দাজ্জালের বাহন। এবং তাঁরা রীতিমত ঘৃণা করেছেন এরোপ্লেনে চড়তে এবং হারামও বলেছেন।
এখন?
যত বড় স্কলার, তত বেশি এরোপ্লেনে চড়ে। যত বড় স্কলার, তত বেশি ঘন্টা প্রতিদিন এরোপ্লেনে থাকে।
এছাড়াও যে যত বড় ওয়ায়েজ, তার জন্য তত বেশি হেলিকপ্টার ওড়ে।
একবার ভাবুন তো,
এরা যদি প্লেনে না থাকে, উটের পিঠেই যদি সফর করতে থাকে, তবে শিখবে কখন, শিখাবে কখন, জানবে কখন, জানাবে কখন, যাবে কখন জায়গামতন?
অবশ্যই তাকে প্লেনে যেতে হবে, যদি তার কাছে তার সময়ের মূল্য থাকে। বাংলাদেশের একজন স্কলার আছেন, যিনি বেশ কঠোর এবং বেশ তাকফিরি, তিনি তো সবাইকে বলেন, আমাকে কত টাকা দেবেন সেটা কথা না, কিন্তু আমার ব্যস্ততা অত্যন্ত বেশি, শুধু হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করতে পারলেই আমি যেতে পারব। তিনি হেলিকপ্টার ছাড়া যান না।

কুরআন থেকে মাসআলা বের করা, হাদীস থেকে মাসআলা বের করার কথাই ধরুন।
বিজ্ঞানের বিকাশের ফলে আমরা কুরআনকে ওইসব বিষয়ের সাথে যুক্ত করছি, যা কুরআনকে নতুন আলোয় ব্যাখ্যা করছে।

এক সময় ইমামদের অনেকেই বিশ্বাস করতেন, আকাশের ছাদ আছে। ফিজিক্যাল ছাদের মতন।
বিন বাজও এই কথা এতই বিশ্বাস করত যে, সে পৃথিবী গোল হওয়াকে কুফরি মনে করতো, আকাশের ছাদ আছে সেটা বিশ্বাস করতো, মহাশূণ্য বিশ্বাস করতো না।
এখন, পৃথিবী যে গোল, এটা কীভাবে বিজ্ঞানীরা বোঝাবেন বিন বাজকে?
সহজ, সৌদদের টাকা আছে। যথাসম্ভব জানি, বিন বাজকে রকেটে চড়িয়ে স্পেসে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে সে দেখলো, পৃথিবী কার্ভড। হ্যা, পৃথিবী গোল হতেও পারে, সে নিজ চোখে দেখে মানলো।
এইটা হল আইনুল ইয়াকিন।
সূফিরা এইভাবে যা মানে, দেখে মানে। যারা দেখে না, তাদের অবজ্ঞা করছি না, কিন্তু যে জানে আর যে জানে না, তারা দুজনে এক হতে পারে না, কারণ দুজনের বিশ্বাসই ভিন্ন। উপলব্ধিই ভিন্ন।

বলতে চাচ্ছি,
আগের যুগের ফকীহ ও মুজতাহিদরা প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে ব্যাখ্যা যেভাবে দিয়েছেন, বা কোন কিছুতে অভ্যস্ত থাকার কারণে ব্যাখ্যা যেভাবে দিয়েছেন-
আমরা ওই কিতাবগুলো পড়ব, ওই কিতাবগুলো সম্মান করব, কিন্তু শুধু ওটা কীভাবে ধরে রাখব?

কিতাবি আলিমরা প্যারালাল ইউনিভার্সের ধারণা রাখতেন না, তাঁরা স্পেস-টাইম কন্টিনিউয়ামের ধারণা রাখতেন না, তাঁরা জেনেটিক্সের ধারণা রাখতেন না, আলো-বস্তু-শক্তি-সময় ও মাত্রার পারস্পরিক সম্পর্ক জানতেন না। ফিজিক্যাল এবং মেটাফিজিক্যালের মধ্যে সব সময় তালগোল পাকিয়ে ফেলতেন।
সূফিদের কথা আলাদা। তাঁরা দেখার বাইরের বিষয় দেখে অভ্যস্ত এবং জানার বাইরের বিষয় জেনে অভ্যস্ত বলেই তাঁরা আইডিয়াগুলোকে ধারণ করতে পারেন, পারতেন।

এটা কিতাবমুখী আলিমদের দৈন্য নয়। তাদের মত আন্তরিক কেউ ছিল না। তাদের মত যোগ্য কেউ ছিল না। তাদের মত পরিশ্রমী কেউ ছিল না। কিন্ত তাদের যথাযথ ডাটা, যথাযথ অভিজ্ঞতা ও অভীজ্ঞা ছিল না। সেই সুযোগই ছিল না।
তখন তাঁরা যে ব্যাখ্যা, যে বিশ্লেষণ, যে ফতোয়, যে অনুসিদ্ধান্ত দিয়েছেন, নিজের আকল ঈমান আমল ইলম ও উম্মাহ্’র প্রচলিত বৃহত্তম ট্রাডিশন অনুসারেই দিয়েছেন।
এখন, প্রশ্ন হচ্ছে, ওই সময়ের প্রতিটাকেই আমরা সেভাবেই মেনে নিব, যদিও তা ভুল হয় এবং আন্তরিক ভুল হয়, নাকি আমরা মাইক চালিয়ে আজান দিয়ে মেয়েকে ভূগোল পড়িয়ে প্লেনে চড়ে ওয়াজ করতে যাব- চয়েস আমার হাতে।

চাইলে আমরা এলাকার মাইক আন্তরিকতার সাথে বন্ধ করে দিয়ে মেয়েদের স্কুলগুলো বন্ধ করে দিয়ে সব কুফফারি প্লেন টেকনোলজি বন্ধ করে দিয়ে একিনের সাথে পাথর ঘষে জীবনও কাটাতে পারি।
অসুবিধা তো কিছু নেই।