একটি ইমান বিধ্বংসী কথা কবর-পূজারী/ মাজার-পূজারী। | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

একটি ইমান বিধ্বংসী কথা কবর-পূজারী/ মাজার-পূজারী। 


প্রশ্নকর্তাঃ 

কবর জিয়ারতকারীকে কবর-পূজারী/ মাজার-পূজারী বলার পরিনতি কি? আমি একজনকে কোন দিন দেখি নি যে সে এমন কোন শিরকী কাজ করেছে কিন্তু সে সুন্নী পরিচয় দেয়ায় তাকে আমি আন্দাজের উপর কবরপূজারী বললাম। কারণ আমাদের অনেক শায়খ সুন্নিদেরকে কবরপূজারী/মাজার পূজারী বলে। এ মর্মে আমার এই ফতোয়া ভুল নাকি শুদ্ধ অনুগ্রহ করে জানাবেন এবং ভুল হলে এর শাস্তি অথবা করনীয় কি?

 

জবাবঃ


প্রথমে আমাদের জানা দরকার “শিরক” কাকে বলে এর সংজ্ঞা কি? “শিরক” বাংলা অর্থ শরিক অর্থাৎ আল্লাহর সাথে কারো শরিক করা কে বোঝায়। ব্যাপকভাবে শিরক বলতে বুঝায়, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সৃষ্টিকর্তা মাবুদ হিসাবে গ্রহণ করা। শিরকের গুনাহ আল্লাহ মাফ করেন না। 


اِنَّ اللہَ لَا یَغْفِرُ اَنۡ یُّشْرَکَ بِہٖ وَیَغْفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَمَنۡ یُّشْرِکْ بِاللہِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلٰلًۢا بـَعِیۡدًا ﴿۱۱۶


আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আল্লাহ এটা ক্ষমা করেন না যে, তাঁর কোন শরীক দাঁড় করানো হবে এবং এর নিম্ন পর্যায়ে যা কিছু আছে তা যাকে চান ক্ষমা করে দেন। ”

[সূরা আন্‌-নিসা, আয়াত নং ১১৬]


তাই এই ক্ষেত্রে যেসব বিষয় মাথায় রাখা জরুরি তা হলঃ

১) প্রথমত, আন্দাজের উপর সর্বোচ্চ লেভেলের ফতোয়া দেয়ার স্পর্ধা আপনে কোথায় পেলেন? আপনে কোন দিন দেখেছেন যে ঐ ব্যক্তি আসলেই শিরক করেছে কিনা? তার মনোসম্মতি কিংবা কথাবার্তায় এমন শিরক কুফর আছে কিনা? কবর যিয়ারত বা মাজার জিয়ারত করা হচ্ছে সুন্নাতে রাসূল (ﷺ) ও সুন্নাতে সাহাবা (رضي الله عنه) আর এটাকে “কবর পুজা” বলা মানে নিজের ফতোয়ায় নিজে মুশরিক। 


(২) দ্বিতীয়ত, ফতোয়াদানকারীর উপর মিথ্যা ও অপবাদ দেয়ার মত কবিরা গুনাহ বর্তাবে। 


(৩) তৃতীয়ত, একজনের দেখাদেখি যারাই এই পাপ (যদি হাজার কিংবা কোটি মানুষও) শরীক হয় তবে সবাই উক্ত শিরক, কুফর, মিথ্যা ও অপবাদের পাপে জর্জরিত হবে। এবং প্রথম ব্যক্তির উপর সকলের পাপ বর্তাবে।


(৪) চতুর্থত, শিরক ও কুফর এমন পাপ যার উপরে আর কোন পাপ নেই। সুতরাং, কাউকে শিরক বললে অবশ্যই জেনে শুনে, স্বজ্ঞানে যাচাই বাচাই করে সেই ফতোয়া দিতে হবে। আর সেই ফতোয়ার দায়িত্ব হল মুফতি সাহেবদের। যারা দ্বীনের জ্ঞান রাখে না তারা যদি পাইকারী দরে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে এই ফতোয়া মারে সবার পাপ তার উপর বর্তাবে। এটাতে কারো কোন দ্বিমত নেই। দুঃখের বিষয় হল, আজকাল কাফির মুশরিক বলার জন্য কোন আলেম লাগে না। সবাই গণহারে ফতোয়াবাজিতে অংশ নেয়। 


(৫) যে বা যারা এই ভয়াবহ পাপে অংশ নিবে তাদের ইমান ও আমল সব বরবাদ। কারণ নিজেদের ভ্রান্ত ফতোয়ায় তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে। এমতবস্থায়, 

(i) ঐ ব্যক্তির নিকট ক্ষমা চেয়ে তার থেকে মাফ নিতে হবে। 

(ii) আল্লাহর নিকট তওবাহ করে পুনরায় কালেমা পড়ে মুসলমান হতে হবে নয়ত তার কোন ইবাদত কিয়ামত পর্যন্ত কাজে আসবে না। 

(iii) তার থেকে যারা ভুল শিখেছে তাদেরকে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে হবে নয়ত তাদের পাপও ঐ ব্যক্তির আমল নামায় আসতে থাকবে। 


(৬) অপরদিকে মাজারকে কেন্দ্র করে যারা ভন্ডামী করে তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে। আ'লা হযরতের কিতাব-তাজিমী সিজদায় বলা আছে, সিজদায়ে তাজিমী হারাম আর সিজদায়ে ইবাদতী (যদি ইবাদতের উদ্দেশ্যে হয়) তবে তা শিরক, মাজারে যারা গান-বাজনা করে  এসবও হারাম। এই শরিয়তবিরোধী কাজের জন্য মাজারস্থ আল্লাহর অলী কষ্ট পান। 


(৭) কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি শরিয়তের জ্ঞান না রেখে যদি শরিয়ত বিরোধী কাজ করে তবে তার দ্বায়ভার তাকেই নিতে হবে। তার পাপের বোঝা অন্য কারো উপর ন্যাস্ত হবে না। তেমনি কোন ব্যক্তি বিশেষের মন্দ কাজের জন্য পুরো জাতিকে সেই পাপের অপবাদ দেয়া যাবে না যতক্ষণ না তাদেরকে তা প্রকাশ পায়। 




যে কাফির-মুশরিক না তাকে কাফির-মুশরিক বলার পরিনতিঃ



❏ হাদিস ১:


قال المستبان ماقالا فعلى البادى مالم يعتد المظلوم- رواه مسلم


হযরত আবু যার (رضي الله عنه) থেকে বর্নিত, রাসুল (ﷺ) বলেছেন, "যে ব্যাক্তি কাউকে কাফের বলে ডাকে অথবা আল্লাহর শত্রু বলে, অথচ (যাকে কাফের ও আল্লাহ তাআলার শত্রু বলা হচ্ছে) সে তা নয়, তখন তার কথা নিজের দিকে ফিরবে।"


তথ্যসূত্রঃ

[বুখারী ও মুসলিম , মিশকাতঃ ৪৬০৬ অধ্যায়ঃজিহ্বার সংযম, গীবত…গাল-মন্দ প্রসঙ্গে]


❏ হাদিস ২:


হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, 

"যে ব্যক্তি তার অপর কোন ভাইকে কাফের বলে, তাহলে তা উভয়ের যেকোন একজনের দিকে ফিরবে। যদি সে যেমন বলেছে বাস্তবে তা’ই হয়, তাহলে তো ঠিক আছে, নতুবা উক্ত বিষয়টি যে বলেছে তার দিকেই ফিরে আসবে। "


তথ্যসূত্রঃ

১. সহীহ মুসলিম, হা/২২৫

২. সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/২৫০

৩. মুসনাদে আহমাদ, হা/৫০৩৫

৪. মুসনাদে আবী আওয়ানা, হা/৫৪ ৫. শুয়াবুল ঈমান, হা/৬২৩৭



শিরকের শাস্তিঃ



❏ আয়াত ১:


“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সঙ্গে কেউ অংশীদারিত্ব স্থাপন করলে তাকে ক্ষমা করবেন না এবং এর চেয়ে ছোট পাপে যাকে ইচ্ছা তিঁনি ক্ষমা করবেন। আর যে শিরক করল সে বড় ধরনের অপবাদ ধারণ করল। ”

[সুরা নিসা, আয়াত নং ৪৮]


❏ আয়াত ২: 


অপর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে “আর যে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করল সে বহু দূরের ভ্রষ্টতায় পতিত হলো। ”

[সুরা নিসা, আয়াত নং ১১৬]


❏ আয়াত ৩: 


“নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর অংশীদারিত্ব স্থাপন করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নামে। আর এরূপ অত্যাচারীদের জন্যে কোন সাহায্যকারী থাকবে না। ”

[সুরা মায়েদা, আয়াত নং ৭২]


❏ আয়াত ৪:


“আর যে আল্লাহর সাথে শিরক করল; সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়ল, অত:পর মৃতভোজী পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোন দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল। ”

[সুরা হজ, আয়াত নং ৩১]



মিথ্যাচারের শাস্তিঃ



❏ আয়াত ১:


মিথ্যা অপবাদ দেয়ার জন্য কঠোর শাস্তি দেয়া হবেঃ


وَيَدْرَأُ عَنْهَا الْعَذَابَ أَنْ تَشْهَدَ أَرْبَعَ شَهَادَاتٍ بِاللَّهِ إِنَّهُ لَمِنَ الْكَاذِبِينَ


“এবং পঞ্চমবার বলবে যে, যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তবে তার উপর নেমে আসবে আল্লাহর অভিশাপ। ”

[সুরা নুর আয়াত নং ৭]


❏ আয়াত ২:


لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُبِينٌ (12) لَوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ (13) وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآَخِرَةِ لَمَسَّكُمْ فِي مَا أَفَضْتُمْ فِيهِ عَذَابٌ عَظِيمٌ (14)


“তোমরা যখন একথা (অর্থাৎ অপবাদ) শুনলে, তখন ঈমানদার পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করনি এবং বলেনি যে, এটা তো নির্জলা মিথ্যা অপবাদ?”

[সূরা নূর, আয়াত নং ১২]


❏ আয়াত ৩:


“তারা কেন এ ব্যাপারে চার জন সাক্ষী উপস্থিত করেনি; অতঃপর যখন তারা সাক্ষী উপস্থিত করেনি, তখন তারাই আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী। ”

[সূরা নূর, আয়াত নং ১৩]


❏ আয়াত ৪:


“যদি ইহকাল ও পরকালে তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত, তবে তোমরা যা চর্চা করছিলে (অর্থাৎ যে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিলে), সেজন্য তোমাদেরকে গুরুতর আযাব দেয়া হতো। ”

[সূরা নূর, আয়াত নং ১৪]


❏ আয়াত ৫: 


পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, 


﴿وَقَدۡ خَابَ مَنِ ٱفۡتَرَىٰ ٦١ ﴾ [طه: ٦١]


আর যে ব্যক্তি মিথ্যা আরোপ করে, সে-ই ব্যর্থ হয়। 

[সূরা ত্বোয়া-হা, আয়াত নং ৬১]



কবর জিয়ারত বা মাজার জিয়ারত সুন্নাতঃ



❏ হাদিস ১:


١٨ – عَنْ بريرة رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُاللَّهِ ﷺ: “كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ، فَزُورُوهَا،،رواه مسلم والترميذي و زاد فَإِنَّها وَتُذَكِّرُكم الآخِرَةَ،


অনুবাদ: হযরত বুরায়রাহ (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন যে, আঁমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু এখন তোমরা কবর যিয়ারত কর। (সহিহ মুসলিম) সুনানে তিরমিজিতে এ বাক্যটা যুক্ত হয়েছেঃ “কেননা এটি তোমাদের পরকালকে স্মরন করিয়ে দিবে। ”


তথ্যসূত্রঃ

১. সহিহ মুসলিমঃ ১৭৮, ১৮৮

২. সুনানে ইবনে মাজাহঃ ১৫৭১

৩. মিশকাত শরীফ ১৬৭০। 


ব্যাখ্যা : এ হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শায়খ আব্দুল হক মোহাদ্দীসে দেহেলভী (রহঃ) লিখেছেন যে, অজ্ঞতার যুগ সবেমাত্র পার হওয়ায় রাসূলুলাহ (ﷺ) কবর যিয়ারত নিষেধ করেছিলেন এই আশংকায় যে মুসলমানরা পুরুনো জীবনধারায় প্রত্যাবর্তন করবেন। তবে মানুষেরা যখন ইসলামী ব্যবস্থার সাথে ভালভাবে পরিচিত হলেন, তখন প্রিয় নবী (ﷺ) যেয়ারতকে অনুমতি দিলেন। 

[আশ্আতুল লোমআত, ১ম খন্ড, ৭১৭ পৃষ্ঠা]


❏ হাদিস ২:

 

ইবনে মাসউদ (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত,


اِنَّ رَسُولَ الله (ص) قال : کُنتُ نَهَيتُکُم عَن زيارة القُبورَ فَزُوُروها فَا نَّها تُزَهِّدُ في الدّتيا و تُذَ کِّرُ فِي الآخِرَة


নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন : আঁমি (ইতিপূর্বে ) তোমাদেরকে কবর যিয়ারতে নিষেধ করেছিলাম, এখন এগুলোর যিয়ারতে যাও। কারণ কবর যিয়ারত, পৃথিবীতে সংযম ও আখিরাতের স্মরণ আনয়ন করে। 


তথ্যসূত্রঃ

১.সহীহ মুসলিম, হাদিস ৯৭৭, 

২.সুনানে নাসাঈ, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৮৯

৩.সূনানে ইবনে মা’জাহ, ১ম খন্ড, পৃঃ ৫০০-৫০১

৪.সুনানে তিরমিযি, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ২৭৪

৫.সুনানে আবি দাউদ, হাদিস ৩২৩৫

৬.মোয়াত্তা মালিক, ২য় খন্ড, পৃঃ৪৮৫


❏ হাদিস ৩:


ﻥﺎﻣﺯ ﻲﻓ ﻂﺤﻗ ﺱﺎﻨﻟﺍ ﺏﺎﺻﺍ ﻲﺒﻨﻟﺍ ﺮﺒﻗ ﻲﻟﺍ ﻞﺟﺭ ﺀﺎﺠﻓ _ ﺮﻤﻋ ﻪﻠﻟﺍ ﻝﻮﺳﺭﺎﻳ ﻝﺎﻘﻓ ﻢﻌﻠﺻ ﺍﻮﻜﻠﻫ ﺪﻗ ﻢﻬﻧﺎﻓ ﻚﺘﻣﻻ ﻒﺴﺘﺳﺍ ﻪﻟ ﻞﻴﻘﻓ ﻡﺎﻨﻤﻟﺍ ﻲﻓ ﻞﺟﺮﻟﺍ ﻲﺗﺎﻓ _ ﻡﻼﺴﻟﺍ ﻪﺋﺮﻗﺎﻓ ﺮﻤﻋ ﺖﺋﺍ ﻥﻮﻤﻴﻘﺘﺴﻣ ﻢﻜﻧﺍ ﻩﺮﺒﺧﺍﻭ


হযরত ওমর (رضي الله عنه) এর সময় একদা অনাবৃষ্টির কারণে মানুষের উপর দুর্ভিক্ষ পতিত হল। তখন এক সাহাবী হযরত বেলাল বিন হারেস (رضي الله عنه) রাসূল (ﷺ)-এঁর রওযা মোবারকে এসে আবেদন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (ﷺ) আঁপনার উম্মত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আঁপনি আল্লাহর দরবারে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করুন। সে সাহাবিকে স্বপ্নযোগে বলা হল , হযরত ওমর (رضي الله عنه) কে গিয়ে সালাম বল এবং তাকে বল যে তোমাদেরকে বৃষ্টি দান করা হবে। 


তথ্যসূত্রঃ

১.আল মুসান্নাফ, ইবনে আবি শায়বাহ, ১২ তম খন্ড, পৃ:৩২, হাদিস নং ১২০৫১

২.হযরত ইবনে হাজার আসকালানী (র:), ফতহুল বারী শরহে বুখারী, ২য় খন্ড, পৃঃ ৪৯৫ ও ৪১২


[হযরত ইবনে আবি শায়বাহ, ইবনে হাজর আসকালানী , ও ইমাম কোস্তলানী (رحمة الله) উনারা বলেছেন- ﺢﻴﺤﺻ ﺚﻳﺪﺣ ﺍﺬﻫ অত্র হাদিস খানা সহীহ সনদে বর্ণিত]


❏ হাদিস ৪:


“মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম আত্-তায়মী (رحمة الله) বলেন- আল্লাহর রাসুল (ﷺ)-প্রতি বছরের শুরুতে উহুদের যুদ্ধে শহিদানের কবর/মাজারে আসতেন। অত:পর বলতেন- “আসসালামু আলাইকুম বিমা ছাবারতুম ফানি’মা উকবা দারে।" তিনি বলেন-হযরত আবু-বকর (رضي الله عنه), হযরত উমর (رضي الله عنه) , হযরত উসমান (رضي الله عنه) এমনটি করতেন/অনুরুপ করতেন। 


তথ্যসূত্রঃ

১. তাফসিরে তাবারী, হা/২০৩৪৫

২.সুরা রা’দ এর ২৪ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়: তাফসীরে ছা’লাভী, ৫ম খন্ড, ২৮৭ পৃষ্ঠা

৩.তাফসিরে নিছাপুরী, ২য় খন্ড, ২২৭ পৃষ্ঠা

৪.তাফসিরে কুরতুবি, ৯ম খন্ড, ৩১২ পৃষ্ঠা

৫.তাফসিরে আবু ছাউদ, ৫ম খন্ড, ১৮ পৃষ্ঠা

৬.মুছান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, ৩য় খন্ড, হা/৬৭১৬

৭.তাখরিজু আহাদিছুল কাশশাফ, হা/৬৫১


© এই হাদিসের রাবি মুহাম্মাদ ইব্রাহিম আত-তায়মী (رحمة الله) একজন নির্ভরযোগ্য রাবি ও বিখ্যাত তাবেঈ। 


(ক.) ইমাম শামছুদ্দিন যাহাবি (رحمة الله) বলেনঃ ‘মুহাম্মাদ ইব্রাহিম আত-তায়মী (رحمة الله) ছিলেন একজন বিশ্বস্ত তাবেঈগনের একজন। 

[আল-মুগনী ফিদ-দোয়াফা, রাবি নং ৫২০৩]


(খ.) আল্লামা হাফিছ ইবনে হাজার আসকালানী (رحمة الله) বলেনঃ ‘‘ আমি (ইবনে হাজার আসকালানী) বলছি- লোকেরা তাকে বিশ্বস্ত বলেছেন। 

ইমাম বুখারী ও মুসলিম (رحمة الله) তার উপর নির্ভর করেছেন। ’’

[লিছানুল মিযান, ৫ম খন্ড, ২০ পৃষ্ঠা]


সুতরাং ‘মুহাম্মাদ ইব্রাহিম আত-তায়মী (رحمة الله) এর রেওয়াত সহীহ হিসাবে স্বীকৃত। 



রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কি তাঁর উম্মতের ব্যাপারে শিরকের আশংকা করতেন?


❏ হাদিস ১:


হযরত ওকবা বিন আমের ra থেকে বণিত, তিনি বলেন, 

صلي رسول الله صلي الله عليه واله و سلمّ علئ قتل احد ثم سعد المنبر كالمودع للاحياء و الاموات . فقال اني فرطكم علي الحوض، و ان عرضه كما بين ايلة الي الجحفه. اني لست اخشي عليكم ان تشركوا بعدي. ولكني اخشي عليكم الدنيا ان تنافسوا فيها،وتقتتلوا فتهلكوا، كما هلك من كان قبلكم،

قال عقبة: فكانت اخر ما رايت رسول الله صلي الله عليه واله و سلمّ علي المنبر-

اخرخه هذا الحديث امام المسلم من كتاب الفضائل تحت العنوان “باب اثبات حوض نبينا صلي الله عليه واله و سلمّ صفاته” ٤: ١٧٩٦ ، الرقم ٩٦٢٢ :


অনুবাদ: রাসুল (ﷺ) উহুদ যুদ্ধের শহিদদের জানাজার নামাজ আদায় করেন, অতপর মিম্বরের উপর উপস্থিত হয়ে এমনভাবে নছিহত করতে লাগলেন যেন মৃত ও জীবিত উভয়কে নছিহত করতে লাগলেন, রাসুল (ﷺ) এরশাদ করেন, নিশ্চয় আঁমি তোমাদেরকে হাওজে কাউছার এর পানি পান করাব, (হাওজে কাওছারের পানি অনুমতি আছে ) আর এই হাওজের শুরু আয়িলা নামক জায়গা থেকে জোহফা পর্যন্ত, আঁমার কোন ভয়ে নেই যে (উম্মত) আঁমার অনুপস্থিতে তোমরা কোন প্রকার শিরিক করবে। কিন্তু আঁমি ভয় পাচ্ছি যে দুনিয়া তোমাদেরকে পেয়ে বসবে, এবং একে অপরের সাথে দাঙ্গা হাঙ্গামা করবে এতে নিজেরা ক্ষতি গ্রস্থ হবে। যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিরা ধংস হয়েছে। হযরত ওকবা বিন আমের বলেন, আমি রাসুল (ﷺ) কে শেষবাবের মত এই মিম্বরে দাড়াঁতে দেখেছি। 

তথ্যসূত্রঃ

[ইমাম মুসিলম এই হাদিছকে “কিতাবুল ফযায়েলে” “এছবাতু হাওযু নব্বীয়েনা (ﷺ) ওয়া সিফাতিহি” অধায়ে বর্ণনা করেন- ৪: ১৭৯৬, হাদিছ নং-২২৯৬]


❏ হাদিস ২:


باب الصَّلاَةِ عَلَى الشَّهِيدِ حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، حَدَّثَنِي يَزِيدُ بْنُ أَبِي حَبِيبٍ، عَنْ أَبِي الْخَيْرِ، عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم خَرَجَ يَوْمًا فَصَلَّى عَلَى أَهْلِ أُحُدٍ صَلاَتَهُ عَلَى الْمَيِّتِ، ثُمَّ انْصَرَفَ إِلَى الْمِنْبَرِ فَقَالَ ‏ “‏ إِنِّي فَرَطٌ لَكُمْ، وَأَنَا شَهِيدٌ عَلَيْكُمْ، وَإِنِّي وَاللَّهِ لأَنْظُرُ إِلَى حَوْضِي الآنَ، وَإِنِّي أُعْطِيتُ مَفَاتِيحَ خَزَائِنِ الأَرْضِ ـ أَوْ مَفَاتِيحَ الأَرْضِ ـ وَإِنِّي وَاللَّهِ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ أَنْ تُشْرِكُوا بَعْدِي، وَلَكِنْ أَخَافُ عَلَيْكُمْ أَنْ تَنَافَسُوا فِيهَا ‏”‏‏.‏


আবদুল্লাহ‌ ইবন ইউসুফ… উক্‌বা ইবনু আমির ra থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন বের হলেন এবং উহুদে পৌঁছে মৃতের জন্য যেরূপ (জানাযার) সালাত আদায় করা হয় উহুদের শহীদানের জন্য অনুরূপ সালাত আদায় করলেন। এরপর ফিরে এসে মিম্বারে তাশরীফ রেখে বললেনঃ আঁমি হবো তোমাদের জন্য অগ্রে প্রেরিত এবং আঁমি তোমাদের জন্য সাক্ষী। আল্লাহর কসম! এ মুহূর্তে আঁমি অবশ্যই আঁমার হাউয (হাউয-ই-কাওসার) দেখছি। আর অবশ্যই আঁমাকে পৃথিবীর ভান্ডারসমূহের চাবিগুচ্ছ প্রদান করা হয়েছে। অথবা (রাবী বলেছেন) পৃথিবীর চাবিগুচ্ছ আর আল্লাহর কসম! তোমরা আঁমার পরে শিরক করবে এ আশংকা আঁমি করি না। তবে তোমাদের ব্যপারে আঁমার আশংকা যে, তেমরা পার্থিব সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বে। 

হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

তথ্যসূত্রঃ

[বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ ২০/ জানাযা, হাদিস নম্বরঃ ১২৬৩ পরিচ্ছদঃ শহীদের জন্য জানাযার সালাত। ]


❏ হাদিস ৩:


হযরত উক্ববা বিন আমর (رضي الله عنه) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, 


٣٩- عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ : قَالَ قَال رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” إِنِّي فَرَطُ لَكُمْ ، وَأَنَا شَهِيدٌ عَلَيْكُمْ ، وَإِنِّي وَاللَّهِ لَأَنْظُرُ إِلَى حَوْضِي الْآنَ ، وَإِنِّي أُعْطِيتُ مَفَاتِيحَ خَزَائِنِ الْأَرْضِ أَوْ مَفَاتِيحَ الْأَرْضِ ، وَإِنِّي وَاللَّهِ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ أَنْ تُشْرِكُوا بَعْدِي ، وَلَكِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ أَنْ تَنَافَسُوا فِيهَا “


নবী করীম (ﷺ) ইরশাদ করেন আঁমি তোমাদের অগ্রবর্তী ও তোমাদের উপর সাক্ষ্যদাতা। খোদার কসম! অবশ্যই এই মূহুর্তে আঁমি আঁমার হাউজ (কাউছার) দেখতে পাচ্ছি এবং অবশ্যই আঁমাকে জমিনের খাজানার সমূহের চাবি অথবা জমিনের চাবি দেওয়া হয়েছে। খোদার কসম! আঁমি এ নিয়ে ভীত নই যে তোমরা আঁমার পরে শিরিকে লিপ্ত হবে। বরং আঁমি এ নিয়ে ভীত যে, তোমরা দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে। 

তথ্যসূত্রঃ

[সহিহ বুখারী, অনুচ্ছেদঃ মানাকিব, অধ্যায়: ইসলামে নবুয়্যতের আলামত, ৩/১৩১ হাঃ ৩৪০১ সহিহ মুসলিম, অনুচ্ছেদঃ ফাযায়েল অধ্যায়ঃ নবী এর হাউজের প্রমাণ ও বৈশিষ্ট, ৪/১৭৯৫ হাঃ ২২৯৬]


উক্ত হাদিসে স্পষ্টত: এই উম্মত কখনো শিরিকে লিপ্ত হবেনা। 


ওলামায়ে কেরামের বর্ণনার আলোকে তাওহিদঃ


❏ বর্ণনা ১:


التوحيد تفعيل من الوحدة ، و هو جعل الشئ واحدا. و المقصود بتوحيد الله تعالي اعتقاده انه تعلئ واحد فئ ذاته وفي

صفاته وفي افعاله, فلا يشاركه فيها احد ولا يشبهه فيها احد


তাওহিদ শব্দটি আরবি গ্রামার অনুযায়ি তাফয়িলুন এর ওজনে বা তাফয়িলুন এর সূত্র ব্যবহার হয়, যাকে “ওয়াহদাতু” শব্দ থেকে নেয়া হয়েছে, অর্থঃ-কোন বস্তুকে একক মানা, আল্লাহর তাওহিদের উদ্দেশ্য হচ্ছে এসব বিষয়ের বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ তায়ালা তার সত্ত্বাগত, গুণগত ও কর্মপদ্ধতিতে একক, এর মধ্যে কারো অংশিদারিত্ব নাই, এর সাথে কারো তুলনাও নাই। আল্লাহর তাওহিদের বর্ণনায়।"


তথ্যসূত্রঃ

১.হযরত ইমাম আবু জাফর তাহাবি (رحمة الله) “আল আকিদাতুত তাহবিয়া” ৯-১১ পৃষ্টায়, 

২.হযরত ইমাম আবুল হাসান আল আসয়ারি (رحمة الله) “আল ইবানাতু আল উসুয়ুলু দিয়ানাহ” ৭ পৃষ্টায়, 

৩.হযরত ইমাম গজ্জালি (رحمة الله) “ কাওয়ায়েদুল আকাঈদে” পৃষ্টা নং ৫০-৫৪। 


❏ বর্ণনা ২:


انه في ذاته واحد لا شريك له، فرد لا مثيل له، صمد لا ضد له، منفرد لا ند له ، وانه واحد قديم لا اوّل له، ازليّ لا بداية له، مستمر الوجود لا اخر له، ابدي لا نهاية له، قيوم لا انقطاع له، دايم لا انصرم له، لم يزل موصوفا بنعوت الجلال ، لا يقضي عليه بالانقضاء،والانفصا ل ، بتصرم الاباد، و انقراض الاجال، بل هوالاول و الاخر واالظاهرو الباطن ، وهو بكل شي عليم


আল্লাহ তাঁর সত্ত্বাতে একক, যারঁ কোন অংশিদারিত্ব নেই, যাঁর কোন তুলনা নেই, যাঁর কোন বিপরীত কেও নেই, যাঁর প্রকার কেউ নেই, নিশ্চয় তিঁনি একক ও চিরন্জিব, যাঁর প্রথম বলতে নেই, তিঁনি তখন থেকে যখন সময়ের উল্লেখ নেই, তিঁনি চীরস্থায়ি যাঁর শেষ নেই, তিঁনি সর্বাবস্থায় বিরাজমান, তিঁনি জালালি গুনে গুনান্নিত। যুগের শেষে, সময়ের শেষের পরে সব কিছুর ধংসের যে বিষয় তা তার বিপরীতে নেই। বরং তিঁনিই প্রথম তিঁনিই শেষ, তিঁনিই প্রকাশ্য তিঁনিই অপ্রকাশ্য, তিঁনিই সবকিছুর জ্ঞান রখেন। 

[হযরত ইমাম গজ্জালি (رحمة الله) এঁর “ কাওয়ায়েদুল আকাঈদে” পৃষ্টা নং ৫০-৫৪]


অতএব, আলোচনা থেকে এই কথায় প্রমানিত হয় যে তারঁ সব গুণ সত্ত্বাগত। 


❏ বর্ণনা ৩:


اِلشركة والشَركة سواء :مخالطة الشريكين: يقال : اشتركنا بمعني تشاركنا ، وقد اشترك الرجلان وتشاركا و شارك احدهما الاخر


“শিরকাতুন” অথবা “শারিকাতুন” এই দুয়ের অর্থ হচ্ছে দুজন অংশিদ্বারকে একই বস্তুতে সমান ভাবে অংশিদ্বারি করা, যেমন বলা হয়, আমাদের অংশিদ্বারিত্ব হয়েছে, অথবা দুজন ব্যক্তি একে অন্যের সাথে অংশীদ্বার হয়েছে। অথবা তাদের অধিকার প্রতিষ্টা হয়েছে, সুতরাং একে অন্যের সাথে অংশীদ্বার হয়েছে। 

[লেসানুল আরবে” হযরত ইবনে মানজুর আফ্রিকি ৪৪৮ পৃষ্টা]


❏ বর্ণনা ৪:


والشرك با لله :جعل له شريكا في ملكه، تعالي الله عن ذالك، والشرك ان يجعل الله شريكا في ربوبيته،تعالي الله عن الشركاء والانداد، لان الله وحده ل شريك له ولا نّد له ولا نديد له


যখন ইহাই বলা হয় যে ঐ ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরিক করেছে তখন এর অর্থ হচ্ছে, এই ব্যক্তি অন্য কাওকে আল্লাহর রাজ্যে ও তাঁর শাষণের মধ্যে সমান অংশিদারত্ব প্রতিষ্টা করে দিয়েছে, আর শরিকের অর্থ হচ্ছে আল্লাহর প্রভূত্বে কাওকে অংশিদ্বারীত্ব করা, অথচ আল্লাহর জাতটা অংশিদ্বারীত্ব থেকে ও প্রতিদ্বন্দী থেকে আল্লাহ পবিত্র। কেননা আল্লাহ তায়ালা একক ও তার কোন শরিক নেই, তাঁর সমকক্ষ কোন শাসক নেই। তারঁ কোন দৃষ্টান্ত নেই। 

[লেসানুল আরবে হযরত ইবনে মানজুর আফ্রিকি ৪৪৯ পৃষ্টা]


মোদ্দাকথা হচ্ছে:

(১) সমান অংশিদ্বার দাবি করা শিরিক, 

(২) একজন মুসলমান শিরিক কখনো করবে না বা করার সম্ভাবনা নেই।

(৩) তাওহিদের বিপরীতে হচ্ছে শিরিক।