ইসলামে পবিত্র দিন ও রজনী বলতে এমন কিছু সময়কে বোঝানো হয়, যেগুলোর বিশেষ ফজিলত কুরআন-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে এবং মুসলমানরা ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে সেগুলোকে গুরুত্ব সহকারে পালন করেন। তবে সবগুলোর মর্যাদা ও আমলের ধরন এক নয়।
গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র দিন ও রজনী
- মিলাদুন্নবী (ﷺ)→১২ই রবিউল আউয়াল
- জুমার দিন→প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার→সপ্তাহের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন
- শবে কদর / লাইলাতুল কদর→রমজানের শেষ ১০ রাতের বিজোড় রাতসমূহ→হাজার মাসের চেয়েও উত্তম
- আরাফার দিন→৯ জিলহজ→হজের গুরুত্বপূর্ণ দিন; নফল ইবাদত ও রোজার বিশেষ ফজিলত
- আশুরার দিন→১০ মুহররম→নফল ইবাদত ও রোজার বিশেষ ফজিলত আছে
- শবে বরাত / লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান→১৫ শাবান রাত→এ রাতের ফজিলত বিষয়ে একাধিক হাদিস বর্ণিত
- ঈদুল ফিতর→১ শাওয়াল→রমজানের পর মুসলমানদের উৎসব
- ঈদুল আজহা→১০ জিলহজ→কুরবানির ঈদ
- তাশরিকের দিনগুলো→১১–১৩ জিলহজ→ঈদুল আজহার পরের বিশেষ দিন
এগুলো একটু বিস্তারিতভাবে দেখা যাক।
১. জুমার দিন — সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে দিনগুলোতে সূর্য উদিত হয়, তার মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন।”
এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং কিয়ামতও জুমার দিন সংঘটিত হবে।
রেফারেন্স: সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৫৪।
জুমার দিনের বিশেষ আমলের মধ্যে গোসল, উত্তম পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার, মসজিদে আগে যাওয়া, সূরা কাহফ পাঠ এবং অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ উল্লেখযোগ্য।
২. শবে কদর — লাইলাতুল কদর
এটি ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ রজনী।
আল্লাহ বলেন: “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।”
সূরা আল-কদর ৯৭:৩
আরও বলেন: “নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) নাজিল করেছি বরকতময় রাতে।”
সূরা আদ-দুখান ৪৪:৩
রাসুল ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে রাত জাগবে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”
সহিহ বুখারি ২০১৪; সহিহ মুসলিম ৭৬০
শবে কদর নির্দিষ্ট একটি রাত হিসেবে নিশ্চিত করে দেওয়া হয়নি; বরং রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে তা অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে।
সহিহ বুখারি ২০১৭; সহিহ মুসলিম ১১৬৯
৩. আরাফার দিন — ৯ জিলহজ
হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি হলো ৯ জিলহজ, ইয়াওমু আরাফাহ।
রাসুল ﷺ বলেছেন:
“আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, এটি পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৬২
তবে হাজিদের জন্য আরাফার ময়দানে অবস্থানরত অবস্থায় রোজা না রাখাই সুন্নত—রাসুল ﷺ আরাফায় অবস্থানকালে রোজা রাখেননি।
৪. আশুরার দিন — ১০ মুহররম
১০ মুহররম হলো আশুরার দিন।
রাসুল ﷺ মদিনায় এসে ইহুদিদের আশুরার রোজা রাখতে দেখে এর কারণ জানতে পারেন। তারা জানায়, এ দিনে আল্লাহ মূসা (আ.) ও বনী ইসরাইলকে ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।
তখন রাসুল ﷺ বলেন: “তোমরা মূসার সঙ্গে তাদের চেয়ে বেশি সম্পর্কিত।”
এবং তিনি আশুরার রোজা রাখেন।
সহিহ বুখারি ২০০৪; সহিহ মুসলিম ১১৩০
আরও বলেছেন: “আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা করবে বলে আমি আশা করি।”
সহিহ মুসলিম ১১৬২
১০ মুহররমের সঙ্গে ৯ মুহররম মিলিয়ে রোজা রাখার ইচ্ছাও রাসুল ﷺ প্রকাশ করেছিলেন:
সহিহ মুসলিম ১১৩৪।
৫. শবে বরাত — ১৫ শাবানের রাত
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ উপমহাদেশে ১৫ শাবানের রাতকে শবে বরাত বলা হয়।
এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে ইবনু মাজাহ, বায়হাকি প্রমুখ গ্রন্থে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন:
“আল্লাহ ১৫ শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া তাঁর সকল সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন।”
সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস ১৩৯০।
এই বিষয়ে হাদিসের সনদের শক্তি নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেক আলেম বিভিন্ন সনদ একত্রে বিবেচনা করে এ রাতের মূল ফজিলতকে গ্রহণ করেছেন; অন্যদিকে কিছু আলেম নির্দিষ্টভাবে এ রাতের বিশেষ নামাজ/উৎসবের পক্ষে সহিহ দলিলকে যথেষ্ট মনে করেননি।
তাই এ রাতে নির্দিষ্ট সংখ্যার বিশেষ নামাজ, নির্দিষ্ট পদ্ধতির অনুষ্ঠান বা শরিয়ত নির্ধারিত উৎসব বানানো থেকে বিরত থাকা নিরাপদ। সাধারণ নফল ইবাদত, দোয়া, ইস্তিগফার ইত্যাদি করা যেতে পারে।
৬. ঈদুল ফিতর — ১ শাওয়াল
রমজানের এক মাস রোজা রাখার পর ১ শাওয়াল মুসলমানদের ঈদুল ফিতর।
রাসুল ﷺ মদিনায় এসে দেখলেন, মানুষের দুটি উৎসবের দিন ছিল। তিনি বলেন:
“আল্লাহ তোমাদের জন্য এ দুটির পরিবর্তে তার চেয়ে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।”
সুনান আবু দাউদ ১১৩৪; সুনান নাসাঈ ১৫৫৬।
ঈদের দিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ।
সহিহ বুখারি ১৯৯০; সহিহ মুসলিম ১১৩৭।
৭. ঈদুল আজহা — ১০ জিলহজ
১০ জিলহজ হলো ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ।
এটি হজের মৌসুমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন মুসলমানরা ঈদের নামাজ আদায় করেন এবং সামর্থ্যবানরা কুরবানি করেন।
আল্লাহ বলেন:
“অতএব তোমার রবের জন্য নামাজ পড়ো এবং কুরবানি করো।”
সূরা আল-কাওসার ১০৮:২
এ দিন এবং পরবর্তী তাশরিকের দিনগুলোতে আল্লাহর জিকিরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
৮. তাশরিকের দিন — ১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ
ঈদুল আজহার পরের ১১, ১২ ও ১৩ জিলহজকে আইয়ামে তাশরিক বলা হয়।
রাসুল ﷺ বলেছেন: “তাশরিকের দিনগুলো হলো পানাহার এবং আল্লাহর জিকিরের দিন।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৪১।
এই দিনগুলোতে রোজা রাখা নিষিদ্ধ।