সাম্রাজ্য বিস্তারের অহমিকায় মত্ত ব্রিটিশ রাজশক্তি যখন বন্দুকের নল আর বুটের তলায় পিষে মারছিল পরাধীন ভারতের সাধারণ মানুষকে, ঠিক তখনই এই উপমহাদেশের মাটিতে এক অদ্ভুত শক্তির মুখোমুখি হয়েছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন। উনিশ শতকের শেষভাগে আজমীর শরীফে হযরত খাজা গরীব নাওয়াজ মঈনুদ্দিন চিশতী হাসান সনজারী (রহঃ)—যিনি বিশ্বজুড়ে ‘খাজা গরীবে নাওয়াজ’ নামে সমধিক পরিচিত—তাঁর পবিত্র দরগাহ শরীফ পরিদর্শনে গিয়ে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হন এই দাম্ভিক ব্রিটিশ শাসক।

সেখানে কোনো রাজকীয় সৈন্যসামন্ত ছিল না, ছিল না কোনো আধুনিক মারণাস্ত্র কিংবা জোরপূর্বক বশ্যতা স্বীকারের জবরদস্তি। অথচ কার্জন দেখলেন, ভারতের কোণায় কোণায় থাকা হিন্দু, মুসলিম, শিখ, দলিতসহ প্রতিটি জাতি ও ধর্মের লাখ লাখ মানুষ স্বেচ্ছায় পরম শ্রদ্ধায় মাথা নত করছে এক সুফি সাধকের সমাধির সামনে। এই দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় লর্ড কার্জন মন্তব্য করেছিলেন— "I have seen a grave in India which rules over India." অর্থাৎ, "আমি ভারতে এমন একটি কবর দেখেছি, যা পুরো ভারত শাসন করছে।"

লর্ড কার্জন (১৮৯৯-১৯০৫ সাল পর্যন্ত ভারতের ভাইসরয়) ছিলেন অত্যন্ত চতুর ও বাস্তববাদী ব্রিটিশ প্রশাসক। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে, ব্রিটিশরা তাদের বিশাল সেনাবাহিনী, আধুনিক অস্ত্র এবং কঠোর রাজদণ্ড খাটিয়েও ভারতীয়দের হৃদয় জয় করতে পারেনি, কেবল শরীরগুলোকে বন্দি করতে পেরেছে মাত্র।

কিন্তু আজমীরের মাটিতে এসে তাঁর সেই রাজনৈতিক ও সামরিক অহংকার চূর্ণ হয়ে যায়। তিনি উপলব্ধি করেন, শক্তির চেয়ে প্রেমের ক্ষমতা কতটা গভীর ও চিরন্তন হতে পারে। একজন মানুষ শত শত বছর আগে পৃথিবী ত্যাগ করার পরেও তাঁর রূহানি ও আধ্যাত্মিক শক্তির বলে আজো কোটি কোটি মানুষের হৃদয়কে শাসন করছেন। তরবারির শাসনের চেয়ে এই ভালোবাসার শাসন যে কতখানি অজেয়, কার্জনের সেই ঐতিহাসিক উক্তিটি মূলত তারই এক অবিকল্প স্বীকারোক্তি।

১. আজমীর শরীফ দরগাহর দাপ্তরিক ভিজিটরস রেকর্ড ও পরিদর্শক নথিপত্র (১৯০২)

২. ব্রিটিশ রাজপুতানা অফিশিয়াল গ্যাজেটিয়ার ও ভাইসরয়দের ডায়েরি (১৮৯৯-১৯০৫)

৩. The Shrine and Cult of Mu'in al-Din Chishti of Ajmer — P.M. Currie (Oxford University Press)

সংকলন ও সম্পাদনা: Gulshan-e-Chishty


Next
This is the most recent post.
Previous
Older Post
Top