কবর জিয়ারত সম্পর্কেঃ | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস


জিহাদে শহীদগণের কবর জিয়ারত প্রসংগেঃ

ইব্রাহিম বিন মুহাম্মদ (রা) বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বছরের প্রারম্ভে ওহুদ যুদ্ধে শহীদদের সমাধি জেয়ারতে যেতেন এবং বলতেন: السلام عليکم بما صبرتم فنعم عقبي الدار.

আপনাদের উপর সালাম! আপনারা আপনাদের ধৈর্যের ফলস্বরূপ আখেরাতে কি চমৎকার জায়গাই না পেয়েছেন।

আবু বকর, উমর এবং ওসমান (রা) একই ভাবে জেয়ারতে যেতেন।

সুত্র: –

১. মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক: ৩:৫৭৩

২. আইনি, উমদাদুল কারী, ৮:৭০

৩. তাবরী, জামি আল কুরআন, ১৩:১৪২

৪. ইমাম সুউতি, দারুল ময়ানসুর, ৪:৬৪১

৫. তাফসীর ইবনে ই কাসীর।


কবর জিয়ারত মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ঃ-



★ মহানবী (সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: “তোমরা ক্কবর জিয়ারত কর কারণ এই অভ্যাস পরকালের কথা মনে করিয়ে দেয়। (এ হাদিসে নির্দেশ দেয়া হয়েছে)

সুত্র:

১. মুসলিম ১:৬৭১ .. ৯৭৬

২. হাকীম আল মুস্তাদরাক: ১:৫৩১ .. ১৩৯০


★ হযরত বুরহিদাহ্ রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা তা করতে পারো।
(মুসলিম শরীফ)

★ হযরত ইবনে মসউদ রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই রসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা তা করতে পার। কেননা উহা দুনিয়ার আসক্তিকে কমায় এবং আখিরাতকে স্মরণ করায়। 
(ইবনে মাযাহ)



রওজা মোবারক জিয়ারতঃ


পবিত্র মহানবী (সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ‘র রওজা জিয়ারতের ফজিলত: –

নবী করীম (সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যে আমার রওজা জিয়ারত করবে, কিয়ামতের দিনে তাঁর জন্যে আমার শাফায়াত অবধারিত।

সুত্র:

১. দারুল কুতনী, আল সুনান ২: ২৭৮)

২. বায়হাকি, শোহবুল ঈমান ৩: ৪৯০, এবং ৪১৫৯ এবং ৪১৬০)

৩. হাকীম তিরমিজি, নাওয়াদিরুল উসুল ২: ৬৭)


প্রতিনিয়ত অবিরাম ফেরেশতাদের রৌজা মোবারক জিয়ারতঃ




রওজা মোবারক কে ঘিরে কিয়ামত পর্যন্ত ৭০ হাজার ফেরেশতাদের অবিরাম সকাল সন্ধ্যা 
জিয়ারত ও
 দুরুদ শরীফ পাঠঃ 


হযরত ওয়াহাব বিন মুনাব্বাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন,
প্রতিদিন ফজরের সময় আসমান থেকে ৭০ হাজার ফেরেশতা 
নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের, রাওযা শরীফে অবতরণ করেন । তারা চতুর্দিক থেকে রাওযা শরীফ পরিবেষ্টন করে রাখেন, এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দরূদ শরীফ পাঠ করতে থাকেন। অতঃপর সন্ধ্যা হয়ে গেলে এই ফেরেশতাগণ আবার উর্ধগমন করেন এবং তখনই আবার সমপরিমান ফেরেশতা অবতরণ করেন এবং ফজর পর্যন্ত পূর্ববর্তীদের ন্যায় দরূদ শরীফ পাঠ করতে থাকেন। যারা একবার আসবেন , তারা আর দ্বিতীয় বার আসার সুযোগ পাবে না । (সুবহানাল্লাহ)
Reference :
★ ইমাম বায়হাকীঃ শু’আবুল ঈমানঃ খন্ড ৩, হাদিস নং ৪১৭০, ৩৮৬২
★ ইমাম গাজ্জালিঃ ইহয়াউ উলূমিদ্দীনঃ৪ : ৫২২ পৃ
★ ইবনুল জাওজীঃ আল ওয়াফা বি আহওয়ালিল মোস্তফাঃ হাদিস ১৫৭৮
★ ইমাম জুরকানীঃ যুরকানী শরীফ ৭ : ৩৭৯ 
★ হিদায়াতুস সালিকঃ ১ : ১১৪
★ ইমাম ইবনে কাসীরঃ তাফসীরে ইবনে কাসীরঃ সুরা আহযাব
★ ইমাম দারিমীঃ সুনানে দারিমীঃ ৯৪


মাতা-পিতার 
কবর 
জিয়ারতঃ





★ তাবেয়ী মুহম্মদ বিন নোমান রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বর্ণিত রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন॥ যে ব্যক্তি প্রত্যেক শুক্রবার আপন মা॥বাপের অথবা তাঁদের মধ্যে একজনের কবর জিয়ারত করবে, তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং মা॥বাপের সহিত সদ্ব্যব্যবহারকারী বলে লেখা হবে। (বায়হাকী)




ইমাম ও মুহাদ্দিসগনের বর্ননাঃ


★ হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আযীয রহমতুল্লাহি আলাইহি শামদেশ হতে উট সওয়ার শুধু রওজায়ে পাকে তাঁর সালাম জানানোর জন্য পাঠিয়ে দিতেন।


★ হযরত ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি যিনি শাফেয়ী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা তিনি যখন কোন মাসআলা সমস্যার সমাধানে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তেন তখন আলমে ইসলামীর সর্বশ্রেষ্ঠ ইমামে আযম ইমাম আবু হানিফা নোমান বিন সাবেত কুফী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর মাজার শরীফে এসে জিয়ারত করে তখায় দু’রাকাত নামাজ পড়তেন। এরপর হযরত ইমামে আযম ইমাম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি এর উসিলা দিয়ে আল্লাহ্ পাকের দরবারে ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর সমস্যা জানাতেন। আল্লাহ্ পাক তাঁর দোয়া কবুল করতেন অর্থাৎ মাসআলার যে সমস্যার জালে আবদ্ধ হয়ে তিনি সেখানে যেতেন ইমামে আযম রহমতুল্লাহি আলাইহি এর উসিলার বরকতে তা খুলে যেত। অতঃপর স্বীয় স্থানে প্রত্যাবর্তন করতেন। উল্লেখ্য ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর এ আগমন শুরু হত ফিলিস্তিন হতে, আর এই সূদুর ফিলিস্তিন থেকে আগমনের একমাত্র নিয়ত ছিল মাজার জিয়ারত করা। অন্য কোন উদ্দেশ্যে বাগদাদ এসে মাজার জিয়ারত করা নয় (আন্ নাসিয়াতুলিল ওহাবী)




★ এ প্রসঙ্গে ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন:


অর্থঃ নিশ্চয়ই আমি ইমাম আযম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বরকত হাসিল করি। যখন আমার কোন সমস্যা দেখা দেয় আমি তাঁর মাজার শরীফে এসে প্রথমে দু’রাকাত নামাজ আদায় করি। অতঃপর তাঁর উসিলা দিয়ে আল্লাহ্ পাকের নিকট সমস্যা সমাধানের জন্য প্রার্থনা করি। তা অতি তাড়া তাড়ি সমাধান হয়ে যায়। (মুকাদ্দিমা,শামী ১ম খন্ড ৫৫ পৃঃ)

★ হুজ্জাতুল ইসলাম আল্লামা ইবনে হাযার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনি দিয়েছেন এভাবেঃ

জেনে রাখুন পুরুষ ও মহিলাদের জন্য কবর জিয়ারত করা এ সমস্ত হাদীসের রায় অনুযায়ী মোস্তাহাব প্রমাণিত, তবে মহিলাদের ব্যাপারে মতানৈক্য আছে।(ফতহুল বারী ফি শরহে বোখারী ৩য় খন্ড ১১৮ পৃষ্ঠা)

★ আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন:

→ কবর জিয়ারত এতে কোন অসুবিধা নেই, বরং এটা মোস্তাহাব। (ফতওয়ায়ে শামী)

→ পুরুষের জন্য কবর জিয়ারত করা মোস্তাহাব। (ফিক্বহুস সুন্নাহ্, ১ম খন্ড পৃঃ৪৯৯)


→ দূরবর্তী স্থানেও (কবর) জিয়ারতের জন্য গমন করা মোস্তাহাব। (শামী ২য় খন্ড ২৪২ পৃঃ)


→ ওহোদ পাহাড়ের শহীদগণের (কবর) জিয়ারত করা মোস্তাহাব। ইবনে শায়বা হতে বর্ণিত আছে যে, “রসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি বৎসরান্তে ওহোদের শহীদগণের (কবর) জিয়ারত করতে আসতেন। অতঃপর বলতেন, তোমাদের প্রতি সালাম, যেমন তোমরা ধৈর্য্য ধারণ করেছিলে তেমনি পরকালে উত্তম বাসস্থান লাভ করেছ। (ফতোয়ায়ে শামী)

★ আরো বর্ণিত আছে যে, পরবর্তীতে খলিফাতুল মোসলেমীন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিআল্লাহু আনহু ও আমিরুল মো’মেনীন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহু হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই ধারাকে বজায় রেখেছিলেন। (উমদাতুল ফিক্বাহ)

★ বিখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী রহমতুল্লাহি আলাইহি উল্লেখ করেন: সাইয়্যিদাহ্ ফাতিমা রাদিআল্লাহু আনহু প্রতি শুক্রবার হযরত হামযাহ্ রাদিআল্লাহু আনহু এর কবর জিয়ারত করতে যেতেন, অনুরূপভাবে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাদিআল্লাহু আনহু স্বীয় ভ্রাতা আবদুর রহমান রাদিআল্লাহু আনহু এর কবর জিয়ারত করার জন্য মক্কা শরীফ যেতেন। (উমদাতুল ক্বারী ফি শরহে বোখারী)

★ শায়েখ ওলি উদ্দীন ইরাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন আমার পিতা জয়নুদ্দীন ইরাকী এবং শায়েখ আব্দুর রহমান ইবনে রজব হাসলী, হযরত ইব্রাহীম খলীল আলাইহিস সালাম এর জিয়ারতে বলেছিলেন; যখন শহরের নিকটবর্তী হলেন তখন ইবনে রজব বলতে লাগলেন, আমি খলীলুল্লাহ্ আলাইহিস সালাম এর মসজিদে নামাজ পড়ার নিয়ত করে নিলাম যেন জিয়ারতের নিয়ত না থাকে। আমার পিতা বললেন, আপনিতো হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এরশাদের বিপরীত আমল করলেন। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের জন্য সফর করা যায় না অথচ আপনি চতুর্থ এক মসজিদের নিয়ত করলেন আর আমি হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এরশাদের উপর আমল করেছি। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কবর জিয়ারত করতে থাকবে। এমন কোন হাদীস নেই যাতে নবী আলাইহিস সালাম গণের কবরকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং আমি হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এরশাদ মোতাবেক আমল করেছি। (ফাযায়েলে হজ্ব, জুরক্বানী)

★ ইমামে রাব্বানী আফজালুল আউলিয়া শায়েখ আহমদ সিরহিন্দী ফারুকী মোজাদ্দেদে আলফেসানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, সুলতানুল হিন্দ হাবীবুল্লাহ ইমামুত্ব ত্বারীকত হযরত খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতী আজমিরী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর মাজার শরীফ জিযারত করতে গিয়েছিলেন। আর এতে জিয়ারত ভিন্ন অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না।(সীরাতে মোজাদ্দেদে আলফেসানীরহমতুল্লাহি আলাইহি।

★ আল্লামা আবদুর রহমান যাফিরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন:

কবর জিয়ারত এর ক্ষেত্রে নিকট ও দূরের কোন পার্থক্য নাই। (কিতাবুল ফিক্বাহ আলা মাযাহিবিল আরবা ১ম খন্ড ৫৪০ পৃঃ)

★ হাকিমূল উম্মত মাওলানা আশ্রাফ আলী থানভী বলেন॥ “পুরুষদের জন্য কবর জিয়ারত করা মোস্তাহাব। জিয়ারত করার অর্থ দেখাশুনা। সপ্তাহে অন্ততঃ একদিন কবর জিয়ারত করা উচিৎ। সেই দিন শুক্রবার হওয়াই সবচেয়ে ভাল। বুজুর্গানে দ্বীনের কবর জিয়ারত করার জন্য সফরে যাওয়াও দুরস্ত আছে”। 
(এমদাদুল ফতওয়া)