রসুলে পাক ﷺ বিদায় হজ্জ্বের ভাষণ | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস


জুমার খুতবা
****************
৩য় জুমা’ যুল হাজ্জাহ ১৪৩৮হি: 0৮ সেপ্টেম্বর- ২০১৭

রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিদায় হজ্বের ভাষণ
=========================================
সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী
খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
بسم الله الرحمن الرحيم
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দশম হিজরি,৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে যে হজ্ব পালন করেন, ইসলামের ইতিহাসে তা ‘হজ্জাতুল বিদা’ বা ‘বিদায় হজ্ব’ নামে খ্যাত। দশম হিজরি জিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফাতের বিশাল ময়দানে উপস্থিত প্রায় ১ লক্ষ ১৪ হাজার বা প্রায় ১ লক্ষ ২৪ হাজার সাহাবীর সম্মুখে জীবনের অন্তিম ভাষণ দান করেন, যা বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ‘বিদায় হজ্বের ঐতিহাসিক ভাষণ’ নামে পরিচিত।

১০ম হিজরীর যুলক্বা‘দাহ মাসের চারদিন বাকী থাকতে শনিবার যোহরের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায় লক্ষাধিক সাহাবীর এক বিরাট দল সমভিব্যাহারে মদীনা হ’তে মক্কার পথে হজ্ব আদায়ের জন্যে রওয়ানা হ’লেন। অনবরত আট দিন পথ চলার পর যিলহজ্ব মাসের ৪ তারিখ রোজ শনিবার মক্কা মুয়াজ্জামায় প্রবেশ করেন, ৮ জিলহজ সাহাবিদের সঙ্গে নিয়ে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিনায় চলে গেলেন। দশম হিজরি জিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখে আয়োজিত হয় বিশ্বমানবতায় এক মহাসমাবেশ। ওই দিনটি ছিল ইসলামের গৌরবময় ও সুউচ্চ মর্যাদা বিকাশের দিন, যার ফলে প্রাক-ইসলামি অন্ধকার যুগের যাবতীয় কুসংস্কার ও অহেতুক কাজকর্ম বিলুপ্ত হয়ে গেল।

এ দিন ছিল শুক্রবার, ভোরে নামায আদায় করে মিনা থেকে আরাফাতের দিকে রওনা হলেন। লাখো কণ্ঠের গগনবিদারী ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে দুই পাশের পর্বতমালা কেঁপে উঠল। আরাফাহ ময়দানের পূর্বদিকে নামিরা নামক স্থানে তাঁবু স্থাপন করা হলে, সেখানে পৌঁছে দুপুর পর্যন্ত তথায় তাঁবুতে অবস্থান করেন। জুমার সালাত আদায় করে তিনি ‘কচয়া’ নামক উষ্ট্রীর উপর আরোহন করে আরাফা’র সন্নিকটে ‘আরনা’ প্রান্তরে উপস্থিত হয়ে এ বিশাল সমাবেশে তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজ্বের খুতবা বা ভাষণ প্রদান করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ভাষণ ছিল মূলত আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের চূড়ান্ত ঘোষণা। আর তাই তো সেদিন নাযিল হয়েছিল “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপরে আমার নে‘মতকে পরিপূর্ণ করলাম আর ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম’ (সুরা মায়েদা, আয়াত-৩)।

দীর্ঘ ২৩ বছরে কঠিন সাধনা আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান স্রষ্টার ইচ্ছার স্বরূপে আরব জাহানকে গড়ে তুলেছিলেন। আরাফাত ময়দানে বিদায় হজ্বের ভাষণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল ইসলামের সেই মর্মবানী। ইসলামের প্রকৃত মূল্যবোধ অনুযায়ী মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে এই ভাষণে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা ছিল। ইসলাম ধর্ম যে ধাপে ধাপে ও পর্যায়ক্রমে পূর্ণতা পেয়েছিলো, তারই চূড়ান্ত ঘোষণা ছিলো মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ভাষণ।

এ ভাষণে ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছিলো। মুসলিম জাতির সাফল্যের ধারা বজায় রাখতে মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক ভাষণ কেবল উপাসনামূলক অনুশাসন ছিলো না, বরং মানবসমাজের জন্য করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ভাষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেশও এতে ছিলো।

আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তাঁর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, মানবজাতির ঐক্য, আধ্যাত্মিক ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সাম্য ইত্যাদি সমাজ বিনির্মাণের অন্যতম সব বিষয়ই এই ভাষণের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এই ভাষণে তাকওয়া বা দায়িত্বনিষ্ঠতার কথা গুরুত্ব দেয়া হয়েছিলো এবং পাপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছিলো। আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব বা হক্কুল্লাহ ও মানবসম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ব বা হক্কুল ইবাদের মধ্যে সীমারেখা টেনে দেয়া হয়েছিলো তাঁর এ ভাষনে।

হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ভাষণে সমাজ ও রাষ্ট্রে অরাজকতা, বিদ্রোহ এবং কুপরামর্শ প্রদানকারী শয়তানদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই ভাষণে বিভিন্ন ধরণের সুদপ্রথা রহিত করে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিলো। নারীর পূর্ণ নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকারকে নিশ্চিত করার জন্য মুসলমানদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো এই ভাষণে। মানুষে মানুষে আত্মীয়তার বন্ধন, বিশেষ করে রক্তের সম্পর্কের উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ ও সামাজিক কুসংস্কার থেকে মানুষের মুক্তি লাভের ওপর জোর দেয়া হয়েছিলো। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই ঐতিহাসিক ভাষণে স্বর্গ-মর্তের সকল কিছুর ওপর আল্লাহর কর্তৃত্ব সুনিশ্চিত করা হয়েছিলো এবং মানুষকে এসব কিছুর আমানতদার হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। আল্লাহর মালিকানায় সবার অধিকার স্বীকৃত বলে উত্তরাধিকার আইনের ওপর অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়। আমানতের খেয়ানতকারীর প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা ও মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা বিধানের জন্য কাজ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। সাম্য, স্বাধীনতা, ন্যায়পরায়ণতা, ভ্রাতৃত্ব এবং বদান্যতা ও মানবতার পরম ধর্ম হিসেবে ইসলামকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিলো।

আরাফাতের ময়দানের উক্ত ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেন,

(১) ‘হে জনগণ! তোমরা আমার কথা শোন! কারণ আমি হয়তো এরপর তোমাদের সঙ্গে এই স্থানে আর মিলিত হবনা’।[দারেমী হা/২২৭, ফিক্বহুস সীরাহ পৃঃ ৪৫৬, সনদ ছহীহ।]

(২) ‘নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্ভ্রমকে তোমাদের পরস্পরের উপরে এমনভাবে হারাম, যেমনভাবে আজকের এই দিন, এই মাস, এই শহর তোমাদের জন্য হারাম’ (অর্থাৎ এর সম্মান বিনষ্ট করা হারাম) ।

(৩) ‘শুনে রাখ, জাহেলী যুগের সকল কিছু আমার পায়ের তলে পিষ্ট হ’ল। জাহেলী যুগের সকল রক্তের দাবী পরিত্যক্ত হ’ল। আমাদের রক্ত সমূহের প্রথম যে রক্তের দাবী আমি পরিত্যাগ করছি, সেটি হ’ল রাবী‘আহ ইবনুল হারেছ-এর শিশু পুত্রের রক্ত; যে তখন বনু সা‘দ গোত্রে দুগ্ধ পান করছিল, আর হোযায়েল গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করেছিল’।


(৪) “জাহেলী যুগের সূদপ্রথা পরিত্যক্ত হ’ল। আমাদের সূদ সমূহের প্রথম যে সূদ আমি পরিত্যক্ত বলে ঘোষনা দিচ্ছি সেটা হ’ল আববাস ইবনু আব্দিল মুত্ত্বালিবের পাওনা সূদ। সূদের সকল প্রকার কারবার সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত করে দেওয়া হ’ল।”

(৫) ‘তোমরা মহিলাদের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় কর। কেননা তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসাবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে তাদেরকে হালাল করেছ। তাদের উপর তোমাদের প্রাপ্য হ’ল, তারা যেন তোমাদের বিছানা এমন কাউকে মাড়াতে না দেয়, যাদেরকে তোমরা অপছন্দ কর। যদি তারা সেটা করে, তবে তোমরা তাদের মৃদু প্রহার করবে, যা গুরুতর হবে না। আর তোমাদের উপরে তাদের প্রাপ্য হক হ’ল, তোমরা যেন তাদের জন্য সুন্দর রূপে খাদ্য ও পরিধেয়ের যোগান দাও।

(৬) ‘আর জেনে রাখ, আমি তোমাদের মাঝে রেখে যাচ্ছি এমন এক বস্ত্ত, যা মযবুতভাবে ধারণ করলে তোমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না। আর সেটি হ’ল আল্লাহর কেতাব’।[মুসলিম হা/১২১৮, মিশকাত হা/২৫৫৫ ‘মানাসিক’ অধ্যায়।]

(৭) ‘হে জনগণ! শুনে রাখ আমার পরে কোন নবী নেই এবং তোমাদের পরে আর কোন উম্মাত নেই। অতএব তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ইবাদত কর, পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় কর, রামাযান মাসের রোযা রাখো, সন্তুষ্ট চিত্তে তোমাদের মালের যাকাত দাও, তোমাদের প্রভুর গৃহে হজ্জ আদায় কর, তোমাদের শাসকদের আনুগত্য কর, এ সবের মাধ্যমে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের জান্নাতে প্রবেশ কর’।[ত্বাবারাণী, আহমাদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৫৭১; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৩২৩৩।]

(৮) আর তোমরা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। তখন তোমরা কি বলবে? লোকেরা বলল, আমরা সাক্ষ্য দেব যে, আপনি সবকিছু পৌছে দিয়েছেন, দাওয়াতের হক আদায় করেছেন এবং উপদেশ দিয়েছেন’। অতঃপর তিনি শাহাদাত অঙ্গুলি আসমানের দিকে উঁচু করে ও সমবেত জনমন্ডলীর দিকে নীচু করে তিনবার বললেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক’।[মুসলিম, মিশকাত হা/২৫৫৫।]

ইসলামের পূর্ণাঙ্গতার সনদ নাযিল :
————————————
সারগর্ভ ও মর্মস্পর্শী বিদায়ী ভাষণ শেষে আল্লাহর পক্ষ হ’তে নাযিল হয় এক ঐতিহাসিক দলীল, ইসলামের পূর্ণতার সনদ, যা ইতিপূর্বে নাযিলকৃত কোন এলাহী ধর্মের জন্য নাযিল হয়নি। ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপরে আমার নে‘মতকে পরিপূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম’ (মায়েদাহ-৩)।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে এই আয়াত শ্রবণ করে ওমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু আনহু কেঁদে উঠলেন। অতঃপর লোকদের প্রশ্নের জওয়াবে বললেন, ‘পূর্ণতার পরে তো কেবল ঘাটতিই এসে থাকে’।[আর-রাহীক্ব পৃঃ ৪৬০; আল-বিদায়াহ ৫/২১৫।]

বস্তুতঃ এই আয়াত আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের আভাস, এ আয়াত নাযিলের মাত্র ৮১ দিন পর তিনি ওফাত লাভ করেন। এই আয়াত প্রসঙ্গে জনৈক ইহুদী পন্ডিত হযরত ওমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, যদি এরূপ আয়াত আমাদের উপর নাযিল হ’ত, তাহ’লে আমরা ঐদিনটিকে ঈদের দিন হিসাবে উদযাপন করতাম’। জওয়াবে ওমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ঐদিনে একটি নয়, বরং দু’টি ঈদ একসঙ্গে উদযাপন করেছিলাম।- (১) ঐদিন ছিল শুক্রবার, যা আমাদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন (২) ঐদিন ছিল ৯ই যিলহাজ্জ আরাফাহর দিন। যা হ’ল উম্মতের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে বার্ষিক ঈদের দিন’।[তিরমিযী হা/৩০৪৪, সনদ ছহীহ।]

মিনায় ২য় ভাষণ:
——————
সুনানে আবুদাঊদের বর্ণনা অনুযায়ী ১০ই যিলহাজ্জ কুরবানীর দিন সকালে সূর্য উপরে উঠলে[আবুদাঊদ, মিশকাত হা/২৬৭১।] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি সাদা-কালো মিশ্রিত বাহনে সওয়ার হয়ে (কংকর নিক্ষেপের পর) জামরায়ে আক্বাবায় এক ভাষণ দেন।

ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, এদিনে তিনি বলেন,

(১) হে জনগণ! তোমরা আমার নিকট থেকে হজ্জ ও কুরবানীর নিয়ম-কানূন শিখে নাও। কারণ আমি এ বছরের পর আর হজ্জ করতে পারব না’।[মুসলিম, মিশকাত হা/২৬১৮।] তিনি আরও বলেন,

(২) ‘কালচক্র আপন রূপে আবর্তিত হয়, যেদিন থেকে আসমান ও যমীন সৃষ্টি হয়েছে। বছর বারো মাসে হয়। তারমধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস। তিনটি পরপর, যুলক্বা‘দাহ, যুলহিজ্জাহ ও মুহাররম এবং রজবে মুদার’[মুদার গোত্রের দিকে সম্পর্কিত করে ‘রজবে মুদার’ বলা হয়েছে।] হ’ল জুমাদা ও শা‘বানের মধ্যবর্তী।[বুখারী হা/১৭৪১ ‘মিনায় ভাষণ’ অনুচ্ছেদ; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৬৫৯।] অতঃপর তিনি বলেন,

(৩) এটি কোন মাস? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক অবগত। অতঃপর তিনি চুপ থাকলেন। আমরা ভাবলাম হয়ত তিনি এর পরিবর্তে অন্য কোন নাম রাখবেন। তিনি বললেন, এটা কি যুলহিজ্জাহ নয়? আমরা বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, এটি কোন শহর? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক অবগত। অতঃপর তিনি চুপ থাকলেন। আমরা ভাবলাম হয়ত তিনি এর পরিবর্তে অন্য কোন নাম রাখবেন। তিনি বললেন, এটা কি মক্কা নয়? আমরা বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আজ কোন দিন? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক অবগত। অতঃপর তিনি চুপ থাকলেন। আমরা ভাবলাম হয়ত তিনি এর পরিবর্তে অন্য কোন নাম রাখবেন। তিনি বললেন, আজ কি কুরবানীর দিন নয়? আমরা বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, জেনে রেখ, তোমাদের রক্ত, তোমাদের মাল-সম্পদ, তোমাদের ইয্যত তোমাদের উপর এমনভাবে হারাম যেমনভাবে তোমাদের আজকের এই দিন, এই শহর, এই মাস তোমাদের জন্য হারাম (অর্থাৎ এর সম্মান বিনষ্ট করা হারাম)।

(৪) ‘সত্বর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সাথে মিলিত হবে। অতঃপর তিনি তোমাদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। সাবধান! আমার পরে তোমরা পুনরায় ভ্রষ্টতার দিকে ফিরে যেয়ো না এবং একে অপরের গর্দান মেরো না বা হত্যা করোনা।

(৫) ‘ওহে জনগণ! আমি কি পৌঁছে দিয়েছি? লোকেরা বলল, হাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক। উপস্থিতগণ যেন অনুপস্থিতগণকে কথাগুলি পৌঁছে দেয়। কেননা উপস্থিত শ্রোতাদের অনেকের চাইতে অনুপস্থিত যাদের কাছে এগুলি পৌঁছানো হবে, তাদের মধ্যে অনেকে অধিক বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি রয়েছে’।[বুখারী হা/১৭৪১ ‘মিনায় ভাষণ’ অনুচ্ছেদ; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/২৬৫৯।]
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, উক্ত ভাষণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছিলেন,

(৬) ‘মনে রেখ, অপরাধের শাস্তি অপরাধী ব্যতীত অন্যের উপরে বর্তাবে না। মনে রেখ, পিতার অপরাধের শাস্তি পুত্রের উপরে এবং পুত্রের অপরাধের শাস্তি পিতার উপরে বর্তাবে না’।

(৭) মনে রেখ, শয়তান তোমাদের এই শহরে পূজা পাওয়া থেকে চিরদিনের মত নিরাশ হয়ে গেছে। তবে যেসব কাজগুলিকে তোমরা তুচ্ছ মনে কর, সেসব কাজে তার আনুগত্য করা হবে, আর তাতেই সে খুশী থাকবে’।[তিরমিযী হা/২১৫৯; ইবনু মাজাহ হা/২৭৭১ ‘হজ্জ’ অধ্যায়; মিশকাত হ/২৬৭০।]

এদিন তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, ‘আমি তোমাদের মাঝে দু’টি বস্ত্ত রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা তা শক্তভাবে ধারণ করে থাকবে, ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। একটি আল্লাহর কিতাব, অপরটি তাঁর নবীর সুন্নাত’।[মুওয়াত্ত্বা মালেক, মিশকাত হা/১৮৬।]

খুম কূয়ার নিকটে ভাষণ:
———————-
হজ্জ থেকে ফেরার পথে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী ‘খুম’ নামক কূয়ার নিকটে যাত্রাবিরতি করে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। যাতে তিনি নবী পরিবারের উচ্চ মর্যাদা ব্যাখ্যা করেন। অতঃপর হযরত আলীর হাত ধরে বলেন, ‘আমি যার বন্ধু, আলীও তার বন্ধু’।[আহমাদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৬০৮২, ছহীহাহ হা/১৭৫০।]
وصلى الله وسلم على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه اجمعين