মাদকাসক্তি ও আমাদের করণীয়-১ | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস


জুমার খুতবা
৩য় জুমা, জুমাদা আল উলা, ১৪৩৮
বিষয়: মাদকাসক্তি ও আমাদের করণীয়-১
সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী
খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

بسم الله الرحمن الرحيم. الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين وعلى آله وصحبه أجمعين. أما بعد!

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য। দরূদ ও সালাম নবী ও রাসূলগনের সর্বশ্রেষ্ঠ আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি।

মানবসভ্যতার প্রতি মারাত্মক হুমকি সৃষ্টিকারী অন্যতম অভিশাপ মাদকাসক্তি। মাদকদ্রব্যের নেশার ছোবল এমনই ভয়ানক যে তা ব্যক্তিকে পরিবার, সমাজ, দেশ থেকেই বিচ্ছিন্ন করে না; তার সমগ্র জীবন ধ্বংস করে দেয়। মাদক কেবল সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্রেরই ক্ষতি করে না; সভ্যতা ও সংস্কৃতিকেও বিপন্ন করে।

কুরআনে মাদকদ্রব্যের আরবী শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ‘খামর’ বা ‘খিমার’ শব্দটি, যার অর্থ আবৃত করা, আচ্ছাদিত করা বা ঢেকে ফেলা। হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন- “মদ হচ্ছে তাই, যা মানেুষর বিবেক বা বোধশক্তিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে বা বিবেককে ঢেকে দেয়” (বুখারী -৪৬১৯)।

আর বিবেক হচ্ছে সেই জিনিষ যা ভাল-মন্দের পার্থক্য নির্ধারণে সহায়তা করে। যখন একজন মানুষ মদ বা নেশা জাতিয় জিনিষ পান করে বা খায় তার মস্তিষ্ক প্রায় অচল হয়ে পড়ে। নেশার রাজ্যে রকমারি অপকর্ম করতে সে এতোই ব্যস্ত থাকে যে তার সাথে জাগ্রত মন- মেজাজের যোগাযোগ থাকেনা। ফলে ঠিক বা বেঠিকের পার্থক্য গোচরীভুত হয়না। এই সময়টার জন্য শয়তান অপেক্ষা করে, তখন শয়তান তাকে দিয়ে যা ইচ্ছা করিয়ে নিতে পারে।

অতএব মদ্যপানের ফলে বিবেক যখন আচ্ছন্ন হয়ে যায় তখন মানুষ যেকোন ধরনের অন্যায়, অশ্লীল ও মন্দ কাজ করতে পারে এবং এতে সে বিন্দুমাত্র দ্বিধান্বিতবোধ করে না

মাদক কেবল একক অপরাধ নয়, মাদকাসক্তির সঙ্গে সন্ত্রাস ও অন্যান্য অপরাধ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে মানুষের অন্তরে মাদকের ক্ষতির অনুভূতি জাগ্রত করে রাসুলে করিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘তোমরা মাদক ও নেশা থেকে দূরে থাক, কেননা এটা সব অপকর্ম ও অশ্লীলতার মূল। আর কোনো নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি ঈমানদার হতে পারে না।’ (মুসলিম)

রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ব্যভিচারী যে সময় ব্যভিচার করে সে সময় সে মুমিন থাকে না, চোর যখন চুরি করে তখন সে মুমিন থাকে না এবং মদ্যপানকারী যখন মদ্যপান করে তখন সে মুমিন থাকে না।’’ (বুখারী)

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ‘যে ব্যক্তি দুনিয়ার শরাব পান করবে, সে পরকালে জান্নাতের শারাবান তহুরা থেকে বঞ্চিত থাকবে।’ (বুখারী, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজা)

মাদকদ্রব্য বলতে কেবলমাত্র মদ নামে প্রচলিত দ্রব্যাদিকে বুঝায় না। নেশা জাতীয় সকল দ্রব্য এর অধীন। পরিমাণে অল্প হোক আর বেশি হোক-পান বা অন্য কোনোভাবে গ্রহণ করা হোক, নেশা ও চিত্ত-বিভ্রমক হলেই তা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “সমস্ত নেশাকারী বস্তু মদ আর প্রত্যেক নেশাকারী বস্তু হারাম।” (মুসলিম হা/৩৭৩৩)

তিনি আরো বলেনঃ “যে সমস্ত পানীয় নেশাকারী তা হারাম।” (বুখারী হা/২৩৫, মুসলিম হা/৩৭২৭) তিনি আরো বলেনঃ “যার অধিক সেবন নেশা নিয়ে আসে তার অল্পও হারাম।” (আবু দাউদ হা/৩১৯৬ তিরমিযী হা/ ১৭৮৮ ইবনু মাজাহ্ হা/ ৩৩৮৪)

মানবজাতির ভাল বা মন্দ কিসে নিহিত আছে তা স্রষ্টা মহান আল্লাহতায়ালা ভালভাবেই জানেন। তাই তিনি সকল মন্দ থেকে বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে বার বার সাবধান করে দিয়েছেন। বর্তমানে মাদকাসক্তি একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে, যা সমাজ তথা গোটা জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সর্বনাশা নেশার কবলে পড়ে যে অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে এবং সমাজে অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

মাদকাসক্ত অবস্থায় এবং নেশার চাহিদা মেটাতে গিয়ে একজন মানুষ বিবেকশুন্য হয়ে যায়। তখন সে অতি সহজেই চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাই, যেনা ও ব্যভিচার সহ নানা রকম অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়। ফলে একদিকে যেমন সমাজের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ছে, তেমনি লাগামহীন অবৈধ সম্পর্ক এবং ‘এইড্স্’ সহ নানা রকম সংক্রামক রোগের প্রকোপ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তাই এগুলোকে ঘৃন্যবস্তু ও শয়তানের কাজ বলা হয়েছে।

“হে বিশ্বাসিগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃন্যবস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায়, এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণে ও নামাজে বাধা দিতে চায়। অতএব তোমরা কি নিবৃত হবে না [সূরা মায়েদা:৯০-৯১]

এ জন্য রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মদ পান করো না। কেননা তা সকল অপকর্মের চাবিকাঠি”। (মুসতাদরাক-৭৩১৩) অন্য হাদীছে এসেছে, “তোমরা মদ থেকে বেঁচে থাক। কেননা তা অশ্লীল কাজের মূল”(নাসায়ী-৩১৭)

মাদকের করাল গ্রাসে তরুণ সমাজ আজ সৃষ্টিশীল ও সৃজনশীল কাজে মেধা, যোগ্যতা, প্রজ্ঞার আশানুরূপ অবদান রাখতে পারছে না। উপরন্তু কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্ব ও জাকাতসহ আল্লাহ তায়ালার বিধিবদ্ধ দৈহিক ও আর্থিক ইবাদত থেকে দূরে রাখছে এবং পাপাচারে লিপ্ত করছে।

এ মর্মে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই শয়তান মদ ও জুয়ার দ্বারা তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখতে চায়, তবু কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না?’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত-৯১)

অতএব এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে মদ ও মদ্যপানকারীর আচরনের কুপ্রভাবে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের বৈরিতা সৃষ্টি করে যার ফলে পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা, কলহ-বিবাদ ও হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। তাছাড়া আথর্-সামাজিক বাস্তবতায় দেখা যায় যে সমাজের মধ্যে যে বড় বড় অপরাধগুলো যেমন খুন, ছিনতাই, রাহাজানি, ধর্ষণ ইত্যাদি সংগঠিত হয়, তার সাথে সম্পৃক্ত অপরাধীদের একটি বড় অংশ মাদকাসক্তের সাথে জড়িত।

মদ্যপান ও মাদকদ্রব্য সেবন জটিল ও প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করে যা আমাদেরকে অনেক ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে আতœহননের দিকে ঠেলে দেয়। আল্লাহ তা’আলা হলেন আমাদের জীবনের মালিক এবং মানুষ হিসেবে আমদের জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়াকে আল্লাহ তা’আলা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- “তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না” (সূরা বাকারা- ১৯৫)। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না। (সুরা নিসা-২৯)।

মদের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রতি রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর অভিসম্পাত: শুধু মদ্যপায়ী ও বিক্রেতা নয়, বরং মদ ও মাদকদ্রব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ১০ (দশ) শ্রেণীর লোকের প্রতি রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অভিশাপ করেছেন।। তারা হলো-১. মদপানকারী, ২. মাদক প্রস্তুতকারক ৩. মাদক প্রস্তুতের উপদেষ্টা, ৪. মাদক বহনকারী, ৫. যার কাছে মাদক বহন করা হয় ৬. যে মাদক পান করায়, ৭. মাদকবিক্রেতা, ৮. মাদকের মূল্য গ্রহণকারী ৯. মাদক ক্রয়-বিক্রয়কারী, ১০. যার জন্য মাদক ক্রয় করা হয় (তিরমিজি)

এখানেই শেষ নয়, মাদকদ্রব্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা তো চরম অপরাধ ও নিষিদ্ধই, এমনকি যে মজলিশে মাদক সেবন করা হয়, সে মজলিশে উপস্থিত থাকাও নিষিদ্ধ ও চরম ঘৃণ্য। এ ব্যাপারে রহমতের নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছে, কঠোর হুঁশিয়ারি। (চলবে)

وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين. والحمد لله رب العالمين.