নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র বংশ ও তাঁর মাতা-পিতা | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

জুমার খুতবা
*******************
৪র্থ জুমা, ছফর ১৪৩৯ হি: নভেম্বর- ২০১৭
বিষয়: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র বংশ ও তাঁর মাতা-পিতা।
সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী
খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। লেকচারার, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
بسم الله الرحمن الرحيم. الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين وعلى آله وصحبه أجمعين. أما بعد!

সম্মানিত মুসল্লীগন! আজ আমরা আমাদের প্রিয় নবী, বিশ্বনবী, নবীদের নবী, শেষ নবী, সারা সৃষ্টিকূলের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র বংশ পরিচয় আপনাদের খেদমতে উপস্থাপন করবো, ইন্শা আল্লাহ্। প্রতিটি মুসলমান তো বটেই প্রতিটি মানুষেরই জানা উচিত বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশ পরিচয় কী?। আমাদের উচিত হচ্ছে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে সঠিক পরিচিতি অর্জন করা। তিনি মানব ও জ্বিন জাতিসহ সকল সৃষ্টির মধ্য হতে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। তাঁকে সৃষ্টি করা না হলে পৃথিবীর কোন কিছু সৃষ্টি করা হত না। তাঁর নুর হতে পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করা হয়েছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বপ্রথম সৃষ্টি। তাঁর পূর্বে আল্লাহ তায়ালা কোন কিছু সৃষ্টি করেননি। হযরত আদম আলাহিস সালামও তাঁকে অসিলা করে দোয়া করেছেন। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ كُنْتُ نَبِيًّا وَآدَمُ بَيْنَ الْمَاءِ وَالطِّينِ আমি তখনও নবী ছিলাম যখন আদম পানি ও মাটির মাধ্যে মিশ্রিত ছিলেন। (আল কাফি; খঃ ১, পৃঃ ৪০০।)

عن ميسرة الفجرِ، قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَتَى كُتِبْتَ نَبِيًّا؟ قَالَ: ্রوآدَمُ بَيْنَ الرُّوحِ وَالْجَسَدِগ্ধأخرجه الطبراني في الكبير (৮৩৩-৮৩৪) وأحمد في المسند (২০৫৯৬) وابن أبي عاصم في السنة (৪১০) والفريابي في القدر (১৭) والآجري في الشريعة (৯৪৩-৯৪৪-৯৪৫ وأخرجه الحاكم في المستدرك (৪২০৯) وقال ((هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحُ الْإِسْنَادِ وَلَمْ يُخَرِّجَاهُ وَشَاهِدُهُ حَدِيثُ الْأَوْزَاعِيِّ الَّذِي)) ووافقه الذهبي.والحديث ذكره الهيثمي في مجمع الزوائد (১৩৮৪৮) وقال ((رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالطَّبَرَانِيُّ، وَرِجَالُهُ رِجَالُ الصَّحِيحِ)).عن عبد الله بن شقيق، عن رجلقَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَتَى جُعِلْتَ نَبِيًّا؟ قَالَ: ্রوَآدَمُ بَيْنَ الرُّوحِ وَالْجَسَدِগ্ধأخرجه أحمد في المسند (১৬৬২৩- ২৩২১২) وابن أبي عاصم في الآحاد والمثاني (২৯১৮) وابن أبي شيبة في المصنف (৩৬৫৫৩) وابن بطة في الإبانة (১৮৯৩) وهو أيضا أخرجه الهيثمي (১৩৮৪৯) وقال ((رَوَاهُ أَحْمَدُ، وَرِجَالُهُ رِجَالُ الصَّحِيحِ)) انتهى.
শুধু আদম আলাহিস সালাম নন; রবং সকল নবী-রাসূল তাঁকে অসিলা করে দোয়া করেছেন ও সমস্যার সমাধান পেয়েছেন।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র বংশ সারা দুনিয়ার সব বংশাবলী থেকে অতি পবিত্র ও সম্ভ্রান্ত, সারা বিশ্বের সেরা ও উত্তম বংশ। তা এমনি একটি বাস্তব সত্য কথা যে, আপন পর সবাই অকপটে তা স্বীকার করত। তাঁর চরম দুশমন ও মক্কার কাফেরকুলও তা অমান্য করতে পারেনি। রোমের বাদশাহর সামনে হযরত আবু সুফিয়ান রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কাফের থাকাবস্থায় তা স্বীকার করেছিলেন ও বলেছিলেন,
قَالَ كَيْفَ نَسَبُهُ فِيكُمْ؟، قُلْتُ هُوَ فِينَا ذُو نَسَبٍ
“তিনি আমাদের মধ্যে উচ্চ বংশীয় ব্যক্তি। বংশ গৌরব ও আভিজাত্যে কেউ তাঁর তুল্য নয়। তখন রোম সম্রাট হিরাকল বলেছিলেনঃ
فَقَالَ لِلتَّرْجُمَانِ قُلْ لَهُ سَأَلْتُكَ عَنْ نَسَبِهِ فَذَكَرْتَ أَنَّهُ فِيكُمْ ذُو نَسَبٍ فَكَذَلِكَ الرُّسُلُ تُبْعَثُ فِي نَسَبِ قَوْمِهَا. ((صحيح البخاري – بدء الوحي (৭)صحيح مسلم – الجهاد والسير (১৭৭৩) سنن الترمذي – الاستئذان والآداب (২৭১৭) سنن أبي داود – الأدب (৫১৩৬
“তেমনি নবী রসূলগণ সর্বোচ্চ বংশ ও গোত্রে প্রেরীত হয়ে থাকেন। “
অথচ তিনি তখন চেয়েছিলেন যে, যদি কোন সুযোগ-সুবিধা হয়ে যায়, তাহলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কোন প্রকার দোষারোপ করবেন। নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও বলেছেনঃ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ , قَالَ : ” بُعِثْتُ مِنْ خَيْرِ قُرُونِ بَنِي آدَمَ قَرْنًا فَقَرْنًا حَتَّى كُنْتُ فِي الْقَرْنِ الَّذِي كُنْتُ فِيهِ ” . صحيح البخاري – المناقب (৩৩৬৪) مسند أحمد – باقي مسند المكثرين (২/৩৭৩) مسند أحمد – باقي مسند المكثرين (২/৪১৭)
“আমি বনী আদমের সর্বোত্তম বংশে প্রেরীত হয়েছি। আমার যুগই সর্বশেষ্ঠ যুগ। “(সহীহ আল বুখারীঃ ৪/১৫১) আল্লাহ তাআলা তাঁর সর্বোচ্চ বংশো™ু¢ত হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেনঃ اللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ ۗ “আল্লাহ তাঁর রিসালত বা পয়গামের দায়িত্ব কাকে দিচ্ছেন সে ব্যাপারে অনেক জ্ঞাত। “ (সূরা আন আমঃ ১২৪)
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা নিজেও বহুবার আপন যবানে পাকে আপন বংশপরিচয় দিয়ে ইরশাদ করেছেন,
خَطَبَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ : ” أَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ بْنِ هَاشِمِ بْنِ عَبْدِ مَنَافِ بْنِ قُصَيِّ بْنِ كِلابِ بْنِ مُرَّةَ بْنِ كَعْبِ بْنِ لُؤَيِّ بْنِ غَالِبِ بْنِ فِهْرِ بْنِ مَالِكِ بْنِ النَّضْرِ بْنِ كِنَانَةَ بْنِ خُزَيْمَةَ بْنِ مُدْرَكَةَ بْنِ إِلْيَاسَ بْنِ مُضَرَ بْنِ نِزَارٍ ، وَمَا افْتَرَقَ النَّاسُ فِرْقَتَيْنِ إِلا جَعَلَنِي اللَّهُ فِي الْخَيْرِ مِنْهُمَا حَتَّى خَرَجْتُ مِنْ بَيْنِ أَبَوَيْنِ ، وَلَمْ يُصِبْنِي مِنْ زَعْمِ الْجَاهِلِيَّةِ ، وَخَرَجْتُ مِنْ نَكَاحٍ وَلَمْ أَخْرُجْ مِنْ سِفَاحٍ مِنْ لَدُنَّ آدَمَ حَتَّى انْتَهَيْتُ إِلَى أَبِي وَأُمِّي ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ نَفْسًا وَخَيْرُكُمْ أَبًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ” .( دلائل النبوة للبيهقي, رقم الحديث১০০تاريخ دمشق لابن عساكر, رقم الحديث-১৪২৯معرفة علوم الحديث للحاكم গ্ধ ذِكْرُ النَّوْعِ التَّاسِعِ وَالثَّلاثِينَ مِنْ مَعْرِفَةِ … رقم الحديث: ৩৬০)
“আমি হলাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দিল্লাহ ইবনে আব্দিল মুত্তালিব ইবনে হাশিম ইবনে আবদে মানাফ“। অনুরুপভাবে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা কখনো কখনো ‘আদনান’ পর্যন্ত নিজের বংশ সূত্র বর্ণনা করেছেন।

হযরত আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা বলেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার কোন কারণে মিম্বরে দাঁড়িয়ে সমবেত লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন-

عَنِ الْمُطَّلِبِ بْنِ أَبِي وَدَاعَةَ ، قَالَ : قَالَ الْعَبَّاسُ : بَلَغَهُ صلى الله عليه وسلم بَعْضُ مَا يَقُولُ النَّاسُ ، قَالَ : فَصَعِدَ الْمِنْبَرَ ، فَقَالَ : مَنْ أَنَا ؟ قَالُوا : أَنْتَ رَسُولُ اللهِ ، فَقَالَ : أَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ ، إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ الْخَلْقَ فَجَعَلَنِي فِي خَيْرِ خَلْقِهِ ، وَجَعَلَهُمْ فِرْقَتَيْنِ ، فَجَعَلَنِي فِي خَيْرِ فِرْقَةٍ ، وَخَلَقَ الْقَبَائِلَ ، فَجَعَلَنِي فِي خَيْرِ قَبِيلَةٍ ، وَجَعَلَهُمْ بُيُوتًا ، فَجَعَلَنِي فِي خَيْرِهِمْ بَيْتًا ، فَأَنَا خَيْرُكُمْ بَيْتًا وَخَيْرُكُمْ نَفْسًا.
عَنْ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ بْنِ رَبِيعَةَ بْنِ الْحَارِثِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ قَالَ : أَتَى نَاسٌ مِنَ الأَنْصَارِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم، فَقَالُوا : إِنَّا نَسْمَعُ مِنْ قَوْمِكَ حَتَّى يَقُولَ الْقَائِلُ مِنْهُمْ : إِنَّمَا مِثْلُ مُحَمَّدٍ مِثْلُ نَخْلَةٍ نَبَتَتْ فِي كِبَا – قَالَ حُسَيْنٌ : الْكِبَا : الْكُنَاسَةُ – . فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَيُّهَا النَّاسُ ، مَنْ أَنَا ؟ . قَالُوا : أَنْتَ رَسُولُ اللهِ . قَالَ : أَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ – قَالَ: فَمَا سَمِعْنَاهُ قَطُّ يَنْتَمِي قَبْلَهَا – أَلاَ إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ خَلْقَهُ ، فَجَعَلَنِي مِنْ خَيْرِ خَلْقِهِ ، ثُمَّ فَرَّقَهُمْ فِرْقَتَيْنِ فَجَعَلَنِي مِنْ خَيْرِ الْفِرْقَتَيْنِ ، ثُمَّ جَعَلَهُمْ قَبَائِلَ فَجَعَلَنِي مِنْ خَيْرِهِمْ قَبِيلَةً ، ثُمَّ جَعَلَهُمْ بُيُوتًا ، فَجَعَلَنِي مِنْ خَيْرِهِمْ بَيْتًا ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ بَيْتًا وَخَيْرُكُمْ نَفْسًا.
تحفة الأحوذي (ج ৯ / ص ১৪) (২) (ت) ৩৬০৭ (৩) (ت) ৩৫৩২ (৪) (حم) ১৭৮৮ , (ت) ৩৬০৭ , صحيح الجامع: ১৪৭২ , صحيح السيرة ص১১ , وقال الشيخ شعيب الأرناؤوط: حسن لغيره.
আমি কে? সাহাবীগণ বললেন- আপনি আল্লাহর রাসূল, আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তখন তিনি বললেন- আমি আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিবের ছেলে মুহাম্মদ। আল্লাহ তাআলা তামাম মাখলূক সৃষ্টি করে আমাকে সর্বোত্তম সৃষ্টির অন্তর্ভূক্ত করেছেন অর্থাৎ মানুষ বানিয়েছেন। এরপর তাদেরকে দু’ভাগে আরব ও অনারবে বিভক্ত করে আমাকে উত্তম ভাগে আরবে রেখেছেন এবং আমাকে তাদের মধ্যে সর্বোত্তম গোত্রে পাঠিয়েছেন। এরপর সে গোত্রকে বিভিন্ন পরিবারে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে সর্বোত্তম পরিবারে প্রেরণ করেছেন। সুতরাং আমি ব্যক্তি ও বংশ সর্বদিক থেকে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। {সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং-৩৫৩২, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৭৮৮, আল মু’জামুল কাবীর, হাদীস নং-৬৭৫, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-৩২২৯৬}

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهَا ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : ” قَالَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ : قَلَّبْتُ مَشَارِقَ الْأَرْضِ وَمَغَارِبَهَا فَلَمْ أَجِدْ رَجُلًا أَفْضَلَ مِنْ مُحَمَّدٍ ، وَقَلَّبْتُ مَشَارِقَ الْأَرْضِ وَمَغَارِبَهَا فَلَمْ أَجِدْ بَيْتًا أَفْضَلَ مِنْ بَنِي هَاشِمٍ “( الأمالي المطلقة لابن حجر গ্ধ قلبت مشارق الأرض ومغاربها فلم أجد رجلا أفضل من محمد …رقم الحديث৬৬, الشفا ১/১৬৬ الشفاء ১ / ১৬৬ . مجمع الزوائد ৭ / ২১৮ ،ينابيع المودة لذوي القربى – القندوزي ج ১ ص ৬১)
হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম স্বয়ং বর্ণনা করেছেন, আমি সমগ্র জাহান তদন্ত করে দেখলাম, আমি কোথাও হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা অপেক্ষা উত্তম পূরুষ দেখিনি, তাঁর বংশ ও গোত্র অপেক্ষা উত্তম কোন বংশ বা গোত্র আমার নজরে পরেনি, আর বনূ হাশেম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কোন গোত্রই আমি দেখিনি।(তাবরানী শরীফ, মাওয়াহিব,দালায়েলে আবু নাঈম)
হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম যেই বনূ হাশেম গোত্র সম্পর্কে “সেটাই সর্বোচ্চ বংশ ও গোত্র“ বলে মন্তব্য করেছেন, বাস্তবতাও যে বংশের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। সেই উচ্চতর বংশেই আমাদের আক্বা ও মাওলা বিশ্বকূল সরদার হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বেলাদত শরীফ হয়েছে। রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ , قَالَ : ” بُعِثْتُ مِنْ خَيْرِ قُرُونِ بَنِي آدَمَ قَرْنًا فَقَرْنًا حَتَّى كُنْتُ فِي الْقَرْنِ الَّذِي كُنْتُ فِيهِ ” . صحيح البخاري – المناقب (৩৩৬৪) مسند أحمد – باقي مسند المكثرين (২/৩৭৩) مسند أحمد – باقي مسند المكثرين (২/৪১৭)
“যুগে যুগে মানব সমাজের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বংশ পরস্পরায় আমি প্রেরিত হয়েছি। অবশেষে যে যুগের মানব বংশে আমি এসেছি তাও শ্রেষ্ঠ। “
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ,
لم يلتق أبواي قط على سفاح، لم يزل الله ينقلني من الأصلاب الطيبة إلى الأرحام الطاهرة، مصفى مهذبًا، لا تتشعب شعبتان إلا كنت في خيرهما”.
السيوطي – الدر المنثور – الجزء : ( ৫ ) – رقم الصفحة : ( ৯৮ ) أخرجه أبو نعيم ( ১ / ১১ – ১২ )
“আমার পিতা ও মাতাগণ কখনো যিনা বা ব্যভিচারে লিপ্ত হননি। সর্বদা মহান আল্লাহ পাক আমাকে পবিত্র পৃষ্ঠ মুবারক হতে পবিত্রা রেহেম শরীফে পবিত্রভাবে স্থানান্তরিত করেন। যখন দু’টি শাখা বের হতো অর্থাৎ দু’টি সন্তান জন্ম নিত, তখন আমি দু’টি শাখার মধ্যে যে শাখাটি উত্তম বা দু’টি সন্তানের মধ্যে যে সন্তানটি উত্তম তার পৃষ্ঠে বা রেহেম স্থান নিতাম।”
عن واثلة بن الأسقع – رضي الله عنه – قال: قال رسول الله – صلى الله عليه وسلم -: ” قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ اصْطَفَى كِنَانَةَ مِنْ وَلَدِ إِسْمَاعِيلَ ، وَاصْطَفَى مِنْ كِنَانَةَ قُرَيْشًا ، وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِي هَاشِمٍ ، وَاصْطَفَانِي مِنْ بَنِي هَاشِمٍ ”
(ت) ৩৬০৫ , (م) ১ – (২২৭৬) , (حم) ১৭০২৭) أخرجه مسلمٌ ( ২২৭৬ / ১) ، والبخاري في ( التاريخ الكبير ) ( ১/ ১/ ৪) ، والترمذي ( ৩৬০৫ ، ৩৬০৬) ، وأحمد (৪/ ১০৭) ، وابنُ أبي شيبة ( ১১ / ৪৭৮) ، وابن سعد في ( الطبقات ) (১/ ২০) ، والطبراني في ( الكبير ) ( ج২২/ رقم ১৬১ ) ، والبيهقي في ( السنن الكبير) (৭ / ১৩৪) ، وفي ( الدلائل) (১/ ১৬৫) ، والخطيب ( ১৩ / ৬৪) ، واللالكائي في ( شرح الأصول ) (১৪০০) ، والجوزقاني في ( الأباطيل ) (১/ ১৭০) ، والبغوي في ( شرح السنة ) ( ১৩ ، ১৯৪ ) من طريق الأوزاعي ، حدثني أبو عمار شداد ، عن واثلة بن الأسقع مرفوعًا به ، والله أعلم .
হযরত রাসূলে মাকবুল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ফরমান, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ইসমাঈল আলায়হিস সালামের সন্তানদের মধ্যে বণী কেনানাকে পছন্দ করেছেন। আর বণী কেনানা থেকে কুরাইশকে, আর কুরাইশ থেকে বণী হাশিমকে, আর বণী হাশিম থেকে আমাকে পছন্দ করেছেন।” ইবনে সাদের এক মুরসাল বর্ণনায় এতটুকু অতিরিক্ত রয়েছে যে, “বণী হাশিম থেকে আব্দুল মুত্তালিবকে পছন্দ করেছেন।” (মুসলিম-২২৭৬, তিরমীজি-৩৬০৬,মুসনাদে আহমাদ-১৬৯৮৬ ও ৮/১০৭, হা/ ১৭১১১,মিশকাত শরীফ*ফাযায়েলে সৈয়্যদিল মুরসালিন অধ্যায়)
হযরত আদম আলাহিস সালাম থেকে শুরু করে রসূল কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাতা পিতা পর্যন্ত নারী পুরুষের যতগুলি স্তর রয়েছে প্রত্যেক স্তরের প্রতিটি নারী ও পুরুষ সৎ ও পবিত্র ছিলেন। কেউ কখনো ব্যবিচারে লিপ্ত হননি। রসূল কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
عَنْ جعفر ، عَنْ أَبِيهِ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” خَرَجْتُ مِنْ نِكَاحٍ ، وَلَمْ أَخْرُجْ مِنْ سِفَاحٍ ، مِنْ لَدُنْ آدَمَ لَمْ يُصِبْنِي سِفَاحُ الْجَاهِلِيَّةِ ” .
(أخرجه الرامهرمزي في “الفاصل بين الراوي والواعي” ( ص ১৩৬ ) والجرجاني السهمي في ” تاريخ جرجان ” ( ص ৩১৮ – ৩১৯ ) وأبو نعيم في ” اعلام النبوة ” ( ১ / ১১ ) وابن عساكر في ” تاريخ دمشق ” ( ১ / ২৬৭ / ১ – ২ ) كلهم عن العدني به إلا أنه لم يقل ” عن علي ” في رواية عنه . وقد عزاه إلى ” مسند العدني ” السيوطي في ” الدر المنثور ” ( ২ / ২৯৪ ) و ” الجامع الصغير ” وعزاه للطبراني أيضا في ” الأوسط ” تبعا للهيثمي وقال هذا في ” المجمع ” ( ৮ / ২১৪ ))
“আমি বিবাহের মাধ্যমে জন্ম গ্রহন করেছি, ব্যভিচারের মাধ্যমে নয়। হযরত আদম আলাহিস সালাম থেকে শুরু করে আমার পিতা মাতা পর্যন্ত কোন নারী পুরুষ ব্যভিচারে লিপ্ত হননি। আর জাহেলী যুগের ব্যভিচার আমাকে চুয়েঁও নি।” (ইরওয়াউল গালীলঃ ১৯৭২, সহীহুল জামিউস্ সাগীরঃ ৩২২৫। তাবারানী, আবু নাঈম, ইবনে আসাকীর; ইমাম হাকেম এটাকে সহিহ বলেছেন।)
হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,“আমি সর্বদা পবিত্র পৃষ্ঠ মুবারক হতে পবিত্র রেহেম শরীফে স্থানান্তরিত হয়েছি। আমার পূর্ব পুরুষগণের মধ্যে হযরত আদম আলাইহিস সালাম ও হযরত হাওয়া আলাইহাস সালাম পর্যন্ত কোন পুরুষ বা মহিলা কেউই কাফির ছিলেন না।”
হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমার পূর্ব পুরুষগণের কোন পুরুষ বা মহিলা কেউই চারিত্রিক দোষে দোষী ছিলেন না।” প্রতীয়মান হল যে,উল্লেখিত বংশগুলো পৃথিবীর অন্যান্য সকল বংশ অপেক্ষা উত্তম ও সম্মানিত ।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরপবিত্র বংশ তালিকা: রসূল কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র বংশধারা নিম্নরূপঃ হযরত মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইবনু আব্দিল্লাহ, ইবনু আব্দিল মুত্তালিব, ইবনু হাশিম, ইবনু আব্দি মানাফ, ইবনু কুসাই, ইবনু কিলাব, ইবনু মুররাহ, ইবনু কাআ’ব, ইবনু লুওয়াই, ইবনু গালিব, ইবনু ফেহের (কুরাইশ), ইবনু মালিক, ইবনু নযর, ইবনু কিনানা, ইবনু খুযাইমাহ, ইবনু মুদরিকাহ, ইবনু ইলিয়াস, ইবনু মুদ্বার, ইবনু নাযার, ইবনু মাআ’দ, ইবনু আদনান।” এই পর্যন্ত বংশ ধারা উম্মতের ঐক্যমতে প্রমাণিত এবং এখান থেকে আদম আলাইহিস সালাম পর্যন্ত বংশ তালিকায় মতানৈক্য থাকায় তার বিবরণ পরিত্যাগ করা হল।
সম্মানিত মাতার পক্ষ থেকে বংশ তালিকা নিম্নরূপ: হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনে আমিনা বিনতে ওয়াহাব ইবনে আব্দে মানাফ ইবনে যুহরা ইবনে কিলাব। এ দ্বারা বুঝা যায় যে, কিলাব ইবনে মুররা পর্যন্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতা-মাতার বংশীয় ধারা একসাথে মিলিত হয়ে যায়।
হযরত আদম আলাইহিস সালামের বিছাল শরীফের পূর্বে নূরে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাহক তাঁর পুত্র-সন্তান ও পরবর্তী নবী-রসূল হযরত শীশ আলাইহিস সালামকে নছীহত করতে গিয়ে বলেছিলেন, “যেন (হযরত শীশ আলাইহিস সালাম এই নূরের পরবর্তী বাহককে নছীহত করেন) এই নূর মুবারককে পবিত্র নারী ব্যতীত অন্য কোন নারীর নিকট নিবেদন না করেন।”
আদম আলাইহিস্ সালাম আপন পুত্র হযরত শীস আলাইহিস্ সালামকে লক্ষ্য করে বলেন:
واخرج ابْن عَسَاكِر عَن كَعْب الاحبار قَالَ ان الله انْزِلْ على آدم عصيا بِعَدَد الْأَنْبِيَاء وَالْمُرْسلِينَ ثمَّ اقبل على ابْنه شِيث فَقَالَ أَي بني انت خليفتي من بعدِي فَخذهَا بعمارة التَّقْوَى والعروة الوثقى فَكلما ذكرت الله فاذكر الى جنبه اسْم مُحَمَّد صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فَإِنِّي رَأَيْت اسْمه مَكْتُوبًا على سَاق الْعَرْش وَأَنا بَين الرّوح والطين ثمَّ إِنِّي طفت السَّمَوَات فَلم أر فِي السَّمَوَات موضعا إِلَّا رَأَيْت اسْم مُحَمَّد مَكْتُوبًا عَلَيْهِ وَأَن رَبِّي اسكنني الْجنَّة فَلم ار فِي الْجنَّة قصرا وَلَا غرفَة إِلَّا اسْم مُحَمَّد مَكْتُوبًا عَلَيْهِ وَلَقَد رَأَيْت اسْم مُحَمَّد مَكْتُوبًا على نحور الْحور الْعين وعَلى ورق قصب آجام الْجنَّة وعَلى ورق شَجَرَة طُوبَى وعَلى ورق سِدْرَة الْمُنْتَهى وعَلى أَطْرَاف الْحجب وَبَين اعين الْمَلَائِكَة فَأكْثر ذكره فان الْمَلَائِكَة تذكره فِي كل ساعاتها (شرح الزرقاني على المواهب اللدنية بالمنح المحمدية. جـ৪ صـ২৩৮ الكتاب: الخصائص الكبرى. المؤلف: عبد الرحمن بن أبي بكر، جلال الدين السيوطي (المتوفى: ৯১১هـ) الناشر: دار الكتب العلمية – بيروت. جـ১ صـ১২-১৩)
“হে প্রিয় বৎস। আমার পরে তুমি আমার খলিফা। সুতরাং এই খেলাফতকে তাকওয়ার তাজ ও দৃঢ় এক্বিনের দ্বারা মজবুত করে ধরে রেখো। আর যখনই আল্লাহর নাম যিকির (উল্লেখ) করবে তার সাথেই হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামও উল্লেখ করবে। তার কারন এ যে, আমি রূহ ও মাটির মধ্যবর্তী থাকা অবস্থায়ই তাঁর পবিত্র নাম আরশের পায়ায় (আল্লাহর নামের সাথে) লিখিত দেখেছি। এরপর আমি সমস্ত আকাশ ভ্রমন করেছি। আকাশের এমন কোন স্থান ছিলনা যেখানে হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম মুবারক অংকিত পাইনি। আমার রব আমাকে বেহেস্তে বসবাস করতে দিলেন। বেহেস্তের এমন কোন প্রাসাদ ও কামরা পাইনি যেখানে হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম মুবারক ছিলনা। আমি হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতময় নাম আরোও লিখিত দেখেছি সমস্ত হুরের স্কন্ধ দেশে, বেহেস্তের সমস্ত বৃক্ষের পাতায়, বিশেষ করে তুলা বৃক্ষের পাতায় পাতায়, পর্দার কিনারায় এবং ফেরেশতাগনের চোখের মনিতে ঐ নাম মুবারক অংকিত দেখেছি। সুতরাং হে শীস ! তুমি এই নাম বেশী বেশী করে জপতে থাক। কেননা, ফেরেস্তাগন পুর্ব হতেই এই নাম জপনে মশগুল রয়েছেন। ” ( জুরকানি শরীফ ২/২৩৮, খাসায়েস আল কুবরা: সুয়ূতী ১/১২-১৩ )।
তিনি সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও পবিত্র পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছেন। তাঁর পিতা-মাতা নিষ্পাপ ও পবিত্র ব্যক্তি ছিলেন। তারা কখনো মূর্তিপূজা করেননি। সর্বদা তৌহিদে বিশ্বাসী ছিলেন এবং আল্লাহর এবাদত করতেন। রাসুলের বংশ নবীগণের সাথে স্পর্কিত। যেমন: তাঁর পূর্ব পুরুষ ছিলেন হযরত ইমাইল, হযরত ইব্রাহিম ও হযরত নুহ আলাহিস সালামের মত ব্যক্তিগণ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এর পিতা মাতা ও পূর্ব পুরুষগণ তৌহিদে বিশ্বাসী ছিলেন: ইতিহাস থেকে জানা যায়- আখিরী রসূল, মহানবী হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্ব পুরুষগণ কেউ কাফির-মুশরিক বা অপবিত্র ছিলেন না, প্রত্যেকেই ছিলেন পবিত্র থেকে পবিত্রতম। তাঁরা একত্ববাদী বা হানিফ ছিলেন এবং কোনো পিতাই কখনও কাফির ছিলেন না। তাঁরা আল্লাহর একত্ববাদে মনে প্রানে বিশ্বাস করে তদানুযায়ী জীবন যাপন করতেন। এমনকি তাঁদের উভয়ের বংশীয় পূর্ব পুরুষ ও মহিলাগণও তৌহিদে বিশ্বাসী ছিলেন। শির্ক-কুফরের অপবিত্রতা তাঁদের কখনোই স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁরা তা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্রই ছিলেন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আপন হাবীবের পবিত্র নূরকে পাক পবিত্র পুরুষগনের ঔরসেই এবং পবিত্র মহীয়সী মায়েদের মাধ্যমে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। কারন, কোন কাফির পুরুষ কিংবা নারীর এহেন সৌভাগ্য হতে পারেনা। সুতরাং রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিত পিতা-মাতা তাঁদের জীবদ্দশায় যেমন তৌহিদ-এ বিশ্বাসী ছিলেন,তাঁদের ইন্তিকালও হয়েছিল ঈমানের উপর। এ অকাট্য সত্য তথ্যের স্বপক্ষে নিম্নে কতিপয় প্রমাণ পেশ করা গেল।
পবিত্র কুরআনের আলোকে: পবিত্র কুরআন মজীদে আল্লাহ পাক এরশাদ ফরমান- وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ“ওয়া তাক্বাল্লুবাকা ফিস্ সাজিদীন“। (শূয়ারা-২১৯) অর্থাৎ,হে নবী! আমি আপনাকে সিজদাকারীদের পৃষ্ঠের মাধ্যমে(ঔরসে) স্থানান্তরিত করেছি। এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে আরম্ভ করে হযরত আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু পর্যন্ত সকল পূর্বপুরূষই মু’মিন ছিলেন। (তাফসীরে মাদারিক)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও ইরশাদ করেন, لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ“লাক্বাদ জা’আকুম রাসূলুম মিন আনফুসিকুম আযীযুন আলাইহি মা’আনিত্তুম।“ অর্থঃ-নিশ্চয় তোমাদের নিকট তাশরিফ আনয়ন করেছেন, তোমাদের মধ্যে থেকে ঐ রাসূল, যাঁর নিকট তোমাদের কষ্টে পড়া কষ্টদায়ক। (সুরা তাওবা-১২৮. বঙ্গানুবাদঃ কানযুল ঈমান।) এ আয়াতের ‘আনফুসিকুম‘ শব্দটির ‘ফা‘ অক্ষরটিতে ‘যবর’ও বর্ণিত হয়েছে। তখন আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় নিম্নরুপঃ “তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বোতকৃষ্ট, অভিজাত ব্যক্তিবর্গ থেকে এক মহান রাসূল তাশরীফ আনয়ন করেছেন (খাসায়িসুল ক্বুবরা,তাফসীরে-ই-নঈমী)।
হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা নিজেও ইরশাদ করেন, وعن أنس رضى الله عنه قال قرأ رسول الله صلى الله عليه وسلم “لقد جاءكم رسول من أنفسكم” بفتح الفاء وقال أنا أنفسكم نسبا وصهرا وحسبا ليس فى آبائى من لدن آدم سفاح.“আনা আনফাসূকুম“ অর্থাৎ,আমি তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম বংশোদ্ভূত। (তাবরানী শরীফ) হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্ব পুরুষদের মধ্যে হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে হযরত আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু পর্যন্ত কেউ মন্দ ও অশ্লীল কর্মে লিপ্ত হননি। (খাসায়িসুল ক্বুবরা)
পবিত্র কুরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে- إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ “ইন্নামাল মুশরিকুনা নাজাসুন“। অর্থঃ-নিসন্দেহে মুশরিকরা অপবিত্র। [التوبة: ২৮] কুরআন মজীদে যেহেতু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুশরিকদেরকে অপবিত্র বলে ঘোষনা করেছেন, সেহেতু তিনি তাঁর প্রিয় নবীর নূরকে যেকোন নাপাক ব্যক্তির ঔরসে রাখবেন না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। এ কথার সমর্থনে রাসূলে পাকের এ হাদীস শরীফটি বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য। তিনি ইরশাদ করেন-“আল্লাহ তায়ালা আমাকে সর্বদা পূত-পবিত্র পৃষ্ঠদেশ থেকে পবিত্র গর্ভেই স্থানান্তরিত করেছেন। পবিত্র পরিচ্ছন্ন-দুটি বংশীয় ধারার উভয়টির মধ্যে আমি উত্তম বংশের অন্তর্ভূক্ত“( খাসাইসুল ক্বুবরা )।
হাদীস শরীফের আলোকে:
রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিত পিতা-মাতা, পিতামহ ও মাতামহগন, যাঁদের মাধ্যমে তাঁর পবিত্র ও বরকতময় নূর স্থানান্তরিত হয়ে হযরত আব্দুল্লাহ ও হযরত আমিনা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা পর্যন্ত পৌছেছে, তাঁদের সম্পর্কে খোদ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা ইরশাদ করেন, لم يزل الله ينقلني من الأصلاب الطيبة إلى الأرحام الطاهرة، مصفى مهذبًا، لا تتشعب شعبتان إلا كنت في خيرهما”.
السيوطي – الدر المنثور – الجزء : ( ৫ ) – رقم الصفحة : ( ৯৮ ) أخرجه أبو نعيم ( ১ / ১১ – ১২ )
“আমি সর্বদা পবিত্র পৃষ্ঠদেশ সমূহ থেকে পবিত্র মাতৃগর্ভ সমূহে স্থানান্তরিত হয়ে ভূ-পৃষ্ঠে আবির্ভূত হয়েছি। (খাসাইসুল ক্বুবরা, দালায়েলুন্ নবুয়্যত)
তিনি আরও ইরশাদ করেন, “আমি প্রতিটি যুগে মানবজাতির সর্বস্তরের সর্বশ্রেষ্ঠ বংশে আবির্ভূত হয়েছি। (বুখারী শরীফ, সীফাতুন্নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা শীর্ষক অধ্যায়)
তিনি আরও ইরশাদ করেন, “আল্লাহ তায়ালা ধারাবাহিকভাবে পবিত্র পৃষ্ঠদেশ ও পবিত্র গর্ভে স্থানান্তরিত করে ভূ-পৃষ্ঠে আমার বরকতময় আবির্ভাব ঘটিয়েছেন।” (কিতাবুশ্ শেফা)
হযরত আব্দুল্লাহ ও হযরত আমেনা রাদিয়াল্লাহু আনহুমাঃ
কুরাইশ সর্দার হযরত আব্দুল মুত্তালিবের ছিল দশ পুত্র। এদের সকলেই ছিলেন বিশিষ্ট ও খ্যাতিমান। তাঁর সকল পুত্রের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ খুবই প্রশংসনীয় গুণাবলী ও কেন্দ্রীয় মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর পিতা বিয়ে দিয়েছিলেন বনূ যুহরার সর্দার ওহাব এর কন্যা হযরত আমেনার সঙ্গে, যাঁকে সে সময় উচ্চ বংশ, সম্মান ও প্রভাব প্রতিপত্তির দিক দিয়ে কুরাইশদের ভিতর সবচেয়ে সম্মানিত মহিলা মনে করা হত।
রসূল কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাতৃগর্ভে থাকাকালেই তাঁর পিতা হযরত আব্দুল্লাহ মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি সিরিয়া সফর থেকে ফেরার পথে মদীনা শরীফে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তথায় ওফাত বরণ করেন। ‘দার আল্ নাবেগা আলজা’দী’ নামক স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। (আর রাহীকুল মাখতুম, ছফীউররাহমান মুবারকপুরী, পৃঃ ৫৩।)
হযরত আমেনা রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের পূর্বেই এমন বহু নিদর্শন দেখতে পান যদ্বারা বোঝা যেত যে, তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ অত্যুজ্জল ও মর্যাদাকর হবে। (নবীয়ে রহমত- সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী- ১১৩)
হযরত খাজা আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু:
হযরত আবদুল্লাহর পিতা খাজা আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজের জীবনের কঠিনতম সংকটে ও বিপদের সময়েও আল্লাহর ইবাদত ত্যাগ করেননি ও একত্ববাদের দ্বীনের সহায়তা করতে কুণ্ঠা বোধ করেননি। যখন আবরাহার হস্তি সওয়ার বিশাল বাহিনী কা’বা গৃহ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে অগ্রসর হয় তখন পথিমধ্যে আব্দুল মুত্তালিবের কিছু উট তারা ধরে নিয়ে যায়। অতঃপর আব্দুল মুত্তালিব যখন উটগুলো ফিরিয়ে নিতে তার কাছে আসলেন তখন আবরাহা আশ্চার্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করল: উট ফেরত না চেয়ে কেন আমার বাহিনী ফেরত নিতে ও কা’বা ঘর ধ্বংস না করার আবেদন জানালে না? তখন আব্দুল মুত্তালিব আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান ও তাঁর ওপর ভরসা করে বললেন: لَمَّا سَأَلَ أَبْرَهَةَ أَنْ يَرُدَّ لَهُ إِبِلَهُ ، فَقَالَ : سَأَلْتَنِي مَالَكَ ، وَلَمْ تَسْأَلْنِي الرُّجُوعَ عَنْ هَذَا الْبَيْتِ مَعَ أَنَّهُ شَرَفُكُمْ ؟ ! ! فَقَالَ : إِنَّ لِلْبَيْتِ رَبًّا يَحْمِيهِ .“আমি হলাম এই উটগুলোর মালিক আর এই কা’বা ঘরেরও মালিক বা প্রভু রয়েছেন তিনি সেটা রক্ষা করবেন।” (কামেলে ইবনে আসির) এরপর তিনি মক্কার দিকে রওয়ানা দিলেন এবং কা’বা ঘরের কাছে এসে কা’বার দরজার কড়া ধরে বলেছিলেন:
ورجع عبد المطلب إلى قريش فأمرهم بالخروج من مكة والتحصن في رؤوس الجبال تخوفا عليهم من معرة الجيش ، ثم قام عبد المطلب فأخذ بحلقة باب الكعبة ، وقام معه نفر من قريش يدعون الله ويستنصرون على أبرهة وجنده ،فقال عبد المطلب وهو آخذ بحلقة باب الكعبة : لاهم إن المرء يمنع رحله فامنع حلالك * لا يغلبن صليبهم ومحالهم غدوا محالك. قال ابن اسحاق : ثم أرسل عبد المطلب حلقة الباب ، ثم خرجوا إلى رؤوس الجبال.
“হে আমার প্রতিপালক! তুমি ছাড়া আমি কারো ওপর ভরসা করি না। হে আমার প্রভু! (সকলের জন্য নির্ধারিত) নিজের এই নিরাপদ আশ্রয় স্থলকে রক্ষা কর। এই ঘরের শত্রুরা তোমার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, তাদেরকে তোমার ঘর ধ্বংস করা হতে বিরত রাখো। ” (কামেলে ইবনে আসির)
এই কথাগুলো হযরত আব্দুল মুত্তালিবের আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী হওয়ার স্পষ্ট দলিল। ইয়াকুবী নিজ ইতিহাস গ্রন্থে খাজা আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে লিখেছেন: “আব্দুল মুত্তালিব মূর্তিপূজা থেকে দূরে ছিলেন এবং মহিমান্বিত ও গৌরবময় এক আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করতেন না।” (তারিখে ইয়াকুবি)
أن جميع آبائه عليه السلام وأمهاته كانوا على التوحيد ، لم يدخلهم كفر ولا عيب ولا رجس ، ولا شيء مما كان عليه أهل الجاهلية – ذكر الباجوري في حاشيته على جوهرة التوحيد أنها بالغة مبلغ التواتر يعني المعنوي.
কা’বুল আহবার বর্ণনা করেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূর মুবারক হযরত খাজা আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর ললাট মুবারক-এ বেমেছালভাবে জ্বলজ্বল করতো, যা বর্ণনার ঊর্ধ্বে। নূরে মুহাম্মাদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতে হযরত খাজা আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর শরীর মুবারক হতে মিশক আম্বরের সুঘ্রাণ পাওয়া যেত। আর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নূরে পাক তাঁর কপালে সর্বদা চমকিত।
وعن كعب الأحبار أن نور رسول الله صلى الله عليه وسلم لما صار إلى عبد المطلب وأدرك نام يوما فى الحجر فانتبه مكحولا مدهونا قد كسى حلة البهاء والجمال فبقى متحيرا لايدرى من فعل به ذلك فأخذ أبوه بيده ثم انطلق به إلى كهنة قريش فأشاروا عليه بتزويجه فزوجه وكانت تفوح منه رائحة المسك الأذفر ونور رسول الله صلى الله عليه وسلم يضئ فى غرته وكانت قريش إذا أصابها قحط شديد تأخذ بيده فتخرج به إلى جبل ثبير فيتقربون به إلى الله تعالى ويسألونه أن يسقيهم الغيث فكان يغيثهم ويسقيهم ببركة نور محمد صلى الله عليه وسلم.
হযরত খাজা আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু নূরে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতে অনেক বিশেষত্বের অধিকারী হয়েছেন। কাবা শরীফের মুতাওয়াল্লী হওয়া এবং হজ্ব পালনকারীর দেখাশুনা করার দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যস্ত ছিল। তিনি নূরে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতে অনেক গুনের অধিকারী ছিলেন। তিনি শরাব পান,ব্যাভিচার এবং উলঙ্গঁপনা অবস্থায় কাবা শরীফের তাওয়াফ করা নিষিদ্ধ করেছেন।
উপরোক্ত হাদীস শরীফগুলো থেকে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিত পিতা-মাতা এবং পিতামহ ও মাতামহগনের সব ধরনের পাপাচার থেকে পবিত্রতারই প্রমাণ মিলে। তাই হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে আরম্ভ করে হযরত আব্দুল্লাহ ও হযরত আমিনা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা পর্যন্ত যারা যথাক্রমে আপন আপন ঔরস ও গর্ভে নূর নবীর নূর মুবারক বহন করেছেন, তাঁদের চারিত্রিক পবিত্রতা প্রসঙ্গে প্রত্যেকেরই বিশুদ্ধ আক্বীদা পোষণ করা দায়িত্ব-কর্তব্য।