ওরস কী? এর শরীয়ী মর্যাদা কী এবং এ বিষয়ে আমাদের কেমন ধারণা রাখা উচিত? ইসলামে ওরসের গুরুত্ব কতটুকু?
উত্তর:
بِسْمِ اللہِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
اَلْجَوَابُ بِعَوْنِ الْمَلِکِ الْوَھَّابِ اَللّٰھُمَّ ھِدَایَۃَ الْحَقِّ وَالصَّوَابِ
‘ওরস’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘বিবাহ’ বা ‘শাদী’। যেমন আমাদের উর্দুতেও ‘আরুসি জোড়া’ শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়, যার অর্থ বর-কনের পোশাক। আমরা যে অর্থে এটি ব্যবহার করি তা হলো— আল্লাহর ওলিদের ওফাত দিবসে (মৃত্যুবার্ষিকীতে) তাঁদের কবরের পাশে বা অন্য কোথাও তাঁদের স্মরণে কোনো মাহফিল বা ওয়াজ-নসিহত ইত্যাদির আয়োজন করাকে ওরস বলা হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, এই দিনটি পালনের নাম ‘ওরস’ রাখা হলো কেন? অন্য কোনো শব্দ কেন নয়? এর মূল কারণ হলো, যেহেতু ওরস মানে বিবাহ, আর বিয়ের সময় যেমন মিলন ঘটে, তেমনি ওরসও পালন করা হয় সেই দিনে যেদিন সেই মাজারের অধিকারীর (সাহেবে মাজার) ‘বিসাল’ বা ইন্তেকাল হয়। আমরা ইন্তেকালকে ‘বিসাল’ বলি, আর বিসাল মানে মিলন। সাহেবে মাজার কার সাথে মিলিত হন? বাহ্যত তিনি আমাদের থেকে দূরে চলে যান, কিন্তু তিনি মিলিত হন আল্লাহ তায়ালার সেই পুরস্কার ও নিয়ামতরাজির সাথে, যার ওয়াদা নেক আমলের বিনিময়ে আল্লাহ দিয়েছিলেন। এটিই তাঁর বিসাল বা মিলন— আল্লাহর নিয়ামত ও সন্তুষ্টির সাথে।
তাছাড়া হাদিসে আছে কবরে তিনটি প্রশ্ন হয়, তৃতীয় প্রশ্নটি নবীজি ﷺ এর ব্যাপারে। ওলামায়ে কেরাম বলেন, নবীজি ﷺ কবরে তাশরিফ আনেন। তো নবীজি ﷺ এর সাথে এই যে সাক্ষাৎ বা মিলন হলো— যেমন দুনিয়াবী মিলনের জন্য ‘ওরস’ শব্দ ব্যবহার হতো, তেমনি কবরের এই মহান মিলনের জন্যও ‘ওরস’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো, মিশকাত শরীফে একটি হাদিস রয়েছে। নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন, যখন মুনকার ও নাকির ফেরেশতা মৃত ব্যক্তিকে সওয়াল-জওয়াব করেন এবং সে সফল হয়, তখন ফেরেশতারা তাকে বলেন, 'নাম কানাওমাতিল আরুস' (نَمْ كَنَوْمَةِ الْعَرُوسِ) অর্থাৎ 'নববধূর মতো ঘুমাও, যাকে তার প্রিয়জন ছাড়া কেউ জাগায় না'। যেহেতু হাদিসে ‘আরুস’ (নববধূ) শব্দটি এসেছে, তাই সাহেবে কবর যখন কবরে যান এবং ফেরেশতারা তাঁকে এই সুসংবাদ দেন, সেই দিনটির জন্য ‘ওরস’ লফজটি ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এভাবেই ‘ওরস’ শব্দটি প্রচলিত হয়েছে।
এবার আসি ওরসের শরীয়ী মর্যাদার কথায়, যে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট দিনে কবরে যাওয়া এবং ওরস পালন করা। এ ব্যাপারে প্রমাণ হলো, নবীজি ﷺ নিজেও প্রতি বছর ওহুদ যুদ্ধের শহীদদের মাজার জিয়ারতে যেতেন।
মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, দুররে মানসুর এবং তাফসিরে কবীরে এই হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে যে, নবী করীম ﷺ প্রতি বছর ওহুদ শহীদদের কবরে তাশরিফ নিয়ে যেতেন। তাফসিরে কবীরে এ হাদিসের পর আরও বলা হয়েছে যে, খোলাফায়ে রাশেদীনও নবীজি ﷺ এর পর এই আমল অব্যাহত রেখেছিলেন, তাঁরা প্রতি বছর ওহুদ শহীদদের মাজারে যেতেন। তো এই যে বাৎসরিক যাওয়া, এটি নবীজি ﷺ এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের আমল থেকে প্রমাণিত। তাই আমরাও প্রতি বছর ওলি-আউলিয়াদের মাজারে যাই এবং দিনটি ধুমধামের সাথে পালন করি।
এখন বাকি রইল এই দিনে যেসব আমল করা হয়, সেগুলো জায়েজ কি না? ওরস আসলে কী? আমাদের সমাজে ওরস বলতে যা বোঝায় তা হলো, একটি নির্দিষ্ট দিনে সাহেবে মাজারের মাজারে হাজিরা দেওয়া, সেখানে তিলাওয়াত করা, মানকাবাত পড়া, ওয়াজ-নসিহত করা, দোয়া চাওয়া এবং খাবার (তাবারক) বিতরণ করা। এই সমষ্টির নাম ওরস। এর প্রতিটি কাজ আলাদাভাবে কোরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন— কবর জিয়ারত করা।
নবীজি ﷺ বলেছেন, 'আমি আগে তোমাদের কবর জিয়ারতে নিষেধ করতাম, এখন আদেশ দিচ্ছি যে তোমরা জিয়ারত করো।' তো মাজারে যাওয়া হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত।
সেখানে গিয়ে কী হয়? আপনারা দেখেছেন, দাতা হুজুর বা যেকোনো মাজারে গেলে দেখবেন প্রচুর কোরআন শরীফ রাখা আছে। জিয়ারতকারীরা এসে তিলাওয়াত করেন। তিলাওয়াত করা শরীয়তের দৃষ্টিতে পছন্দনীয় ও কাঙ্ক্ষিত।
এরপর সেখানে জলসার মতো হয়— নাত পড়া হয়, সেই ওলির শান-মান (মানকাবাত) গাওয়া হয়, আল্লাহ ও রাসূলের আজমত বয়ান করা হয় এবং ওয়াজ-নসিহত হয়। এই সব বিষয়— আল্লাহর বড়ত্ব, রাসূলের শান, ওলিদের শান, কোরআনে মজুদ আছে।
এরপর ইসালে সওয়াব করা হয়, যা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এরপর লঙ্গর বা খাবার বিতরণ করা হয়। মুসলমানকে খাবার খাওয়ানো অনেক বড় সওয়াবের কাজ, নবীজি ﷺ এর নির্দেশ দিয়েছেন এবং কোরআনেও বারবার এতিম ও মিসকিনকে খাবার খাওয়ানোর কথা এসেছে।
সুতরাং ওরসের মধ্যে যেসব কাজ থাকে, শরীয়তের গণ্ডির মধ্যে থাকলে তার প্রতিটি কাজই আলাদাভাবে জায়েজ। যখন সব কাজ জায়েজ, তখন সেগুলোকে এক জায়গায় জমা করলে তাতে দোষের কিছু নেই। এর উদাহরণ হলো, মাদ্রাসায় বোখারি শরীফ খতম বা দস্তারবন্দী উপলক্ষে যে বাৎসরিক জলসা হয়। ছাত্ররা দ্বীনি শিক্ষা বা হিফজ শেষ করলে জলসা হয়। সেখানেও নির্দিষ্ট দিন ধার্য করা হয় (কেউ রমজানে, কেউ শাওয়ালে বা রজ্জবে করে)।
সেখানেও লোক জমা হয়, তিলাওয়াত হয়, নাত হয়, বয়ান হয় এবং শেষে খাবার বিতরণ করা হয়। এই সমষ্টিকে ‘জলসা’ বলা হয় এবং সবাই তা করে। যদি সবাই জলসা করতে পারে, তবে সাহেবে মাজারের সান্নিধ্যে গিয়ে করলে তা নাজায়েজ হবে কেন? ওলিদের সান্নিধ্য তো বরকতের কারণ, হারাম হওয়ার কারণ নয়। যেভাবে অন্য সব আয়োজন করা হয়, ঠিক সেভাবেই এটিও করা হয়।
তাছাড়া ওরসের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। হযরত সাইয়্যেদেনা আমীর হামজা رضي الله عنه এর ওরস মদিনাবাসীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পালন করে আসছেন। এর মূল কারণ হয়তো সেই হাদিসটিই, যেখানে নবীজি ﷺ প্রতি বছর শহীদদের মাজারে যেতেন। কারও মনে ওয়াসওয়াসা বা সন্দেহ আসতে পারে যে, আজকাল যে পদ্ধতিতে ওরস হয় তা হয়তো নতুন।
এর উত্তর হলো— কবর জিয়ারতের আদল বদলেছে, যেমন আমাদের যুগে দ্বীন শেখার পদ্ধতি বদলে মাদ্রাসা হয়েছে। নবীজি ﷺ এর যুগে প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসা ছিল না, সাহাবীরা এসে মাসআলা জিজ্ঞেস করতেন, নবীজি বয়ান করতেন, এটাই ছিল পদ্ধতি। আমাদের সময়ে সেটাকে নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে এনে মাদ্রাসা ব্যবস্থা (System) চালু করা হয়েছে।
ইসালে সওয়াব, দোয়া, ফাতিহা, খাবার খাওয়ানো, জিয়ারত –এগুলো সবই নবীজির যুগে ছিল, তবে বিচ্ছিন্নভাবে। এখন সেগুলোকে গুছিয়ে যদি ‘ওরস’ বা ‘জলসা’ আকারে করা হয়, তবে তাতে কোনো দোষ নেই।
[সূত্র: তথ্যাবলী দারুল ইফতা আহলে সুন্নাত (দাওয়াতে ইসলামী) থেকে সংগৃহীত]
وَاللہُ اَعْلَمُ عَزَّوَجَلَّ وَرَسُوْلُہ اَعْلَم صَلَّی اللّٰہُ تَعَالٰی عَلَیْہِ وَاٰلِہٖ وَسَلَّم
