❑ বিশ্বজগতের স্রষ্টা!


মুফতি মুহাম্মদ নাভিদ রেজা আত্তারী 

৬ জানুয়ারি ২০২৫


بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

পুরনো দিনের কথা, যখন মানুষের ভ্রমণের একমাত্র মাধ্যম ছিল জানোয়ারের পিঠে চড়া। এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতে সপ্তাহ, এমনকি মাঝে মাঝে মাসও লেগে যেত। সেই সময় এক যুবকের মনে নেশা চাপল যে, সে তার উটে চড়ে পৃথিবীর এমন এক প্রান্তে যাবে যেখানে আজ পর্যন্ত কেউ পৌঁছায়নি। 


নিজের মনে এই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সে উটে চড়ে খোরাসান থেকে যাত্রা শুরু করল। অনেক মাস সফর করে, বিভিন্ন নদী, জঙ্গল, পাহাড় এবং জনমানবহীন এলাকা পার হয়ে এই যুবক এক মরুভূমিতে পৌঁছাল, যা এক বিশাল বিস্তৃত সমতল মাঠের মতো ছিল, যতদূর চোখ যায় শুধু ধুঁ ধুঁ প্রান্তর। এই জায়গায় পৌঁছে যুবকের বিশ্বাস হলো যে, সে এমন এক জায়গায় এসেছে যেখানে আজ পর্যন্ত কেউ পৌঁছায়নি।


উটে বসে সে এই নিশ্চয়তার জগতেই ছিল, এমন সময় সামনে কিছু দূর এগিয়ে সে উটের কিছু বিষ্ঠা দেখতে পেল। সে একটু চমকে উঠল এবং ভাবতে লাগল যে এখানে এই বিষ্ঠা কীভাবে এল? একটু এগিয়ে উটের পায়ের ছাপও স্পষ্টভাবে নজরে এল। এসব জিনিস দেখে তার মনে হলো, এখানে আমার আগেও কেউ না কেউ এসেছে। এই কৌতূহলী অবস্থায় সে সামনে একটি বড়ই গাছ দেখতে পেল। সে গাছের নিচে গিয়ে বসল এবং গাছের সাথে হেলান দিয়ে ভাবতে লাগল! যখন বিষ্ঠা এবং উটের পায়ের ছাপ নিজে নিজে এখানে আসতে পারে না, বরং এগুলো এখানে কেউ না কেউ আনার আছে, তাহলে এই এত বড় জগত, চাঁদ, সূর্য, জমিন ইত্যাদি নিজে নিজে কীভাবে অস্তিত্বে আসতে পারে? নিশ্চয়ই কোনো শক্তিশালী সত্তা এগুলো তৈরি করেছেন।


এবং সে নিজের অজান্তেই চিৎকার করে উঠল যে, অবশ্যই এই মহাবিশ্বের একজন স্রষ্টা আছেন যিনি একক এবং অদ্বিতীয়। যেভাবে এই যুবক নিশ্চিতভাবে জেনেছিল যে এই জগতের একজন স্রষ্টা (Creator) আছেন, তেমনই প্রতিটি মানুষ যদি সুস্থ বিবেকের সাথে এই মহাবিশ্বের বস্তুগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, তবে এই সমস্ত বস্তু এই কথার উজ্জ্বল প্রমাণ যে, এদের একজন সৃষ্টিকর্তা ও কারিগর (Creator) অবশ্যই আছেন এবং সেই সত্তা হলেন واجب الوجود (Necessary Being) আল্লাহ পাক। এই বিষয়টি একটু বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি।


আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্বের সপক্ষে যুক্তিনির্ভর প্রমাণ:

এই বিশ্বজগৎ সহ এতে যত জিনিস موجود আছে, তা মানুষ, প্রাণী, গাছপালা হোক বা চাঁদ, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি, সবই এক সময় অস্তিত্বে আসে এবং একটা সময়ের পর তাদের অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায়।


এই সমস্ত জিনিস নিজে থেকে অস্তিত্বে আসে না, বরং অস্তিত্বে আসার জন্য অন্য কিছুর মুখাপেক্ষী হয়। যেমন: গাছ নিজের অস্তিত্বের জন্য মাটি, পানি, বীজ এবং সূর্যের আলোর মুখাপেক্ষী। এগুলো ছাড়া গাছ জন্মাতে পারে না। বিবেক ও বুদ্ধির ভিত্তিতে কোনো জিনিসের অস্তিত্বের জন্য জরুরি হলো যে, তাকে কেউ অস্তিত্ব প্রদানকারী হোক। কারণ কোনো কিছু ছাড়া কোনো জিনিসের নিজে নিজে অস্তিত্বে আসা বিবেক অনুযায়ী অসম্ভব।


Contingent Being (ممکن الوجود) -এর নিজে নিজে অস্তিত্বে আসা:

Contingent Being (ممکن الوجود) -এর বুদ্ধিগতভাবে নিজে নিজে অস্তিত্বে আসা সম্ভব নয়। এর কারণ হলো, কোনো জিনিসের অস্তিত্বে আসার জন্য দুটিই পথ রয়েছে। 


(১) হয় সে নিজে নিজে অস্তিত্বে আসবে। 

(২) অথবা অন্য কেউ তাকে অস্তিত্ব দান করবে।


আর এটা স্পষ্ট বিষয় যে, ممکن الوجود (Contingent Being) জিনিস যতক্ষণ অস্তিত্বে না আসে, ততক্ষণ তাতে 'অনস্তিত্ব' (নেই অবস্থা) এবং 'অস্তিত্ব' (আছে অবস্থা) উভয়ই সমান থাকে। তাই যখন কোনো জিনিস অস্তিত্বে আসে, তার অস্তিত্বে আসা একটি ফলাফল (Effect) হয়, যা কোনো কারণের (Cause) ভিত্তিতে হয় এবং এই কারণ (Cause), ফলাফল (Effect)-এর পূর্বে থাকে। এখন যদি ممکن الوجود (Contingent Being) জিনিসের ক্ষেত্রে প্রথম পদ্ধতি মেনে নেওয়া হয় যে, সে নিজে নিজে অস্তিত্বে এসেছে, তবে এটা আবশ্যক হয়ে পড়ে যে, এই ফলাফল (Effect)-এর কারণ (Cause) সে নিজেই, এবং ফলাফল (Effect) (অর্থাৎ অস্তিত্ব) থেকে কারণ (Cause)-এর আগে থাকা জরুরি। 


আর একটি জিনিস নিজের অস্তিত্বের আগে অস্তিত্ব রাখা, এটা সুস্পষ্টভাবে বাতিল বা ভুল ধারণা। সুতরাং জানা গেল যে ممکن الوجود-এর কারণ (Cause) হওয়া জরুরি, যার কারণে এই জিনিসটি অস্তিত্ব লাভ করেছে।


এখন যদি সেই কারণটিও এমন হয় যে, সে আগে ছিল না এবং পরে পাওয়া গিয়েছে (অর্থাৎ Contingent Being হয়), তবে তার সম্পর্কেও এই প্রশ্ন হবে যে, তাকে কে অস্তিত্ব দান করেছে? এভাবে যদি আমরা প্রতিটি কারণের ব্যাপারে চিন্তা করতে থাকি, তবে এখানে দুটি পথ বাকি থাকে। 


(১) একটি হলো, কারণগুলোর এই ধারা কোথাও না থেমে ক্রমাগত চলতে থাকবে, যাকে আরবিতে "تسلسل" এবং ইংরেজিতে "Infinite Regress of Causes" বলা হয় এবং এটি বুদ্ধিগতভাবে সঠিক নয়। কারণ, যদি জিনিসগুলোর অস্তিত্বের জন্য এই পদ্ধতি মেনে নেওয়া হয়, তবে ফলাফল এই দাঁড়াবে যে, কোনো জিনিসই অস্তিত্বে আসতে পারবে না। কেন?


এই জন্য যে, যখন একটি জিনিসের অস্তিত্ব (পাওয়া যাওয়া) কোনো কারণের পাওয়া যাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হয় এবং সেই কারণের অস্তিত্বের জন্য অন্য একটি কারণের অস্তিত্বের প্রয়োজন হয়, এবং তার জন্য তৃতীয় একটি কারণের, এভাবে এই ধারা চলতে থাকে এবং কোথাও না থামে, তবে জিনিসের অস্তিত্বের কোনো চূড়ান্ত কারণ পাওয়া যাবে না। আর যখন কোনো কারণের অস্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাই ফলস্বরূপ কারণও পাওয়া যাবে না এবং কোনো জিনিস অস্তিত্বেও আসবে না।


এই বিষয়টি আমরা কিছু সাধারণ উদাহরণ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি:

(১) শত্রুদের সাথে যুদ্ধে এক ফৌজি গুলি চালাল, যখন তার কাছে জিজ্ঞাসা করা হলো যে তোমাকে গুলি চালানোর আদেশ (Order) কে দিয়েছিল? সে বলল যে অমুক কমান্ডার দিয়েছে। যখন সেই কমান্ডারের কাছে জিজ্ঞাসা করা হলো, সে বলল অমুক জেনারেল দিয়েছে। তারপর জেনারেল অন্য কারো কথা বলল। যদি এই ধারা কোথাও শেষ না হয়, তবে ফলাফল এই দাঁড়াবে যে গুলিই চলবে না। কারণ কোনো আদেশ দাতা পাওয়া যায়নি। সুতরাং এটা জরুরি যে, এমন একজন প্রথম ব্যক্তি থাকবেন যিনি কারো আদেশের মুখাপেক্ষী নন, বরং নিজে থেকে আদেশ দাতা।


(২) আপনি একটি দরজা খুলতে চান, কিন্তু এর জন্য শর্ত হলো আগে অনুমতি নিতে হবে। আর যার কাছ থেকে আপনি অনুমতি নিচ্ছেন, সে অন্য কারো অনুমতির মুখাপেক্ষী, এবং সে অন্য কারো অনুমতির মুখাপেক্ষী। আর এভাবে এই ধারা কোথাও শেষ না হয়, তবে ফলাফল এই হবে যে, দরজা কখনোই খুলবে না। সুতরাং কোথাও না কোথাও এমন একজন প্রথম ব্যক্তি থাকা জরুরি যিনি নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেবেন, যাতে এই ধারা থামে এবং দরজা খোলার কাজটি অস্তিত্বে আসতে পারে।


(৩) এক ব্যক্তি কোনো চাকরির জন্য আবেদন করল এবং তাকে বলা হলো যে, আগে আপনার পরীক্ষা হবে। যখন সে সেই পরীক্ষায় সফল হয়ে গেল, তখন তাকে বলা হলো যে, এখন আরও একটি পরীক্ষা হবে। তারপর বলা হলো যে, তৃতীয় পরীক্ষাও হবে এবং এই পরীক্ষার ধারা চলতেই থাকল, তো ফলাফল এই দাঁড়াবে যে, পরীক্ষার ধারা শেষ হবে না এবং সেই ব্যক্তি কখনোই চাকরি পাবে না। সুতরাং জরুরি হলো যে, কোনো ফাইনাল পরীক্ষা হোক, যার পর কোনো পরীক্ষা না থাকে এবং তাতে সফলতা অর্জন করার পর সেই ব্যক্তিকে চাকরি দিয়ে দেওয়া হয়।


এই সমস্ত উদাহরণ থেকে জানা গেল: জিনিসগুলোর অস্তিত্বের জন্য জরুরি হলো যে, কোনো শেষ এবং চূড়ান্ত কারণ থাকবে, যেখানে কারণের ধারা শেষ হয়ে যাবে এবং সেই কারণ অন্য কোনো কারণের মুখাপেক্ষী হবে না। অন্যথায় কোনো জিনিস অস্তিত্বেই আসতে পারত না। এটাই দ্বিতীয় (২) পথ। আমরা জগতে দেখছি যে মানুষ, প্রাণী, পাখি, আসমান ও জমিন ইত্যাদি আরব আরব জিনিস موجود আছে। সুতরাং কোনো না কোনো শেষ এবং চূড়ান্ত এমন কারণ موجود আছে যা কারো এবং কোনো কারণের মুখাপেক্ষী নয় এবং তারই কারণে এই সমস্ত বস্তুগত জগৎ অস্তিত্বে পরিপূর্ণ। এই পূর্ণ আলোচনা থেকে এই বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এই বিশ্বের একজন কারিগর ও স্রষ্টা (Creator) موجود আছেন, যিনি واجب الوجود (Necessary Being)। 


এর অর্থ হলো, তাঁর অস্তিত্ব থাকা জরুরি, তাঁকে না পাওয়া যাওয়া অসম্ভব। যেহেতু আমরা তাঁকে শেষ এবং চূড়ান্ত কারণ সাব্যস্ত করেছি, যিনি কারো অস্তিত্বের মুখাপেক্ষী নন, বাকি সবাই নিজেদের অস্তিত্বের জন্য তাঁর মুখাপেক্ষী। তাই তাঁর ممکن الوجود (Contingent Being) হওয়া সম্ভব নয়, বরং তিনি واجب الوجود (Being Necessary)।


আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্বের ওপর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণাদি: 

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কালাম শাস্ত্রের কিতাব ইত্যাদিতে এগুলো বর্ণনা করা হয়েছে। যেমনটি ইলমে কালামের প্রসিদ্ধ কিতাব شرح العقائد النسفیه -তে রয়েছে: "যেহেতু এই কথা প্রমাণিত যে আলম (বিশ্বজগৎ) হলো حادث (সৃষ্ট), এবং এই কথাও জানা আছে যে, حادث জিনিসের জন্য কোনো محدث (অর্থাৎ যিনি অস্তিত্বে আনয়নকারী) থাকা জরুরি। কারণ ممکن (যার অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব সমান) এর দুই দিকের (অনস্তিত্ব ও অস্তিত্ব) মধ্য থেকে এক দিককে কোনো مرجح (প্রাধান্যদানকারী) ছাড়া প্রাধান্য পাওয়া অসম্ভব। 


সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, এর কোনো অস্তিত্বদানকারী অবশ্যই আছে এবং তিনিই হলেন আল্লাহ পাকের সত্তা, যিনি واجب الوجود। আর আল্লাহ পাকের সত্তার ব্যাখ্যা واجب الوجود শব্দ দ্বারা এই জন্য করা হয়েছে, কারণ যেহেতু আল্লাহ পাক সমস্ত حوادث (সৃষ্ট বস্তু)-এর مبدع (প্রথমবার অস্তিত্বদানকারী) এবং সমস্ত ممکنات (সম্ভাব্য বস্তু)-এর سلسله (ধারাবাহিকতা)-এর مبدع (অর্থাৎ সমস্ত ممکن বস্তুর সূচনাকারী), তাই সেই সত্তার واحد (এক), قدیم (অনাদি) হওয়া এবং جسمیت و عرضیت (দেহ ও আকস্মিক গুণাবলি) ইত্যাদি حوادث (সৃষ্ট বৈশিষ্ট্য) থেকে পবিত্র হওয়া, এবং তাঁর واجب الوجود হওয়ার দিক থেকে জরুরি। 


এবং সেই সত্তার অস্তিত্ব তাঁর নিজের সত্তার কারণেই হয়। অর্থাৎ তাঁর অস্তিত্বের জন্য কোনো علت تامه (পূর্ণাঙ্গ কারণ) রয়েছে এবং তা তাঁর নিজের অস্তিত্বেই রয়েছে, তিনি অন্য কোনো জিনিসের প্রতি মুখাপেক্ষী নন। কারণ যদি বিশ্বজগতের স্রষ্টা অস্তিত্বের জন্য অন্য কারো মুখাপেক্ষী হন (অর্থাৎ অন্য কোনো ممکن الوجود হন), তবে তাঁর জন্যও محدث (স্রষ্টা) সাব্যস্ত করা জরুরি হয়ে পড়বে। যদিও বিশ্বজগতের এই সমস্ত জিনিসের নাম হলো, যা اپنے مبدع (তাদের স্রষ্টা)-এর অস্তিত্বের ওপর প্রমাণ বহনকারী علامت (নিদর্শন)।


সুতরাং যদি محدث للعالم (বিশ্বের স্রষ্টা), جملہ عالم (সমগ্র বিশ্ব) থেকে হন, তবে তো তিনি নিজেই নিজের অস্তিত্বের ওপর علامت (নিদর্শন) হবেন এবং এটি محال (অসম্ভব)। আর এই সমস্ত আলোচনা থেকে নিকটবর্তী দলিল হলো যে, تمام ممکنات (সমস্ত সম্ভাব্য বস্তু)-এর مبدع (স্রষ্টা)-এর واجب الوجود (Necessary Being) হওয়া জরুরি। কারণ যদি তিনি ممکن الوجود (Contingent Being) হন, তবে তো তিনি নিজেই ممکنات (সম্ভাব্য বস্তু)-এর অন্তর্ভুক্ত হবেন এবং তাঁর مبدع (স্রষ্টা) তিনি নিজে হবেন না, অথচ আমাদের দাবি তো এটাই ছিল যে, ممکنات (সম্ভাব্য বস্তু)-এর সমাপ্তি কোনো واجب (আবশ্যিক সত্তা)-এর দিকে হবে।


شرح العقائد النسفیه مع النبراس، ص 96، 97، مطبوعه ملتان


Source: Darul Ifta AhleSunnat 

Translator: Swadhin Attari

Top