সালাতুল আওয়াবীন বা খোদাভীরুদের নামাজ | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

সালাতুল আওয়াবীন বা খোদাভীরুদের নামাজঃ

উলূমুল হাদীসের গলদ ব্যবহারের একটা দিক এই যে, কোনো রেওয়ায়েতের মান নির্ণয়ের জন্য সনদের তাহকীক করা হয়। প্রত্যেক ময়দানে যে কোনো বিষয়ের তাহকীকের ক্ষেত্রে বদহজম হতে পারে। তাহকীকের বদহজম হলেই ফেতনা হবে। তাহকীকের বদহজম হয় দুই জিনিসের অভাবে। যথাঃ ১. তাফাক্কুহের অভাব

২. আকলে সালীমের অভাব।

তাফাক্কুহ এবং আকলে সালীম না থাকার কারণে তাহকীককে তার নতীজার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নতীজার বাইরে ব্যবহার করা হয়। এটাই হল তাহকীকের বদহজম। যখনই তাহকীকের বদহজম হবে তখনই ফেতনাহবে। আসুন, বাদ মাগরিবের নফল নামায প্রসঙ্গে। সাধারণ পরিভাষায় যা আওয়াবীনের নামায হিসেবে প্রসিদ্ধ। একবার কেউ রীতিমতো ঝগড়া বাঁধিয়ে দিয়েছিল। তার বক্তব্য, সহীহ মুসলিমের একটি বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, সালাতুদ দুহা (চাশতের নামায) হল আওয়াবীনের নামায। সুতরাং মাগরিবের পরের নফল নামাযকে আওয়াবীনের নামায বলা ভুল। এবং এই নামাযের কোনো ভিত্তি নেই। সে বলেছিল, তিরমিযী শরীফে মাগরিবের পর ছয় রাকাত নফল পড়ার ফযীলত সম্বলিত যে রেওয়ায়েতটি আছে তাতে ইমাম তিরমিযী  রাহ. নিজেই একথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এখানে ওমর ইবনে আবী খাছআম নামে একজন  আছেন, যার ব্যাপারে ইমাম বুখারী রাহ. বলেছেন, ‘মুনকারুল হাদীস’। তাছাড়া ইমাম যাহাবী রাহ. ‘মীযানুল ইতিদাল’ কিতাবে সরাসরি এই রেওয়ায়েতটিকেই ‘মুনকার’ বলেছেন। অতএব তার দাবী আওয়াবীন পড়া ছেড়ে দাও। এবং অন্যকেও তা থেকে বারণ কর। নাউযুবিল্লাহ। মনে রাখবেন, যে লোক বিষয়টিকে এভাবে নিবে নিঃসন্দেহে সে জাহেল। সে ইলমের এবং তাহকীকের কোনো আদবই শিখেনি। এখানে তো শুধু তাহকীকের গলদ ব্যবহার নয়; বরং এখানে তাহকীকই অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। আর তাহকীক না করার চেয়ে অসম্পূর্ণ তাহকীক করা বেশি খতরনাক, বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দেখুন, চাশতকে আওয়াবীনের নামায বললেই কি একথা জরুরি যে, মাগরিবের পরের নফল নামাযও আওয়াবীনের নামায হবে না? বা সেটাকে আওয়াবীনের নামায বলা ঠিক হবে না? – এটা তো ফজর মাগরিবের মতোওয়াক্তের সাথে সম্পৃক্ত কোনো নাম নয় যে, এক নাম দুই নামাযের জন্য হতে পারবে না। ‘সালাতুল আওয়াবীন’ অর্থ কী? এর অর্থ হল, ‘আওয়াব’ বা যারা খুব বেশি আল্লাহমুখী হয় তাদের নামায। এবং বাস্তবতা হল, ভালো সনদের একটি মুরসাল-মারফূ হাদীসে এবং একাধিক ‘আছারে’ মাগরিবের পরের নফল নামাযকে আওয়াবীনের নামায বলা হয়েছে। তাছাড়া অনেক সাহাবী-তাবেয়ী থেকে সহীহ সনদে মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময় নফল পড়ার বিষয়টি প্রমাণিত।

প্রিয় নাবী কারিম (صلى الله عليه و آله و سلم) নিজে ও তাঁর সাহাবীগণ মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে বেশি বেশি নফল সালাত আদায় করতেন বলে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। হযরত হুযাইফা (রা) বলেন, ‘‘আমি নবীজী (صلى الله عليه و آله و سلم) এঁর কাছে এসে তাঁর সাথে মাগরিবের সালাত আদায় করলাম। তিনি মাগরিবের পরে ইশা’র সালাত পর্যন্ত নফল সালাতে রত থাকলেন।’’ হাদীসটি সহীহ।

★[সূত্রঃ ইবন আবী শাইবা, মুসান্নাফ ২/১৫;

★নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা ১/৫১, ৫/৮০; ★আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/৩১৩।]

এ বিষয়ে দেখা যেতে পরে মুহাম্মাদ ইবনে নসর আল মারওয়াযী রাহ. কৃত ‘কিয়ামুল লাইল’। ইমাম ইবনুল মুবারক রাহ. কৃত ‘কিতাবুয যুহদ ওয়ার রাকাইক’ এবং মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ও মাআরিফুস সুনান। এখন যদিও ‘মাগরিবের পরের ছয় রাকাত নামায বারো বছরের ইবাদত বরাবর, বিষয়ক হাদীসটি যয়ীফ বা মুনকার হয়ে থাকে [অথচ ইমাম ইবনে খুযাইমা রাহ. তার ‘কিতাবে রেওয়ায়েতটি এনেছেন। সহীহ ইবনে খুযাইমা (১১৯৫)] তাতেই কি একথা বলা যাবে যে, আওয়াবীন নামাযের কোনো ভিত্তি নেই? এজন্যই যে ব্যক্তি অসম্পূর্ণ তাহকীকের ভিত্তিতে বা তাহকীকের গলদ ব্যবহারের মাধ্যমে আকাবির মাশায়েখের বরকতপূর্ণ আমল থেকে সরে গিয়ে ঐ সময়ের নফল থেকে নিজে বঞ্চিত হয় বা অন্যকে এ ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করে তার এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ভুল পদক্ষেপ যা থেকে ফিরে আসা অত্যন্ত জরুরি। – দেখুন, যদি আওয়াবীনের নামায বিষয়ে কোনো হাদীস আছার নাও থাকতো তবুও তো ঐ সময়ে নফল নামায পড়া মুবাহ এবং সওয়াবের কাজ দুরস্ত আছে। কেননা মাকরূহ ওয়াক্ত ছাড়া বাকী যে কোনো সময় যে কেউ একাকী নফল নামায পড়তে পারে। হ্যাঁ, নির্দিষ্ট বা বিশেষ নফল বলতে হলে সেজন্য ভিন্ন দলীলের প্রয়োজন হবে। তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর আওয়াবীননের জন্য সে রকম দলিল আছে। প্রসঙ্গত, এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করে দেওয়া জরুরি। তা হল, কারো কারো ধারণা, আওয়াবীনের নামায নির্দিষ্টভাবে ছয় রাকাত। অতএব যদি কেউ আওয়াবীন পড়তে চায় তাহলে তাকে ছয় রাকাতই পড়তেহবে। অন্যথায় পড়বে না। এমন ধারণা অবশ্যই পরিহারযোগ্য। এখানে বরং বাদ মাগরিবের দুই রাকাত সুন্নতের পর দুই রাকাত, চার রাকাত, ছয় রাকাত যত রাকাত ইচ্ছা কেউ পড়তে পারে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে এমন কোনো রাকাত সংখ্যা নেই যার খেলাফ করাটা গুনাহ বা মাকরূহ! এক হাদীসে তো এসেছে, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিবের পর থেকে ইশা পর্যন্ত নামায পড়েছেন। [সূত্রঃ সহীহ ইবনে খুযাইমা,হাদীস : ১১৯৪।] তবে এ কথা স্বীকৃত যে, নফল নামায সর্বাবস্থায়ই নফল। শরীয়ত যাকে মানুষের ইখতিয়ারাধীন করেছে। সেজন্য তাতে বাধ্যবাধকতা চলে না। তবে, যদি কোনো শায়খ, মুসলিহ মুরববী বা মুরববী উস্তায অথবা মুরববী অভিভাবক তাঁর অধীনস্তদেরকে কোনো নফলে অভ্যস্ত করে তোলার জন্য কখনো কোনো কড়াকড়ি বা বাধ্যবাধকতা করেন তাহলে সেটা ইনতিযামী মাসআলা। তার হুকুম ভিন্ন। সে ইখতিয়ার তাঁর অধিনস্থদের প্রতি তাঁর রয়েছ। যাহোক, মাগরিবের নামাযের পর আওয়াবীন পড়বো। তা সালাফে সালেহীন তথা পূর্ববর্তী সাদিক্বীনরা পড়তেন। আমরা জেনেছি, সালাতুল আওয়াবীন সম্পর্কে দুই রেওয়ায়েত আছে অর্থাৎ ছয় রাকাত ও বিশ রাকাত। আর বিশ রাকাতের রেওয়ায়েতের সনদে দুর্বলতা তুলনামূলক কম আছে, সে কারণে ছয় রাকাতের সনদ একটু অধিক দুর্বল হলেও একাধিক দূর্বল সনদের অস্থিত্ব উভয় সনদকে শক্তিশালী করেছে। তাছাড়া মাগরিব ও এশার মাঝে নফল নামায একাধিক সহীহ আছার দ্বারা প্রমাণিত। আর একটি হাসান পর্যায়ের হাদীসে এই নামাযকে সালাতুল আওয়াবীন বলা হয়েছে, কাজেই সাদিক্বীনদের আমলের পরম্পরায় এ নামায পড়ায় কোন অসুবিধা থাকে না।

জামে তিরমীযিতে রেওয়ায়েত হয়েছে সালাতুল আওয়াবীনের ছয় রাকাত নামাযের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা বার বৎসর নফল ইবাদত করার সওয়াব দান করবেন।

★[সূত্রঃ জামে তিরমিযী ১/৯৮।]

ছয় রাকাআত তো পড়বেন, ব্যস্ততা কম থাকলে সময় সুযোগমত আরও বেশী বা বিশ রাকাআতও পড়ার অভ্যাস করা মন্দ নয়। মহান আল্লাহ্ পাক সকলকে অধিক নফল ইবাদাত করার তৌফীক নসীব করুন, আমীন।