জান্নাত   অর্থ   কী?   জান্নাতের   আকৃতি   কিরূপ?  জান্নাতের অধিবাসীদের অবস্থা কী হবে?   জান্নাতে কি  কি  নেয়ামত দান   করা  হবে? জান্নাতীদের প্রথম খাদ্য কি হবে? জান্নাত কয়টি ও কি কি? | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

প্রশ্নঃ   জান্নাত   অর্থ   কী?   জান্নাতের   আকৃতি   কিরূপ?  জান্নাতের অধিবাসীদের অবস্থা কী হবে?   জান্নাতে কি  কি  নেয়ামত দান   করা  হবে? জান্নাতীদের প্রথম খাদ্য কি হবে? জান্নাত কয়টি ও কি কি?

উত্তরঃ   ইসলাম এসেছে  পরকালে জান্নাতের সুসংবাদ  দিতে।    তাই    কোরআন   মজিদ   ও    হাদীস     শরীফের অধিকাংশ     বর্ণনাতেই      জান্নাতের     কথা       আলোচিত  হয়েছে।      বিশেষ        করে       সুরা       আর-রহমান,       সূরা ওয়াকিয়াহ,    সূরা দাহার  এবং  সূরা গাশিয়ায় সবচেয়ে বেশী  আলোচিত   হয়েছে   জান্নাত   ও   তার  অভ্যন্তরের  নেয়ামত সম্পর্কে। নবী করীম (ﷺ) ঐ সমস্ত আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়েছেন আরো  বেশী  বিস্তারিতভাবে। কেননা, শবে মি’রাজে  তিনি জান্নাত  ও  জাহান্নাম স্বচক্ষে  দর্শন করে   এসেছেন।   এজন্যই   তিনি   “শাহেদ”   বা   হাযির  নাযির     খেতাবে    ভূষিত।     তাই    কোরআন     ও    সহীহ হাদীসের    আলোকে    জান্নাতের     গঠন      ও      কাঠামো, জান্নাতের            রূপসৌন্দর্য,            জান্নাতের            দৈর্ঘ-প্রস্থ, জান্নাতীদের     রূপসৌন্দর্য,     হুরও    গিল্মান,    জান্নাতের আরাম আয়েশের বিবরণ ক্রমানুসারে দেয়া হলো।

(১) জান্নাতের গঠনাকৃতির বিবরণ

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস,
عن ابی    ھریرۃ رضی اللّٰہ عنہ قال  قلت  یا   رسول اللّٰہ مم خلق الخلق؟ قال  من الماء قلنا الجنۃ  ما  بنا  ؤھا  ؟ قال    لبنۃ    من   ذھب   من     فضۃ   ولاطھا    المسک   الازفر وحصباءھا   اللؤلؤ    والیاقوت۔   وتربتھا   الزعفران   ۔   من  یدخلھا   ینعم   ولا   یبأس   یخلد   ولا   یموت   ولا   یبلی  ثیابھم ولا یغنی مشبابھم (رواہ الترمذی والدارمی)

অর্থঃ    হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ)  হতে বর্ণিত।   তিনি বলেন-  আমি  রাসুলে   করিম  সাল্লাল্লাহু  আলাইহি  ওয়া  সাল্লামের  খেদমতে  আরয   করলাম-  ইয়া   রাসুলাল্লাহ্! সৃষ্টজগত    কিসের    থেকে   সৃষ্টি   হয়েছে?   (অর্থাৎ   সৃষ্ট জগতের উপাদান কি?) তিনি এরশাদ করলেন “পানির উপাদান থেকে”। আমরা পুনরায় প্রশ্ন করলাম- জান্নাত কিসের তৈরী?   হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি    ওয়া  সাল্লাম এরশাদ  করলেন-  “জান্নাতের   উপাদান   হচ্ছে-  একটি ইট স্বর্নের- অন্যটি রৌপ্যের  এবং গাথুনীর  মসলা হবে সুগন্ধ    মিশ্ক।   আর   তার    কাঠ   বা   খুটী   হবে   লুলু   ও ইয়াকুত পাথরের  এবং   তার  মাটি বা ভিটা  হবে সুগন্ধ জাফ্রান।  যেব্যক্তি  জান্নাতে  প্রবেশ  করবে,  সে  বিভিন্ন  ধরণের      নেয়ামত     ভোগ     করবে      এবং     বিভিন্নভাবে পুরস্কৃত   হবে-   কোন    প্রকারেই   নিরাশ   হবে   না।    সে মৃত্যুহীন চিরস্থায়ী হবে।  তাঁর  পোষাক পুরাতন   হবেনা  এবং যৌবনও ক্ষয়প্রাপ্ত  হবে  না-   বরং অটুট থাকবে”।  (মুসনাদে আহমদ, তিরমিযি ও দারামী)।

ব্যাখ্যাঃ এখানে বলা হয়েছে “পানি হতে সব কিছু সৃষ্ট। কিন্তু    হযরত   জাবেরের    হাদীসে   বলা   হয়েছে-   “নূরে মোহাম্মদী হতে সবকিছু সৃষ্ট”। কারণ কি?

এর    সমন্বয়     এভাবে     হবেঃ    নূরে    মোহাম্মদী    হতেই পানিসহ সবকিছু   সৃষ্ট।   এটা শতসিদ্ধ কথা।  তাই তার উল্লেখ     করার   প্রয়োজন    নেই।   তারপরে   পানি   হতে আসমান   জমীন   ও    মানুষের   উপাদান    সৃষ্টি   হয়েছে। অর্থাৎ-     পানি   সহ   প্রত্যেক   বস্তুতেই   নূরে   মোহাম্মদী হচ্ছে     মূল      উপাদান      এবং     পানি    হচ্ছে    আনুসঙ্গিক উপাদান। সৃষ্টিরহস্য ও সৃষ্টিতত্বের মৌলিক নীতি বিবৃত হয়েছে অত্র হাদীসে, বিস্তারিত বিষয় ও বিশ্লেষন বর্ণিত হয়নি। তদুপরি- “খাল্ক বা সৃষ্টজীব শব্দের মধ্যে নবীজী অন্তর্ভূক্ত নন”।  তিনি ছাড়া   সব বস্তুর মধ্যে পানি   হলো অন্যতম উপাদান। আব,  আতশ, খাক, বাদ-  এই চার উপাদানে  অন্যান্য   জড়  জিনিস  সৃষ্টি।  সুতরাং   “প্রথম সৃষ্টি”   শব্দটি   আপেক্ষিক।    প্রথমের    উপরেও   আরেক প্রথম     থাকতে     পারে।    অতএব     অত্র    হাদীসে    নূরে  মোহাম্মদীকে অস্বীকার করা হয়নি।

(২)   জান্নাতের  গেইট  বা  সিংহ     দরজা  কয়টি   ও   কি  কি?

জান্নাতে  বিভিন্ন  ধরণের   ও   সাইজের  গেইট  বা  সদর দরজা    হবে।  কাযী  আয়ায  (রহঃ)  ও   অন্যান্য  হাদীস বিশারদগনের  মতে  জান্নাতের  মেইন  গেইট  বা  সদর  দরজার সংখ্যা হলো  ষোল।  যথা- বাবু মুহাম্মদ, বাবুস সালাত,  বাবুস   সউম,   বাবুয  যাকাত,  বাবুস     সাদ্ক্বা, বাবুল হজ্ব, বাবুল ওমরাহ্, বাবুল জিহাদ, বাবুস সিলাহ্ (আত্মীয়তার বন্ধন),  বাবুল   কাযিমীনাল   গায়য (গোস্বা হজমকারীর   গেইট),  বাবুর   রাযীন  (তৃপ্তি    ও    সন্তুষ্টি), বাবুল   আয়মান   (বিনা   হিসাবে    জান্নাতীদের   দরজা),  বাবুত  তাওবাহ্,  বাবুর  রহমত,     বাবুল   ফারাহ্,  বাবুর রাইয়ান-   ইত্যাদি।  ইমাম    কুরতুবী   বলেন-  বেহেস্তের  মেইন  গেইটের  সংখ্যা  প্রসিদ্ধ  হলো  ৮টি।  বাকীগুলো  সংশ্লিষ্ট এবং  তুলনামূলক ছোট। এদিকে ইঙ্গিত  করেই আল্লাহ্পাক এরশাদ করেছেন,
وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا  رَبَّهُمْ  إِلَى الْجَنَّةِ زُمَرًا  حَتَّى    إِذَا  جَاؤُوهَا وَفُتِحَتْ أَبْوَابُهَا
অর্থঃ      “যারা      দুনিয়াতে       আল্লাহ্কে       ভয়       করতো, তাঁদেরকে  স্বসম্মানে   ফিরিস্তারা  দলে   দলে   জান্নাতের  দিকে    নিয়ে  যাবে।  যখন   তাঁরা   জান্নাতের  নিকটবর্তী  হবে এবং তাঁদের জন্য জান্নাতের গেইট ও দরজাসমূহ খোলা হবে”। (সূরা যুমার ৭৩ আয়াতের প্রথমাংশ)।

অত্র আয়াতে  أَبْوَابُ শব্দ  দ্বারা  জান্নাতের বিভিন্ন মেইন গেইটের  প্রতি   ইঙ্গিত  করা   হয়েছে।  এ  প্রসঙ্গে   ইমাম বুখারী  ও   ইমাম মুসলিম হযরত আবু হোরায়রা  থেকে  একখানা      হাদীস      বর্ণনা      করেছেন।      এই      হাদীসে  জান্নাতের   গেইট    সম্পর্কে   নবীজী  কয়েকটি   গেইটের কথা উল্লেখ করেছেন। যথা,
عن ابی   ھریرۃ  رضی  اللّٰہ   عنہ ان رسول اللّٰہ ﷺ  قال من انفق  زوجین فی  سبیل اللّٰہ نودی فی الجنۃ یا عبدا للّٰہ  ھذا    خیر  فمن   کان  من  اھل  الصلوۃ  دعی  من  باب الصلوۃ ومن کان من  اھل  الجھاد دعی  من  باب الجھاد۔ ومن  کان  من اھل الصدقۃ  ۔ دعی من باب   الصدقۃ ومن کان  من  کان  من   اھل  الصیام   دعی    من  باب  الریان۔ (بخاری ومسلم)

অর্থঃ  হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত।  তিনি বলেন-     রাসুলুল্লাহ্   সাল্লাল্লাহু   আলাইহি   ওয়া    সাল্লাম  এরশাদ   করেছেন-  “যেব্যক্তি   আল্লাহর    রাস্তায়   একই বস্তুর জোড়ায়  জোড়ায় (স্বর্ন  ও  রৌপ  অথবা দীনার ও দিরহাম) দান করবে- তাঁকে আল্লাহ্পাক জান্নাতে ডাক দিয়ে বলবেন, “হে   আল্লাহর বান্দা। ইহা তোমার  জন্য অতি    উত্তম”।    নবী    করীম    (ﷺ)    অতঃপর    বল্লেন-  “যেব্যক্তি   নামাযী   হবে-   তাঁকে   বাবুস   সালাত   গেইট  দিয়ে     ডেকে     ভিতরে    নিবেন।    মোজাহিদকে    ডেকে নিবেন বাবুল জিহাদ  দিয়ে। যাকাত ও  সাদক্বাকারীকে ডেকে নিবেন বাবুস সাদাক্বা দিয়ে। রোযাদারকে ডেকে নিবেন বাবুর রাইয়ান দিয়ে”। (বুখারী ও মুসলিম)।

ব্যাখ্যাঃ জান্নাতের  বিভিন্ন গেইট  হবে সাইনবোর্ডযুক্ত। যে  যা  আমল  করেছে,  তাঁকে  সে  নামের  গেইট  দিয়ে  জান্নাতের ভিতরে নেয়া হবে। যারা সব আমল করেছে- তাঁদের জন্য ১৬টি গেইট-ই   খোলা থাকবে। সে   যেটা দিয়ে ইচ্ছা  জান্নাতে প্রবেশ  করবে।  এটা যেন দুনিয়ার ভি.ভি.আই.পি. গেইট। আল্লামা কুরতুবী বলেন- হযরত ওমর (রাঃ) -এর  বর্ণিত হাদীসে উত্তমভাবে অযুকারীর জন্য  ৮   দরজা  খোলার  কথা   আছে-  যে  দরজা  দিয়ে ইচ্ছা- সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

ইমাম তিরমিযি  আবু দাউদ ও   নাছায়ী   এ  হাদীসখানা  বর্ণনা করেছেন।  ইমাম   কুরতুবী   বলেন- বিভিন্ন  সহীহ্ হাদীস    পর্যালোচনা   করে    আমি  ১৬টি  সদর  দরজার  প্রমান  পেয়েছি- যা   উপরে সংখ্যা দিয়ে বর্ণনা করেছি। মোট     কথা-   যত    প্রকারের   নেক   আমল   আছে-    সে  মোতাবেক      এক       একটি       গেইট      হবে।      সেজন্যই  আল্লাহ্পাক   সুরা    যুমার   -এ    أَبْوَابُ   বহুবচন    ব্যবহার করেছেন- সংখ্যা  নির্ধারিত করে বলেননি।  বুঝা  গেল- জান্নাতের মেইন গেইটের সংখ্যা  যার যার নেক আমল অনুযায়ীই    হবে।    ইহাই   সমস্ত   হাদীসের    মূল     কথা। আমরা যেন বাবু  মোহাম্মদ দিয়ে প্রবেশ করতে   পারি- এই প্রার্থনা।

(৩) বেহেস্তের মধ্যে প্রাসাদসমূহ ও তার বাসিন্দা

জান্নাতের  মধ্যে  প্রাসাদ  থাকবে  অনেক।  ঐ    প্রাসাদে থাকবে  অনেক বাড়ী। বাড়ীতে থাকবে অনেক ঘর। ঐ ঘর   বা  কামরাতে    থাকবে    অনেক  পালঙ্ক।  পালঙ্কের  উপরে   থাকবে  অনেক   বিছানা।  বিছানার   উপর    বসা থাকবে    হুর    বালা।    প্রত্যেক    ঘরে      থাকবে    খাদ্যের অনেক      খাঞ্চা।     প্রত্যেক      খাঞ্চাতে      থাকবে     বিভিন্ন রকমের খাদ্য।

এ   প্রসঙ্গে   হযরত  আবু  হোরায়রা  (রাঃ)  এবং  ইমরান ইবনে হোসাইন (রাঃ) থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে -

(৪) জান্নাতের প্রাসাদ ও বাড়ীঘর
عن  الحسین    قال   :   سألت  عمران  بن   حصین   واباھریرۃ رضی اللّٰہ  عنھما عن تفسیر ھذہ الاٰیۃ  (ومساکن  طیبۃ فی جنت عدن)  فقالا:  سألنا عنھا رسول اللّٰہ ﷺ فقال : قصر من لؤلؤۃ  فی  الجنۃ فی ذلک القصر سبعون دارا من یاقوتۃ حمراء فی کل دار سبعون بیتا من زہر جدۃ خضراء فی  کل بیت  سبعون سریرا ۔ علی کل  سریر سبعون فراشا من کل لون۔ علی فراش سبعون امراۃ من الحور العین فی کل بیت سبعون مائدۃ ۔ علی کل مائدۃ  سبعون  لونا من الطعام۔  فیعطی  اللّٰہ تبارک وتعالی   من القوۃ فی  غداۃ واحدۃ مایأتی علی ذلک کلہ (کتاب النصیحۃ)

অর্থঃ  হযরত  হাসান  বসরী  (রহঃ) থেকে  বর্ণিত-  তিনি বলেন-     আমি    হযরত   ইমরান   ইবনে   হোছাইন   এবং হযরত আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে- কালামে মজিদের সূরা তাওবাহ্র  ৭২  নম্বর আয়াতের   তাফসীর  ব্যাখ্যা   করার   জন্য     অনুরোধ      করলে   তাঁরা   বল্লেন-  আমরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু   আলাইহি    ওয়া সাল্লামের খেদমতে    উক্ত    আয়াতের    ব্যাখ্যা    জানতে    চেয়েছি।  আয়াতখানা    হলোঃ    وَمَسَاکِنَ    طَیِّبَۃً    فِیْ    جَنّٰتِ    عَدْنٍ  অর্থাৎঃ  “আল্লাহ্  ঈমানদার    নরনারীদেরকে  প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জান্নাতে   আদনের মধ্যে “পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন” ঘরের।

হুযুর করিম  সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম  “পরিচ্ছন্ন ঘর    সমূহের”    ব্যাখ্যা    করে    বল্লেন-    ঐগুলো    হলো-  জান্নাতের     প্রাসাদসমূহ-       যা     লুলু     পাথরের     তৈরী। প্রত্যেক প্রাসাদে   থাকবে লাল ইয়াকুত  পাথরের তৈরী ৭০টি   বাড়ী।   প্রত্যেক    বাড়ীতে  থাকবে  ৭০টি   সবুজ জমরুদ   পাথরের  ঘর। প্রত্যেকটি   ঘরে  থাকবে ৭০টি পালঙ্ক। প্রত্যেক পালঙ্কে   থাকবে  ৭০টি বিভিন্ন রংয়ের বিছানার        চাদর।       প্রত্যেক      চাদরে      বসা        থাকবে ডাগরচোখের   অধিকারিনী    ৭০   জন     হুরবালা।    আর থাকবে   প্রত্যেক   ঘরে   ৭০টি   খাদ্যের   খাঞ্চা   বা   ট্রে।  প্রত্যেক  খাঞ্চায়  থাকবে   ৭০   রকমের    সুস্বাদু  খাদ্য।   আল্লাহ্   তায়ালা   প্রত্যেক   মুমিন  পুরুষকে   ঐ  পরিমান যৌনশক্তি দান করবেন- যাতে সে প্রত্যেক হুরের সাথে একই  দিনে   মিলিত হতে পারে”। (“আন্-নসিহত” গ্রন্থ সুত্রেঃ আত্ তাযকিরাহ্ পৃষ্ঠা ৫৭০)।

(৫) জান্নাতে প্রত্যেকের বালাখানা ও কামরা সংখ্যাঃ

ইবনে   যায়েদ   তাঁর   পিতা   যায়েদ   (রাঃ)   হতে   বর্ণনা  করেন,
عن    زید  قال   :  قال   رسول   اللّٰہ  ﷺ  انہ  لیجاء  للرجل  واحدۃ     بالقصر   من   اللؤلؤۃ    الواحدۃ   ۔   فی   ذلک   القصر سبعون غرفۃ   فی کل  غرفۃ  زوجۃ  من الحور العین  ۔ فی کل غرفۃ سبعون بابا یدخل علیہ من کل باب رائحۃ من  رائحۃ الجنۃ۔ سوی  الرائحۃ  التی  تدخل علیہ من   الباب   الاخر۔  وقرا  قول  اللّٰہ  عزوجل (  فلا تعلم نفس ما اخفی لھم من قرۃ اعین) ذکر ابن وھب (التذکرۃ صفح ۵۰۸

অর্থঃ   যায়েদ   (রাঃ)   হতে   বর্ণিত-   তিনি   বলেন-   নবী  করীম      সাল্লাল্লাহু      আলাইহি     ওয়া      সাল্লাম     এরশাদ করেছেন, “প্রত্যেক জান্নাতী ব্যক্তিকে  একটি করে লুলু পাথরের  তৈরী  প্রাসাদ  দেয়া   হবে।  ঐ প্রাসাদে  ৭০টি কামরা     থাকবে।     প্রত্যেক     কামরায়     একজন     করে  ডাগরচোখ  বিশিষ্ট  হুর   দেয়া   হবে।  প্রত্যেক   কামরায় ৭০  টি  জানালা  থাকবে।  প্রত্যেক  জানালা  দিয়ে  ভিন্ন  ভিন্ন জান্নাতী সুগন্ধি আসতে থাকবে। একথা বলে নবী করীম   (ﷺ)   কোরআন  মজিদের     সূরা  সিজদাহ্র  ১৭  নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করে শুনালেন- যার অর্থ হলো “কেউ   জানেনা    তাঁদের   জন্য   নয়ন   জুড়ানো   কি    কি প্রতিদান  ও  নেয়ামত লুক্কায়িত রাখা  হয়েছে”।  (ইবনে ওয়াহাব সুত্রে তাযকিরাহ্ ৫০৮ পৃষ্ঠা)

(৬) চতুষ্কোন  বিশিষ্ট স্বর্ণের বালাখানা হযরত ওমরের  জন্য নির্ধারিত
عن برید بن الخصیب رضی  اللّٰہ عنہ  قال  :  اصبح رسول اللّٰہ فدعا بلا لا فقال :  یا بلال بما سبقتنی الی الجنۃ ؟ فما دخلت الجنۃ  قط الا  سمعت   خشخشتک امامی   دخلت  الجنۃ البارحۃ  فسمعت  خشخشتک  امامی ۔   فاتیت علی  قصر بربع   مشرف  من  ذھب  فقلت   لمن ھذا  القصر ؟  قالوا لرجل عربی ۔ فقلت انا عربی لمن ھذا القصر قالوا الرجل من قریشی  ۔ قالت  انا قریشی لمن ھذا القصر قالوا لرجل من امۃ محمد ۔ قلت انا محمد ۔ لمن ھذا القصر ؟ قالوا لعمر بن  الخطاب  ۔   فقال  بلال   یا   رسول    اللّٰہ     ما   اذانت  قط الاصلیت  رکعتین  وما  اصابنی  حدث  الاتوضأ  عندہ  ۔  ورایت   ان  اللّٰہ  تعالی   رکعتین  ۔  فقال    رسول  اللّٰہ  ﷺ بھما ۔ خرجہ الترمذی۔

অর্থঃ হযরত  বারীদ ইবনে  খাসীব   (রাঃ) হতে  বর্ণিত। তিনি  বলেন-  “একদিন  সোব্হে  সাদেকের  সময়  নবী  করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিদ্রা থেকে উঠে হযরত    বেলাল    (রাঃ)    কে    ডাকলেন    এবং    এরশাদ  করলেন-   “হে   বেলাল!   কোন্   আমলের   কারণে   তুমি  আমার    পূর্বে   জান্নাতে   প্রবেশ    করেছো?   আমি   যখন জান্নাতে প্রবেশ করলাম, তোমার পায়ের মৃদু আওয়াজ আমার সামনে শুনলাম। আমি গতরাত্রে জান্নাতে প্রবেশ করে  আমার   সামনে   তোমার   পায়ের   নরম  আওয়াজ শুনতে পেয়েছি”।

আর    শুন,   আমি  স্বর্নের   চতুষ্কোন  বিশিষ্ট  উঁচু    একটি  বালাখানায় গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- এই বালাখানা কার জন্য নির্মিত? ফিরিস্তারা জবাব দিলো- একজন আরবী লোকের  জন্য  তৈরী    হয়েছে।  আমি   বললাম-   আমিই  তো    আরবী।   বলো-    কার    জন্য     এটি   তৈরী?   তাঁরা বললো-    কোরাইশ   বংশের    একজন   লোকের   জন্য। আমি   বললাম-  আমিই   তো  কোরাইশী  লোক।  বলো- কার   জন্য   এটি  নির্মিত?  তাঁরা  বললো-   না,  আপনার জন্য    নয়-   বরং   তিনি     মুহাম্মদ   (ﷺ)   -এর   একজন উম্মত।   আমি   বললাম-   আমিই   তো   মুহাম্মদ   (ﷺ)।  আমার   সে    উম্মত  কে?   তাঁরা   বললো-   ওমর  ইবনুল খাত্তাব” (রাঃ)।

হযরত  বেলাল    (রাঃ)   এ  কাহিনী   শুনার   পর   হুযুরের  প্রশ্নের  জবাবে আরয করলেন-  ইয়া রাসুলাল্লাহ্ (ﷺ)! আমার  মনে   হয়-  আমার  উক্ত   মর্তবার  কারণ  হলো-   আমি  যখনই   আযান   দিই-    তখন   দু  রাকআত    নফল পড়ে    নিই।     আর  যখনই   আমার  অযু  ভঙ্গ  হয়ে  যায়- সাথে      সাথেই  অযু  করে  নিই।   আযানের  পর  আমার উক্ত দু রাকাআত নফল নামায আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই পড়ি। হুযুর (ﷺ) এরশাদ করলেন- হাঁ, উক্ত দু কারণেই তোমার ঐ মর্তবা হয়েছে”। (তিরমিযি)।

ব্যাখ্যাঃ আযানের পর দু’রাকআত  নফল এবং দায়েমী  অযুর কারণে হযরত বেলাল (রাঃ) জান্নাতের ঐ মর্তবা পেয়েছিলেন। এখন প্রশ্ন হলো- হুযুর (ﷺ) -এর আগে আগে    কেন     চলার    শব্দ?    পিছনে     হলো    না    কেন? আল্লামা    কুরতুবীসহ    হাদীস    বিশেষজ্ঞগণ    বলেছেন-  খাদেম ও সেবক   হিসাবে মুনিবের  আগে  আগে চলাই  রীতি   ও  নিয়ম। যেমন প্রধান মন্ত্রীর    আগে আগে চলে  সিকিউরিটি গার্ড  ও  খাদেমগণ। তাঁরা রাস্তার দুপাশের লোকদেরকে    প্রধান     মন্ত্রীর   আগমনের   ইঙ্গিত    দিতে থাকে-   যেন   লোকেরা   সম্মান  প্রদর্শনের   জন্য   প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

এই হাদীসে পরিষ্কার হয়ে গেলো-  হযরত ওমর (রাঃ) -এর জন্য জান্নাতে স্বর্নের আলীশান উঁচু প্রাসাদ পূর্বেই তৈরী হয়ে  আছে  এবং নবীজী বাহির থেকে   তা   দেখে এসেছেন।   শিয়া  সম্প্রদায়  দিনরাত   ২৪  ঘন্টা   হযরত ওমরের (রাঃ) উপর লা’নত  বর্ষণ  করে থাকে। সুতরাং শিয়া  সম্প্রদায়  যে   বাতিল   ও   ভ্রান্ত  বেদআতী  ফের্কা-  এতে কোনই  সন্দেহ নেই।   একদল শিয়া হযরত  আবু বকর    (রাঃ) কেও গালাগালি  করে  থাকে, তাঁকে তারা সাহাবী    বলেও     স্বীকার    করে    না।      একারণে    তারা  কাফির।      কেননা,      আল্লাহ্পাক         কোরআনের      সূরা তাওবার    ৪০   নম্বর    আয়াতে    তাঁকে    “সাহাবী”   বলে  ঘোষণা   করেছেন।   পূর্বে   এক   হাদীসে   বলা   হয়েছে-  “উম্মতের   মধ্যে    সর্বপ্রথম    আমলনামা   হাতে   আসবে  হযরত    ওমরের।   হযরত   আবু    বকরকে   এর    পূর্বেই  জান্নাতে       পৌঁছিয়ে       দেয়া       হবে”।       (দেখুন       উড়ন্ত  আমলনামা অধ্যায়)। এখন এই দুই সাহাবীকে একদল শিয়া  সকাল  সন্ধ্যায়   লা’নত  দিয়ে  থাকে।   তাই  তারা কাফির       ও       বাতিল।       (দেখুন       মম       রচিত       শিয়া  পরিচিতি)।

(৭)    সূরা   ইখ্লাস   ১০   বার   পাঠে    জান্নাতের   একটি প্রাসাদ
عن  سعید  بن المسیب یقول  ای  نبی اللّٰہ ﷺ  قال:  من   قرأ سوۃ  الاخلال عشر مرات بنی لہ  قصر فی الجنۃ  ۔ ومن قرأھا عشربن  مرۃ  بنی  لہ    قصران  فی  الجنۃ  ومن قرأ ھا تثلثین مرۃ  بنی لہ قصر فی الجنۃ ۔ فقال عمر بن الخطاب رضی اللّٰہ اذا   لتکثرن قصورنا فقال  رسول اللّٰہ ﷺ  اللّٰہ اوسع من ذلک ۔ رواہ الدارمی

অর্থঃ  তাবেয়ী    হযরত   সায়ীদ  ইবনে  মুসাইয়েব  (রাঃ) বলেছেন-  নবী করীম সাল্লাল্লাহু  আলাইহি  ওয়া সাল্লাম ইরশাদ       করেছেন-        “যেব্যক্তি      সূরা       ইখ্লাস       বা কুলহুয়াল্লাহ্      ছুরা    দশবার    পাঠ    করবে-    তার    জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ  বা বালাখানা তৈরী   করা হবে। বিশবার   পড়লে    দুটি   এবং    ত্রিশবার      পড়লে   তিনটি বালাখানা তৈরী হবে। একথা শুনে হযরত ওমর ইব্নুল খাত্তাব  আরয করলেন- তাহলে তো   আমাদের প্রাসাদ  বা  বালাখানার সংখ্যা   অনেক   হয়ে  যাবে। নবী করীম  (ﷺ)   এরশাদ    করলেন    “আল্লাহ্   এর   চেয়েও   বেশী প্রশস্ত”। (দারামী শরীফ)।

(৮)    জান্নাতের   বিছানার   ফরশ   বা     চাদর    উঁচু    হবে আকাশ ছোঁয়া
عن ابی  سیعد  الخدری رضی   اللّٰہ  عنہ عن النبی   ﷺ  فی  قولہ  تعالی  ۔  وقرشی  مرفوعۃ  ۔  قال  ارتفاعھا  لکما  بین      السماء    والارض    مسیرۃ     خمسماءۃ     عام۔     رواہ الترمذی۔
অর্থঃ   হযরত   আবু   সায়ীদ  খুদরী  (রাঃ)  হতে    বর্ণিত। তিনি   বলেন-      নবী   করীম     সাল্লাল্লাহু   আলাইহি   ওয়া সাল্লাম    ইরশাদ    করেছেন-    “আল্লাহ্পাকের    কালাম-  “ওয়া   ফুরুশিম   মারফুআতিন”   -এর   অর্থ   হলো-   উঁচু  ফরশ  বা বিছানার চাদর। এর পরিমান  হলো আসমান যমীনের       দূরত্বের       সমান       (পাঁচশত       বৎসরের)”।  (তিরমিযি শরীফ)।

(৯) জান্নাতের درجات বা বিভাগ

হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রাঃ) বর্ণনা করেন,
عن ابی سعید الخدری  رضی اللّٰہ عنہ  عن النبی  صلی اللّٰہ   ﷺ   قال   ان   الجنۃ   مأۃ   درجۃ   ۔   لو   ان   العالمین  اجتمعوا  فی احداھن  لو سعتھم   ۔  رواہ    الترمذی وقال حدیث غریب۔
অর্থঃ    হযরত   আবু   সায়ীদ   খুদরী   (রাঃ)    নবী    করীম সাল্লাল্লাহু       আলাইহি       ওয়া       সাল্লাম       থেকে       বর্ণনা  করেছেন--  “জান্নাতের  দারাজাত বা  বিভাগ একশটি। তার একটি বিভাগে যদি সমগ্র সৃষ্টজগত একত্রিত করা হয়-   তাহলে   তাও   সঙ্কুলান   হয়ে   যাবে”।   (তিরমিযি-  হাদীসে গরীব সুত্রে)।

(১০)     তোমরা      জান্নাতুল     ফিরদাউস      -এর     প্রার্থনা করবে
عن معاذ  بن  جبل رضی اللّٰہ عنہ قال سمعت رسول  اللّٰہ یقول ۔ الجنۃ مأۃ   درجۃ کل درجۃ  منھا  ما بین السماء والارض   وان   اعلاھا   الفردوس   وسطھا   الفردوس   ۔   وان  العرش   علی    الفردوس  ۔  منھا  تفجر  انھار  الجنۃ   ۔  فاذا سألتم     اللّٰہ    فاسئلوہ    الفردوس   ۔   رواہ   الترمذی     (قال الترمذی عطاء ھذا لم یدرک معاذ بن جبل )

অর্থঃ   হযরত মুয়ায ইবনে  জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে   একথা  এরশাদ  করতে   শুনেছি-  “জান্নাতে  একশত  দরজা  বা বিভাগ রয়েছে। এক একটি বিভাগ  আসমান   যমিনের   মধ্যবর্তী   স্থানের   সমান।   উম্মতের  জন্য  জান্নাতের  মধ্যে  সর্বোচ্চ  ও  উত্তম  জান্নাত  হলো  ফিরদাউস। ফিরদাউসের উপরে হলো আরশে আযীম। এই জান্নাতুল  ফিরদাউস থেকে বেহেস্তের   চারটি  নহর প্রবাহিত হয়। (পানি, দুধ, মধু ও পবিত্র শরাব)। যখনই তোমরা  আল্লাহর  কাছে  বেহেস্ত  প্রার্থনা   করবে-   তখন জান্নাতুল    ফিরদাউস-ই    প্রার্থনা     করবে”।    (তিরমিযি  মুনকাতা সুত্রে- মুয়ায থেকে)।

ব্যাখ্যাঃ    আটটি    বেহেস্তের   মধ্যে    সর্বোচ্চ   “জান্নাতুল   আদন”   আম্বিয়ায়ে    কেরামের   জন্য    নির্ধারিত।   বাকী  ৭টির মধ্যে ফিরদাউস হলো সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম। এটি ঈমানদার  ও  নেক  আমলধারী  নিখুঁত  লোকদের  জন্য  বরাদ্দকৃত।   এই   সর্বোচ্চ   জান্নাত  প্রার্থনা  করার  জন্য  নবীজীর পরামর্শের কারণ হলো- নবীগণের মধ্যে তিনি হলেন   সর্বশ্রেষ্ঠ।    উম্মতের   মধ্যে    উম্মতে     মোহাম্মদী হলো সর্বশ্রেষ্ট   এবং জান্নাতের  মধ্যে (“নবীগণকে বাদ দিয়ে”)   জান্নাতুল  ফিরদাউস   হলো   সর্বশ্রেষ্ঠ।   সুতরাং সর্বশ্রেষ্ঠ  নবীর   সর্বশ্রেষ্ঠ  উম্মত  হয়ে  সর্বশ্রেষ্ঠ   জান্নাত   কামনা করাই যুক্তিসঙ্গত।

(১১)  কোরআনের  আয়াতের    সংখ্যা   যত-   জান্নাতের  বিভাগও ততঃ

হযরত  ইবনে  আব্বাস  ও  হযরত  আয়েশা  (রাঃ)  -এর  বর্ণনা
عن عبد     اللّٰہ بن عباس رضی اللّٰہ  عنھما عن  النبی  ﷺ قال: درج الجنۃ علی عدد آی القرآن لکل آیۃ درجۃ ۔ فتلک ۔ فتلک ستۃ آلاف ومائتا اٰیۃ وستۃ عشر آیۃ ۔ بین کل درجتین مقدار ما بین  السماء والارض۔ وینتھی بہ الی  اعلی علیین  ۔  لھا  سبعون  الف   رکن  وھی یا   قوتۃ تضیئی مسیرۃ ایام ولیالی ۔

وقالت  عائشۃ  رضی اللّٰہ  عنھا  ان  عدد  آی  القران   علی عدد درج  الجنۃ فلیس  احدیدخل الجنۃ   ۔ افضل ممن قرأ  القران  ۔ وذکرہ  مکی  رحمۃ  اللّٰہ  علیہ۔  کتاب الاختیار   فی  الملح من  الاخبار  والآثار لابی   حفص  عمر  بن عبد  المجید القرشی المیانشی)
অর্থঃ    হযরত     আবদুল্লাহ্   ইবনে    আব্বাস   (রাঃ)    নবী করীম       সাল্লাল্লাহু      আলাইহি       ওয়া        সাল্লাম      থেকে রেওয়ায়াত      করেন-      নবী        করীম      (ﷺ)      এরশাদ করেছেন- “কোরআনের  আয়াতের  সমপরিমান  সংখ্যা হলো   জান্নাতের   দরজা     বা   বিভাগ     সমূহের।   ইবনে আব্বাস    বলেন-   “কোরআনের    আয়াত   হলো   ৬২১৬ (ছয়     হাজার    দুইশত     ষোল)।    দু’বিভাগের    মধ্যবর্তী স্থানের   দূরত্ব   হলো   আসমান   যমীনের   মধ্যবর্তীস্থান।  এক  একটি  বিভাগ  “আ’লা  ইল্লিয়্যিন”      এ  গিয়ে   শেষ হয়েছে। জান্নাতের মধ্যে খাম্বা রয়েছে সত্তর হাজার। ঐ খাম্বাগুলো      ইয়াকুত      পাথরের      তৈরী।     এর     আলো কয়েকদিনের রাস্তা পর্য্যন্ত বিস্তৃত”।

হযরত    আয়েশা    (রাঃ)     হতে    বর্ণিত।     তিনি    বলেন- “কোরআনের   আয়াতের  সংখ্যা হলো বেহেস্তের দরজা বা   বিভাগ    সমূহের   সংখ্যার    সমপরিমান”।    জান্নাতে  প্রবেশকারীদের        মধ্যে        কোরআন        পাঠকারী        বা  আলেমের চেয়ে উত্তম আর অন্য কেউ হবেনা”।

(মশহুর      ক্বারী  মাক্কী   তাঁর  ফাওয়ায়েদে  মাক্কিয়ায়  মা  আয়েশার  রেওয়ায়াতটি  বর্ণনা   করেছেন-  আবু   হাফ্স ওমর  ইবনে  আবদুল    মজিদ   ক্বারশী   মিয়ান্শী   কর্তৃক  রচিত    কিতাব    আল    ইখ্তিবার     ফিল     মিল্হি    মিনাল আখ্বার ওয়াল আছার গ্রন্থে”)।

ব্যাখ্যাঃ  হযরত  ইবনে  আব্বাসের  বর্ণনায়   দেখা   যায়- কোরআনের      আয়াতের        সংখ্যা      ৬২১৬      টি      এবং  জান্নাতের বিভাগও ৬২১৬ টি। কিন্তু মা আয়েশা (রাঃ)- এর   বর্ণনায়   সংখ্যা   নেই।   তাই   বিষয়টি   গবেষণা   ও  পর্যালোচনার  দাবী   রাখে।   অন্য   মশহুর   রেওয়ায়াতে দেখা   যায়-  কোরআনের   আয়াত হলো  ৬৬৬৬। ইহাই মশহুর।  এই  দুই    বিপরীত  সংখ্যার  সমাধান  কিভাবে করা যায়?

এর    জবাব   হলো-   হযরত   ইবনে   আব্বাসের   বর্ণনার  মধ্যে-
فتلک ستۃ الاف ومائتا اية وستة عشر
অংশটুকু  নবী    করীম   (ﷺ)   অথবা  ইবনে   আব্বাসের বাণী   কিনা-   এ   নিয়ে   মতভেদ   আছে।   কেননা,   নবী  করীম    (ﷺ)    যদি   সঠিকভাবে    ৬২১৬   আয়াত   বলে থাকতেন-  তাহলে  মশহুর  রেওয়ায়াতে  কি  করে  তার  খেলাফ  ৬৬৬৬  বলা    হলো?   বুঝা    গেল-   অন্য  কেউ  হয়তো  এ  সংখ্যাটি  হাদীসের  মধ্যে  ঢুকিয়ে  দিয়েছেন  এবং      এটাকে      ইবনে     আব্বাসের     উক্তি      বলেছেন। আরবীতে    এটাকে   مندرج   বা   অনুপ্রবেশ   বলা   হয়।  মশহুর  বর্ণনা   অনুযায়ীই  আমল    করা   হচ্ছে।   বর্তমান কোরআনের  বাংলা   অনুবাদে আয়াতের  সংখ্যা  বিভিন্ন রকম    দেখা   যায়।   তাফসীরে     রূহুল   বয়ান    অনুযায়ী কোরআনের   আয়াতের   সংখ্যা  সর্বাধিক  ৬২৬৫  এবং  রূহুল মাআনীতে সর্বাধিক ৬২৮৯। মক্কা, মদিনা, কুফা, বসরা      ও      সিরিয়ার      ক্বেরাত      বিশেষজ্ঞদের         মতে আয়াতের    মোট   সংখ্যার   মধ্যে   তারতম্য    লক্ষ্য   করা যায়। সুতরাং মশহুর বর্ণনাকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ ওলামাগণ গ্রহণ করে বলেছেন- আয়াতের সংখ্যা ৬৬৬৬।

আয়াতের সংখ্যার  মধ্যে  পার্থক্য হওয়ার  কারণ হলো- বড়      বড়     আয়াতকে     কেউ    কেউ    কয়েকটি    আয়াত ধরেছেন- যেমন, “যালিকাল    কিতাবু   লা-রাইবা ফিহী, হুদাললিল   মুত্তাকীন”   একটি     আয়াতকে   কেউ     কেউ  তিনটি  আয়াত    ধরেছেন।  আবার  অনেকে  ছোট  ছোট কয়েকটি আয়াত মিলিয়ে এক আয়াত গণনা করেছেন। বর্তমানে  যারা   চ্যালেঞ্জ  করে-    তারা    কিন্তু  এ   বিষয়ে  কোন     জ্ঞানই   রাখেনা।   পরের   হিসাবে   তারা    হিসাব করে।    অনুবাদ    ও    তাফসীর    গ্রন্থের    মধ্যে    সংখ্যার  পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

হযরত    আয়েশা    সিদ্দিকা     (রাঃ)-    এর    অত্র    বর্ণনায়  ক্বারীগণের যে মর্যাদা বয়ান করা হয়েছে- এর বিশ্লেষণ করে   ইমাম  কুরতুবী     (রহঃ)  বলেছেন-  এখানে   ক্বারী অর্থে “হামিলুল কোরআন” তথা কোরআন বিশেষজ্ঞকে বুঝানো   হয়েছে-   যারা   কোরআনে   বর্ণিত   বিধিবিধান  যথাযথভাবে বুঝেন এবং সে মোতাবেক আমল করেন। তারাই জান্নাতীদের মধ্যে  সর্বোত্তম ব্যক্তি হবেন”। ১০ নম্বর  হাদীসে  জামাতের বিভাগ  বলা হয়েছে একশত। উক্ত   বর্ণনা    চুড়ান্ত   নয়।    এরপরেও      বিভাগ   থাকতে  পারে।

(১২)    জান্নাতের    غرفات    বা     কামরার     সংখ্যা    এবং  বাসিন্দাদের বর্ণনা

আল্লাহ্পাক         জান্নাতের        কামরাসমূহ         এবং        তার বাসিন্দাদের সম্পর্কে সংখ্যা ছাড়াই সাধারণভাবে বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে,
لَكِنِ   الَّذِينَ   اتَّقَوْا   رَبَّهُمْ    لَهُمْ     غُرَفٌ    مِّن   فَوْقِهَا     غُرَفٌ  مَّبْنِيَّةٌ
অর্থঃ   “কিন্তু   যারা   তাঁদের   পালনকর্তাকে    ভয়    করে,  তাঁদের   জন্য নির্মিত রয়েছে   প্রাসাদের কামরার উপর  কামরাসমূহ”। (সূরা যুমার ২০ আয়াত)।

অন্য আয়াতে বর্ণনা করেছেন,
إِلَّا مَنْ  آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا  فَأُوْلَئِكَ    لَهُمْ  جَزَاء الضِّعْفِ   بِمَا  عَمِلُوا وَهُمْ فِي الْغُرُفَاتِ آمِنُونَ
অর্থঃ         (তোমাদের          ধনসম্পদ          ও         সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে  আমার নিকটবর্তী  করতে পারবে  না।   ) “তবে-   যারা   ঈমান   এনেছে   এবং   সৎকাজ   করেছে,  তাঁদের জন্য  রয়েছে- তাঁদের কাজের বিনিময়ে বহুগুণ পুরষ্কার। তাঁরা কামরাসমূহে নিরাপদে থাকবে”। (সূরা সাবা ৩৭ আয়াত)।

অন্য আয়াতে আল্লাহ্ পাক বলেছেন,
أُوْلَئِكَ    يُجْزَوْنَ   الْغُرْفَةَ    بِمَا    صَبَرُوا    وَيُلَقَّوْنَ     فِيهَا   تَحِيَّةً  وَسَلَامًا
অর্থঃ   “যারা    বিভিন্ন    সৎকাজে    কষ্ট   স্বীকার   করেছে, তাঁদেরকে        তাঁদের       সবরের       বিনিময়ে        প্রাসাদের কামরাসমুহ    দেয়া     হবে    এবং     তাঁদেরকে    দোয়া    ও সালামসহ    তথায়    অভ্যর্থনা     জানানো     হবে”।    (সূরা ফুরকান ৭৫ আয়াত)।

বুঝা গেল- জান্নাতে অসংখ্য কামরা হবে।

(১৩)   নবী  করীম (ﷺ)  উক্ত আয়াত  সমূহের ব্যাখ্যায় জান্নাতের  প্রাসাদের  কামরা   সমূহের  বর্ণনা   দিয়েছেন এভাবে-
عن  سھل  بن سعد ان  رسول   اللّٰہ ﷺ قال ان اھل الجنۃ لیتراء   ون اھل  الغرف من فوقھم کما تتراء    ون  الکوکب الدری الغائر فی الافق من المشرق او المغرب لتضاضل ما بینھم   ۔   قالوا  یا  رسول    اللّٰہ  تلک   منازل  الانبیاء   لا یبلغھا  غیرھم؟    قال:  بلی   والذی    نفسی  بیدہ۔  رجال آمنوا باللّٰہ وصدقوا المرسلین۔

অর্থঃ   হযরত  সাহল   ইবনে   সাআদ   (রাঃ)  নবী  করীম (ﷺ)  থেকে   বর্ণনা   করেছেন।  নবীজী     (ﷺ)  বলেন- “সাধারণ            জান্নাতবাসীরা            প্রাসাদের            কামরায়  বসবাসকারী     বিশেষ      লোকদেরকে      উপরের     দিকে তাকিয়ে দেখতে পাবে- যেভাবে তোমরা উপরের দিকে তাকিয়ে দুরবর্তী উজ্জল তারকা দেখতে পাও-  সকালে বা সন্ধ্যায়। এটা এজন্য যে, কর্ম অনুযায়ী তাঁদের মধ্যে মর্তবার এই পার্থক্য হবে”।

সাহাবায়ে   কেরাম  একথা  শুনে  আরয  করলেন-     ইয়া  রাসুলাল্লাহ্!  ইহা   তো   মনে  হয়   নবীগণের   শান।  এই মর্যাদা  তো  তাঁদেরই প্রাপ্য? হুযুর  (ﷺ) বললেন- হাঁ,  তবে   অন্যরাও পাবে। যে আল্লাহর হাতে আমার   প্রাণ, তাঁর শপথ  করে   বলছি- ঐসমস্ত   লোকেরাই এ   মর্তবা পাবে-যারা  মনেপ্রাণে  আল্লাহ্কে  বিশ্বাস  করেছে  এবং  বিনাবাক্যে নবীগণকে সত্য বলে জেনেছে”।

(হযরত  সাহ্ল -এর অন্য   রেওয়ায়াতে তিরমিযি শরীফে আছে-   এ    মর্তবাধারীদের     মধ্যে   হযরত   আবু   বকর   (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ) রয়েছেন- মুসলিম শরীফ)।

(১৪)   জান্নাতী   প্রাসাদের   কামরা   ৪   প্রকার   লোকের  জন্য,
عن علی رضی اللّہ عنہ  قال قال رسول اللّٰہ ﷺ ان فی  الجنۃ لغرفا یری ظھورھا من بنونھا ویطونھا من ظھورھا فقام   الیہ اعرابی فقال :  لمن  ھی  یا رسول اللّٰہ،  وقال   لمن  اطاب   الکلام  واطعم  الطعام  وادام الصیام  وصلی اللّٰہ باللیل والناس نیام۔ (ترمذی)

অর্থঃ  হযরত  আলী  (রাঃ)   হতে   বর্ণিত।   তিনি  বলেন- নবী  করীম    সাল্লাল্লাহু  আলাইহি   ওয়া  সাল্লাম  এরশাদ করেছেন-   “জান্নাতের   প্রাসাদ   সমূহের   মধ্যে   অনেক  অনেক কামরা আছে। উহার ভিতর থেকে বাহির দেখা যাবে এবং বাহির থেকেও   ভিতর দেখা যাবে” (কাঁচের মত স্বচ্ছ)।

একথা    শুনে     জনৈক    গ্রাম্য    সাহাবী     দাঁড়িয়ে    আরয করলেন- কার জন্য এই কামরাসমূহ- ইয়া রাসুলাল্লাহ্? নবী  করীম  সাল্লাল্লাহু   আলাইহি   ওয়া  সাল্লাম   এরশাদ করলেন-  “চার প্রকার   লোকের জন্য-   যথা- (১) যারা  উত্তম কথা  বলে, (২) যারা খাদ্য  দান করে, (৩)  যারা সর্বদা   নফল    রোযা পালন করে এবং (৪)  যারা   রাত্রে আল্লাহর   নামায  পড়ে-   যখন   অন্য  (ধর্মের)   লোকেরা নিদ্রাবিভূত থাকে”। (তিরমিযি)।

(১৫    ক)   উপরের    হাদীসখানার   ব্যাখ্যাস্বরূপ   হযরত জাবের (রাঃ) এভাবে বর্ণনা করেছেন,
عن جابر بن عبد اللّٰہ رضی اللّٰہ عنھما قال خرج علینا رسول   اللّٰہ  ذات  یوم  فقال  :  الا  اخبرکم  بغرف  الجنۃَ   ؟ غرفا   من   الوان    الجواھر   یری   ظاھرھا      من   باطنھا   ۔ وباطنھا    من      ظاھرھا     ۔      فیھا    من    النعیم    الثواب۔ والکرامات مالا اذن  سمعت   ولا عین رأت ۔ فقلنا  بابینا  انت  وامنا۔  یا  رسول  اللّٰہ   لمن  تلک؟   فقال  لمن  افشی السلام   وادام   الصیام   واطعم   الطعام   وصلی   والناس  نیام ۔فقلنا بابینا انت وامنا یا رسول  اللّٰہ  ومن یطیق  ذلک؟ فقال امتی تطیق ذلک وسأخبرکم من یطیق ذلک ۔ من لقی اخاہ  السلم فسلم  علیہ فقد افشی السلام۔ ومن اطعم   اھلہ وعیالہ من  الطعام حتی یشبعھم فقد اطعم  الطعام ۔ ومن صام من رمضان ومن کل شھر ثلاثۃ ایام فد ادام الصیام ۔ ومن صلی العشاء الاخیرۃ فی جماعۃ فقد صلی والناس نیام ای الیھود والنصاری والمجوس ۔ ( ابونعیم)

অর্থঃ    হযরত    জাবের    ইবনে    আবদুল্লাহ্    রাদিয়াল্লাহু  আনহুমা  থেকে   বর্ণিত।  তিনি  বলেন-  একদিন   রাসুল  করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে এসে     উপস্থিত     হয়ে    এরশাদ    করলেন-     “আমি     কি তোমাদেরকে        জান্নাতের        প্রাসাদের        কামরাগুলো  সম্পর্কে  কিছু জানাবো না? একটি  কামরা  হবে মূক্তার রংয়ের মত- যার ভেতর থেকে বাইরে দেখা যাবে এবং বাইরে থেকেও ভিতর দেখা যাবে। ঐ কামরায় থাকবে এমন    সব  অগনিত     নেয়ামত,  পুরষ্কার  ও  মর্যাদাপূর্ণ  বস্তু-  যা কারো কর্ন  কোনদিন শ্রবণ  করেনি এবং কোন চক্ষুও তা কোনদিন অবলোকন করেনি”।

হযরত       জাবের       বলেন-      আমরা      আরয      করলাম- আমাদের পিতামাতা  আপনার  চরণে উৎসর্গীত  হোক- হে    আল্লাহর    প্রিয়রাসুল!    ঐ   কামরাসমূহ    কার   জন্য  নির্ধারিত?   হুযুর  (ﷺ)   বল্লেন-    চার  প্রকার   লোকের  জন্য। যথা- (১) “যারা সালাম প্রথার প্রসার ঘটায়, (২) যারা সর্বদা রোযা রাখে, (৩) যারা খাদ্যদান করে এবং (৪)   যারা   নামায   আদায়   করে-   যখন   অন্য   (ধর্মের)  মানুষ ঘুমন্ত থাকে”।

আমরা  পুনরায়  আরয  করলাম-   আমাদের  পিতামাতা  আপনার    চরনে    উৎসর্গ    করতে    আমরা     প্রস্তুত-     হে আল্লাহর প্রিয়রাসুল!  আমাদের মধ্যে   এমন  সাধ্য  কার আছে?  হুযুর সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম  এরশাদ করলেন- আমার প্রত্যেক  উম্মতেরই এই   সাধ্য আছে। এখন  আমি  তোমাদেরকে  আমার  কথার  ব্যাখ্যা  করে  বলছি    (১)     যারা    আপন     মুসলমান    ভাইয়ের     সাথে মোলাকাত হলে ছালাম বিনিময়  করে-  তারাই    সালাম সম্প্রসারিত     করে।  (২)  যারা   আপন  সন্তান-সন্ততি   ও পরিবারস্থ  লোকদেরকে তৃপ্তি সহকারে  খাদ্য খাওয়ায়- তারাই খাদ্যদানকারী  বলে  গণ্য। (৩)  যারা  রমযানের রোযাসহ    প্রতিমাসে   তিন   দিনের   (আইয়ামে    বীজের রোযা)  নফল  রোযা  পালন  করে,  তারাই  জীবনব্যাপী  রোযাদার      বলে     গণ্য।      (৪)     আর-     যারা      মানুষের (ইয়াহুদ,     নাছারাও     অগ্নিপূজক)     নিদ্রাবস্থায়     এশার  নামায জামাতে আদায় করে- তারাই সদা নামাযী বলে গণ্য”।

ঘুমন্ত    মানুষ   বলতে-   ইহুদী,    নাসারা    ও    মজুসীদের   বুঝানো   হয়েছে।   কেননা,   মুসলমান   তো   এমনিতেই  জাগ্রত থেকে নামায আদায় করে। (আবু নোয়াঈম)।

ব্যাখ্যাঃ অত্র হাদীসে সাহাবায়ে কেরামের  বিনয়, ভক্তি ও   নবী     প্রেমের    উজ্জ্বল     প্রমাণ   পাওয়া    যায়।    তাঁরা সবসময় নবীজীর চরণে পিতামাতাকে  কোরবান দিতে প্রস্তুত ছিলেন। জান্নাতের একটি কাম্রা পাওয়ার আশায় তাঁরা ছিলেন ব্যাকুল। নবী করীম (ﷺ) প্রথমে যেভাবে কথা বলেছেন-   তাতে মনে হয়েছিল- উক্ত চারটি কাজ খুবই  কঠিন। কিন্তু   নবীজী  নিজেই ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিলেন- চারটি কাজের অর্থ কী।

হুযুর (ﷺ) -এর সবকথা যেখানে সাহাবীগণ অনুধাবন করতে অক্ষম- সেখানে আমরা কে? এজন্যই হাদীসের মর্ম বুঝার জন্য  মাযহাবের বিজ্ঞ  ইমামগণের প্রয়োজন হয়।  তাঁদের  ব্যাখ্যা  ছাড়া নিজে   নিজে কেউই   বুঝতে পারবে     না।     একশ্রেণীর      জাহেল     লোক     হাদীসের   অনুবাদ পড়েই  মাছআলা  দেয়া  শুরু  করে  দেয়।  এরা মাযহাব মানেনা, ইমামদের ব্যাখ্যা মানেনা। এরা আহ্লে হাদীস বলে দাবী করে-  অথচ একটি হাদীসের  ব্যাখ্যা করার   ক্ষমতাও   এদের  নেই।  বর্তমানকালে  জামাতী, তাবলীগী,   আহ্লে হাদীস, লা-মাযহাবী লোকেরা  কথায় কথায়  হাদীসের    উল্টাপাল্টা  মর্ম   বুঝায়।    ইহা   কোন্ ইমামের   ব্যাখ্যা-  তা    তারা  বলে  না।   আল্লাহ্     এদের খপপর  থেকে  মাযহাবপন্থী  মুসলমানকে  রক্ষা  করুন।  আমীন!

(১৫    খ)    প্রাসাদের    কিছু   কিছু    কাম্রা    থাকবে   শুন্যে ভাসমান
عن  انس    بن  مالک  رضی  اللّٰہ عنہ قال قال رسول  اللّٰہ ﷺ ان فی فی الجنۃ لغرفا لیس لھا مغالیق من فوقھا ولا عماد من تحتھا قیل یا رسول اللّٰہ وکیف یدخلھا اھلھا ؟ قال یدخلونھا اشباہ الطیر ۔ قیل ھی یا رسول اللّٰہ لمن ؟     قال     سول     الاھل     الاسقام     ۔     والاوجاع     والبلوی  ۔(التذکرۃ صفح ۵۰۷)

অর্থঃ  হযরত আনাছ  (রাঃ)   হতে  বর্ণিত। তিনি বলেন-  রাসুলে      মকবুল      সাল্লাল্লাহু     আলাইহি     ওয়া     সাল্লাম  এরশাদ    করেছেন, “নিশ্চয়ই জান্নাতের প্রাসাদ   সমূহে এমন   অনেক     কাম্রা   রয়েছে-   যেগুলো   শুন্যের   উপর ভাসমান- উপরের দিকে কোন তালা নেই এবং নীচেও কোন   খুটি    নেই”।    সাহাবীগণ   আরয    করলেন-   ইয়া রাসুলাল্লাহ!    তাহলে    ঐ    কামরাবাসীরা    কেমন    করে  প্রবেশ  করবে? হুযুর  সাল্লাল্লাহু    আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ    করলেন-    তারা     পাখীর   ন্যায়    উড়ে   ঢুক্বে।  পুনরায় আরয করা হলো-   “ঐ কামরাগুলো কার  জন্য নির্ধারিত”?    হুযুর    সাল্লাল্লাহু    আলাইহি     ওয়া     সাল্লাম এরশাদ করলেন- “ঐগুলো রোগী, ক্ষুর্ধাত ও বিপদগ্রস্ত লোকদের জন্য”। (আত্-তাযকিরাহ্ পৃষ্ঠা ৫০৭)।

(১৬) জান্নাতের তাবু হবে মুক্তার তৈরী
عن ابی  موسی الاشعری ان رسول اللّٰہ ﷺ قال فی الجنۃ خیمۃ  من لؤلؤۃ غرفۃ ۔ عضھا ستون  میلا فی کل زاوی  منھا    اھل    للمومن   م     یرون   الاٰخرین   یطوف   علیھم المؤمن ۔ رواہ مسلم وفی روایۃ الخیمۃ درۃ ۔ طوالھا فی السماء ستون میلا۔ فی کل زاریۃ۔ منھا اھل المؤمن ما یرون الاٰخرین۔

অর্থঃ হযরত  আবু মুছা  আশ্আরী (রাঃ)  বর্ণনা  করেনঃ রাসুলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-“  জান্নাতের  প্রাসাদে   থাকবে   লুলু   পাথরের প্রশস্ত   তাবুসমূহ।    এক   একটি    তাবুর    প্রস্থ   হবে    ৬০ মাইল।   ঐ   তাবুর    চতুর্পার্শ্বের    প্রতি   কোনায়    থাকবে মোমিনদের       পরিবার        পরিজন-         যাদের       একজন অন্যদেরকে    দেখতে    পাবে।   মুমিনরা   ঐসব     স্ত্রীদের সাথে মিলিত হবে তথায়”। (মুসলিম শরীফ)।

অন্য  বর্ণনায়  এসেছে-   তাঁবুগুলো    হবে  মুক্তার  তৈরী। তাঁর উচ্চতা হবে আসমান ছোঁয়া। প্রস্থ হবে ৬০ মাইল। প্রত্যেক   পাশে   থাকবে মোমেনদের পরিবার পরিজন- যাদের        একজন        অন্যদেরকে          দেখতে        পাবে”। (তাযকিরাহ্)।

(১৭) জান্নাতে সাপ্তাহিক প্রদর্শনী বাজার বসবে
عن انس بن مالک رضی اللّٰہ عنہ ان رسول اللّٰہﷺ  قال ان      فی   الجنۃ  لسوقا  یأتونھا   کل   جمعۃ   ۔  فتھب   ریح الشمال فتحثوا فی وجوھھم وثیابھم المسک ۔ فیزدادون  حسنا    وجمالا   ۔  فیرجعون   الی  اھلھم   وقد    ازداروا  ۔  حسنا جمالا۔ فیقول لھم اھلھم واللّٰہ لقد  ازددتم حسنا وجمالا ۔ رواہ مسلم۔

অর্থঃ  হযরত  আনাস   (রাঃ)    হতে   বর্ণিত-  নবী    করীম সাল্লাল্লাহু    আলাইহি   ওয়া   সাল্লাম   ইরশাদ   করেছেন-  “নিশ্চয়ই জান্নাতে থাকবে বাজারসমূহ। জান্নাতীরা প্রতি শুত্রবারে ঐ বাজারে একত্রিত হবে। উত্তরের শীতলবায়ু বয়ে  যাবে।  এতে   তাদের  চেহারা  ও   পোষাকে   মিশ্ক সুগন্ধি   ছড়াবে।  আর  তাদের  সৌষ্ঠব   তাঁদের  সৌন্দর্য বৃদ্ধি   পাবে   বহুগুনে।     যখন   তাঁরা      রূপসৌন্দর্য   নিয়ে আপন পরিবারে    ফিরে আসবে- তখন   তারাও  বলবে- খোদার     কসম,   তোমাদের   রূপসৌন্দর্য   তো    আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে”। (মুসলিম শরীফ)।

ব্যাখ্যাঃ  হযরত  আলী ও  হযরত  আনাছ  (রাঃ)  বলেন- দুনিয়ার   মত  জান্নাতের   বাজার   বেচা   কেনার   বাজার নয়- বরং রূপসৌন্দর্য বৃদ্ধির পরিচর্যাগৃহ। সেখানে প্রতি শুক্রবার    একবার    করে   রূপচর্চা   হবে।    দুনিয়ার   মত সাজানী    নয়-    বরং     প্রাকৃতিকভাবে     উত্তরা     হাওয়ায় মিশক   ভেসে   আসবে,   চেহারা   ও   পোষাক   সুগন্ধময়  করে   তুলবে  এবং  চেহারার  রূপসৌন্দর্য   বহুগণ   বৃদ্ধি   করে    দিবে।    (কল্পনার    জন্য   আধুনিক   রূপচর্চা   গৃহ  ধারণা করা যেতে পারে। রূপসৌন্দর্য জান্নাতী তোহ্ফা স্বরূপ।   এর  জন্য  সাধনা   করা  প্রয়োজন।  অলস  হয়ে বসে থাকলে চলবেনা)।

উল্লেখ্যঃ        জান্নাতে         প্রবেশাধিকার       হবে       ঈমানের বিনিময়ে- কিন্তু মানাযিল বা মর্তবাসমূহ পাবে আমলের বিনিময়ে।       এটাই       ওলামায়ে        কেরামের       মতামত  (আত-তাযকিরাহ্   ও   মাওয়াহিব   ৬৭৯   পৃষ্ঠা)।   নবীর  প্রেম  ও    ভালবাসায়  পাওয়া  যাবে  নবীজীর     সান্নিধ্য।  সাহাবী   রাবিয়া  (রাঃ)   নবীজীর    সান্নিধ্য  চেয়েছিলেন। নবীজী    তা    মঞ্জুর    করেছেন।     আল্লাহর    ইবাদত     ও  নবীজীর মহব্বৎ হলো সকল মর্যাদার চাবি কাঠি।

(১৮) গরীব মুসলমানগণ ধনীদের পাঁচশত বৎসর পূর্বে জান্নাতে যাবে
عن  ابی  الدرداء  رضی  اللّٰہ    عنہ  قال  حدثنی  عمر  بن  الخطاب   قال   سمعت     رسول   اللّٰہ   ﷺ    یقول   انی   فقراء  المسلمین  یدخلون  الجنۃ  قبل  الاغنیاء  بنصف  یوم  ۔  قیل لہ یا رسول  اللّٰہ وما نصف  یوم؟ قال خمسمأۃ  سنۃ  قیل  لہ فکم السنۃ  من شھر قال  خمسمأۃ شھر  ۔ قیل   لہ فکم   الشھر  من  یوم  ۔  قال  خمسمأۃ  یوم   قیل  لہ  فکم الیوم قال خمسمأۃ مما تعدون ۔ (ذکرہ العتبی فی عیون الاخبار ۔ التذکرۃ للقرطبی صفح ۵۱۲)

অর্থঃ  হযরত  আবু  দারদা  (রাঃ)  বলেন-  হযরত  ওমর  (রাঃ)  আমাকে   একটি     হাদীস   শুনিয়েছেন।  তাহলো- তিনি  শুনেছেন-  নবী   করীম    সাল্লাল্লাহু  আলাইহি  ওয়া সাল্লাম        ইরশাদ     করেছেন-     “গরীব     ও      হত-দরিদ্র মুসলমানরা   ধনী  লোকদের  অর্ধদিবস     পূর্বে   জান্নাতে প্রবেশ  করবে”।     আরয  করা  হলো-  ইয়া   রাসুলাল্লাহ্! অর্ধদিবস     বলতে    কি     বুঝায়?    হুযুর    (ﷺ)    বল্লেন- “পরকালের অর্ধদিবস হলো দুনিয়ার পাঁচশত বৎসরের সমান”।   আবার    আরয    করা    হলো-   কতমাসে    এক  বৎসর   হবে?  হুযুর (ﷺ) বল্লেন- “পাচশত মাসে  এক বৎসর”। আবার আরয করা হলো- কতদিনে একমাস? হুযুর (ﷺ)  বল্লেন- “পাঁচশত দিনে একমাস”। পুনরায়  প্রশ্ন     করা   হলো-   একদিন   কতদিনের    সমান?   হুযুর (ﷺ)   বললেন-   “একদিন    পাঁচশত    দিনের    সমান”।  (উৎবী কৃত উয়ুনুল আখ্বার সূত্রে- কুরতুবীর তাযকিরাহ্ পৃষ্ঠা ৫১২)।

ব্যাখ্যাঃ  নবী    করীম  সাল্লাল্লাহু  আলাইহি   ওয়া   সাল্লাম কত  সুন্দর  করে পরজগতের    হিসাব  তুলে ধরলেন এ হাদীসের  মাধ্যমে।   দুনিয়ার  পাঁচশত   বৎসরের  সমান ওখানকার    অর্ধদিন।    দুনিয়ার    এক    হাজার      বছরের সমান হবে  হাশরের  একদিন। কিন্তু আরশে মোয়াল্লার  একদিন     হলো      দুনিয়ার     পঞ্চাশ     হাজার      বৎসরের সমান।

(১৯) মক্কার মুহাজির  মুসলমানগণ  ধনীগণের  পাঁচশত বৎসর পূর্বে জান্নাতে যাবেন,
عن  ابی  سعید  الخدری  رضی  اللّٰہ  عنہ  قال  قال  رسول  اللّٰہ ﷺ فقراء المھاجرین یدخلون الجنۃ قبل اغنیاءھم بخمسمأۃ عام ۔ خرجہ الترمذی۔
۴۱ نمبر
অর্থঃ   হযরত   আবু  সায়ীদ  খুদরী  (রাঃ)  বর্ণনা  করেন- নবী   করীম    সাল্লাল্লাহু  আলাইহি  ওয়া  সাল্লাম   ইরশাদ করেছেন     -     মক্কার     মুহাজির     মুসলমানগণ     তাঁদের  ধনীদের   চেয়ে  পাঁচশত  বৎসর  পূর্বে  জান্নাতে    প্রবেশ করবে”। (তিরমিযি শরীফ)।

ব্যাখ্যাঃ  হযরত  আবু  দারদা  বর্নিত  পূর্ব  হাদীসে  হুযুর  (ﷺ)  সাধারণ   গরীব  মুসলমানের  জান্নাতে    প্রবেশের সময়  বলেছেন-  ধনীদের  পাঁচশত  বৎসর  পূর্বে।  আর  হযরত আবু সায়ীদ খুদরী বর্ণিত বর্তমান হাদীসে দেখা যায়-     মক্কার     মুহাজির     দরিদ্রগণও    জান্নাতে    যাবেন তাঁদের মধ্যকার ধনীগণের পাঁচশত বৎসর পূর্বে।

বাহ্যিক  দৃষ্টিতে   দুটি   বর্ণনা   বিপরীতমুখী  মনে  হলেও মূলতঃ কোন  বিরোধ নেই। কেননা, মুহাজির  গরীব  ও মুহাজির   ধনীদের  মধ্যে  তুলনা  করা   হয়েছে   পাঁচশত  বৎসরের  ব্যবধান।   আর   সাধারণ  মুসলমান  গরীব  ও ধনীদের মধ্যেও তুলনা  করা হয়েছে পাঁচশত বৎসরের ব্যবধান।   সুতরাং  প্রত্যেক  যুগের  ধনী  দরিদ্রের   মধ্যে এই  ব্যবধান  থাকবে।  তাহলে  সরল  অর্থ  দাড়ায়  এই  -“প্রত্যেক   যুগের  গরীবগণ   সে  যুগের  ধনীদের    চেয়ে পাঁচশত বৎসর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবে”।

অত্র হাদীসে গরীবদের জন্য শুভ সংবাদ দেয়া হয়েছে- যাতে   গরীবগণ  অধৈর্য  না  হয়ে  আল্লাহর  উপর     আস্থা রাখে।   আল্লাহ্   তাদের   ধৈর্যের   বিনিময়ে   কম   হিসাব  নিকাশে  ৫০০  বৎসর পূর্বেই  জান্নাতের  নেয়ামত  দান করবেন।  এ   হাদীসের  অর্থ  এ   নয়   যে,  গরীবরা  হাত গুটিয়ে বসে থাকবে, কাজকর্ম ছেড়ে  দিয়ে তাক্বদীরের উপর ভরসা করে বসে থাকবে-   বরং চেষ্টা তাদবীরের পরও যাদের দারিদ্র দূর করা সম্ভব হয়  না- তারা যেন অধৈর্য     না      হয়ে      তাকদীর     মেনে     নেয়।      তাহলেই  আল্লাহ্পাক    পরকালে    তাদের      জন্য    উক্ত    পুরষ্কার  দিবেন। দুনিয়ায় কষ্ট পেলেও পরকালে সুখ পাবে এবং ধনীদের    পূর্বে      জান্নাতে    প্রবেশ     করবে।    জান্নাতের নেয়ামত পেলে দুনিয়ার কষ্ট তখন ভুলে যাবে। সুতরাং গরীবরা ভাগ্যবান।

জান্নাতের সংখ্যা ও নাম
========
জান্নাতের  সংখ্যা ৮টি   যথা- (ক) জান্নাতুল   আদন (খ) জান্নাতুল ফিরদাউস (গ) জান্নাতুন নাঈম (ঘ) জান্নাতুল মা’ওয়া (ঙ) দারুস সালাম (চ) দারুল খুল্দ (ছ) দারুল ক্বারার (জ) দারুল...।

তন্মধ্যে    সর্বোচ্চ    জান্নাতুল    আদন     হচ্ছে     আম্বিয়ায়ে  কেরামের  জন্য  নির্ধারিত।  এখানেই  আল্লাহ্পাক  নিজ  দীদার      দান    করবেন।     তারপর     মোমেনদের    জন্য  সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম জান্নাত হচ্ছে জান্নাতুল ফিরদাউস। ইহা  জান্নাতুল  আদন  সংলগ্ন।   এর  পরের     স্থান   হলো জান্নাতুল খুল্দ। এর পরের স্থান হলো জান্নাতুন নাঈম। এরপরের   স্থান    হলো    জান্নাতুল    মা’ওয়া।   এর     পরে দারুস    সালাম।    এরপরে    দারুল     ক্বারার।     এরপরে দারুল....।

------