আম্বিয়া (আ:) আমাদের মতো সাধারণ মানুষ নন | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস


আম্বিয়া (আ:) আমাদের মতো সাধারণ মানুষ নন
মূল: শায়খ মোহাম্মদ আলাউয়ী মালেকী হাসানী (রহ:)
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন
[লেখকের "সংশোধনীয় ভ্রান্ত ধারণাসমূহ” শীর্ষক বই হতে সারসংক্ষেপ]

কিছু লোক মনে করে হযরতে আম্বিয়া-এ-কেরাম (আলাইহিমুস সালাম) তাঁদের সকল হালত তথা আধ্যাত্মিক অবস্থায় এবং সকল দিক দিয়ে অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতোই মানব। এটি এমন-ই একটি স্পষ্ট ভ্রান্তি ও নিরেট মূর্খতা যা আল্লাহর কেতাব ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ’তে শক্তিশালী দলিল দ্বারা খণ্ডন করা হয়েছে।

অন্যান্য আদম-সন্তানদের সাথে যদি আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ:)-এর মানব-সূরতের প্রকৃতি সাদৃশ্যপূর্ণ হয়-ও, যেমনটি খোদায়ী কালামে এরশাদ হয়েছে - “হে রাসূল, বলুন: আমি তোমাদেরই উপমায় মানব-সূরতবিশিষ্ট” (সূরা কাহফ, ১১০), তথাপি-ও তাঁরা অন্যান্য মানুষ হতে বিভিন্ন সিফাত (গুণ) ও সুনির্দিষ্ট পার্থক্যকারী বৈশিষ্ট্য দ্বারা পৃথক। তা-ই যদি না হতো, তাহলে তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব কোথায়? তাঁদের সেই শ্রেষ্ঠত্ব ও মনোনীত হওয়ার ফল/ফসল অন্যান্যদের ওপর কীভাবে প্রকাশিত হতো? ধর্মীয় গবেষণার এ বিষয়টিতে আমরা আম্বিয়া (আ:)-এর পার্থিব জীবনের (অনুপম) বৈশিষ্ট্যগুলো এবং এর পাশাপাশি বরযখ (পরকালীন) জীবনের অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোর কিয়দংশ উল্লেখ করবো। তাঁদের এসব বৈশিষ্ট্য কুরঅান ও সুন্নাহ’-সমর্থিত।

আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দ মানবজাতির মালিক-মোক্তার

আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে নবী-রাসূল (আ:)-বৃন্দ হলেন বিশেষভাবে মনোনীত ও পছন্দকৃত। মহান প্রভু তাঁদেরকে নবুয়্যত দান করে মহাসম্মানিত করেছেন; তিনি তাঁদের আরও দান করেছেন (আধ্যাত্মিক) জ্ঞান-প্রজ্ঞা, প্রখর ধীশক্তি ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য; আর তিনি তাঁদেরকে তাঁর এবং তাঁর সৃষ্টিকুলের মাঝে অসীলা তথা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পছন্দ করেছেন। আম্বিয়া (আ:) আল্লাহর আদেশ-নিষেধ বা বিধি-বিধান মানবজাতির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন এবং মহান প্রভুর না-রাজি ও শাস্তি সম্পর্কেও তাদেরকে সতর্ক করেছেন। নবী-রাসূল (আ:)-বৃন্দ নিজ নিজ জাতিকে ইহ ও পরকালীন সুখ-শান্তির দিকে পরিচালনা করেছেন। এটি আল্লাহতা’লারই ঐশী জ্ঞান-প্রজ্ঞা ছিল যে পয়গম্বর-মণ্ডলী (আ:) মানব আকৃতিবিশিষ্ট ছিলেন, যাতে মানুষেরা তাঁদের সাথে মেশতে পারে, তাঁদের থেকে গ্রহণ করতে পারে, আর তাঁদেরই আচার-আচরণ ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনসমূহ অনুসরণ-অনুকরণ করতে পারে। তাঁদের মানব-সূরত হচ্ছে তাঁদেরই (আধ্যাত্মিকতাসমৃদ্ধ) অলৌকিক প্রকৃতির সারমর্ম, কেননা তাঁরা মানব আকৃতির হলেও এর পাশাপাশি বাকি মনুষ্যকুল হতে এমন গুণাবলী দ্বারা পৃথক যা অন্য কেউই তাঁদের সাথে ভাগাভাগি করতে অক্ষম। এ কারণেই ওই পার্থক্যকারী বৈশিষ্ট্যগুলো ছাড়া তাঁদের স্বাভাবিক মানবীয় আবরণ দেখে মূল্যায়ন করা জাহেলীয়্যা (মূর্খতা) ও মুশরিকী (অংশীবাদী) যুগের দৃষ্টিভঙ্গি।

এ (মূর্খতাপ্রসূত) দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ হচ্ছে হযরত নূহ (আ:)-এর প্রতি তাঁরই জাতির মনোভাব, যা আল্লাহতা’লার পাক কালামে বিধৃত হয়েছে এভাবে - “সুতরাং তাঁর সম্প্রদায়ের নেতৃবর্গ যারা কাফের ছিল, তারা বল্লো, ‘আমরা তো তোমাকে আমাদেরই মতো মানুষ দেখছি’।” [সূরা হূ-দ, ২৭ অায়াত; মুফতী আহমদ এয়ার খান কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’]

অনুরূপ মতামত ছিল সর্ব-হযরত মূসা (আ:) ও হারূন (আ:)-এর জাতির: “সুতরাং তারা বল্লো, আমরা কি ঈমান নিয়ে আসবো আমাদেরই মতো দু’জন লোকের প্রতি, অথচ তাদের সম্প্রদায় আমাদের দাসত্ব করছে?” [সূরা মু’মিনূ-ন, ৪৭ অায়াত; প্রাগুক্ত ‘নূরুল এরফান’]

একই রকম নজির পাওয়া যায় সামূদ গোত্রের লোকদের বক্তব্য থেকে: “আপনি তো আমাদেরই মতো মানুষ। কাজেই কোনো নিদর্শন উপস্থিত করুন যদি সত্যবাদী হন।” [সূরা শু’আরা, ১৫৪ আয়াত; প্রাগুক্ত ‘নূরুল এরফান’]

পয়গম্বর হযরত শু’আইব (আ:)-এর প্রতি তাঁর কওম বা সম্প্রদায় আইকা’র লোকদের কথাতেও রয়েছে একই দৃষ্টান্ত: “তারা বল্লো, ‘আপনার ওপর জাদুর প্রভাব পড়েছে; আপনি তো আমাদের মতোই একজন মানুষ এবং নিশ্চয় আমরা আপনাকে মিথ্যাবাদী মনে করি’।” [সূরা শু’আরা, ১৮৫-৬ আয়াত; নূরুল এরফান]

আর আমাদের মহানবী (দ:)-কে তাঁর অনুপম বৈশিষ্ট্য ছাড়া স্রেফ মানব-সূরতে দেখতে সক্ষম মুশরিকীনদের মন্তব্যেও একই দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠেছে: “এবং (তারা) বল্লো, ‘ওই রাসূলের কী হলো যিনি (আমাদের মতোই) আহার করেন ও হাট-বাজারে চলাফেরা করেন’?” [সূরা ফোরকান, ৭ আয়াত; প্রাগুক্ত ‘নূরুল এরফান’]

আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের গুণাবলী

পয়গম্বর-মণ্ডলী (আ:) মানব আকৃতির এ অর্থে যে তাঁরা পানাহার করেছেন, সুস্থতা ও অসুস্থতা বোধ করেছেন, বিয়ে-শাদী করেছেন, হাট-বাজারে চলাফেরা করেছেন, আর দুর্বলতা, বার্ধক্য ও বেসাল (খোদার সাথে পরলোকে মিলন)-প্রাপ্তির মতো সার্বিক মানবীয় অবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন। এতদসত্ত্বেও অনন্য বৈশিষ্ট্যাবলী দ্বারা তাঁরা সবার থেকে আলাদা মর্যাদায় অধিষ্ঠিত রয়েছেন এবং তাঁদের এ সুমহৎ গুণাবলীর বিবরণ-ও দেয়া হয়েছে। তাঁদের ক্ষেত্রে এ সব গুণ অবিচ্ছেদ্য; আর তা তাঁদের আবশ্যকীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য-ও। নিচে এগুলোর সারসংক্ষেপ দেয়া হলো:

১/ - সত্যবাদিতা
২/ - (ঐশী বিধান) পৌঁছে দেয়ার সামর্থ্য
৩/ - (খোদায়ী) আস্থা পূরণের ক্ষমতা
৪/ - (ঐশী প্রদত্ত) ধীশক্তি
৫/ - ঘৃণিত ত্রুটি হতে মুক্ত থাকার সক্ষমতা
৬/ - মা’সূম তথা নিষ্পাপ অবস্থা।

এসব গুণ বিস্তারিত আলোচনা করার স্থান এখানে নেই। এগুলো সম্পর্কে ‘তাওহীদ’-বিষয়ক বইপত্রে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে। এখানে আমরা শুধু আম্বিয়াকুল শিরোমণি হযরতে মোহাম্মাদুর-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সেসব অনুপম গুণের কথা উল্লেখ করবো যা দ্বারা তিনি মনুষ্যকুলের বাকি সবাই হতে পৃথক।

সামনে ও পেছনে দর্শনক্ষমতা

শায়খাইন (সর্ব-ইমাম বোখারী ও মুসলিম) হযরত আবূ হোরায়রা (রা:) থেকে বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর বাণী: “তোমরা কি আমার ‘কেবলা’ দেখতে পাও? আল্লাহর কসম! (নামাযে) তোমাদের রুকু-সেজদা আমার থেকে আড়ালে নয়। নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে পেছন থেকেও দেখতে পাই।” ইমাম মুসলিম হযরত আনাস (রা:) হতে বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস, যিনি বলেন: “ওহে মানুষেরা, নিশ্চয় আমি হলাম তোমাদের ইমাম। অতএব, রুকূ বা সেজদা উভয় ক্ষেত্রে আমার চেয়ে অগ্রসর হয়ো না; কেননা নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে আমার সামনে যেমন দেখি, পেছন থেকেও তেমনি দেখি।” আবদুর রাযযাক নিজ ‘জামে’ পুস্তকে, আল-হাকীম ও আবূ নুয়াইম হযরত আবূ হোরায়রা (রা:) থেকে বর্ণনা করেন হুযূর পাক (দ:)-এর ভাষ্য: “নিশ্চয় আমি আমার সামনে যেমন দেখি, পেছন থেকেও তেমনি দেখি।” আবূ নুয়াইম হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা:) হতে বর্ণনা করেন নবী করীম (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: “নিশ্চয় আমি পেছন দিকেও দেখতে পাই।”

আমরা যা দেখি না রাসূল (দ:) তা দেখেন, যা শুনি না তা শোনেন

হযরত আবূ যর (গিফারী রাদিয়াল্লাহুতা’লা আনহু) বর্ণনা করেন হুযূর পূর নূর (দ:)-এর হাদীস, যিনি বলেন: “নিশ্চয় আমি দেখতে পাই যা তোমরা দেখতে পাও না এবং শুনতে পাই যা তোমরা শুনতে পাও না। আসমানসমূহ ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে এবং তা করার অধিকার রয়েছে। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর নামে শপথ, আসমানে চার আঙ্গুল প্রস্থ জায়গা ছাড়া খালি জায়গা নেই, যেখানে ফেরেশ্তাবৃন্দ আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদারত। আল্লাহর কসম! আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে, তাহলে তোমরা কম হাসতে এবং বেশি কাঁদতে; আর তোমরা নিজেদের বিছানায় স্ত্রী-সহবাসে আনন্দ করতে না, বরং খোলা জায়গায় যেয়ে আল্লাহর আশ্রয় পার্থনা করতে।” হযরত আবূ যর (রা:) এ বর্ণনাশেষে বলেন, “আহা, আমি যদি কোনো ঝোপঝাঁড় হতাম যাকে চিবিয়ে ফেলা যায়!” [সূত্র: সর্ব-ইমাম আহমদ (রহ:), তিরমিযী (রহ:) ও ইবনে মাজাহ (রহ:)]

রাসূল (দ:)-এর পবিত্র বগল-যুগল

শায়খাইন (সর্ব-ইমাম বোখারী ও মুসলিম) হযরত আনাস (রা:) থেকে বর্ণনা করেন, যিনি বলেন: “অামি রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে দোয়ার মধ্যে হাত দুটো ওঠাতে দেখলাম, যে পর্যন্ত না তাঁর শুভ্র বগল-যুগল দেখা গিয়েছিল।” ইবনে সা’আদ (রহ:) বর্ণনা করেন হযরত জাবের (রা:) হতে; তিনি বলেন: “মহানবী (দ:) যখন সেজদারত হতেন, তখন তাঁর শুভ্র বগল-যুগল দেখা যেতো।”

হুযূর পূর নূর (দ:)-এর শ্বেতবর্ণ বগল-যুগলের বিবরণসম্বলিত অনেক রেওয়ায়াত (বর্ণনা) সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর কাছ থেকে এসেছে। আল-মুহিব আত্ তাবারী বলেন: “নবী করীম (দ:)-এর অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে এটি একটি যে অন্যান্য মানুষের বগল তাদের দেহের রংয়ের চেয়ে ভিন্নতর হলেও তাঁর ক্ষেত্রে কিন্তু বাকি শরীর মোবারক ও পবিত্র বগল-যুগলের রং একই ছিল।” আল-কুরতুবী (রহ:)-ও একই কথা বলেছেন এবং আরও যোগ করেছেন যে মহানবী (দ:)-এর বগল-যুগলে কোনো লোম ছিল না।

কখনো হাই তোলেননি

আল-বোখারী (রহ:) নিজ ইতিহাস পুস্তকে, ইবনে আবি শায়বাহ (রহ:) তাঁর ‘মোসান্নাফ’ কেতাবে এবং ইবনে সা’অাদ প্রমুখ হযরত এয়াযীদ ইবনে আসাম্ম (রা:) থেকে বর্ণনা করেন, যিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ (দ:) কখনোই হাই তোলেননি।” ইবনে আবি শায়বা (রহ:) বর্ণনা করেন মুসলিমা বিন আবদিল মালেক বিন মারওয়ান হতে, যিনি বলেন: “কোনো পয়গম্বর (আ:)-ই কখনো হাই তোলেননি।”

পবিত্র ঘাম মোবারক 

ইমাম মুসলিম (রহ:) বর্ণনা করেন হযরত আনাস (রা:) হতে, যিনি বলেন: “বিশ্বনবী (দ:) আমাদের বাড়িতে এসে ঈষৎ নিদ্রাগত হন। এ সময় তাঁর ঘাম বেরোয়, যার দরুন আমার মা একটি ছোট বোতল এনে তাতে তাঁর বরকতময় ঘাম সংগ্রহ করে রাখেন। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (দ:) ঘুম থেকে জেগে ওঠে বলেন, ‘ওহে উম্মে সুলায়েম! তুমি কী করছো?’ তিনি প্রত্যুত্তর দেন, ‘আমরা আমাদের সুগন্ধিতে এই ঘাম মেশাই, আর তাতে তা সবচেয়ে সুঘ্রাণবিশিষ্ট হয়’।”

ইমাম মুসলিম (রহ:)-ও হযরত আনাস (রা:) থেকে অনুরূপ আরেকটি রেওয়ায়াত লিপিবদ্ধ করেন যা’তে হযরত আনাস (রা:) বলেন: “মহানবী (দ:) নিয়মিত উম্মে সুলায়েম (রা:)-এর বাড়িতে এসে ঈষৎ নিদ্রাগত হতেন, অার তিনি হুযূর পাক (দ:)-এর জন্যে ফরাশ (ম্যাট) পেতে দিতেন যাতে তিনি ঘুমোতে পারেন। ওই সময় মহানবী (দ:) অনেক ঘামাতেন, আর উম্মে সুলায়েম (রা:) ওই বরকতময় ঘাম সংগ্রহ করে সুগন্ধিতে মেশাতেন এবং বোতলে সংরক্ষণ করতেন। একবার রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁকে বলেন, ‘ওহে উম্মে সুলায়েম! তুমি কী করছো?’ তিনি জবাব দেন, ‘আমি আমার সুগন্ধিতে আপনার ঘাম মেশাই’।”

মহানবী (দ:)-এর শারীরিক উচ্চতা

ইবনে খায়তামা নিজ ইতিহাস পুস্তকে, আল-বায়হাকী (রহ:) ও ইবনে আসাকির (রহ:) হযরত আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণনা করেন, যিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ (দ:) শারীরিক উচ্চতায় বেশি লম্বা ছিলেন না, আবার বেঁটেও ছিলেন না। তিনি একাকী হাঁটলে তাঁকে গড় উচ্চতাবিশিষ্ট বিবেচনা করা যেতো; কিন্তু লম্বা মানুষদের দলে হাঁটার সময় তাঁকে সর্বদা তাদের চেয়েও লম্বা মনে হতো। তিনি দু’জন লম্বা মানুষের মাঝে থাকলেও তাঁকেই লম্বা দেখা যেতো। আবার অন্যদিকে হেঁটে চলে যাওয়ার সময় তাঁকে গড় উচ্চতাবিশিষ্ট মনে হতো।” ইবনে সাব’আ হুযূর পাক (দ:)-এর অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর নিজ সংকলনে এ বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং আরও যোগ করেন যে নবী করীম (দ:) অন্যান্যদের মাঝে যখন বসতেন, তখন তাঁর কাঁধ মোবারক বাকি সবার চেয়ে উঁচু মনে হতো।

ছায়া মোবারক

আল-হাকীম আত্ তিরমিযী (রহ:) দাকওয়ান (রা:) হতে বর্ণনা করেন যে সূর্য বা চাঁদের কিরণে মহানবী (দ:)-এর পবিত্র শরীরের কোনো ছায়া মাটিতে পড়তো না। ইবনে সাব’আ বলেন: “রাসূলে খোদা (দ:)-এর অনন্য গুণগুলোর মধ্যে এটি একটি যে তাঁর ছায়া কখনো মাটিতে পড়তো না। সূর্য বা চাঁদের আলোতে বের হলে তিনি নিজেই আলো ছড়াতেন, আর তাই তাঁর কোনো ছায়া ছিল না।” উলামাদের কেউ কেউ বলেছেন: “এই বিষয়টি একটি হাদীস দ্বারা সমর্থিত যেখানে তিনি এরশাদ ফরমান, ‘আর আমাকে এক নূরে পরিণত করুন’।”

ইমাম কাজী আয়ায (রহ:) নিজ ‘শেফা’ গ্রন্থে এবং আল-আযফী তাঁর ‘মওলিদ’ পুস্তকে উল্লেখ করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি হলো তাঁর পবিত্র দেহে কখনো কোনো মাছি বসতো না। ইবনে সাব’আ তাঁর সংকলনে উল্লেখ করেন: “মাছি কখনো তাঁর জামাকাপড়ে বসতো না।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে উকুন-ও মাথার চুল মোবারকে আসতো না।

পবিত্র রক্ত

আল-বাযযার, আবূ এয়ালা, আত্ তাবারানী, আল-হাকীম ও আল-বায়হাকী একযোগে বর্ণনা করেন যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়র (রা:) একবার রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর দরবারে আসেন। ওই সময় তাঁর ‘হিজামা’ তথা শিঙ্গা অস্ত্রোপচার হচ্ছিল। তা শেষ হলে পরে তিনি এরশাদ ফরমান: “ওহে আবদুল্লাহ! এই অতিরিক্ত রক্ত নিয়ে এমন জায়গায় ফেলে আসো যেখানে কেউ তোমাকে দেখতে পাবে না।” এই সাহাবী (রা:) তা নিয়ে পান করে ফেলেন। তিনি ফিরে এলে মহানবী (দ:) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, “ওহে আবদুল্লাহ! তুমি কী করেছো?” তিনি জবাব দেন: “আমার জানামতে সবচেয়ে গোপন জায়গায় আমি তা রেখে দিয়েছি। এটি মানুষের কাছ থেকে আড়ালে আছে।” রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান: “তুমি কি তা পান করেছো?” হযরত আব্দুল্লাহ (রা:) উত্তর দেন, ‘জ্বি হ্যাঁ।” অতঃপর মহানবী (দ:) বলেন, “তোমার দ্বারা মানুষেরা পীড়িত হবে, আবার মানুষের দ্বারাও তুমি পীড়িত হবে।” পরবর্তীকালে মানুষেরা দেখতে পান যে ওই রক্তপান করে তাঁর অতিরিক্ত শক্তি হয়েছিল।

মহানবী (দ:)-এর বরকতময় ঘুম

শায়খাইন (সর্ব-ইমাম বোখারী ও মুসলিম) হযরত আয়েশা (রা:) হতে বর্ণনা করেন; তিনি আরয করেছিলেন: “এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আপনি কি বেতরের নামাযের আগেই ঘুমোবেন?” হুযূর পূর নূর (দ:) এরশাদ ফরমান: “ওহে আয়েশা! আমার চোখ ঘুমোয়, কিন্তু আমার অন্তর (কলব্) ঘুমোয় না। শায়খাইন আরও বর্ণনা করেন হযরত আনাস্ বিন মালেক (রা:) হতে, যিনি বলেন: “মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান, ‘আমার চোখ ঘুমোয়, কিন্তু আমার অন্তর ঘুমোয় না’।” রাসূলুল্লাহ (দ:) আরও এরশাদ ফরমান: “আম্বিয়া (আ:)-এর চোখ ঘুমোয়, কিন্তু অন্তর জাগ্রত থাকে।”

স্ত্রী-সহবাসে সামর্থ্য

আল-বোখারী (রহ:) ইমাম কাতাদা (রহ:) হতে, তিনি সাহাবী হযরত আনাস (রা:) হতে বর্ণনা করেন, যিনি বলেন: “মহানবী (দ:) প্রতি দিন একে একে তাঁর সকল স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করতেন, আর তাঁদের সংখ্যা ছিল এগারো।” ইমাম কাতাদা (রহ:) বলেন: “আমি হযরত আনাস (রা:)-কে জিজ্ঞেস করি, তিনি কি সত্যি এ রকম সামর্থ্য রাখতেন? হযরত আনাস (রা:) জবাব দেন: “আমরা বলতাম, রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে ত্রিশজন পুরুষের (যৌবনের) শক্তি দান করা হয়েছিল।”

স্বপ্নদোষ থেকে পবিত্র

আত্ তাবারানী (রহ:) হযরত একরেমা (রহ:) হতে, তিনি সর্ব-হযরত আনাস (রা:) ও আব্বাস (রা:) হতে বর্ণনা করেন, এবং আদ্ দায়নূরী নিজ ‘আল-মোজালাসা’ পুস্তকে বর্ণনা করেন হযরত মোজাহেদ (রা:) হতে, তিনি হযরত ইনে আব্বাস (রা:) হতে, যিনি বলেন: “কোনো পয়গম্বরেরই কখনো স্বপ্নদোষ হয়নি; আর নিশ্চয় তা (স্বপ্নদোষ) শুধু শয়তানের কাছ থেকে (আগত)।”

পবিত্র পেশাব মোবারক

হাসান বিন সুফিয়ান নিজ ‘মুসনাদ’ কেতাবে, আবূ এয়ালা, আল-হাকীম, আদ্ দারাকুতনী ও আবূ নুয়াইম একযোগে বর্ণনা করেন হযরত উম্মে আয়মান (রা:) হতে, যিনি বলেন: “এক রাতে মহানবী (দ:) ঘুম থেকে ওঠে একটি পাত্রে পেশাব করেন। সে রাতে আমি তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ঘুম থেকে জেগে যাই, আর তাই ওই পাত্রে যা ছিল তা পান করি। সকালে আমি তাঁকে একথা জানালে তিনি স্মিত হেসে আমাকে বলেন: “নিশ্চয় তুমি আর কখনো পেটের ব্যথায় (পীড়ায়) ভুগবে না।”

ইমাম আবদুর রাযযাক (রহ:) বর্ণনা করেন ইবনে জুরায়েজ হতে; তিনি বলেন: “আমাকে জানানো হয়েছিল যে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর একটি কাঠের পাত্র ছিল যা’তে তিনি পেশাব করতেন, আর তা তাঁরই খাটের নিচে রাখা হতো। একবার তিনি পাত্রটি খুঁজে তা খালি দেখতে পান। এমতাবস্থায়  উম্মে হাবীবা (রা:) কর্তৃক আবিসিনিয়া থেকে ফেরার সময় নিয়ে আসা বারাকা নাম্নী তাঁরই এক সেবিকাকে মহানবী (দ:) এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, ‘পাত্রে রাখা পেশাব কোথায়?’ বারাকা জবাব দেন, ‘আমি তা পান করেছি।’ অতঃপর রাসূলে পাক (দ:) বলেন, ‘ওহে উম্মে ইউসূফ! তুমি নিশ্চয় সুস্বাস্থ্যের অধিকারিনী হবে।’ এটি (উম্মে ইউসূফ) ছিল তাঁর ডাক-নাম। তিনি আর জীবনে কখনোই রোগ-ব্যাধিগ্রস্ত হননি, শুধু মৃত্যুর আগে যে ব্যাধি হয় তা ছাড়া।” ইবনে দাহিয়্যা বলেন: “উম্মে আয়মান (রা:)-এর ঘটনা হতে এ ঘটনা ভিন্ন এবং বারাকা উম্মে আয়মান হতে বারাকা উম্মে ইউসূফ-ও ভিন্ন ব্যক্তি।”

একটি বরকতময় সমাপ্তি  

অনেকেই কবিতা লেখেছেন মহানবী (দ:)-এর অনন্য শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে, যা অন্যদের চেয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্যে তাঁকে করেছে পৃথক। পংক্তি:

“দশটি বিশেষ গুণে পছন্দকৃত আমাদের রাসূল
কখনো স্বপ্নদোষ হয়নি, ছায়াহীন কায়া তাতেও নেই ভুল
মাটি শুষে নেয় তাঁর দেহের পরিত্যাজ্য মল
তেমনি তাঁর থেকে দূরে সরে থাকে গোটা মাছির দল
চোখ ঘুমোলেও ঘুমোয় না তাঁর হৃদয়ের অন্তস্তল
সম্মুখভাগে যেমনটি দেখেন, তেমনি পেছনে দেখার সামর্থ্য ও বল
একবারও হাই তোলেননি, এ তাঁর সপ্তম গুণ দৃঢ়-অবিচল
আর খতনা অবস্থায় আসেন তিনি এ ধরণীতল
পিঠে চড়লেই চিনতে পারতো তাঁকে সমস্ত প্রাণিকুল
না পালিয়ে তাঁর কাছে করতো তারা দ্রুত চলাচল
সমাবেশে বসলে তাঁকে দেখাতো সবার চেয়ে উচ্চতাবহুল
তাঁর প্রতি আল্লাহর শান্তি ও আশীর্বাদ বর্ষিত হোক প্রবল
প্রতিটি রাত ও প্রতিদিন সকাল।”

মহানবী (দ:)-এর রেসালাতের বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে আমাদের এ গবেষণার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে আমরা তাঁর নবুয়্যতের অনন্য গুণাবলী এবং সেগুলো সম্পর্কে আমাদের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করেছি; আর এ-ও ব্যাখ্যা করেছি যে এগুলোর সংখ্যা গণনাতীত। এগুলোর মধ্যে কিছুর এসনাদ (সনদ) সহীহ বা বিশুদ্ধ, কিছু আছে যযীফ বা দুর্বল; আরও এমন কিছু আছে যেগুলো সম্পর্কে উলামাদের মধ্যে মতপার্থক্য বিরাজমান। এঁদের কারো কারো মতে সেগুলো বিশুদ্ধ বা নির্ভরযোগ্য, আবার কারো কারো মতে দুর্বল। ফলে সেগুলো মতপার্থক্যের বিষয় হিসেবে বিদ্যমান।

অতীতে এসব রেওয়ায়াত (বর্ণনা) সম্পর্কে উলামাদের ভাষ্য কেন্দ্রীভূত ছিল সেগুলো সঠিক না ভুল, নির্ভরযোগ্য না ভিত্তিহীন, তা বিবেচনার ব্যাপারে। তাঁদের কথাবার্তা কখনোই আকীদা-বিশ্বাস ও কূফর (অবিশ্বাস)-এর প্রতি কেন্দ্রীভূত ছিল না। আমরা ওই অনন্য সাধারণ গুণাবলীর একটি নমুনা-ই উল্লেখ করেছি মাত্র; এগুলোর কিছু আছে নির্ভরযোগ্য, কিছু তা নয়। কিছু গ্রহণযোগ্য, কিছু তা নয়।

আমরা এগুলো তুলে ধরেছি যাতে কতিপয় ইমাম কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া এগুলো উদ্ধৃত করার সময় যে উদারতা দেখিয়েছেন, তা নজির হয়ে থাকে। ওই সব রেওয়ায়োতের বিশুদ্ধতা বা দুর্বলতা সম্পর্কে আলোচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না। অতএব, এ বিষয়টি (সবার) ভালভাবে বোঝা উচিত।

                                           *সমাপ্ত*