আল মুবাশিশরাত গ্রন্থে শায়খে আকবর মুহিউদ্দীন ইবন আরাবি (রহ.) বলেন, “আমি একবার স্বপ্নে দেখলাম, আল্লাহ তায়ালা যেন আমাকে ডেকে বলছেন, আমার বান্দা। আমার কাছে যদি নৈকট্যপ্রাপ্ত, সম্মানিত আর নিয়ামতপ্রাপ্ত হতে চাও, তাহলে আমার এই আয়াত বেশি করে পড়ো- রাব্বি আরিনি আনযুর ইলাইকা। (সূরা আরাফ ১৪৩) আমার কাছে বারবার এটা বলতে থাকো।”
তফসীরে মাযহারী হতে উক্ত আয়াতের শানে নুযুল ও তফসীরঃ
সূরা আ'রাফ : আয়াত ১৪২, ১৪৩
وَ وٰعَدْنَا مُوْسٰی ثَلٰثِیْنَ لَیْلَةً وَّ اَتْمَمْنٰهَا بِعَشْرٍ فَتَمَّ مِیْقَاتُ رَبِّهٖۤ اَرْبَعِیْنَ لَیْلَةً ۚ وَ قَالَ مُوْسٰی لِاَخِیْهِ هٰرُوْنَ اخْلُفْنِیْ فِیْ قَوْمِیْ وَ اَصْلِحْ وَ لَا تَتَّبِعْ سَبِیْلَ الْمُفْسِدِیْنَ - وَ لَمَّا جَآءَ مُوْسٰی لِمِیْقَاتِنَا وَ كَلَّمَهٗ رَبُّهٗ ۙ قَالَ رَبِّ اَرِنِیْۤ اَنْظُرْ اِلَیْكَ ؕ قَالَ لَنْ تَرٰىنِیْ وَ لٰكِنِ انْظُرْ اِلَی الْجَبَلِ فَاِنِ اسْتَقَرَّ مَكَانَهٗ فَسَوْفَ تَرٰىنِیْ ۚ فَلَمَّا تَجَلّٰی رَبُّهٗ لِلْجَبَلِ جَعَلَهٗ دَكًّا وَّ خَرَّ مُوْسٰی صَعِقًا ۚ فَلَمَّاۤ اَفَاقَ قَالَ سُبْحٰنَكَ تُبْتُ اِلَیْكَ وَ اَنَا اَوَّلُ الْمُؤْمِنِیْنَ
→ স্মরণ কর, মূসার জন্য আমি ত্রিশ রাত্রি নির্ধারিত করি এবং আরও দশ দ্বারা উহা পূর্ণ করি। এইভাবে তাহার প্রতিপালকের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাত্রিতে পূর্ণ হয়। এবং মূসা তাহার ভ্রাতা হারুণকে বলিল, 'আমার অনুপস্থিতিতে আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে তুমি আমার প্রতিনিধিত্ব করিবে, সদাচার করিবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদিগের অনুসরণ করিবে না।'
→ মূসা যখন আমার নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হইল এবং তাহার প্রতিপালক তাহার সহিত কথা বলিলেন তখন সে বলিল, 'হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দাও, আমি তোমাকে দেখিব;' তিনি বলিলেন, 'তুমি আমাকে কখনই দেখিবে না। তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য কর, যদি উহা স্বস্থানে স্থির থাকে তবে তুমি আমাকে দেখিবে।' যখন তাহার প্রতিপালক পাহাড়ে জ্যোতিষ্মান হইলেন তখন উহা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করিল আর মূসা সংজ্ঞাহীন হইয়া পড়িল। যখন সে জ্ঞান ফিরিয়া পাইল তখন বলিল, 'মহিমময় তুমি! আমি অনুতপ্ত হইয়া তোমাতেই প্রত্যাবর্তন করিলাম এবং বিশ্বাসীদিগের মধ্যে আমিই প্রথম।'
🕋 তফসীরে মাযহারী→ ৫৬১
প্রথমে বলা হয়েছে— 'স্মরণ করো, মুসার জন্য আমি তিরিশ রাত্রি নির্ধারণ করি এবং আরো দশ দ্বারা তা পূর্ণ করি। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাত্রিতে পূর্ণ হয়।' এ সম্পর্কে ইবনে হাতেমের বর্ণনায় রয়েছে— আবুল আলীয়া বলেছেন: জিলকদ মাসের তিরিশ দিন এবং জিলহজ মাসের দশদিন মিলে মোট চল্লিশ দিন রোজা রেখেছিলেন হজরত মুসা।
ইমাম সুয়্যুতি লিখেছেন— আল্লাহ্তায়ালা হজরত মুসাকে এক মাস (তিরিশ দিন) রোজা রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। অঙ্গীকার করেছিলেন এক মাস পর তিনি হজরত মুসার সঙ্গে কথা বলবেন।
ইমাম বাগবী লিখেছেন— ফেরাউনের জীবদ্দশায় মিসরে থাকতেই হজরত মুসা তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন: আল্লাহ্পাক তোমাদের শত্রু নিধনের পর তোমাদেরকে দান করবেন একটি কিতাব; ওই কিতাবে লিপিবদ্ধ থাকবে তাঁর আদেশ ও নিষেধের বিবরণ। এরপর যথাসময়ে ফেরাউন ও তার অনুসারীদেরকে ধ্বংস করে দিলেন আল্লাহ্পাক। হজরত মুসা তখন অঙ্গীকৃত কিতাব যাচ্ঞা করলেন। আল্লাহ্তায়ালা নির্দেশ দিলেন— তিরিশ দিন একটানা রোজা রাখো। হজরত মুসা নির্দেশ পালন করলেন। কিন্তু ঠিক তিরিশ রোজার দিন মুখে কিছুটা দুর্গন্ধ অনুভব করলেন তিনি। দুর্গন্ধ দূর করার জন্য তিনি তখন একটি নরম কাঠ দ্বারা মেসওয়াক করে ফেললেন। আবুল আলীয়া বলেছেন— হজরত মুসা তখন চিবিয়েছিলেন একটি গাছের ছাল। মেসওয়াক করার পরপরই সেখানে হাজির হলো একটি ফেরেশতার দল। তারা বললো— 'আপনার মুখ থেকে নির্গত হচ্ছিলো মেশকের সুঘ্রাণ; মেসওয়াক করে সেই সুঘ্রাণকে আপনি দূর করে দিয়েছেন।' আল্লাহ্তায়ালা তখন পুনঃনির্দেশ দিলেন আরো দশ দিন রোজা রাখতে। বললেন— এভাবে রোজা অবস্থায় অতিবাহিত করতে হবে মোট চল্লিশ দিন। আরো প্রত্যাদেশ করলেন— হে মুসা! তুমি কি এ কথা জানো না যে রোজাদারদের মুখের দুর্গন্ধ আমার কাছে মেশক আম্বরের চেয়েও উত্তম? হজরত ইবনে আব্বাস থেকে দায়লামীও এ রকম বর্ণনা করেছেন। 🕋 তফসীরে মাযহারী→ ৫৬২
এরপর বলা হয়েছে— 'এবং মুসা তার ভ্রাতা হারুণকে বললো: আমার অনুপস্থিতিতে আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে তুমি আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সদাচার করবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অনুসরণ করবে না।' এ কথার অর্থ— আল্লাহ্তায়ালার সঙ্গে কথোপকথনের উদ্দেশ্যে তুর পর্বতের দিকে যাত্রার প্রাক্কালে হজরত মুসা তাঁর ভ্রাতা হজরত হারুণকে এই মর্মে নির্দেশনা দিলেন যে: 'আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত তুমি এখানে আমার স্থলাভিষিক্ত। তোমার প্রতি উপদেশ এই যে তুমি সকলের সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে; এভাবে সংশোধন করবে তাদেরকে, পরিচালিত করবে সকলকে সুপথে। আর যারা বিপর্যয় সৃষ্টি করে, কস্মিনকালেও তাদেরকে সমর্থন করবে না।'
হজরত ইবনে আব্বাস বলেন— হজরত মুসা তাঁর ভ্রাতাকে দু'টি নির্দেশ দিয়েছিলেন। একটি হচ্ছে— 'আসলিহ্' (সদাচার করবে বা সংশোধন করবে), আর একটি হচ্ছে— 'ওয়ালা তাত্তাবি' (অনুসরণ করবে না)— অর্থাৎ যারা অবাধ্য ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী তাদের আনুগত্য করবে না।
পরের আয়াতে (১৪৩) বলা হয়েছে— 'মুসা যখন আমার নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হলো এবং তার প্রতিপালক তার সহিত কথা বললেন তখন সে বললো: হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দাও, আমি তোমাকে দেখবো; তিনি বললেন: তুমি আমাকে কখনোই দেখবে না। তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য করো, যদি উহা স্বস্থানে স্থির থাকে তবে তুমি আমাকে দেখবে।' এখানে 'ওয়ালাম্মা জাআ মূসা' (মুসা যখন আমার নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হলো) কথাটির অর্থ: হজরত মুসা যখন সিনাই পর্বতমালার তুর পাহাড়ে উপনীত হলেন। 'লিমিকাতিনা' কথাটির অর্থ— আমার নির্ধারিত স্থানে। 'লিমিকাতিনা' কথাটির প্রথমে ব্যবহৃত 'লাম' অক্ষরটি সুনির্দিষ্ট অবস্থা প্রকাশক। এভাবে কথাটির অর্থ দাঁড়িয়েছে— কথোপকথনের জন্য আমি যে স্থান ও সময় নির্ধারণ করেছিলাম, সেই সুনির্দিষ্ট সময়ে ও স্থানে।
তাফসীরকারগণ উল্লেখ করেছেন— হজরত মুসা পাক-পবিত্র হয়ে পবিত্র বস্ত্র পরিধান করে একান্ত আলাপনের জন্য আল্লাহ্পাক কর্তৃক নির্ধারিত তুর পাহাড়ে নির্ধারিত সময়ে গমন করেছিলেন। এখানে 'ওয়া কাল্লামাহু রব্বুহু' কথাটির অর্থ— তার প্রতিপালক তার সঙ্গে কথা বললেন। বর্ণিত হয়েছে— আল্লাহ্পাক তখন তুর পাহাড়ের চারপাশে সাত ফারসাখ (২১ মাইল) এলাকা করে দিয়েছিলেন সম্পূর্ণ অন্ধকার। ওই এলাকা থেকে শয়তানকে বের করে দেয়া হয়েছিলো; মাটিতে অবস্থানরত কীট-পতঙ্গগুলোকেও সরিয়ে দেয়া হয়েছিলো সেখান থেকে। আমল লেখক ফেরেশতাদ্বয়কেও পৃথক করে দেয়া হয়েছিলো। উন্মোচন করে দেয়া হয়েছিলো ঊর্ধ্বাকাশের সকল আবরণ। হজরত মুসা তখন দেখলেন চারিদিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ফেরেশতা, আর উপরের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলেন আল্লাহ্তায়ালার আরশ। ওই অবস্থায় আল্লাহ্তায়ালা হজরত মুসার সঙ্গে বাক্যালাপ করলেন। হজরত মুসার পাশে উপস্থিত থাকলেও হজরত জিবরাইল ওই বাক্যালাপ শুনতে পাননি। হজরত মুসা তখন তকদির লিপিবদ্ধকারী কলমের লেখার আওয়াজও শুনতে পেলেন। 🕋 তফসীরে মাযহারী→ ৫৬৩
বায়যাবীর বর্ণনায় রয়েছে— হজরত মুসা শুনতে পেলেন সকল দিক থেকে ভেসে আসছে আল্লাহ্তায়ালার পবিত্র বাণীর উচ্চারণ। আমি বলি— এ কথার অর্থ হজরত মুসা তখন কোনো নির্দিষ্ট দিক থেকে আল্লাহ্তায়ালার কথা শুনতে পাচ্ছিলেন না। অর্থাৎ ওই অতুলনীয় বাণীবৈভব কোনো এক বা একাধিক নির্দিষ্ট দিকের মুখাপেক্ষী নয়। কোনো দিক যাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না, সেই অতুলনীয় ও অবিভাজ্য পবিত্র সত্তার বাণী তো দিকের অতীত হবেই। হজরত মুসা যখন স্বকর্ণে আল্লাহ্তায়ালার বাণী শুনতে পেলেন তখন তাঁর হৃদয়ে জাগ্রত হলো আল্লাহ-দর্শনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তিনি প্রেমাতিশয্যবশত বলে উঠলেন— 'হে আমার প্রভুপালক! আমাকে দর্শন দাও, আমি তোমাকে দেখবো।'
'আল্লাহ্তায়ালা বললেন: তুমি আমাকে কখনোই দেখবে না'— এ কথার অর্থ পৃথিবীর সময় এবং স্থানের অধীন তুমি এখন। এ অবস্থা দর্শনদানের উপযুক্ত নয়। এখান থেকে আমার দিকে দৃষ্টিপাত করা যায় না; এখানে এ রকম চেষ্টা কেউ করলে তার মৃত্যু অনিবার্য। হজরত মুসা বললেন— 'হে আমার প্রিয়তম প্রভুপ্রতিপালক! তোমার দর্শনধন্য মৃত্যু তো দর্শনবিহীন জীবনের চেয়েও মহীয়ান।'
আল্লামা সুয়্যুতি লিখেছেন— এখানে 'লান্ তারানি' কথাটির অর্থ তুমি আমাকে দেখতে পাবেই না। অর্থাৎ— তুমি আমাকে এখানে দেখতে পাবে না, কিন্তু আখেরাতে বেহেশতে দেখতে পাবে। উল্লেখ্য যে আল্লাহ্পাক এখানে 'লা উরা' (আমি দর্শনীয় নই) এ রকম বলেননি; এতে করে বুঝা যায় আল্লাহ্তায়ালাকে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব, কিন্তু তা পৃথিবীতে হবার নয়।
এরপর বলা হয়েছে— 'তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য করো, যদি তা স্বস্থানে স্থির থাকে তবে তুমি আমাকে দেখবে।' এখানে যে পাহাড়ের দিকে দৃষ্টিপাত করতে বলা হয়েছে সেই পাহাড়টি ছিলো মাদায়েনের সর্ববৃহৎ পাহাড়; পাহাড়টির নাম আল যোবায়ের।
সুদ্দীর বর্ণনায় রয়েছে— আল্লাহ্তায়ালার সঙ্গে হজরত মুসার বাক্যালাপের সময় ইবলিস ঢুকে গিয়েছিলো মাটির মধ্যে। তারপর সে মাটি ফুঁড়ে হজরত মুসার দুই পায়ের মধ্যবর্তী স্থানে উত্থিত হয়ে এই মর্মে কুমন্ত্রণা দিয়েছিলো যে— যে কথা ভেসে আসছে সে কথা শয়তানের, আল্লাহর নয়। হজরত মুসা তাই আল্লাহকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। 🕋 তফসীরে মাযহারী→ ৫৬৪
ওপরের বর্ণনা থেকে এ কথাটিও তো প্রতীয়মান হয় যে পৃথিবীতেই আল্লাহকে দেখা সম্ভব। কারণ হজরত মুসা ছিলেন একজন উলুল আজম পয়গম্বর। তাই তিনি কোনো অসম্ভব বিষয়ের প্রার্থী হতে পারেন না। অসম্ভব জেনেও তার প্রার্থনা করা বিজ্ঞতার পরিচয় নয়। অতএব পৃথিবীতে আল্লাহর দীদার অসম্ভব বলা হলে হজরত মুসাকে বিজ্ঞ না বলে বলতে হয় অজ্ঞ। আল্লাহ্-পরিচয়প্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিত্ব এ রকম অজ্ঞতার পরিচয় দিতে পারেন না। এই অভিমতটির পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয় যে আল্লাহ্তায়ালা এখানে বলেছেন 'লান্ তারানি' (দেখতে পাবেই না), 'লা উরা' (দর্শনীয় নই) এ রকম বলেননি। তাই এ কথা সহজেই অনুমেয় যে আল্লাহর দীদার পৃথিবীতে সম্ভব নয়, কিন্তু পরবর্তী পৃথিবীতে সম্ভব। এ ব্যাপারে প্রকৃত সমাধান এটাই।
**একটি প্রশ্ন:** হজরত মুসা কি এতই অজ্ঞ ছিলেন যে পৃথিবীতে আল্লাহ্ দীদার যে অসম্ভব সে কথাও জানতেন না?
**উত্তর:** আল্লাহ্পাকের পক্ষ থেকে ‘লান্ তারানি'— ঘোষণাটির পূর্বে এ কথা তাঁর জানা না থাকারই কথা; এবং আল্লাহ্তায়ালা না জানানোর আগে কোনো কিছু না জানা কোনো দোষ নয়। হজরত নূহ (عليه السلام) এর ক্ষেত্রে এ রকম ঘটেছে— মহাপ্লাবনের সময় তিনি তাঁর এক পুত্রের জন্য পরিত্রাণপ্রার্থী হয়েছিলেন। আল্লাহ্তায়ালা তখন তাঁকে জানিয়েছিলেন এ রকম প্রার্থনা সমীচীন নয়; এ কথা জানার পর তিনি ওই প্রার্থনার পুনরাবৃত্তি আর করেননি। হজরত ইব্রাহিম (عليه السلام) ও তাঁর পিতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছিলেন না জেনে; কিন্তু আল্লাহ্তায়ালা যখন তাঁকে এ কথা জানালেন যে মুশরিকদেরকে ক্ষমা করা হয় না, তখন থেকে তিনি এ রকম প্রার্থনা আর করেননি। আখেরী রাসূল (ﷺ) ও তাঁর পিতৃব্য আবু তালেবের হেদায়েতের জন্য প্রার্থনা জানিয়েছিলেন আল্লাহ্তায়ালার দরবারে; ওই প্রার্থনার প্রেক্ষিতে আল্লাহ্তায়ালা জানিয়েছেন— 'কোনো নবী এবং মুমিনের জন্য এটা সমীচীন নয় যে তারা কোনো মুশরিকের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী হবে— যদিও তারা নিকটাত্মীয় হয়।'
কোনো কোনো মুনাফিকের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহ্পাকের সকাশে ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছিলেন। সেই প্রার্থনাসূত্রে আল্লাহ্তায়ালা ইরশাদ করেছেন— 'ইস্তাগফির লাহুম আও লা তাসতাগফির লাহুম; ইন তাসতাগফির লাহুম সাব্ঈনা মাররাতান ফালাই ইয়্যাগফিরাল্লাহু লাহুম' (তাদের জন্য আপনি ক্ষমাপ্রার্থনা করুন অথবা না করুন; যদি তাদের জন্য আপনি সত্তর বারও ক্ষমাপ্রার্থনা করেন তবু কখনোই তা আল্লাহ্ মঞ্জুর করবেন না)। অন্যত্র ইরশাদ করেছেন— 'আর কখনও তাদের মধ্য থেকে কেউ মারা গেলে তার জন্য দোয়া (জানাযা) করবেন না এবং কারো কবরের পাশেও দোয়ার জন্য দণ্ডায়মান হবেন না।' এ সকল দৃষ্টান্তসমূহের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে আল্লাহ্তায়ালা কোনো বিষয়ে অবগত করানোর আগে সে বিষয়ের অবগতি না থাকা দোষের কিছু নয়।
🕋 তফসীরে মাযহারী→ ৫৬৫
মোতাজিলারা বলে: দুনিয়া কিংবা আখেরাত— কোনো স্থানেই আল্লাহর দীদার সম্ভব নয়। কারণ এখানে বলা হয়েছে— 'লান্ তারানি' (তুমি আমাকে কখনোই দেখবে না)। এখানে 'লান' শব্দটি (কখনোই না) একটি চূড়ান্ত নির্দেশনা যার অন্যথা অসম্ভব। তাই দুনিয়া-আখেরাত কোনোখানে কখনো আল্লাহর দর্শন সম্ভব নয়। আমরা বলি— এখানে 'কখনোই' অর্থ দুনিয়াতে কখনোই; আখেরাত এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়। এখানে এ রকম বলে দুনিয়ায় দর্শনের সম্ভাবনাকেই সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দেয়া হয়েছে। 'লান' শব্দটির এ রকম ব্যবহারের দৃষ্টান্ত রয়েছে অনেক। যেমন ইহুদীদের সম্পর্কে একস্থানে ইরশাদ হয়েছে— 'ওয়া লাই ইয়্যাতামান্নাওহু আবাদা' (এরা কখনোই মৃত্যু কামনা করবে না)। এ কথার অর্থ— ইহুদীরা দুনিয়ায় কখনো মৃত্যু কামনা করবে না; কিন্তু আখেরাতে মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষী হবে তারা। যেমন এক স্থানে ইরশাদ হয়েছে— 'তারা দোয়া করবে: আক্ষেপ! আমাদের মালিক যদি এখন আমাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতো, আমাদের ওপর আরোপ করতো মৃত্যুর আদেশ।' অন্যত্র বলা হয়েছে— (ইহুদীরা বলবে) 'হায় আফসোস! প্রথম মৃত্যুতেই যদি আমাদেরকে শেষ করে দেয়া হতো।' আরেক স্থানে উল্লেখিত হয়েছে— 'ওয়া ইয়াকুলুল কাফিরু ইয়া লাইতানি কুনতু তুরাবা' (হায় আক্ষেপ! আমরা যদি মাটি হয়ে যেতাম)।
কেউ কেউ বলেছেন— হজরত মুসা আল্লাহ্তায়ালাকে দেখতে চেয়েছিলেন তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের আবদার রক্ষা করার জন্য। যেমন এক আয়াতে এসেছে (ইহুদীদের গোত্রনেতারা বললো) 'আরিনাল্লাহ জাহরাতান' (আমাদেরকে প্রকাশ্যে আল্লাহ্তায়ালাকে দেখিয়ে দিন)। এই অভিমতটি কিন্তু ঠিক নয়। কারণ ওই ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ঘটনা। বর্ণিত উক্তিটির কারণে তখন ওই গোত্রনেতাদের ওপর আপতিত হয়েছিলো আল্লাহর আযাব; বজ্রপাতের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটানো হয়েছিলো তাদের। আর ওই ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহ্তায়ালার ইরশাদ ঘোষিত হয়েছিলো— 'তারা এ কথা বলার অধিকার রাখে না, তাই তাদেরকে পাকড়াও করা হয়েছে।' আলোচ্য আয়াতের প্রেক্ষিতটি কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন; এখানে বিবরণ দেয়া হয়েছে আল্লাহ্তায়ালা ও তাঁর প্রেমিক রাসূলের একান্ত কথোপকথনের— তৃতীয় কারো উপস্থিতি এখানে নেই। আর হজরত মুসাও ছিলেন যোগ্য প্রেমিক। তাই তাঁর দর্শনাভিলাষের কারণে আল্লাহ্পাকের পক্ষ থেকে কোনো অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়নি। কেবল বলে দেয়া হয়েছে— হে আমার দর্শনমত্ত প্রেমিক রাসূল! তোমার অভিলাষ পূরণের স্থান এটা নয়। পৃথিবী আল্লাহ্তায়ালার দীদারের ভার বহনে অক্ষম। এ কথা বলে একটি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে আল্লাহ্তায়ালা বিষয়টি পরিষ্কার করে বুঝিয়েও দিয়েছেন তাঁর প্রিয় রাসূলকে। বলেছেন— 'তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য করো, যদি তা স্বস্থানে স্থির থাকে তবে তুমি আমাকে দেখবে।' প্রিয়তমের দর্শনেচ্ছা প্রেমরীতির প্রতিকূল নয়। যদি হতো তবে আল্লাহ্তায়ালা নিশ্চয় কঠোর ভাষায় এর প্রতিবাদ জানাতেন। কিন্তু যারা প্রকৃত প্রেমিক নয় তাদের আল্লাহ-দর্শনের আবদার অবশ্যই অন্যায়। তাই অবাঞ্ছিত ইহুদী গোত্রনেতাদের সম্পর্কে আল্লাহ্তায়ালা অন্যত্র জানিয়েছেন— 'তারা এ কথা বলার অধিকার রাখে না, তাই তাদেরকে পাকড়াও করা হয়েছে।' অতএব এ কথা প্রমাণিত হলো যে আল্লাহ্তায়ালার নির্ধারিত রাসূলগণ যা করেন তা কখনো অজ্ঞজনোচিত হতে পারে না; আর অজ্ঞদের আবদার অনুসারেও তিনি আল্লাহ্ দর্শনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেননি।
এরপর বলা হয়েছে— 'তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য করো, যদি তা স্বস্থানে স্থির থাকে তবে তুমি আমাকে দেখবে।' এ কথার অর্থ— হে মহাপ্রেমিক মুসা! উত্তমরূপে অবগত হও যে ওই বিশাল পর্বতও আমার জ্যোতিচ্ছটার আবির্ভাব সহ্য করতে পারবে না, তাহলে তুমি কীভাবে সহ্য করবে? এখানে শর্ত করে দেয়া হয়েছে যে পাহাড় স্বস্থানে স্থির থাকলে হজরত মুসার আল্লাহ্-দর্শন সম্ভব। এতে করে বুঝা যায় পৃথিবীতে আল্লাহ্তায়ালার তাজাল্লির আবির্ভাবে পাহাড়ের স্বস্থানে স্থির থাকা সম্ভব নয়। তাই হজরত মুসার পক্ষেও পৃথিবীতে আল্লাহ্-দর্শন সম্ভব নয়। অতএব প্রমাণিত হলো যে পৃথিবীতে আল্লাহ্-দর্শন অসম্ভব; একই সঙ্গে এ কথাটিও প্রমাণিত হলো যে আখেরাতে আল্লাহ্তায়ালার দর্শন সম্ভব। কারণ আখেরাতে অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এরপর বলা হয়েছে— 'যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে জ্যোতিষ্মান হলেন তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করলো আর মুসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লো। যখন সে জ্ঞান ফিরে পেলো তখন বললো: মহিমময় তুমি! আমি অনুতপ্ত হয়ে তোমাতেই প্রত্যাবর্তন করলাম এবং বিশ্বাসীদের মধ্যে আমিই প্রথম।' ওয়াহাব বিন মোনাব্বাহ্ এবং ইবনে ইসহাক বলেছেন— হজরত মুসা যখন বললেন: 'হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দাও, আমি তোমাকে দেখবো'— তখন চার ফারসাখ এলাকা জুড়ে নেমে এলো ঘন কুয়াশা ও অন্ধকার। শুরু হলো বিদ্যুৎ-চমক এবং বজ্রপাত। আল্লাহ্তায়ালা আকাশের ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিলেন— 'যাও, মুসার নিকটে গিয়ে সমবেত হও।' নির্দেশ পেয়ে প্রথম আকাশের ফেরেশতারা বিড়ালের আকার ধারণ করে উড়ন্ত মেঘমালার মতো হজরত মুসার দিকে গমন করতে শুরু করলো। বজ্রগম্ভীর আওয়াজে তাদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছিলো আল্লাহ্তায়ালার প্রশংসা ও পবিত্রতার ঘোষণা। এরপর দ্বিতীয় আকাশের ফেরেশতারা বাঘের আকার ধারণ করে যেতে শুরু করলো তুর পাহাড়ের সন্নিকটে; তাদের মুখেও বিরামহীনভাবে ধ্বনিত হচ্ছিলো আল্লাহ্তায়ালার প্রশংসা ও পবিত্রতার উচ্চকিত আওয়াজ। ফেরেশতাদের এই বিশাল সমাবেশ ও আল্লাহ্পাকের প্রশংসা ও পবিত্রতার মুহুর্মুহু ঘোষণা শুনে ঘন কুয়াশা এবং অন্ধকার বেষ্টিত হজরত মুসা ভীত হয়ে পড়লেন। খাড়া হয়ে উঠলো তাঁর শরীরের সমস্ত পশম। তিনি কাঁপতে কাঁপতে বললেন— 'আমার অসমীচীন আবেদনের জন্য আমি অনুতপ্ত। হায়! আমি যদি এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে পৃথক হয়ে যেতে পারতাম।' সমবেত ফেরেশতাদের সর্দার তখন তাঁকে বললেন— 'হে দীদারাভিলাষী নবী! আপনি আপনার আবেদনের ওপরই স্থির থাকুন; এখনো সামনে রয়েছে অনেক বিস্ময়।'
এরপর আবির্ভূত হলেন তৃতীয় আকাশের ফেরেশতারা। তাদের বর্ণ ছিলো আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো, আর আকার ছিলো ব্যাঘ্রের মতো। বিশাল সেনাদলের মতো সম্মিলিত পদবিক্ষেপে আগমন করছিলো তারা; উচ্চকণ্ঠে বর্ণনা করছিলো আল্লাহ্পাকের প্রশংসা ও পবিত্রতা। হজরত মুসা জীবনের আশা পরিত্যাগ করলেন। ফেরেশতা বাহিনীর অধিপতি বললেন— 'হে ইমরান তনয়! আপন স্থানে অটল থাকুন; সামনে তো রয়েছে আরো অনেক অসহনীয় দৃশ্য।'
এরপর সম্পূর্ণ ভিন্ন আকৃতি ধারণ করে আগুন ও বরফের শরীর বিশিষ্ট রক্তাভ ও শ্বেতাভ বর্ণের ফেরেশতাবৃন্দ উপস্থিত হলো; তারা এলো চতুর্থ আকাশ থেকে। পূর্বে সমবেত সকল ফেরেশতার সম্মিলিত আওয়াজের চেয়ে নবাগত ফেরেশতা বাহিনীর তসবীহ্ পাঠের কণ্ঠস্বর ছিলো আরো অনেক উচ্চ। হজরত মুসার মনে হচ্ছিলো কর্ণকুহর বুঝি বিদীর্ণ হয়ে যাবে; শরীরের গ্রন্থিসমূহ মনে হয় এই মুহূর্তে হয়ে যাবে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠলো। ফেরেশতাধিপতি বললেন— 'হে রাসূল মুসা! বিচলিত হবেন না; আরো অনেক কিছু রয়েছে সম্মুখে। সবে তো শুরু।'
এরপর উপস্থিত হলো সপ্তবর্ণ বিশিষ্ট ফেরেশতার দল; তারা ছিলো পঞ্চম আকাশের। মনে হচ্ছিলো যেনো আগুনের ঢেউ— কিন্তু সে আগুন ছিলো উত্তাপ বিবর্জিত। সম্পূর্ণ ভিন্ন আকৃতিসম্পন্ন ওই ফেরেশতাদের উচ্চকণ্ঠে তসবিহ্ পাঠ শুনে বিহ্বল হয়ে পড়লেন বিস্মিত ও আতঙ্কিত হজরত মুসা; ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। অধিনায়ক ফেরেশতাটি বললেন— 'হে ইমরান পুত্র! ধৈর্যধারণ করুন; আরো বিস্ময় রয়েছে সামনে। সকল দৃশ্য উন্মোচিত হবে একে একে। আপনি কিন্তু ধৈর্যচ্যুত হবেন না।'
ষষ্ঠ আকাশের ফেরেশতারা এরপর হাজির হলেন আগুনের পোশাক পরে; তাদের প্রত্যেকের হাতে শোভা পাচ্ছিলো একটি করে খেজুরের গাছের মতো লম্বা আগুনের লাঠি। লাঠিগুলো ছিলো সূর্যের আলোর চেয়ে অনেক উজ্জ্বল। চারটি করে মুখ ছিলো প্রত্যেকের, তাই তাদের তসবীহ্ পাঠের আওয়াজ ছিলো আরো বেশি ভয়ংকর। সেই আওয়াজে ডুবে যাচ্ছিলো পূর্বের সকল ফেরেশতাদের সম্মিলিত তসবীহ্ পাঠের আওয়াজ। চতুর্মুখী সেই আওয়াজে পুনঃপুনঃ ধ্বনিত হচ্ছিলো— 🕋 তফসীরে মাযহারী→ ৫৬৮
'সুব্বুহুন কুদ্দুসুন ওয়া রব্বুল মালায়িকাতি ওয়ার রূহ্, রব্বিল ই’য্যাতি আবাদান লা ইয়ামুতু।' হজরত মুসা এবার রোদনসিক্ত কণ্ঠে সেই তসবীহ্ পাঠ শুরু করে দিলেন। বললেন— 'হে আমার প্রিয়তম প্রভুপ্রতিপালক! আমাকে বিস্মৃত হবেন না; আপনার এই দাসকে আর পরীক্ষা করবেন না। জানি না এই ভয়ংকর অবস্থা থেকে আমি আর কখনো পরিত্রাণ পাবো কিনা। একি অসহনীয় অবস্থা! আমি নিশ্চিত, এই স্থান পরিত্যাগ করলে আমি ভস্মীভূত হবো; আর আমি এ বিষয়েও নিশ্চিত যে এখানে আমার সামনে মৃত্যু ছাড়া অন্য কিছু নেই।' অধিনায়ক ফেরেশতা বললেন— 'হে ইমরান নন্দন! ভয়-ভীতির সীমানা অতিক্রম করেছেন আপনি; আপনার জীবন এখন কণ্ঠাগত। তবু হে রাসূল প্রবর! সহিষ্ণুতাকে আশ্রয় করাই আপনার পক্ষে সমীচীন।'
এরপর এলো সপ্তম আকাশের ফেরেশতারা। তারা গগনবিদারী আওয়াজে পাঠ করতে শুরু করলো— 'সুবহানাল মালিকিল কুদ্দুসি রব্বিল ই’য্যাতি আবাদান লা ইয়ামুতু' (যাবতীয় পবিত্রতার অধীশ্বরেরই সমস্ত পবিত্রতা। মহিমময় পালনকর্তা চিরঞ্জীব, অমর)। থর থর করে কাঁপতে শুরু করলো সিনাই পর্বতমালা। পর্দা উঠিয়ে দেয়া হলো আরশের। আল্লাহ্তায়ালার সৌন্দর্যচ্ছটার অতি দূরবর্তী এক বিন্দু প্রতিচ্ছায়া পতিত হলো সিনাই গিরিশ্রেণীর সর্বোচ্চ চূড়াবিশিষ্ট আল যোবায়ের পর্বতশৃঙ্গে। নিমেষে ভস্মীভূত হয়ে গেলো আল যোবায়ের, আর হজরত মুসা জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন; উপুড় হয়ে পড়ে গেলেন মাটিতে। ওই তাজাল্লি প্রক্ষেপণের লেলিহান প্রতিক্রিয়ায় হজরত মুসা যেনো ভস্মীভূত না হন তাই যে পাথরের ওপর হজরত মুসা দাঁড়িয়েছিলেন সেই পাথরটিকেই আল্লাহ্পাক উল্টো করে গম্বুজের মতো স্থাপন করলেন ভূতলশায়ী হজরত মুসার ওপর। এভাবে অতিবাহিত হলো কিছুটা সময়। হজরত মুসা সংজ্ঞা ফিরে পেলেন; তসবীহ্ পাঠ করতে করতে পূর্ববৎ দণ্ডায়মান হলেন তিনি। বললেন— 'হে আমার জীবন-মৃত্যুর অধীশ্বর! আমি তো আপনার ওপর ইমান আনয়ন করেছি। এ কথাও এখন জানলাম যে কেউ আপনার ফেরেশতাকুলকে চাক্ষুষ করলে ভীত-সন্ত্রস্ত হবেই, আর আপনাকে দেখতে চাইলে মৃত্যুবরণ করবেই। হে মহাবিশ্বের মহা অধিপতি! আপনিই শ্রেষ্ঠ, আপনিই মহান। আপনিই সকল সৃষ্টির একমাত্র প্রভুপ্রতিপালক, অতুলনীয় রাজাধিরাজ, একমাত্র উপাস্য। আপনার সমতুল কেউ নেই; আপনার সমকক্ষ হওয়ার ধৃষ্টতাও কেউ রাখে না। হে আমার প্রেমময় প্রেমাধিরাজ! আমি আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনকামী; সকল প্রশংসা ও পবিত্রতা কেবলই আপনার। আপনার কোনো অংশীদার নেই। পবিত্রাতিতম পবিত্র আপনি; আপনি মহীয়ান, গরিয়ান। মহাবিশ্বের আপনিই একক প্রভুপ্রতিপালক।'
এখানে 'তাজাল্লি' শব্দটির অর্থ নূরের আবির্ভাব। আল্লামা সুয়্যুতি লিখেছেন— ওই সময় মুহূর্তের জন্য একটি নূরের ঝলক বিম্বিত হয়েছিলো মাত্র। হাকেমের বিশুদ্ধ বর্ণনাতেও এ রকম বলা হয়েছে। 🕋 তফসীরে মাযহারী→ ৫৬৯
মহান সুফী সাধকগণ বলেন— প্রতিচ্ছায়ার স্তরের আবির্ভাবকে বলা হয় তাজাল্লি— যেমন আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিবিম্ব। তুর পর্বতে যা ঘটেছিলো তা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্তায়ালার দর্শন নয়। এ কথাটিও মনে রাখতে হবে যে তাজাল্লি সহ্য করার দিক থেকে হজরত মুসা নিশ্চয়ই পাহাড়াপেক্ষা অধিকতর যোগ্য; তাই পাহাড় ভস্মীভূত হয়েছিলো বটে কিন্তু হজরত মুসা ভস্মীভূত হননি। তিনি বেহুঁশ হয়েছিলেন মাত্র, ক্ষণকাল পরে আবার সংজ্ঞাও ফিরে পেয়েছিলেন। আল্লাহ্তায়ালা ইরশাদ করেছেন— 'আমি তো আসমান-জমিন ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত অর্পণ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা এ গুরুভার বহন করতে অস্বীকৃত হলো এবং শঙ্কিত হলো; আর মানুষ তা বহন করলো।'
হজরত ইবনে আব্বাস বলেছেন— আল্লাহর নূর তখন প্রকাশিত হয়েছিলো পাহাড়ের ওপর। জুহাক বলেছেন— আল্লাহ্পাক তাঁর সত্তার জ্যোতি তখন অবারিত করেছিলেন এবং পর্দা উঠিয়ে ষাঁড়ের নাসিকারন্ধ্রের পরিসরের সমান জ্যোতি প্রকাশ করেছিলেন মাত্র। হজরত আবদুল্লাহ্ ইবনে সালাম এবং হজরত কা'ব আহবার বলেছেন— সূঁচের অগ্রভাগ পরিমাণ নূরের তাজাল্লি তখন পাহাড়ের ওপর প্রক্ষেপ করেছিলেন আল্লাহ্তায়ালা, আর তাতেই পাহাড়টি হয়ে গিয়েছিলো চূর্ণ-বিচূর্ণ।
সুদ্দী বলেছেন— তখন নূরের তাজাল্লিসম্পাত ঘটেছিলো কনিষ্ঠা আঙুলের অগ্রভাগ সমতুল্য। হজরত আনাসের বর্ণনায় রয়েছে কনিষ্ঠ আঙুলের সর্বোচ্চ গিরায় বৃদ্ধ আঙুলের অগ্রভাগ স্থাপন করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই আয়াত পাঠ করে বলেছিলেন: 'ব্যস, এতোটুকুই তাজাল্লি নিক্ষিপ্ত হয়েছিলো তখন। আর তাতেই পাহাড় হয়ে গিয়েছিলো চূর্ণ-বিচূর্ণ এবং মুসা হয়ে পড়েছিলেন বেহুঁশ।' আবু শায়েখের বর্ণনায় রয়েছে— রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কনিষ্ঠা আঙুলের অগ্রভাগ দেখিয়ে বলেছিলেন: 'এতোটুকু তাজাল্লি নিক্ষেপের ফলে পাহাড় হয়ে গিয়েছিলো চূর্ণ-বিচূর্ণ।'
হজরত সহল বিন সা'দ সায়াদীর বর্ণনায় এসেছে— আল্লাহ্তায়ালা তাঁর সত্তর হাজার নূরের পর্দা থেকে মাত্র এক দিরহাম পরিসরের পর্দা উঠিয়ে নিয়েছিলেন; তাতেই পাহাড় হয়ে গিয়েছিলো ভস্মীভূত।
'দাক্কান' শব্দটির অর্থ টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া বা চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়া। কামুস গ্রন্থে রয়েছে— 'দাক্কান', 'দাকুন' এবং 'হাদামুন' শব্দত্রয়ের অর্থ সমতল বালুকা ভূমি।
হজরত ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন— আল্লাহ্পাক ওই পাহাড়কে পুড়িয়ে ভস্ম করে দিয়েছিলেন; আর ওই জমাট ভস্মের পাহাড়টি তখন চলতে চলতে গিয়ে পড়েছিলো সমুদ্রবক্ষে। সমুদ্রের অভ্যন্তরে এখন পর্যন্ত সেটি সতত ধাবমান।
🕋 তফসীরে মাযহারী→ ৫৭০
আতিয়া বলেছেন— পাহাড়টি তখন পরিণত হয়েছিলো বালির পাহাড়ে। কালাবী বলেছেন— 'দাক্কান' শব্দটির অর্থ 'কারান', অর্থাৎ খণ্ড-বিখণ্ড। পাহাড়ের খণ্ড-বিখণ্ড অংশগুলো তখন যুক্ত হয়ে গিয়েছিলো ছোট ছোট পাহাড়ের সঙ্গে।
বাগবী লিখেছেন— এই আয়াতের ব্যাখ্যাসূত্রে বর্ণিত হয়েছে: নূরের তেজে তখন ছয় খণ্ডে বিভক্ত হয়েছিলো পাহাড়টি। তিনটি খণ্ড গিয়ে পড়েছিলো মদীনায় এবং অবশিষ্ট তিনটি খণ্ড গিয়ে স্থির হয়েছিলো মক্কায়। মদীনায় ওই তিনটির নাম হয়েছে উহুদ, অরকান এবং রিজবী; আর মক্কায় সেগুলোর নাম হয়েছে সাওর, সাবীর এবং হেরা।
'তাখরিজে বায়যাবী' গ্রন্থে সায়াফ উল্লেখ করেছেন— ইবনে মারদুবিয়ার বর্ণনায় রয়েছে: হজরত আলী (رَضِيَ ٱللَّٰهُ عَنْهُ) বলেছেন, আরাফা প্রান্তরে সন্ধ্যার সময় হজরত মুসার প্রতি আল্লাহ্ প্রত্যাদেশ করলেন— 'ইন্নানী আনাল্লাহ্' (নিশ্চয় আমিই আল্লাহ)। হজের সমাবেশস্থলের সন্নিকটে তখন প্রক্ষিপ্ত হয়েছিলো নূরের বিচ্ছুরণ; ফলে ওই পাহাড়টি বিভক্ত হয়েছিলো সাতটি খণ্ডে। একটি খণ্ড এখনো স্বস্থানে অটুট; সেই স্থানটি হচ্ছে ইমামের অবস্থানস্থল। তিনটি খণ্ড নিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়ে পতিত হয়েছিলো মদীনায়; ওই তিনটির নাম— তাইয়্যেবা, উহুদ এবং রিজবী। একটি খণ্ড উড়ে গিয়ে পড়েছিলো সিরিয়ার সিনাই পর্বতমালায়; উড়ে গিয়ে পড়েছিলো বলেই ওই পর্বতটির নাম তুর। আমি বলি— বর্ণনাটি অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য। কারণ আল্লাহ্তায়ালা হজরত মুসার সঙ্গে বাক্যবিনিময় করেছিলেন সিরিয়ার সিনাই গিরিশ্রেণীর তুর পাহাড়ে; সেখানেই তাঁর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিলো তওরাত শরীফ। আরাফা প্রান্তরে এ রকম কোনো ঘটনা ঘটেনি।
'সায়িক্বা' শব্দটির অর্থ সংজ্ঞাহীন বা বেহুঁশ— এ রকম বলেছেন হজরত ইবনে আব্বাস। হজরত কাতাদা বলেছেন— শব্দটির অর্থ মৃত্যু। কালাবী বলেছেন— আরাফার দিন বৃহস্পতিবার হজরত মুসা বেহুঁশ হয়েছিলেন এবং জুমার কোরবানীর দিন আল্লাহ্পাক তাঁকে তওরাত দান করেছিলেন। ওয়াকেদী বলেছেন— বেহুঁশ অবস্থা থেকে সংজ্ঞা ফিরে পাবার পর ফেরেশতারা তাঁকে বলেছিলো: 'হে ইমরানের দুলাল! আপনার দীদারের বাসনা ফলপ্রসূ হয়েছে কি?'
'ফালাম্মা আফাক্বা' অর্থ— হজরত মুসা জ্ঞান ফিরে পেলেন। 'কলা' অর্থ— তখন বললেন। 'সুবহানাকা তুবতু ইলাইকা' অর্থ— 'মহিমময় তুমি! আমি অনুতপ্ত হয়ে তোমাতেই প্রত্যাবর্তন করলাম।' অর্থাৎ অনুমতি ব্যতিরেকে দীদার যাচ্ঞা করার দুঃসাহস থেকে আমি অনুতপ্ত ও সলজ্জিত প্রত্যাবর্তন (তওবা) করলাম। 'ওয়া আনা আউয়ালুল মু'মিনীন' অর্থ— 'এবং বিশ্বাসীদের মধ্যে আমিই প্রথম।' অর্থাৎ— এই উম্মতের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম ও সর্বাগ্রগণ্য ইমানদার। বলাবাহুল্য যে নবীর ইমান নিশ্চয় তাঁর উম্মতের ইমানাপেক্ষা অগ্রগামী।
🕋 তফসীরে মাযহারী→ ৫৭১