আলেমের কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

বিষয় নং- ০২: ‘আলেমের কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র।
কিতাবঃ প্রমাণিত হাদিসকে জাল বানানোর স্বরুপ উন্মোচন
কৃতঃ মাওলানা মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাহাদুর
____________________
বিষয় নং- ০২: ‘আলেমের কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র।


“হাদীসের নামে জালিয়াতি” গ্রন্থের ৪৪৭ পৃষ্ঠায় এ হাদিসটিকে জাল প্রমাণের অনেক অপচেষ্টা করেন। তিনি কতিপয় ইমামদের নামে মিথ্যাচার করে লিখেন-‘‘সাখাভী, যারকানী, মোল্লা আলী কারী প্রমুখ মুহাদ্দিস জানিয়েছেন যে, কথাটি খুব সুন্দর শোনালেও তা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কথা নয়।’’


সম্মানিত পাঠকবৃন্দ! তিনি তিনজন মুহাদ্দিসের নামে মিথ্যাচার করেছেন, তার জবাব সামনে আসছে ইন শা আল্লাহ। শুধু তাই নয় তিনি আরও লিখেন-‘‘বাক্যটি আসলে তাবিয়ী হাসান বসরীর (রাহ.) উক্তি।’’


এভাবে তিনি যে একজন হাদিস শাস্ত্রের গবেষক দাবী করে সত্য গোপনকারীর খাতায় নাম উঠিয়েছেন। আমি দেখেছি এ হাদিসগলোকে অনেক বাংলা বিভিন্ন পুস্তুকে মনগড়াভাবে জাল বলে উল্লেখ করেছেন।


প্রথমে বলা রাখা ভাল উক্ত হাদিসটির দশটিরও বেশী সনদ রয়েছে, যা দ্বারা হাদিসটি মুতাওয়াতিরের কাছাকাছি মর্যাদা রাখে। আমি এ বিষয়টির প্রত্যেক সনদ নিয়েই আলোচনা করার চেষ্টা করবো, ইনশা আল্লাহ।



প্রথম সূত্র : 


❏ যেমন হাফিজ ইবনে আব্দিল বার (رضي الله عنه) বর্ণনা করেছেন,


وَقَرَأْتُ عَلَى خَلَفِ بْنِ الْقَاسِمِ، أَنَّ أَحْمَدَ بْنَ إِبْرَاهِيمَ بْنَ عَطِيَّةَ الْحَدَّادَ، حَدَّثَهُ ثنا أَحْمَدُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ مُوسَى بْنِ عِيسَى، ثنا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْمُسْتَنِيرِ، ثنا أَبُو عِصْمَةَ عَاصِمُ بْنُ النُّعْمَانِ الْبَلْخِيُّ، ثنا إِسْمَاعِيلُ بْنُ أَبِي زِيَادٍ، عَنْ أَبِي يُونُسَ الْقُشَيْرِيِّ، عَنْ سِمَاكِ بْنِ حَرْبٍ، عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يُوزَنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِدَادُ الْعُلَمَاءِ وَدَمُ الشُّهَدَاءِ


-“হযরত আবু দারদা (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলে পাক (ﷺ) বলেছেন: কেয়ামতের দিন আলিমের কলমের কালি ও শহীদের রক্ত ওজন করা হবে, তখন আলিমের কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়ে ভারী হয়ে যাবে।’’  ১১

➥{ইমাম ইবনুল বার, জামিউল বায়ানুল ইলমে ওয়া ফাদ্বলিহি, ১/১৫০পৃ. হাদিস,  ১৫৩, যারকশী,  তাযকিরাহ, ১/১৬৯পৃ. ইরাকী, তাখরীজে ইহইয়াউল উলূম, ১/১৩পৃ. তিনি বলেন সনদটি দুর্বল, মুত্তাকী হিন্দী, কানযুল উম্মাল, ১০/১৭৩ পৃ. হা/২৮৯০১,  শাওকানী,  ফাওয়াইদুল মওদ্বুআত, ১/২৮৭ পৃ. হাদিস,  ৫৩,  ও ইবনে হাজার আসকালানী,  রওদ্বাতুল মুহাদ্দিসীন,  ৩/১৪০ পৃ. হা/৪৮৯১ ,  সাখাভী : মাকাসিদুল হাসানা : ৩৮৪ পৃ. : হা/১০০৫, ইমাম সুয়ূতি : জামেউস সগীর : ২/৭১৫ পৃ. : হা/১০০২৬, ইবনুল জাওযী : আল-ইলালুল মুতানাহিয়্যাহ, ১/১৪৮ পৃ.,  আজলূনী,  কাশফুল খাফা : ২/১৭৯পৃ. হাদিস,  ২২৭৪,  তাহের পাটনী, তাযকিরাতুল মওদ্বুআত,  ১/২৩পৃ. মোল্লা আলী ক্বারী, আসরারুল মারফূআহ, ১/৩১৩পৃ. হাদিস,  ২৩৯,}



পর্যালোচনা: 


বুঝা গেল এটা রাসুল (ﷺ) এর হাদিস। আর ইমাম সাখাভী ও আজলূনী (رحمة الله) হাদিসটি সম্পর্কে কোন মন্তব্য করেননি। ইমাম সুয়ূতি  একজন রাবী দুর্বল হওয়াতে হাদিসটি দুর্বল বলে উলে­খ করেছেন।


❏ হাফিজ যায়নুদ্দিন ইরাকী (رحمة الله) বলেন,


يُوزن يَوْم الْقِيَامَة مداد الْعلمَاء وَدِمَاء الشُّهَدَاء أخرجه ابْن عبد الْبر من حَدِيث أبي الدَّرْدَاء بِسَنَد ضَعِيف.


-“কিয়ামতের দিন আলিমের কলমের কালি ও শহিদের রক্ত ওজন করা হবে। ইবনে আব্দিল বার (رحمة الله) হযরত আবু দারদা (رضي الله عنه) থেকে যঈফ সনদে হাদিস বর্ণনা করেছেন।”


(তাখরিজু আহাদিসুল ইহ্ইয়াউল উলূম, হাদিস নং ৪)


অপরদিকে আহলে হাদিস আলবানী তার “সিলসিলাতুল...দ্বঈফাহ” গ্রন্থের হাদিস নং ৪৮৩২ এ হাদিসটিকে মওদ্বু বা জাল বলে সীমালংঘন করেছেন।



দ্বিতীয় সূত্রঃ- 


এ হাদিসটি খতিবে বাগদাদী (رحمة الله) তার “তারীখে বাগদাদ” গ্রন্থে দু‘টি ধারায় বর্ণনা করেছেন ।


❏ আর ইমাম সাখাভী (رحمة الله) খতিবে বাগদাদী হতে সংকলন করেছেন :


حديث نافع، عن عبد الله ابن عمر رفعه: (وزن حبر العلماء بدم الشهداء فرجح عليهم)


-‘‘হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত। তিনি মারফু সনদে বর্ণনা করেন,  যখন শহীদের রক্তের সাথে আলেমের কলমের কালির ওজন করা হবে,  তখন শহীদের রক্তের পাল্লা নিঁচু হয়ে যাবে।’’   ১২

➥{খতিবে বাগদাদ, তারীখে কাগদাদ, ২/১৯০ পৃ. হা/৬১৮, সাখাভী, মাকাসিদুল হাসানা, ৩৮৪ পৃ., হা/১০০৫, সুয়ূতি : জামেউস সগীর : ২/৭১৫ পৃ. হা/১০০২৬, আজলূনী,  কাশফুল খাফা,  ২/১৭৯ পৃ. হাদিস:২২৭৪,  ইমাম যারকশী,  তাযকিরাহ ফি আহাদিসুল মুশতাহিরাহ,  ১/১৬৯ পৃ. ইমাম ইরাকী,  তাখরীজে আহাদিসুল ইহইয়াউল উলূম,  ১/২৭ পৃ.

 . ১৩. ইমাম যারকশী,  তাযকিরাহ ফি আহাদিসুল মুশতাহিরাহ,  ১/১৬৯ পৃ.}


ইমাম সাখাভী (رحمة الله) বলেন,  উক্ত হাদিসটির মধ্যে ‘মুহাম্মদ বিন জাফর’ নামক একজন রাবী দোষী। তবে মিথ্যার দোষে অভিযোগ নেই। অপরদিকে জালালুদ্দীন সুয়তী (رحمة الله) উক্ত হাদিসটির সনদের উক্ত রাবীকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম ইবনে ইরাকী  এ সনদটি সম্পর্কে বলেন হাদিসটি সহীহ পর্যায়ের নয়।  ১৩

➥{ইমাম যারকশী,  তাযকিরাহ ফি আহাদিসুল মুশতাহিরাহ,  ১/১৬৯ পৃ.}


❏ এ সনদের অভিযুক্ত  রাবী ব্যতিত ইমাম যারকশী  আরেকটি ধারা বর্ণনা করেছেন যা নিম্নরূপ-


رَوَاهُ صَاحب مُسْند الفردوس من حَدِيث عبد الْعَزِيز بن ابي دَاوُد عَن نَافِع عَن ابْن عمر مَرْفُوعا يُوزن حبر الْعلمَاء بِدَم الشُّهَدَاء فيرجح ثَوَاب حبر الْعلمَاء على ثَوَاب دم الشُّهَدَاء


-‘‘ইমাম দায়লামী (رحمة الله) তাঁর মুসনাদিল ফিরদাউস হযরত আবদুল আযিয বিন আবি দাউদ থেকে তিনি না‘ফে (رحمة الله) হতে তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (رضي الله عنه) হতে বর্ণনা করেন।’’  ১৪

➥{ইমাম ইরাকী,  তাখরীজে আহাদিসুল ইহইয়াউল উলূম,  ১/২৭পৃ.}


তৃতীয় সূত্রঃ- 


❏ আল্লামা সাখাভী ও আজলূনী (رحمة الله) তাদের গ্রন্থে ইমাম দায়লামী,  ইমাম সিরাজী (رحمة الله) এর গ্রন্থে হতে আরেকটি হাদিস সংকলন করেছেন তা হলো :


عن انس بن مالك ؓ قال قال رسول الله ﷺ : يوزن يوم القيامة مداد العلماء و دم الشهداء فيرجح مداد العلماء على دم الشهداء


-‘‘হযরত আনাস বিন মালিক (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত।  রাসুল (ﷺ) ইরশাদ করেন : কিয়ামতের মাঠে আলিমের কলমের কালির সাথে শহীদের রক্তের পরিমাপ করা হবে। অত:পর আলেমের কলমের কালির পাল্লা ভারি আর শহীদের রক্তের পাল্লা নিচু হয়ে যাবে।’’  ১৫

➥{সাখাভী : মাকাসিদুল হাসানা : ৩৮৪ পৃ : হা/১০০৫,  সুয়ূতি : জামেউস সগীর : ২/৭১৫ পৃ. : হা/১০০২৬, দায়লামী : আল-ফিরদাউস : ২/১৮৭পৃ. ইমাম সিরাজী : ইনকিলাব : ২/১৪২ পৃ,  ইবনে জাওযী : ইল্লাল : ১/১৪৮, আজলূনী : কাশফুল খাফা : ২/২০০ পৃ. হা/২২৭৪, শায়খ ইউসুফ নাবহানী, ফতহুল কাবীর, ৩/৪০৯ পৃ. হা/১৪৫৩৪, মুত্তাকী হিন্দী, কানযুল উম্মাল, ১০/১৪১ পৃ. হা/২৮৭১৫, ইমাম ইরাকী, তাখরীযে আহাদিসুল ইহইয়াউল উলূম, ১/২৭ পৃ. সুয়ূতি,  জামিউল আহাদিস, ৪/২৩ পৃ. হা/২৬৯৪ ও ২৪/২৭৫ পৃ. হা/২৭১৪৫}



চতুর্থ সূত্রঃ-


❏ এর ব্যাপারে আল্লামা কাজী ছানাউল্লাহ পানিপাথি (رحمة الله) স্বীয় তাফছিরের কিতাবে উল্লেখ করেন:


واخرج الذهبي وَأخرج المرهبي فِي فضل الْعلم عَن عمرَان بن حُصَيْن رَضِي الله عَنهُ قَالَ: قَالَ رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم يُوزن يَوْم الْقِيَامَة مداد الْعلمَاء وَدِمَاء الشُّهَدَاء فيرجح مداد الْعلمَاء على دِمَاء الشُّهَدَاء


-“ইমাম যাহাবী (رحمة الله) এবং মারহাবী (رحمة الله) ইলিমের ফজিলত প্রসঙ্গে হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (رضي الله عنه) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলে পাক (ﷺ) বলেছেন: কিয়ামতের দিন আলিমের কলমের কালি ও শহিদের রক্ত ওজন করা হবে, তখন আলিমের কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়ে ভারী হয়ে যাবে।”


(তাফসিরে মাজহারী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩০৮ পৃ:; তাফসিরে দুররুল মানসুর, ৩য় খণ্ড, ৪২৩ পৃ:)।



পঞ্চম সূত্রঃ- 


❏ আল্লামা ইমাম ইবনুল বার (رحمة الله) তার প্রসিদ্ধ হাদিস গ্রন্থ جامع بيان العلوم و فضله- গ্রন্থের ১/৩১ পৃষ্ঠায় হযরত আবু হুরায়রা (رضي الله عنه) হতে গ্রহণযোগ্য সনদে শহীদের উপরে আলেমের মর্যাদা প্রসঙ্গে একটি হাদিস বর্ণনা করেন। যেমন-


الانبياء على العلماء فضل درجتين و للعلماء على الشهداء فضل درجة


-“আলেমদের উপরে নবীদের মর্যাদা আর শহীদদের উপরে আলেমদের মর্যাদা।”



ষষ্ঠ সূত্রঃ- 


এ বিষয়ে হযরত হাসান বসরী (رضي الله عنه) হতেও একটি সনদ বর্ণিত আছে।  ১৬

➥{যারকশী, আল-তাযকিরাহ ফি আহাদিসুল মুশতাহিরাহ, ১/১৬৮ পৃ. সুয়ূতি, আদ্দুরুল মুনতাসিরাহ,  ১/১৭৬ পৃ. হাদিস,  ৩৬৬, আজলূনী, কাশফুল খাফা, ২/২৩৬ পৃ. হা/২২৭৬, শাওকানী, ফাওয়াইদুল মাওদ্বুআত, ১/২৮৭ পৃ. হা/৫৩,  ও ১/১০৭ পৃ. হা/১০০, তাহের পাটনী, তাযকিরাতুল মুওদ্বুআত,  ১/২৩ পৃ. মোল্লা আলী ক্বারী,  আসরারুল মারফূআহ, ১/৩১২ পৃ. হা/৪২৯}


সপ্তম সূত্রঃ- 


❏ এ বিষয়ে ইমাম ইবনে জাওযী (رحمة الله) ও মুত্তাকী হিন্দী (رحمة الله) তাদের গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (رضي الله عنه) থেকে একটি সূত্র এভাবে বর্ণনা করেছেন-


عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مُحَمَّدِ قَالَ نا أَحْمَدُ بْنُ عَلِيِّ بْنِ ثَابِتٍ قَالَ أَخْبَرَنِي الْحَسَنُ بْنِ أَبِي طَالِبٍ قَالَ نا أَبُو بَكْرٍ مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرِ بْنِ الْعَبَّاسِ قَالَ نا مُحَمَّدُ بْنُ الْحَسَنِ الْعَسْكَرِيُّ قَالَ نا الْعَبَّاسُ بْنُ يَزِيدَ الْبَحْرَانِيُّ قَالَ نا إِسْمَاعِيلُ بْنُ عَلِيَّةَ قَالَ نا أَيُّوبُ عَنْ نَافِعٍ عَنِ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ وُزِنَ حِبْرُ الْعُلَمَاءِ بِدَمِ الشُّهَدَاءِ فَرَجَحَ عَلَيْهِمْ.


-‘‘আবদুর রাহমান বিন মুহাম্মদ (رحمة الله) তিনি........ যথাক্রমে মুহাদ্দিস আইয়ুব (رحمة الله) থেকে তিনি না‘ফে (رحمة الله) থেকে তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (رضي الله عنه)  থেকে তিনি বলেন রাসুল (ﷺ) ইরশাদ ফরমান, কিয়ামতের দিন আলিমের কলমের কালি ও শহিদের রক্ত ওজন করা হবে, তখন আলিমের কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়ে ভারী হয়ে যাবে।’’  ১৭

➥{ইমাম ইবনে জাওযী, আল-ইল­লুল মুতনাহিয়্যাহ, ১/৭১ পৃ. হাদিস,  ৮৩, মুত্তাকী হিন্দী, কানযুল উম্মাল,  ১০/১৭৩ পৃ. হাদিস, ২৮৯০৩, তিনি ইবনে নাজ্জারের সূত্রে। সুয়ূতি, জামিউল আহাদিস: ১৮/১৬৯ পৃ.  হা/১৯১৩৬}


পর্যালোচনা:

এ হাদিসটি সম্পর্কে ইমাম ইবনে জাওযী  বলেন, হাদিসটি- لا يَصِحُّ‘‘সহীহ পর্যায়ের নয়।


❏ ইমাম খতিবে বাগদাদী  বলেন-


قَالَ الْخَطِيبُ: رِجَالُهُ كُلُّهُمْ ثِقَاتٌ غَيْرُ مُحَمَّدِ بْنَ الْحَسَنِ وَنَرَاهُ مِمَّا صَنَعَتْ يَدَاهُ.


-‘‘এ হাদিসের সমস্ত রাবিগণই সিকাহ শুধু মাত্র ‘মুহাম্মদ বিন হাসান আসকারী’ ছাড়া। আমার মনে হয় তিনিই নিজ হাতে এ হাদিসটি রচনা করেছেন।’’১৮

➥{ইমাম ইবনে জাওযী, আল-ইলালুল মুতনাহিয়্যাহ,  ১/৭১ পৃ. হা/৮৩}



সম্মানিত পাঠকবৃন্দ! ইমাম মুহাম্মদ বিন হাসান আসকারী (رحمة الله) হলেন আহলে বায়াতের ১১তম বংশধর, তার পক্ষে জাল হাদিস বানানো কল্পনাও করা যায় না। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে আমি এ গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডের ১০৩ পৃষ্ঠায় আলোকপাত করেছি, পাঠকবৃন্দের সেখানে দেখে নেয়ার অনুরোধ রইল।



অষ্টম সূত্রঃ- 


❏ এ বিষয়ে ইমাম ইবনে জাওযী  তার গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর বিন আস (رضي الله عنه) থেকে একটি সূত্র এভাবে বর্ণনা করেছেন-


حَدِيثُ ابْنِ عَمْرٍو نا ابْنُ نَاصِرٍ قَالَ نا نَصْرُ بْنُ أَحْمَدَ قَالَ نا أَبُو الْحَسَنِ بْنُ رِزْقَوَيْهِ قَالَ نا عُثْمَانُ بْنُ أَحْمَدَ الدَّقَّاقُ قَالَ نا مُحَمَّدُ بْنُ أَحْمَدَ بْنِ الْمُهْتَدِي قَالَ نا أَبُو عَبْدِ الرَّحْمَنِ الزَّارِعُ قَالَ نا محمد بن يزيد الو اسطي عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ زِيَادِ بْنِ أَنْعَمَ الأَفْرِيقِيِّ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ يَزِيدَ الْحُبُلِيِّ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ :لَوْ وُزِنَ مِدَادُ الْعُلَمَاءِ عَلَى دَمِ الشُّهَدَاءِ لَرَجَحَ مِدَادُ الْعُلَمَاءِ عَلَى دَمِ الشُّهَدَاءِ.


-‘‘ইবনে নাসের যথাক্রমে...হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (رضي الله عنه) থেকে তিনি বলেন, রাসুল (ﷺ) ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন আলিমের কলমের কালি ও শহিদের রক্ত ওজন করা হবে, তখন আলিমের কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়ে ভারী হয়ে যাবে। ’’  ১৯

➥{ইমাম ইবনে জাওযী,  আল-ইল­লুল মুতনাহিয়্যাহ, ১/৭১ পৃ. হা/৮৪,}



❏ ইমাম ইবনে জাওযী  বলেন, হাদিসটি لايَصِحّ-‘‘সহীহ পর্যায়ের নয়।’’  ২০

➥{ইমাম ইবনে জাওযী,  আল-ইল­লুল মুতনাহিয়্যাহ, ১/৭১ পৃ. হা/৮৪}


কোনো মুহাদ্দিসের উক্তি হাদিসটি ‘সহীহ নয়’ বলতে কী বুঝায় তা এ গ্রন্থের শুরুতে আলোকপাত করা হয়েছে, পাঠকবৃন্দের সেখানে দেখে নেয়ার অনুরোধ রইল।



নবম সূত্রঃ- 


❏ আল্লামা মুত্তাকী হিন্দী (رحمة الله) তার গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه)থেকে উপরের হাদিসের ন্যায় একটি সূত্র বর্ণনা করেছেন।  ২১

➥{ইমাম মুত্তাকী হিন্দী, কানযুল উম্মাল, ১০/১৭৩ পৃ. হা/২৮৮৯৯, তিনি ইবনে নাজ্জারের সূত্রে হাদিসটি সংকলন করেছেন। }



দশম সূত্রঃ- 


❏ ইমাম আবুল কাশেম হামজা ইবনে ইউছুফ জুরযানী (رحمة الله) ওফাত ৪২৭ হিজরী তদীয় কিতাবে আরেকটি সূত্র উল্লেখ করেছেন,


وأما حديث النعمان فنا ابْنُ نَاصِرٍ قَالَ نا مُحَمَّدُ بْنِ إِبْرَاهِيمَ قَالَ نا مُحَمَّدُ بْنُ الْفَضْلِ قَالَ أَخْبَرَنَا ابْنُ مَرْدَوَيْهِ قَالَ نا عَبْدُ اللَّهِ بن إبراهيم الجرجاني قال اناإِبْرَاهِيمُ بْنُ يَوْمَرْدَ قَالَ نا أَحْمَدُ بْنُ بَهْرَامَ قَالَ نا سَهْلُ بْنُ عَبْدِ الْكَرِيمِ عَنْ يَعْقُوبَ الْقُمِّيِّ عَنِ هَارُونَ بْنِ عَنْتَرَةَ عَنِ الشَّعْبِيِّ قَالَ خَطَبَنَا النُّعْمَانُ بْنُ بَشِيرٍ فَقَالَ: سَمِعْتُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ يُوزَنُ مِدَادُ الْعُلَمَاءِ مَعَ دَمِ الشُّهَدَاءِ يَرْجُحُ مِدَادُ الْعُلَمَاءِ عَلَى دَمِ الشُّهَدَاءِ.


-“হযরত শাবী (رضي الله عنه) বলেন, নুমান ইবনে বাশির (رضي الله عنه) আমাদের মাঝে বক্তব্য পেশ করছিলেন। তিনি বলেন, আমি রাসুলে পাক (ﷺ) কে বলতে শুনেছি যে, কেয়ামতের দিন আলিমের কলমের কালি ও শহিদের রক্ত ওজন করা হবে, তখন আলিমের কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়ে ভারী হয়ে যাবে।”


(তারিখে জুরযান, রাবী নং ৫২; ইবনে জাওযী, ইলালুল মুতানাহিয়া ফি আহাদিসিল ওয়াহিয়া, হাদিস নং ৮৫)


এই হাদিস সম্পর্কে নাসিরুদ্দিন আলবানী বলেন: قلت: وهذا إسناد ضعيف -“আমি (আলবানী) বলি: এই সনদ যঈফ।”


(আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদিসিদ দ্বঈফাহ, হাদিস নং ৪৮৩২ এর ব্যাখ্যায়)


তিনি আরো বলেন: وبالجملة فالحديث ضعيف من جميع طرقه. -“সমষ্ঠিগতভাবে এই হাদিসের সকল সূত্রই যঈফ।”


(আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদিসিদ দ্বঈফাহ, হাদিস নং ৪৮৩২ এর ব্যাখ্যায়)



একাদশ সূত্রঃ- 


❏ এ বিষয়ে আরেকটি রেওয়াত উল্লেখ করা যায়,


أَبُو هُرَيْرَة يُحَاسب النَّاس بأعمالهم وَالْعُلَمَاء على حسب عَمَلهم فيوزن عمل أحدهم مَعَ عمله وَإِن مداد الْعلمَاء فِي الْمِيزَان أثقل من دم الشُّهَدَاء وَأكْثر ثَوابًا يَوْم الْقِيَامَة


-“হযরত আবু হুরায়রা (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত, লোকেদের আমল হিসাব হবে এবং আলিমগণের আমলও হিসাব হবে। একজন আলিমের আমল অন্যদের আমলের সাথে ওজন করা হবে। আর নিশ্চয় আলিমের কলমের কালী মিযানের পাল্লায় শহিদের রক্তের চেয়েও প্রাধান্য পাবে এবং অধিক সওয়াবের কারণ হবে।”


(মুসনাদিল ফিরদাউস, হাদিস নং ৪৮৮)



দ্বাদশ সূত্রঃ- 


❏ এ বিষয়ে আল্লামা আজলূনী (رحمة الله) তাঁর গ্রন্থে হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (رضي الله عنه) থেকে একটি সূত্র বর্ণনা করেছেন।  ২২

➥{আজলূনী, কাশফুল খাফা, ২/৪০০ পৃ. হা/৩২৮১, সালিম র্জারার, ইমা ইলা যাওয়াইদ, ৫/৩৪৩ পৃ. হা/৪৮০০, সুয়ূতি, জামেউল আহাদিস, ২৪/২৭৫ পৃ., জুরজানী, তারীখে জুরজানী,  ১/১৮১ পৃ.}



এ হাদিসের বিষয়ে মুহাদ্দিসগণের বক্তব্য:


❏ এই হাদিস সম্পর্কে ইমাম আজলুনী (رحمة الله) বলেন,


يوزن يوم القيامة مداد العلماء ودم الشهداء؛ فيرجح مداد العلماء على دم الشهداء. رواه الشيرازي عن أنس، ورواه الموهبي عن عمران بن الحصين، وأخرجه ابن عبد البر عن أبي الدرداء، وابن الجوزي في "العلل" عن النعمان بن بشير، قال المناوي: وأسانيده ضعيفة؛ لكن يقوي بعضها بعضًا؛


-“কেয়ামতের দিন আলিমের কলমের কালি ও শহিদের রক্ত ওজন করা হবে, তখন আলিমের কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়ে ভারী হয়ে যাবে। ইমাম সিরাজী (রঃ) হযরত আনাস (رضي الله عنه) হতে বর্ণনা করেছেন। মাওহাবী (رحمة الله) হযরত ইমরান ইবনে হুছাইন (رضي الله عنه) থেকেও বর্ণনা করেছেন। ইবনে আব্দিল বার (রঃ) হযরত আবু দারদা (رضي الله عنه) থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে জাওযী (রঃ) হযরত নুমান ইবনে বাশির (رضي الله عنه) থেকে ‘ইলাল’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। ইমাম মানাভী (رحمة الله) বলেছেন: এর প্রত্যেকটি সনদই যঈফ, কিন্তু একে অপরকে শক্তিশালী করেছেন।”


(ইমাম আজলুনী: কাশফুল খাফা, হাদিস নং ৩২৮১)


❏ এই হাদিস সম্পর্কে আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (رحمة الله) বলেছেন,


رَوَاهُ الشِّيرَازِيُّ عَنْ أَنَسٍ، وَابْنُ عَبْدِ الْبَرِّ، عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ، وَابْنُ الْجَوْزِيِّ فِي الْعِلَلِ، عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ مَرْفُوعًا: يُوزَنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِدَادُ الْعُلَمَاءِ وَدَمُ الشُّهَدَاءِ، فَيَرْجَحُ مِدَادُ الْعُلَمَاءِ عَلَى دَمِ الشُّهَدَاءِ


-“সিরাজী হযরত আনাস (رضي الله عنه) হতে, ইবনে আব্দিল বার হযরত আবু দারদা (رضي الله عنه) হতে, ইমাম ইবনে জাওযী তার ইলাল গ্রন্থে হযরত নুমান ইবনে বাশির (رضي الله عنه) হতে মারফূরূপে বর্ণনা করেন, কেয়ামতের দিন আলিমের কলমের কালি ও শহিদের রক্ত ওজন করা হবে, তখন আলিমের কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়ে ভারী হয়ে যাবে।”


(ইমাম মোল্লা আলী: মেরকাত শরহে মেসকাত, ৫৬১১ নং হাদিসের ব্যাখ্যায়)


❏ আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (رحمة الله) আরো বলেছেন,


قُلْتُ وَمَعْنَاهُ صَحِيحٌ لِأَنَّ نَفْعَ دَمِ الشَّهِيدِ قَاصِرٌ وَنَفْعَ قَلَمِ الْعَالِمِ مُتَعَدٍّ حَاضِرٌ -


“আমি বলি: এর মাআনা বা অর্থ সহীহ্। কেননা শহিদের রক্ত উপকারী আর আলিমের কলমের কালী সর্বদা উপকারী।”


(ইমাম মোল্লা আলী ক্বারী: আসরারুল মারফু‘আ, হাদিস নং ৪২৯)


উপরের আলোচনা থেকে প্রমাণিত যে, ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর তার গ্রন্থে মিথ্যাচার করেছেন। একে তাবেয়ী হযরত হাসান বসরী (رحمة الله)-এর কওল বলে তিনি চালিয়ে দিতে চেয়েছিল। অথচ এটির অনেক মারফু সূত্র রয়েছে। সুতরাং এই হাদিসকে মওজু বা ভিত্তিহীন অথবা জাল বলার কোন রাস্তা’ই নেই।


তাই এ হাদিস সম্পর্কে সর্বশেষ বলতে চাই যে হাদিসটি নিঃসন্দেহে মুতাওয়াতিরের নিকটবর্তী, আর এ ধরনের হাদিসকে অস্বীকার করা গোমরাহ ছাড়া কিছুই নয়।