অল্পে তুষ্টির ফযিলত | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি অল্প রিযিকে (জীবিকায়) সন্তুষ্ট হবে আল্লাহ্ তাআ'লা তার অল্প আমলে সন্তুষ্ট হবেন। আর আল্লাহ'র পক্ষ থেকে প্রশস্ততার (স্বচ্ছলতার) অপেক্ষা করা হচ্ছে ইবাদত। [শুআবুল ঈমান ৯৫৩১]

কেন অল্পে তুষ্ট থাকাটা এতই ফযিলত-মন্ডিত!! কারণ এই গুণটা অর্জন করা এতটা সহজ বিষয় না, মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ, সে যত পায় তত চায়।

ইবনে আব্বাস (রঃ) বলেন, আমি নবী ﷺ কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেনঃ বনী আদমের জন্য যদি এক উপত্যকা পরিমাণ ধনসম্পদ থাকে তাহলে সে আরও ধন অর্জনের জন্য লালায়িত থাকবে। বনী আদমের (লোভী) চোখ মাটি (মৃত্যু) ছাড়া আর কিছুই তৃপ্ত করতে পারবে না। তবে যে তওবা করবে আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন। [সহীহ বুখারী ৬৪৩৭]

পরবর্তী হাদিসে রয়েছে,

প্রিয় নবী ﷺ প্রায়ই বলতেন যে, যদি আদম সন্তানকে স্বর্ণে পরিপূর্ণ একটা উপত্যকা দেয়া হয়, তথাপিও সে এই রকম দ্বিতীয়টার জন্য আকাঙ্ক্ষিত হয়ে থাকবে। আর তাকে এরকম দ্বিতীয়টা যদি দেয়া হয়, তাহলে সে তৃতীয় আরও একটার জন্য আকাঙ্ক্ষা করতে থাকবে। মানুষের পেট মাটি ছাড়া কিছুই ভরাতে পারে না। তবে যে ব্যাক্তি তাওবা করে, আল্লাহ তাআ'লা তার তাওবা কবুল করেন।

একই প্রসঙ্গের পরের হাদিসে রয়েছে, তার মুখ একমাত্র মাটি ছাড়া অন্য কিছুই ভরাতে পারবে না। 
অত্র তিনটি হাদিসে চোখ, মুখ ও পেটের কথা বলা হয়েছে; আর এ তিনটি হচ্ছে পৃথিবী ভোগ করতে গিয়ে ধোঁকায় পড়ার মাধ্যম। কাজেই আদম সন্তানকে এ তিনটি অঙ্গের ব্যাপারে খুব সর্তক থাকতে হবে। বুখারীর উক্ত হাদিসসমূহের পরিচ্ছেদের নাম হচ্ছে "ধন-সম্পদের পরীক্ষা থেকে বেঁচে থাকা সম্পর্কে"। 

রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালবাসেন তখন তাকে দুনিয়া হতে এমনভাবে বাঁচিয়ে রাখেন যেমনিভাবে তোমাদের কেউ আপন (বিশেষ) রোগীকে পানি হতে বাঁচিয়ে রাখে (দুনিয়ার রং-তামাশা থেকে তাকে রক্ষা করেন যাতে দুনিয়াপ্রেম রোগে তার হৃদয় আক্রান্ত না হয়)। [সূনান আত তিরমিযী ২০৩৬]

🍂 হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে জিজ্ঞেস করলেন, #ধৈর্য কি? ইমাম হাসান রঃ বললেন, ক্রোধ সংবরণ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ। জিজ্ঞেস করলেন, #অভাব_মুক্তি কী? ইমাম হাসান রঃ বললেন, আল্লাহ্ যা বন্টন করে দিয়েছেন, তাতে পরিতৃপ্ত থাকা সেটি কম হলেও। কারণ (প্রকৃত) অভাব মুক্তি হল মনের অভাব মুক্তি। 

[হযরত আবূ হুরাইরা রঃ বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ ধন-সম্পদের প্রাচুর্য থাকলেই ঐশ্বর্যশালী হওয়া যায় না। মনের ঐশ্বর্যই প্রকৃত ঐশ্বর্য। (সহীহ বুখারী ৬৪৪৬)]


🍂 হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে জিজ্ঞেস করলেন, #সাফল্য কিসে? ইমাম হাসান রঃ বললেন, তাকওয়া-আল্লাহ্ভীতির প্রতি আকর্ষণ এবং দুনিয়ার প্রতি বিমুখ হওয়া।

[হযরত আলী রঃ বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ সে-ই সফলকাম হলো, যেই ইসলাম কবুল করেছে এবং তার নিকট প্রয়োজন পরিমাণ রিযিক রয়েছে এবং তাকে আল্লাহ তাআ'লা অল্পে তুষ্ট থাকার তাওফীক দিয়েছেন। (সূনান আত তিরমিজী ২৩৪৮, সূনান ইবনে মাজাহ ৪১৩৮)

রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ হে আবূ হুরায়রা! তুমি আল্লাহভীরু হয়ে যাও, তাহলে লোকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইবাদতকারী হতে পারবে। তুমি অল্পে তুষ্ট থাকো, তাহলে লোকদের মধ্যে সর্বোত্তম কৃতজ্ঞ হতে পারবে। তুমি নিজের জন্য যা পছন্দ করো, অন্যদের জন্যও তাই পছন্দ করবে, তাহলে পূর্ণ মুমিন হতে পারবে। তোমার প্রতিবেশীর প্রতি সদাচারী ও দয়াপরবশ হও, তাহলে মুসলমান হতে পারবে। কম হাসবে কেননা অধিক হাসি অন্তরাত্মাকে ধ্বংস করে। (সূনান ইবনে মাজাহ ৪২১৭) 

ইমাম তিরমিজী রহঃ উল্লেখ করেন, আবূ হুরাইরা (রঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ এমন কে আছে যে আমার নিকট হতে এ কথাগুলো গ্রহণ করবে এবং সে মুতাবিক নিজেও আমল করবে অথবা এমন কাউকে শিক্ষা দিবে যে অনুরূপ আমল করবে? আবূ হুরাইরা (রঃ) বলেন, আমি বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ﷺ! আমি আছি। অতঃপর তিনি আমার হাত ধরলেন এবং গুনে গুনে এ পাঁচটি কথা বললেনঃ 

১. তুমি হারামসমূহ হতে বিরত থাকলে লোকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় আবিদ বলে গণ্য হবে; 

২. তোমার ভাগ্যে আল্লাহ তাআ'লা যা নির্ধারিত করে রেখেছেন তাতে খুশি থাকলে লোকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা স্বনির্ভর (অমুখাপেক্ষী) বলে গণ্য হবে; 

৩. প্রতিবেশীর সাথে ভদ্র আচরণ করলে প্রকৃত মুমিন হতে পারবে; 

৪. যা নিজের জন্য পছন্দ কর তা-ই অন্যের জন্যও পছন্দ করতে পারলে প্রকৃত মুসলমান হতে পারবে এবং 

৫. অধিক হাসা থেকে বিরত থাক কেননা অতিরিক্ত হাস্য-কৌতুক হৃদয়কে মৃতবৎ করে দেয়। (সূনান আত তিরমিজী ২৩০৫)]

🍂 হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে জিজ্ঞেস করলেন, দারিদ্র্যতা ও অভাব কী? ইমাম হাসান রঃ বললেন, সকল ক্ষেত্রে লোভী হওয়া। জিজ্ঞেস করলেন, দানশীলতা কী? ইমাম হাসান (রঃ) বললেন, সচ্ছলতা ও অভাব সর্বাবস্থায় দান করা।

[হযরত আবূ হুরাইরা (রঃ) বলেন, এক ব্যক্তি নবী ﷺ কে জিজ্ঞেস করল, ইয়া রসূলাল্লাহ ﷺ! উত্তম সাদকা কোনটি? তিনি বলেন, সুস্থ এবং সম্পদের প্রতি অনুরাগ থাকা অবস্থায় দান খয়রাত করা- যখন তোমার ধনী হবার আকাঙ্ক্ষা থাকে এবং (যখন) তুমি দারিদ্রের আশংকা কর, আর তুমি এভাবে অপেক্ষায় থাকবে না যে- যখন তোমার প্রাণ কন্ঠাগত হবে তখন তুমি বলবেঃ অমুকের জন্য এতটুকু, অমুকের জন্য এতটুকু অথচ তা অমুকের জন্য হয়েই গেছে। (সহীহ বুখারী ১৪১৯, ২৭৪৮)

আল্লাহ সুবহা'নাহু ওয়াতাআ'লা বলেন, 'আমি তোমাদেরকে যে রুযী দিয়েছি, তোমরা তা হতে ব্যয় কর, তোমাদের কারো মৃত্যু আসার পূর্বে। (অন্যথা মৃত্যু আসলে সে বলবে) ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আরো কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে না কেন?তাহলে আমি সাদকা করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’ (সূরা মুনাফিকূনঃ ১০)]

🍂 হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে জিজ্ঞেস করলেন, কার্পণ্য কী? ইমাম হাসান রঃ বললেন, হাতে নগদ যা আছে তাকে অল্প মনে করা আর যা ব্যয় করা হয়েছে সেটাকে নষ্ট হয়েছে মনে করা। 

[(একদিন) প্রিয় নবী ﷺ সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি, নিজের সম্পদ হতে তার উত্তরাধিকারীর সম্পদকে অধিক প্রিয় মনে করে? তাঁরা সবাই জবাব দিলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ﷺ! আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে তার নিজের সম্পদকে সবচেয়ে অধিক প্রিয় মনে করে না। তখন তিনি ﷺ বললেনঃ নিশ্চয়ই মানুষের নিজের সম্পদ তা-ই, যা সে (সৎ কাজে ব্যয়ের মাধ্যমে) আগে পাঠিয়েছে। আর সে পিছনে যা রেখে যাবে তা তার ওয়ারিসের সম্পদ। (সহীহ বুখারী ৬৪৪২)]

হযরত আলী ও ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা এঁর মধ্যেকার কথোপকথন-গুলো আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খন্ড, ৮৫ পৃষ্ঠা (ইফাঃ) থেকে নেয়া।

ইলম ও হিকমতের ভান্ডার, জান্নাতী যুব-সর্দার হযরত হাসান ইবনে আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা কে বলা হয়েছিল, আবূ যিরা তো বলে থাকেন- ধন-সম্পদ অপেক্ষা দারিদ্র্যতা আমার নিকট অধিকতর প্রিয় এবং সুস্থতা অপেক্ষা রুগ্নতা আমার অধিক প্রিয়। তখন ইমাম হাসান রঃ বলেছিলেন, আল্লাহ্ তাআ'লা আবূ যিরাকে দয়া করুন। বরং আমি বলি আল্লাহ্ তাআ'লা যার জন্য যা কল্যাণকর হিসেবে মঞ্জুর করেন তার উপর যে নির্ভর করে সে কখনও আল্লাহ'র মঞ্জুর করা বিষয়ের বিপরীতটি কামনা করবে না। এই পর্যায়টি হল আল্লাহ'র (সকল) ফায়সালায় রাযী থাকার পর্যায়। [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খন্ড, ৮৪ পৃষ্ঠা]