হায়াতুন্নবী এবং হাজির নাজির আকীদা নিয়ে কিছু কথা | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

ফেরেশতাগণ কেন আল্লাহ'র কাছে এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর দরবারে মানুষের আমল, মানুষের পঠিত দরুদ ও সালাম পেশ করে?? এবং হাজির নাজির আকীদা নিয়ে কিছু কথা....
----
যারা হায়াতুল আম্বিয়া তথা মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করার পরেও আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতায় নবীগণের স্ব স্ব মাজার শরীফে জীবিত থাকাকে অস্বীকার করে (সালাফী) কিংবা হায়াতুল আম্বিয়াকে স্বীকার করে এমন অনেকেও (দেওবন্দী) ফেরেশতাগণ কর্তৃক রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর দরবারে উম্মতের পঠিত দরুদ ও সালাম পেশ করার হাদিসকে অপব্যাখ্যা করে বলতে চায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে শুনেন না কিংবা দেখেন না তাই উনার কাছে দরুদ শরীফ পৌঁছানো হয় (নাউজুবিল্লাহ)।

প্রথমত বলতে চাই, ঐ হাদিসকে স্বীকার করে নিলে হায়াতুল আম্বিয়াকে অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই কেননা সেখানে এটাও বলা হয়েছে নবীগণ কবরে জীবিত। আসুন হাদিসে মুবারকাটা দেখে নিই-

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ তোমরা জুমু‘আর দিন (বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে শুক্রবার মাগরিবের ওয়াক্ত পর্যন্ত) আমার ওপর বেশি পরিমাণ করে দরূদ পড়ো। কেননা তা আমার নিকট পৌঁছানো হয়, ফেরেশতাগণ তা পৌঁছে দেন। যে ব্যক্তি আমার ওপর দরূদ পাঠ করে, তার দরূদ আমার কাছে পেশ করা হতে থাকে, যে পর্যন্ত সে এর থেকে অবসর না হয়। জিজ্ঞেস করা হল, (আপনার) ওফাতের পরও কি? তিনি ﷺ বললেনঃ আল্লাহ তা‘আলা নবীদের শরীর ভক্ষণ করা মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন। নবীরা কবরে জীবিত এবং তাদেরকে রিযিক দেয়া হয়। (মিশকাত ১৩৬৬, সূনান ইবনে মাজাহ্ ১৬৩৭)

এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। উক্ত হাদিসে মুবারকা দ্বারা যদি এটা দাবী করা হয় যে, ফেরেশতাগণ কর্তৃক রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর দরবারে উম্মতের পঠিত দরুদ শরীফ পেশ করার কারণ এটাই যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে শুনেন না কিংবা দেখেন না তাহলে ধরে নিতে হবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা তাঁর বান্দার সোমবার ও বৃহস্পতিবারের আমলসমূহ দেখেন না তাই সোমবার ও বৃহস্পতিবারের আমলসমূহ তাঁর কাছে পেশ করা হয় (নাউজুবিল্লাহ)।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, মানুষের আমল সোমবার ও বৃহস্পতিবার (আল্লাহর দরবারে) উপস্থাপন করা হয়। এরপর প্রত্যেক মুমিন বান্দাকে ক্ষমা করা হয় (অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তখন আল্লাহ তা’আলা সেদিন প্রত্যেক এমন বান্দাকে ক্ষমা করেন, যারা তার সাথে কোন কিছুকে অংশীদার স্থির করে না)। তবে সে ব্যক্তিকে নয়, যার ভাই এর সাথে তার দুশমনি রয়েছে। তখন বলা হবে, এ দু’জনকে বর্জন করো অথবা অবকাশ দাও যতক্ষণ না তারা মীমাংসার প্রতি প্রত্যাবর্তন করে। (সহীহ মুসলিম ৬৪৪১, ৬৪৪০)

সুতরাং ফেরেশতাগণ কর্তৃক পেশ করার অর্থই এটা নয় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ শুনেন না কিংবা দেখেন না তাই পেশ করা হয়। বরং আমার দাবী হল ঐ দিনগুলোর বিশেষ মর্যাদা এবং সালাত (দরুদ) ও সালামের বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করা এবং এই আমলকারীগণকে বিশেষভাবে সম্মানিত করায় এর উদ্দেশ্য। বিষয়টা আরো হৃদয়ঙ্গম হবে ইমাম বায়হাক্বী রহঃ এঁর লিখিত "হায়াতুল আম্বিয়া-ই ফী ক্বুবুরিহিম (নবীগণ আলায়হিমুস সালাম কবরসমূহে জীবিত)" কিতাবের একখানা হাদিসের দিকে নজর দিলে। সেখানে রয়েছে,

হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বলেন, নবী করীম ﷺ এরশাদ করেন, কিয়ামতের দিনে তােমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আমার সর্বাধিক নিকটতম স্থানে থাকবে, যে ব্যক্তি দুনিয়াতে আমার প্রতি সর্বাধিক দরুদ (সালাত ও সালাম) প্রেরণকারী ছিল। আর যে ব্যক্তি আমার প্রতি প্রত্যেক জুমার দিনে ও জুমার রাতে একশত বার দুরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তা'আলা ঐ ব্যক্তির একশ'টি চাহিদা পূরণ করবেন সত্তরটি আখিরাতের প্রয়ােজন ও চাহিদা এবং ত্রিশটি দুনিয়ার চাহিদা ও প্রয়ােজন। অতঃপর আল্লাহ ঐ দরুদ সংরক্ষণ ও পৌঁছানাের জন্য এক ফেরেশতা নিয়ােজিত করবেন, যিনি তা আমার কবর শরীফে ঐভাবে প্রবেশ করাবে, যেভাবে তােমাদের কারও নিকট হাদিয়া উপঢৌকনসমূহ প্রবেশ করানাে হয়। আর ঐ ফেরেশতা আমাকে সংবাদ দেবেন যে ব্যক্তি আমার প্রতি দরুদ প্রেরণ করেছে তার নাম, তার পিতা, বংশ, গােত্র, অঞ্চলসহ সমুদয় বিষয়ে। অতঃপর তা আমি আমার নিকট রক্ষিত শ্বেত বালামে লিপিবদ্ধ করে রাখি (সুবহানাল্লাহ)।

ফেরেশতাগণ বলে দেয়া মানেই, রাসূলুল্লাহ ﷺ ঐ বিষয়ে অবহিত নন- বিষয়টা যে এমন নয় তা বুঝতে আরো একটি হাদিসে মুবারকা লক্ষ্য করুন-

আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, আল্লাহর একদল ফেরেশতা আছেন, যাঁরা আল্লাহর যিকরে রত লোকেদের খোঁজে পথে পথে ঘুরে বেড়ান। যখন তাঁরা কোথাও আল্লাহর যিকরে রত লোকদের দেখতে পান, তখন ফেরেশতারা পরস্পরকে ডাক দিয়ে বলেন, তোমরা আপন আপন কাজ করার জন্য এগিয়ে এসো। তখন তাঁরা তাঁদের ডানাগুলো দিয়ে সেই লোকদের ঢেকে ফেলেন নিকটবর্তী আসমান পর্যন্ত। তখন তাদের প্রতিপালক তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন আমার বান্দারা কী বলছে? (তাহলে আমরা এটা বুঝব যে, আল্লাহ তায়ালা জানেন না তাই জিজ্ঞেস করছেন..(নাউজুবিল্লাহ) বরং এর দ্বারাও সমবেত হয়ে যিকিরকারীদেরকে সম্মানিত করা হয়েছে)

তখন তাঁরা বলে, তারা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছে, তারা আপনার শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দিচ্ছে, তারা আপনার গুণগান করছে এবং তারা আপনার মাহাত্ম্য প্রকাশ করছে। তখন তিনি জিজ্ঞেস করবেন, তারা কি আমাকে দেখেছে? তখন তাঁরা বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক, আপনার শপথ! তারা আপনাকে দেখেনি। তিনি বলবেন, আচ্ছা, তবে যদি তারা আমাকে দেখত? তাঁরা বলবেন, যদি তারা আপনাকে দেখত, তবে তারা আরও অধিক পরিমাণে আপনার ‘ইবাদাত করত, আরো অধিক আপনার মাহাত্ম্য ঘোষণা করত, আরো অধিক পরিমাণে আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করত।

বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহ বলবেন, তারা আমার কাছে কী চায়? তাঁরা বলবে, তারা আপনার কাছে জান্নাত চায়। তিনি জিজ্ঞেস করবেন, তারা কি জান্নাত দেখেছে? ফেরেশতারা বলবেন, না। আপনার সত্তার কসম! হে রব! তারা তা দেখেনি। তিনি জিজ্ঞেস করবেন, যদি তারা দেখত তবে তারা কী করত? তাঁরা বলবে, যদি তারা তা দেখত তাহলে তারা জান্নাতের আরো অধিক লোভ করত, আরো বেশি চাইত এবং এর জন্য আরো বেশি বেশি আকৃষ্ট হত।। আল্লাহ্ তা‘আলা জিজ্ঞেস করবেন, তারা কী থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায়? ফেরেশতাগণ বলবেন, জাহান্নাম থেকে। তিনি জিজ্ঞেস করবেন, তারা কি জাহান্নাম দেখেছে? তাঁরা জবাব দেবে, আল্লাহর কসম! হে প্রতিপালক! তারা জাহান্নাম দেখেনি।

তিনি জিজ্ঞেস করবেন, যদি তারা তা দেখত তখন তাদের কী হত? তাঁরা বলবে, যদি তারা তা দেখত, তাহলে তারা তাত্থেকে দ্রুত পালিয়ে যেত এবং একে অত্যন্ত বেশি ভয় করত। তখন আল্লাহ্ তা‘আলা বলবেন, আমি তোমাদের সাক্ষী রাখছি, আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। তখন ফেরেশতাদের একজন বলবে, তাদের মধ্যে অমুক ব্যক্তি আছে, যে তাদের অন্তর্ভুক্ত নয় বরং সে কোন প্রয়োজনে এসেছে। আল্লাহ্ তা‘আলা বলবেন, তাদের সাথে বসা কোন ব্যক্তিই তা থেকে বঞ্চিত হবে না (তারা তো এমন একটি কওম যাদের সঙ্গীরা দুর্ভাগা হয় না)। (সহীহ বুখারী ৬৪০৮)

এটাও বলতে পারি যে, মৃত্যু দান, বৃষ্টি বর্ষণ ইত্যাদি কাজের জন্য ফেরেশতাদেরকে হুকুম করা ছাড়া তিনি নিজে করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও যেভাবে ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন তেমনিভাবে নবীজির দরবারে ফেরেশতাগণের মাধ্যমে সালাত ও সালাম কিংবা অন্যান্য আমল পেশ করা এটাও আল্লাহর ইচ্ছা কিংবা কানুন (নিয়ম)।

সুতরাং ফেরেশতাগণ কর্তৃক রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর দরবারে উম্মতের পঠিত দরুদ শরীফ পেশ করার অর্থ কখনোই এটা নয় যে, তিনি এ বিষয়ে অবহিত নন তাই পেশ করা হয়। আরে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তো আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতায় নিজেই উম্মতের আমলসমূহ দেখতে পান। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা বলেন, "বলুন, তোমরা কাজ (আমল) করতে থাক। তোমাদের কার্যকলাপ তো আল্লাহ দেখবেন এবং তাঁর রসূল ও বিশ্বাসীগণও দেখবে। আর অচিরেই তোমাদেরকে অদৃশ্য ও প্রকাশ্য বিষয়ের জ্ঞাতা (আল্লাহর) দিকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তোমাদের সকল কৃতকর্ম জানিয়ে দেবেন।" (সূরা তাওবাহঃ ১০৫)

এছাড়াও মহান আল্লাহ সুবহানাহু তো জানেন কে কি আমল করবে, কে জাহান্নামী আর কে জান্নাতী। আর তিনি প্রিয় হাবিবকে এসবও জানিয়ে দিয়েছেন।

প্রিয় নবী ﷺ বলেন, আমার উম্মতের সমস্ত আমল আমার সামনে পেশ করা হয়েছিল। আমি দেখলাম তাদের সমস্ত উত্তম কাজের মধ্যে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূরীকরণও একটি উত্তম কাজ। আর আমি এও দেখলাম যে, তাদের খারাপ আমলের মধ্যে রয়েছে মসজিদের মধ্যে কফ বা থুথু ফেলা এরং তা মিটিয়ে না ফেলা। [সহীহ মুসলিম ১১২০, মুসনাদে আহমাদ ২১৫৪৯, সহীহ ইবনু হিব্বান ১৬৪১, মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৭০৯]

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ আল্লাহ তা’আলা গোটা পৃথিবীকে ভাজ করে আমার সামনে রেখে দিলেন। অতঃপর আমি এর পূর্বপ্রান্ত থেকে পশ্চিমপ্রান্ত পর্যন্ত দেখে নিয়েছি। পৃথিবীর যে পরিমাণ অংশ গুটিয়ে আমার সম্মুখে রাখা হয়েছিল সে পর্যন্ত আমার উম্মতের রাজত্ব পৌছবে। আমাকে লাল ও সাদা দুই প্রকারের ধনাগার দেয়া হয়েছে। (সহীহ মুসলিম ৭১৫০)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ আমার সামনে সকল উম্মতকে পেশ করা হয়েছিল। (সহীহ বুখারী ৫৭০৫)

আম্মাজান আয়িশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ এমন কোন জিনিস নেই যা আমাকে দেখানো হয়নি। (সহীহ বুখারী ৯২২)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ ‘আল্লাহ তা’আলা আমার সামনে সারা দুনিয়াকে তুলে ধরেছেন। তখন আমি এ দুনিয়াকে এবং এতে কিয়ামত পর্যন্ত যা’ কিছু হবে এমনভাবে দেখতে পেয়েছি, যেভাবে আমি আমার নিজ হাতকে দেখতে পাচ্ছি। (এই হাদিসটা অনেক ইমাম বর্ণনা করেছেন যেমনঃ ইমাম তাবরানীঃ মু’জামুল কবীরঃ ১/৩৮২; মুত্তাকী হিন্দিীঃ কানযুল উম্মালঃ ১১/৪২০ হাদিসঃ ৩১৯৭১; ইমাম কুস্তালানীঃ মাওয়াহেবে লাদুন্নীয়াঃ ৩/৯৫ পৃ.; আল্লামা ইবনে হাজার হায়সামীঃ মাযমাউদ যাওয়াহিদঃ ৮/২৮৭ পৃ.; আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সূয়তীঃ জামিউল কবীরঃ হাদীসঃ ৪৮৪৯..)

আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ তোমরা কি মনে কর যে, আমার দৃষ্টি (কেবল) ক্বিবলার দিকে? আল্লাহর কসম! আমার নিকট তোমাদের খুশু’ (বিনয়, একাগ্রতা) ও রুকূ’ কিছুই গোপন থাকে না। অবশ্যই আমি আমার পেছন হতেও তোমাদের দেখতে পাই। (সহীহ বুখারী ৪১৮)

আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) বলেন, একদা রসূলুল্লাহ ﷺ দুই হাতে দু’টি কিতাব নিয়ে বের হলেন এবং (সাহাবীগণের উদ্দেশে) বললেন, তোমরা কি জান এ কিতাব দু’টি কি? আমরা বললাম, না, ইয়া রসূলাল্লাহ ﷺ! কিন্তু আপনি যদি আমাদের অবহিত করতেন। তিনি তাঁর ডান হাতের কিতাবের প্রতি ইশারা করে বললেন, আমার ডান হাতে কিতাবটি হচ্ছে আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীনের পক্ষ থেকে একটি কিতাব। এতে সকল জান্নাতীদের নাম, তাদের বাপ-দাদার নাম ও তাদের গোত্রের নাম লিখা রয়েছে এবং এদের সর্বশেষ ব্যক্তির নামের পর সর্বমোট যোগ করা হয়েছে। অতঃপর এতে আর কখনো (কোন নাম) বৃদ্ধিও হবে না কমতিও করা হবে না। তারপর তিনি তাঁর বাম হাতের কিতাবের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, এটাও আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীনের পক্ষ হতে একটি কিতাব। এ কিতাবে জাহান্নামীদের নাম আছে, তাদের বাপ-দাদার নাম ও তাদের গোত্রের নামও রয়েছে। অতঃপর তাদের সর্বশেষ ব্যক্তির নাম লিখে মোট যোগ করা হয়েছে। তাই এতে (আর কোন নাম কখনো) বৃদ্ধিও করা যাবে না কমানোও যাবে না।

তাঁর এ বর্ণনা শুনার পর সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ﷺ! এসব ব্যাপার যদি আগে থেকে চূড়ান্ত হয়েই থাকে (অর্থাৎ- জান্নাত ও জাহান্নামের বিষয়টি তাক্বদীরের উপর নির্ভর করে লিপিবদ্ধ হয়েছে) তবে ‘আমল করার প্রয়োজন কী? উত্তরে তিনি বললেন, হক পথে থেকে দৃঢ়ভাবে ‘আমল করতে থাক এবং আল্লাহর নৈকট্যার্জনের চেষ্টা কর। কেননা জান্নাতবাসীদের শেষ ‘আমল (জান্নাত প্রাপ্তির ন্যায়) জান্নাতীদেরই কাজ হবে। (পূর্বে) দুনিয়ার জীবনে সে যা-ই করুক। আর জাহান্নামবাসীদের পরিসমাপ্তি জাহান্নামে যাবার ন্যায় ‘আমলের দ্বারা শেষ হবে। তার (জীবনের) ‘আমাল যা-ই হোক। অতঃপর রসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর দুই হাতে ইশারা করে কিতাব দু’টিকে পেছনের দিকে ফেলে দিয়ে বললেন, তোমাদের রব বান্দাদের ব্যাপারে পূর্ব থেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে রেখেছেন। একদল জান্নাতে যাবে আর অপর একদল জাহান্নামে যাবে। (সূরা আশ্ শূরা ৪২: ৭)। (মিশকাতুল মাসাবীহ ৯৬, সূনান আত তিরমিযী ২০৬৭)

হযরত সালমা রা. বলেন- ‘‘আমি (উম্মাহাতুল মু‘মিনীন) উম্মে সালামাহ রা. এঁর নিকট গিয়েছিলাম এবং দেখলাম যে তিনি কাঁদছেন। আমি বললাম, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, একটু আগে আমি রাসূল ﷺ কে স্বপ্নে দেখলাম যে তাঁর মাথা মুবারকে এবং দাঁড়ি মুবারকে ধুলা বালি লেগে আছে। অতঃপর আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ ﷺ! আপনার এ অবস্থা কেন? তিনি বললেন, এই মাত্র আমি হুসাইনকে কতল করার স্থানে উপস্থিত ছিলাম।’’ [সূনান আত তিরমিজি ৩৭৭১, মুস্তাদরেক হাকিম, ৪/২০ পৃ. হা/ ৬৭৭৪, মিশকাত, ৩/১৭৭৩ পৃ. হা/৬১৬৬, এ হাদিসের (شَهِدْتُ) এর ব্যাখ্যায় আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী রহঃ লিখেন- أَيْ: حَضَرْتُ -‘‘অর্থাৎ আমি উপস্থিত ছিলাম।’' (মেরকাত, ৯/৩৯৮০ পৃ.)]

এখানে উল্লেখ্য যে, কারবালায় ইমাম হুসাইন রাঃ এঁর শাহাদাতের স্থানে রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর উপস্থিতি ওফাতের পরও নবী ﷺ কর্তৃক আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতায় উম্মতের কার্যাদি সম্পর্কে অবহিত হওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে উপস্থিত হওয়ার ক্ষমতাকেও প্রমাণ করে। কেননা এটা স্বপ্ন হলেও সত্যি কারণ শয়তান রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর আকৃতি ধারণ করতে পারেনা এবং উম্মাহাতুল মু'মিনীনদের কেউ জাহান্নামী হতে পারেনা অর্থাৎ নবীজির নামে মিথ্যা বলতে পারেনা।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ যে আমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখল সে আমাকেই দেখল। কারণ শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না। আর মু’মিনের স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।
(সহীহ বুখারী ৬৯৯৪)

আবূ হুরাইরাহ (রা.) বলেন, নবী ﷺ বলেনঃ ‘আমার নামে তোমরা নাম রেখ; কিন্তু আমার উপনামে (কুনিয়াতে) তোমরা নাম রেখ না। আর যে আমাকে স্বপ্নে দেখে সে ঠিক আমাকেই দেখে। কারণ শয়তান আমার আকৃতির ন্যায় আকৃতি ধারণ করতে পারে না। যে ইচ্ছা করে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার আসন বানিয়ে নেয়।’
(সহীহ বুখারী ১১০)

বিখ্যাত ফকিহ ও হাদিস বিশারদ আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী রহঃ উল্লেখ করেন,

আউলিয়াদের ইহকালীন জীবনের অবস্থা এবং পরকালীন জীবনের অবস্থার মাঝে কোন পার্থক্য নাই, এজন্য বলা হয় আল্লাহর ওলীগণ (প্রিয় বান্দাগণ, সাধারণদের মত) মৃত্যুবরণ করেন না বরং (মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে, দুনিয়া হতে পর্দা করে) তারা এক ঘর থেকে আরেক ঘরে বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবর্তন হন মাত্র। তিনি আরো উল্লেখ করেন, ইমাম বায়হাকী রহঃ বলেন, নবীগণ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত হতে পারেন এটা আকল দ্বারাও বৈধ, যেমনিভাবে হাদিস দ্বারাও প্রমাণিত। (মিশকাতের ব্যাখ্যাগ্রন্থ মেরকাতের ৩য় খন্ড, ৪১৪-৪১৫ পৃষ্ঠা)

তেমনিভাবে মুফতিয়ে বাগদাদ আল্লামা সাইয়্যেদ মাহমুদ আলুসী আল বাগদাদী রহঃ তদীয় তাফসীরে রুহুল মায়ানীতে উল্লেখ করেন-

"নিশ্চয় নবীয়ে রহমত রাসূলুল্লাহ ﷺ শারীরিক ও রুহানী উভয় ভাবে জীবিত এবং আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতায় পৃথিবী ও জগতসমূহে ক্ষমতা প্রয়োগ ও পরিভ্রমণ করতে পারেন যেভাবে ওফাত শরীফের পূর্বে করতেন। তাঁর কোন কিছুই পরিবর্তন হয়নি শুধু বাহ্যিক চোখের আড়াল হয়েছেন যেমনি ফেরেস্তাগণের উপস্থিতি স্বত্বেও চোখের আড়াল বা অদৃশ্য হয়ে আছেন।"

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা বলেন,"হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষ্য প্রদানকারী, সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁরই দিকে আহ্বানকারী এবং একটি উজ্জ্বল প্রদীপরূপে প্রেরণ করেছি।” (সূরা আহযাব, আয়াত ৪৫-৪৬)

উক্ত আয়াতের তাফসীরে মুফাসসির ইমাম আলূসী বাগদাদী (রহ.) ও ইমাম আবুস সাউদ (রহঃ) আরো বলেন- ‘যাদের প্রতি আপনাকে রাসূল করে প্রেরণ করা হয়েছে, তাদের সকলের জন্যে আমি (আল্লাহ) আপনাকে ‘শাহিদ’ করে পাঠিয়েছি। প্রিয় নবী (ﷺ) কে উম্মতের নিম্নবর্ণিত বিষয়াবলীর সাক্ষী বানানো হয়েছে-

(১) অবস্থাসমূহ পর্যবেক্ষণ করা।
(২) তাদের আমলসমূহ প্রত্যক্ষ করা ।
(৩) তাদের সত্যায়ন ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করার সাক্ষ্য প্রদান।
(৪) তাদের হেদায়াত ও গোমরাহী সম্পর্কে সাক্ষ্য প্রদান।
এসব বিষয়ে তিনিই কিয়ামতে সাক্ষ্য প্রদান করবেন।’’

{আলূসী, রুহুল মা‘য়ানী, ১১/২২২পৃ. আবুস সাউদ, তাফসীরে আবুস্-সাউদ, ৭/১০৭-১০৮পৃ.}

হুযুর (ﷺ) মাহফিলে তাশরীফ আনয়ন করা ও উপস্থিত হওয়া অসম্ভব নয়। এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহঃ বলেন, ‘‘এ আক্বীদা ও বিশ্বাস রাখা যে, মিলাদ মাহফিলে হুযুর ﷺ উপস্থিত হন (কিংবা হতে পারে), এটা ‘কুফর’ বা ‘শিরক’ নয়, বরং এমন বলা সীমা লঙ্গন ছাড়া কিছুই নয়। কেননা এ বিষয়টি যুক্তিভিত্তিক ও শরীয়তের দলীলের আলোকে সম্ভব। এমনকি অনেকক্ষেত্রে বাস্তবে তা ঘটেও থাকে।’’ (আল্লামা হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী : কুল্লীয়াতে এমদাদীয়া, পৃ : ১০৩)

হ্যা, আমরা এটাই বলি যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ মিলাদ মাহফিলে উপস্থিত হতে পারেন কিংবা উপস্থিত না হলেও আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতায় উম্মতের কার্যাবলী দেখতে ও শুনতে পারেন।

পোস্ট অনেক লম্বা হয়ে গেল। ইমাম শরফুদ্দিন বুসরী (রহঃ) কর্তৃক প্রিয় নবী ﷺ এঁর প্রশংসায় রচিত সর্বমহলে সমাদৃত কাসীদা, কাসীদা-এ-বুরদা (মাওলা ইয়া সল্লি ওয়া সাল্লিম দাঁ ইমান আবাদান...) রচনার প্রেক্ষাপট দিয়ে শেষ করে দিচ্ছি,

কবি একসময় পক্ষাঘাতে আক্রান্ত ও সম্পূর্ণ অচল হয়ে বিছানায় আশ্রয় নেন। বহু চিকিৎসার পরেও তিনি আরোগ্য লাভ করেন নি, এ সময় তিনি নবিজী ﷺ এঁর প্রশংসায় একটি কাসীদা লিখে তাঁর উছিলায় আল্লাহ পাকের দরবারে রোগমুক্তির প্রার্থনা করার নিয়ত করেন। কাসীদা রচনা সমাপ্ত হলে তিনি এক জুমার রাতে পাক-সাফ হয়ে এক নির্জন ঘরে প্রবেশ করেন এবং গভীর মনোযোগে ভক্তি ভরে কাসীদা আবৃত্তি করে থাকেন। আবৃত্তি করতে করতে তিনি একসময় ঘুমিয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তিনি স্বপ্ন দেখলেন, সমগ্র ঘর আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে গেছে এবং প্রিয় নবী ﷺ সেখানে শুভাগমন করেছেন। কবি আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন এবং স্বপ্নাবস্থায় প্রিয় নবী ﷺ কে কাসীদা পাঠ করে শুনাতে থাকেন। আবৃত্তি করতে করতে যখন কাসীদার শেষের দিকের একটি পঙক্তি পর্যন্ত পৌঁছান যেখানে লেখা ছিল "কাম আবরাআত আসিবান"- অর্থাৎ 'কত চিররুগ্ন ব্যক্তিকে নিরাময় করেছে প্রিয়নবীর হাতের স্পর্শ' তখন প্রিয় নবী ﷺ তাঁর হাত মোবারক দিয়ে কবির সমগ্র দেহ মুছে দেন এবং তিনি খুশী হয়ে নিজ গায়ের নকশাদার ইয়ামেনী চাঁদর দিয়ে তাঁকে ঢেকে দেন। স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় কবির! তাকিয়ে দেখেন প্রিয়নবী ﷺ সেখানে নেই। তবে কবি সম্পূর্ণ রোগমুক্ত এবং নবীজীর প্রদত্ত চাঁদর তার গায়ে জড়ানো। তিনি আল্লাহর শোকর আদায় করলেন।