নব্য শিয়াদের ধোঁকাবাজি ও সেগুলোর জবাব | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

কৃতঃ মুহাম্মদ রাকিব আত্তারী

আব্দুল বাতেন মিয়াজী একজন চরম মিথ্যাবাদী, ধোঁকাবাজ। এমনকি সে রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর নামেও মিথ্যাচার করে। সে বলছে আবূ বকর ও উমার রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা নবীগণ ব্যতিত সকল পূর্ণ বয়স্কদের সর্দার একথা প্রিয় নবী ﷺ কেবল মাওলা আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু কে বলেছেন এবং অন্য কাউকে বলতে নিষেধ করেছেন অথচ স্বয়ং আলী রাঃ এটা অন্যদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন এমনকি অন্যান্য সাহাবী থেকেও এই হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তাহলে সে যে বলছে এটা শুধু আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু কে বলা হয়েছে এবং অন্য কাউকে বলতে নিষেধ করেছেন- এটা স্বয়ং নবীজি ﷺ এঁর নামে মিথ্যাচার এবং আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু এঁর উপরও অপবাদ কেননা যদি এটা কাউকে বলতে নিষেধ করা হয় তাহলে মাওলা আলী আলায়হিস সালাম এটা অন্যদেরকে বলে দিয়ে নবীজি ﷺ এঁর অবাধ্যতা তথা বিরুদ্ধাচারণ করেছেন (নাউজুবিল্লাহ)।

হায়! এরা কি জানে না যে, সালামাহ ইবনু আক্ওয়া‘ (রাঃ) বলেনঃ আমি নবী ﷺ কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি আমার উপর এমন কথা আরোপ করে যা আমি বলিনি, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।’ (সহীহ বুখারী ১০৯)!!

আবূ হুরাইরা (রা.) বলেন, নবী ﷺ বলেনঃ ‘আমার নামে তোমরা নাম রেখ; কিন্তু আমার উপনামে (কুনিয়াতে) তোমরা নাম রেখ না। আর যে আমাকে স্বপ্নে দেখে সে ঠিক আমাকেই দেখে। কারণ শয়তান আমার আকৃতির ন্যায় আকৃতি ধারণ করতে পারে না। যে ইচ্ছা করে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার আসন বানিয়ে নেয়।’
(সহীহ বুখারী ১১০)

এছাড়াও গতকালের ঐ পোস্টে সে লিখেছে শিয়ারা বুখারি শরীফ মানে না, মুসলিম শরীফ মানে না। তারা মূলত সিহাহ সিত্তার কোনও হাদিসই মানে না, কেবল তাদের পছন্দের কিছু হাদিস ছাড়া। অথচ দেখা যাচ্ছে যে, এই বৈশিষ্ট্যটা তার মধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে কেননা সে বুখারী শরীফে বর্ণিত নবী করীম ﷺ এঁর পরে আবূ বকর রাঃ এঁর শ্রেষ্ঠত্বের হাদিস মানে না, তিরমিজী-ইবনে মাজাহ তে বর্ণিত জান্নাতে আবূ বকর রাঃ ও উমার রাঃ নবীগণ ব্যতিত সকল পূর্ণ বয়স্কদের সর্দার হওয়ার হাদিসকে মানে না...

সে আরো লিখেছে, মুয়াবিয়া রাঃ বিতর্কিত হওয়ায় তার ফাজায়েল বা মানাকেব উল্লেখ না করে ইমাম বুখারি নিজ জামিউস সাহীহ মানে বুখারি শরীফে অধ্যায়ের নাম দিয়েছেন 'জিকরে মুয়াবিয়া রা' মানে মুয়াবিয়া রা র আলোচনা। অথচ অন্যান্য সাহাবাগণের বেলায় ফাজায়েল বা মানাকেব দিয়ে অধ্যায় শুরু করেছেন। অথচ তার এই দাবী সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং মুয়াবিয়া রাঃ এঁর প্রতি বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। কেননা এভাবে নবীজির চাচা আব্বাস রাঃ, চাচাত ভাই ইবনে আব্বাস রাঃ, ত্বালহা ইবনে ‘উবাইদুল্লাহ (রাঃ), উসামা ইবনে যায়দ (রাঃ), এমনকি নবী ﷺ এঁর জামাতাগণের বর্ণনার পরিচ্ছেদও "ফাজায়েল বা মানাকেব" দিয়ে শুরু হয়নি, শুরু হয়ছে "জিকরে" তথা আলোচনা দিয়ে, তাহলে ইনারাও বিতর্কিত?? (নাউজুবিল্লাহ)

উল্লেখ্য যে, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ: তাঁর কিতাব "ফাজায়েলে সাহাবা" তে মুয়াবিয়া রাঃ সম্পর্কিত একটি পরিচ্ছেদ রেখেছেন যার নাম "ফাদায়েলে মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা"। এভাবে ইমাম তিরমিজি রহঃ মানাকিব অধ্যায়ে একটা পরিচ্ছেদের নামকরণ করেছেন "বাব-মানাকিবিল মুআবিয়া বিন আবু সুফিয়ান রাঃ"। আরো উল্লেখ্য যে, বুখারীর জিকরে মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু আনহু পরিচ্ছেদের হাদিসে আমীরে মুয়াবিয়া রাঃ কে আমীরুল মুমিনীন, ফকীহ হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে, এমন কথাও উল্লেখ আছে।

পরিশেষে বলতে চাই,

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “প্রত্যেক কিছুর একটি মূল আছে। আর ইসলামের মূল হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর সাহাবাদের এবং তাঁর পরিবারবর্গ (আহলে বাইত)'কে ভালবাসা।" [আদ-দুররুল মনসুর (৬/৭)]

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “তােমাদের মধ্যে সিরাতের (পুলসিরাত) ওপর ঐ ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি অটল থাকবে, যে আমার বংশধরগণ ও আমার সাহাবাগণকে বেশি বেশি ভালবাসবে।" [কানযুল উম্মাল ১২:৯৬ (৩৪১৫৭)]

আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ হুঁশিয়ার (সাবধান)! আমার সাহাবীদের বিষয়ে আল্লাহ্ তা'আলাকে ভয় কর। আমার পরে তোমরা তাদেরকে (গালি, বিদ্রুপ, সমালোচনার) লক্ষ্যবস্তু বানিও না। যেহেতু যে ব্যক্তি তাদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করল, সে আমার প্রতি ভালোবাসার খাতিরেই তাদেরকে ভালোবাসল। আর যে ব্যক্তি তাদের প্রতি শক্রতা ও হিংসা পোষণ করল, সে আমার প্রতি শক্রতা ও হিংসাবশেই তাদের প্রতি শক্ৰতা ও হিংসা পোষণ করল। যে ব্যক্তি তাদেরকে কষ্ট দিল, সে আমাকেই কষ্ট দিল। যে আমাকে কষ্ট দিল, সে আল্লাহ তা’আলাকেই কষ্ট দিল। আর যে আল্লাহ তা'আলাকে কষ্ট দিল, শীঘ্রই আল্লাহ তা'আলা তাকে পাকড়াও করবেন।
(সূনান আত তিরমিজী ৩৮৬২)

এই 'কুহুল' বা 'বয়স্ক'দের হাদীস এর ব্যাপারে শায়খ আব্দুল হক্ব মুহাক্কিক আলাল ইত্বলাক মুহাদ্দিসে দেহলভী বলেন—

'কুহুল' বা বয়স্ক বলার দ্বারা এটা বুঝানো উদ্দেশ্য ঐ সকল মুসলমান যারা পৃথিবীতে (মরার আগে) বয়স্ক ছিল (মানে,বয়স্ক হয়ে মারা গিয়েছে)।কেননা জান্নাতে কোনো বয়স্ক ব্যক্তি নেই।সুতরাং শায়খাইনদের প্রতি 'বয়স্কদের সর্দার' শব্দের ব্যবহার দ্বারা বুঝা যায় যে,যে সকল মুসলিম বয়স্ক হয়ে মারা গিয়েছেন (শায়খাইনরা) তাদের সর্দার হবেন।আর উনারা যদি বয়স্কদের নেতা হোন তবে তারা যুবকদের সর্দার ও হবেন।একইভাবে বলা যায়,'বয়স্ক' দ্বারা পরিপূর্ণ আক্বলমান্দ (আক্বলসম্পন্ন বুঝায়), অর্থাৎ আল্লাহ সবাইকে আক্বলবান এবং হিলম (জ্ঞানে পরিপূর্ণতা) বানিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন (তাদের সর্দার হবেন শায়খাইন)।
[লুমআতুত তানকীহ ফী শরহে মিশকাতুল মাসাবিহ,৯/৬৩১,শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী]

➤ইমাম মুহাম্মাদ আব্দুর রউফ আল মুনাভী বলেন—

'কুহুল বা বয়স্ক' এর অর্থ হলো 'হালিম' ব্যক্তি, উচ্চ পর্যায়ের বিবেকবান ব্যক্তি।কোনো সম্প্রদায়ের 'কুহুল' গণের মধ্যে 'কুহুল' এর অর্থ হল তাদের কর্মকান্ডে সর্বোত সাহায্যকারী,তাদের পক্ষে বিপদাপদে ছত্রধারী তথা মুখপাত্র।
[ফয়যুল ক্বদীর শরহে জামেউস সগীর মিন আহাদীছিল বাশিরিন নাযির,৬৮ নং হাদীসের ব্যাখ্যা]

➤ইমাম সূয়ুতি উল্লেখ করেন —

'কুহুল' বা বয়স্ক দ্বারা উদ্দেশ্য সেই সকল মানুষ যাদের আক্বল/বিবেক 'হালিম' পর্যায়ে পৌঁছেছে।
[আল-ক্বুওতুল মুগতাযী আলা জামেউত তিরমিযী,৯৮৭ পৃ:,ইমাম সূয়ুতি এবং
মুসনাদু আহমদ,৬০২নং হাদীসের হাশিয়ায় আল্লামা শোয়াইব আরনাউত্ব 'ফয়যুল ক্বদীর লিল মানাভী' এর উদ্ধৃতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন,মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ]

সৈয়্যদুনা ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন عليهم السلام হলেন জান্নাতের যুবকদের সরদার, সৈয়্যদুশ শাবাবি আহলিল জান্নাহ এবং সেটা বর্ণিত আছে অসংখ্য কিতাবে।

➤'ফয়যুল ক্বদীর শরহে জামেউস সগীর' এ ৩/৪১৫ তে উল্লেখ আছে, ইমাম সূয়ুতী বলেন, হাদীসটি মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এবং এর সাথে একটা কথা জুড়ে দেয়া আছে যে,"তাঁদের পিতা (অর্থাৎ আলী عليه السلام) তাদের চেয়ে উত্তম বা আফদ্বল।" ইমাম হায়সামী মাজমাউয যাওয়াইদের ৯ম খন্ডে ১৭২ পৃষ্ঠায় কয়েকটি হাদীস এনে প্রমাণ করে দিয়েছেন হাদীসটা সহিহ।

এই হাদীসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ আছে,ইমাম জালালউদ্দিন সুয়ুতি ব্যাপারে বলেন—

"ইমাম নববী তার ফতোয়ার কিতাবে উল্লেখ করেন,মুযাহহারী বলেছেন,হাদীসটির অর্থ হলো সে সকল যুবক যারা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছেন, জান্নাতের তাদের চেয়েও (হাসান-হুসাইন) মর্যাদাপূর্ণ হবেন।

আরেকটু অগ্রসর হয়ে বলা হচ্ছে—

অথবা এও হতে পারে যে উনারা (হাসান-হুসাইন عليهم السلام) নবীগণ এবং খুলাফায়ে রাশেদুনগণ ব্যতীত সবার সর্দার হবেন,যেহেতু বেহেশতে সবার বয়স একই হবে এবং সেখানে কোনো বয়স্ক থাকবে না।
[আল-ক্বুওতুল মুগতাযী আলা জামেউত তিরমিযী,১০১৯ পৃ:,ইমাম সূয়ুতি]