শুআবুল ইমান, ইমাম বায়হাকী (রহ), ইমানের শাখা ৬+ | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস


শুআবুল ইমান, ইমাম বায়হাকী (রহ), ইমানের শাখা ৬+

(কৃতজ্ঞতায়ঃ দুররুস সা'আদাত) 

السَّادِسُ مِنْ شُعَبِ الْإِيمَانِ
وَهُوَ بَابٌ فِي الْإِيمَانِ بِالْيَوْمِ الْآخِرِ
ইমানের ৬ষ্ট শাখা
আখিরাতের প্রতি ইমান
শায়খ হালিমী (রহ) বলেন- আখিরাতের দিনের প্রতি ইমান আনার অর্থ হলো এই কথার সত্যায়ন করা যে, এই দুনিয়ার দিনের শেষ ও চূড়ান্ত সীমা রয়েছে। অর্থাৎ এই দুনিয়া একদিন টুকরো টুকরো হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।
আখিরাতের উপর ইমান আনার ব্যাপারে শরহে সদর বা প্রশান্ত চিত্ত হওয়ার জন্য যে বিষয়টি প্রযোজ্য, তা হলো আল্লাহর ভয় বিদ্যমান থাকা। আর এর আলামত হলো দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ততা কম থাকা। দুনিয়ার কষ্ট ও মুসিবতে হতাশ না হওয়া এবং র্ধৈয ধরা। খাহিশাত বা আসক্তির চাহিদার ব্যাপারে র্ধৈয ধারণ করা। আর আল্লাহ তাআলার নিকট যে প্রতিদান ও সওয়াব রয়েছে তার প্রতি ইয়াকীন রাখা।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آَمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ
আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান এনেছি অথচ আদৌ তারা ইমানদার নয়।– সূরা বাকারা ৮
আমরা বর্ণনা করেছি হযরত উমর (রা) সূত্রে নবী (সা) থেকে। যখন তাকে ইমানের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি বললেন,
أَنْ تُؤْمِنَ بِاللهِ، وَمَلَائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ، وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، وَالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ
তুমি ইমান আনবে আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাদের প্রতি, তার কিতাবসমূহের প্রতি, তার রাসূলগেণের প্রতি, আখিরাত বা শেষ দিবসের প্রতি এবং তাকদীর বা ভাগ্যের ভাল মন্দের প্রতি। 
নবী (সা) ইরশাদ করেন-
بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةُ كَهَاتَيْنِ
আমার প্রেরণ এবং কিয়ামত- এই দুটি আঙ্গুলের মত নিকটর্বতী।
এই হাদীসের অর্থ হলো- আমি শেষ নবী। আমার পর আর কোন নবী আসবে না। তবে কিয়ামত বা পরকাল আসবে। যা আমার পরে খুবই নিকটর্বতী।
কিয়ামত যেভাবে সংঘটিত হবে
হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَتَقُومَنَّ السَّاعَةُ، وَقَدْ نَشَرَ الرَّجُلَانِ ثَوْبًا بَيْنَهُمَا لَا يَتَبَايَعَانِهِ وَلَا يَطْوِيَانِهِ، وَلَتَقُومَنَّ السَّاعَةُ، وَهُوَ يَلِيطُ حَوْضَهُ لَا يَسْقِيهِ، وَلَتَقُومَنَّ السَّاعَةُ وَقَدِ انْصَرَفَ الرَّجُلُ بِلَبَنِ لِقْحَتِهِ مِنْ تَحْتِهَا لَا يَطْعَمُهَا، وَقَدْ رَفَعَ أُكْلَتَهُ إِلَى فِيهِ فَلَا يَطْعَمُهَا
কসম সেই সত্তার  যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে। এমনককি দুই ব্যক্তি ক্রয়-বিক্রয়েরে জন্য কাপড়ের থান মেলে ধরবে আর তার সওদা করার পূর্বেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে। এক ব্যক্তি তার উটনীর দুধ দোহন করে তা পান করার পূর্বেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে। পানাহারে বসা ব্যক্তি তার লোকমা গ্রহণ করার পূবেই কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে। – রিওয়ায়াত ২৫৫
السابع من شعب الإيمان
وهو باب في الإيمان بالبعث والنشور بعد الموت
ইমানের ৭ম শাখা
মৃত্যুর পর পূণরুত্থানেরর উপর ইমান
আল্লাহ তাআলার বাণী-
زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنْ لَنْ يُبْعَثُوا
যারা কাফির তার এই বিশ্বাস রাখে যে, মৃত্যুর পর তাদের কখনও জীবিত করা হবে না।- সূরা  তাগাবুন ৭
قُلِ اللَّهُ يُحْيِيكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ
বলে দিন আল্লাহ তাআলা তোমাদেরতে জীবনদান করেছেন অত:পর তিনিই তোমাদের মৃত্যু দান করবেন।– সূরা জাসিয়া ২৬
আমরা বর্ণনা করেছি হযরত উমর (রা) থেকে। রাসূলুল্লাহ (সা) কে জিজ্ঞাসা করা হলো, ইমান কি? তিনি বললেন-
الإيمان أن تؤمن بالله وملائكته وكتبه ورسله وبالبعث من بعد الموت وبالقدر كله
তুমি ইমান আনবে আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাদের প্রতি, তার কিতাবসমূহের প্রতি, তার রাসূলগেণের প্রতি, মৃত্যুর পর পূণরায় জীবিত হওয়ার প্রতি এবং পুরো তাকদীরের প্রতি।– রিওয়ায়াত ২৫৬
মৃত্যুর পর জীবিত হওয়ার অসংখ্য প্রমাণ এই দুনিয়ার জীবনেই আল্লাহ তাআলা প্রদান করেছেন। যেমন- ইবরাহিম (আ) এর জন্য মৃত পাখিকে জীবিত করা, হযরত উযায়র (আ) এর মৃত্যুর পর জীবিত হওয়ার ঘটনা, আমালেকা সম্প্রদায় এর ঘটনা, আসহাবে কাহফের ঘটনা ইত্যদি।
الثامن من شعب الإيمان
وهو باب في حشر الناس بعد ما يبعثون من قبورهم إلى الموقف الذي بين لهم من الأرض
ইমানের ৮ম শাখা
মৃত্যুর পর পূণরুত্থানের প্রতি ইমান
আল্লাহ তাআলা যে পর্যন্ত চাইবেন মানুষ হাশরের ময়দানে দাড়িয়ে থাকবেন। যখন সেই সময় আসবে, যখন আল্লাহ তাদের থেকে হিসাব নেওয়ার ইচ্ছা করবেন, তখন আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিবেন আর সমস্ত আমলনামা নিয়ে আসা হবে, যা কিরামান কাতিবীন ফেরেশতাদ্বয় লোকদের কার্যকলাপ লিপিবদ্ধ করেছিল।
আর তা মানুষদেরকে এভাবে দেয়া হবে যে, কারো আমলনামা সোজা হাতে, কারো আমলনামা উল্টা হাতে আবার করো আমলনামা তার পিছন দিক হতে দেয়া হবে। যাদের আমলনামা সোজা হাতে দেয়া হবে তারা হবে সৌভাগ্যবান। আর যাদের আমলনামা বিপরীত দিক হতে দেয়া হবে তারা হবে হতভাগ্য।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
ألا يظن أولئك أنهم مبعوثون ليوم عظيم يوم يقوم الناس لرب العالمين
তারা কি চিন্তা করে না যে, উহারা পুণরুত্থিত হবে, মহাদিবসে? যেদিন সমস্ত মানুষ দণ্ডায়মান হবে তার প্রতিপালকের সম্মুখে।– সূরা তাতফীফ ৪-৬
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
يقوم الناس يوم القيامة لرب العالمين حتى يغيب أحدهم في رشحه إلى أنصاف أذنيه
কিয়ামতের দিন মানুষ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে দন্ডায়মান হবে। এমনকি তারা তাদের কানের লতি পর্যন্ত ঘাম দ্বারা ডুবে যাবে।-রিওয়ায়ায়াত ২৫৭
হযরত মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি-
تدني الشمس يوم القيامة من الخلق حتى تكون منهم كمقدار ميل
কিয়ামতের দিন মানুষকে সূর্যের নিকটবর্তী করে দেয়া হবে। এমনকি তা মানুষের এক মাইলের নিকটবর্তী হয়ে যাবে।
বর্ণনাকারী সুলায়মান ইবনে আমির (রহ) বলেন-  আল্লাহর শপথ! আমি জানি না, (ميل) মাইল দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে, জমীনের দূরত্ব নাকি না (ميل নামক) ঐ শলাকা যা চোখে সুরমা দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।
মানুষ তাদের আমল অনুসারে ঘামের মাঝে ডুবে থাকেবে। তাদের কারো ঘাম পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত হবে, কেউ হাটু পর্যন্ত ঘামের মধ্যে থাকবে, কেউ কোমর পর্যন্ত আর কারো মুখ পর্যন্ত ঘামে ডুবে যাবে।  
বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা) নিজ মুখের প্রতি ইঙ্গিত করলেন।–রিওয়ায়াত ২৫৮
চলেবে….
আমলনামা সবার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে
আল্লাহ তাআলার বাণী
وَكُلَّ إِنْسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنْشُورًا (13) اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا (14)
আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার গ্রীবালগ্ন করেছি। আর কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব যা সে খোলা অবস্থায় পাবে। (আর বলা হবে) পাঠ কর তুমি তোমার কিতাব। আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।– সূরা ইসরা ১৩-১৪
আমলনামা লিখার জন্য ফেরেশতা নির্ধারিত
وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ (10) كِرَامًا كَاتِبِينَ (11) يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ (12)
অবশ্যই তোমাদের উপর তত্বাবধায়ক নিযুক্ত আছে। সম্মানিত আমল লেখকবৃন্দ। তারা জানে তোমরা যা কর।– সূরা ইনফিতার-১০-১১
প্রত্যেকটি বিষয়ই লিখা হয়
عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ (17) مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ (18)
ফেরেশতা ডানে ও বামে বসে তার আমল গ্রহণ করে। সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।– সূরা ক্বাফ:১৭-১৮
আমলনামায় ছোট বড় সব কৃতকর্ম লিখা থাকবে
مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا
(তারা বলবে, হায়!) এ কেমন কিতাব (আমলনামা)। এ যে ছোট কড় কোন কিছুই বাদ দেয়নি- সবই এতে রয়েছে।– সূরা আল কাহফ ৪৯
আমলনামায় ডান হাতে আসলে হিসাব সহজ হবেআর না হয় কঠিন হবে
) فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ (7) فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا (8) وَيَنْقَلِبُ إِلَى أَهْلِهِ مَسْرُورًا (9) وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ وَرَاءَ ظَهْرِهِ (10) فَسَوْفَ يَدْعُو ثُبُورًا (11)
আর যাকে তার আমলনামা তার সোজা হাতে দেওয়া হবে তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেয়া হবে। আর সে তার স্বজনদের নিকট প্রফুল্লচিত্তে ফিরে যাবে। আর যাকে তার আমলনামা পিছন দিক হতে দেয়া হবে, সে (নিজেই) তার নিজের ধ্বংস চাইবে এবং জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রবেশ করবে।– সূরা ইনশিকাক ৭-১২
হিসাবের সময় আল্লাহ  বান্দার মাঝে কোন পর্দাথাকবে না
আদি ইবনে হাতিম (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا سَيُكَلِّمُهُ رَبُّهُ لَيْسَ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ حَاجِبٌ وَلَا تُرْجُمَانٌ، فَيَنْظُرُ أَيْمَنَ مِنْهُ فَلَا يَرَى شَيْئًا إِلَّا شَيْئًا قَدَّمَهُ، وَيَنْظُرُ أَشْأَمَ مِنْهُ فَلَا يَرَى إِلَّا شَيْئًا قَدَّمَهُ، وَيَنْظُرُ أَمَامَهُ فَلَا يَرَى إِلَّا النَّارَ فَاتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ
কিয়ামতের দিন তোমাদের প্রত্যেকের সাথে আল্লাহ তাআলা কথা বলবেন। আর সেদিন আল্লাহ ও বান্দার মাঝে কোন পর্দা থাকবে না, কোন দোভাষীও থাকবে না। মানুষ তার ডান দিকে দেখবে তো কিছুই দেখতে পাবে না- সেসব আমল ও কার্যকলাপ ব্যতীত যা সে আগে পাঠিয়েছে। বাম দিকেও দেখবে, তবে কিছুই দেখতে পাবে না- সেসব আমল ও কার্যকলাপ ব্যতীত যা সে আগে পাঠিয়েছে। অতএব তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচ অর্থেক খেজুর দান করে হলেও।– রিওয়ায়াত ২৫৯
কে হিসাব নিবেন?
কেউ কেউ বলেন যে, আল্লাহ তাআলা সকলকে একত্রিত করে সবার হিসাব একসাথে নিবেন। আবার কেউ বলেন যে, আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে হিসাব নেয়ার হুকুম দিবেন। আবার কেউ বলেন যে, আল্লাহ তাআলা মুমিনদের হিসাব নিজ দায়িত্বে নিবেন আর আর কাফিরদের হিসাব ফেরেশতাদের দায়িত্বে দিবেন। যখন হিসাব-কিতাব শেষ হবে তখন আমল ওজন করা হবে, কেননা ওজন করার উদ্দেশ্য প্রতিদান প্রদান করার জন্য।
আবু সাইফ আয যাহিদ (রহ) বলেন-
مَا أُحِبُّ أَنْ يَلِيَ حِسَابَنَا غَيْرُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ لِأَنَّ الْكَرِيمَ يَتَجَاوَزُ
আমি চাই না যে আমার হিসাব আল্লাহ ছাড়া অপর কেউ নেয়। এজন্য যে, দয়াময় সত্বাই ক্ষমা করে থাকেন।- রিওয়ায়াত ২৬০
সুফিয়ান সাওরী (রহ) বলেন-
مَا أُحِبُّ أَنَّ حِسَابِي جُعِلَ إِلَى وَالِدِي رَبِّي خَيْرٌ لِي مِنْ وَالِدِي
আমি চাই না যে, আমার হিসাব আমার পিতা মাতা নেন, কেননা আল্লাহ তাআলা পিতামাতার চেয়েও উত্তম।– রিওয়ায়াত ২৬১
রাসূলুল্লাহ (সাএর উম্মত অন্য উম্মতদের উপরসাক্ষী
আবূ সাঈদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, (হাশরের দিন) নূহ এবং তাঁর উম্মত (আল্লাহর দরবারে) হাযির হবেন । তখন আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, নূহ কি তোমাদের কাছে আমার বাণী পৌছিয়েছেন। তারা বলবে- না, আমাদের কাছে কোন নবীই আসেন নি । তখন আল্লাহ  নূহ (আ) কে বলবেন, তোমার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে কে? তিনি বলবেন, মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর উম্মত। [রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন] তখন আমরা সাক্ষ্য দিব। নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহ্‌র বাণী পৌছিয়েছেন । আর এটিই হল আল্লাহ্‌র বাণীঃ
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ، وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا
আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী উম্মত বানিয়েছে, যেন তোমরা মানব জাতির উপর সাক্ষী হও।–[সূরা বাকারা ১৪৩]- রিওয়ায়াত ২৬৪
আবূ সাঈদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- (কিয়ামতের দিন) একজন নবী আসবেন, তাঁর সাথে থাকবে একজন মাত্র অনুসারী। আবার কোন নবীর সাথে থাকবে দু’জন অনুসারী। আবার কোন নবীর সাথে থাকবে তিনজন বা তার কম-বেশী অনুসারী। তাকে বলা হবে, তুমি কি তোমার জাতির নিকট আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়েছিলে? তিনি বলবেনঃ হা। তার জাতিকে ডাকা হবে এবং বলা হবে, তিনি কি তোমাদের নিকট আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়েছিলেন? তারা বলবে, না। তাঁকে বলা হবে, তোমার সাক্ষী কারা? তিনি বলবেনঃ মুহাম্মাদ (সা) ও তার উম্মাত।
তখন মুহাম্মাদ (সা) এর উম্মাতকে ডাকা হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবে, নবী কি (তার উম্মাতের নিকট আল্লাহর বাণী) পৌঁছিয়েছিলেন? তারা বলবে, হা। তাদের আবার জিজ্ঞেস করা হবে, তোমরা তা জানলে কিভাবে? তারা বলবে, আমাদের নবী (সা) আমাদের অবহিত করেছিলেন যে, নিশ্চয় রাসূলগণ আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছেন। আমরা তার কথা সত্য বলে স্বীকার করেছি।
তোমাদের জন্য এ কথার প্রমাণ হলো মহান আল্লাহর বাণী-
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ، وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا
আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী উম্মত বানিয়েছে, যেন তোমরা মানব জাতির উপর সাক্ষী হও।–[সূরা বাকারা ১৪৩]- রিওয়ায়াত ২৬৫
মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধ সাক্ষ্য দিবে
আল্লাহ তাআলার বাণী-
يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (24)
যেদিন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও তাদের পা তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে।– সূরা নূর ২৪
وَقَالُوا لِجُلُودِهِمْ لِمَ شَهِدْتُمْ عَلَيْنَا قَالُوا أَنْطَقَنَا اللَّهُ الَّذِي أَنْطَقَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُوَ خَلَقَكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ (21)
জাহান্নামীরা উহাদের ত্বককে জিজ্ঞাসা করবে, তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতেছ কেন? তারা উত্তরে বলবে, আল্লাহ- যিনি আমাদেরকে বাকশক্তি দিয়েছেন, তিনি সমস্ত কিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন। তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন প্রথমবার এবং তারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। – সূরা হামিম সাজদা ২১
الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ (65)
আজ আমি তাদের মুখে মোহর করে দিবে, তাদের হাত কথা বলবে আমার সাথে আর তাদের পা সাক্ষ্য দিবে তাদের কৃতকর্মের।– সূরা ইয়াসীন ৬৫
আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা রাসুলুল্লাহ (সা) এর নিকট ছিলাম। এ সময় তিনি হেসে বললেন, তোমরা কি জান, আমি কেন হাসছি? আমরা বললাম, এ সম্পর্কে আল্লাহ ও তার রাসুলই ভাল জানেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ  বান্দা তার প্রতিপালকের সাথে যে কথা বলবে, এ জন্য হাসছি।
তখন বান্দা বলবে, হে আমার প্রতিপালক! তুমি কি আশ্রয় দাওনি আমাকে যুলম হতে? রাসুলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আল্লাহ তাআলা বলবেন, হাঁ আমি কারো প্রতি যূলূম করি না। অতঃপর বান্দা বলবে, আমি আমার ব্যাপারে নিজের সাক্ষ্য ব্যতীত অন্য কারো সাক্ষী হওয়াকে জায়িয মনে করি না । তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আজ তুমি নিজেই তোমার সাক্ষী হওয়ার জন্য যথেষ্ট এবং সম্মানিত লিপিকার বৃন্দও।
 অতঃপর বান্দার মূখের উপর মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে এবং তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে হুকুম করা হবে যে, তোমরা বল। তারা তার আমল সম্পর্কে বলবে। এরপর বান্দাকে কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে। তখন বান্দা তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে লক্ষ্য করে বলবে, অভিশাপ তোমাদের প্রতি, তোমরা দূর হয়ে যাও। আমি তো তোমাদের জন্যই ঝগড়া করছিলাম।- রিওয়ায়াত ২৬৬
নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহাবীগন প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামতের দিন আমরা কি আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাব? উত্তরে তিনি বললেন, আকাশে মেঘ না থাকা অবস্হায় দ্বিপ্রহরের সময় সূর্য দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট হয় কি? সাহাবীগণ বললেন, জী না। অতঃপর তিনি বললেন, আকাশে মেঘ না থাকা অবস্হায়–পূর্ণিমার চাদ দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট হয় কি? সাহাবীগণ বললেন, জি না।
       এরপর তিনি বললেন, কসম ঐ সত্তার! যার হাতে আমার প্রাণ! চন্দ্র সূর্যের কোন একটি দেখতে তোমাদের যেরুপ কোন কষ্ট হয় না, তদ্রুপ তোমাদের প্রতিপালককেও দেখতে তোমাদের কোন কষ্ট হবে না। আল্লাহর সাথে বান্দার সাক্ষাত হবে ।
তখন তিনি বলবেন, হে অমুক! আমি কি তোমাকে ইযযত দান করিনি, নেতৃত্ব দান করিনি, জোড়া মিলিয়ে দেইনি, ঘোড়া, উট তোমার অনুগত করে দেইনি এবং প্রাচুর্যের মাঝে তোমার পানাহারের ব্যবস্হা করিনি? জবাবে বান্দা বলবে- হ্যা, হে আমার প্রতিপালক! অতঃপর তিনি বলবেন, তুমি কি মনে করতে যে, তুমি আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে? সে বলবে, না। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি যেমনিভাবে আমাকে ভূলে গিয়েছিলে অনুরুপভাবে আমিও তোমাকে ভুলে যাব।
অতঃপর দ্বিতীয় অপর এক ব্যক্তির আল্লাহর সাথে সাক্ষাত হবে। তখন তিনি তাকেও বলবেন, হে অমুক! আমি কি তোমাকে সম্মান দান করিনি, নেতৃত্ব দেই নি, তোমার জোড়া মিলিয়ে দেইনি, উট-ঘোড়া তোমার অনুগত করে দেইনি এবং সূখ-সাচ্ছন্দ্যে পানাহারের জন্য তোমাকে কি সুযোগ করে দেই নি! সে বলবে, হাঁ করেছেন, হে আমার প্রতিপালক! তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আমার সাথে তোমার সাক্ষাৎ হবে এ কথা কি তুমি মনে করতে? সে বলবে, না। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি যেমন আমাকে ভুলে গিয়েছিলে অনুরুপভাবে আমিও তোমাকে ভুলে যাব।
অতঃপর  অপর এক ব্যক্তির আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হবে। অতঃপর পূর্বের অনুরুপ বলবেন। তখন লোকটি বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি আপনার প্রতি এবং কিতাব ও রাসুলগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করেছি। আমি সালাত আদায় করেছি, সাওম পালন করেছি এবং সাদাকা করেছি। এমনিভাবে সে যথাসম্ভব নিজের প্রশংসা করবে। এমতাবস্হায় আল্লাহ তাআলা বলবেন, এখনই তোমার মিথ্যা প্রকাশিত হয়ে যাবে।
রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন, এরপর তাকে বলা হবে, এখনই আমি তোমার উপর আমার সাক্ষী কায়িম করব। তখন বান্দা মনে মনে চিন্তা করতে থাকবে যে, কে তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবে? তখন তার মুখে মোহর মেরে দেয়া হবে । এবং তার উরু, গোশত ও হাড্ডিকে বলা হবে, তোমরা কথা বল । ফলে তার উরু, গোশত ও হাড় তার আমল সম্পর্কে বলতে থাকবে।
এ ব্যবস্হা এ জন্য করা হবে যেন, আত্মপক্ষ সমর্থন করার কোন অবকাশ তার আর বাকী না থাকে। এই ব্যক্তি হচ্ছে মুনাফিক। তার প্রতি আল্লাহ তাআলা অন্তুষ্ট হবেন।-রিওয়ায়াত ২৬৭
চলেবে…