তাফসীর আদ দুররে মানসূর- ইমাম সুয়ূতী (রহ)। সূরা আল বাকারা :১ – ২৯ pdf- | tafsir ad-durre mansur | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

তফসীর আদ দুররে মানসূর- ইমাম সুয়ূতী (রহ)। সূরা আল বাকারা :১ – ২৯। 

pdf download👉

durre mansur al baqara 1-29


তাফসীর আদ দুররে মানসূর- ইমাম সুয়ূতী (রহ)। সূরা আল বাকারা: ৩০-

وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ (30)

আর যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বললেন, নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। তখন ফেরেশতাগণ বলল, আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যারা সেখানে ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? আমরাই তো আপনার সপ্রশংসা তাসবীহ ও পবিত্রতা বর্ণনা করি। তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে আমি জানি, তা তোমরা জান না।

ইমাম ইবনে জারির হযরত হাসান থেকে এর তাফসীর বর্ণনা করেন যে, এই আয়াতে إِنِّي جَاعل শব্দের অর্থ হলো فَاعل অর্থাৎ এই কাজ করতে যাচ্ছি।

ইমাম ইবনে জারির হযরত যাহহাক থেকে বর্ণনা করেন যে- আল কুরআনের যেখানেই جُعِلَ শব্দ রয়ে তার অর্থ خُلِقَ সৃষ্টি করা অর্থে।

ইমাম হাকীম হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন, আর তিনি এটাকে সহিহ বলেছেন। তিনি বলেন- আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ)-কে জান্নাতে দাখিল করার পূর্বে তা থেকে বের করলেন। আল্লাহ তাআলার ইরশাদ-

…  إِنِّي جَاعل فِي الأَرْض خَليفَة

আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি …

 আদম (আ) এর সৃষ্টির পূর্বে পৃথিবীতে জ্বিনরা বসবাস করত। তারা পৃথিবীতে খুন খারাবী ও ফিতনা ফাসাদ শুরু করে দিল। যখন তারা পৃথিবীতে খুন খারাবী ও ফিতনা ফাসাদের মধ্যে পুরোপুরি নিমজ্জিত হয়ে গেল, তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দমন করার জন্য ফেরেশতাদেরকে পাঠালেন। তারা তাদেরকে মেরে সমুদ্র ও উপত্যকায় পাঠিয়ে দিলেন।

অতঃপর আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করলেন-

…  إِنِّي جَاعل فِي الأَرْض خَليفَة

আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি …

 তখন ফেরেশতরা বলল, জিনদের মত তারাও পৃথিবীতে খুন খারাবী ও ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টি করবে। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন-

إِنِّي أعلم مَا لَا تعلمُونَ

আমি যা জানি তা তোমরা জান না।

ইমাম ইবনে জারির, ইবনে আবি হাতিম, আবুশ শায়খ আল আযমায় হযরত আবুল আলিয়া থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে বুধবার দিন সৃষ্টি করেছেন। জ্বিনদেরকে বৃহস্পতিবার দিন সৃষ্টি করেছেন। আর আদম (আ) কে শুক্রবার দিন সৃষ্টি করেছেন। যখন জিনদের একটি কওম কুফর করল, তখন ফেরেশতাদের একটি দল পৃথিবীতে এসে তাদের সাথে যুদ্ধ করল। পৃথিবী ঐ সময় খুন-খারাবীতে পূর্ণ ছিল। (তখন আল্লাহ তাআলা খলিফা সৃষ্টি করার ইচ্ছা করলেন) এ কারণে ফেরেশতারা বলল, আপনি তাকে [আদম (আ)-কে] পৃথিবীতে খলিফা বানাতে চান, যারা পৃথিবীতে ফিতনা ফাসাদ করবে।

ইমাম ইবনে জারির হযরত যায়দ (রহ) থেকে বর্ণনা করেন। যখন আল্লাহ তাআলা আগুন সৃষ্টি করলেন, তখন ফেরেশতরা ভয় পেয়ে গেলেন এবং বললেন, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এটা কেন সৃষ্টি করেছেন? আল্লাহ তাআলা বললেন, এজন্য যে, এটা আমার ‍সৃষ্টির মধ্যে আমার নাফরমানি করবে। ঐ সময় ফেরেশতারা ব্যতীত আল্লাহর আর কোন সৃষ্টি ছিল না। ফেরেশতরা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর এমন কোন সময় কি আসবে যে, আমরা আপনার নাফরমানি করব? আল্লাহ তাআলা বললেন, না। আমি চাই যে, পৃথিবীতে আমি মাখলুক সৃষ্টি করব আর তার মধ্যে আমার খলিফা নিযুক্ত করব। তারা যমীনে খুন খারবী ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা করবে। ফেরেশতারা বলল, আপনি কি যমীনে এমন খলিফা বানাবেন যারা দাঙ্গা-হাঙ্গামা করবে? বরং আপনি আমাদেরকেই আপনার খলিফা বানিয়ে নিন। আমরা প্রশংসার সাথে আপনার তাসবীহ ও গুণ-কীর্তন করে থাকি। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি যা জানি তা তোমরা জান না।

ইমাম ইবনে জারির এবং ইবনে আসাকির হযরত ইবনে মাসউদ (রা) এবং অন্যান্য সাহাবীদের থেকে বর্ণনা করেন। আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় মাখলুককে সৃষ্টি করার পর আরশের দিকে মনোনিবেশ করলেন এবং দুনিয়ার আসমান পরিচালনার জন্য ইবলিসকে নির্ধারণ করেন। সে ফেরেশতাদের ঐ গোত্রের ছিল, যাদেরকে জ্বিন বলা হত। আর তাদেরকে এজন্য জ্বিন বলা হত যে, তারা জান্নাদের পাহাড়াদার ছিল। ইবলিসও তাদের মধ্যে একজন পাহাড়াদার ছিল। অতএব ইবলিসের মনে অহংকার সৃষ্টি হলো এবং বলতে লাগল, আল্লাহ তাআলা আমাকে বাদশাহী দান করেছেন এবং আমাকে জান্নাতের পাহাড়াদার করেছেন। কেননা আমার পরিশুদ্ধতা আছে। আল্লাহ তাআলা তার এই ধ্যান-খেয়াল জানতে পারলেন। আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে বললেন, আমি পৃথিবীতে খলিফা বানাব। ফেরেশতারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি কি যমীনে এমন খলিফা বানাবেন যারা দাঙ্গা-হাঙ্গামা করবে? তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি যা জানি তা তোমরা জান না।

ইমাম আব্দ ইবনে হুমায়দ এবং ইবনে আবি হাতিম হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে বললেন, আমি পৃথিবীতে খলিফা সৃষ্টি করব, যারা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ, খুন-খারাবী এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামা করবে। ফেরেশতারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি কি যমীনে এমন খলিফা বানাবেন যারা দাঙ্গা-হাঙ্গামা করবে? ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, ইবলিস দুনিয়ার আসমানের ফেরেশতাদের আমির ছিল। সে যখন অহংকার ও পাপের ইচ্ছা করল, তখন আল্লাত তাআলা তা জানতে পারলেন। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি যা জানি তা তোমরা জান না।

ইমাম আব্দ ইবনে হুমায়দ এবং ইবনে জারির এই আয়াত أَتجْعَلُ فِيهَا من يفْسد فِيهَا ويسفك الدِّمَاء প্রসঙ্গে হযরত কাতাদাহ (রহ) থেকে বর্ণনা করেন যে-

قد علمت الْمَلَائِكَة وَعلم الله أَنه لاشيء أكره عِنْد الله من سفك الدِّمَاء وَالْفساد فِي الأَرْض

ফেরেশতাদের এই বিষয়টি জানা ছিল যে, আল্লাহর নিকট পৃথিবীতে খুন খারাবী ও ফিতনা-ফাসাদ থেকে অধিক অপছন্দনীয় আর কিছু নেই।

ইমাম ইবনুল মুনযির এবং ইবনে বাত্তাহ তার আমালীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন-

إيَّاكُمْ والرأي فَإِن الله تَعَالَى رد الرَّأْي على الْمَلَائِكَة

তিনি বলেন, নিজের রায় এর উপর আমল করা থেকে বিরত থাক। কেননা আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের রায় বা অভিমতকে খণ্ডন করে দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা বললেন- আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি …। ফেরেশতারা বলল- আপনি কি পৃথিবীতে…। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি যা জানি তা তোমরা জান না।

ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া কিতাবুত তওবায় হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- সর্বপ্রথম ফেরেশতারা লাব্বাইক লাব্বাইক বলেছিল। যখন আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। তখন ফেরেশতাগণ বলল, আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যারা ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? তারা আল্লাহর কথার উপর কথা বললেন। আল্লাহ তাআলা এতে অসন্তুষ্ট হলেন। অতএব ফেরেশতারা ছয় বৎসর পর্যন্ত আরশের আশপাশ দিয়ে লাব্বাইক লাব্বাইক বলতে বলতে তাওয়াফ করতে লাগল ওযরখাহির জন্য। আর বলতে লাগল-

لبيْك لبيْك نستغفرك ونتوب إِلَيْك

আমরা উপস্থিত, আমরা উপস্থিত। আমরা আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি ও তওবা করছি।

[আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ) আল বিদায়ায় বলেন- ফেরেশতারা বিষয়টির তাৎপর্য জানা এবং তার রহস্য সম্পর্কে অবগতি লাভ করার উদ্দেশ্যে এ কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন। আপত্তি তোলা, আদম সন্তানদের অমর্যাদা বা তাদের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। তাছাড়া আদমের পূর্বে জিনদের কার্যকলাপ দেখে তারা জানতে পেরেছিলেন যে, ভবিষ্যতেও এমন অঘটন ঘটবে।- অনুবাদক]

ইমাম ইবনে জারির, ইবনে আবি হাতিম এবং ইমাম আসাকীর হযরত ইবনে সাবিত (রা) থেকে বর্ণনা করেন। পৃথিবী মক্কার স্থান থেকে সম্প্রসারিত হয়েছে। ফেরেশতারা বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করত আর তারাই ছিল প্রথম তাওয়াফকারী। উক্ত আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য এই যমীন। যখন কোন নবীর সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে যেত তখন সেই নবী ও নেক লোকেরা এখানে এসে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন তাদের মৃত্যু পর্যন্ত। হযরত নূহ, হুদ, শুআইব এবং সালিহ (আ) এর কবর যমযম ও রুকনের মাঝে অবস্থিত।

ইমাম আব্দুর রাযযাক, আব্দ ইবনে হুমায়দ এবং ইবনে জারির হযরত কাতাদাহ (রহ) থেকে বর্ণনা করেন, এই আয়াতে وَنحن نُسَبِّح بحَمْدك ونقدس لَكতাসবীহ দ্বারা উদ্দেশ্য তাসবীহ-তাহলীল। আর তাকদীস দ্বারা উদ্দেশ্য নামায।

ইমাম ইবনে আবি শাইবাহ, আহমদ, মুসলিম, তিরমিযী এবং নাসাঈ হযরত আবু যার (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় কালাম যা তিনি ফেরেশতাদের জন্য নির্বাচন করেছেন, তা হলো سُبْحَانَ رَبِّي وَبِحَمْدِهِ অপর রিওয়ায়াতের শব্দ হলো- سُبْحَانَ الله وَبِحَمْدِهِ ।

ইমাম ইবনে জারির হযরত ইবনে মাসউদ (রা) এবং অন্যান্য সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন যে ونقدس لَكএর অর্থ হলো نصلي لَك আমরা তোমার জন্য নামায পড়ি।

ইমাম আব্দ ইবনে হুমায়দ এবং ইবনে জারির হযরত মুজাহিদ (রহ) থেকে ونقدس لَك এর অর্থ বর্ণনা করেন যে, এর অর্থ হলো- نعظمك ونكبركঅর্থাৎ আমরা আপনার মহত্ব ও বড়ত্ব বর্ণনা করি।

ইমাম ওকী, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ, আব্দুর রাযযাক, সাঈদ ইবনে মানসূর, আব্দ ইবনে হুমায়দ এবং ইবনে জারির إِنِّي أعلم مَا لَا تعلمُونَ এর তাফসীরে লিখেছেন যে-

علم من إِبْلِيس وخلقه لَهَا

ইবলিসের পাপ এবং পাপের জন্যই তার সৃষ্টি- এই জ্ঞান আল্লাহ তাআলার পূর্ব থেকেই ছিল।

ইমাম আব্দ ইবনে হুমায়দ, ইবনে জারির কাতাদাহ (রহ) إِنِّي أعلم مَا لَا تعلمُونَ আয়াতের ব্যাপারে বর্ণনা করেছেন যে-

كَانَ فِي علم الله أَنه سَيكون من تِلْكَ الخليقة أَنْبيَاء ورسل وَقوم صَالِحُونَ وساكنو الْجنَّة

আল্লাহ তাআলার জ্ঞানে ছিল যে, আল্লাহর সেই নির্বাচিত খলিফা থেকে নবী, রাসূল এবং নেক লোকেরা হবে, আর তারা জান্নাতে থাকবে।

ইমাম আবি শাইবাহ মুসান্নিফে, আহমদ যুহুদে, ইবনে আবিদ দুনইয়া আল আমাল-এ হযরত হাসান থেকে বর্ণনা করেন যে-

لما خلق الله آدم وَذريته قَالَت الْمَلَائِكَة: رَبنَا إِن الأَرْض لم تسعهم قَالَ: إِنِّي جَاعل موتا قَالُوا: إِذا لَا يهنأ لَهُم الْعَيْش قَالَ: إِنِّي جَاعل أملاً

 যখন আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ) এবং তার সন্তানদেরকে (রূহসমূহকে) সৃষ্টি করলেন, তখন ফেরেশতারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! যমীনে এদের স্থান সংকুলান হবে না। আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি তাদের জন্য মৃত্যু সৃষ্টি করব। ফেরেশতারা বলল, তবে তো জীবন তাদের জন্য আনন্দদায়ক হবে না। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি আশা-আকাঙ্ক্ষাও সৃষ্টি করব।

ইমাম আহমদ, আব্দ ইবনে হুমায়দ, ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ) আল উকূবাত-এ, ইবনে হিব্বান তার সহিহতে এবং বায়হাকী শুআবুল ইমানে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছেন- আল্লাহ তাআলা যখন হযরত আদম (আ)-কে যমীনে অবতরণ করালেন, তখন ফেরেশতারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি কি তাকে খলিফা বানাচ্ছেন, যে পৃথীবিতে দাঙ্গা-হাঙ্গামা আর খুন-খারাবী করবে? অথচ আমরা প্রশংসার সাথে আপনার তাসবীহ ও গুণ-কীর্তন করি। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি যা জানি তা তোমরা জান না।

ফেরেশতারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা বনী আদম থেকে আপনার বেশী অনুগত। আল্লাহ তাআলা বললেন, তোমাদের মধ্য থেকে দুজনকে আমার নিকট নিয়ে আস। আমি তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠাব আর দেখব তারা কেমন আমল করে। ফেরেশতারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! হারূত-মারূত প্রস্ত্তত আছে। আল্লাহ তাআলা বললেন, তোমরা উভয়ে পৃথিবীতে নেমে যাও।

অতঃপর তাদের (পরীক্ষার) জন্য যোহরা তারকাকে একজন সুন্দরী রমণীর আকৃতিতে পেশ করা হলো (এবং তাদের মধ্যে জৈবিক চাহিদা প্রদান করা হলো)। ঐ রমণী যখন তাদের নিকট আসল, তখন তারা তার নিকট নিজেদের জৈবিক কামনা পুরা করার অভিপ্রায় জ্ঞাপন করল। তথন রমণীটি বলল, আল্লাহর শপথ! তোমাদের কামনা ঐ সময় পর্যন্ত পুরা হবে না, যে পর্যন্ত না তোমরা আল্লাহর সাথে শির্‌ক না করবে। তারা বলল, আমরা আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করি না।

ঐ রমণী চলে গেল। অতঃপর একটি বাচ্চা সাথে করে নিয়ে আসল। তখন তারা আবার তার নিকট নিজেদের জৈবিক কামনা পুরা করার অভিপ্রায় জ্ঞাপন করল। তথন রমণীটি বলল, তোমাদের কামনা ঐ সময় পর্যন্ত পুরা হবে না, যে পর্যন্ত না তোমরা এই শিশুটিকে হত্যা করবে। তারা বলল, আল্লাহর শপথ! আমরা কখনও একে হত্যা করব না।

ঐ রমণী চলে গেল। অতঃপর তৃতীয়বার যখন আসল তখন তার হাতে এক পাত্র মদ ছিল। হারূত-মারূত আবার তার নিকট নিজেদের জৈবিক কামনা পুরা করার অভিপ্রায় জ্ঞাপন করল। তখন রমণীটি বলল, তোমাদের কামনা ঐ সময় পর্যন্ত পুরা হবে না, যে পর্যন্ত না তোমরা এই মদ পান না করবে। অতএব তারা মদ পান করল এবং নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। অতঃপর তারা রমণীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং বাচ্চাকেও হত্যা করে ফেলল।

যখন তাদের হুশ আসল, তখন রমণীটি বলল, আল্লাহর শপথ! প্রথমে তোমরা যা করতে অস্বীকার করেছিলে, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তার সবই করে ফেলেছ। অতএব এই পাপের জন্য তাদেরকে দুনিয়ার আযাব অথবা আখিরাতের আযাব- এ দুটির মধ্যে যে কোন একটি বেঁছে নেওয়ার ইচ্ছা প্রদান করা হয়। তারা দুনিয়ার আযাব ও শাস্তিকেই বেঁছে নেয়।

[আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ) তাফসীরে ইবনে কাসীরে বলেন, হারূত-মারূতের ঘটনা তাবিয়ীগণের মধ্যে অনেকে বর্ণনা করেছেন। পূর্ববর্তী-পরবর্তী অনেক মুফাসসিরগণও তাদের নিজ নিজ তাফসীর গ্রন্থে এটা এনেছেন। কিন্তু এর অধিকাংশই ইসরাইলী রিওয়ায়াত। এ বিষয়ে কোন সহিহ, মারফু ও মুত্তাসিল হাদীস রাসূলুল্লাহ (সা) হতে সাব্যস্ত নেই। আবার কুরআন হাদীসের মধ্যেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই। সুতরাং আমাদের ইমান এর উপরই রয়েছে যে, যেটুকু কুরআনুল কারীমে রয়েছে তা-ই সঠিক। আর প্রকৃত অবস্থা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন।- অনুবাদক]

ইমাম ইবনে সাদ তাবাকাতে, আহমদ, আব্দ ইবনে হুমায়দ, আবু দাউদ, তিরমিযী, হাকীম নাওয়াদিরুল উসূলে, ইবনে জারির, ইবনুল মুনযির, আবুশ শায়খ আল আযমায়, হাকীম, ইবনে মারদুবিয়া এবং বায়হাকী আল আসমা ওয়াস সিফাতে হযরত আবু মূসা আশ’আরী (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)  ইরশাদ করেন-  

إِن الله خلق آدم من قَبْضَة قبضهَا من جَمِيع الأَرْض فجَاء بَنو آدم على قدر الأَرْض جَاءَ مِنْهُم الْأَحْمَر والأبيض وَالْأسود وَبَين ذَلِك والسهل والحزن والخبيث وَالطّيب

মহান আল্লাহ আদম-(আ)-কে এক মুষ্টি মাটি দিয়ে তৈরী করেন, যার মধ্যে যমীন বা পৃথিবীর সব স্থানের অংশ ছিল। আর এ কারণেই আদম সন্তান ঐ মাটির স্বভাব অনুযায়ী সৃষ্টি হয়েছে। যেমন- কেউ লাল, কেউ সাদা বা কাল, আবার কেউ এর মাঝামাঝি রংয়ের। আর এ জন্য তাদের কারো স্বভাব নরম, কারো কঠোর, আবার কেউ মন্দ কেউবা ভাল।

ইমাম ইবনে জারির, বায়হাকী আল আসমা ওয়াস ‍সিফাতে এবং ইবনে আসাকীর ইবনে মাসউদ (রা) এবং অন্যান্য সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন। আল্লাহ তাআলা জিবরাইল (আ)-কে পৃথিবীতে পাঠালেন তার মাটি আনার জন্য। যমীন বলল, আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই যে তুমি আমার অঙ্গহানী করবে। ফলে জিবরাইল (আ) মাটি না নিয়ে ফিরে গেলেন এবং বললেন, হে আমার রব! যমীন আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করায় আমি তাকে ছেড়ে এসেছি।

 অতঃপর আল্লাহ তাআলা মিকাঈল (আ)-কে পাঠালে তার সাথেও এমন হলো। এবার আল্লাহ তাআলা মালাকুল মউতকে প্রেরণ করেন। যমীন তার কাছ থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করলে তিনি বললেন, আমিও আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি তার নির্দেশ পালন না করে ফিরে যাওয়া হতে। এ কথা বলে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে সাদা, লাল ও কাল রঙের কিছু মাটি সংগ্রহ করে মিশিয়ে নিয়ে চলে যান। এ কারণেই আদম (আ) এর সন্তানদের এক একজনের রঙ একেক রকম হয়ে থাকে।

মালাকুল মউত মাটি নিয়ে নিয়ে উপরে গেলে মাটিকে ভিজিয়ে নেয়া হয়, ফলে তা আঠালো হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে বললেন, আমি মাটির দ্বারা মানুষ সৃষ্টি করব। আল্লাহ তাআলা তার কুদরতী হাত দ্বারা মানুষ সৃষ্টি করলেন, যাতে ইবলিস বড়াই করতে না পারে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করলেন। তারপর মাটির তৈরী এই দেহটি চল্লিশ বছর পর্যন্ত জুমার দিনের অংশ-বিশেষ ভাবে পড়ে থাকে। তা দেখে ফেরেশতারা ভয় পান। সবচেয়ে বেশী ভয় পায় ইবলিস। সে তার পাশ দিয়ে আনাগোনা করত এবং তাকে আঘাত করত। ফলে দেহটি ঠনঠনে পোড়া মাটির ন্যায় শব্দ করত। ইবলিস বলল, তাকে কি জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে? এক পর্যায়ে সে তার মুখ দিয়ে প্রবেশ করে এবং গুহ্যদ্বার দিয়ে বেরিয়ে এসে ফেরেশতাদেরকে বলল, তোমরা একে ভয় করো না। কারণ তোমাদের প্রতিপালক অমুখাপেক্ষী আর এটা শূণ্যগর্ভ মাত্র। যদি আমি এটাকে নাগালে পাই তবে ধ্বংস করেই ছাড়ব।

যখন সেই সময় আসল যখন আল্লাহ তার মধ্যে রূহ সঞ্চার করবেন, তখন ফেরেশতাদেরকে বললেন, যখন আমি এর মধ্যে রূহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা একে সিজদা করবে। অতএব যখন আল্লাহ তার মধ্যে রূহ সঞ্চার করলেন, আর প্রাণ তার মাথার মধ্যে পৌছল তখন আদম (আ) হাঁচি দিলেন। ফেরেশতারা তাকে বলল, আপনি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলুন। তিনি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘ইয়ারহামুকা রাব্বুকা।’ অতঃপর যখন রূহ আদম (আ) এর চোখে প্রবেশ করল, তখন তিনি জান্নাতের ফল-ফলাদির প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন। যখন রূহ তার পেটে প্রবেশ করল, তখন তার খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হলো, আর তার রূহ তার পা পর্যন্ত পৌছার আগেই জান্নাতের ফলের দিকে অগ্রসর হতে চেষ্টা করলেন। এজন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

خُلِقَ الْإِنْسَانُ مِنْ عَجَلٍ

মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই ত্বরাপ্রবণ।– সূরা আম্বিয়া:৩৭

ইবনে সাদ তাবাকাতে, ইবনে জারির, ইবনে আবি হাতিম এবং ইবনে আসাকীর তার ইতিহাসে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে পৃথিবীতে পাঠান আর সে যমীনের উপরের অংশ থেকে ভাল ও লবনাক্ত মাটি নিয়ে আসে। আল্লাহ তাআলা এর দ্বারা আদম (আ)-কে সৃষ্টি করেন। অতএব তিনি যাকে ভাল মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন সে সৌভাগ্যের দিকে যাবে, যদিও সে হয় কোন কাফিরের সন্তান। পক্ষান্তরে যাকে লবনাক্ত মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন সে দুর্ভাগ্যের দিকে যাবে, যদিও সে হয় কোন নবীর সন্তান।

এ কারণেই ইবলিস বলেছিল, আমি কি তাকে সিজদা করব যাকে তুমি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছ। এই মাটি আমি নিজে পৃথিবী থেকে নিয়ে এসেছি। এ কারণেই আদমকে আদম বলা হয়, কারণ তার খামির মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে।   

ইমাম ইবনে জারির হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন-

إِن آدم خلق من أَدِيم الأَرْض فِيهِ الطّيب والصالح والرديء فَكل ذَلِك أَنْت رَاء فِي وَلَده

আদম (আ)-কে যমীনের উপরে অংশ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এর মধ্যে ভাল মন্দ সব ধরণের অংশ ছিল। যার কারণে তার সন্তানদের মধ্যে সব ধরণের লোক নযরে আসে।

ইবনে সাদ এবং ইবনে আসাকির হযরত আবু যার (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি নবী (সা) কে বলতে শুনেছি-

إِن آدم خلق من ثَلَاث تربات: سَوْدَاء وبيضاء وحمراء

আদম (আ)-কে তিন রকমের মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে- কাল, সাদা এবং লাল।

ইমাম দায়লামী হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে মারফু হাদীস বর্ণনা করেন যে-

الْهوى وَالْبَلَاء والشهوة معجونة بطينة آدم عَلَيْهِ السَّلَام

 হযরত আদম (আ) এর মাটির সাথে খাহিশাত ও কামনা, বিপদ ও মুসিবত এবং শাহাওয়াত ও আসক্তি গুলানো হয়েছে।

ইমাম তায়ালসী, ইবনে সাদ, আহমদ, আব্দ ইবনে হুমায়দ, মুসলিম, আবু ইয়ালা, ইবনে হিব্বান, আবুশ শায়খ আল আযমায় এবং বায়হাকী আল আসমা ওয়াস সিফাতে হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন- আল্লাহ তাআলা জান্নাতে হযরত আদম (আ) এর দেহ মুবারক তৈরী করে কিছু সময়ের জন্য এভাবেই রেখে দেন। তখন ইবলিস এটা কি- তা দেখার জন্য তার আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে থাকেন। ইবলিস যখন দেখল যে, তার ভিতর অংশ ফাঁকা। তখন তার জ্ঞান হলো যে, এটা এমন সৃষ্টি যে কোন কিছুর মালিক নয়।

আবুশ শায়খ এর বর্ণনায় আছে-

خلق لَا يَتَمَالَك ظَفرت بِهِ

এটা এমন সৃষ্টি যে কোন কিছুর মালিক নয়। আমি এর উপর সফল হয়ে যাব।

ইমাম ইবনে হিব্বান হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

لما نفخ الله فِي آدم الرّوح فَبلغ الرّوح رَأسه عطس فَقَالَ (الْحَمد لله رب الْعَالمين) فَقَالَ لَهُ تبَارك وَتَعَالَى: يَرْحَمك الله

যখন আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ) এর দেহে রূহ ও প্রাণ সঞ্চার করলেন এবং প্রাণ তার মাথা পর্যন্ত পৌছল, তখন তিনি হাঁচি দিলেন এবং বললেন- ‘আল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।’ তখন আল্লাহ তাআলা উত্তর দিলেন- ‘ইয়ারহামকুল্লাহ।’

ইমাম ইবনে হিব্বান হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন –

لما خلق الله آدم عطس فألهمه الله ربه أَن قَالَ: الْحَمد لله قَالَ لَهُ ربه: يَرْحَمك الله فَلذَلِك سبقت رَحمته غَضَبه

যখন আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ) –কে সৃষ্টি করলেন তখন তিনি হাঁচি দিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বলার জন্য ইলহাম করলেন। (তিনি তা বললে) আল্লাহ তাআলা উত্তর দিলেন- ‘ইয়ারহামকুল্লাহ।’ এ কারণে তার রহমত তার ক্রোধকে অতিক্রম করে গেছে।

ইমাম আহমদ, বুখারী, মুসলিম হযরত আবু হুরায়রা (রা) এর মাধ্যমে নবী (স) থেকে বর্ণনা করেন। যখন আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ)-কে সৃষ্টি করেছেন তখন তাঁর দৈর্ঘ্য ছিল ষাট হাত। এরপর তিনি (আল্লাহ) তাকে বললেন, যাও। ঐ ফেরেশতাদের প্রতি সালাম কর  এবং তারা তোমার সালামের জওয়াব কিরূপে দেয় তা মনোযোগ দিয়ে শোন। কেননা এটাই হবে তোমার এবং তোমার সন্তানদের সালামের রীতি। তারপর আদম (আ) বললেন, ‘আস্‌সালামু আলাইকুম।’ ফেরশতারা তার উত্তরে “আস্‌সালামু আলাইকা ওয়া রাহামাতুল্লাহ” বললেন। ফেরশতারা সালামের জওয়াবে “ওয়া রাহ্‌মাতুল্লাহ” শব্দটি বাড়িয়ে বললেন । যারা জান্নাতে প্রবেশ করবেন তারা আদম (আ)-এর আকৃতি বিশিষ্ট হবেন। তবে আদম সন্তানদের দেহের দৈর্ঘ্য সর্বদা কমতে কমতে বর্তমান পরিমাপ পর্যন্ত পোঁছেছে ।

ইমাম মুসলিম, আবু দাউদ, ইবনুল মুনযির, ইবনে আবি হাতিম এবং ইবনে মারদুবিয়া হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

خير يَوْم طلعت عَلَيْهِ الشَّمْس يَوْم الْجُمُعَة فِيهِ خلق الله آدم وَفِيه أَدخل الْجنَّة وَفِيه أهبط مِنْهَا وَفِيه مَاتَ وَفِيه تيب عَلَيْهِ وَفِيه تقوم السَّاعَة

সবচেয়ে উত্তম দিন যার উপর সূর্য উদিত হয়, তা হলো জুমআর দিন। এই দিনেই আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ)-কে সৃষ্টি করেছেন। এই দিনেই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। এই দিনেই তাকে জান্নাত থেকে নামিয়ে দিয়েছেন। এই দিনেই দার মৃত্যু হয়েছে আর  এই দিনেই তার তওবা কবুল হয়েছে। আর এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।

চলবে ইনশাআল্লাহ

وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنْبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاءِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (31) قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ (32) قَالَ يَا آدَمُ أَنْبِئْهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ فَلَمَّا أَنْبَأَهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَأَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنْتُمْ تَكْتُمُونَ (33)

৩১.আর আল্লাহ তা’আলা আদমকে যাবতীয় বিষয়ের নাম (ও পরিচয়) শিক্ষা দিলেন। অতঃপর সে সবকিছু ফেরেশতাদের সামনে উত্থাপন করলেন। অতঃপর বললেন, আমাকে তোমরা এগুলোর নাম বলে দাও, যদি তোমরা সত্য হয়ে থাক।

৩২.তারা বলল, আপনি পবিত্র! আপনি আমাদেরকে যা শিখিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের আর কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই আপনি জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।

৩৩.তিনি বললেন, হে আদম, ফেরেশতাদেরকে এসবকিছুর নাম বলে দাও। অতঃপর যখন তিনি সে সবকিছুর নাম বলে দিলেন, তখন তিনি বললেন- আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আসমান ও যমীনের যাবতীয় গোপন বিষয় সম্পর্কে খুব ভাল করেই অবগত রয়েছি? এবং সেসব বিষয়ও জানি যা তোমরা প্রকাশ কর আর যা তোমরা গোপন কর।

ইমাম ফিরইয়াবি, ইবনে সাদ, ইবনে জারির, ইবনে আবি হাতিম, হাকিম এবং বায়হাকী আল আসমা ওয়াস সিফাতে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে-

إِنَّمَا سمي آدم لِأَنَّهُ خلق من أَدِيم الأَرْض الْحمرَة وَالْبَيَاض والسواد وَكَذَلِكَ ألوان النَّاس مُخْتَلفَة فِيهَا الْأَحْمَر والأبيض وَالْأسود وَالطّيب والخبيث

 আদম (আ)-কে আদম এজন্য বলা হয় যে, তাকে পৃথিবীর আদিম (মাটির উপর আস্তরণ) দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে, যার মধ্যে লাল, সাদা, কাল সব ছিল। এ কারণেই মানুষের বর্ণ বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কেউ লাল, কেউ সাদা, কেউ কাল। আবার কেউ ভাল, কেউ খারাপ।

ইমাম আব্দ ইবনে হুমায়দ হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে-

خلق الله آدم من أَدِيم الأَرْض من طِينَة حَمْرَاء وبيضاء وسوداء

 আল্লাহ তাআলা আদম (আ)-কে পৃথিবীর আদিম (মাটির উপর আস্তরণ) দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। তাকে লাল, সাদা, কাল মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।

ইমাম ইবনে জারির, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতিম হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে এই আয়াত وَعلم آدم الْأَسْمَاء كلهَا প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে-

علمه اسْم الصحفة وَالْقدر وكل شَيْء حَتَّى الفسوة والفسية

আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ)-কে থালা-বর্তন, হাড়ি-পাতিল তথা যাবতীয় আসবাবপত্রের নাম শিখিয়েছেন। এমনকি পেটের মধ্যস্থি বায়ূ যা নিঃসরণ হয় এবং নোংড়া নালার কীট-পতঙ্গের নামও শিক্ষা দিয়েছেন।

ইমাম ওকী এবং ইবনে জারির হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়র (রহ) থেকে এই আয়াত وَعلم آدم الْأَسْمَاء كلهَا প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে-

علمه اسْم كل شَيْء حَتَّى الْبَعِير وَالْبَقَرَة وَالشَّاة

আল্লাহ তাআলা আদম (আ)-কে প্রত্যেক বিষয়ের জ্ঞান দান করেছেন। এমনকি উট, গরু ও বকরীর নামও।

ইমাম আব্দ ইবনে হুমায়দ এবং ইবনে আবি হাতিম হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে এই আয়াত  وَعلم آدم الْأَسْمَاء كلهَا প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে- مَا خلق الله অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার সব বিষয়ে তাকে জ্ঞান দান করেছেন।

ইমাম দাইলামী হযরত আবু রাফে থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-

مثلت لي أمتِي فِي المَاء والطين وَعلمت الْأَسْمَاء كَمَا علم آدم الْأَسْمَاء كلهَا

আমার জন্য আমার উম্মতের মাটি ও পানির মধ্যে দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে। আর আমি সকল নাম পরিচয় জেনে নিলাম যা হযরত আদম (আ) জেনেছিলেন।

ইমাম ইবনে জারির হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। আল্লাহ তাআলা আদম (আ) কে সবকিছুর নাম শিক্ষা দেন। এগুলো সেইসব নাম যা লোকেরা এখন জানে। যেমন মানুষ, প্রাণী, সমুদ্র, নরম, পাহাড়, গাধা এবং এই ধরণের অন্য সবকিছুর নাম শিক্ষা দেন। অতঃপর এসবকিছুর নাম ফেরেশতাদের সামনে পেশ করা হলো যা হযরত আদম (আ) কে শিক্ষা দেয়া হয়েছে। আর বলা হলো- তোমরা এসবকিছুর নাম বল, যদি তোমরা সত্যবাদি হয়ে থাক। অর্থাৎ যদি তোমরা জান (বা মনে কর) যে, আমি যমীনে খলিফা বানাব না। ফেরেশতরা বলল, আপনার সত্তা পবিত্র। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা পবিত্র যিনি ব্যতীত অদৃশ্যের সংবাদ কেউ জানে না। আমরা আপনার দিকে প্রত্যাবর্তন করছি, আমরা তা জানি না, যা আপনি আদম (আ) কে শিখিয়েছেন।

ইমাম ইবনে জারির হযরত মুজাহিদ (রহ) এর মাধ্যমে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন।

إِن الله لما أَخذ فِي خلق آدم قَالَت الْمَلَائِكَة: مَا الله خَالق خلقا أكْرم عَلَيْهِ منا وَلَا أعلم منا فابتلوا بِخلق آدم

আল্লাহ তাআলা যখন হযরত আদম (আ) কে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করলেন, তখন ফেরেশতরা বলল, আল্লাহ তাআলা এমন কোন মাখলুক সৃষ্টি করবেন না, যারা তার নিকট আমাদের চেয়ে বেশী সম্মানিত ও জ্ঞানী হবেন। অতএব এই কারণে আদম (আ) এর সৃষ্টির মাধ্যমে তাদেরকে পরীক্ষায় নিপতিত করলেন।

ইমাম ইবনে জারির হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করেন-

الْعَلِيم الَّذِي قد كمل فِي علمه الْحَكِيم الَّذِي قد كمل فِي حكمه

 আলিম ও জ্ঞানী সে ব্যক্তি, যে তার ইলম ও জ্ঞানে কামিল বা পরিপূর্ণ হয়। আর হাকীম বা প্রজ্ঞাবান সে, যে তার হিকমত বা প্রজ্ঞায় কামিল বা পরিপূর্ণ হয়।

ইমাম আব্দ ইবনে হুমায়দ হযরত মুজাহিদ (রহ) থেকে এই আয়াত প্রসঙ্গে বলেন যে-

مَا أسر إِبْلِيس من الْكفْر فِي السُّجُود

 ইবলিস সিজদা করার অস্বীকার করার বিষয়টি যা গোপন করেছিল (তা আল্লাহ তাআলা জানেন)।

ইমাম ইবনে জারির হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে এর وَأعلم مَا تبدون তাফসীর বর্ণনা করেন যে, এর অর্থ হলো যা তোমরা প্রকাশ কর। আর وَمَا كُنْتُم تكتمون এর অর্থ হলো আমি গোপনীয় বিষয়গুলোও এভাবে জানি যেভাবে তোমরা প্রকাশ্য বিষয় জান।

ইমাম আব্দ ইবনে হুমায়দ এবং ইবনে জারির হযরত মাহমুদ বিন মায়মুন (রহ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি হযরত হাসান বসরী (রহ) থেকে শুনেছি। হযরত হাসান বিন দীনার (রহ) তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, হে আবু সাঈদ! আল্লাহ তাআলা যে ফেরেশতাদেরকে বলেছেন  وَأعلم مَا تبدون وَمَا كُنْتُم تكتمون তার অর্থ কি, ফেরেশতরা কোন বিষয়টি গোপন করেছিলেন? হাসান বসরী (রহ) বললেন, আল্লাহ তাআলা যখন হযরত আদম (আ) কে সৃষ্টি করলেন আর ফেরেশতারা এক আজব মাখলুক দেখল, তখন তাদের স্মৃতিতে কিছু চিন্তা আসল, যা তারা পরস্পর আলোচনা করলেন। কেউ বলল, তোমরা ঐ মাখলুকের ব্যাপারে এত পেরেশান হচ্ছ কেন, আল্লাহ তাআলা আমাদের চাইতে বেশী সম্মানিত কোন মাখলুক সৃষ্টি করবেন না। এ বিষয়টিই যা তারা গোপন করেছিল।

চলবে ইনশাআল্লাহ

وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ (34)

৩৪. আর যখন আমি আদম-কে সিজদা করার জন্য ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিলাম, তখন ইবলীস ব্যতীত সবাই সিজদা করল। সে অস্বীকার করল এবং অহংকার প্রদর্শন করল। ফলে সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।

ইমাম ইবনে আবি হাতিম হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে اسجدوا لآدَم এর তাফসীর বর্ণনা করেন যে-

كَانَت السَّجْدَة لآدَم وَالطَّاعَة لله

সিজদা ছিল আদম (আ) এর জন্য আর আনুগত্য ছিল আল্লাহর।

ইমাম ইবনে আবি হাতিম হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে এই আয়াতের তাফসীর বর্ণনা করেন যে-

أَمرهم أَن يسجدوا فسجدوا لَهُ كَرَامَة من الله أكْرم بهَا آدم

 আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে সিজদা করার নির্দেশ দিয়েছেন আর তারা আদম (আ)-কে সিজদা করেছেন এই বিশেষত্বের জন্য, যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা আদম (আ) কে সম্মানিত করেছেন।

ইমাম ইবনে আসাকির আবু ইবরাহিম আল মুযানী থেকে বর্ণনা করেন যে, তাকে ফেরেশতাদের আদম (আ)-কে সিজদার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হল। তখন তিনি বললেন-

إِن الله جعل آدم كالكعبة

আল্লাহ তাআলা আদম (আ)-কে ফেরেশতাদের সিজদার জন্য কাবার মত করেছিলেন।

ইমাম আবুশ শায়খ আল আযমায় মুহাম্মদ ইবনে উব্বাদ ইবনে জাফর আল মাখযূমী থেকে বর্ণনা করেন-

كَانَ سُجُود الْمَلَائِكَة لآدَم إِيمَاء

ফেরেশতাদের আদম (আ) কে সিজদা করা ইশারার সাথে ছিল।

ইমাম ইবনে আবি হাতিম এবং আবুশ শায়খ হযরত যামরাহ থেকে বর্ণনা করেন- আল্লাহ তাআলা যখন ফেরেশতাদেরকে সিজদা করার নির্দেশ দিলেন, তখন সবার আগে হযরত ইসরাফিল (আ) সিজদা করেন। এর প্রতিদান স্বরুপ আল্লাহ তাআলা তার কপালে সম্পূর্ণ কুরআন লিখে দেন।

ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া মাকায়িদুশ শয়তান-এ, ইবনে আবি হাতিম, ইবনুল আম্বারী কিতাবুল আযদাদ-এ এবং বায়হাকী শুআবুল ইমানে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে-

كَانَ إِبْلِيس اسْمه عزازيل وَكَانَ من أشرف الْمَلَائِكَة من ذَوي الأجنحة الْأَرْبَعَة ثمَّ أبلس بعد

 ইবলিসের নাম ছিল আযাযিল। সে ছিল চার ডানাওয়ালা সম্মানিত ফেরেশতাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত। কিন্তু পরে সে ইবলিস হয়ে যায়।

   ইমাম ইবনে জারির, ইবনুল মুনযির, ইবনে আবি হাতিম এবং ইবনুল আম্বারী হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে-

إِنَّمَا سمي إِبْلِيس لِأَن الله أبلسه من الْخَيْر كُله آيسه مِنْهُ

 ইবলিসকে এজন্য ইবলিস (নিরাশ) বলা হয় যে, আল্লাহ তাআলা তাকে সকল কল্যাণ থেকে নিরাশ ও বঞ্চিত করে দিয়েছেন।

ইমাম ইবনে ইসহাক আল মুবতাদায়, ইবনে জারির, ইবনুল মুনযির, হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, ইবলিস গুনাহর সওয়ারীতে উঠার পূর্বে ফেরেশতাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল আর তার নাম ছিল আযাযিল। সে পৃথিবীর দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল। সকল ফেরেশতাদের চেয়ে বেশী ইবাদতগুযার ছিল। অধিক জ্ঞানের অধিকারী ছিল। এ কারণেই তার মধ্যে অহংকার সৃষ্টি হয়েছিল। সে ছিল ফেরেশতাদের ঐ গোত্রের যাদেরকে জ্বিন বলা হত।

  ইমাম ইবনে জারির হযরত সুদ্দি (রহ) থেকে বর্ণনা করেন- كَانَ اسْم إِبْلِيس الْحَرْث ইবলিসের নাম ছিল আল হার্‌স।

ইমাম ওকী, ইবনুল মুনযির, বায়হাকী শুআবুল ইমানে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে-

كَانَ إِبْلِيس من خزان الْجنَّة وَكَانَ يدبر أَمر السَّمَاء الدُّنْيَا

 ইবলি ছিল জান্নাতের রক্ষকদের মধ্য হতে এবং তার উপর ছিল দুনিয়ার ব্যাবস্থাপনার দায়িত্ব।

 ইমাম ইবনে জারির, ইবনে আবি হাতিম হযরত সাঈদ ইবনুল মুসায়িব (রহ) থেকে বর্ণনা করেন-

كَانَ إِبْلِيس رَئِيس مَلَائِكَة سَمَاء الدُّنْيَا

ইবলিস দুনিয়ার আসমানের ফেরেশতাদের সর্দার ছিল।

ইমাম ইবনে আবি হাতিম মুহাম্মদ বিন আমির আল মাক্কী থেকে বর্ণনা করেন-

خلق الله الْمَلَائِكَة من نور وَخلق الجان من نَار وَخلق الْبَهَائِم من مَاء وَخلق آدم من طين فَجعل الطَّاعَة فِي الْمَلَائِكَة وَجعل الْمعْصِيَة فِي الْجِنّ والإِنس

আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে তার নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, জ্বিনদেরকে আগুণ দ্বারা, চতুষ্পদ জন্তুকে পানি দ্বারা এবং আদমকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর ফেরেশতাদের মধ্যে আনুগত্যের গুণ আর জ্বিন ও মানুষের মধ্যে নাফরমানীর দোষ রেখে দিয়েছেন।

ইমাম মুহাম্মদ ইবনে নসর হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন-

إِن الله أَمر آدم بِالسُّجُود فَسجدَ فَقَالَ: لَك الْجنَّة وَلمن سجد من ذريتك وَأمر إِبْلِيس بِالسُّجُود فَأبى أَن يسْجد فَقَالَ: لَك النَّار وَلمن أَبى من ولدك أَن يسْجد

 আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ)-কে সিজদা করার আদেশ করলে তিনি সিজদা করেন। আল্লাহ তাআলা বললেন, তুমি ও তোমার সন্তানদের মধ্যে যারাই (আমাকে) সিজদা করবে, তার জন্য জান্নাত। আর আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে সিজদা করার নির্দেশ দিলে ইবলিস তা অস্বীকার করে। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, তুই ও তোর সন্তানদের মধ্যে যারাই সিজদা করতে অস্বীকার করবে তার জন্য জাহান্নাম।

ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ) মাকায়িদুশ শয়তান-এ হযরত উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেন। একবার হযরত মূসা (অ) এর সাথে শয়তান সাক্ষাত করে বলল, হে মূসা! আপনি তো আল্লাহর মনোনীত নবী এবং যখন আপনি তার প্রতি তওবা করেছেন তখন তিনি আপনার সাথে কথা বলেছেন। আমি তওবা করতে চাই। আপনি আল্লাহর নিকট আমার ব্যাপারে সুপারিশ করুন, যেন তিনি আমার তওবা কবুল করেন।

মূসা (আ) বললেন, ঠিক আছে। অতঃপর মুসা (আ) আল্লাহর নিকট দুআ করলেন। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, হে মূসা! তুমি তোমার কাজ করেছ। অতঃপর মূসা (আ) এর সাথে ইবলিসের সাক্ষাত হলে মূসা (আ) বললেন, আমাকে এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তুমি যদি আদম (আ) এর কবরে সিজদা কর, তাহলে তিনি তোমার তওবা কবুল করবেন। তখন ইবলিস দম্ভ ও ক্রোধসহকারে বলল, তার জীবনকালে আমি তাকে সিজদা করিনি, এখন তার মৃত্যুর পর আমি তাকে সিজদা করব?

অতঃপর ইবলিস বলল, হে মূসা আমার উপর আপনার হক আছে, যেহেতু আপনি আমার জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করেছেন। আপনি আমাকে তিনটি জায়গায় স্মরণ রাখবেন অর্থাৎ সতর্ক থাকবেন। তাহলে আপনি আমার ধ্বংসকারিতা থেকে রক্ষা পাবেন। তা হলো-

যখন আপনার রাগ হবে তখন আমার ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। কেননা আমি আপনার মধ্যে (অর্থাৎ মানুষের মধ্যে) রক্তের মত চলাফেরা করতে পারি।

যুদ্ধের ময়দানে যখন শত্রুর মুখোমুখি হবেন তখন আমার ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। কেননা এ সময় আমি মুজাহিদের কাছে এসে তার স্ত্রী-সন্তানের কথা মনে করিয়ে দেই, যে পর্যন্ত না সে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালায়।

আর না-মাহরাম-পরনারীর সাথে নির্জনে বসা থেকে বেঁচে থাকবেন, কেননা আমি তাদের পরস্পরের মধ্যে ব্যভিচারের দূত হয়ে থাকি।

ইমাম ইবনুল মুনযির হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। হযরত নূহ (আ) যখন তার নৌকায় আরোহণ করে তখন ইবলিস এসে হাজির হয়। নূহ (আ) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কে তুমি! সে বলল, ইবলিস। তিনি জিজ্ঞাসা করল, কেন এসেছিস? সে বলতে লাগল, আমি এজন্য এসেছি যে, আপনি আল্লাহকে জিজ্ঞাসা করুন আমার তওবার কোন উপায় আছে কি? আল্লাহ তাআলা হযরত নূহ (আ) এর প্রতি ওহী পাঠালেন- তাকে বল যে, তার তওবার উপায় আছে একটাই। তা হলো আদমের কবরে সিজদা করা। তখন ইবলিস বলল, আমি যাকে তার জীবনকালে সিজদা করিনি, এখন তার মৃত্যুর পর আমি তাকে সিজদা করব? অতএব সে অহংকার করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হলো।

ইমাম ইবনুল মুনযির মুজাহিদ সূত্রে হযরত জুনাদাহ ইবনে আবি উমাইয়া থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-

كَانَ أول خَطِيئَة كَانَت الْحَسَد حسد إِبْلِيس آدم أَن يسْجد لَهُ حِين أَمر فَحَمله الْحَسَد على الْمعْصِيَة

সর্বপ্রথম গুনাহ ছিল হিংসা। ইবলিস আদম (আ) এর প্রতি হিংসা করেছিল। তাকে যখন সিজদা করার হুকুম দেয়া হয়েছিল, ঐ হিংসাই তাকে গুনাহর দিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

ইমাম ইবনে আবি হাতিম মুহাম্মদ ইবনে কাব আল কুরুযী থেকে বর্ণনা করেন-

ابْتَدَأَ الله خلق إِبْلِيس على الْكفْر والضلالة وَعمل بِعَمَل الْمَلَائِكَة فصيره إِلَى مَا بدىء إِلَيْهِ خلقه من الْكفْر قَالَ الله {وَكَانَ من الْكَافرين}

 আল্লাহ তাআলা ইবলিসের সৃষ্টির সূচনা গুমরাহী ও পথভ্রষ্টতার উপর করেছেন। পরবর্তীতে সে ফেরেশতাদের মত আমল করতে থাকে অতঃপর সে তার মূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন- وَكَانَ من الْكَافرين সে ছিল কাফিরদের মধ্য হতে।

ইমাম ইবনুল মুনযির হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে এই আয়াত وَكَانَ من الْكَافرين প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-

جعله الله كَافِرًا لَا يَسْتَطِيع أَن يُؤمن

আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে কাফির হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। তার মধ্যে ইমান কবুল করার যোগ্যতা ছিল না।

চলবে ইনশাআল্লাহ

وَقُلْنَا يَا آَدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ (35)

৩৫.আর আমি আদমকে নির্দেশ দিলাম যে, তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর। আর সেখানে যা চাও, যেখান থেকে চাও স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে আহার কর। তবে এই গাছের নিকটবর্তী হয়ো না। তাহলে তোমরা সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বে।

ইমাম তাবরানী, আবুশ শায়খ আল আযমায়, ইবনে মারদুবিয়া হযরত আবু যার (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি মনে করেন যে, আদম (আ) নবী ছিলেন? তিনি (সা) বললেন, হ্যা। তিনি নবী ও রাসূল ছিলেন আর আল্লাহ তাআলা তার সাথে সরাসরি কথা বলেছেন। আল্লাহ বলেছেন- يَا آدم اسكن أَنْت وزوجك الْجنَّة   হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর।

ইমাম ইবনে আবি শাইবাহ এবং তাবরানী হযরত আবু যার (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! প্রথম নবী কে ছিলেন, তিনি (সা) বললেন, আদম (আ)। জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি কি নবী ছিলেন? তিনি (সা) বললেন- হ্যাঁ, আল্লাহ তার সাথে কথা বলেছেন। জিজ্ঞাসা করলাম, তারপর কে নবী ছিলেন? তিনি বললেন-   نوح وَبَينهمَا عشرَة آبَاء নূহ (আ)। আর তাদের মাঝে দশ আবা (প্রজন্ম) ব্যবধান ছিল।

ইমাম আব্দ ইবনে হুমায়দ এবং আল আযরী আরবাঈনে হযরত আবু যার (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আরয করলাম ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই রাসূলদের মধ্যে প্রথম রাসূল কে ছিলেন? তিনি বললেন, আদম (আ)। আমি বললাম, তিনি রাসূল নবী ছিলেন? তিনি (সা) বললেন- হ্যাঁ।

خلقه الله بِيَدِهِ وَنفخ فِيهِ من روحه وسواه قبلا

আল্লাহ তাআলা তাকে নিজ কুদরতী হাত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, তার রূহ ফুকে দিয়েছেন অতঃপর তাকে সুগঠিত করেছেন।

ইমাম ইবনে আবি হাতিম, ইবনে হিব্বান, তাবরানী, হাকীম এবং বায়হাকী আল আসমা ওয়াস সিফাতে হযরত আবু উমামা বাহিলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আদম (আ) কি নবী ছিলেন? তিনি (সা) বলনে, হ্যা। আল্লাহ তাআলা তার সাথে কথা বলেছেন।

জিজ্ঞাসা করলেন, আদম (আ) ও নূহ (আ) এর মধ্যে কত সময়ের ব্যবধান ছিল? তিনি (সা) বললেন, দশ প্রজন্ম। অত:পর জিজ্ঞাসা করলেন, নূহ (আ) এবং ইবরাহিম (আ) এর মধ্যে কত সময়ের ব্যবধান ছিল? তিনি (সা) বললেন, দশ প্রজন্ম। অত:পর জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! নবী কতজন ছিলেন? তিনি (সা) বললেন, এক লক্ষ চব্বিশ হাজার। অত:পর জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাদের মধ্যে রাসূল কতজন ছিলেন? তিনি (সা) বললেন, তিনশত পনর জনের বড় এক জামাত।

ইমাম ইবনে আবিদ দুনইয়া (রহ) কিতাবুশ শোকর এ, হাকীম তিরমিযী নাওয়াদিরুল উসূলে, বায়হাকী শুআবুল ইমানে, ইবনে আসাকির তার ইতিহাসে হযরত হাসান বসরী (রহ) থেকে বর্ণনা করেন। মূসা (আ) জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রব! আদম আপনার শুকরিয়া কিভাবে আদায় করবে, আপনি তাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে আপনার রূহ ফুকে দিয়েছেন, তাকে জান্নাতে বসবাস করিয়েছেন, ফেরেশতাদের দিয়ে সিজদা করিয়েছেন?

আল্লাহ তাআলা বললেন,

يَا مُوسَى، عَلِمَ أَنَّ ذَلِكَ مِنِّي فَحَمِدَنِي، فَكَانَ ذَلِكَ شُكْرًا لِمَا صَنَعْتُهُ لَهُ

হে মূসা! যদি সে এটা জেনে নেয় যে, এইসব অনুগ্রহ আমার পক্ষ থেকে অতঃপর এর জন্যে আমার প্রশংসা করে, তবে এটাই হবে আমার প্রতি তার কৃতজ্ঞতা আদায়।

ইমাম ইবনে আবি হাতিম হযরত আবুল আলিয়া (রহ) থেকে বর্ণনা করেন-

خلق الله آدم يَوْم الْجُمُعَة وَأدْخلهُ الْجنَّة يَوْم الْجُمُعَة فَجعله فِي جنَّات الفردوس

আদম (আ) কে জুমার দিনে সৃষ্টি করা হয়েছে, জুমার দিনে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসে রাখা হয়েছে।

ইমাম আব্দ ইবনে হুমায়দ এবং হাকিম হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে,

مَا سكن آدم الْجنَّة إِلَّا مابين صَلَاة الْعَصْر إِلَى غرُوب الشَّمْس

জান্নাতে আদম (আ) আসরের সময় থেকে নিয়ে মাগরিব পর্যন্ত সময় অবস্থান করেছিলেন।

ইমাম ফিরইয়াবী, আহমদ আয যুহুদে, আব্দ ইবনে হুমায়দ এবং ইবনুল মুনযির হযরত হাসান থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আদম (আ) জান্নাতে দিনের কিছু সময় অতিবাহিত করেছেন আর এটা ছিল দুনিয়ার দিনের হিসাবে একশত তিন বৎসর।

[অপর এক ভিন্ন বর্ণনায় ২৫০ বৎসর]

أما قَوْله تَعَالَى: {وزوجك}

আল্লাহ তাআলার বাণীঃ (তুমি ও) তোমার স্ত্রী (জান্নাতে বসবাস কর)

ইমাম ইবনে জারির, ইবনে আবি হাতিম, বায়হাকী আল আসমা ওয়াস সিফাতে এবং ইবনে আসাকির কতক সাহাবা থেকে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ তাআলা যখন জান্নাতে আদম (আ) কে সৃষ্টি করলেন, তখন আদম (আ) জান্নাতে ঘোরাফেরা করার সময় নিঃসঙ্গতা অনুভব করেন। তার কোন সঙ্গী ছিল না, যার সাথে তিনি ভালবাসা ও অন্তরঙ্গতা প্রকাশ করবেন। অতঃপর তিনি শুয়ে পড়েন। ঘুম থেকে জেগে দেখেন যে, তার পাশে একজন নারী বসা যাকে আল্লাহ তাআলা তার পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কে? সে বলল, নারী।  তিনি বললেন, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? সে বলল, যাতে আপনি আমার থেকে শান্তি লাভ করতে পারেন।

ফেরেশতারা বলল, হে আদম! এই নারীর নাম কি? তিনি বললেন, হাওয়া। এই প্রশ্ন ফেরেশতারা তার জ্ঞান-বুদ্ধি পরখ করার জন্য করেছিল। ফেরেশতারা বলল, তার নাম হাওয়া কেন রাখা হয়েছে? তিনি বললেন, যেহেতু তাকে জীবিত মানুষ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-  يَا آدم اسكن أَنْت وزوجك الْجنَّة     হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর।

ইমাম বুখারী ও মুসলিম হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ، فَإِنَّ المَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِي الضِّلَعِ أَعْلاَهُ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ، فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ

তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যহার করবে। কেননা, তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে পাঁজরের হাড় থেকে এবং সবচেয়ে বাঁকা হচ্ছে পাঁজরের ওপরের হাড়। যদি তুমি তা সোজা করতে যাও, তাহলে ভেঙে যাবে। আর যদি তুমি তা যেভাবে আছে সে ভাবে রেখে দাও তাহলে বাঁকাই থকবে। অতএব, তোমাদেরকে ওসীয়াত করা হলো, তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যহার করবে।

হযরত ইবনে সাদ এবং ইবনে আসাকির হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে-

إِنَّمَا سميت حَوَّاء لِأَنَّهَا أم كل حَيّ

 হযরত হাওয়া (আ) এর নাম হাওয়া এজন্য রাখা হয়েছে যে, তিনি সকল জীবিত মানুষের মা।

ইমাম আবুশ শায়খ এবং ইবনে আসাকির অপর পদ্ধতীতে বর্ণনা করেন যে, মহীলাদরেকে مرأة (মহীলা) এজন্য বলা হয় যে, তাকে الْمَرْء (পুরুষ) থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর হাওয়া বলা হয় এজন্য যে, তিনি প্রত্যেক জীবিত মানুষের মা।

ইমাম ইবনে আবি হাতিম হযরত আশআস হাদানী থেকে বর্ণনা করেন যে,

كَانَت حَوَّاء من نسَاء الْجنَّة وَكَانَ الْوَلَد يرى فِي بَطنهَا إِذا حملت ذكر أم أُنْثَى من صفاتها

হযরত হাওয়া (আ) জান্নাতী নারীদের মধ্য হতে। যখন তিনি ছেলে অথবা মেয়ে বাচ্চার দ্বারা গর্ভবতী হতেন, তথন বাচ্চা তার পেটে দৃষ্টিগোচর হত।

ইমাম ইবনে আদি এবং ইবনে আসাকির হযরত ইবরাহিম নাখয়ী (রহ) থেকে বর্ণনা করেন। যখন আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ) কে সৃষ্টি করেন তখন তার জন্য তার স্ত্রীকেও সৃষ্টি করেন। অতঃপর ফেরেশতা প্রেরণ করে এই নির্দেশ দিলেন যে, তারা যেন সহবাস করে। আদম (আ) স্ত্রী-সহবাস করলেন। যখন সহবাস শেষ করলেন, তখন হাওয়া (আ) বললেন, হে আদম! এটা পবিত্র (কাজ), আমরা এর মধ্যে বৃদ্ধি করব।

أما قَوْله تَعَالَى {وكلا مِنْهَا رغداً}

আল্লাহ তাআলার বাণীঃ (আর সেখানে যা চাওযেখান থেকে চাও) স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে তা আহারকর

ইমাম ইবনে জারির এবং ইবনে আসাকির হযরত ইবনে মাসউদ এবং আরো অন্যান্য সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন যে, الرغد  অর্থ হলো الهنيّ স্বাচ্ছন্দ্য।

ইমাম ইবনে জারির এবং ইবনে আবি হাতিম হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। এর অর্থ হলোسَعَة العيشة    প্রশস্ত জীবিকা।

ইমাম ইবনে জারির এবং ইবনে আবি হাতিম মুজাহিদ (রহ) থেকে বর্ণনা করেন।وكلا مِنْهَا رغداً حَيْثُ شئتما   এর অর্থ হলো لَا حِسَاب عَلَيْكُم  তোমাদের উপর কোন হিসাব নাই, যখন যেভাবে যেখার থেকে ইচ্ছা স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে আহার কর।

أما قَوْله تَعَالَى: {وَلَا تقربا هَذِه الشَّجَرَة}

আল্লাহ তাআলার বাণী: আর তোমরা ঐ গাছের নিকটবর্তী হয়ো না

ইমাম ইবনে জারির ইবনুল মুনযির, ইবনে আবি হাতিম, আবুশ শায়খ এবং ইবনে আসাকির (রহ) কতক পদ্ধতিতে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

الشَّجَرَة الَّتِي نهى الله عَنْهَا آدم السنبلة

যে বৃক্ষ থেকে আল্লাহ আদম (আ) কে নিষেধ করেছেন, তা হলো গন্দম বৃক্ষ।

ইমাম ইবনে জারির এবং ইবনে আবি হাতিম হযরত ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ (রহ) থেকে বর্ণনা করেন,

الشَّجَرَة الَّتِي نهى الله عَنْهَا آدم الْبر وَلَكِن الْحبَّة مِنْهَا فِي الْجنَّة كمكلي الْبَقر أَلين من الزّبد وَأحلى من الْعَسَل

 যে বৃক্ষ থেকে আল্লাহ আদম (আ) কে নিষেধ করেছেন, তা হলো গন্দম বৃক্ষ, তবে জান্নাতের ঐ বৃক্ষের দানা গাভীর গুর্দার সমান, মাখন থেকেও বেশী নরম এবং মধুর থেকেও বেশী মিষ্ট।

ইমাম আব্দ ইবনে হুমায়দ, ইবনে জারির, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতিম হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, আদম (আ) কে যে গাছ থেকে নিষেধ করা হয়েছিল, তা ছিলالْكَرم   আঙ্গুর গাছ।

ইমাম ওকী, ইবনে সাদ, ইবনে জারির এবং আবুশ শায়খ (রহ) হযরত জা’দাহ বিন হুবায়রাহ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

لشَّجَرَة الَّتِي افْتتن بهَا آدم الْكَرم وَجعلت فتْنَة لوَلَده من بعده وَالَّتِي أكل مِنْهَا آدم الْعِنَب

আদম (আ) কে যেই গাছের ফলের জন্য ফিতনা (পরীক্ষায়) ফেলা হয়েছিল, তা ছিল আঙ্গুর গাছ। আর তারপরে তার সন্তানদের জন্যও এটা (আঙ্গুর দ্বারা তৈরী মদ) ফিতনার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। আদম (আ) যা খেয়েছিলেন তা ছিল আঙ্গুর।

ইমাম ইবনে জারির হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, هِيَ اللوز  তা ছিল বাদাম।

ইমাম আবুশ শায়খ (রহ) হযরত মুজাহিদ (রহ) থেকে বর্ণনা করেন যে,

بَلغنِي أَنَّهَا التينة

আমার নিকট বর্ণনা পৌছেছে যে, তা ছিল ডুমুর গাছ।

ইবনে আবি হাতিম, আবুশ শায়খ হযরত আবু মালিক থেকে বর্ণনা করেন যে,  هِيَ النَّخْلَة তা ছিল খেজুর গাছ।

আবুশ শায়খ ইয়াযিদ ইবনে আব্দুল্লাহ কুসায়ত্ব থেকে বর্ণনা করেন যে,هِيَ الأترج  তা ছিল লেবু গাছ।

ইমাম ইবনে আবি হাতিম এবং আবুশ শায়খ আবুল আলিয়া (রহ) থেকে বর্ণনা করেন যে,

كَانَت الشَّجَرَة من أكل مِنْهَا أحدث ولاينبغي أَن يكون فِي الْجنَّة حدث

তা ছিল এমন গাছ যে, কেউ তার ফল খেলে হাদাস- বায়ু নিঃসরণ বা প্রস্রাব পায়খানার প্রয়োজন দেখা দেয়। আর জান্নাতে তা সম্ভব না।

চলবে ইনশাআল্লাহ