কিতাবঃ প্রথম পরিবার [অধ্যায় ১-১০] [লেখকঃ মামুনুর রশীদ] | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

বই ""প্রথম পরিবার"""

লেখকঃমোহাম্মদ মামুনুর রশীদ

Text : ফাতিমাতুজ যাহরা শাকিলা



*একঃ

শেষ হয়ে গেলো আনন্দের আলোকিত অধ্যায় ।


ভেঙে গেলো বেহেশতের বৈভবিত বসবাস। বেহেশত থেকে বহিষ্কৃত হলেন দু'জনই প্রথম মানব । প্রথম মানবী । হজরত আদম । হজরত হাওয়া ।


তারপর অবতরণ । অবরোহন। পতন। যেনো বিরহিনী বেহেশতের দু'চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া দু'টি অশ্রু ধারা ক্রমাগত গড়িয়ে পড়ছে নিচে । আরো নিচে।


নামছেন তারা। অন্তরে অনুতাপের লেলিহান যন্ত্রণা। সমস্ত সন্তা জুড়ে রোদনের সর্বগ্রাসী জলোচ্ছাস। বেহেশতবিচ্যুত অসহায় দুই নরনারী নামছেন।

নামতে বাধ্য হচ্ছেন।


পতনের এই পথপরিক্রমায় একে একে অতিক্রান্ত হচ্ছে আকাশের সকল স্তর ৷অতিক্রান্ত হচ্ছে বিশাল সৃষ্টির বিস্ময়ঘেরা অজস্র পরিধি । আকাশ আসছে একের পর এক। আসছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। দূরে বহুদূরে দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে

একে একে হারিয়ে যাচ্ছে সকল আকাশ।


সপ্তম। যষ্ঠ। পঞ্চম। চতুর্থ। তৃতীয়। দ্বিতীয়। প্রথম। সাতটি আকাশ একে একে পার হয়ে গেলো । তারপর পার হলো নক্ষত্র রাজ্য। নীহারিকা । ছায়াপথ ।


তারপর হঠাৎ আলাদা হতে থাকলেন দুজনে । হজরত আদম আর হজরত হাওয়া-দু'জন দু'জনের কাছ থেকে সরে যেতে থাকলেন।


দুঃখের উপরে দুঃখ । বিপদের উপরে বিপদ ৷ এতোদিনের যুগল জীবনে নেমে এলো প্রথম বিচ্ছেদ । এতোদিন সাথী ছিলো। সুখের সাথী, দুঃখের সাথী । কিন্তু, এ কেমন জীবন এখন । সঙ্গীহীন। সঙ্জিনীবিহীন।


চলছে। বিরতিহীন পতন। অবরোহণ ।


এভাবেই নামতে নামতে নামতে এক সময় পতনের প্রাস্তদেশে এই পৃথিবীতে পা রাখলেন তারা। সৃষ্টির প্রথম নর । প্রথম নারী । দু'জন- দু'জায়গায়।


এভাবেই পৃথিবীতে এলেন আল্লাহতায়ালার প্রথম প্রতিনিধি। এলেন অনুতাপের আগুনে জুলতে জ্বলতে, রোদনের গ্লাবনে ভাসতে ভাসতে । এলেন নিসঃঙ্গ নবী হজরত আদম আ.। এলেন তার হৃদয়ের অপর পিঠ, নিঃশ্বাসের প্রতিধ্বনি- জীবনসঙ্গিনী হজরত হাওয়া আ.। এভাবেই সমাপ্ত হলো আনন্দের সর্বোচ্চ শিখর থেকে বেদনার বিচিত্র অঙ্গনের পথে অভিযাত্রিক প্রথম মানুষের পতনের পর্যায় ।


প্রতিনিয়ত যেনো নিনাদিত হয় শাশ্বত সুন্দর সেই বাণী “নিশ্চয় দুঃখের পরে সুখ... দুঃখের পরে সুখ ।


সামনে কি? কোন অনাগত আমানতের দায়িত্ব বহন করতে হবে এবার কে জানে? অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ । রোদনাক্রান্ত বর্তমান । শুধু অতীত- উজ্জ্বল অতীতের কথা মনে হয় বার বার ।


সেই বেহেশতের কথা। সেই বালাখানা। নহর। সুন্দর অরণ্যানী। সুখ। আনন্দ । বেহেশতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ানো । হজরত হাওয়ার নিরবিচ্ছিন্ন সঙ্গসুখ। সাহচর্য। সেই বেহেশত..... সেই বেহেশত....... 


*দুইঃ

দিকচিহৃহীন প্রান্তর । যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু আলো আর আলো। এখানে দিন রাত্রির পরিবর্তন নেই। অন্ধকার নেই। ভয় নেই। ভীতি নেই। শংকা নেই।


এখানে সময়ের বিবর্তন নেই। সময় এখানে স্থির। শাস্ত। বর্তমান।

চিরবর্তমান। সুখ এখানে চিরস্থায়ী । চিরস্তন। এ যে চির আনন্দের আলয়।


এখানে সুষুত্তি নেই তন্দ্রা নেই। নিদ্রা নেই। এখানে একটানা ঢেউ জ্যোতির। জাগরণের ৷ এখানকার আদি-অস্ত জুড়ে শুধু সুখ । শুধু শান্তি ।


মৃত্যুর অস্তিতবও নেই এখানে। জরা নেই। অবসাদ নেই। ক্লান্তি নেই। শ্রান্তি নেই। ক্ষয় নেই। লয় নেই। এখানে শুধু জীবনের অন্তহীন জোয়ার।


এখানকার গৃহ, বৃক্ষ, নির্বারিণী অব্যয়- অক্ষয়। এখানে ভাঙা-গড়া নেই। উ্থান-পতন নেই । নেই সংঘর্ষ, আনন্দের সঙ্গে বেদনার । সুখের সঙ্গে দুঃখের । বৈপরিত্যের বলয় আর দোদুল্যমানতার দ্বন্থ থেকে চিরনিরাপদ এ স্থানের নামই বেহেশত । জান্নাত।


এই বেহেশতেই বসবাস করেন হজরত আদম আ.। আল্লাহপাকের প্রিয় সৃষ্টি । বিশাল বেহেশতের প্রান্তরে বিচরণ করেন তিনি। ইচ্ছা মতো যান এদিকে সেদিকে ঘুরে ঘুরে দেখেন বেহেশতের অফুরস্ত সৌন্দর্যরাজি। দেখেন ইয়াকুত মোতি সোনা রূপা আর আকিক নির্মিত চোখ জুড়ানো মন ভোলানো বালাখানা। দেখেন পত্রপুষ্পশোভিত হাজার বৃক্ষের সারি। দেখেন নহর। নহরের নির্মল স্রোতের নিখুঁত নিপুণ ছন্দ। দেখেন আর প্রশংসা করেন। পবিত্রতা আর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেন সেই আল্লাহ্‌র, যিনি ইচ্ছা করলেই সৃষ্টি চলে আসে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিতে। শূন্যতা থেকে পূর্ণতায়। যিনি বলেন “হও'- সাথে সাথেই সব কিছু হয়ে

যায়। শক্তি তার কি অসীম, অনস্ত। পরিকল্পনা তার কি নির্ভল, নিখুঁত। উদ্দেশ্য তার কি মহৎ, সুন্দর ।


তিনিই সৃষ্টি করেছেন সকল কিছু । এই বেহেশত এই বালাখানা । এই নির্বার। তিনিই সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য ফেরেশতা, অগণিত জীবন, দৃশ্য অদৃশ্য আরো কতো কিছু। কে দেখেছে বিশাল এই সৃষ্টির পূর্ণ রূপ। সঠিক সীমানা ।


ছিলো একসময়- যখন কিছুই ছিলো না। না ছিলো আকাশ। না ছিলো জমিন। না বেহেশত, নহর, বালাখানা । তখন তিনিই ছিলেন কেবল । যেমন এখন আছেন। যেমন সব সময় থাকবেন। তিনি ছিলেন একমাত্র অস্তিতু। বাকী সব শূন্যতা, অনস্তিতৃতা ।


আল্লাহপাক স্থির করলেন এক সময়, তিনি প্রকাশিত হবেন। তিনি নিজের পরিচয় দান করবেন এমন এক সৃষ্টির কাছে যাকে তিনিই সৃষ্টি করবেন। আর তার জন্যই সৃষ্টি করবেন বিশাল বিশ্ববহ্ষাণ্ড। তাতে থাকবে রহস্যের শত সহস্ব আবরণ । থাকবে বিস্ময়ের সীমাহীন বিবর্তন। থাকবে তাঁর শক্তিমত্তা আর কৌশলের অনন্ত

আয়োজন।


আল্লাহ্‌ পাক শুরু করলেন এই বিশাল নিখিল সৃষ্টির কাজ। ধাপে ধাপে এগিয়ে চললো নির্মাণ । নিখুঁত নির্ভুল পরিকল্পনার অনুসরণে এগিয়ে চললো সৃজনের বিপুল বিকাশ।


অতুলনীয় অস্তিত্ব তার। তেমনি অপরিমেয় কুদরত, শক্তিমত্তা। তার হুকুমে অনস্তিতু রূপ নেয় অস্তিতে। শুন্যতা আকার নেয় পর্ণতায়।


তিনি বললেন “হও' ৷ অমনি হয়ে গেলো সমস্ত সৃষ্টির সমষ্টিভূত এক আকার। সে সমষ্টিতে মিশে ছিলো আকাশ জমিনের সকল সৃষ্টির অস্তিত্ব একাকার হয়ে। এরপর আল্লাহপাক পৃথক করলেন সৃষ্টিকে । একটি থেকে অন্যটির অস্তিত্ব করে তুললেন স্বাতন্ত্যশোভিত।


রহস্যজগত, জড়জগত, আকাশের সাতটি স্তর, পৃথিবী- সব কিছু সরে যেতে থাকলো নিজ নিজ অবস্থানের দিকে। সাজিয়ে দিলেন আকাশকে এক এক করে সাতটি স্তরে। প্রথম আকাশ শোভিত হলো সূর্যের দীপ্তিতে, চন্দ্রের আভায়। নক্ষত্রেরা নিলো নয়নশোভিত রূপ । রহস্যের রূপ নিলো নীহারিকা, ছায়াপথ ।


পৃথিবী পরিপূর্ণ হলো পানিতে । সে পানিতে সৃষ্টি হলো অশান্ত তরঙ্গ বিরতিহীন তরঙ্গাভিঘাতে সৃষ্টি হলো ফেনা । ফেনার বিশাল স্তর জমাট বাধতে শুরু করলো । এভাবে জমাট বেঁধে তৈরী হলো জমিন। সে জমিন কাপতে থাকলো থর থর করে।


আল্লাহপাক তখন সৃষ্টি করলেন পাহাড় পর্বত। বসিয়ে দিলেন সেগুলোকে জমিনের উপর । স্থির হয়ে গেলো পৃথিবী । পৃথিবীর মাটি ।


এরপর ধীরে ধীরে বিকশিত হতে লাগলো পৃথিবীর রূপ। সৃষ্টি হলো নদী নালা। সৃষ্টি হলো বনরাজী। মেঘে মেঘে ছেয়ে গেলো আকাশ । বৃষ্টি হলো। জন্ম নিলো বৃক্ষরাজি, লতাগুল্মু। ফুটে উঠলো ফুল। ছুটে এলো ভ্রমর প্রজাপতি । উড়ে এলো পাখির ঝাঁক। উঠলো কুজন, পাখির। জাগলো আওয়াজ, ঝিল্লীর। হাজার হাজার প্রজাতির প্রাণীর । কীট পতঙ্গের। মাছের। সকল প্রাণী আল্লাহ্ পাক সৃষ্টি করলেন পানি থেকে।


আল্লাহ্তায়ালা বিনা খুঁটিতে ঝুলিয়ে রাখলেন আকাশকে । চন্দরসূর্য গ্রহ তারার জন্য নির্দিষ্ট করে দিলেন কক্ষপথ । হুকুম মতো তারা পরিক্রমণ করতে লাগলো নিজ নিজ কক্ষপথ । নির্দিষ্ট সময় মতো । নির্ধারিত বিধান মতো ।


স্তরে স্তরে সাতটি আকাশ সাজিয়ে সপ্তম আকাশের উপরে সৃষ্টি করলেন বেহেশত । সাত স্তর পৃথিবীর সর্বনিম্ স্তরে সৃষ্টি করলেন দোজখ ।


বেহেশতের উপরে স্থাপন করলেন তাঁর সীমাহীন পরাক্রমের প্রতীকম্বরূপ আরশে আজীম। আরশের উপরের স্তরে স্থাপন করলেন রূহের জগত। তারপর সমাসীন হলেন আরশে আজীমে, যেমন সমাসীন হওয়া তাঁর সম্মানের উপযোগী । এ অবস্থা ধারণার সীমানায় আসা অসম্ভব ।


'হও' বললেই সব কিছু হয়ে যায়। অথচ আল্লাহতায়ালা বিশাল সৃষ্টির এই সুন্দর বিন্যাসে ব্যয় করলেন ছয়দিন। ছয়দিন পর তিনি সমাসীন হলেন আরশে।


না। বিশ্রামের জন্য নয়। তিনি তো এমনই সত্তা, ক্লান্তি ধাকে স্পর্শ করবার অধিকার রাখে না। বরং তিনি আরশে সমাসীন হলেন এজন্যে যে, এই বিশাল সৃষ্টির ক্রম-বিবর্তন এখন থেকে পরিচালিত হবে এই আরশ আজীমকে কেন্দ্র করে । আরশে আজীম সেই কুদরতেরই কেন্দ্রবিন্দু


আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি করলেন ফেরেশতা । অগণিত। অসংখ্য । বিভিন্ন নির্দেশ দিলেন তাঁদেরকে । নিখুঁত নির্ভুলভাবে নির্দেশ পালনে রত হলেন তারা ।


আল্লাহপাক কর্তৃক নির্ধারিত নিয়মে তাঁরা শুর করলেন ইবাদত। আকাশ জমিন এবং সকল সৃষ্ট প্রাণী_ শুরু করলো নিরবচ্ছিন্ন জিকির । নিজ নিজ ভাষায়, অবস্থায় সকল সৃষ্টি নিমগ্ন হলো আল্লাহতায়ালার বিরতিহীন জিকিরে। এই জিকিরের বরকতেই সৃষ্টিকুল রক্ষা করে চললো তাদের অস্তিতৃ, বংশবিস্তার, বিবর্তন।


এভাবে কতোদিন কাটলো কে জানে। এক সময় আল্লাহ্তায়ালা সৃষ্টি করলেন নতুন এক সম্প্রদায়কে । তাদেরকে সৃষ্টি করলেন তিনি ধোয়া বিবর্জিত আগুন থেকে । তাদের নামকরণ করা হলো জীন।


এরা হলেন আল্লাহতায়ালার অন্যান্য সকল সৃষ্টি থেকে একটু ভিন্ন প্রকৃতির ।আল্লাহ্তায়ালার অন্যান্য সৃষ্টির মধ্যে তীর হুকুমের বিরোধিতা করবার শক্তি নেই। কিন্তু, জ্বীনের মধ্যে দেয়া হলো সেই শক্তি। দেয়া হলো জ্ঞান। বলা হলো জ্ঞানের চাহিদা অনুযায়ী একথা সর্ববাদী সত্য যে, সৃষ্টিকর্তার ইবাদত সকল সৃষ্টির জন্য ফরজ (অপরিহার্য কর্তব্য)। অতএব বিরুদ্ধ প্রবৃত্তির নিকট মাথা নত না করে আল্লাহ্‌র ইবাদত করতেই হবে। এই কর্তব্যে অটল থাকতে হবে সব সময়। না হলে আল্লাহতায়ালার অসস্তুষ্টি আর আজাব থেকে কারো নিস্তার নেই।


*তিনঃ

জ্বীন সম্প্রদায়কে পৃথিবীতে পাঠালেন আল্লাহতায়ালা । নির্ধারণ করে দিলেন, এই পৃথিবীতেই চলতে থাকবে তাদের জীবন ধারা, বংশবিস্তার । পৃথিবীর সম্পদ সৌন্দর্য সবকিছুই উপভোগ করতে পারবে তারা । কিস্তু এ কারণে আল্লাহতায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। ইবাদত করতে হবে তার। আর সেই সঙ্গে রক্ষা করতে হবে পারস্পরিক সম্প্রীতি, শৃঙ্খলা । শাস্তির সীমানা রক্ষা করে চলতে হবে সবাইকে ।


জ্বীন সম্প্রদায় মেনে নিলো সবকিছু । ক্রমে ক্রমে বংশবিস্তার ঘটলো তাদের । পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অংশ ভরে গেলো জ্বীন।


শান্তির সঙ্গেই বসবাস করছিলো তারা । কিন্তু, ধীরে ধীরে দেখা দিলো মতবিরোধ, অসহিষ্ণুতা। একে অপরের প্রতিদ্বন্থী হয়ে উঠলো জ্বীনেরা। শান্তির আহ্বান কানেই ঢুকলোনা তাদের ৷ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব আর কৃতিত্ প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো তারা । শুরু হলো কলহ, বিবাদ, মারামারি, খুনাখুনি।


আগুনের তৈরী সবাই। আগুনের মতোই উদ্ধত স্বভাব জীনদের । আপোষ মীমাংসার প্রতি মোটেও আকর্ষণ নেই তাদের । ফেতনা ফাসাদই যেনো তাদের একমাত্র কামনা ।


এরকম অবস্থায় আল্লাহতায়ালা তাদের জন্য নির্ধারণ করলেন শাস্তি। শাস্তির সীমানা লংঘনের শাস্তি দেয়ার জন্য পৃথিবীতে ফেরেশতাদের এক বিশাল বাহিনী পাঠালেন আল্লাহপাক। ফেনা সৃষ্টিকারী সকল জ্বীনকে শাস্তি দিতে লাগলেন তারা । যাকে সামনে পাওয়া গেলো তাকেই হত্যা করা হলো ।প্রহারে প্রহারে

পর্যুদস্ত করে ফেলা হলো। যারা পালাতে পারলো তাদেরও পশ্চাদ্ধাবন করে গভীর দুর্গম জঙ্গলের দিকে তাড়িয়ে দেয়া হলো। এভাবে পালিয়ে বাচলো কেউ কেউ। বসবাস উপযোগী স্থানে পড়ে রইলো পাপিষ্ঠ জ্বীনদের অসংখ্য লাশ।


ফেরেশতাদের নজরে পড়লো হঠাৎ একটি শিশু- একেবারেই কচি শিশু একস্থানে বসে কীদছে। পালাতে পারেনি সে। ফেরেশতারা দেখলেন, জীন শিশুটি কী সুন্দর। দেখলে মায়া হয়। শিশুটিকে কোলে তুলে নিলেন তারা । তাকে আদর করলেন। তারপর যখন আসমানে ফিরে গেলেন সবাই, তখন শিশুটিকেও নিয়ে গেলেন আসমানে । সেখানে ফেরেশতাদের মধ্যে ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলো সে। এই জ্বীন শিশুটির নাম ইবলিস।


ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলো ইবলিস। ইবলিস যদিও জ্বীন কিন্তু

ফেরেশতাদের মধ্যে লালিত পালিত হওয়ার কারণে স্বভাব চরিত্র তার হলো ফেরেশতাদেরই মতো । ফেরেশতাদের মতোই সে সারাক্ষণ ইবাদত বন্দেগীতে সময় কাটাতে লাগলো ।


এভাবে হাজার হাজার বৎসর ইবাদত করলো সে। আল্লাহপাক ইবাদতের কারণে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিলেন। সে হয়ে গেলো ফেরেশতাদের নেতা । হয়ে গেলো ফেরেশতাদের শিক্ষক। জমিন ও আকাশের সকল স্থানে সে আল্লাহ্পাকের ইবাদত করলো । সকল স্থানে সেজদা করলো ।


এভাবে গত হয়ে গেলো হাজার হাজার বৎসর ৷ তারপর একদিন-


*চারঃ

পৃথিবীতে প্রতিনিধি প্রেরণ করবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন আল্লাহ্‌ পাক। স্থির কররেন, পৃথিবীতে প্রতিনিধি হিসাবে প্রেরণ করবেন তিনি নতুন এক সৃষ্টিকে । তার নাম হবে আদম।


জ্বীন নয়। ফেরেশতা নয়। মাটির পৃথিবীর জন্য প্রয়োজন মাটির তৈরী মানুষের ।


আল্লাহপাক ফেরেশতাদের সমাবেশ ডাকলেন। তাদের সমানে ঘোষণা করলেন, “আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি প্রেরণ করতে চাই।”


ফেরেশতাদের তখন মনে পড়ে গেলো জ্বীনদের কথা । তারাও প্রতিনিধিত লাভ করেছিলো পৃথিবীর। তারপর শুরু করেছিলো কী রকম অন্যায় আচরণ । শুরু করেছিলো অশান্তি হানাহানি রক্তপাত ।


সেই বিষিত বিশ্বের কথা স্মরণে আসতেই ফেরেশতারা নিবেদন করলেন, "প্রভু পরওয়ারদিগার! আপনি কি দুনিয়ায় এমন কোনো সম্প্রদায় সৃষ্টি করতে চান, যারা সেখানে আবার ঘটাবে অশান্তি, ঘটাবে রক্তপাত। অথচ আমরাই আছি আপনার অনুগত বান্দা। আমরাই তো নিরস্তর আপনার প্রশংসা এবং পবিব্রতা বর্ণনা করছি যেরূপ আপনার নির্দেশ ।”


“আল্লাহতায়ালার অটল সিদ্ধাস্ত ঘোষিত হলো অতঃপর “নিশ্চয় আমিই জানি-যা জানো না তোমরা ।”


ফেরেশতারা নীরব হয়ে গেলেন। আল্লাহ্‌্পাকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত । সত্যিই তিনিই তো জানেন সবকিছু । আদি-অস্ত, প্রকাশ্য-গোপন- সকল কিছুতো তারই জ্ঞানের আওতায় ।


ফেরেশতারা নূরের তৈরী । তাঁরা মাসুম-নিম্পাপ। আল্লাহপাক যা হুকুম করেন, তার বরখেলাপ করার সাধ্য তাঁদের নেই। কিন্তু আল্লাহ্‌ পাকের প্রতিনিধি হবার যোগ্যতা নেই তাদের । প্রতিনিধি তো তাকেই বলে, যে তার প্রতিনিধিত্বের কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন, মুক্ত। তার কাছে থাকতে হবে অমূল্য এক সম্পদ-প্রজ্ঞা, জ্ঞান। আর থাকতে হবে প্রেমময় অভ্তর। বিরুদ্ধ পরিবেশে হবে তার প্রতিনিধিত্রে পরীক্ষা । বিস্মৃতির অন্ধকারে তাকে প্রজ্কলিত রাখতে হবে আল্লাহপাকের স্মরণের অনির্বান জ্যোতিশিখা। প্রেম ও প্রজ্ঞার হবে জয়। চিরবিজায়।


কিন্তু ফেরেশতাদের তো ওসব কিছু নেই। যদিও নূর তারা । যদিও নিষ্পাপ-তবুও প্রেমহীন। প্রজ্ঞাহীন।


প্রজ্ঞার অধিকারী করেছিলেন আল্লাহপাক জ্বীনদেরকে ৷ দিয়েছিলেন পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বও | কিন্তু তারা তো আগুনের তৈরী। আগুনের মতোই উদ্ধত স্বভাব তাদের। তাদের সে উদ্ধত স্বভাবের প্রচণ্ড প্রতাপে তারা নিজেরাই নিভিয়ে দিয়েছিলো আল্লাহতায়ালার প্রধানতম নেয়ামত- প্রজ্ঞার আলো । যোগ্যতার বিচারে ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে তারা ।


তাই পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্রে দায়িত্ব বহনের জন্য এবার আসবে নতুন এক সৃষ্টি। নতুন এক রহস্যময় জীবন। সেখানে আলো আছে। অন্ধকারও আছে। পূণ্য আছে। পাপও আছে। আছে প্রবল বিরুদ্ধ প্রবৃত্তি। আছে বন্ধুর যাত্রা পথ । আছে স্খলন আর পতনের সীমাহীন সুযোগ । সেখানেই প্রকৃত মানুষেরা প্রতিনিধিত্ব করবে অন্য সমস্ত সৃষ্টির । সকল জীবনের ৷ সমস্ত নিসর্ণের। প্রজ্ঞার দিকনির্দেশনা দিয়ে অক্ষয় মনজিলের দিকে এগিয়ে চলবে সে- আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি। সেই বিপুল যোগ্যতা দিয়ে আদম সৃষ্টির পরিকল্পনা করলেন আল্লাহ্ তায়ালা।


*পাঁচঃ

হুকুম হলো, পৃথিবীর সকল স্থান থেকে একটু একটু করে মাটি সংগ্রহ করতে হবে। ফেরেশতারা হুকুম তামিল করলেন। লাল, শাদা, কালো-যতো বর্ণের মাটি আছে পৃথিবীতে, সবধরনের মাটি সংগ্রহ করা হলো। নরম, শক্ত— বিভিন্ন প্রকৃতির মাটি জমা করা হলো। তারপর সকল রঙের সকল প্রকৃতির মাটি পরিণত করা হলো পঁচা কাদায়। বিচিত্র সেই কর্দম ধারণ করলো চটচটে আঠালো রূপ। তারপর শুকিয়ে শক্ত করা হলো সে মাটিকে। পোড়া মাটির মতো সেই মাটি খন্ খন্ করে বাজবার মতো হয়ে গেলো।

তখন সেই মাটিকে আল্লাহ্ পাক তাঁর অসীম কুদরতে আকার দিলেন আদমের। এভাবেই সৃষ্টি হলো আদমের সুন্দর শরীর। সুন্দর, কিন্তু নিষ্প্রাণ। নিঃসাড়।


আল্লাহ্ তায়ালা আদেশ করলেন, ‘হও’। অমনি জীবন্ত হয়ে গেলেন আদম। দেহের সঙ্গে সংযোজিত হলো রূহ— প্রাণ।


এই রূহের ইতিহাস আছে। শুধু আদমের রূহ নয়। সমস্ত আদম সন্তানের রূহ অনেক আগেই সৃষ্টি করে রেখেছিলেন আল্লাহ্ তায়ালা। সে আর এক জগত। সেই জগতের নাম আলমে আরওয়াহ (রূহের জগত)। সেই রূহের জগতে আল্লাহ্ তায়ালা সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেছিলেন তার পেয়ারা হাবীব হযরত মোহাম্মদ

মোস্তফা (সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর রূহ। তারপর সেই রূহ থেকে অনেক রূহ। অসংখ্য রূহ। সমস্ত মানুষের রূহ।


সমস্ত রূহের উদ্দেশ্যে তিনি ঘোষণা করেছিলেন এই কথা, ‘আমি কি তোমাদের প্রভু নই?’ সমস্ত রূহ সমস্বরে জবাব দিয়েছিলো, ‘হাঁ। তুমিই আমাদের প্রভু।’


সেও অনেক আগের কথা। হাজার হাজার বছর আগের কথা। সেই রূহের জগত থেকে হযরত আদম (আঃ) এর দেহে এই প্রথম রূহ সংযোজিত করা হলো এক রহস্যময় কৌশলে। না। দেহের ভিতরে নয়, বাইরেও নয়— এমন এক অবোধ্য নিয়মে রূহ সম্পর্ক স্থাপন করলো সৃষ্টির প্রথম মানুষের শরীরের সঙ্গে। সুকৌশলী আল্লাহ্ পাকের এ এক অসীম কুদরত। জ্ঞান ধারণায় যার সঠিক স্বরূপ বুঝতে পারা কিছুতেই  সম্ভব নয়। শুধু বিস্ময়ের সাথে বিশ্বাস করতে হবে আল্লাহ্ পাকের এই কথাঃ ‘বলে দাও রূহ তার প্রতিপালকের হুকুম।’


উঠে দাঁড়ালেন প্রথম মানুষ। আল্লাহ্ তায়ালার প্রথম প্রতিনিধি। প্রথম খলিফা। আল্লাহ্ তায়ালা হুকুম করলেন তাকে, যাও ফেরেশতাদের কাছে। সালাম দাও তাদেরকে। সালামের জবাব শোনো। এই সালাম প্রতি সালামের বাক্য মনে রেখো। সামনে এমন সময় আসবে যখন তোমার সন্তান সন্তুতিতে ভরে যাবে পৃথিবী। তখন পরস্পরের শান্তি সম্ভাষণের বাক্য হবে আজকের এই সালাম আদান প্রদানের বাক্যাবলী। 


ফেরেশতাদের সমাবেশে হাজির হলেন হযরত আদম (আঃ) বললেন, আস্সালামু আলাইকুম। শান্তি বর্ষিত হোক আপনাদের সকলের প্রতি। সঙ্গে সঙ্গে ফেরেশতারা জবাব দিলেন, ‘ওয়া আলাইকুমুস্ সালামু ওয়া রহমাতুল্লরহ্— আপনার উপরও বর্ষিত হোক শান্তি এবং রহমত।’


আল্লাহ্ তায়ালার প্রতিনিধি সৃষ্টি হবার পর প্রথম বসলো শান্তির অনুষ্ঠান।জানানো হলো হয়তোবা, শান্তি প্রতিষ্ঠাই প্রতিনিধির মূল কাজ। শান্তির সাধনাই প্রতিনিধির প্রধানতম সাধনা।


আল্লাহ্ তায়ালার আদেশে সমাপ্ত হলো শান্তির প্রথম সম্মেলন। সালাম  আর প্রতিসালামের বরকতে সমগ্র সৃষ্টিতে উঠলো শান্তির দোল। সমস্ত সৃষ্টি যেনো এই প্রথম পেলো অভাবিত শান্তির স্বাদ। হযরত আদম যেনো অনুভব করলেন তার সমস্ত শিরায়, পাঁজরের সকল অস্থিতে, অন্তরের প্রতিটি পরতে শান্তির নূরানী তরঙ্গ উথাল পাথাল করছে।


এরপর আল্লাহ্ তায়ালা হযরত আদমকে দান করলেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা। তিনি যেমন সমস্ত মানুষের মধ্যে প্রথম মানুষ, তেমনি জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডারের প্রথম পাঠ শিক্ষা দেওয়া হলো তাকেই। সমস্ত মানবতার শিরোনাম হযরত আদম (আঃ)। তাই তিনি লাভ করলেন সমস্ত জ্ঞানের শিরোনামসম্মত জ্ঞান। সমস্ত সৃষ্টির নাম জানতে পারলেন তিনি। এরপর তাঁরই বংশধরগণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিকশিত হবে এ সমস্ত নামের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ গবেষণা। এ জ্ঞানের সংক্ষিপ্তসারের বাহক তিনি। আর এ জ্ঞানের বিস্তৃতি ফুটে উঠবে আগামী অনাগত মানুষের বংশবিস্তৃতির মাধ্যমে।


ছয়ঃ আদম (আঃ) এর শ্রেষ্ঠত্ব।

হযরত আদমের শ্রেষ্ঠত্ব এই জ্ঞানের কারণেই। ফেরেশতারা নূরের তৈরী, নিষ্পাপ। আল্লাহ্ তায়ালার একান্ত বাধ্যগত বান্দা। কিন্তু তাদেরতো নেই জ্ঞান আহরণের ক্ষমতা। নেই জ্ঞান ধারণের অতিরিক্ত যোগ্যতা।


আল্লাহ্ তায়ালা চাইলেন, হযরত আদমের শ্রেষ্ঠত্ব আর যোগ্যতা সম্পর্কে অবহিত হোক সবাই। আল্লাহ্ তায়ালার এই প্রতিনিধির মর্যাদা স্বীকার করে নিক সকলে।


তাই তিনি আবারো সমবেত করলেন ফেরেশতাদেরকে। সমাবেশ বসলো চতুর্থ আসমানে। এই সমাবেশে ইবলিসও হাজির ছিলো।

আল্লাহ্ তায়ালা সেখানে হাজির করলেন অনেক দ্রব্য সামগ্রী। তারপর ফেরেশতাদের  লক্ষ্য করে এরশাদ করলেন—

 ‘তোমাদের সত্যবাদিতার সমর্থনে প্রমাণ দেখাও। বলো, এ সমস্ত বস্তুর নাম কি? এসবের বিবরণ দাও সংক্ষেপে।’

 

ফেরেশতারা পূর্ণ বিনয়ের সঙ্গে জবাব দিলেন, হে প্রভু পরওয়ারদিগার! পাক পবিত্র আপনি। আমাদেরকে যতটুকু জানিয়েছেন আপনি, তার চেয়ে বেশী কিছু তো আমরা জানি না। নিশ্চয় আপনি সর্ববিষয়ে জ্ঞাত এবং আপনি তো সুকৌশলীও।

তখন আল্লাহ্ আদেশ দিলেন আদমকে, বলে দাও এসবের বিবরণ।


হযরত আদম হুকুম তামিল করলেন। এক এক করে তিনি সমস্ত বস্তুগুলির নাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ বললেন।

আল্লাহ্ তায়ালা তখন বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আকাশ পৃথিবীর সকল প্রকার গোপন তথ্য আমি জানি। তোমরা যা কিছু প্রকাশ করো আর যা কিছু গোপন রাখো— সবই জানা আছে আমার।’


জ্ঞানের এই প্রথম পরীক্ষায় পরাজিত হলেন ফেরেশতারা। তারা সবাই মেনে নিলেন হযরত আদমের শ্রেষ্ঠত্ব। 

সবাই বুঝলেন আল্লাহ্ তায়ালার বাণীই সত্য, চিরসত্য— 

‘ইন্নি আ’লামু মালা তা’লামুন— নিশ্চয় আমি জানি, যা তোমরা জানো না।’


আল্লাহ্ তায়ালা হযরত আদমের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য হুকুম দিলেন সবাইকে। তাদের সঙ্গে ইবলিসের প্রতিও জারী হলো একই হুকুম।

আল্লাহ্ পাক হুকুম  দিলেন, ‘আদমকে কেবলা করে তার সম্মানার্থে সেজদা করো।’ সকল ফেরেশতা হুকুম তামিল করলেন।সবাই সেজদাবনত হলেন হযরত আদমের সামনে। শুধু ইবলিস ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র সে-ই এই প্রথম অমান্য করলো আল্লাহ্ পাকের নির্দেশ। কী ভয়ানক ধৃষ্টতা। কী নিদারুণ দুর্ভাগ্য। কী নিষ্ঠুর ঔদ্ধত্য।


কিন্তু, আল্লাহ্ তায়ালা মহামহিম। সীমাহীন ধৈর্য তার। তিনি ইবলিসকে সঙ্গে সঙ্গেই শাস্তি দিতে পারতেন। সঙ্গে সঙ্গেই দেখিয়ে দিতে পারতেন অবাধ্যতার আজাব কতো ভয়ানক। কিন্তু তিনি তা করলেন না। বরং প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি আদমকে সেজদা করলে না কেনো?’

শয়তান জবাব দিলো ‘কেনো তাকে আমি সেজদা করবো? আমি যে আদমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। সে তো আমার তুলনায়  নিম্নমানের সৃষ্টি। আমাকে আপনি সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে আর আদমকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে। আগুনের গতি ঊর্ধ্বমুখী আর মাটির গতি নিম্নমুখী। আমি, এই অযৌক্তিক আদেশ মেনে নিতে পারি না।’

কে না বুঝবে যে ইবলিসের এই যুক্তি যুক্তিহীন। এরকম যুক্তি প্রদর্শন যে চরম মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ্ তায়ালার সৃষ্টি নির্দ্বিধায় আল্লাহ্ পাকের নির্দেশ পালন করবে। এ নিয়মের বিরুদ্ধে যুক্তির অবকাশ কোথায়? আল্লাহ্ পাকের সকল সৃষ্টিই তাঁর নির্দেশ মেনে নেয় নির্বিবাদে। কিন্তু ইবলিসই প্রথম প্রদর্শন করলো অবাধ্যতার দৃষ্টান্ত। তার সঙ্গে অবাধ্যতার সপক্ষে দেখালো যুক্তি।


আল্লাহ্ তায়ালা অসুন্তুষ্ট হলেন ইবলিসের প্রতি। এরশাদ করলেন, ‘নেমে যা এখান থেকে। তোর অহংকার অশোভনীয় এখানে। বের হয়ে যা শীঘ্রই। আজ থেকে অনন্তকালের জন্য তোকে বয়ে বেড়াতে হবে ধিক্কার আর অভিশাপের শাস্তি।’

আগুনের তৈরী ইবলিস। আগুনের মতোই তার ছিলো টকটকে লাল চেহারা। কিন্তু আল্লাহ্ তায়ালার অভিশাপ নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার চেহারা হয়ে গেলো কদর্য কয়লার মতো কালো। সে হয়ে গেলো অভিশপ্ত শয়তান। চিরদিনের মতো। তবুও ভীত হলো না শয়তান। আপন কৃতকর্মের জন্য এতটুকুও অনুতপ্ত হলো না সে। বরং প্রতিহিংসার আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। মনস্থির করলো সে, প্রতিশোধ নিতে হবে। চরমতম প্রতিশোধ। হাজার হাজার বছর ইবাদত করে কিনা আজ এই ফল। এর জন্য আদমই দায়ী। তাই তার প্রতি নিতে হবে প্রচণ্ড প্রতিশোধ। নিতেই হবে।

কিন্তু এই প্রতিশোধ— পরিকল্পনা  বাস্তবায়িত করতে হলে যে আল্লাহ্ তায়ালার কাছেই প্রার্থনা জানাতে হবে। আল্লাহ্ তায়ালা শক্তি না দিলে কী করে সে শায়েস্তা করবে আদমকে। হাজার হাজার বছর ইবাদত করেছে সে। এর বিনিময়ে আজ কি একটি প্রার্থনা কবুল হবে না তার?

শয়তান নিবেদন করলো, ‘আমাকে কেয়ামতের দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকার অধিকার দিন।’


আল্লাহ্ তায়ালা এরশাদ করলেন, ‘মঞ্জুর করা হলো তোর প্রার্থনা।’

শয়তান তখন বললো, ‘আদমের জন্যই আজ আমার এই দুর্দশা। আমি কসম করে বলছি, আমি আদম এবং তার বংশধরদেরকে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত করবার চেষ্টায় নিয়োজিত থাকবোই। সামনে পিছনে ডানে বামে— সবদিক থেকে আমি তাদের প্রতি চালাবো আক্রমণ। বিপথগামী করবো তাদেরকে। তারপর আপনি দেখতে পাবেন তাদের অধিকাংশই অকৃতজ্ঞ প্রমাণিত হয়েছে।’

আল্লাহ্ পাক এরশাদ করলেন,  ‘এখান থেকে তোর বহিষ্কার ধিক্কার আর অভিশাপের সঙ্গে হোক। নিশ্চিত জেনে নে, মানুষের মধ্যে যারা তোর অনুসরণ করবে, আমি তাদেরকে দিয়ে পরিপূর্ণ করবো জাহান্নাম।’


তবুও হতোদ্যম হলো না শয়তান। দম্ভ আর প্রতিহিংসার নেশায় সে মত্ত। সে বললো ‘আপনি তো আদমের জন্যই আমাকে আজ সর্বহারা করলেন। আমি তার বংশধরদের সামনে অসৎকর্ম আর অবাধ্যতাকে মনোরম রূপে প্রদর্শন করবো। তাদেরকে পথভ্রষ্ট করবো। তবে একথা অবশ্য স্বীকার করতেই হবে যে, আপনার খাঁটি বান্দারা বেঁচে যেতে পারবে।’


আল্লাহ্ তায়ালা বললেন, ‘আমার খাঁটি বান্দা হওয়াই একমাত্র সোজা পথ। সিরাত্বল মুস্তাকিম। এই পথই তার পথিককে পৌঁছে দেয় আমার সান্নিধ্যে। আমার এরকম খাঁটি বান্দাদের উপর তোর কোনো প্রভাবই কার্যকর হবে না। অবশ্য ভ্রষ্টরা তোর অনুগামী হবে। ভ্রষ্টদের জন্য আমি নির্ধারণ করে রেখেছি দোজখের দাবানল। সেই দোজখের থাকবে সাতটি স্তর। প্রতি স্তরের জন্য থাকবে স্বতন্ত্র তোরণ। প্রতিটি তোরণের মধ্য দিয়ে দোজখে অনুপ্রবেশকারীরা থাকবে পৃথক পৃথক দলে বিভক্ত হয়ে।’

এভাবে সমাপ্ত হলো হযরত আদমের অভিষেক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান শেষে চতুর্থ আসমান থেকে আল্লাহ্ পাক তাকে তুলে নিলেন সপ্তম আসমানের উপরে— বেহেশতে।


আর শয়তান বিতাড়িত হলো  চিরদিনের জন্য। অভিশপ্ত হলো  চিরকালের জন্য। সুযোগের অপেক্ষায় দিন গুণতে থাকলো সে। প্রতিশোধ গ্রহণের সময় কি আসবে না? নিশ্চয়ই আসবে।


*সাতঃ আদম হাওয়ার সৃষ্টি/সম্পর্ক।

বেহেশতের বাগানে একা একা ঘুরে বেড়ান হযরত আদম (আঃ)। কখনো বহমান নির্ঝরিণীর পাড়ে, কখনো ফলবান বৃক্ষের নিচে , কখনো পুষ্পের উদ্যানে। ঘুরে বেড়ান আর বিমোহিত হন আল্লাহ্ পাকের নিখুঁত সৌন্দর্যসম্ভার দেখে। চারিদিকে 

পবিত্র জ্যোতির সয়লাব।


হযরত আদমের অন্তরে আপনা আপনিই যেনো সারাক্ষণ অনুরণিত হয়— সোবহানাল্লাহি ওয়ালহামদু লিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবর। ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাহ্ বিল্লাহিল আলিইল আজীম— 

অর্থ্যাৎ, পবিত্রতা আল্লাহ্ তায়ালার, প্রশংসাও আল্লাহ্ তায়ালারই, তিনি ছাড়া উপাস্য নেই আর কেউ, তিনি তো মহান, শ্রেষ্ঠ। আল্লাহর সাহায্য এবং শক্তি ছাড়া আর কারো কোনো শক্তি

নেই, সাহায্যও নেই। তিনিই সর্বোচ্চ, তিনিই মহান।

 

মাঝে মাঝে ফেরেশতাদের সঙ্গে তাঁর সালাম বিনিময় হয়। ফেরেশতারা মোবারকবাদ দেন তাঁকে। খেদমতের জন্য ছুটে আসে হাজারো হুর, হাজারো গেলেমান। কিন্তু তবু কিসের যেনো এক সূক্ষ্ম অস্বস্তিতে মাঝে মাঝে ভরে আসে মন। হযরত আদম দেখেন ফেরেশতা হুর গেলেমান সবারই সাথী আছে, সবারই

দল আছে। কিন্তু আদম যে একা। নিঃসঙ্গ মানুষ তিনি। আল্লাহ্ তায়ালার সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে একক মানুষ।


বেহেশতের এতো সুখ। এতো শান্তি। আনন্দের এতোকিছু উপকরণ। তবু অন্তর অশান্ত কেনো? নিঃসঙ্গতার বেদনায় অন্তর ভারাক্রান্ত হয়। অদৃশ্য কোন্ এক কাঁটা যেনো অন্তরে বিঁধে আছে সারাক্ষণ। মন বিরাগী হয়ে ওঠে। মনে মনে শুধু একটি প্রশ্নই যেনো তার সহস্র তরঙ্গ নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ায়, অবুঝ মন— হয়েছে কি তোমার? আলেমুল গায়েব আল্লাহ্ তায়ালা।  মানুষকে তিনিই দিয়েছেন প্রেমময় অন্তর। দিয়েছেন বিদগ্ধ হৃদয়। সে হৃদয়ের বেলাভূমিতে নিরন্তর আনন্দ বেদনার কতো শত ঢেউ যে আছড়ে পড়ে— তার সব খবরই জানা তাঁর। তিনি যে অন্তর্যামী।


আল্লাহ্ পাক হযরত আদমের অন্তর প্রশান্ত করবার ব্যবস্থা নিলেন। একদিন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন হযরত আদম। এক সময় ঘুমিয়েও পড়লেন। তখন তাঁর বুকের পাঁজরের একটি হাড় থেকে আল্লাহ্ পাক সৃষ্টি করলেন হযরত মা হাওয়াকে।

সৃষ্টির প্রথম নারী হযরত মা হাওয়া (আঃ)। সৃষ্টির প্রথম রমণী তিনি। হযরত আদমের বুকের পাঁজর। হৃদয়ের প্রেম। নিঃশ্বাসের প্রতিধ্বনি। জীবনের জীবন।


হযরত আদমের শিয়রের পাশে বসলেন হাওয়া। বিমুগ্ধ নয়নে দেখতে লাগলেন আদমকে। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলো আদমের। ত্রস্তে উঠে বসে তিনি বিস্ময় আর আনন্দে অভিভূত হয়ে গেলেন হাওয়াকে দেখে। চোখে চোখ পড়বার আগে দৃষ্টি অবনত করলেন হাওয়া। একি লজ্জা। লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে উঠলেন তিনি।

হযরত আদম চোখ ফেরাতে পারেন না। কে এই নবীনা? এতো আপন কেনো মনে হয় তাকে। এতো রূপ, এতো যৌবন তার। বেহেশতের সকল রূপসী হুর যেনো ক্রীতদাসী তার কাছে। এ রমণী কে? এই সুন্দরী যে মুহূর্তেই অধিকার করে ফেলেছে অদৃশ্য অন্তরের সকল পরত। আর দেহকে করেছে উন্মাদ, উম্মাতাল। নিজের অজান্তেই কখন যেনো আদম আলিঙ্গনাবদ্ধ করতে চাইলেন হাওয়াকে। অমনি প্রত্যাদেশ হলো, ‘ক্ষান্ত হও। বিনা বিবাহে তুমি হাওয়াকে স্পর্শ করতে পারবে না।’


হযরত আদমের অন্তরে বিবাহের সংকল্প প্রবল হয়ে উঠলো। তখন আল্লাহ্ তায়ালা শুভবিবাহের আয়োজন করলেন। আল্লাহ্ তায়ালার ইচ্ছায় অসংখ্য ফেরেশতা সমবেত হলেন বিবাহ অনুষ্ঠানে। ফেরেশতাদের সামনে বিবাহের সাজে সজ্জিত করা হলো হযরত আদম এবং হযরত হাওয়াকে।


প্রথম মানব এবং প্রথম মানবীর প্রথম বিবাহ অনুষ্ঠান। পবিত্র এ অনুষ্ঠানে উঠলো আনন্দের সীমাহীন জোয়ার। মুহুর্মুহু সোবহানাল্লাহ্,  আলহামদুলিল্লাহ্, আল্লাহু আকবর, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ ইত্যাদি পবিত্র ধ্বনিতে মুখরিত বিবাহের মজলিশ। শুভবিবাহ সম্পন্ন হলো এক সময়। তারপর আমন্ত্রিত সকল মেহমান ফেরেশতা বিদায় নিলেন একে একে।


একান্তে বসে রইলেন সদ্য বিবাহিত দুলহা ও দুলহান। মানবতার প্রথম আত্মীয়তার আলাপন এবার। প্রথম মিলনের লগন। প্রথম স্বামী। প্রথম স্ত্রী। হাওয়াকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করতে উদ্যত হলেন আদম। অমনি প্রত্যাদেশ হলো আদমের প্রতি—

‘মিলিত হওয়ার আগে দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে।’

হযরত আদম আরজ করলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, কি দিয়ে পরিশোধ করবো দেনমোহর।’

আল্লাহ্ তায়ালা জানালেন, ‘আমার হাবীব হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ শরীফ পড়তে হবে দশবার।’


হযরত আদম নিবেদন করলেন, ‘হে প্রভু পরওয়ারদিগার! মোহাম্মদ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে?

তাকে দেখতে ইচ্ছা করি আমি।’

আল্লাহ্ তায়ালা জানালেন, ‘সে তোমারই আগামী বংশধরদের একজন। তাঁর জন্যই সৃষ্টি করেছি আমি তোমাকে হাওয়াকে সমস্ত ফেরেশতাকে সমস্ত সৃষ্টিকে।’


দশবার দরূদ শরীফ পড়লেন হযরত আদম। দরূদ শরীফের বরকতে নূরে নূরে ভরপুর হয়ে গেলো হযরত আদমের অন্তর বাহির। নূরে নূরে ভরপুর হয়ে গেলো প্রথম বিবাহ বাসর। মিলিত হলেন হাওয়া ও আদম। প্রেম সমুদ্রের অশান্ত তরঙ্গমালা ভেদ করে গভীরে আরো গভীরে ডুব দিলেন তাঁরা। দু’জনেই হারিয়ে ফেললেন যেনো সকল অনুভূতি, বোধচিহ্ন। একাকার হয়ে গেলেন তাঁরা। হারিয়েই গেলেন যেন তারা চিরদিনের জন্য। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেন। শুধু জেগে রইল প্রেম। শাশ্বত সুন্দর চিরন্তন প্রেম।

এক সময় যখন তাদের হুশ হলো,  আল্লাহ্ তায়ালা তখন জানালেন তার নির্দেশ, ‘হে আদম তুমি আর তোমার সঙ্গিনীর বসবাস স্থান এই বেহেশত। তোমরা স্বাধীন সকল প্রকার পানাহারের জন্য, সকল স্থানে বিচরণের জন্য। কিন্তু ঐ বৃক্ষটির নিকটবর্তী হয়ো না কখনো। যদি হও তবে অত্যাচারীদের অন্তর্ভূত হয়ে যাবে তোমরা।’

ঐ বৃক্ষটির নাম গন্ধম বৃক্ষ।

 

আল্লাহ্ তায়ালার সাবধানবাণী শুনে শংকিত হয়ে পড়লেন আদম ও হাওয়া। মনে রাখতে হবে আল্লাহ্ তায়ালার এই নির্দেশ। এখানে সহস্র বৃক্ষের সারি, শত ঝর্ণার সংগীত, অসংখ্য পুষ্পোদ্যান আর বালাখানার বৈভব— সব কিছুই হালাল তাঁদের জন্য। শুধু মনে রাখতে হবে ঐ বৃক্ষের কথা। ঐ সর্বনাশা নিষিদ্ধ বৃক্ষের কথা। আদম ও হাওয়া দু’জনেই সাবধান হয়ে গেলেন। বেহেশতের অপার সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের মাঝে ঐ নিষিদ্ধ বৃক্ষটির উপস্থিতি কী ভয়ংকর।


*আটঃ শয়তানের সবলে আদম ও হাওয়া।

বিতাড়িত শয়তান মনের দুঃখে কালাতিপাত করে। অন্তরে তার প্রতিহিংসার লেলিহান আগুন। বিতাড়িত অভিশপ্ত এই জীবন দুর্বিষহ। অথচ ছিলো একদিন যখন আল্লাহর নিরবচ্ছিন্ন ইবাদতের মধ্য দিয়ে নিরুপদ্রব সময় অতিবাহিত করেছে সে। লাভ করেছে আল্লাহ্ তায়ালার সীমাহীন মেহেরবানি। আর আজ সে আল্লাহ্ তায়ালার অসন্তুষ্টির স্বীকার। বিতাড়িত। লাঞ্ছিত। অপমানিত। অভিশপ্ত।


আদমই সকল অনিষ্টের মূল। তাকে শায়েস্তা করতে হবে। তাকেও বিতাড়িত করতে হবে বেহেশত থেকে। বেহেশত থেকে তাকেও টেনে আনতে হবে পৃথিবীতে। কিন্তু কেমন করে?

শয়তান ভাবে আর ভাবে। কিন্তু ভাবনার কোনো কূল খুঁজে পায় না। হঠাৎ সে বুদ্ধি বের করে— যে ভাবেই হোক একবার— শুধু একবার যদি বেহেশতে কোনোরকমে পৌঁছানো যেতো, তবে আদম আর তার স্ত্রী হাওয়াকে ফাঁদে ফেলবার চেষ্টা করতে পারতো সে। সহজ সরল জীবন আদম হাওয়ার। প্রতারণা কাকে বলে, তারা জানে না। প্রতারণার পথ ধরে তাদের স্খলন ঘটানো হয়তো সম্ভব। আশায় বুক বাঁধে শয়তান।


তারপর এক সময় ফেরেশতার রূপ ধরে সে উড়াল দেয় আকাশে। কৌশলে ফেরেশতাদেরকে ধোঁকা দিয়ে একে একে অতিক্রম করে আকাশ। ফেরেশতারা চিনতে পারে না তাকে। ভাবে তারা, এও এক বিচরণকারী ফেরেশতা। সপ্তম  আকাশের উপরে বেহেশত। বেহেশতের প্রতিটি তোরণ সুরক্ষিত।সারাক্ষণ সেখানে প্রহরা থাকে ফেরেশতাদের। শয়তান অপেক্ষা করতে থাকে। অপেক্ষা করতেই থাকে। এক সময় চেষ্টা সফল হলো তার। অত্যন্ত সন্তর্পণে বেহেশতে প্রবেশ করলো সে। প্রবেশ করেই সেই নিষিদ্ধ বৃক্ষের কাছে গেলো।


সেখানে বসে থাকলো একেবারে ভালো মানুষের মতো। দেখলে মনে হয় যেনো কোনো সাধু পুরুষ। আল্লাহ্ তায়ালার ইবাদত ছাড়া আর কোনোদিকেই তার খেয়াল নেই যেনো।

আদম ও হাওয়া নিষিদ্ধ বৃক্ষ থেকে দূরে দূরেই থাকতেন। মাঝে মাঝে কী এক আকর্ষণ বোধ করতেন তারা ঐ বৃক্ষটির প্রতি। এ কিরূপ বিস্ময়কর প্রবৃত্তি। মানুষের এ এক সহজাত আকর্ষণ। যা কিছু নিষিদ্ধ, মানুষ যেনো তারই দিকে ছুটে যেতে চায়। আদম হাওয়া মাঝে মাঝেই তাকান বৃক্ষটির দিকে। কী সুন্দর বৃক্ষ। কী সুন্দর তার পত্রপলব্ল। কী সুন্দর তার ফল।


হঠাৎ একদিন তারা দূর থেকে দেখতে পেলেন, কে একজন অচেনা আগন্তুক বসে আছে ঐ নিষিদ্ধ বৃক্ষটির কাছে। মনে হয় উদাসীন সে সমস্ত কিছু থেকে। মনে হয় সে যেনো ডুবে আছে আল্লাহ তায়ালার ধ্যানে।


কৌতুহলী হয়ে উঠলেন আদম হাওয়া। এও মানুষের এক সহজাত প্রবৃত্তি। নতুন কিছু দেখলে কৌতুহলের উদ্রেক হয়। জানতে ইচ্ছে হয়। বুঝতে ইচ্ছে করে। এখানে এতোদিন তো এ দৃশ্য কখনো দেখেননি তারা। এখানে এতোদিন ধরে বসবাস করছেন তারা। এখানে তো কোনোকিছু অচেনা নয় তাদের। শুধু ঐ বৃক্ষটি তাদের কাছে রহস্যঘেরা এক বৃক্ষ। জানেন না তারা, বেহেশতের অসংখ্য বৃক্ষের মধ্যে কেনো ঐ একটি বৃক্ষ নিষিদ্ধ  হয়েছে তাদের জন্য। আজ আবার নিষিদ্ধ বৃক্ষের কাছে কে এসে উপস্থিত হয়েছে হঠাৎ।

একপা দু’পা করে তারা এগিয়ে যান অচেনা আগন্তুকটির দিকে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তারা ভালো করে দেখতে থাকলেন আগন্তুকটিকে। 


আগন্তুকই মুখ খুললো প্রথম। বললো, ‘শংকার কোনো কারণ নেই। আমি তোমাদের একান্ত শুভাকাঙ্খী। আমাকে বিশ্বাস করতে পারো তোমরা। ’কিছুক্ষণ থেমে শয়তান আবার বললো ‘এতোদিন ধরে তোমরা বাসবাস করছো বেহেশতে। কিন্তু তোমাদের সামনে রয়েছে বিপদ।  অচিরেই আল্লাহ্ তায়ালা তোমাদেরকে বেহেশত থেকে বের করে দিবেন। পাঠাবেন পৃথিবীতে। তোমরা তো জাননা পৃথিবী কী রকম জায়গা। সেখানে শুধু কষ্ট আর বিপদ।’

আদম হাওয়া নিরুত্তর রইলেন। বেহেশত চ্যুতির সংবাদ শুনে চিন্তিত হলেন তাঁরা।


শয়তান আবার বললো, ‘অথচ ইচ্ছা করলে তোমরা বেহেশতেই থেকে যেতে পারো চিরদিনের জন্য। আমি তোমাদের কল্যাণ কামনা করি। আমার কথা শোনো। নিষিদ্ধ এ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করো যদি, তাহলে এই বেহেশতেরই স্থায়ী অধিবাসী হতে পারবে তোমরা। ’শিউরে উঠলেন আদম ও হাওয়া। এ কী করে সম্ভব। এতে যে আল্লাহ্ তায়ালার অবাধ্যতা করা হবে?

তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে ক্ষণিকের জন্য হতাশ হলো শয়তান। তারপর আরো নরম হয়ে গেলো সে। এবার সে একেবারে পরম আত্মীয়ের মতো বোঝাতে লাগলো তাদেরকে, ‘যাই বলো না কেনো তোমরা। এতে আমার তো আর কোনো লাভ নেই। তোমাদের ভালোর জন্যই আমি বলছিলাম একথা। তোমরা জানো না তাই একথা জানাচ্ছিলাম তোমাদেরকে। আমি তোমাদের একান্ত আপনজন। পৃথিবীতে যেয়ে তোমরা কষ্ট পাবে। সে কষ্ট আমার পক্ষে অসহ্য। তাই বলছিলাম। আল্লাহ্ তায়ালা যে এই বৃক্ষের কাছে আসতে তোমাদেরকে মানা করেছেন, তার কারণ আছে।


সবেমাত্র তোমরা সৃষ্টি হয়েছো তখন। এই গাছের ফল  খেলে তোমাদের তখন ক্ষতিই হতো। আল্লাহ্ তায়ালার প্রিয় তোমরা। আল্লাহ্ তায়ালা তো তোমাদের ক্ষতি  চাইতে পারেন না। তাই নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু এখন তো তোমরা পরিণত। বেশেতের পরিবেশে তোমরা এখন স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছো। এখন আর কোনো বাধা নিষেধ নেই। এখন এ ফল না খেলেই বরং তোমাদেরকে চলে যেতে হবে পৃথিবীতে। পৃথিবীর অনিশ্চিত ঐ জীবন থেকে পরিত্রাণ  কি চাও না তোমরা? আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্য কার কামনা নয়? অল্প কয়েকটা মাত্র ফল খেলেই চলবে। আর তাছাড়া তোমাদের নিয়ত তো অসাধু নয়। আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্য লাভের জন্যই তো তোমরা বেহেশতে থাকতে চাও চিরকাল। আর সে জন্যই তো এই নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করা।’


শয়তানের মধুর কথা শুনে হযরত হাওয়ার মন নরম হয়ে গেলো। আহা বেচারা আগন্তুক সাধু পুরুষতো সৎ পরামর্শই দিয়েছে। এতে তার তো কোনো লাভ নেই। লাভ তো আমাদেরই। আর আমাদের নিয়ত তো আর খারাপ নয়। আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্যইতো আমাদের  কাম্য। মেহেরবান আল্লাহ্ তায়ালা অন্তর্যামী তিনি তো জানবেনই, কী নিয়তে আজ এই গাছের ফল খাবো আমরা।

প্রতারণা আর মিথ্যাচার কাকে বলে তা একেবারেই জানা ছিলো না আদম ও হাওয়ার। তাদের সরল প্রাণে শয়তান সুকৌশলে ঢুকিয়ে দিলো প্রলোভনের বিষ। শয়তানের  প্রতারণার অচিন্তনীয় কৌশলের কারণে সে বিষ তাদের দু’চোখে প্রতিভাত হলো অমৃতরূপে।


হযরত হাওয়া একেবারেই গলে গেলেন শয়তানের কথায়। খেয়ে ফেললেন কয়েকটি ফল সেই নিষিদ্ধ বৃক্ষের। তারপর হযরত আদমকে বললেন, ‘খাও।’


প্রিয়তমার অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারলেন না হযরত আদম। তিনিও খেয়ে ফেললেন কয়েকটি গন্ধম ফল।

মুহূর্তকাল পরেই আদম হাওয়া বুঝতে পারলেন, তারা কী সর্বনাশা কাজ করে ফেলেছেন। আগন্তুক সাধুপুরুষটি যে শয়তান, তা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারলেন তারা। শয়তান পালিয়ে গেলো মুহূর্তেই। সফল হলো তার  ক্রান্ত, ষড়যন্ত্র।


ভয়ানক এক বিপদের অশনি সংকেতে কেঁপে উঠলেন হযরত আদম আর হযরত হাওয়া। বেহেশতের বালাখানা, নির্ঝরিণী, পুষ্পোদ্যান হাহাকার করে উঠলো। হায় হায় করে উঠলো সকল হুর গেলেমান। ফেরেশতারা হয়ে গেলো স্তম্ভিত। একি করেছেন আদম ও হাওয়া। বেশেতের অফুরন্ত নেয়ামতের মধ্যে ডুবে থেকেও আল্লাহ্ তায়ালার সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টি আদম তাঁর সঙ্গিনীকে নিয়ে কী নিদারুণ আচরণ করলেন আজ।

আল্লাহ্ তায়ালার বিধান অলংঘনীয়। তার নির্ধারিত নিয়মে আগুন পোড়ায়, পানি পিপাসা মেটায়, সূর্য চন্দ্র আলো দেয়। তার নির্ধারিত নিয়ম অলংঘনীয়। এ- ও তার  নির্ধারিত নিয়ম যে, গন্ধম বৃক্ষের ফল ভক্ষণকারী বেহেশতে বসবাসের

যোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে মুহূর্তেই।


তাই হলো। ভুলের আগুনে ঝলসানো অন্তর আদম হাওয়ার। হায় একি ভয়াবহ কাজ করেছেন তারা। বেহেশতের সকল সুখ যে দ্রুত অতিদ্রুত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে তাদের কাছ থেকে। আল্লাহর হুকুম অমান্যকারীদের সঙ্গে কেউ আর সম্পর্ক রাখতে চায় না। এমনকি পরনের পোশাকও। নিরাবরণ হয়ে পড়লেন তারা। পোশাকের আবরণ খসে পড়লো। নগ্ন হয়ে পড়লেন আদম ও হাওয়া।

দু’জন দু’জনকে দেখে লজ্জায় মুখ ঢাকলেন তারা। কী অপমান। কী লজ্জা। 


লজ্জায় অপমানে উন্মাদপ্রায় হয়ে গেলেন দু’জনে। এভাবে শয়তান অপমান করলো আল্লাহ্ তায়ালার সম্মানিত প্রতিনিধি আর তার সঙ্গিনীকে। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন আদম হাওয়া। বেহেশতের লতাপাতা ছিঁড়ে লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করতে লাগলেন তারা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। একদিক আবৃত করতে গেলে আরেক দিক হয়ে পড়ে নগ্ন।


  একি ভয়ানক আজাব। লজ্জার— এই আজাবের কাছে শত সহস্র দোজখের আগুন যে কিছুই নয়। চিৎকার করে কাঁদতে থাকলেন আদম হাওয়া। রোদনের অবিশ্রাম  আওয়াজে ভরে গেলো চারিদিক। এরই মধ্যে তারা শুনতে পেলেন আল্লাহ্ তায়ালার প্রত্যাদেশ—

   

  আমি কি ঐ বৃক্ষ সম্পর্কে  তোমাদেরকে সতর্ক করে দেইনি।  শয়তান তোমাদের চরমতম শত্রু— একথা কি আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেইনি?’


আল্লাহ্ তায়ালার প্রত্যাদেশে শুধু অনুতাপ আর অপমানের আগুন জ্বলে উঠলো দাউ দাউ করে। লজ্জা আর অনুশোচনার সর্বধ্বংসী তুফান যেনো নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায় সবকিছু। দু’জনে তারা কেঁদে ওঠেন আরো জোরে। বারবার কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে নিবেদন করতে থাকনে তারা, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা অপরাধী। নিজেরাই আমরা ডেকে এনেছি আমাদের সর্বনাশ। যদি আপনি ক্ষমা না করেন, যদি আপনি দয়া না করেন, তবে আমরা যে ধ্বংস হয়ে যাবো প্রভু।’


বারবার এভাবে বিলাপ করতে থাকলেন হযরত আদম আর হযরত হাওয়া। বারবার উচ্চারণ করতে লাগলেন—

রব্বানা জলামনা আনফুসানা ওয়া  ইল্লাম তাগফিরলানা অতারহামনা লানা কুনান্না মিনালখসিরীন।


এরি মধ্যে জারী হয়ে গেলো আল্লাহ্ তায়ালার অটল নির্দেশ—

‘নেমে যাও নিচে। সেখানে তোমাদেরকে শয়তানের সঙ্গে শত্রুতার মধ্যে সতর্ক জীবন যাপন করতে হবে।’


*নয়ঃ বেহেশত হতে দুনিয়ায় আগমন। 

শেষ হয়ে গেলো আনন্দের আলোকিত অধ্যায়। বেহেশতবি চ্যুত প্রথম মানব আর প্রথম মানবী ক্রমাগত নামতে থাকলেন নিচে। একে একে অনেক আকাশ ভেদ করে চলতে লাগলো অবতরণ। অবরোহন। পতন। সারা নিসর্গ যেনো ম্লান হয়ে গেলো মুহূর্তেই। চারিদিকে উঠলো শোকের মুর্ছনা। হাহাকারে ভরে গেলো আকাশ বাতাস। নির্বাক অসংখ্য ফেরেশতা স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন তাদের দিকে। আল্লাহ্ তায়ালার প্রিয় সৃষ্টি মানুষের একি নির্মম পরিণতি। 


শুধু স্মরণ করতে থাকলেন তারা আল্লাহ্ তায়ালার সেই চিরন্তন বাণী ---‘ইন্নি আ’লামু মালা তায়ালামুন।’ নিশ্চয় আমি জানি— যা জানো না তোমরা। 


‘কি অপার রহস্য যে লুকিয়ে আছে এই বেদনাবিধুর ঘটনায় কে জানে? ভবিষ্যতের জ্ঞান তো কারো  জানা নেই। কারোরই জানা নেই। সকল জ্ঞানের অধিকারী যে একমাত্র আল্লাহ্ জাল্লা জালালুহু। ঐ কথাই সত্য যা তিনি বলেন, ‘নিশ্চয় আমি জানি— যা জানো না তোমরা।’


  এক সঙ্গেই নামছিলেন তারা। প্রথম আকাশের নিচে এসে হঠাৎ আলাদা হয়ে গেলেন দু’জনে। তারপর অসহায় একাকী নিঃসঙ্গ অবস্থায় শেষে পৃথিবীর মাটিতে পা রাখলেন তারা। হযরত আদম অবতরণ করলেন সিংহল দ্বীপে। আর হযরত হাওয়া জেদ্দায়।

  তারপর একটানা রোদনের অধ্যায়। শতশত বৎসর চলে যায় কাঁদতে কাঁদতে। দ্বীপদেশ সিংহলে আদম আর সমুদ্র উপকূল জেদ্দায় হাওয়া কেঁদেই চলেন সারাক্ষণ। 


কাঁদেন আর প্রার্থনা জানান মহামহিম আল্লাহ্ তায়ালার দরবারে— 

  রব্বানা জলামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা অতারহামনা লানা কুনান্না মিনাল খসিরীন।

—হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা যে নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি ক্ষমা না করলে, দয়া না করলে আমরা যে ধ্বংস হয়ে যাবো প্রভু। 


   কখনো বলতে লাগলেন তারা, ‘হে আমার আল্লাহ! তুমি ছাড়া আর কোনো মা’বুদ নেই। তুমি পবিত্র। সমস্ত প্রশংসা তো তোমারই। নিজের প্রতি অত্যাচারী নিরূপায় আমি তোমার কাছেই ক্ষমাপ্রার্থনা করি— তুমি যে শ্রেষ্ঠ ক্ষমাকারী। হে আমার আল্লাহ্! আমি নিশ্চিত বিশ্বাস করি, তুমিই একমাত্র মা’বুদ। তুমি পবিত্র । সকল প্রশংসার অধিকারী তুমি। নিকৃষ্ট আমি নিজের সর্বনাশ ডেকে এনেছি নিজেই। দয়া করো মেহেরবান প্রভু— তুমি যে শ্রেষ্ঠ দয়াবান। আমি নিরূপায় সর্বহারা। অতএব তুমি আমার তওবা কবুল করো। তুমি তো তওবা কবুলকারী। অতিশয় দয়ালু।’

  হযরত আদম কাঁদেন সিংহলে। দু'চোখ বেয়ে অবিরল ঝরে অশ্রুধারা। যে অশ্রুর বিরাম নেই। যে অশ্রু বয়ে যায় নদীর মতো নিরন্তর, নিরবধি। নদীর তীরে তীরে জন্ম নেয় ফুল ও ফলের অগণিত বৃক্ষ। তারাও কাঁদে। হযরত আদমের শোকে শোকাতুর হয়— বৃক্ষরাজি, নদী-সমুদ্র, সমস্ত নিসর্গ।


ওদিকে হযরত  হাওয়া একটানা কেঁদে চলেন বিরান সমুদ্রপোকূল জেদ্দায়। তার কান্নার অশ্রুতে নেমে আসে বন্যা, প্লাবন। শোনা যায়, অশ্রুর ধারা থেকে সৃষ্টি হয়েছে  মেহেদি বৃক্ষ। অশ্রু মিশ্রিত বালুকণা পরিণত হয়েছে সুরমায়। আর যে অশ্রু স্রোত মিশে গিয়েছে সাগরে, সেগুলো পরিণত হয়েছে মুক্তায়।


*দশঃ অশ্রুশিক্ত কান্নার পর একত্র।

শত বছর কেটে গেলো কাঁদতে কাঁদতে। তবুও বিরতি নেই রোদনের আরো অতিক্রান্ত হলো শত বছর।তবুও থামে না  অশ্রু। এরপর আরো শত বছর কেটে গেলো যখন, তখন প্রশমিত হলো শোক। স্তিমিত হলো অনুশোচনার অনল।


  আল্লাহ্ তায়ালার ক্ষমার জ্যোতিসমুদ্রে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হলেন তারা। বুকের পাথর নেমে গেলো যেনো। আল্লাহ্ তায়ালার দয়ার নির্মল বাতাসে তারা প্রাণ ভরে নিলেন নতুন নিঃশ্বাস। ক্ষমাপ্রাপ্তির আনন্দে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো অতীতের সমস্ত বেদনারোধ। মনে হলো সারা অন্তরটাই যেনো এবার পরিণত হয়েছে সুখময় বেহেশতে।


  কিন্তু আর এক বেদনায় যে অন্তর আচ্ছন্ন হয়ে আসে— জীবনের নিঃসঙ্গতা দূর হবে কেমন করে? হাওয়ার কথা মনে পড়ে যায় আদমের। কোথায় কি অবস্থায় আছে সে, কে জানে। এই বিশাল বিরান পৃথিবীতে কী করে তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব। সঙ্গিনীর বিরহ যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে ওঠেন আদম।


   ওদিকে হযরত হাওয়াও হয়ে পড়েন বিরহবিধুরা। না জানি কোথায় এখন তিনি। পথ ঘাট জানা নেই। অজানা অচেনা এই পৃথিবীতে কোথায় আদম। কে বলে দিবে তাঁর ঠিকানা।

   আল্লাহ্ পাক রহম করলেন তাদের প্রতি। একদিন হযরত জিবরাইল (আঃ) হাজির হলেন হযরত আদমের কাছে। হাজির হয়ে আল্লাহ্ তায়ালার নির্দেশ জানিয়ে দিলেন তাকে, ‘হে আদম। আপনি মৃত্যু আসবার আগে হজ্জ্ব সমাধা করুন।’


   মৃত্যুর কথা শুনে শংকিত হয়ে পড়লেন আদম। মৃত্যুর মুখোমুখি যে হতেই হবে একদিন। এই পৃথিবীর জীবন যে নশ্বর, ক্ষণস্থায়ী। নিরূপায় মানুষ মৃত্যু থেকে তোমার নিস্তার নেই।


   মনস্থির করলেন হযরত আদম। তিনি হজ্জ্ব করতে যাবেন। পথের সন্ধান দিলেন হযরত জিবরাইল (আঃ) তার নির্দেশিত পথ ধরে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেলেন তিনি।

   দূরের পথ। দিনশেষে বিশ্রামের জন্য থামতে হয় বিভিন্ন মনজিলে। নিশাবসানে আবার শুরু হয় পথ চলা।

   এভাবে চলতে চলতে এক সময় তিনি হাজির হলেন মক্কায়। বহু বছর আগে সেখানে ফেরেশতারা প্রথম নির্মাণ করে রেখেছিলেন কাবা শরীফ। সাত আসমানে অবস্থিত বায়তুল মামুর মসজিদের আদলে নির্মিত কাবা শরীফে সব সময় ফেরেশতারা তওয়াফ করতেন।


   হযরত আদম কাবা শরীফ তাওয়াফ করলেন। নামাজ আদায় করলেন।আল্লাহ্ তায়ালা তখন সন্তুষ্ট হয়ে জান্নাতের অনেক জ্যোতির্ময় তাঁবু থেকে একটি তাঁবু স্থাপন করলেন কাবা শরীফের উপর। তাঁবুটি ছিল লাল ইয়াকুত পাথরের তৈরী। তাঁবুটি বেহেশতের তাঁবুর মতোই ছিলো নূরে ভরপুর। তাঁবুর  চারটি কোণে ছিলো শুভ্র ও উজ্জ্বল ইয়াকুত পাথর। ফেরেশতারা এসে ঘিরে রাখলেন সেই তাঁবুকে। জ্বীন শয়তানেরা যেনো কাবাগৃহ দেখতে না পায়, সে কারণেই ফেরেশতারা বেষ্টন করে রাখলেন কাবা শরীফকে। সমবেত ফেরেশতারা বিরতিহীন ভাবে পাঠ করে চললেন, সোবহানাল্লাহ্... আলহামদুলিল্লাহ্... আল্লাহুআকবার...।


   আল্লাহ্ তায়ালার আরশ থেকে দলে দলে ছুটে এলেন ফেরেশতারা। আরশের মাকাম থেকেই তাঁরা এহরাম বেঁধে লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক বলতে বলতে কাবা গৃহের দিকে ছুটে আসতেন। হাজরে আসওয়াদকে  চুম্বন করে তাঁরা তওয়াফ শুরু করতেন। তারপর দুই রাকাত নামাজ শেষে পুনরায় ফিরে যেতেন আকাশের দিকে। কাবা শরীফের সাথে সাথে বেহেশত থেকে হাজরে আসওয়াদ নামের এই জ্যোতির্ময় পাথর খণ্ডটি অবতীর্ণ হয়েছিলো। হযরত আদম (আঃ) সেই পাথরটিকে মাঝে মাঝেই জড়িয়ে ধরেন আবেগে। চুম্বন করেন আর বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেন আল্লাহ্ তায়ালার ক্ষমা ও মহত্বের এক অভূতপূর্ব নিদর্শন। পৃথিবীর মতো নিকৃষ্ট এই স্থানে শুধু তাঁর জন্য, শুধু মানুষের জন্য তিনি নাজিল করেছেন এই ইবাদতগৃহ— কা’বা। রক্তিমবর্ণ ইয়াকুত প্রস্তর নির্মিত এই গৃহটির পূর্ব পশ্চিম দিকে রয়েছে দু’টি দরোজা। দরোজা দু’টিতে রয়েছে নূরের প্রদীপ। আর দীপাধারগুলি নির্মিত হয়েছে বেহেশতের নিখাদ সোনা দিয়ে।


   হজ্বের সকল আহকাম পালনের পর একান্ত বিনয়ের সঙ্গে আল্লাহ্ পাকের উদ্দেশ্যে আরজ করলেন হযরত আদম, ‘হে আমার আল্লাহ্! প্রত্যেক কর্মের বিনিময় দেওয়াই তো তোমার নিয়ম।’

   আল্লাহ্ তায়ালা জানিয়ে দিলেন,  ‘হে আদম, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তোমার পরবর্তী বংশধরগণের মধ্যে যারা এই কা’বা গৃহের জেয়ারত করে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাদেরকেও ক্ষমা করে দিব।’


   হজ্জ্বের কিছুদিন পর একদল ফেরেশতা সাক্ষাৎ করলেন হযরত আদমের সঙ্গে এবং জানালেন,  ‘আপনার হ্জ্ব আল্লাহ্ তায়ালা কবুল করে নিয়েছেন। আমরা আপনার দুই হাজার বছর আগে প্রথম হজ্ব সমাধা করেছি।’


   হযরত আদম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি দোয়া পড়তে তোমরা হজ্বের সময়?’

ফেরেশতারা জানালেন, ‘আমরা পড়তাম— সোবহানাল্লাহি ওয়ালহামদুলিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়ালহু আকবর।


    হযরত আদম আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন কখনো কখনো। হাওয়ার কথা মনে হয় বার বার। কে জানে সে অভাগিনী এখন কোথায়। একাকীত্ব যে ক্রমে ক্রমে  অসহনীয় হয়ে উঠেছে। সাথীবিহীন জীবন তপ্ত মরুভুমির মতো। অসহ্য। হযরত আদম মাঝে মাঝেই দোয়া প্রার্থনা করেন আল্লাহ্ তায়ালার কাছে। প্রার্থনা করেন, ‘এ বিরহ যাতনার অবসান করে দাও প্রভু। আমরা একসঙ্গে আবার শুরু করি নতুন জীবন। দ্বীন দুনিয়ার সুখ দুঃখ সবকিছু ভাগ করে নিই আমরা একসাথে।’


   একদিন মোনাজাত শেষ না হতেই তিনি যেনো শুনতে পেলেন কার পায়ের মৃদু শব্দ। মোনাজাত শেষ করেই দেখলেন হাওয়া, এগিয়ে আসছেন তাঁর দিকে।


   চোখে মুখে তাঁর দীর্ঘদিনের একটানা রোদনের চিহ্ন। এখনো লেগে আছে অশ্রুর দাগ। বিরহবিধুরা বিপর্যস্তা স্ত্রীকে দেখে হযরত আদম প্রায় দৌড়ে গেলেন তাঁর দিকে।  জাড়িয়ে ধরলেন তাকে। হযরত হাওয়াও জড়িয়ে ধরলেন স্বামীকে।তারপর চললো একটানা রোদন।


পৃথিবীর আকাশ বাতাস মরুভুমি সবাই এই প্রথম দেখলো প্রথম মানব আর মানবীর প্রেমালিঙ্গনের দৃশ্য। কী সুন্দর। কী অপরূপ।