দেওবন্দীদের মুখে আলা হযরতের প্রশংসা | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

দেওবন্দী আকাবেরদের মুখে আ’লা হযরতের প্রশংসা

সংকলনেঃ হাসান মুহাম্মদ শারফুদ্দীন

চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ, ইমামে আহলে সুন্নাত, মাওলানা আহমদ রেযা খান ফাযেলে বেরেলভী যাকে আমরা আলা হযরত হিসেবে এক নামে চিনি। তিনি ছিলেন এমনই এক মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি শুধু আমাদের মাথার তাজ নন বরং দেওবন্দের আকাবেরাও তাঁকে অপরিসীম শ্রদ্ধা করতেন। আজকের দেওবন্দীরা আলা হযরতকে অত্যন্ত ঘৃণা করে তাঁকে গালি দেয়। তাদের উচিত তাদের আকাবেররা তাঁকে কীভাবে সম্মান করেছে এবং তাঁর প্রশংসা করেছে সেদিকে দৃষ্টিপাত করা। নিম্নে আলা হযরত সম্পর্কে দেওবন্দের কিছু সুপরিচিত মৌলভী এর উক্তি তুলে ধরা হলো।
(১) মৌলভী আশরাফ আলী থানভী
মৌলভী গোলাম ইয়াযদানী সাহেব (ফাযিলে মাদ্রাসা-ই-মাযহারুল উলুম, সাহারানপুর, ভারত, খতিব, জামে মসজিদ গোন্দলমন্ডি, আটক; আশরাফ আলী থানভীর ঘটনা বলেন- “ঐ হযরতের মাহফিলে কোন এক ব্যক্তি আলোচনা প্রসঙ্গে মাওলানা আহমদ রেযা খান সাহেব বেরলভীর নাম মাওলানা ছাড়াই শুধু আহমদ রেযা খান বলেছিলো। তখন হাকীমুল উম্মত মৌলভী আশ্রাফ আলী থানভী তাকে খুব তিরস্কার করলেন বকুনি দিলেন।”
মৌলভী থানভী আরো বলেছে- “আমার অন্তরে মাওলানা আহমদ রেযার প্রতি সীমাহীন ভক্তি শ্রদ্ধা রয়েছে। তিনি আমাদেরকে কাফির বলেন। তাও কিন্তু ইশকে রাসুল (দরুদ) এর ভিত্তিতেই বলে থাকেন অন্য কোনো উদ্দেশ্যে তো বলেন না। (চটান লাহোর ২৩শে এপ্রিল ১৯৬২ ইং সংখ্যা আলা হযরতকা ফিকহী মকাম লাহোর মুদ্রিত ১৯৭১ ইং পৃষ্ঠা-১১০)
এছাড়াও তিনি (আশরাফ আলী থানভী) বলেছে- সুযোগ হলে আমি মৌলভী আহমদ রেযা খান সাহেব বেরলভীর পেছনে (ইমামতিতে) নামায পড়ে নিতাম। (মুহাম্মদ বাহাউল হক কাসেমী উসইয়া-ই-আকাবির, লাহোর; মুদ্রিত ১৯৬২ ইং পৃষ্ঠা -১৫)
(২) মুফতী মুহাম্মদ শফী (করাচী)
মুফতী শফি বলেন- “যখন হযরত মাওলানা আহমদ রেযা খান সাহেবের ওফাত হলো তখন মৌলভী আশরাফ আলী থানভীকে কেউ এসে খবর দিলেন। মৌলভী থানভী দোয়ার জন্য হাত উঠিয়ে দিলেন। সে দোয়া শেষ করলে মজলিসে উপস্থিতদের একজন বললো তিনি সারা জীবন আপনাকে কাফের বলেছেন। আর আপনি তাঁর জন্য মাগফিরাতের দোয়া করছেন? তিনি বললেন- মাওলানা আহমদ রেযা খান আমাদের উপর কুফরের ফতোয়া এজন্য আরোপ করেছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করতেন যে, আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মানহানি করেছি। যদি তিনি ইয়াক্বীন বা নিশ্চিত বিশ্বাস রাখা সত্বেও আমাদের উপর কাফির ফতোয়া আরোপ না করতেন তাহলে তিনি নিজেই কাফির হয়ে যেতেন। (ইমাম আহমদ রেযা খান বেরলভী কুদ্দিসা সিররুহু এক-হামাহ জিহাত শাখসিয়াত করাচী পৃষ্টা-১৮ ও ১৯)
্থ আলিম ১ম বর্ষ, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা।
(৩) মৌলভী মুহাম্মদ ইদ্রিস কান্ধলভী
মৌলভী মুহাম্মদ ইদ্রিস কাধলভী বলেন- মাওলানা আহমদ রেযা খান-এর মাগফিরাত তো ঐসব ফতোয়ার কারণেই হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা বলবেন আহমদ রেযা খান তোমার মধ্যে আমার রাসুল (দরুদ) এর প্রতি এত মহব্বত ছিল যে, এত বড় বড় আলেমদেরকেও তুমি ক্ষমা করোনি। তুমি মনে করেছো যে তারা রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মানহানি করেছে। সুতরাং তুমি তাদের প্রতিও কুফরের ফতোয়া আরোপ করেছো। যাও এক আমলের উপর আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। (পূর্বোক্ত বই পৃষ্ঠা-১৮)
(৪) মৌলভী এযায আলী দেওবন্দী তিনি বলেন- এ যুগের মধ্যে যদি কোনো মুহাক্বিক্ব (সুদক্ষ) আলেমে দ্বীন থাকেন তবে তিনি হলেন আহমদ রেযা খান বেরলভী। কেননা আমি মাওলানা আহমদ খানকে যাঁকে আমরা আজ পর্যন্ত কাফির বিদআতী ও মুশরিক বলে বেড়াচ্ছি, অত্যন্ত প্রশস্ত দৃষ্টিসম্পন্ন উন্নত মানসিকতার অধিকারী, অদম্য সাহসী, আলিমে দ্বীন এবং মহান চিন্তাবিদ হিসেবে পেয়েছি। তাঁর উপস্থাপিত দলিলাদি ক্বোরআন ও সুন্নাহর বিরোধী নয় বরং পরস্পর গভীরভাবে সম্পৃক্ত। কাজেই আমি আপনাদেরকে পরামর্শ দিচ্ছি যদি আপনারা কোন জটিল মাসআলার কারণে কোনো অসুবিধার সম্মুখীন হন, তবে বেরেলী গিয়ে মাওলানা আহমদ রেযা খান সাহেব বেরেলভীর নিকট সমাধান প্রার্থী হোন। (রিসালাহ ই আন নূর থানাভূন, পৃষ্ঠা ৪০, শাওয়াল ১৩৪২ হিঃ)
(৫) মৌলভী শাব্বির আহমদ ওসমানী বলেন- মাওলানা আহমদ রেযা খানকে “তিনি কাফের ফতোয়া দেন” মর্মে অপবাদ দিয়ে মন্দ বলা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। কেননা, তিনি খুব বড় আলেমে দ্বীন, উচ্চ পর্যায়ের মুহাক্কিক্ব (সুদক্ষ) ছিলেন। (রিসালাহ ই হাদী দেওবন্দ, ২০ পৃষ্ঠা জিলহজ্ব ১৩২৯ হিঃ)
(৬) মৌলভী আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী বলেন- বাস্তবিকই বেরলভী হযরতগণের ইমাম মাওলানা আহমদ রেযা সাহেবের লেখনী নির্ভুল ও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য। (রিসালাহ -ই-দেওবন্দ ২১ পৃষ্ঠা জুমাদালউলা ১৩৩০ হিঃ)
(৭) মৌলভী সৈয়দ মুহাম্মদ সুলায়মান নদভী আলা হযরতের কিতাব পড়ে বলেন ইনি তো বিদআতীদের নেতা নন; বরং তিনি তো ইসলামী বিশ্বেরই স্কলার ও কর্ণধার পরিলক্ষিত হচ্ছেন। মাওলানা মরহুমের লেখনীতে যে পরিমাণ গভীরতা পাওয়া যাচ্ছে সেই পরিমাণ গভীরতা তো আমার সম্মানিত ওস্তাদ জনাব মাওলানা শিবলী সাহেব হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী এবং হযরত মাওলানা শায়খুত তাফসীর আল্লামা শাব্বীর আহমদ ওসমানীর কিতাবগুলোতেও নেই। (মাহনামা-ই-নদওয়াহ: আগষ্ট ১৯১৩ ইং পৃঃ ১৭)
(৮) মৌলভী আবুল হাসান আলী নদভী বলেন হানাফী ফিকহ ও এর শাখা প্রশাখা সম্পর্কে জ্ঞানানুসারে এ যুগে তাঁর (আলা হযরত) সমকক্ষ পাওয়া যায় না।
উপরোল্লিখিত দেওবন্দী ওলামাদের বক্তব্যে প্রমাণিত হয় যে,আলা হযরত ফিক্বহীজ্ঞানে অত্যন্ত সুদক্ষ ছিলেন এছাড়াও তিনি নিজ আকীদায় সত্য ছিলেন। অতএব বর্তমান দেওবন্দীদের উচিত আলা হযরতকে গালি না দিয়ে সানন্দচিত্তে গ্রহণ করে মুরুব্বীদের অনুসরণ করা। আল্লাহ তাদের হেদায়াত দান করুক। আমিন (দেওবন্দী আলেমগণ ও যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ কৃতঃ আলামা সৈয়দ সাবের হোসাইন শাহ বোখারী থেকে সংকলিত।