মাওলা আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু এঁর ওফাত দিবস | ইসলামী বিশ্বকোষ

২১শে রমজান। এই দিনে শাহাদাতবরণ করেন ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু, যিনি হচ্ছেন বনী আদমের সর্দার আমাদের প্রিয় নবী ﷺ এঁর চাচাত ভাই এবং জামাতা, যাঁর সঙ্গিনী হচ্ছেন জান্নাতী রমনীদের সর্দারনী এবং যিনি জান্নাতী যুবকদের সর্দারদ্বয়ের সম্মানিত পিতা।




যাঁর অন্যতম মর্যাদা এই যে, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর চাচাত ভাই কিংবা জামাতা হয়েও রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর পরিবার তথা আহলে বাইতের অন্যতম সদস্য হিসেবে মর্যাদা পেয়েছেন।

আম্মাজান আয়িশা (রাঃ) বলেন, (একদিন) রাসূলুল্লাহ ﷺ সকালে বের হলেন। তার পরনে ছিল কালো নকশী দ্বারা আবৃত একটি পশমী চাদর। হাসান ইবনু আলী (রাঃ) এলেন, তিনি তাকে চাদরের ভেতর প্রবেশ করিয়ে নিলেন। হুসায়ন ইবনু আলী (রাঃ) এলেন, তিনিও চাদরের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়লেন। ফাতিমা (রাঃ) এলেন, তাকেও ভেতরে ঢুকিয়ে ফেললেন। তারপর ‘আলী (রাঃ) এলেন তাকেও ভেতরে ঢুকিয়ে নিলেন। তারপরে বললেনঃ "হে আহলে বায়ত আল্লাহ তা'আলা তোমাদের হতে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করে তোমাদের পবিত্র করতে চান।" (সূরা আল আহযাব ৩৩ঃ ৩৩)।(সহীহ মুসলিম ৬১৫৫)

সা'দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রা.) বলেন, যখন (এই) আয়াতঃ "অতঃপর (হে মাহবুব!) যে ব্যক্তি আপনার সাথে (ঈসা সম্পর্কে) বিতর্ক করে এর পরে যে, আপনার নিকট জ্ঞান (ওহী) এসেছে, তবে তাদেরকে বলে দিন, ‘এসো, আমরা ডেকে নিই আমাদের পুত্রদেরকে ও তোমরা তোমাদের পুত্রদেরকে এবং আমরা আমাদের নারীদেরকে ও তোমরা তোমাদের নারীদেরকে; আর আমরা আমাদের নিজেদেরকে ও তোমরা তোমদের নিজেদেরকে। অতঃপর মুবাহালাহ্ (বিনীত প্রার্থনা) করি। তারপর মিথ্যাবাদীদের উপর আল্লাহর লা’নত দিই।"(সূরা আলে ইমরান ৩ঃ ৬১)

অবতীর্ণ হলো, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসায়ন (রা.) কে ডাকলেন। তারপর বললেন, হে আল্লাহ! এরাই আমার পরিবার-পরিজন। (সহীহ মুসলিম ৬১১৪)

জান্নাতী যুবকদের সর্দারদ্বয়ের সম্মানিত পিতা মাওলা আলী রাঃ বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসান ও হুসাইনের হাত ধরে বলেনঃ যে ব্যক্তি আমাকে ভালোবাসে এবং এ দু’জন ও তাঁদের পিতা-মাতাকে ভালোবাসে, সে কিয়ামতের দিন আমার সাথেই থাকবে। (সূনান আত তিরমিজী ৩৭৩৩)

ইনিই হচ্ছেন সেই সৌভাগ্যবান যাকে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ মুমিনদের মাওলা হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

আল-বারা বিন আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ (তিনি বলেন) আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এঁর সঙ্গে বিদায় হজ্জে উপস্থিত ছিলাম। তিনি পথিমধ্যে এক স্থানে (গাদিরে খুম) অবতরণ করেন, অতঃপর নামাজের জামা’আতে একত্র হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি আলী (রাঃ)-এঁর হাত ধরে বলেন, আমি কি মু'মিনদের নিকট তাদের নিজেদের চাইতে অধিক প্রিয়/ ঘনিষ্টতর নই? তারা বলেন, হাঁ অবশ্যই। তিনি আবার বলেন, আমি কি প্রত্যেক মু'মিনের নিকট তার নিজের চাইতে অধিক ঘনিষ্টতর নই? তারা বলেন, হ্যাঁ অবশ্যই। তিনি ﷺ বলেন, আমি যার ওয়ালি/ মাওলা, আলীও তার ওয়ালি/ মাওলা। হে আল্লাহ্‌! যে তাকে ভালবাসে আপনি তাকে ভালবাসুন। হে আল্লাহ্‌! যে তার সাথে শত্রুতা করে আপনিও তার সাথে শত্রুতা করুন।(সূনান ইবনে মাজাহ ১১৬, মুসনাদে আহমাদ ১৮০১১)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা। (সূনান আত তিরমিজী ৩৭১৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: "কি বলতে চাও? তোমরা ‘আলী প্রসঙ্গে কি বলতে চাও? ‘আলী প্রসঙ্গে তোমরা কি বলতে চাও? আলী আমার হতে এবং আমি আলী হতে। আমার পরে সে-ই হবে সমস্ত মুমিনের ওয়ালি। (সূনান আত তিরমিজী ৩৭১২)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ হাসান ও হুসায়ন জান্নাতী যুবকদের সর্দার এবং তাঁদের পিতা তাঁদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হবে। (সূনানে ইবনে মাজাহ ১১৮)

রাসূলুল্লাহ ﷺ আরো বলেনঃ (হে আলী!) তুমি কি এতে খুশী হবে না যে, তোমার মর্যাদা আমার কাছে মূসা (আঃ) এর কাছে হারূন (আঃ) এর মতো। এ কথা ভিন্ন যে, আমার পর আর কোন নবী আসবে না। (সহীহ মুসলিম ৬১১২)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, "আমি ইলমের শহর আর আলী তাঁর দরজা, কেউ যদি ইলম তালাশ করতে চায় সে যেন দরজার (আলী) নিকটেই অন্বেষণ করে।’’ (হাকিম নিশাপুরীঃ আল-মুস্তাদরাক ৪৬৩৭, ইমাম তাবারানীঃ আল মু‘জামুল কাবীর ১১৬১, মোল্লা আলী ক্বারীঃ মিরকাত ৬০৯৬, জালালুদ্দিন সুয়ূতি, জামিউস সগীর ২৭০৫ ও জামিউল আহাদিস ৮৬৪৯)

হযরত মাওলা আলী রাঃ এঁর শান/ প্রশংসা খারেজী নাসেবী মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিতদের সহ্য হয়না। তারা তো উপরিউক্ত হাদিসকে জাল জয়ীফ এমনকি শিয়াদের বানানো বলেই চালিয়ে দিতে চাই। এদের নাম ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি, এই পোস্টে তাদের নামোল্লেখ করে পোস্টের সৌন্দর্য নষ্ট করলাম না। হ্যা, আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতায় অদৃশ্যের সংবাদদাতা নবী ﷺ এসব ব্যাপারে বলেই দিয়েছেন। উনার ফরমান অনুযায়ী হযরত মাওলা আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু হচ্ছেন ঈমান যাচাইয়ের কষ্টিপাথর।

মুসলিম শরীফে "আনসারদের এবং আলী (রা)-কে ভালোবাসা ঈমানের অংশ ও চিহ্ন এবং তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা নিফাকের চিহ্ন" পরিচ্ছেদে, নাসাঈ শরীফে "ঈমানের আলামত" এবং "মুনাফিকের আলামত" আলাদা আলাদা দুটি পরিচ্ছেদেই, এছাড়াও তিরমিজি, ইবনে মাজাহ'তেও যে হাদিস শরীফটা এসেছে তা হল হযরত আলী রা. কে মুমিনরাই ভালবাসবে এবং মুনাফিকরাই তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে। (সহীহ মুসলিম ১৪৩, সূনান আন নাসাঈ ৫০১৮, ৫০২২, সূনান ইবনে মাজাহ ১১৪, সূনান আত তিরমিজি ৩৭৩৬)

অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আর একটি ভবিষ্যদ্বাণী যার মূলকথা হচ্ছে,

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, "হে আলি! তোমার উপমা হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের মত। ঈসা আলাইহিস সালামকে ভালোবেসে অতিরঞ্জিত করে একদল পথভ্রষ্ট হয়েছে তারা হলো খ্রীষ্টান, আর তাঁকে হিংসা করেও একদল পথভ্রষ্ট হয়েছে তারা ইহুদী। অনুরুপ তুমি আলির সাথেও হবে। একদল তোমার ভালোবাসাতে অতিরঞ্জিত করে পথভ্রষ্ট হবে, আরেক দল তোমার সাথে হিংসা বিদ্বেষ রেখে পথভ্রষ্ট হবে।" (মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল, খন্ড-১, পৃষ্ঠা নং-১৬০; ফাজায়েলে সাহাবা, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, খন্ডঃ ২, পৃষ্ঠা নং-৬৩৯, হাদিস নং-১০৮৭)

হিজরি ৪০ সনের রমজান মাসে হযরত আলী রাঃ কে ইবনে মুলজিম নামে একজন খারেজী বর্তমান ইরাকে অবস্থিত কুফার শাহী মসজিদে বিষে মাখা একটি তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে। উনার শাহাদাতের তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলে থাকেন যেদিন আঘাত করা হয়েছে সেদিন ওফাতবরণ করেন আর কেউ কেউ বলেন আরো কয়েকদিন পর ওফাতবরণ করেন।

ইমাম জালালুদ্দিন সূয়ুতী রহঃ তাঁর খাসায়েসুল কুবরায় প্রিয় নবী ﷺ কর্তৃক মাওলা আলী রাঃ এঁর শাহাদাতের ভবিষ্যদ্বাণীর কথা উল্লেখ করে বলেন,

হযরত আলী রাঃ এঁর রেওয়ায়েতে রাসূলে করীম ﷺ বলেন, হে আলী! তোমার এ স্থানে এবং এ স্থানে আঘাত করা হবে (তিনি কানপট্টির দিকে ইশারা করলেন)। এ স্থান থেকে রক্ত প্রবাহিত হবে এবং তোমার দাড়ি রঞ্জিত হয়ে যাবে।

ইমাম সূয়ুতী রহঃ আরো উল্লেখ করেন, আম্মার ইবনে ইয়াসির রাঃ রেওয়ায়েত করেন রাসূলে করীম ﷺ হযরত আলী রাঃ কে বললেনঃ এক হতভাগা তোমার কানপট্টিতে তরবারী দ্বারা আঘাত করবে। ফলে তোমার দাড়ি রক্তাপ্লুত হয়ে যাবে। যুহরী রাঃ রেওয়ায়েত করেন, যেদিন সকালে হযরত আলী রাঃ নিহত হন, বায়তুল মোকাদ্দাসে যে পাথরই উত্তোলন করা হয়, তার নীচে রক্ত পাওয়া যায়। (খাসায়েসুল কুবরা ২য় খন্ড)

আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের সকলকে আহলে বাইত এবং সকল সাহাবায়ে কেরামের প্রতি পূর্ণ ভালবাসা পোষণ করার তাওফিক দান করেন। আহলে বাইত বিদ্বেষী এবং সাহাবী বিদ্বেষীদের ধোঁকা থেকে হেফাজত করেন। মাওলা আলী রাঃ এঁর উসিলায় আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।

পুবাল হাওয়াকে সম্বোধন করে জানানো কবি নজরুলের মত সালামের আরজি দিয়ে শেষ করছি,

পুবাল হাওয়া পশ্চিমে যাও কাবার পথে বইয়া।
যাও রে বইয়া এই গরীবের সালামখানি লইয়া।।

কাবার জিয়ারতের আমার নাই সম্বল ভাই,
সারা জনম সাধ ছিল যে, মদিনাতে যাই (রে ভাই)।
মিটল না সাধ, দিন গেল মোর দুনিয়ার বোঝা বইয়া।।

তোমার পানির সাথে লইয়া যাও রে আমার চোখের পানি,
লইয়া যাওরে এই নিরাশের দীর্ঘ নিশ্বাসখানি।
নবীজীর রওজায় কাঁদিও ভাই রে আমার হইয়া।।

মা ফাতেমা হযরত আলীর মাজার যেথায় আছে,
আমার সালাম দিয়া আইস তাঁদের পায়ের কাছে।
কাবায় মোনাজাত করিও আমার কথা কইয়া।।

সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া আসহাবিহি ওয়া সাল্লাম।