আমিরে মুয়াবিয়া (রা.)'র বিষয়ে ইমামগণের বক্তব্য | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

হযরত আমিরে মুয়াবিয়া (رضي الله عنه)'র বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকাইদের ইমামগণের বক্তব্য:

কৃতঃ মাওলানা মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ বাহাদুর


১.আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকায়েদের ইমাম ইমাম আবুল হাসান আশ‘আরী (রহ., ওফাত. ৩২৪ হিজরী), তিনি তাঁর একটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থে লিখেন-

فأما ما جرى من علي والزبير وعائشة رضي الله عنهم أجمعين، فإنما كان على تأويل واجتهاد، وعلي الإمام، وكلهم من أهل الاجتهاد، وقد شهد لهم النبي صلى الله عليه وسلم بالجنة والشهادة، فدل على أنهم كلهم كانوا على حق في اجتهادهم، وكذلك ما جرى بين سيدنا علي ومعاوية رضي الله عنهما، فدل على تأويل واجتهاد.

-‘‘সুতরাং হযরত আলী (رضي الله عنه) হযরত জোবাইর (رضي الله عنه) এবং হযরত আয়শা সিদ্দিকা (رضي الله عنه) এর মধ্যে পরস্পর যে বিবাদের মুখোমুখী হল তা মূলত জটিল ব্যাখ্যা ও (ইজতিহাদের) গবেষণার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, এবং হযরত আলী (رضي الله عنه) ইমাম (খলিফা ছিলেন) আর এরা সবাই গবেষক ছিলেন এবং তাদের জন্য হুযুর নবী করীম (ﷺ) জান্নাত এবং শাহাদাতের সুসংবাদ দিয়েছেন।

অতএব, এ থেকে বুঝা যায় যে, এরা সবাই নিজ নিজ গবেষণায় সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তেমনিভাবে হযরত আলী (رضي الله عنه) ও হযরত আমীরে মুয়াবিয়া (رضي الله عنه) এর মাঝে যে বিবাদ হল তাও জটিল ব্যাখ্যা ও (ইজতিহাদ) গবেষণার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।’’

(ইমাম আশ‘আরী, আল-ইবানাহ, পৃ: ২৬০, বাবুল কালামু ফি ইমামতে আবি বকর সিদ্দিক রা.)


তাই এর বিপরীতে যেই দল যেটিই দাবী করুক না কেনো সে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারী নয়। মহান রব রাফেজীদের (শীয়াদের) থেকে আমার ঈমান ও আমলকে হিফাযত করুন। আমিন


২.হযরত আমিরে মুয়াবিয়া (رضي الله عنه) বিষয়ে ইমাম গাযযালী রহ. এর অভিমত:


হুজ্জাতুল ইসলাম, সূফি, দার্শনিক, ইমাম গাযযালী (رحمة الله) নাম জানে না এমন তাসাউফ গবেষক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সর্ব মহলে তিনি প্রসিদ্ধ, তিনি পঞ্চম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ। তিনি তাঁর বিখ্যাত কিতাব ইহইয়াউল উলূম এ লিখেন-

وما جرى بين معاوية وعلي رضي الله عنهما كان مبنياً على الاجتهاد لا منازعة من معاوية في الإمامة

-‘‘হযরত আলী (رضي الله عنه) এবং হযরত আমীরে মুয়াবিয়া (رضي الله عنه) এর মাঝে বিবাদের ভিত্তি গবেষণার (ইজতিহাদ এর) উপর, এটা নয় যে, (ইমামত) নেতৃত্বের ব্যাপারে হযরত আমীরে মুয়াবিয়া (رضي الله عنه)-এর পক্ষ থেকে বিবাদ হয়েছে। (ইমাম গাযযালী, ইহ্য়াউল উলূম, খ-, ১, পৃ: ১১৫)


তাই দুজনেই মুজতাহিদ ছিলেন, আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (رضي الله عنه) ইজতিহাদই ছিল নির্ভুল, হযরত মুয়াবিয়া (رضي الله عنه) ইজতিহাদে হয়েছিল ভুল। মহান রব আহলে বায়আতের সঠিক শান মান এবং সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর মর্যাদা বুঝার তাওফিক দান করুন। আমীন


৩.ইমাম কুরতুবী আল-মালেকী (رحمة الله)'র অভিমতঃ


তাফসির গবেষকদের কাছে এক পরিচিত নাম আল্লামা ইমাম কুরতুবী আল-মালেকী (ওফাত. ৬৭১ হিজরী) তিনি লিখেন-

لَا يَجُوزُ أَنْ يُنْسَبَ إِلَى أَحَدٍ مِنَ الصَّحَابَةِ خَطَأٌ مَقْطُوعٌ بِهِ، إِذْ كَانُوا كُلَّهُمُ اجْتَهَدُوا فِيمَا فَعَلُوهُ وَأَرَادُوا اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ، وَهُمْ كُلُّهُمْ لَنَا أَئِمَّةٌ، وَقَدْ تَعَبَّدْنَا بِالْكَفِّ عَمَّا شَجَرَ بَيْنَهُمْ، وَأَلَّا نَذْكُرَهُمْ إِلَّا بِأَحْسَنَ الذِّكْرِ، لِحُرْمَةِ الصُّحْبَةِ وَلِنَهْيِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ سَبِّهِمْ، وَأَنَّ اللَّهَ غَفَرَ لَهُمْ، وَأَخْبَرَ بِالرِّضَا عَنْهُمْ.

-‘‘প্রিয় নবী (ﷺ)'র যে কোন একজন সাহাবীর দিকে নিশ্চিতরূপে ভুলের সম্বন্ধ করা বৈধ নয়, সেখানে তারা সবাই যা কিছু করেছেন, স্বীয় (ইজতিহাদ) গবেষণার দ্বারা করেছেন, আর তাঁরা আল্লাহ তা‘য়ালার সন্তুষ্টি কামনায় করেছেন এবং তাঁরা সবাই আমাদের পথপ্রদর্শক। আর আমাদের প্রতি এ বিষয়ের নির্দেশ রয়েছে যে, তাঁর মধ্যে পরস্পর যে বিবাদ হয়েছে তার থেকে যেন আমাদের মুখকে বিরত রাখি এবং তাদের স্মরণ যেন উত্তম বাক্যের সাথে করি, কেননা সাহাবি হওয়ার সম্মান বড়ই মর্যাদার বিষয়, এবং হুযূর নবী করীম (ﷺ) তাদেরকে মন্দ বলতে নিষেধ করেছেন, আর তার কারণ হল এই যে, মহান আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তাদের থেকে স্বীয় সন্তুষ্টির সুসংবাদ দিয়েছেন।’’ 

(জামেউল আহকামিল কুরআন লিল কুরতুবী, খ- ১৬, পৃ. ৩২১, সুরাতুল হুজরাত, ওয়াইন তায়েফাতানে মিনাল মু’মিনীনা এর ব্যাখ্যায়, দারুল কুতুব মিসরিয়্যাহ, কায়রু, মিশর, দ্বিতীয় প্রকাশ. ১৩৮৪ হি.)


৪."হযরত আমিরে মুয়াবিয়া (رضي الله عنه) বিষয়ে আল্লামা হাফেজ ইমাদুদ্দীন ইবনে কাসীর (رحمة الله)-এর অভিমত:


বিখ্যাত ঐতিহাসিক, মুফাসসির, হাফেযুল হাদিস, ইমাম ইবনে কাসীর (ওফাত. ৭৭৪ হিজরী) নাম জানে না এমন মুফাসসির, ইতিহাসবিদ এবং মুহাদ্দিস খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। আমাদের অনেক পরিচিত হযরত আমিরে মুয়াবিয়া রা. বিরোধীদের দেখা যায় তারা উনার লিখিত "আল-বেদায়া ওয়ান নিহায়া" থেকে অনেক ক্ষেত্রে দলিল দেয়ার চেষ্টা করেন; আজকে আমি সে কিতাব থেকে আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (رضي الله عنه) এবং হযরত মুয়াবিয়া (رضي الله عنه) দন্ধের বিষয়ে তিনি চূড়ান্ত কি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তা তুলে ধরার চেষ্টা করব। আর আমরা সে উদ্ধৃতিতে দেখব যে তিনি তাঁর কিতাবে নিজের কোন বক্তব্য তুলে ধরেননি, বরং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত এর আক্বিদা তুলে ধরেছেন। এবার মূল আলোচনায় আসি।


ইমাম ইবনে কাসির (رحمة الله) সিফফীনের যুদ্ধের দন্ধের সমাধানকল্পে লিখেন-


وَفِيهِ أَنَّ أَصْحَابَ عَلِيٍّ أَدْنَى الطَّائِفَتَيْنِ إِلَى الْحَقِّ، وَهَذَا هُوَ مَذْهَبُ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ أَنَّ عَلِيًّا هُوَ المصيب وإن كان معاوية مجتهدا، وهو مأجور إن شاء الله،

-‘‘এ হাদিস দ্বারা এটাও প্রমাণিত হল যে, হযরত আলী (رضي الله عنه) এর সাথীগণ উভয় দলের মধ্যে সত্যের অতিনিকটতম ছিলেন, এটাই হল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের নীতি যে, হযরত আলী (رضي الله عنه) (স্বীয় গবেষণায়) সত্যের উপর ছিলেন, যদিওবা হযরত আমীরে মুয়াবিয়া (رضي الله عنه) গবেষক (মুজতাহিদ) হওয়ার কারণে (গবেষণায় ভুল হওয়ায়) ইনশাআল্লাহ তা‘য়ালা (১টি) পুরস্কার প্রাপ্ত।’’ (দেখুন-ইমাম ইবনে কাসির, আল-বেদায়া ওয়ান নিহায়া, সপ্তম খণ্ড, পৃ. ২৭৯, দারুল ফিকর ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন।)


৫.ইমাম হাফেজ ইবনে হাজার হায়তমী মাক্কী (رحمة الله) (ওফাত. ৯৭৪ হিজরী) লিখেছেন-


وَالْوَاجِب أَيْضا على كل من سمع شَيْئا من ذَلِك أَن يثبت فِيهِ وَلَا ينْسبهُ إِلَى أحدهم بِمُجَرَّد رُؤْيَته فِي كتاب أَو سَمَاعه من شخص بل لَا بُد أَن يبْحَث عَنهُ حَتَّى يَصح عِنْده نسبته إِلَى أحدهم فَحِينَئِذٍ الْوَاجِب أَن يلْتَمس لَهُم أحسن التأويلات

-‘‘এবং যে ব্যক্তি মহান সাহাবা (رضي الله عنه) গণের মত পার্থক্য এবং দ্ব্যর্থবোধকতা সম্পর্কে কোন কথা শুনে তখন তার উপর এ বিষয়ের ব্যাপারে অনুসন্ধান করা ওয়াজিব এবং শুধু কোন কিতাবে দেখে নেয়া কিংবা কোন ব্যক্তির কাছে শুনার ভিত্তির উপর সে ভুলকে তাদের মধ্য থেকে কারো প্রতি সম্পর্কিত করবে না। বরং এটা আবশ্যক যে, সেটার অনুসন্ধান করবে। এভাবে যদি তাদের প্রতি সেটার সম্পর্ক বিশুদ্ধ প্রমাণিত হয়ে যায়; তখন এ স্তরের (আলেমদের) উপর ওয়াজিব হল যে, তাদের জন্য চমৎকার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সন্ধান করা।’’ 

(ইবনে হাজার মক্কী, আস-সাওয়াকুল মুহারিকা, ২/৬২১ পৃ. ফি বয়ানে আকাঈদে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতু ফিস সাহাবা)