বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম কুস্তালানী (রহঃ) এর মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া গ্রন্থের “নূর বিষয়ক” অধ্যায়ঃ (পর্ব ৩) | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস


একসাথে সকল পর্ব :

http://sunni-encyclopedia.blogspot.com/2015/10/blog-post_15.html?m=1

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম কুস্তালানী (রহঃ) এর মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া গ্রন্থের “নূর বিষয়ক” অধ্যায়ঃ (পর্ব ৩)
অনুবাদ : কাজী সাইফুদ্দীন হোসাইন

প্রারম্ভিক শৈশবকালীন মো’জেযা (অলৌকিকত্ব)

[হালিমা (রা:) আরও বর্ণনা করেন] “আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে সাথে করে ফেরত নিয়ে আসার দুই বা তিন মাস পরে আমরা আমাদের বাড়ির পেছনে নিজস্ব কিছু গবাদি পশুর যত্ন নেয়ার সময় তাঁর দুধ-ভাই (হালিমার ছেলে)
ছুটে আসে এই বলে চিৎকার করতে করতে – ‘আমার কুরাইশ-গোত্রীয় ভাইয়ের কাছে সাদা পোশাক-পরিহিত দু’জন মানুষ আসেন। তাঁরা তাঁকে শুইয়ে তাঁর বক্ষবিদীর্ণ করেন।’ ছেলের বাবা ও আমি তৎক্ষণাৎ ছুটে যাই। মহানবী (দ:) তখন দাঁড়ানো এবং তাঁর চেহারার রং বদলে গিয়েছে। তাঁর (পালক) বাবা তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং জিজ্ঞেস করেন, ‘ওহে পুত্র! কী হয়েছে আপনার?’ সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দেন, ‘সাদা পোশাক পরা দুই ব্যক্তি আমার কাছে আসেন। তাঁরা আমাকে শুইয়ে আমার বক্ষবিদীর্ণ করেন। অতঃপর তাঁরা (শরীরের) ভেতর থেকে কিছু একটা বের করে ফেলে দেন এবং বক্ষ যেমনটি ছিল ঠিক তেমনটি জোড়া লাগিয়ে দেন।’ আমরা তাঁকে বাড়ি নিয়ে আসি এবং তাঁর (পালক) পিতা বলেন, ‘ওহে হালিমা! আমি আশংকা করি আমাদের এই ছেলের কিছু একটা হয়েছে। আরও খারাপ কিছু হওয়ার আগে চলো তাঁকে তাঁর পরিবারের কাছে ফেরত দিয়ে আসি!’

“আমরা রাসূল (দ:)-কে মক্কায় তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা তাঁকে নেয়ার জন্যে এতো আগ্রহ প্রকাশের পরে কী কারণে আবার ফেরত এনেছো?’ আমরা তাঁকে জানাই যে মহানবী (দ:)-এর খারাপ কিছু হতে পারে ভেবে আমরা শংকিত (তাই নিয়ে এসেছি)। আমিনা (রা:) বলেন, ‘তা হতে পারে না; তোমরা সত্য কথাটি বলো যে আসলে কী হয়েছে।’ তিনি তাঁর অবস্থানে অনড় থাকার দরুন আমরা আসল ঘটনা খুলে বলি। এমতাবস্থায় তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কি ভয় পেয়েছো যে শয়তান তাঁর ক্ষতি করবে? না, তা কখনোই হতে পারে না। আল্লাহর কসম, শয়তান কোনোক্রমেই তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমার এই ছেলে মহা সম্মানের অধিকারী কেউ হবেন। তোমরা এক্ষণে তাঁকে (আমার কাছে) রেখে যেতে পারো’!”

হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস (রা:) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান: “আমি বনী সা’আদ ইবনে বকর গোত্রে (দুধ-মায়ের) লালন-পালনে থাকাকালীন একদিন আমার সমবয়সী ছোট ছেলেদের সাথে খেলছিলাম। এমনি সময়ে হঠাৎ তিনজন ব্যক্তি আবির্ভূত হন। তাঁদের কাছে ছিল বরফভর্তি সোনালী রংয়ের একখানা ধোয়াধুয়ি করার পাত্র। তাঁরা আমাকে আমার বন্ধুদের কাছ থেকে আলাদা করেন, আর আমার বন্ধুরা সবাই বসতীর দিকে দৌড়ে ফেরত যান। ওই তিনজনের মধ্যে একজন আমাকে আলতোভাবে মাটিতে শুইয়ে আমার বুক হতে তলপেটের হাড় পর্যন্ত বিদীর্ণ করেন। আমি তা দেখতে সক্ষম হই এবং আমার এতে কোনো ব্যথা-ই অনুভূত হয়নি। তিনি আমার নাড়িভুঁড়ি বের করে বরফ দ্বারা সেটি ভালভাবে কাচেন এবং আবার যথাস্থানে স্থাপন করেন। দ্বিতীয়জন দাঁড়িয়ে তাঁর সাথীকে সরে যেতে বলেন। অতঃপর তিনি তাঁর হাত ঢুকিয়ে আমার হৃদযন্ত্র বের করে আনেন, যা আমি দেখতে পাই। তিনি তা কেটে ওর ভেতর থেকে একটি কালো বস্তু বের করে ছুড়ে ফেলে দেন এবং তাঁর দুই হাত ডানে ও বামে নাড়তে থাকেন, যেন হাতে কিছু একটা গ্রহণ করছিলেন। অকস্মাৎ তাঁর হাতে চোখ-ধাঁধানো আলোর একখানি আংটি দেখা যায়। তিনি আমার হৃদযন্ত্রের ওপর তা দ্বারা ছাপ বসিয়ে দেন, যার দরুন সেটিও আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে।


 এটি-ই নবুওয়্যত ও জ্ঞান-প্রজ্ঞার নূর (জ্যোতি)। অতঃপর তিনি আমার হৃদযন্ত্র যথাস্থানে পুনঃস্থাপন করেন এবং আমি সেই আংটির শীতল স্পর্শ দীর্ঘ সময় যাবত পাই। তৃতীয়জন এবার তাঁর সহযোগীকে সরে দাঁড়াতে বলেন। তিনি তাঁর হাত আমার বিদীর্ণ বক্ষের ওপর বুলিয়ে দিলে আল্লাহর মর্জিতে তা মুহূর্তে জোড়া লেগে যায় (অর্থাৎ, সেরে ওঠে)। এরপর তিনি সযত্নে আমার হাত ধরে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেন এবং প্রথমজনকে বলেন, ‘তাঁর জাতির দশজনের সাথে তাঁকে মাপুন।’ আমি তাদের চেয়ে ওজনে ভারী প্রমাণিত হই। অতঃপর তিনি আবার বলেন, ‘তাঁর জাতির এক’শ জনের সাথে তাঁকে পরিমাপ করুন।’ আমি তাদের চেয়েও ভারী হই। এবার তিনি বলেন, ‘তাঁকে তাঁর সমগ্র জাতির সাথে মাপলেও তিনি ভারী হবেন।’ তাঁরা সবাই আমাকে জড়িয়ে ধরেন, কপালে চুমো খান এবং বলেন, ‘ওহে হাবীব (দ:)! আপনার জন্যে যে মঙ্গল ও কল্যাণ অপেক্ষা করছে তা জেনে আপনি খুশি-ই হবেন’।” এই হাদীসে পরিমাপ করার বিষয়টি হলো নৈতিকতা। অতএব, মহানবী (দ:) সবাইকে নৈতিকতা ও সদগুণাবলীতে ছাড়িয়ে গিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর ’সীনা চাক’ (বক্ষ বিদারণ) জিবরাইল আমীন (আ:) কর্তৃক হেরা গুহায় ওহী বহন করে নিয়ে আসার সময় আরেকবার হয়েছিল; এছাড়া মে’রাজের রাতে ঊর্ধ্বগমনের সময়ও আরেকবার বক্ষবিদারণ হয়েছিল তাঁর। আবূ নুয়াইম নিজ ‘আদ্ দালাইল’ পুস্তকে বর্ণনা করেন যে হুযূর পূর নূর (দ:)-এর বিশ বছর বয়সে আরও একবার ’সীনা চাক’ হয়েছিল। তাঁর শৈশবে এটি হওয়ার এবং কালো বস্তু অপসারণের হেকমত বা রহস্য ছিল তাঁকে সমস্ত ছেলেমানুষি বৈশিষ্ট্য হতে মুক্ত করে প্রাপ্তবয়স্কদের (গুরুগম্ভীর) চিন্তা ও মননে বিভূষিত করা। তাঁর বেড়ে ওঠা তাই নিখূুঁতভাবে সম্পন্ন হয়। তাঁর দু’কাঁধের মাঝামাঝি স্থানে মোহরে নবুওয়্যতের সীলমোহর দেয়া হয়, যা থেকে মেশকের সুগন্ধ বের হতো এবং যা দেখতে একখানা তিতিরজাতীয় পাখির ডিমের মতো ছিল।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) ছয় বছর বয়সে উপনীত হলে তাঁর মা আমিনা (রা:) ও উম্মে আয়মান (রা:) তাঁকে এয়াসরিবে (মদীনায়) অবস্থিত ’দারুল তাবে’আ’-তে তাঁরই বনূ আদী’ ইবনে আল-নাজ্জার গোত্রভুক্ত মামাদের বাড়িতে মাসব্যাপী এক সফরে নিয়ে যান। পরবর্তীকালে ওই জায়গায় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা তিনি স্মরণ করেন। কোনো একটি নির্দিষ্ট বাড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “এখানেই আমি ও আমার মা থেকেছিলাম। বনূ আদী’ ইবনে আল-নাজ্জার গোত্রের মালিকানাধীন হাউজ বা জলাধারে আমি সাঁতার শিখেছিলাম। একদল ইহুদী আমাকে দেখতে ঘনঘন এই স্থানে আসতো।” উম্মে আয়মান (রা:) বলেন, “আমি ইহুদীদের একজনকে বলতে শুনেছি যে সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম হলেন এই জাতির পয়গম্বর; আর এটি-ই হলো তাঁর হিজরতের স্থান। ইহুদীরা যা বলাবলি করেছিল, তার সবই আমি বুঝতে পেরেছিলাম।”


অতঃপর রাসূলুল্লাহ (দ:) ও তাঁর মা মক্কা মোয়াযযমায় ফিরতি যাত্রা আরম্ভ করেন। কিন্তু এয়াসরিবের অদূরে আল-আবূআ’ নামের জায়গায় পৌঁছুলে মা আমিনা (রা:) ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। আল-যুহরী (রা:) হযরত আসমা’ বিনতে রাহম (রা:) হতে, তিনি তাঁর মা হতে বর্ণনা করেন, যিনি বলেন: “আমি মহানবী (দ:)-এর মা আমিনা (রা:)-এর শেষ অসুখের (মৃত্যুব্যাধির) সময় উপস্থিত ছিলাম। ওই সময় মহানবী (দ:) ছিলেন মাত্র পাঁচ বছরের এক শিশু। তিনি যখন মায়ের শিয়রে বসা, তখন আমিনা (রা:) কিছু কবিতার ছত্র পড়ছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি হুযূর পূর নূর (দ:)-এর মোবারক চেহারার দিকে তাকিয়ে বলেন:‘(পৃথিবীতে) সকল প্রাণি-ই মৃত্যুবরণ করবে; যাবতীয় নতুন বস্তু-ও পুরোনোয় পরিণত হবে; আর প্রতিটি প্রাচুর্য-ও কমে যাবে; আমি মৃত্যুপথযাত্রী হলেও স্মৃতি আমার চিরসাথী হবে; আমি রেখে যাচ্ছি অফুরন্ত কল্যাণ এবং জন্ম দিয়েছি পুতঃপবিত্র সত্তাকে এই ভবে।’ এ কথা বলে তিনি ইন্তেকাল করেন। আমরা তাঁর তিরোধানে জ্বিনদের কাঁন্নার আওয়াজ শুনতে সক্ষম হই।”

বর্ণিত আছে যে হযরত আমিনা (রা:) তাঁর ইন্তেকালের পরে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর রেসালাতের প্রতি শাহাদাত তথা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। আত্ তাবারানী (রহ:) হযরত আয়েশা (রা:) হতে নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) আল-হাজূন নামের স্থানে পৌঁছুলে তিনি অন্তরে অত্যন্ত বেদনাক্লিষ্ট হন। আল্লাহতা’লার যতোক্ষণ ইচ্ছা, ততোক্ষণ তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। ওখান থেকে ফেরার পর তিনি খুশি হন এবং বলেন, “আমি আমার মহাপরাক্রমশালী ও মহান প্রভুর (খোদাতা’লার) দরবারে আরয করেছিলাম আমার মাকে তাঁর হায়াত (জীবন) ফিরিয়ে দিতে। তিনি তা মঞ্জুর করেন এবং তারপর আবার মাকে ফেরত নিয়ে যান (পরলোকে)।” আস্ সুহায়লী ও আল-খাতীন উভয়ই বর্ণনা করেন হযরত আয়েশা (রা:)-এর কথা, যিনি বলেন যে আল্লাহ পাক হুযূর পূর নূর (দ:)-এর পিতামাতা দু’জনকেই পুনরায় জীবিত করেন এবং তাঁরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের রেসালাতের প্রতি শাহাদাত বা সাক্ষ্য প্রদান করেন।

আল-কুরতুবী তাঁর ‘আত্ তাযকেরা’ গ্রন্থে বলেন, “সাইয়্যেদুনা মোহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও সদগুণাবলী তাঁর সারা (যাহেরী/প্রকাশ্য) জিন্দেগী জুড়ে প্রকাশমান ছিল। তাঁর পিতামাতাকে আবার জীবিত করে তাঁর প্রতি ঈমান আনার ব্যাপারটি মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। ইসলামী বিধানে বা যুক্তিতে এমন কিছু নেই যা এর বিরোধিতা করে।” পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে যে বনী ইসরাঈল বংশের এক ব্যক্তি খুন হওয়ার পর তাকে আবার জীবিত করে খুনী কে ছিল তা জানানো হয়। অধিকন্তু, আমাদের পয়গম্বর ঈসা (আ:) [যীশু খৃষ্ট] মৃতকে জীবিত করতেন। অনুরূপভাবে, আল্লাহতা’লা আমাদের মহানবী (দ:)-এর দ্বারাও কিছু সংখ্যক মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করেন। তাহলে রাসূল-এ-করীম (দ:) কর্তৃক তাঁর পিতামাতাকে পুনরায় জীবিত করে তাঁর নবুওয়্যতের প্রতি সাক্ষ্য প্রদানের বিষয়টি কেন অসম্ভব হবে, যেখানে এটি তাঁরই শান-শওকত ও মহিমা প্রকাশ করছে?


ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর মতে, সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের সকল পূর্বপুরুষ-ই মুসলমান। এটি রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বাণী থেকেও প্রমাণিত। তিনি (দ:) বলেন, “আমাকে পুতঃপবিত্র পুরুষদের ঔরস থেকে পুতঃপবিত্র নারীদের গর্ভে স্থানান্তর করা হয়।” আর যেহেতু আল্লাহ পাক বলেছেন, “নিশ্চয় অবিশ্বাসীরা নাজাস তথা অপবিত্র”, তাই আমরা (এ আয়াতের আলোকে) দেখতে পাই যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের পূর্বপুরুষদের কেউই অবিশ্বাসী ছিলেন না।

হাফেয শামস আদ্ দীন আদ্ দামেশকী (রহ:) এই বিষয়ে কী সুন্দর লিখেছেন:

“আল্লাহ পাক তাঁর নবী (দ:)-এর প্রতি নিজ আশীর্বাদ করেছেন বর্ষণ
এছাড়াও তিনি তাঁর প্রতি ছিলেন সর্বাধিক দয়াবান
তিনি তাঁর মাতা এবং পিতাকেও ফিরিয়ে দিয়েছেন তাঁদের জীবন
যাতে তাঁরা করতে পারেন তাঁর নবুওয়্যতের সাক্ষ্যদান
নিশ্চয় তা ছিল সূক্ষ্ম করুণার এক নিদর্শন
অতএব, এসব অলৌকিকত্বে করো বিশ্বাস স্থাপন
কেননা, আল্লাহতা’লা এগুলোর সংঘটনকারী হিসেবে সামর্থ্যবান
যদিও বা এতে তাঁর সৃষ্টিকুলের শক্তি-সামর্থ্য ম্লান।”

সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের মায়ের ইন্তেকালের পরে উম্মে আয়মান (রা:) তাঁর সেবাযত্নের দায়িত্ব নেন। মহানবী (দ:) তাঁর সম্পর্কে বলতেন, “আমার মায়ের পরে উম্মে আয়মান হলেন আমার (দ্বিতীয়া) মা।” রাসূলুল্লাহ (দ:) আট বছর বয়সে উপনীত হলে তাঁর দাদা ও অভিভাবক আবদুল মোত্তালিব ইন্তেকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল এক’শ দশ বছর (অপর বর্ণনায় এক’শ চল্লিশ বছর)। ইন্তেকালের সময় তাঁরই অনুরোধে মহানবী (দ:)-এর চাচা আবূ তালেব তাঁর অভিভাবক হন। কেননা, তিনি ছিলেন হুযূর পূর নূর (দ:)-এর পিতা আবদুল্লাহ’র আপন ভাই।

ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন জালহামা ইবনে উরফাতা হতে; সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ ফরমান: “আমি এক খরার সময় মক্কায় আবির্ভূত হই। কুরাইশ গোত্রের কয়েকজন আবূ তালেবের কাছে এসে আরয করেন, ‘হে আবূ তালেব, এই উপত্যকা অনুর্বর এবং সকল পরিবার আর্তপীড়িত। চলুন, আমরা বৃষ্টির জন্যে প্রার্থনা করি।’ আবূ তালেব (ঘর থেকে) বেরিয়ে আসেন, আর তাঁর সাথে ছিলেন এক বাচ্চা ছেলে, যাঁকে দেখতে লাগছিল মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা সূর্যের মতো। তাঁর আশপাশে ঘিরে ছিল অন্যান্য শিশুর দল। আবূ তালেব তাঁকে কা’বাগৃহের দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড় করিয়ে দেন। আকাশে ওই সময় মেঘের কোনো লেশচিহ্ন মাত্র ছিল না। কিন্তু যেমনি ওই বালক তাঁর হাত দুটো ওপরে তোলেন, অমনি সবদিক থেকে মেঘ আসা আরম্ভ করে এবং বৃষ্টিও নামে – প্রথমে অল্প, শেষে অঝোর ধারায়। ফলে উপত্যকা এলাকা উর্বর হয়ে ওঠে, আর মক্কা ও বাইরের মরুভুমি অঞ্চলও শস্যশ্যামলতা ফিরে পায়। এই মো’জেযা (অলৌকিক ঘটনা) সম্পর্কে আবূ তালেব (পদ্যাকারে) লেখেন:

‘জ্যোতির্ময় চেহারার সেই পবিত্র সত্তার সকাশে
যাঁর খাতিরে বারি বর্ষে
তিনি-ই এয়াতীমবর্গের আশ্রয়স্থল সবশেষে
আর বিধবাদের ভরসার উপলক্ষ নিঃশেষে’।”

                                                                  *সমাপ্ত*