কুরআনে কেন হরকত দেয়া হলো? | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

কুরআনে কেন হরকত দেয়া হলো?


ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী


======
শায়খ আবুল আসওয়াদ রহঃ (৬০৩ - ৬৮৯ খ্রিঃ) দেখলেন তার কন্যা ছাদে বসে আকাশের সৌন্দর্য উপভোগ করছে। মেঘমুক্ত খোলা আকাশে তখন লক্ষ-কোটি তারকার ঝাঁঝালো মেলা। অন্ধকার রাত। আরব্য রজনীতে তাই আকাশের সৌন্দর্য অন্যরকম উচ্চতায় পৌঁছে থাকে। একদিকে আদম সূরত তো অন্যদিকে সাতজালি মানে সাতটি উজ্জ্বল তারকার গোলটেবিল বৈঠক। একদিকে বড় ভল্লূক তো অন্যদিকে ছোট ভল্লূক। উত্তরাকাশে তখন সাতটি তারকার একটি প্রশ্নবোধক বলয়। কন্যা আকাশের দিকে তাকিয়ে এর অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করছে তো করছেই। সে অভিভূত, বিস্মিত এবং মুগ্ধ। পিতাকে দেখে মনের ভাব প্রকাশ করতে কন্যা বলে উঠলো, "মা আহছানু ছ-ছামা-ই?" (ما أحسنُ السماءِ) যার অর্থ হলো আকাশকে কিসে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে? কবি পিতা উত্তরে বললেন, আকাশের তারকারাজি একে এতো সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে। উত্তর শুনে কন্যা আরো অবাক হয়ে বলতে লাগলো, "বাবা, আমি তো উত্তর শোনার জন্য কিছু জানতে চাইনি। আকাশের এমন সৌন্দর্য দেখে আমি অবাক হয়েছি। তাই আকাশের এমন রূপ দেখে মনের ভাব প্রকাশ করেছি।" এবার পিতা বললেন, তাহলে তুমি এভাবে বলো, "মা আহছানা ছ-ছামা-আ?" (ما أحسنَ السماء) নুন এবং হামজার উপর জবর দিয়ে বলো। তুমি তো নুনের উপর পেশ এবং হামজার নিচে জের দিয়ে বলেছো। এতে তোমার মনের ভাব প্রকাশ না হয়ে প্রশ্ন হয়ে গিয়েছে যে, "কি সে আকাশকে এমন সুন্দর করেছে?" 

অন্য আরেকদিন আবুল আসওয়াদ রহঃ লক্ষ্য করলেন এক ব্যক্তি কুরআনের সূরা তওবার তিন নম্বর আয়াতটি পড়ছে ভিন্ন ভাবে, (أَنَّ اللَّهَ بَرِيءٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ وَرَسُولُهُ) অর্থাৎ রাসূলাহু'র স্থলে রাসূলিহী পড়ছে। আয়াতের এই অংশের অর্থ হলো, "আল্লাহ মুশরেকদের থেকে দায়িত্ব মুক্ত এবং তাঁর রসূলও"। মক্কা বিজয়ের পর মুসলমানগণ যখন প্রথম হজের দায়িত্ব হাতে নেন, তখন আল্লাহ্‌ পাক ঘোষণা করতে বলেন যেন এ বছরের পর থেকে কাফির ও মুশরিকগণ হজ করতে না আসে। তাদের দায়িত্ব আল্লাহ ও তাঁর রাসূল নিবেন না। কিন্তু ওই ব্যক্তির ভুল উচ্চারণের কারণে এর অর্থ উল্টে গিয়ে হয়েছে, আল্লাহ্‌ পাক মুশরিক ও রাসূল থেকে দায়িত্বমুক্ত। [নাউজুবিল্লাহ। এ কথা লেখার কারণে আল্লাহ্‌ পাক আমাকে ক্ষমা করুন। আমি কেবল অবস্থাটা বোঝানোর জন্য তা উল্লেখ করলাম।]

আবুল আসওয়াদ রহঃ পরদিন সকাল বেলাতেই সমস্ত মুমিনগণের মওলা আলী কারামুল্লাহ ওয়াজহুর দরবারে গেলেন এবং পরপর দুটো ঘটনা অবগত করলেন। মওলা আলী আলাইহিস সালাম এ কথা শুনে উত্তরে বললেন, ইসলামী খেলাফত দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ার কারণে অগণিত অনারব আরবদের সাথে মিশছে। আরব-অনারব একসাথে মেলামেশার কারণে আরবদের মাঝে আরবি ভাষার প্রতি মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে। মওলা আলী ব্যাপারটি খুব গভীর মনোযোগ সহকারে গ্রহণ করলেন এবং এর সমাধানের জন্য আবুল আসওয়াদ রহঃকে আরবি গ্রামার গ্রন্থনা করার উদ্যোগ নিতে বলেন। মওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু শুরু করলেন, কালাম বা শব্দ তিন ধরণেরঃ ইছম (বিশেষ্য), ফি'ল (ক্রিয়া) এবং হরফ (অব্যয়)। আরবি গ্রামার লিখে শেষ করার পর অভিভূত হয়ে নিজেই বললেন, «ما أحسن هذا النحو الذي نحوت»، فمن ثم سُميّ النحو نحوًا - অর্থাৎ, নাহু কি চমৎকার যা আমাদেরকে নতুন জীবন দিয়েছে। এ থেকেই নাহুকে নাহু হিসেবে নামকরণ করা হয়। 

আবুল আসওয়াদ রহঃ নবী করীম ﷺ এঁর জীবদ্দশাতেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে নবীজীর ﷺ সাক্ষাৎ লাভ করতে পারেন নি বলে সাহাবী হবার গৌরব লাভে ব্যর্থ হন। আবুল আসওয়াদ আদ দুআল্লিকে আরবি গ্রামারের উদ্ভাবক বলা হয়। তবে তা করেছেন মওলা আলী কারামুল্লাহু ওয়াজহুর পরামর্শে। তিনি আরবি অক্ষরে নোকতা এবং হরকতের প্রবর্তন করেন। এর পূর্বে আরবিতে কোনও নোকতা ছিল না। পরবর্তীতে স্বৈরশাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নেতৃত্বে আবুল আসওয়াদ রহঃ দুজন ছাত্র কুরআনের হরকত অর্থাৎ জের-জবর-পেশ এসব যোগ করেন। 

কাজেই কুরআনের নোকতা এবং হরকত এ সবই বড় বিদআত। তবে উত্তম বিদআত।