বিষয়ঃ- নামাজে দুই পায়ের মাঝখানে স্বাভাবিক ফাঁকা রাখার বিধান। | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

বিষয়ঃ- নামাজে দুই পায়ের মাঝখানে স্বাভাবিক ফাঁকা রাখার বিধান।

১) হাদীস শরীফঃ-

حَدَّثَنَا وَكِيعٌ ، عَنْ عُيَيْنَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ ، قَالَ : كُنْتُ مَعَ أَبِي فِي الْمَسْجِدِ فَرَأَى رَجُلاً صَافًّا بَيْنَ قَدَمَيْهِ فَقَالَ أَلْزِقْ إحْدَاهُمَا بِالأُخْرَى لَقَدْ رَأَيْت فِي هَذَا الْمَسْجِدِ ثَمَانيَةَ عَشَرَ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم مَا رَأَيْت أَحَدًا مِنْهُمْ فَعَلَ هَذَا قَطُّ

অনুবাদ: উয়াইনা বিন আব্দুর রহমান বলেন: আমি আমার পিতার সাথে মসজিদে ছিলাম। অতঃপর তিনি এক ব্যক্তিকে দেখলেন সে দু’পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বললেন: এক পায়ের সাথে অপর পা মিলিয়ে দাঁড়াও। আমি এ মসজিদে আঠারো জন সাহাবাকে দেখেছি, তাঁদের কেউ এমন করতেন না। (ইবনে আবী শাইবা: ৭১৩৬)

✔ হাদীসটির স্তর : সহীহ, মাউকুফ। এ হাদীসের রাবীগণের মধ্যে হযরত ওয়াকী’ প্রসিদ্ধ ইমাম। তাঁর উসতাদ উয়াইনা বিন আব্দুর রহমান ثقةٌ “নির্ভরযোগ্য”। (আল কাশেফ: ৪৪১১) আর উয়াইনার পিতা আব্দুর রহমানও ثقةٌ “নির্ভরযোগ্য”। (তাকরীব: ৪২৬৯)

☑ সারসংক্ষেপ : এ হাদীসে বর্ণিত উভয় পা মিলিয়ে রাখার নির্দেশ দ্বারা উদ্দেশ্য একেবারে মিলিয়ে রাখা নয়। বরং সামান্য ফাঁকা  রাখা; নিম্নে বর্ণিত হাদীসে তার বিবরণ আসছে।

২) হাদীস শরীফঃ-

حَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ، حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ عُمَرَ، حَدَّثَنَا صَالِحُ بْنُ رُسْتُمَ أَبُو عَامِرٍ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ قَيْسٍ، عَنْ يُوسُفَ بْنِ مَاهَكَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ فَلاَ يَضَعْ نَعْلَيْهِ عَنْ يَمِينِهِ وَلاَ عَنْ يَسَارِهِ فَتَكُونَ عَنْ يَمِينِ غَيْرِهِ إِلاَّ أَنْ لاَ يَكُونَ عَنْ يَسَارِهِ أَحَدٌ وَلْيَضَعْهُمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ‏( رَوَاه ابُوْ دَاود فِىْ بَابِ الْمُصَلِّي إِذَا خَلَعَ نَعْلَيْهِ أَيْنَ يَضَعُهُمَا)

‏ 
অনুবাদঃ- হযরত আবু হুরাইরা (রাদ্বিয়াল্লাহ আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমাদের কেউ যখন নামায পড়ে তখন তার জুতো যেন ডানে না রাখে এবং বামেও না রাখে; কেননা তা অপরের ডান। হ্যাঁ, বামে কেউ না থাকলে ভিন্ন কথা। বরং সে যেন তার জুতো দু’পায়ের মাঝে রাখে। (আবু দাউদ: ৬৫৪)

✔ হাদীসটির স্তর : হাসান। আব্দুর রহমান বিন কায়েস ব্যতীত এ হাদীসের রাবীগণ সবাই-ই বুখারী-মুসলিমের রাবী।

আর আব্দুর রহমান مقبول “গ্রহণযোগ্য”। (তাকরীব: ৪৪৫৯) জামিউল উসূলের তাহকীকে শায়খ আব্দুল কাদের আরনাউত বলেন: وهو حديث حسن “হাদীসটি হাসান”। (জামিউল উসূল: ৩৬২১) শায়খ আলবানী হাদীসটিকে হাসান-সহীহ বলেছেন। (সহীহ-জঈফ  আবু দাউদ: ৬৫৪)

☑ সারসংক্ষেপ : দু’পায়ের মাঝে জুতো রাখার অনুমতি থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, নামাযী ব্যক্তি তার দু’পায়ের মাঝে এতটুকু ফাঁকা রাখবে যাতে ইচ্ছে করলে জুতো রাখা যায়। আর তার পরিমাণ চার থেকে ছয় ইঞ্চি হতে পারে।


৩) হাদীস শরীফঃ-

أَخْبَرَنَا عَمْرُو بْنُ عَلِيٍّ قَالَ: حَدَّثَنَا يَحْيَى، عَنْ سُفْيَانَ بْنُ سَعِيدٍ الثَّوْرِيِّ، عَنْ مَيْسَرَةَ، عَنْ الْمِنْهَالِ بْنِ عَمْرُو، عَنْ أَبِي عُبَيْدَةَ، أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ، رَأَى رَجُلًا يُصَلِّي قَدْ صَفَّ بَيْنَ قَدَمَيْهِ فَقَالَ: «خَالَفَ السُّنَّةَ وَلَوْ رَاوَحَ بَيْنَهُمَا كَانَ أَفْضَلَ» ( رَوَاه النَّسَائِىْ فِىْ بَابِ الصَّفُّ بَيْنَ الْقَدَمَيْنِ فِي الصَّلَاةِ)

অনুবাদ : হযরত আবু উবাইদা রহ. বলেন: হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)  এক ব্যক্তিকে দেখলেন দু’পা ছড়িয়ে দিয়ে নামায পড়ছে। তিনি বললেন: লোকটি সুন্নাত পরিপন্থী কাজ করেছে। যদি সে দু’পায়ের ওপর পালাক্রমে ভর করে নামায আদায় করতো তাহলে সেটা উত্তম হতো। 

রেফারেন্সঃ- ১) নাসাঈ শরীফ, হাদীস নং-৮৯৫,
২) ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-৭১৩৫।


✔ হাদীসটির স্তর : হাসান, মারফু’। মাইসারা ব্যতীত এ হাদীসের রাবীগণ সবাই-ই বুখরীর রাবী। আর মাইসারা ثقةٌ “নির্ভরযোগ্য”। (আল কাশেফ: ৫৭৫২) মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবার তাহকীকে শায়খ মুহাম্মাদ আউওয়ামা বলেন: "হাদীসটির সনদ হাসান"।

☑ ফায়দা : হযরত আবু উবাইদাহ তাঁর পিতা হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে কিছুই  শুনেননি মর্মে অনেকে মন্তব্য করে এ হাদীসটিকে সনদ বিচ্ছিন্ন বলার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু আসলে তা সঠিক নয়। ইমাম জাহাবীর লিখিত ‘আল কাশেফ’ কিতাবের তাহকীকে ২৫৩৯ নম্বর রাবীর জীবনী আলোচনায় শায়খ মুহাম্মাদ আউওয়ামা বিভিন্ন ইমামগণের বরাত দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, তাঁর পিতার নিকট থেকে তিনি শুনেছেন। ইমাম আবু দাউদ রহ. বলেন: আবু উবাইদাহ রহ.-এর পিতা হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর মৃত্যুর সময়ে তাঁর বয়স ছিলো ৭ বছর। (তাহজীবুল কামাল: রাবী নম্বর- ৩০৫১) আর হাদীসের নীতিনির্ধারক ইমামগণের নিকটে যেখানে পাঁচ বছর বয়স হাদীস গ্রহণের জন্য যথেষ্ট সেখানে ৭ বছর বয়সে ছেলে তাঁর পিতা থেকে কিছুই শুনেনি এটা কোনক্রমে গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম তবারানী তাঁর মু’জামে আওসাতে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যার সনদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, আবু উবাইদা তাঁর পিতার নিকট থেকে শুনেছেন। সনদটি এই:

 حدثنا مفضل ثنا علي ثناأبو قرة قال ذكر زمعة عن زياد بن سعد عن أبي الزبير حدثني يونس بن خباب الكوفي قال سمعت أبا عبيدة بن عبد الله بن مسعود يذكر أنه سمع عبد الله بن مسعود يقول 

অর্থাৎ, আবু উবাইদা তাঁর পিতাকে বলতে শুনেছেন। (মু’জামে তবারানী আওসাত: ৯১৮৯) এ হাদীসটির সনদ হাসান। আবু উবাইদা সূত্রে হযরত ইবনে মাসউদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হাদীসকে ইমাম তিরমিজী রহ. হাসান বলেছেন। (তিরমিজী: ৩৬৬) এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত দেখুন শায়খ মুহাম্মাদ আউওয়ামার তাহকীকসহ আল কাশেফ ৩য় খ-, পৃষ্ঠা ৬১।

☑ সারসংক্ষেপ : পালাক্রমে দু’পায়ের মাঝে জিরিয়ে নামায আদায় করার পদ্ধতি হলো এক পায়ের ওপর একটু ওজন বেশী দিয়ে অপর পা’কে বিশ্রাম দেয়া। আবার অপর পায়ের ওপর একটু ওজন বাড়িয়ে দিয়ে পূর্বের পা’কে বিশ্রাম দেয়া। জামাআতের কাতারে দাঁড়ানো অবস্থায় দু’পায়ের মাঝে বেশী ফাঁকা থাকলে যে কোন এক পায়ের ওপর ওজন দিতে গেলে পাশের লোকটিকে ঠেলে সরিয়ে দেয়া ব্যতীত এক পায়ের ওপর ওজন দেয়া সম্ভব নয়। আর দু’পায়ের মাঝে দূরত্ব কম থাকলে এটা সহজে সম্ভব। দীর্ঘ কিয়াম ব্যতীত স্বাভাবিকভাবে জিরিয়ে নামায পড়ার প্রয়োজন হয় না। তবে এ হাদীস থেকে মাসআলা বেরিয়ে আসে যে, দু’পায়ের মাঝে এতটুকু দূরত্ব রাখতে হয় যতটুকু দূরত্ব রাখলে পালাক্রমে দু’পায়ের মাঝে জিরিয়ে নামায আদায় করা যায়। আর তার পরিমাণ হতে পারে চার থেকে ছয় ইঞ্চি যা পূর্বেও বর্ণনা করা হয়েছে। অবশ্য এটা কোন আবশ্যকীয় বিধান নয়। সুতরাং মোটা মানুষ বা অসুস্থ্য মানুষের জন্য প্রয়োজন অনুসারে পা ছড়িয়ে দাঁড়ানোতে সমস্যা নেই।


উল্লেখ্য: দু’পায়ের মাঝখানে স্বাভাবিক ফাঁকা রেখে দাঁড়ানোর ব্যাপারে বর্ণিত মাসআলার বিপরীতে কোন কোন হাদীসে জামাআতের কাতারে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের পরস্পর একজন অপরজনের পায়ের সাথে পা, টাখনুর সাথে টাখনু মিলিয়ে দাঁড়ানোর কথাও বর্ণিত হয়েছে যা থেকে মুসল্লীর নিজের দু’পায়ের মধ্যের ফাঁকা অনেক বেড়ে যায়। যেমন নিম্মে বর্ণিত হযরত আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীস:

৪) হাদীস শরীফঃ- 

حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ خَالِدٍ قَالَ حَدَّثَنَا زُهَيْرٌ عَنْ حُمَيْدٍ عَنْ أَنَسٍ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ أَقِيمُوا صُفُوفَكُمْ فَإِنِّي أَرَاكُمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِي ‏وَكَانَ أَحَدُنَا يُلْزِقُ مَنْكِبَهُ بِمَنْكِبِ صَاحِبِهِ وَقَدَمَهُ بِقَدَمِهِ‏ (رَوَاهُ الْبُخَارِىُّ فِىْ بَابُ إِلْزَاقِ المَنْكِبِ بِالْمَنْكِبِ وَالقَدَمِ بِالقَدَمِ فِي الصَّفِّ)‏


অনুবাদ : হযরত আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন: তোমরা কাতার সোজা কর। কেননা, আমি আমার পেছন দিক থেকেও তোমাদেরকে দেখতে পাই। (হযরত আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন:) আর আমাদের প্রত্যেকে তার পার্শ্ববর্তী ব্যক্তির কাঁধের সাথে কাঁধ এবং পায়ের সাথে পা মিলাতো। (বুখারী: ৬৮৯)


✔ হাদীসটির স্তর : সহীহ, মাউকুফ। শাব্দিক কিছু তারতম্যসহ এ হাদীসটি মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ এবং ইবনে মাজাহ শরীফেও বর্ণিত হয়েছে। (জামিউল উসূল: ৩৮৬৪)

৫) হাদীস শরীফঃ- 

حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِى شَيْبَةَ حَدَّثَنَا وَكِيعٌ عَنْ زَكَرِيَّا بْنِ أَبِى زَائِدَةَ عَنْ أَبِى الْقَاسِمِ الْجَدَلِىِّ قَالَ سَمِعْتُ النُّعْمَانَ بْنَ بَشِيرٍ يَقُولُ أَقْبَلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى النَّاسِ بِوَجْهِهِ فَقَالَ أَقِيمُوا صُفُوفَكُمْ  ثَلاَثًا وَاللَّهِ لَتُقِيمُنَّ صُفُوفَكُمْ أَوْ لَيُخَالِفَنَّ اللَّهُ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ قَالَ فَرَأَيْتُ الرَّجُلَ يُلْزِقُ مَنْكِبَهُ بِمَنْكِبِ صَاحِبِهِ وَرُكْبَتَهُ بِرُكْبَةِ صَاحِبِهِ وَكَعْبَهُ بِكَعْبِهِ.( رَوَاه ابُوْ دَاود فِىْ بَابِ تَسْوِيَةِ الصُّفُوفِ)


অনুবাদ : হযরত নু’মান বিন বাশীর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লোকদের দিকে ফিরে তিনবার বললেন: তোমরা কাতার সোজা কর। আল্লাহর কসম! তোমরা হয় কাতার সোজা করবে না হয় আল্লাহ  তাআলা তোমাদের দিলের মধ্যে ভিন্নতা সৃষ্টি করে দিবেন। হযরত নু’মান বিন বাশীর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: আমি লোকদেরকে দেখেছি নিজের ঘাড় সাথীর ঘাড়ের সাথে, হাঁটু সাথীর হাঁটুর সাথে এবং পায়ের গিট সাথীর পায়ের গিটের সাথে মিলাচ্ছে। (আবু দাউদ: ৬৬২)   


✔ হাদীসটির স্তর : সহীহ। তবে কাতার সোজা করার নির্দেশটি মারফু’। আর হাঁটুর সাথে হাঁটু মিলিয়ে দাঁড়ানোর অংশটি মাউকুফ। শাব্দিক কিছু তারতম্যসহ এ হাদীসটি মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজী, নাসাঈ এবং ইবনে মাজাহ শরীফেও বর্ণিত হয়েছে। (জামিউল উসূল: ৩৮৬৩)


বুখারী শরীফে বর্ণিত হযরত আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীস, আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত হযরত নু’মান বিন বাশীর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীস এবং এ অর্থে বর্ণিত অন্যান্য হাদীসের ছত্রছায়ায় বর্তমান কালের কিছু লোকজন নিজের দু’পায়ের মধ্যে অনেক ফাঁকা করে অন্যের পায়ের সাথে লাগিয়ে দেয় এবং এটাকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাত বলে প্রচার করে থাকে।


এসব হাদীসের ব্যাপারে আমাদের মন্তব্য হলো: এটা আসলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীস নয়; বরং সাহাবার আমল এবং এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অবগত ছিলেন কি না তার কোন প্রমাণও হাদীসে বর্ণিত নেই। সুতরাং পায়ের সাথে পা, টাখনুর সাথে টাখনু মিলিয়ে দাঁড়ানোকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদীস হিসেবে প্রচার করা কোনক্রমেই ঠিক নয়। তবে সাহাবাগণের আমল হিসেবে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত যার অনুসরণ আমাদের করা উচিত এবং আমরা করেও থাকি। অবশ্য, তারা মিলানোর বাহ্যিক অর্থ করে থাকে। আর হাদীস বিশারদগণ এর উদ্দিষ্ট অর্থ করে থাকেন। অর্থাৎ, গায়ে গায়ে মিলে দাঁড়ানো আর কাতার সমান রাখা বা আগে/পিছে না হওয়া। পায়ের সাথে পা, টাখনুর সাথে টাখনু মিলিয়ে দাঁড়ানোর বাহ্যিক অর্থ যেমন এ হাদীসের উদ্দেশ্য নয়; ঠিক তেমনই তা সম্ভবও নয়। কারণ, কাঁধ এবং কদম লাগিয়ে দাঁড়ালে হাঁটুর সাথে হাঁটু লাগানো অসম্ভব। আবার পায়ের পেছনের অংশ তুলনামূলক সরু হওয়ায় গিটের সাথে গিট লাগিয়ে দাঁড়ালে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পা হুবহু কিবলামুখী রাখাও অসম্ভব। বুখারী শরীফের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যাকার যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম, হাফেজ ইবনে হাজার আসকালনী রহ.-এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন: 


(قَوْلُهُ بَابُ إِلْزَاقِ الْمَنْكِبِ بِالْمَنْكِبِ وَالْقَدَمِ بِالْقَدَمِ فِي الصَّفِّ) الْمُرَادُ بِذَلِكَ الْمُبَالَغَةُ فِي تَعْدِيلِ الصَّفِّ وَسَدِّ خَلَلِهِ وَقَدْ وَرَدَ الْأَمْرُ بِسَدِّ خَلَلِ الصَّفِّ وَالتَّرْغِيبِ فِيهِ فِي أَحَادِيثَ كَثِيرَةٍ أجمعها حَدِيث بن عمر عِنْد أبي دَاوُد وَصَححهُ بن خُزَيْمَةَ وَالْحَاكِمُ


 “উক্ত হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে কাতার সোজা করা এবং


ফাঁকা বন্ধ করে পরস্পর মিলেমিলে দাঁড়ানো। তিনি আরও বলেন: ফাঁকা বন্ধ করে দাঁড়ানোর ব্যাপারে অনেক হাদীস আছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত হযরত ইবনে উমার (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীস। ইবনে খুযাইমা ও হাকেম উক্ত হাদীসকে সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন”।


পূর্ববর্ণিত হযরত আব্দুর রহমান, আবু হুরাইরা এবং হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)-এর হাদীস এবং ইবনে হাজার আসকালানী রহ.-এর উপরোক্ত ব্যাখ্যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, নিজের দু’পায়ের মধ্যে অনেক ফাঁকা করে অন্যের পায়ের সাথে লাগিয়ে দেয়া রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাতও নয় আর সাহাবায়ে কিরামের আমলের সঠিক রূপও নয়; বরং এটা কারও কল্পনাপ্রসূত আমল। আর তা বাস্তবায়নের জন্য হাদীসের শব্দ থেকে আশ্রয় গ্রহণ মাত্র।