বিপদে ধৈর্য ধারণ | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

بسم الله الرحمن الرحيم

সবর ঈমানের শেকড়রে মতো। বৃক্ষ যেভাবে শেকড়র ওপর দাঁড়িয়ে থাকে তদ্রুপ ঈমানও সবরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তাই যার সবর নেই তার পূর্ণ ঈমানী শক্তি নেই। আল্লাহ তা’আলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থ কালামে মাজীদে ইরশাদ ফরমান: “মানুষের মধ্যে কতেক এমন রয়েছে, যারা দ্বিধার সাথে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি তার কোন কল্যাণ হয় তবে সে তাতে প্রশান্ত হয়। আর যদি তার কোন বিপর্যয় ঘটে, তাহলে সে তার আসল চেহারায় ফিরে যায়। সে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি হল সুস্পষ্ট ক্ষতি’ (সূরা হজ: ১১)।
পক্ষান্তরে যে সবর করে, বিপদে ধৈর্য ধারণ করে সেই ভাগ্যবান। পৃথিবীতে যারা সুন্দর জীবন গড়তে পেরেছে, তারা সবরের গুণেই তা গড়েছে। তারা সর্বোচ্চ শেখরে আরোহন করেছে এই সবরের বদৌলতেই। তারা দুঃসময় এলে ধৈর্য ধারণ করে আর সুসময় এলে আল্লাহ তা’আলার শুকরিয়া আদায় করে। আর এভাবে তারা সবর ও শোকরের ডানায় চড়ে জান্নাতের অধিকারী হয়। সবর বা ধৈর্য আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ মুমিন বান্দাদের বৈশিষ্ট্য। নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালামকে আল্লাহ তা’আলা এই বিরল গুণে ভূষিত করেছেন।
তাই নবী-রাসূলগণই হলেন সবরের সকল আকার-প্রকৃতির উজ্জ্বলতম উদাহরণ।

আল্লাহ তা’আলা বিজয় ও সফলতার জন্য সবর ও তাকওয়া অবলম্বনের শর্ত জুড় দিয়েছেন। তিনি কালামে মাজীদে ইরশাদ ফরমান: “হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধর ও ধৈর্যে অটল থাক এবং পাহারায় নিয়োজিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও।” (সূরা আলে-ইমরান: ২০০)।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা নব্বই জায়গায় সবরের কথা বলেছেন। অতএব ভেবে দেখুন সবর কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়!
আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে সবরকারী তথা ধৈর্যশীলদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদেরকে হিসাব ছাড়া প্রতিদান দেবেন বলে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে “বলুন, হে আমার বান্দারা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়ায় ভাল কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ। আর আল্লাহর যমীন প্রশস্ত, কেবল ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেয়া হবে কোন হিসাব ছাড়াই।” (সূরা যুমার: ১০)।
আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিয়েছেন যে, কারও যদি সবর থাকে, তাহলে যত বড় দুশমনই হোক তাকে হারাতে পারবে না। ইরশাদ হয়েছে “আর যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোন ক্ষতি করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ তারা যা করে, তা পরিবেষ্টনকারী” (সূরা আলে-ইমরান : ১২০)।

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেনঃ “আমি তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা ও ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করব। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা, তাদেরকে যখন বিপদ আক্রামণ করে তখন বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত’ (সূরা আল বাকারা : ১৫৫-১৫৭)।
ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহ তাআলা রেখেছেন জান্নাত লাভের কামিয়াবি আর জাহান্নাম থেকে মুক্তির সাফল্য। ইরশাদ হয়েছে ”নিশ্চয় আমি তাদের ধৈর্যের কারণে আজ তাদেরকে পুরস্কৃত করলাম; নিশ্চয় তারাই হল সফলকাম’ (সূরা মুমিনূন: ১১১)।
সবরের অর্থ:

——————————————————————————

সবরের আভিধানিক অর্থ বাধা দেয়া বা বিরত রাখা। শরী‘আতের পরিভাষায় সবর বলা হয় অন্তরকে অস্থির হওয়া থেকে, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গাল চাপড়ানো ও বুকের কাপড় ছেঁড়া ইত্যাদি থেকে বিরত রাখা। কারো কারো মতে, এটি হলো মানুষের অন্তরগত একটি উত্তম স্বভাব, যার মাধ্যমে সে অসুন্দর ও অনুত্তম কাজ থেকে বিরত থাকে।
এটি মানুষের একটি অন্তরগত শক্তি, যা দিয়ে সে নিজকে সুস্থ ও সুরক্ষিত রাখতে পারে। হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে সবর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “হাসি মুখে তিক্ততার ঢোক গেলা।”
হযরত যুন্নূন মিসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ থেকে দূরে থাকা; বিপদের সময় শান্ত থাকা এবং জীবনের কুরুক্ষেত্রে দারিদ্রের কষাঘাত সত্ত্বেও অমুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করা।”
কারও মতে, “সবর হলো সুন্দরভাবে বিপদ মোকাবিলা করা।”

আবার কারও মতে, “বিপদকালে অভিযোগ-অনুযোগ না করে অমুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করাই সবর।”

এক বুযুর্গ এক ব্যক্তিকে অন্যের কাছে তার সমস্যা নিয়ে অনুযোগ করতে শুনে বললেন, “তুমি যখন মানুষের কাছে অভিযোগ কর, তখন মূলত দয়াময়ের বিরুদ্ধে নির্দয়ের কাছেই অভিযোগ কর।”
অভিযোগ দু’টি পন্থায় করা হয়:

____________________
একটি হলো, আল্লাহ তাআলার কাছে অনুযোগ করা। এটি সবর পরিপন্থী নয়। যেমন হযরত ইয়াকূব আলাইহিস সালাম প্রিয় পুত্র ইউসুফ আলাইহিস সালামকে হারিয়ে বলেছেন, ”আমি আল্লাহর কাছেই আমার দুঃখ বেদনার অভিযোগ জানাচ্ছি”। অপরটি হলো, নিজের মুখ বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ভাষার মাধ্যমে মানুষের কাছে অভিযোগ করা। এটি সবর পরিপন্থী।
সবরের প্রকারভেদ: সবর তিন প্রকারের। যথা:

১. আল্লাহ তাআলার আদেশ-নির্দেশ পালন ও ইবাদত-বন্দেগী আদায় করতে গিয়ে ধৈর্যধারণ করা।

২. আল্লাহ তা’আলার নিষেধ ও তাঁর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করা এবং

৩. তাকদীর ও ভাগ্যের ভালো-মন্দে অসন্তুষ্ট না হয়ে তার ওপর ধৈর্যধারণ করা।

এই তিন প্রকার সম্পর্কেই হযরত আবদুল কাদির জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তদীয় গ্রন্থ ‘ফুতুহুল গাইব’ এ বলেন, “একজন বান্দাকে অবশ্যই তিনটি বিষয়ে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে: “কিছু আদেশ পালনে, কিছু নিষেধ থেকে বিরত থাকায় এবং ফয়সালাকৃত তাকদীরের ওপর।”
একজন প্রকৃত মুমিন কিন্তু সর্বাবস্থায় দৃঢ়ভাবে এ কথা বিশ্বাস করে যে, সে যে অবস্থায় আছে, তাতে কোনো কল্যাণ নিহিত রয়েছে। যেমন মুসলিম শরীফে সুহাইব ইবন সিনান রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, “মুমিনের অবস্থা কতইনা চমৎকার! তার সব অবস্থাতেই কল্যাণ থাকে।
এটি শুধু মুমিনেরই বৈশিষ্ট্য যে, যখন সে আনন্দে থাকে, তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এবং যখন সে কষ্টে থাকে, তখন সবর করে। আর এ উভয় অবস্থাই তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।”

এ জন্যই কিন্তু হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলতেন, “আমার কাছে বিপদে পড় সবর করার চেয়ে সুখে থেকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করাই অধিক পছন্দনীয়।”
আমাদের মনে রাখতে হবে, মুমিনের পুরো জীবনই কিন্তু পরীক্ষা। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “আর ভাল ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে” (সূরা আম্বিয়া: ৩৫)।
আল্লাহ তাআলা মুমিনকে সম্পদ-সন্তান সব কিছু দিয়েই পরীক্ষা করেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা বিশেষ। আর আল্লাহর নিকটই মহান প্রতিদান” (সূরা তাগাবুন: ১৫)।
সবরের ফযীলত: সবরের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহর বান্দা মাত্রই সবর করতে হবে। কেননা কখনো আল্লাহর আদেশ মানতে হবে, তাঁর নির্দেশিত কাজ করতে হবে। আবার কখনো তাঁর নিষেধ মেনে চলতে হবে, বিরত থাকতে হবে তা করা থেকে।

আবার কখনো অকস্মাৎ তাকদীরের কোনো ফয়সালা এসে পড়বে। নিয়ামত দেয়া হবে, তখন শুকরিয়া আদায় করতে হবে। এভাবে নানা অবস্থার মধ্য দিয়ে মুমিনের জীবন অতিবাহিত হয়। সুতরাং মৃত্যু পর্যন্ত এই সবরকে সাথে নিয়েই চলতে হবে। এজন্যই সবরের অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে।
হযরত উম্মে সালামা রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি কোনো বিপদে পড় আল্লাহ যা নির্দেশ দিয়েছেন ‘ইন্নাল্ল্লিাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেঊন’ (আমরা আল্লাহর জন্যই আর তাঁর নিকটই ফিরে যাব।) [সূরা বাকারাঃ ১৫৬] পড়বে এবং বলবে ”হে আল্লাহ, আমাকে আমার বিপদের প্রতিদান দিন এবং আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন”। আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন।”
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, “সবর হল জ্যোতি।” (মুসনাদ আহমদ ও মুসলিম) হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন,“সবরকে আমরা আমাদের জীবন-জীবিকার সর্বোত্তম মাধ্যম হিসেবে পেয়েছি।” (বুখারী)
হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, “ঈমানের ক্ষেত্রে সবরের উদাহরণ হল দেহের মধ্যে মাথার মত।” এরপর আওয়াজ উঁচু করে বললেন, “যার ধৈর্য নাই তার ঈমান নাই।” আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আল্লাহ তায়ালা ধৈর্যের চেয়ে উৎকৃষ্ট এবং ব্যাপকতর দান কাউকে দেন নি।” (সুনান আবু দাঊদ, অনুচ্ছেদ: নিষ্কলুষ থাকা। সহীহ)
আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন বিপদ আসে না। আর যে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে তিনি তাঁর অন্তরকে সঠিক পথের সন্ধান দেন।” [সূরা তাগাবুনঃ ১১]
আলকামা বলেন, “আল্লাহ তায়ালা ‘যার অন্তরকে সঠিক পথের সন্ধান দেন’ সে হল ঐ ব্যক্তি যে বিপদে পড়লে বিশ্বাস করে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। ফলে বিপদে পড়ও সে খুশি থাকে এবং সহজভাবে তাকে গ্রহণ করে।”
মুমিনের ধৈর্যের প্রয়োজন জীবনের নানান বিপদ-মুসিবত, কষ্ট ও জটিলতার সামনে। সে বিশ্বাস করে যত সংকটই আসুক না কেন সব আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। ফলে সে তা হালকা ভাবে মেনে নেয়। বিপদে পড়ও খুশি থাকে।
এ ক্ষেত্রে ক্ষোভ, হতাশা ও অস্থিরতা প্রকাশ করে না। নিজের ভাষা ও আচরণকে সংযত রাখে। কারণ, সে আল্লাহর প্রতি গভীরভাবে বিশ্বাসী। সে তকদীরকে বিশ্বাস করে। তকদীরকে বিশ্বাস করা ঈমানের সাতটি রোকনের একটি। সুতরাং কোন ব্যক্তি বিপদে সবর না করলে তার অর্থ হল, তার কাছে ঈমানের এই গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিটি অনুপস্থিত। অথবা থাকলেও তা খুব নড়বড়।
বিপদ-আপদের মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মোচন হয়:

==============================

আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদেরকে বিভিন্ন বালা-মুসিবত দেন এক মহান উদ্দেশ্যে। তা হল এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বান্দার গুনাহ মোচন করে থাকেন। যেমন আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণিত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আল্লাহ যখন কোন বান্দার কল্যাণ চান তখন দুনিয়াতেই তাকে শাস্তি দেন। কিন্তু বান্দার অকল্যাণ চাইলে তিনি তার গুনাহের শাস্তি থেকে বিরত রেখে কিয়ামতের দিন তার যথার্থ প্রাপ্য দেন।”
হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, মুমিনকে যেকোনো বিপদই স্পর্শ করুক না কেন আল্লাহ তার বিনিময়ে তার গুনাহ মাফ করে দেন। এমনকি (চলতি পথে) পায়ে যে কাঁটা বিদ্ধ হয় (তার বিনিময়েও গুনাহ মাফ করা হয়)’ (বুখারী ও মুসলিম )।
হযরত আবূ মূসা আশআরী রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয় অথবা সফর করে, তার জন্য সে সুস্থাবস্থায় এবং ঘরে থাকতে যেরূপ নেকি কামাই করতো অনুরূপ নেকি লেখা হয়। ( আশ্শারহুল মুমতি‘)।

বিপদ-আপদ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বান্দার ধৈর্যের পরীক্ষা নেন:

—————————————————————–

বিপদ দিয়ে আল্লাহ পরীক্ষা করেন কে ধৈর্যের পরিচয় দেয় এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকে পক্ষান্তরে কে ধৈর্যহীনতার পরিচয় দেয় ও আল্লাহর সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে। যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “বিপদ যত কঠিন হয় পুরস্কারও তত বড় হয়। আল্লাহ কোন জাতিকে ভালবাসলে তাদেরকে পরীক্ষা করেন। সুতরাং যে তাতে সন্তুষ্ট থাকে আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান আর যে তাতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান।”
ধৈর্যের পরিণতি প্রশংসনীয়:

—————————–

জীবনের সকল কষ্ট ও বিপদাপদে আল্লাহ তায়ালা নামায ও সবরের মাধ্যমে তাঁর নিকট সাহায্য চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, এতেই মানুষের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। ধৈর্যের পরিণতি প্রশংসনীয়। আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন যে, তিনি ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকেন। অর্থাৎ তাদেরকে তিনি সাহায্য করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “হে ইমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে (আল্লাহর কাছে) সাহায্য চাও, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত-১৫৩)
বিপদে ধৈর্য ধারণ করলে মহান আল্লাহ তায়ালা ধৈর্য ধারণকারীর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন। এ প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ”কোন মুসলিম শারীরিক বা মানসিক কষ্ট পেলে, কোন শোক বা দুঃখ পেলে অথবা চিন্তাগ্রস্থ হলে সে যদি ধৈর্য ধারণ করে তাহলে মহান আল্লাহ তায়ালা প্রতিদান স্বরূপ তার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। এমনকি যদি সামান্য একটি কাঁটাও পায়ে বিদ্ধ হয়, তাও তার গুনাহ মাফের কারণ হয়ে দাড়াঁয়। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
বিপদে ধৈর্য ধারণ করলে ধৈর্য ধারণকারীর আমলনামা নিস্পাপ হয়ে যায়:

===========================================

হাদীস শরীফে আছে, হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘“মুমিন নর-নারীর উপর সময় সময় বিপদ ও পরীক্ষা এসে থাকে। কখনো তার উপর সরাসরি বিপদ আসে। কখনো তার সন্তান-সন্ততি মারা যায়। আবার কখনো তার ধন সম্পদ বিনষ্ট হয়। আর এ সকল বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করার ফলে তার (ধৈর্য ধারণকারীর) কলব বা অন্তর পরিস্কার হতে থাকে এবং পাপ পঙ্কিলতা হতে মুক্ত হতে থাকে। অবশেষে সে নিস্পাপ আমলনামা নিয়ে আল্লাহ তায়ালার সাথে মিলিত হয়।” (সুনানে তিরমিযী)
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতাআলা ইরশাদ করেন, “আর নিশ্চয়ই আমি ভীতি, অনাহার, প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতির মাধ্যমে এবং উপার্জন ও আমদানি হ্রাস করে তোমাদের পরীক্ষা করব এসব অবস্থায় যারা ধৈর্য অবলম্বন করবে, তাদের সুসংবাদ দিন এবং যখনই কোনো বিপদ আসে তখনই তারা বলে: ‘আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দিকে আমাদের ফিরে যেতে হবে’ [সুরা বাকারা ১৫৫-১৫৬]

আয়াতে রয়েছে, ‘আল্লাহর হুকুম ব্যতীত মানুষকে কোনো মুসিবতই আক্রমণ করে না। অন্য এক আয়াতে এসেছে, পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের যেসব মুসিবত আসে তার একটিও এমন নয় যে, তাকে আমি সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ করে রাখিনি। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ’। (সূরা হাদিস: ২২)
বিপদ-আপদ, মুসিবত, দুঃখ কার জীবনে না এসেছে। যিনি যতো বড় তাঁর জীবনে তত বেশি বিপদ-আপদ এসেছে। মানুষের মাঝে শ্রেষ্ঠ মানুষ হচ্ছেন- নবী-রাসূলগণ। আর সবচেয়ে বেশি বাধা, বেশি বিপদ এসেছে তাঁদের জীবনেই। একজন প্রকৃত মুমিন কিন্তু সর্বাবস্থায় দৃঢ়ভাবে এ কথা বিশ্বাস করে যে, সে যে অবস্থায় আছে, তাতে কোনো কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তায়েফবাসীদের যুলুম নির্যাতন থেকে ফেরার পথে পর্বত নিয়ন্ত্রণকারী ফেরেশতাকে সঙ্গে নিয়ে জিবরীল আলাইহিস সালাম এসে বলেন, আপনি চাইলে দুই পাহাড়কে একত্রি করে তায়েফবাসীদেরকে পিষে ধ্বংস করে দিই, তাহলে তাই হবে।’ কিন্তু আমি বললাম,” না, বরং আমি এই আশা করি যে, আল্লাহ ঐ জাতির পৃষ্ঠদেশ হতে এমন বংশধর সৃষ্টি করবেন; যারা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক করবে না।