দলিলসহ নামাজের মাসায়েল : (পর্ব ৯)বিশেষ জ্ঞাতব্য | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

বিশেষ জ্ঞাতব্য

এ মাসআলায় আমাদের লা-মাযহাবী বন্ধু মুযাফফর বিন মুহসিন তার লেখা ‘জাল হাদীছের কবলে রাসূলুল্লাহ (ছা:)এর ছালাত’ নামক বইটিতে যেসব দলিলপ্রমাণ পেশ করেছেন, পাঠকদের জ্ঞাতার্থে সেগুলোর সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো।

১. বুকের উপর হাত বাঁধার ছহীহ হাদীছসমূহ শিরোনামে লেখক এক নম্বরে হযরত সাহল ইবনে সা’দ রা. বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। আমরাও এটি প্রথম নম্বরে উল্লেখ করেছি। উক্ত হাদীসে আছে, মানুষকে এই আদেশ দেওয়া হতো যে, তারা যেন নামাযে ডান হাত বাম হাতের বাহুর উপর রাখে।

এ হাদীসটি বুকে হাত বাঁধার দলিল হলো কী করে, তা এক স্বতন্ত্র প্রশ্ন। হাজার বছর যাবৎ বুখারী শরীফের অসংখ্য ভাষ্যকার তাদের একটি ভাষ্যগ্রন্থেও এ ইঙ্গিত দেননি যে, এ হাদীস থেকে বুকের উপর হাত বাঁধা প্রমাণিত হয়। আবার মহান পূর্বসূরিগণের মধ্যে বুকে হাত বাঁধার আমল না থাকাও প্রমাণ করে যে, তারাও এ হাদীসটির অনুরূপ মর্ম বোঝেন নি। তাহলে লা-মাযহাবী বন্ধুরা এটা কোত্থেকে পেলেন?

তাছাড়া উক্ত হাদীসে ডান হাত বাম হাতের বাহুর উপর রাখতে বলা হয়েছে, ডান হাতের বাহু বাম হাতের বাহুর উপর রাখতে বলা হয় নি। বাম হাতের বাহুর বিপরীতে ডান হাত বলায় স্পষ্টত বুঝে আসে, এখানে কব্জি পর্যন্ত ডান হাতকে বোঝানো হয়েছে। আর এর ব্যাখ্যা এসেছে হযরত ওয়াইল রা. বর্ণিত হাদীসটিতে।

২. এরপর লেখক ওয়াইল রা. বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। উক্ত হাদীসে বলা হয়েছে, অতঃপর তাঁর (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) ডান হাত বাম হাতের পিঠ, কব্জি ও বাহুর উপর রাখলেন। এরপর লেখক বলেছেন, উক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, রাসূল (ছা:) ডান হাতটি পুরো বাম হাতের উপর রাখতেন। এমতাবস্থায় হাত নাভির নীচে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। এইভাবে হাত রেখে নাভীর নীচে স্থাপন করতে চাইলে মাজা বাঁকা করে নাভির নীচে হাত নিয়ে যেতে হবে, যা উচিত নয়।

আফসোস! হাদীসটি নিয়ে লেখক একটিবারও ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করেন নি। এটি কিভাবে প্রমাণ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডান হাত পুরো বাম হাতের উপর রাখতেন। এ হাদীসটি দিয়েই তো বুখারী শরীফের ভাষ্যকার হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী ও নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান বুখারী শরীফে উদ্ধৃত হযরত সাহল রা.এর হাদীসটির ব্যাখ্যা করেছেন। তারা বলেছেন, এ হাদীস প্রমাণ করে যে, সাহল রা. বর্ণিত হাদীসে যে যেরা’ বা বাহুর কথা বলা হয়েছে, সেখানে পুরো বাহু বোঝানো হয় নি, বরং বাহুর অংশবিশেষকে বোঝানো হয়েছে। (টীকা-১) শাওকানী সাহেবও একই কথা বলেছেন। তাহলে লেখক বলবেন কি, এই তিনজনের বক্তব্যের মর্ম কি? সউদী আরবের প্রথম ও প্রধান মুফতী শায়খ মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম রহ. যে ডান হাতের তালু দিয়ে বাম হাতের কব্জি চেপে ধরাকে (قبض رسغ اليد اليسرى بكف اليد اليمنى) সুন্নত সাব্যস্ত করেছেন (দ্র. ফাতাওয়া, ২/২০৭) তারই বা অর্থ কী?

বুখারী শরীফে হযরত আলী রা. সম্পর্কে যে বলা হয়েছে, তিনি তার ডান হাতের তালু বাম হাতের কব্জির উপর রেখেছেন, এ হাদীসে কী বোঝানো হয়েছে? এমনিভাবে সুনানে দারিমীতে উদ্ধৃত ওয়াইল রা. বর্ণিত হাদীসটিতে যে বলা হয়েছে, قريبا من الرسغ কব্জির কাছাকাছি (হাত রেখেছেন), উক্ত হাদীসেরই বা মর্ম কী? তাবেয়ী আবু মিজলাযের যে আছারটি গত হয়েছে সেটিরই বা মর্ম কী?

সেই সঙ্গে ইবনে খুযায়মা রহ. তার সহীহ গ্রন্থে ও ইবনুল মুনযির রহ. তার আল-আওসাত গ্রন্থে ওয়াইল রা. বর্ণিত আলোচ্য হাদীসটির উপর যে অনুচ্ছেদ শিরোনাম উল্লেখ করেছেন, এবং ৯৭ নং পৃষ্ঠায় আরবের প্রধান মুফতী শায়খ আব্দুল আযীয ইবনে বায রহ. এর উল্লিখিত ফতোয়ায় আলোচ্য হাদীসটির যে মর্ম তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে তাঁরাই বা কী বোঝাতে চেয়েছেন?

৩. এরপর লেখক তাউস (তাবেঈ) বর্ণিত মুরসাল বা সূত্রবিচ্ছিন্ন হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। যেখানে তাউস রহ. বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সা. নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখতেন এবং উভয় হাত বুকের উপর বাঁধতেন।

হাদীসটি সম্পর্কে লেখক মুযাফফর বিন মুহসিনের মন্তব্য হলো, উক্ত হাদীছকে অনেকে নিজস্ব গোঁড়ামী ও ব্যক্তিত্বের বলে যঈফ বলে প্রত্যাখ্যান করতে চান। মুহাদ্দিছগণের মন্তব্যের তোয়াক্কা করেন না। নিজেকে শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ বলে পরিচয় দিতে চান। অথচ আলবানী উক্ত হাদীছ উল্লেখ করে বলেন, আবু দাউদ তাউছ থেকে এই হাদীছ ছহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন। অতঃপর তিনি অন্যের দাবি খণ্ডন করে বলেন,

وهو وإن كان مرسلا فهو حجة عند جميع العلماء على اختلاف مذاهبهم في المرسل لأنه صحيح السند إلى المرسل وقد جاء موصولا من طرق كما أشرنا إليه آنفا فكان حجة عند الجميع.

অর্থাৎ এ হাদীসটি মুরসাল হলেও তা সকল আলেমের দৃষ্টিতে প্রামাণ্য। যদিও মুরসাল হাদীস সম্পর্কে তাদের মতভিন্নতা রয়েছে, কেননা মুরসিল বা সূত্রবিচ্ছিন্নভাবে বর্ণনাকারী (তাউস) পর্যন্ত এর সনদ সহীহ। আবার এ মর্মে অবিচ্ছিন্নসূত্রে অনেক বর্ণনা এসেছে। যার প্রতি আমরা একটু পূর্বেই ইঙ্গিত করেছি। সুতরাং এটি সকলের দৃষ্টিতে প্রামাণ্য।

এ হলো আলবানী সাহেবের বক্তব্যের সঠিক অনুবাদ, যদিও তার বক্তব্যটি আপত্তিকর। কিন্তু আমাদের মুযাফফর ভাই লম্ফঝম্পে খুব দক্ষ হলেও উসূলে হাদীস বা হাদীস শাস্ত্রের মূলনীতি ও আরবী ভাষা সম্পর্কে একেবারে আনাড়ী হওয়ার দরুন এ বক্তব্যের যে অনুবাদ করেছেন তা রীতিমত বিস্ময়কর ও লজ্জাজনক। তিনি লিখেছেন, তাউস যদিও মুরসাল রাবী তবু তিনি সকল মুহাদ্দিছের নিকট দলীলযোগ্য। কারণ তিনি মুরসাল হলেও সনদের জন্য ছহীহ। তাছাড়াও এই হাদীছ মারফূ হিসাবে অনেকগুলো সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। যেমনটি আমি এই মাত্রই উল্লেখ করলাম। অতএব তা সকল মুহাদ্দিছের নিকট দলীলযোগ্য।

আসলে লেখকের এইটুকু জ্ঞানও নেই যে, মুরসাল বলা হয় সূত্রবিচ্ছিন্ন হাদীসকে আর মুরসিল হলো সূত্রবিচ্ছিন্ন হাদীসের বর্ণনাকারী। আর এ কারণেই আরবী উদ্ধৃতিটুকুতে যের যবর লাগাতেও তিনি ভুল করেছেন। তাছাড়া وهو সর্বনামটি দ্বারা হাদীসটিকে বোঝানো হয়েছে। অথচ তিনি এটা দ্বারা তাউসকে বুঝিয়েছেন। আর এ কারণেই সব এলোমেলো হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে দ্বিতীয় বাক্যটির ভুল অনুবাদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার তো বুঝেই আসে না, এত অল্প পুঁজি আর চালান নিয়ে এরা কিভাবে কিতাব লেখার সাহস করে?

যাহোক, মূল কথায় আসি। এ হাদীসটি মুরসাল। আর মুরসাল হাদীসকে লা-মাযহাবী বন্ধুরা প্রামাণ্য মনে করেন না। তার প্রমাণ, মহিলাদের নামাযের ভিন্নতা বিষয়ে হানাফীরা আবু দাউদ বর্ণিত একটি মুরসাল হাদীস ও সেই সঙ্গে সালাফ বা মহান পূর্বসূরি সাহাবা তাবিঈন ও আইম্মায়ে মুহজতাহিদীনের ফাতাওয়া দলিলরূপে পেশ করলে তারা মুরসাল বলে সেটিকে উড়িয়ে দিয়েছেন। নিজেদেরকে সালাফী বলে দাবি করলেও সালাফের ফাতাওয়া তারা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন। সুতরাং এ মুরসাল হাদীসটিকে: যার উপর সালাফের কারো আমলও নেই: সহীহ ও প্রামাণ্য সাব্যস্ত করার চেষ্টা চালানোর অর্থ কি?

পেছনে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

এরপর লেখক হযরত ওয়াইল বর্ণিত বুকের উপর হাত বাঁধা সংক্রান্ত হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। পেছনে এর দুর্বলতার অনেক কারণ আমরা সবিস্তারে তুলে ধরেছি।

৪. এরপর লেখক হুলব আত তাঈ রা. বর্ণিত হাদীসটি তুলে ধরেছেন। পেছনে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

ইমাম তিরমিযীর প্রতি অভিযোগ

মুযাফফর বিন মুহসিন লিখেছেন, কিন্তু কোন কোন মনীষী দুই ধরনের আমলের প্রতি শিথিলতা প্রকাশ করেছেন। এরপর লেখক ইমাম তিরমিযীর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। পূর্বে আমরা তা তুলে ধরেছি। লেখক বলেছেন, ইবনু কুদামাও অনুরূপ বলেছেন। এরপর পর্যালোচনা শিরোনামে লেখক আরো বলেছেন, উপরের আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, রাসূল (ছাঃ) বুকের উপর হাত রেখে ছালাত আদায় করেছেন। সুতরাং অন্য কারো আমল ও কথার দিকে ভ্রুক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই। তবে ইমাম তিরমিযী (রহঃ) যেমন অন্যের ব্যক্তিগত আমলের কথা বর্ণনা করেছেন, তেমনি ইবনু কুদামাও কেবল হাম্বলী মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করেছেন। যা পাঠকের সামনে পরিস্কার।

লেখকের এ দাবি আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম তিরমিযীর সাধারণ রীতি হলো, প্রতিটি অনুচ্ছেদে উদ্ধৃত হাদীস অনুসারে সাহাবা তাবিঈন, তাবে তাবিঈন ও আয়েম্মায়ে দীনের মধ্যে কারা আমল করেন তা তুলে ধরা। তাই ব্যক্তিগত আমলের প্রশ্ন এখানে অবান্তর। লেখক কি বলতে চান, তাদের ব্যক্তিগত আমল হাদীস ও সুন্নাহ মোতাবেক ছিল না?

সালাফ বা পূর্বসূরিগণের কারো আমল যে বুকে হাত বাঁধা ছিল না, সে কথা যে কেবল ইমাম তিরমিযী ও ইবনে কুদামার আলোচনা থেকে পরিস্কার হয় তা নয়, ইখতিলাফুল আইম্মা গ্রন্থে ইমাম তাহাবী (মৃত্যু ৩২১ হিজরি) ও আল আওসাত গ্রন্থে ইমাম ইবনুল মুনযির (মৃত্যু ৩১৯ হিজরি): এ দুজনের আলোচনা থেকেও তা স্পষ্ট প্রতিভাত হয়। এমনিভাবে ইবনে হাযম জাহিরী (মৃত্যু ৪৫৬ হিজরি) তার আল মুহাল্লা গ্রন্থে বুকের উপর হাত বাঁধার ইশারা পর্যন্ত করেন নি। কারো আমল এমন ছিল সেকথাও বলেন নি। ইবনে আব্দুল বারও (মৃত্যু ৪৬৩ হিজরি) তার তামহীদ গ্রন্থে (২০/৭৫) নাভীর নীচে ও উপরে হাত বাঁধার আমলের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বুকের উপর হাত বাঁধার আমলের কথা উল্লেখ করেন নি। একইভাবে ইমাম বাগাবী (মৃত্যু ৫১৬ হিজরি) তার শারহুস সুন্নাহ গ্রন্থে সাহাবা ও তাবিঈনের আমল তুলে ধরেছেন। কিন্তু বুকে হাত বাঁধার আমল সম্পর্কে কিছুই বলেন নি। ইবনে হুবায়রা শায়বানী (মৃত্যু ৫৬০ হি) তার ইখতিলাফুল আইম্মাতিল উলামা গ্রন্থে পূর্বসূরি আলেম ও ইমামগণের মতামত ও আমল উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বুকের উপর হাত বাঁধার আমলের প্রতি ইঙ্গিতও করেন নি। শুধু নাভীর নীচে ও উপরে হাত বাঁধার আমলের কথা তুলে ধরেছেন। (দ্র, ১/১০৭) আল্লামা জামালুদ্দীন আর রায়মী (মৃত্যু ৭৯২ হি) তার আল মাআনিল বাদীআহ ফী ইখতিলাফি আহলিশ শারীআহ গ্রন্থে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের পাশাপাশি শিয়া যায়দিয়া ও শিয়া ইমামিয়া (১২ ইমামের মতবাদে বিশ্বাসী) দের ফতোয়া ও আমলও তুলে ধরেছেন। কিন্তু হাত বাঁধার মাসআলায় নাভীর নীচে ও উপরের আমল ও ফতোয়ার কথা উল্লেখ করলেও বুকের উপর হাত বাঁধার আমলের কথা উল্লেখ করেন নি। (দ্র, ১/১৩৬) এই বিগত শতকে লা-মাযহাবী ঘরানার শীর্ষ আলেম নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান (মৃত্যু ১৩০৭ হি) শাওকানীর আদ দুরারুল বাহিয়্যাহ গ্রন্থের ভাষ্য আর রাওযাতুন নাদিয়্যাহ গ্রন্থে (১/৯৭-৯৮) লিখেছেন,

ووضع اليدين تحت السرة وفوقها متساويان لأن كلا منهما مروي عن أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم

অর্থাৎ নাভীর নীচে ও উপরে হাত বাঁধা দুটিই সমান। কেননা দুটিই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ থেকে বর্ণিত হয়েছে। এরপর তিনি তাদের কিছু নাম উল্লেখ করেছেন। এবং ইমাম তিরমিযীর বক্তব্য ও ইবনুল হুমামের মন্তব্য উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বুকের উপর হাত বাঁধার কোন কথাই উল্লেখ করেন নি।

হানাফীদের দলিল ও লেখকের মন্তব্য

লেখক নাভীর নীচে হাত বাঁধার ছয়টি দলিল উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে আলী রা. ও আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদীস দুটির সনদ দুর্বল। আমরাও এই দুর্বলতার কথা তুলে ধরেছি। তবে আমরা এ দুটি সাক্ষী বর্ণনারূপে তুলে ধরেছি। লা-মাযহাবী বন্ধুদের রীতি অনুসরণ করলে এ দুটিকেও সহীহ বলা যেত। বুকের উপর হাত বাঁধা সম্পর্কে ওয়াইল বর্ণিত হাদীসটির সনদ দুর্বল। এর দুর্বলতার কথা আলবানী সাহেবসহ লা-মাযহাবী বন্ধুরাও মেনে নিয়েছেন। এতদসত্ত্বেও এর সমর্থনে সহীহ হাদীস আছে দাবি করে আলবানী সাহেব এটিকে সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন। সে হিসাবে উক্ত বর্ণনাদুটির সমর্থনেও যেহেতু সহীহ হাদীস রয়েছে। তাই একই রীতিতে এ দুটিকেও সহীহ বলা যায়। তৃতীয় হাদীসটি হযরত আনাস বর্ণিত ও ইবনে হাযমের আল মুহাল্লা গ্রন্থে উদ্ধৃত। এটি সম্পর্কে লেখক বলেছেন, বর্ণনাটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। মুহাদ্দিস যাকারিয়া বিন গোলাম কাদের বলেন, এই শব্দে কেউ কোন সনদ উল্লেখ করেন নি। মুবারকপুরী (রহঃ) বলেন, আমি এই হাদীসের সনদ সম্পর্কে অবগত নই।

আমাদের বক্তব্য হলো, ইবনে হাযম তো আপনাদের ঘরানার লোক। তিনিও ভিত্তিহীন ও বানোয়াট হাদীস উদ্ধৃত করেন?! যাকারিয়া বিন গোলাম কাদের মুহাদ্দিস নন, প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য কোন ব্যক্তিও নন। তবে তার যে আরবী বক্তব্য লেখক টীকায় উল্লেখ করেছেন তাতে আবারও প্রমাণিত হলো, লেখক আরবী ভাল বোঝেন না। যাকারিয়া সাহেব বলেছেন, তিনি (ইবনে হাযম) এর কোন সনদ উল্লেখ করেন নি। বরং মুআল্লাক (সূত্রবিহীন)রূপে উদ্ধৃত করেছেন। একথা তো ঠিক আছে। কিন্তু এতে ভিত্তিহীন ও বানোয়াট হওয়া অনিবার্য হয় না। মুবারকপুরী সাহেবও এর সনদ সম্পর্কে অবগত হতে পারেন নি। এটাও কোন দলিল নয়। হাদীসটির সনদের আংশিক তুলে ধরেছেন বায়হাকী তার খিলাফিয়াত গ্রন্থে। তিনি বলেছেন,

وروى سعيد بن زربي عن ثابت عن أنس قال : من أخلاق النبوة تعجيل الإفطار وتأخيرالسحور ووضعك يمينك على شمالك في الصلاة تحت السرة. تفرد به ابن زربي وليس بقوي (مختصر الخلافيات ২/৩৪)

অর্থাৎ সাঈদ ইবনে যারবী এটি বর্ণনা করেছেন ছাবিত রহ.এর সূত্রে আনাস রা. থেকে। তিনি বলেছেন, নবীচরিত্রের মধ্যে রয়েছে ইফতার সময় হলেই করা, সেহরি বিলম্বে খাওয়া ও নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভীর নীচে রাখা। ইবনে যারবী একাকী এটি বর্ণনা করেছেন। তিনি মজবুত নন।

সুতরাং এটাকে যঈফ বলা যেতে পারে। ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলা কোনভাবেই উচিত নয়।

চার নম্বরে লেখক হযরত ওয়াইল রা. বর্ণিত নাভীর নীচে হাত বাঁধা সংক্রান্ত হাদীসটি উল্লেখ করে মন্তব্য করেছেন, বর্ণনাটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। নাভীর নীচে কথাটুকু হাদীসে নেই। সুতরাং এই অংশটুকু জাল করা হয়েছে। অতঃপর লেখক তার এই দাবির পক্ষে শায়খ হায়াত সিন্ধির বক্তব্য তুলে ধরেছেন। হায়াত সিন্ধি দাবী করেছেন, তিনি মুসান্নাফের কোন পাণ্ডলিপিতে এ অংশটুকু পান নি।

কিন্তু হায়াত সিন্ধি হাদীসটি পাননি বলে এটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট হয়ে যাবে: এটা কেমন কথা? যারা পেয়েছেন বলে বলেছেন, তারা কি মিথ্যা বলেছেন? হায়াত সিন্ধির ইন্তেকাল হয় ১১৬৩ হি. সালে। তারই সমসাময়িক ছিলেন মুহাম্মদ কায়েম সিন্ধি (মৃত্যু ১১৫৭ হি.)। তিনি শেষ জীবন হিজায তথা মক্কা-মদীনাতেই কাটিয়েছেন এবং সেখানেই হাদীস শরীফের অধ্যাপনার খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। তিনি তার ফাওযুল কিরাম গ্রন্থে লিখেছেন,

بأن القول بكون هذه الزيادة غلطا مع جزم الشيخ الحافظ قاسم بعزوها إلى المصنف ومشاهدتي إياها في نسخة ووجودها في نسخة في خزانة الشيخ عبد القادر المفتي في الحديث والأثر لا يليق بالإنصاف. قال : ورأيته بعيني في نسخة صحيحة عليها الأمارات المصححة. (آثار السنن، ص ৯০)

অর্থাৎ হাদীসের হাফেয শায়খ কাসেম (ইবনে কুতলুবুগা) দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, এ অংশটুকু মুসান্নাফে আছে। আমি নিজেও একটি পা-ুলিপিতে তা দেখেছি। এটি শায়খ মুফতী আব্দুল কাদের সাহেবের গ্রন্থাগারে রক্ষিত পা-ুলিপিতেও বিদ্যমান আছে। এত কিছুর পরও এটাকে ভুল বলা ইনসাফের কথা হতে পারে না। আমি তো নিজ চোখে বিশুদ্ধ একটি পা-ুলিপিতে এঅংশটুকু দেখেছি। (আছারুস সুনান, পৃ. ৯০)

একইভাবে মুহাম্মদ হাশেম সিন্ধি (মৃত্যু ১১৭৪ হি.,) তার তারসীউদ দুররাহ আলা দিরহামিস সুররাহ গ্রন্থে তিনটি পা-ুলিপিতে হাদীসটি পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। ১. আল্লামা হাফেজ কাসেম ইবনে কুতলূবুগার পা-ুলিপি, ২. মক্কা শরীফের মুফতী আল্লামা আব্দুল কাদের ইবনে আবু বকর আস সিদ্দিকীর নিকট রক্ষিত পা-ুলিপি। ৩. আল্লামা মুহাম্মদ আকরাম সিন্ধির (মৃত্যু ১১৩০ হি.) নিকট সংরক্ষিত পা-ুলিপি। দ্বিতীয় দুটি পা-ুলিপি তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন বলেও স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন। (দ্র. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৫)

এমনিভাবে এটি আল্লামা মুহাম্মদ আবেদ সিন্ধির (মৃত্যু ১২৫৭ হি.) নিকট রক্ষিত পা-ুলিপিতে ছিল ও আছে। আল্লামা মুরতাযা হাসান যাবীদীর (মৃত্যু ১২০৫ হি.) নিকট রক্ষিত পা-ুলিপিতেও এটি ছিল ও আছে। বর্তমানে এই পা-ুলিপিটি তিউনিসে আছে। এর একটি ফটোকপি মদীনা ইউনিভার্সিটির গ্রন্থাগারে রক্ষিত আছে। এই দুটি পা-ুলিপি সামনে রেখে প্রখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস শায়খ মুহাম্মদ আওয়ামা অক্লান্ত পরিশ্রম করে সম্পাদনাপূর্বক মুসান্নাফে ইবনে আবু শায়বার যে সংস্করণ তৈরি করেছেন, যা ছাব্বিশ খ-ে বৈরুত থেকে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ৩৯৫৯ নম্বরে হাদীসটি উল্লেখ করা হয়েছে। এবং তৃতীয় খ-ের শুরুতে উক্ত দুটি পা-ুলিপির যে যে পৃষ্ঠায় হাদীসটি উদ্ধৃত রয়েছে তার ফটোও তুলে দেওয়া হয়েছে।

এরপর ৭ নং দলিলে তাবেঈ আবু মিজলায রহ.এর বর্ণনাটি সম্পর্কে লেখক মন্তব্য করেছেন, উক্ত বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এর সনদ বিচ্ছিন্ন।

লেখক এখানে আরবী মাকতূ শব্দটির অর্থ করেছেন ‘সনদ বিচ্ছিন্ন’। একথাও প্রমাণ করে তিনি উসূলে হাদীস বা হাদীস শাস্ত্রের মূলনীতি সম্পর্কে কতটা অজ্ঞ! মাকতূ শব্দটির পারিভাষিক অর্থ হলো, তাবিঈর বক্তব্য বা আমল। এ বর্ণনাটির সনদ মজবুত এবং এটি কোন সহীহ হাদীসের বিরোধী নয়। সুতরাং অন্যান্য সহীহ বর্ণনার সমর্থক হিসাবে এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

এরপর ৯ নং দলিল উল্লেখ করে তাহকীক শিরোনামে লেখক বলেছেন, ইমাম আহমদ (রহঃ) নাভীর নীচে হাত বাঁধার বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। যেমন ইমাম আবু দাউদ বলেন, আমি আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহঃ)কে বলতে শুনেছি যে, আব্দুর রহমান ইবনু ইসহাক যঈফ। সুতরাং উক্ত বর্ণনার দিকে ভ্রুক্ষেপ করার প্রশ্নই উঠে না। তাছাড়া ইমাম নববী ও আলবানী গ্রহণ করেন নি। ইমাম আহমদ সম্পর্কে নাভীর নীচে ও উপরে দুই ধরনের কথা এসেছে। মূলত তা সন্দেহযুক্ত। যেমনটি দাবি করেছেন কাযী আবু ইয়ালা আল ফার্র। সুতরাং তার পক্ষ থেকে বুকের উপর হাত বাঁধাই প্রমাণিত হয়। যাকে ইমাম আবু দাউদ ছহীহ বলেছেন।

লেখক এখানে অনেকগুলো ভুল তথ্য দিয়েছেন।

ইমাম আহমাদ নাভীর নীচে হাত বাঁধার হাদীসকে প্রত্যাখ্যান করেন নি। বরং তদনুযায়ী আমল করেছেন এবং ফতোয়াও দিয়েছেন। হ্যাঁ, আব্দুর রহমানকে তিনি যঈফ বলেছেন। তিনি তো বলেন নি: এ ক্ষেত্রে আর কোন বর্ণনা নেই। রাবীকে যঈফ বলা আর তার বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করা এক জিনিস নয়। এক্ষেত্রে যদি আর কোন বর্ণনা না-ও থাকত, তথাপি রাবীকে যঈফ বলার কারণে তার বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করা প্রমাণিত হতো না।

দেখুন, একটি হাদীসে আছে, মুচি ও হাজ্জাম (যে শিংগা লাগায়) ছাড়া অন্য সকল মানুষ (বংশগতভাবে) সমান। এ হাদীসকে ইমাম আহমদ যঈফ বলেছেন। কিন্তু তার ছাত্র মুহান্না বলেছেন, তাঁকে (আহমদকে) জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি এ হাদীসকে যঈফ বলেন, আবার এটি গ্রহণও করেন? উত্তরে তিনি বলেন, إنما نضعف إسناده ولكن العمل عليه আমরা এর সনদকে যঈফ বলি, কিন্তু আমল তো এর উপরই। (নুকাতুয যারকাশী. ২/৩১৩)

আর আলোচ্য মাসআলায় তো আব্দুর রহমানের বর্ণনা ছাড়াও আরো সহীহ হাদীস, তাবিঈগণের আমল ও ফাতাওয়া বিদ্যমান আছে।

লেখক বলেছেন, ‘ইমাম নববী এটা গ্রহণ করেন নি।’ ভাল কথা, কিন্তু তিনি তো বুকের উপর হাত বাঁধাকেও গ্রহণ করেন নি। ইমাম নববী তার শারহুল মুহাযযাবে বলেছেন, ويجعلهما تحت صدره وفوق سرته وهذا هو الصحيح المنصوص উভয় হাত নাভীর উপরে বুকের নীচে রাখবে। এটাই সঠিক ও (ইমাম শাফেয়ী রহ.এর) স্পষ্ট বক্তব্য।

লেখক বলেছেন, ইমাম আহমদ সম্পর্কে নাভীর নীচে ও উপরে দুই ধরনের কথা এসেছে। মূলত তা সন্দেহযুক্ত। যেমনটি দাবি করেছেন কাযী আবু ইয়ালা আল ফার্র।

লেখক এখানে ফাররাকে ফার্র বানিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি কাযী আবু ইয়ালা আল ফাররার উপর মিথ্যারোপ করেছেন। কারণ কাযী সাহেব কোথাও এমন দাবি করেন নি। লেখক তার গ্রন্থের টীকায় কাযী সাহেবের আল মাসাইলুল ফিকহিয়্যাহ গ্রন্থের বরাত উল্লেখ করেছেন। অথচ উক্ত গ্রন্থে কাযী সাহেব কত স্পষ্ট বলেছেন,

واختلفت في أي موضع يضع يديه فنقل الفضل بن زياد : أنه يضع اليمين على الشمال تحت السرة، وهو اختيار الخرقي، وهو أصح لما روى أبو هريرة قال أمر رسول الله بأخذ الأكف على الأكف تحت السرة. وروى أبو جحيفة عن علي عليه السلام ـ قال: من السنة في الصلاة وضع الأكف على الأكف تحت السرة.

ونقل عبد الله قال رأيت أبي إذا صلى وضع يمينه على شماله فوق السرة، وهذا يحتمل أن يكون ظناً من الراوي أنها كانت على السرة، ويحتمل أن يكون سهواً من أحمد في ذلك.

অর্থাৎ হাত কোথায় বাঁধা হবে তা নিয়ে (হাম্বলী মাযহাবে) দুরকম বর্ণনা রয়েছে। (ইমাম আহমদ) থেকে ফাদল ইবনে যিয়াদের বর্ণনা হলো, ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভীর নীচে রাখবে। এ বর্ণনাটিই খিরাকী রহ. পছন্দ করেছেন। এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ। এরপর তিনি আবু হুরায়রা রা. ও আলী রা.এর বর্ণনাদুটি উল্লেখ করে বলেন, আর আব্দুল্লাহ (ইবনে আহমদ) উল্লেখ করেছেন, আমি আব্বুকে দেখেছি, নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভীর উপরে রাখতে। এটা (অর্থাৎ দ্বিতীয় বর্ণনাটা) হতে পারে বর্ণনাকারীর ধারণায় নাভীর উপরে ছিল। আবার এমনও হতে পারে যে, আহমদ রহ. অসতর্কতাবশত এমনটি করেছেন। (আল মাসাইলুল ফিকহিয়্যাহ, ১/৩২)

এ হলো কাযী আবু ইয়ালার পূর্ণ বক্তব্য। তিনি হাম্বলী মাযহাবের বড় আলেম ছিলেন। নাভীর নীচে হাত বাঁধার বর্ণনাটিকে তিনি অগ্রগণ্য ও বিশুদ্ধ আখ্যা দিয়ে নাভীর উপরে হাত বাঁধার বর্ণনাটির একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চেয়েছেন। অথচ লেখক মুযাফফর বিন মুহসিন তার বরাত দিয়ে পাঠককে কত বড় ধোঁকায় ফেলতে চেয়েছেন!

এ হলো কাযী আবু ইয়ালার পূর্ণ বক্তব্য। তিনি হাম্বলী মাযহাবের বড় আলেম ছিলেন। নাভীর নীচে হাত বাঁধার বর্ণনাটিকে তিনি অগ্রগণ্য ও বিশুদ্ধ আখ্যা দিয়ে নাভীর উপরে হাত বাঁধার বর্ণনাটির একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চেয়েছেন। অথচ লেখক মুযাফফর বিন মুহসিন তার বরাত দিয়ে পাঠককে কত বড় ধোঁকায় ফেলতে চেয়েছেন!

লেখক এখানে ইমাম আবু দাউদের উপরও মিথ্যারোপ করেছেন। ইমাম আবু দাউদ এই হাদীসকে সহীহ বলেন নি। বরং হাদীসটি উদ্ধৃত করার পর কোন মন্তব্য না করে নিরবতা অবলম্বন করেছেন। নিরবতা অবলম্বন আর সহীহ বলা এক কথা নয়।

যেসব হাদীসের ক্ষেত্রে ইমাম আবু দাউদ নিরবতা অবলম্বন করেছেন সেগুলোর মধ্যে সহীহ হাসান ও যঈফ সব ধরনের হাদীসই রয়েছে। লেখকের জানা না থাকলে আন নুকাত আলা মুকাদ্দামাতি ইবনুস সালাহ গ্রন্থে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানীর মন্তব্য এবং সিয়ারু আলামিন নুবালা গ্রন্থে (ইমাম আবু দাউদের জীবনী আলোচনায়) হাফেয শামসুদ্দীন যাহাবীর বক্তব্য পড়ে দেখতে পারেন।

যদি কথার কথা ধরেও নিই, ইমাম আবু দাউদ বুকের উপর হাত বাঁধার হাদীসকে ছহীহ বলেছেন, তবে সেটা ইমাম আহমদের মাযহাব হওয়া প্রমাণিত হবে কী করে? দুটি বিষয়ের মধ্যে এমন অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক লেখক কোত্থেকে আবিষ্কার করলেন?

যদি বলেন, ইমাম আবু দাউদ তার শিষ্য তো তাই। তাহলে বলব, বড় আশ্চর্য কথা, শিষ্যরা হাদীসকে সহীহ বলবেন, আর তার দ্বারা ইমামগণের মাযহাব প্রমাণিত হবে! এ দুটি কথার মধ্যে এমন গভীর সম্পর্ক হলো কী করে! যদি বলেন, ঐ যে ইমামগণ থেকে একটি কথা প্রসিদ্ধ রয়েছে: إذا صح الحديث فهو مذهبي হাদীস সহীহ হলে সেটিই আমার মাযহাব: তাহলে বলব, ভূমিকায় এ উক্তিটির মর্ম ও শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। সেখান থেকে এর উত্তর জেনে নিন।

আলোচ্য মাসআলায় ইমাম আহমদ স্পষ্ট বলেছেন, বুকের উপর হাত বাঁধা মাকরুহ। তার এ কথা স্বয়ং ইমাম আবু দাউদ স্বীয় মাসাইল সংকলনে উল্লেখ করেছেন। হাম্বলী মাযহাবের আরেক শীর্ষ আলেম ইবনে মুফলিহ তার আল ফুরু গ্রন্থে লিখেছেন, ويكره وضعها على صدره نص عليهবুকের উপর হাত রাখা মাকরুহ। আহমদ রহ. একথা স্পষ্ট করেই বলেছেন। ইমাম আবু দাউদ ইমাম আহমদ থেকে এ ফতোয়া উল্লেখ করেছেন যে, فوق السرة قليلا وإن كان تحت السرة فلا بأس به হাত নাভীর সামান্য উপরে রাখবে, নাভীর নীচে রাখলেও কোন অসুবিধা নেই। (দ্র. মাসাইলে আহমদ, লি আবী দাউদ, ১/৪৮) আহমদ রহ.এর আরেক শীর্ষ শিষ্য ইসহাক ইবনে মানসুর আল কাওসাজও তার উস্তাদের মত উল্লেখ করেছেন যে, নাভীর উপরে বা নীচে হাত রাখবে। ইমাম আহমদের আরেকজন অন্যতম শিষ্য ফাদল ইবনে যিয়াদ উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আহমদের মত হলো নাভীর নীচে রাখা। এতসব মজবুত প্রমাণাদি থাকার পরও মুযাফফর বিন মুহসিন ইমাম আহমদের মাযহাব হিসাবে তার উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন বুকের উপর হাত বাঁধা। কিন্তু লেখককে মনে রাখতে হবে, গায়ের জোরে বলা ও কলমের জোরে লেখার দিন ফুরিয়ে গেছে।