দলিলসহ নামাজের মাসায়েল : (পর্ব ৫০)১২ তাকবীরের হাদীসগুলো সম্পর্কে পর্যালোচনা | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

১২ তাকবীরের হাদীসগুলো সম্পর্কে পর্যালোচনা

১. কাছীর ইবনে আব্দুল্লাহর হাদীস: তিনি তার পিতার সূত্রে দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী ও ইবনে মাজায় এটি উদ্ধৃত হয়েছে। ইমাম বুখারী র. ও তিরমিযী র. এর মতে বার তাকবীরের হাদীসগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে ভাল। তিরমিযী এটিকে হাসান বলেছেন। কিন্তু কাছীর সম্পর্কে আবূ দাউদ র. বলেছেন, كان أحد الكذابين ( সে ছিল একজন মিথ্যুক)। ইমাম শাফেয়ী র. বলেছেন, এ ব্যক্তি চরম মিথ্যাবাদীদের একজন। ইমাম আহমদ, ইবনে মাঈন, আবূ যুরআ, আবূ হাতেম, নাসায়ী, দারাকুতনী, ইবনে সা’দ, ইবনে হিব্বান, ইবনুস সাকান, হাকেম ও ইবনে হাযম সকলে তাকে যঈফ (দুর্বল) অথবা মাতরূক (পরিত্যাগযোগ্য) আখ্যা দিয়েছেন। ইবনে আব্দুল বার বলেছেন, তার যঈফ হওয়ার ব্যাপারে সকলে একমত। মিযযী, যাহাবী ও ইবনে হাজার আসকালানীও তাকে যঈফ বলেছেন। লা-মাযহাবী আলেম তিরমিযী শরীফের ভাষ্যকার মোবারকপুরী ও আলবানী (ইবনে খুযায়মার টীকায়) সাহেবও যঈফ বলেছেন।

২.আয়েশা রা. এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসটি আবূ দাউদ ও ইবনে মাজায় উদ্ধৃত হয়েছে। এর সনদে ইবনে লাহীআ আছেন। ইমাম বুখারী এই হাদীসকে যঈফ সাব্যস্ত করেছেন। (দ্র, ইলালে তিরমিযী আল কাবীর, পৃ, ৯৪) হাকেম আবূ আব্দুল্লাহও এটিকে যঈফ বলেছেন। দারাকুতনী ও তাহাবী র. একই ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইবনে হাজার আসকালানী তালখীসুল হাবীর গ্রন্থে বলেছেন, ইবনে লাহীআ থেকে এর সনদে এজতেরাব ও এখতেলাফ রয়েছে। তদুপরি ইবনে লাহীআ তাদের দৃষ্টিতে যঈফ ।

৩. ইবনে উমর রা. এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসটি দারাকুতনী, তাহাবী ও বাযযারে আছে। এর সনদে ফারাজ ইবনে ফাদালা(فرج بن فضالة) আছেন। তিনি যঈফ। তার এ হাদীসকে বুখারী, আবূ হাতেম রাযী ও তিরমিযী প্রমুখ ভুল বর্ণনা আখ্যা দিয়েছেন। ফারাজের উস্তুাদ আব্দুল্লাহ ইবনে আমের আসলামীও দুর্বল। আহমাদ, ইবনে মাঈন, ইবনুল মাদীনী, আবূ যুরআ, আবূ হাতেম, বুখারী , আবু দাউদ ও দারাকুতনী র. তাকে যঈফ ও দুর্বল বলেছেন।

৪. আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসটি আবূ দাউদ, ইবনে মাজাহ ইত্যাদি গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে। এর সনদে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান তাইফী আছেন। ইবনে মাঈন, আবূ হাতেম, নাসায়ী, দারাকুতনী, উকায়লী, ইবনুল জাওযী ও ইবনুল কাত্তান র. প্রমুখ তাকে যঈফ বা দুর্বল আখ্যা দিয়েছেন। হাকেম এই হাদীসের সনদকে ফাসেদ আখ্যা দিয়েছেন। ইবনে হাজার অবশ্য ‘তালখীস’ গ্রন্থে বলেছেন, এই হাদীসকে আহমাদ, ইবনুল মাদীনী ও বুখারী র. সহীহ বলেছেন। কিন্তু এ কথাটি ঠিক নয় । কারণ ইমাম আহমাদ স্পষ্ট বলেছেন যে, ليس في تكبير العيدين عن النبي صلى الله عليه وسلم حديث صحيح (উভয় ঈদের তাকবীর সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন সহীহ হাদীস নেই) (টীকা-১) । (দ্র. নাসবুর রায়াহ, ২/২১৫, ২১৮) সুতরাং এই হাদীসকে তিনি সহীহ বলতে পারেন না। বুখারী র. এর কথা যদিও তিরমিযী র. উল্লেখ করেছেন, কিন্তু সেই ‘সহীহ’ শাব্দিক অর্থে হবে। অর্থাৎ হাদীসটি ঠিক আছে; পারিভাষিক অর্থে নয়। কারণ বুখারী ও তিরমিযী দুজনের মতেই বার তাকবীর সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো হাদীস হল পূর্বে উল্লিখিত প্রথম হাদীসটি। আর সেটাকে তিরমিযী সহীহ বলেননি, হাসান বলেছেন। যা সহীহ থেকে নীচের স্তরের। আর অন্যান্য অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতানুসারে সেটিও চরম দুর্বল। সুতরাং সেই হাদীসের চেয়ে নি¤œস্তরের হাদীস পারিভাষিক অর্থে সহীহ হতে পারে না। এই কারণে মুনযিরী র. মুখতাসার আবূ দাউদে বলেছেন,

وفي إسناده عبد الله الطائفي وفيه مقال

এর সনদে আব্দুল্লাহ তাইফী আছেন, যার ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে।

তাহাবী র. বলেছেন, والطائفي ليس عندهم بالذي يحتج بروايته মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে তাইফীর বর্ণনা প্রমাণযোগ্য নয়। তাছাড়া বুখারী র. তার সম্পর্কে বলেছেন, فيه نظرতার ব্যাপারে আপত্তি আছে। (দ্র, তাহযীবুত তাহযীব)

৫. হযরত আলী রা. এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসটির সূত্র বিচ্ছিন্ন। তদুপরি এর বর্ণনাকারী ইবরাহীম ইবনে আবী ইয়াহয়া চরম দুর্বল।

৬. হযরত জাবের রা. থেকে একটি হাদীস বায়হাকীতে উদ্ধৃত হয়েছে। এর সনদে আলী ইবনে আসেম আছেন। শো’বা, ইবনুল মুবারক, ইবনুল মাদীনী, ইবনে মাঈন, নাসায়ী, সাজী ও সালেহ জাযারা প্রমুখ তার কঠোর সমালোচনা করেছেন। এর বিপরীত জাবের রা. থেকে সহীহ সনদে আমরা ছয় তাকবীরের হাদীস উল্লেখ করেছি।

৭. আব্দুর রহমান ইবনে আওফের মাধ্যমে বর্ণিত একটি হাদীস বাযযারে আছে। এর সনদে হাসান ইবনে হাম্মাদ বাজালী আছেন। তাকে বাযযার র.(দ্র, মাজমাউয যাওয়ায়েদের টীকা) ও শাওকানী (তিনি লা-মাযহাবী আলেম) বলেছেন لين الحديث (অর্থাৎ তার হাদীস দুর্বল)। দারাকুতনীর মতেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসরূপে এটা ঠিক নয়। তিনি বলেছেন, এটি মাওকূফ (সাহাবীর বক্তব্য বা কর্ম) হওয়াই সঠিক।

৮. হযরত ইবনে আব্বাস রা. এর মাধ্যমে বর্ণিত একটি হাদীস তাবারানীর আলমুজামুল কাবীরে উদ্ধৃত হয়েছে। এতে সুলায়মান ইবনে আরকাম আছেন, যিনি সকল মুহাদ্দিসের দৃষ্টিতে পরিত্যাগযোগ্য। এর আরেকটি সূত্রে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল আযীয তদীয় পিতা আব্দুল আযীয থেকে বর্ণনা করেছেন। মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল আযীয সম্পর্কে বুখারী র. বলেছেন, منكر الحديث (আপত্তিকর হাদীস বর্ণনাকারী)। নাসায়ী র. বলেছেন, متروك الحديث(তার হাদীস বর্জনযোগ্য)। আর আবূ হাতেম রাযী বলেছেন, ضعيف الحديث )তার হাদীস দুর্বল(। অধিকন্তু তার পিতা আব্দুল আযীয সম্পর্কে ইবনুল কাত্তান র. বলেছেন, তার অবস্থা অজানা।

৯. আবূ ওয়াকিদ লায়ছী রা. এর মাধ্যমে বর্ণিত হাদীস তাহাবী ও তাবারানী উদ্ধৃত করেছেন। এটি সম্পর্কে আবূ হাতেম রাযী বলেছেন, هذا حديث باطل بهذا الإسنادএইসূত্রে হাদীসটি বাতিল। (দ্র, আত তালখীসুল হাবীর)

অবশ্য হযরত আবু হুরায়রা ও ইবনে আব্বাস রা. এর আমলরূপে ১২ তাকবীরের বর্ণনাও সহীহ সনদে বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে।