দলিলসহ নামাজের মাসায়েল : (পর্ব ৩৭)হাঁটুর পূর্বে হাত রাখার দলিল : একটু পর্যালোচনা | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

হাঁটুর পূর্বে হাত রাখার দলিল : একটু পর্যালোচনা

এক্ষেত্রে দুটি হাদীস এসেছে। হাদীসদুটি পর্যালোচনাসহ এখানে তুলে ধরা হলো।

প্রথম হাদীস

প্রথম হাদীসটি আবু হুরায়রা রা.এর সূত্রে বর্ণিত। এটি দুভাবে বর্ণিত হয়েছে।

ক. আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন,

يعمد أحدكم فيبرك في صلاته برك الجمل

অর্থাৎ তোমাদের কেউ কেউ কি এমন করে যে, নামাযে উটের মতো করে বসে? )তিরমিযী, ২৬৯; নাসাঈ, ১০৯০(

এ হাদীসে উটের মতো করে বসা যে অপছন্দনীয় সেটাই প্রকাশ করা হয়েছে। আলেমগণের এক জামাত বলেছেন, উটের সামনের পা দুটিই হলো হাত। তাই যেহেতু উট প্রথমে হাত গুটিয়ে বসে, তাই এটা অপছন্দ করার অর্থ হলো আগে হাঁটু পরে হাত রেখে সেজদা করা। আল্লামা আবু বকর জাসসাস রাযী, সারাখসী, ইবনুল কাইয়্যিম, আমীর ইয়ামানী, হাসান ইবনে আহমদ সানআনী (ফাতহুল গাফফার প্রণেতা) ও শায়খ সালিহ উছায়মীন প্রমুখ এ মতই অবলম্বন করেছেন। আবার ইমাম তাহাবী, ফযলুল্লাহ তুরেবিশতী, মুবারকপুরী ও আলবানী সাহেবসহ অনেকে বলেছেন, উটের সামনের পায়েই যেহেতু তার হাঁটু, সে হিসাবে উট প্রথমে হাঁটু রাখে, তাই হাদীসে এটাকে অপছন্দ করে আগে হাত রেখে পরে হাঁটু রাখতে উৎসাহিত করা হয়েছে।

কিন্তু এই বিতর্কের পূর্বে আমাদেরকে দেখতে হবে, হাদীসটি আসলে সঠিক ও প্রমাণিত কি না। হাদীসটির দুজন রাবী নিয়ে কথা আছে। একজন হলেন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান। তার সম্পর্কে নাসাঈ বিশ্বস্ত হওয়ার দাবি করলেও ইমাম বুখারী রহ. তার আত তারীখুল কাবীরে এ হাদীসটি উল্লেখপূর্বক মন্তব্য করেছেন, لا يتابع عليه ولا أدري سمع من أبي الزناد أم لاঅর্থাৎ তার হাদীসটির সমর্থন পাওয়া যায় না। আমি জানি না তিনি আবুয যিনাদ থেকে (হাদীসটি) শুনেছেন কি না। (নং ৪১৮)

অপর রাবী হলেন আব্দুল্লাহ ইবনে নাফি আস সাইগ। তার বিশ্বস্ততা নিয়ে মুহাদ্দিসগণের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। ইবনে মাঈন ও ইজলী প্রমুখ তাকে বিশ্বস্ত বলেছেন। কিন্তু ইমাম আহমদ বলেছেন, لم يكن في الحديث بذاكঅর্থাৎ তিনি হাদীসের ক্ষেত্রে তেমন মজবুত ছিলেন না। ইমাম বুখারী রহ. বলেছেন, يعرف حفظه وينكر وكتابه أصحঅর্থাৎ তার স্মৃতি কখনো ঠিক থাকে, কখনো আপত্তিকর ঠেকে, তবে তার কিতাব অধিক শুদ্ধ। আবু হাতেম রাযী বলেছেন, هو لين في حفظه وكتابه أصح অর্থাৎ তিনি স্মৃতির ক্ষেত্রে দুর্বল ছিলেন, তার কিতাব অধিক শুদ্ধ ছিল। (দ্র. তাহযীবুল কামাল ও আলজারহু ওয়াত তাদীল) আবু যুরআ রাযী এক বর্ণনায় তো বলেছেন, لا بأس به অর্থাৎ তার মধ্যে তেমন সমস্যা নেই। কিন্তু বারযায়ীর বর্ণনায় তিনি বলেছেন, هو عندي منكر الحديث অর্থাৎ তিনি আমার দৃষ্টিতে আপত্তিকর হাদীস বর্ণনাকারী। বারযায়ী আরো বলেন,

ذكرت أصحاب مالك يعني لأبي زرعة فذكرت عبد الله بن نافع الصائغ فكلح وجهه

অর্থাৎ আমি মালেক রহ.এর শিষ্যদের কথা উল্লেখ করলাম অর্থাৎ আবু যুরআর নিকট, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে নাফি আস সাইগ এর কথা বলতেই তিনি মুখ কালো করে ফেললেন।

ইবনে হিব্বান বলেছেন, كان صحيح الكتاب وإذا حدث من حفظه ربما أخطأ অর্থাৎ তার কিতাব সঠিক, যখন তিনি মুখস্থ হাদীস বর্ণনা করেন, তখন মাঝেমধ্যেই ভুল করেন। দারাকুতনী বলেছেন, فقيه يعتبر به অর্থাৎ তিনি ফকীহ, অন্যের সমর্থনকল্পে তাকে গ্রহণ করা যায়। ইবন মানজুয়াহ তার রিজালু সাহীহ মুসলিম গ্রন্থে বলেছেন, في حفظه شيئ তার স্মৃতিশক্তিতে সমস্যা ছিল। এসব মন্তব্য বিবেচনায় নিয়েই ইবনে হাজার আসকালানী তার তাকরীব গ্রন্থে লিখেছেন, ثقة صحيح الكتاب في حفظه لينঅর্থাৎ তিনি বিশ্বস্ত, তার কিতাবও সঠিক, তবে তার স্মৃতিতে দুর্বলতা ছিল।

এখন এ হাদীসটিকে সহীহ আখ্যা দেওয়ার একটাই পথ। আর তা হলো একথা প্রমাণ করা যে, তিনি এ হাদীসটি তার কিতাব থেকেই বর্ণনা করেছেন। কিতাব থেকে বর্ণনা করলেও সহীহ তখন হতো যদি তার উস্তাদ সমালোচনার উর্ধ্বে হতেন। কিন্তু পেছনে আমরা দেখলাম, তিনিও সমালোচনা মুক্ত নন। বিশেষ করে ইমাম বুখারী তার নির্ণয়ন নিয়েও দ্বিধা প্রকাশ করেছেন। এবং তাকে তার আয যুআফা (দুর্বল রাবীদের জীবনচরিত) গ্রন্থে উল্লেখ করে তার দুর্বল হওয়ারই ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ কথার উদ্ধৃতি একটু পরেই আসছে।

এসব কারণে এই হাদীসকে সহীহ বলা তো দূরের কথা, হাসান বলাও মুশকিল। তাই তো ইমাম তিরমিযী ও আবু বকর হাযেমী এই হাদীসকে গরীব বলে এর দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। বুখারী ও দারাকুতনীও এটি মা’লুল বা দুর্বল সাব্যস্ত করেছেন। মুহাদ্দিস হামযা কিনানী (মৃত্যু ৩৫৭ হিজরী) বলেছেন, هو منكر অর্থাৎ এটি আপত্তিকর বর্ণনা। ইবনে রজব হাম্বলী তার বুখারী শরীফের ভাষ্যগ্রন্থ ফাতহুল বারীতে বলেছেন, لا يثبتএটি প্রমাণিত নয়।

শুধু তারাই নন, স্বয়ং আলবানী সাহেবও সাহীহা গ্রন্থে (৩১৯৬) আব্দুল্লাহ ইবনে নাফি’ সম্পর্কে বলেছেন, وفيه ضعف من قبل حفظه قال الحافظ في التقريب : ثقة صحيح الكتاب في حفظه لين অর্থাৎ স্মৃতিশক্তির দিক থেকে তার মধ্যে কিছু দুর্বলতা রয়েছে। হাফেজ তাকরীবে বলেছেন, তিনি বিশ্বস্ত, তার কিতাব সঠিক কিন্তু তার স্মৃতিতে কিছু দুর্বলতা আছে। এর চেয়েও আশ্চর্য হলো, জয়ীফা গ্রন্থে (৬৬১৬) তিনি তার হাদীস সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে,

قلت: وهذا إسناد ضعيف، عبد اللة بن نافع - هو: الصائغ، وهو -: ثقة صحيح الكتاب، في حفظه لين - كما في " التقريب " -، ولا أدري هذا مما حدث به من كتابه أم من حفظه.

অর্থাৎ আমি বলব, এই সনদটি দুর্বল। আব্দুল্লাহ ইবনে নাফি’ আসসাইগ বিশ্বস্ত, তার কিতাবও সঠিক। কিন্তু তার স্মৃতিতে কিছু দুর্বলতা রয়েছে, যেমনটি তাকরীব গ্রন্থে বলা হয়েছে। আমার জানা নেই, এই হাদীসটি তিনি কিতাব থেকে বর্ণনা করেছেন না স্মৃতি থেকে।

এমনিভাবে জয়ীফে আবু দাউদে আলবানী সাহেব তার হাদীসকে দুর্বল আখ্যা দিয়ে বলেছেন, وهو ضعيف من قبل حفظه অর্থাৎ তিনি স্মৃতির দুর্বলতার কারণে দুর্বল। (নং ৭৮) উক্ত গ্রন্থেই ২২১ নং হাদীস সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেছেন, إسناده ضعيف ابن نافع لين الحفظ অর্থাৎ এর সনদ দুর্বল। ইবনে নাফি স্মৃতি-দুর্বল ছিলেন।

তাহলে আলবানী সাহেবের নীতি অনুসারেও উল্লিখিত হাদীসটি যঈফই প্রমাণিত হয়। আর বড় বড় মুহাদ্দিসগণ তো এটিকে দুর্বল আখ্যা দিয়েছেনই।

খ. হাদীসটি ভিন্ন আরেকটি সূত্রে একটু ভিন্ন শব্দে এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে, আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন,

إذا سجد أحدكم فلا يبرك كما يبرك البعير وليضع يديه قبل ركبتيه

অর্থাৎ তোমাদের কেউ যখন সেজদা করে তখন উটের মতো করে যেন না বসে। সে যেন তার হাঁটুদ্বয়ের পূর্বে হস্তদ্বয় রাখে। (আবু দাউদ, হাদীস ৮৪০; নাসাঈ, হাদীস ১০৯১; দারিমী, হাদীস ১৩৬০; মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৮৯৫৫; দারাকুতনী, ১/৩৪৫; বায়হাকী, হাদীস ২৬৩৩)

এ হাদীসটির সনদেও দুজন সমালোচিত রাবী রয়েছেন। একজন তো হলেন পূর্ববর্তী সনদটিতে উল্লিখিত সেই মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান। অপরজন হচ্ছেন তারই শিষ্য আব্দুল আযীয ইবনে মুহাম্মদ আদ দারাওয়ার্দী। দারাওয়ার্দীর স্মৃতিদুর্বলতা নিয়ে অনেক মুহাদ্দিসই সমালোচনা করেছেন। ইমাম আহমদ বলেছেন, যখন তিনি স্মৃতি থেকে হাদীস বর্ণনা করেন, তখন ভুল করে ফেলেন, তখন আর তিনি বিশ্বস্ত থাকেন না। আর যখন কিতাব থেকে বর্ণনা করেন তখন ঠিক মতোই বর্ণনা করেন। অন্যত্র তিনি বলেছেন, স্মৃতি থেকে বর্ণনা করার সময় তিনি অনেক বাতিল হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, অনেক সময় তিনি অন্যদের কিতাব থেকে বর্ণনা করতেন এবং ভুলের শিকার হতেন। আবু যুরআ রাযী বলেছেন, তিনি দুর্বল স্মৃতিসম্পন্ন। স্মৃতি থেকে কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং ভুলের শিকার হয়েছেন। নাসাঈ এক বর্ণনায় বলেছেন, তিনি মজবুত বর্ণনাকারী নন। আবু হাতেম রাযী বলেছেন, তার দ্বারা প্রমাণ পেশ করা যায় না। এসব কারণে বুখারী ও মুসলিম তার একক কোন বর্ণনা গ্রহণ করেন নি। সুতরাং তার একক বর্ণনাকে সহীহ আখ্যা দেওয়া কঠিন।

আরেকটি কথা, দারাওয়ার্দীর এই বর্ণনায় হাঁটুর পূর্বে হাত রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু হাত কোথায় রাখবে তা স্পষ্ট করে বলা হয় নি। কিন্তু এই আব্দুল আযীয দারাওয়ার্দীর অপর একটি বর্ণনা বায়হাকীতে উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, وليضع يديه على ركبتيهঅর্থাৎ সে যেন তার উভয় হাত দু’হাঁটুর উপর রাখে। (নং ২৬৩৪)

এটি উদ্ধৃত করার পর বায়হাকী রহ. লিখেছেন,

فَإِنْ كَانَ مَحْفُوظًا كَانَ دَلِيلاً عَلَى أَنَّهُ يَضَعُ يَدَيْهِ عَلَى رُكْبَتَيْهِ عِنْدَ الإِهْوَاءِ إِلَى السُّجُودِ

অর্থাৎ এ বর্ণনাটি সঠিক হলে এটি সেজদায় যাওয়ার সময় উভয় হাত হাঁটুর উপর রাখার দলিল হবে।

এ হিসাবে হাদীসটির মর্ম দাঁড়াবে, তোমাদের কেউ যেন উটের মতো করে সেজদায় না যায়। বরং তার হাঁটু জমিতে রাখার পূর্বেই যেন উভয় হাত দু’হাটুর উপর রাখে। ইমাম কাশ্মিরী রহ.ও হাদীসটির এমর্ম সমর্থন করেছেন। নীমাবী রহ. কৃত আছারুস সুনান গ্রন্থের টীকায় তিনি লিখেছেন,

إنما يريد جعل اليدين على الركبتين حتى يصير شيئا واحدا ولم أر في لفظ ذكر الأرض فالمراد وضع اليدين على موضعهما وهما الركبتان فإنه لا موضع لهما في حين الانحطاط وبين السجدتين والقعدة إلا الركبتان

অর্থাৎ হাদীসটির মর্ম হলো, উভয় হাত হাঁটুর উপর রাখা, যাতে সবটা এক জিনিস হয়ে যায়। এর কোন বর্ণনাতেই আমি জমিনে রাখার উল্লেখ পাই নি। সুতরাং এর মর্ম হবে, উভয় হাত যথাস্থানে রাখা। আর সেই স্থান হলো হাঁটু। কেননা সেজদায় যাওয়ার সময়, দুই সেজদার মাঝে ও বৈঠককালে হাত রাখার স্থানই হলো হাঁটু। (পৃ. ১১৬)

দ্বিতীয় হাদীস :

১.আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন,

ان رسول الله صلى الله عليه وسلم كان إذا سجد يضع يديه قبل ركبتيه

অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সা. যখন সেজদা করতেন, তখন হাঁটু রাখার পূর্বে হাত রাখতেন। (দারাকুতনী, ১/৩৪৪)

এ হাদীস ভিন্ন শব্দে এভাবেও উদ্ধৃত হয়েছে:

عن نافع عن ابن عمر : أنه كان يضع يديه قبل ركبتيه وقال : كان رسول الله صلى الله عليه و سلم يفعل ذلك

নাফি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. হাঁটু রাখার পূর্বে হাত রাখতেন এবং বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সা. এমনটি করতেন। সহীহ ইবনে খুযায়মা (৬২৭), মুসতাদরাকে হাকেম (৯৩০) ও বায়হাকী (২৬৩৮)। হাকেম বলেছেন, এটি ইমাম মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ।

পর্যালোচনা

একাধিক হাদীসগ্রন্থে উদ্ধৃত হলেও এ হাদীসটির সনদ বা সূত্র মাত্র একটিই। আব্দুল আযীয ইবনে মুহাম্মদ দারাওয়ার্দী এটি বর্ণনা করেছেন উবায়দুল্লাহ ইবনে উমর আলউমারী থেকে, তিনি নাফি’ থেকে, তিনি হযরত ইবনে উমর রা. থেকে। আব্দুল আযীয দারাওয়ার্দী ছাড়া অন্য কেউ এটি বর্ণনা করেন নি। দারাওয়ার্দীর স্মৃতিদুর্বলতা সম্পর্কে পেছনের হাদীসে আলোচনা করা হয়েছে। স্মৃতিদুর্বলতার পাশাপাশি এ হাদীসে আরেকটি বড় সমস্যা হলো, উবায়দুল্লাহ আল উমারী থেকে তাঁর বর্ণনার ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণের আপত্তি রয়েছে। ইমাম আহমদ বলেছেন, ما حدث عن عبيد الله بن عمر فهو عن عبد الله بن عمر অর্থাৎ তিনি উবায়দুল্লাহ ইবনে উমর থেকে যত হাদীস বর্ণনা করেছেন, তা সবই আসলে (তারই ভাই) আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (আল উমারী) থেকে। (দ্র. আলজারহু ওয়াত তা’দীল লি ইবনি আবী হাতিম, নং ১৮৩৩)

যদি তাই হয়, তবে আব্দুল আযীয দারাওয়ার্দী যত হাদীস উবায়দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন তার সবই জয়ীফ বা দুর্বল। কেননা আব্দুল্লাহ আল উমারী মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে দুর্বল ছিলেন।

ইমাম নাসাঈ দারাওয়ার্দী সম্পর্কে বলেছেন, ليس به بأس وحديثه عن عبيد الله منكر অর্থাৎ তার মধ্যে সমস্যার কিছু নেই, তবে উবায়দুল্লাহ থেকে তার বর্ণনা আপত্তিকর। (দ্র. তাহযীবুল কামাল)

সুতরাং এ হাদীসটি সহীহ হতে পারে না। তাই তো ইমাম মুসলিম রহ. দারাওয়ার্দীর একক বর্ণনা যেমন গ্রহণ করেন নি, তেমনি উবায়দুল্লাহ থেকেও তাঁর কোন বর্ণনা গ্রহণ করেন নি। আর ইমাম বুখারী তো আরো কড়াকড়ি করেছেন। তাই বলা যায়, এটি ইমাম মুসলিমের শর্ত মোতাবেক হয় নি। যদিও হাকেম সে দাবি করেছেন। যারা বলেন, দারাওয়ার্দী যখন মুসলিম শরীফের রাবী, তাই তার একক বর্ণনায় কোন সমস্যা নেই, বা উবায়দুল্লাহ থেকে দারাওয়ার্দীর বর্ণনা সহীহ হতে কোন বাধা নেই, তাদের বক্তব্য যেমন সুক্ষ্ম চিন্তাপ্রসূত নয়, তেমনি মুহাদ্দিসগণের সিদ্ধান্তের সঙ্গেও এর কোন মিল নেই।

ইমাম দারাকুতনীও দারাওয়ার্দীর একক বর্ণনার কারণে এই হাদীসকে মালুল বা দুর্বল আখ্যা দিয়েছেন। (দ্র. তানকীহ লি ইবনে আবদিল হাদী, ৮১৫) আর বায়হাকী এটি উদ্ধৃত করার পর বলেছেন, ما أراه إلا وهما অর্থাৎ আমি এটাকে (দারাওয়ার্দীর) ভুলই মনে করি।

বায়হাকী রহ. আরো বলেছেন,

وَالْمَشْهُورُ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ فِى هَذَا: إِذَا سَجَدَ أَحَدُكُمْ فَلْيَضَعْ يَدَيْهِ ، فَإِذَا رَفَعَ فَلْيَرْفَعْهُمَا فَإِنَّ الْيَدَيْنِ تَسْجُدَانِ كَمَا يَسْجُدُ الْوَجْهُ. وَالْمَقْصُودُ مِنْهُ وَضْعُ الْيَدَيْنِ فِى السُّجُودِ لاَ التَّقْدِيمُ فِيهِمَا وَاللَّهُ تَعَالَى أَعْلَمُ.

অর্থাৎ আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে এ ক্ষেত্রে যে হাদীসটি প্রসিদ্ধ সেটি হলো, যখন তোমাদের কেউ সেজদা করে সে যেন হাত রাখে এবং যখন উঠে তখন যেন হাত তুলে নেয়। কেননা হাতও চেহারার মতো সেজদা করে। এ হাদীসের উদ্দেশ্য হলো সেজদার সময় হাত রাখা, পূর্বে রাখা নয়। (নং ২৬৩৯)

হাফেজ ইবনুল কায়্যিম রহ.ও তার ‘তাহযীবে সুনানে আবু দাউদ’ গ্রন্থে বায়হাকীর এ বক্তব্যের সঙ্গে সহমত ব্যক্ত করেছেন। সর্বোপরি ইবনে উমর রা.এর এ হাদীসটি ইমাম বুখারী রহ. মাওকূফ তথা ইবনে উমর রা. এর আমলরূপে উদ্ধৃত করেছেন। মারফূ রূপে নয়। (দ্র, বুখারী শরীফ, অনুচ্ছেদ নং ১২৮)

উল্লেখ্য যে, এই মাওকুফ বর্ণনাটিও দারাওয়ার্দী সেই উবায়দুল্লাহ’র সূত্রেই বর্ণনা করেছেন। সুতরাং ইমাম বুখারী সূত্র ব্যতীত এটি উল্লেখ করলেও এতে পূর্বোক্ত সমস্যাগুলো থেকেই যাচ্ছে। তদুপরি ইবনে উমর রা. সম্পর্কে বিপরীত আমল উদ্ধৃত হয়েছে মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বায়। সেখানে বলা হয়েছে, ইবনে আবু লায়লা বর্ণনা করেছেন নাফে রহ. থেকে, তিনি ইবনে উমর রা. সম্পর্কে বলেছেন,

أَنَّهُ كَانَ يَضَعُ رُكْبَتَيْهِ إذَا سَجَدَ قَبْلَ يَدَيْهِ ، وَيَرْفَعُ يَدَيْهِ إذَا رَفَعَ قَبْلَ رُكْبَتَيْهِ.

অর্থাৎ তিনি সেজদার সময় হাত রাখার পূর্বে হাঁটু রাখতেন এবং ওঠার সময় হাঁটু তোলার পূর্বে হাত তুলতেন। (নং ২৭২০)

এর সনদে ইবনে আবু লায়লা রয়েছেন। তার বিশ্বস্ততা নিয়ে দ্বিমত আছে। তিনি মধ্যম স্তরের রাবী, যেমনটি বলেছেন হাফেজ যাহাবী রহ.। অনেকে তাকে দুর্বল আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু ইবনে উমর রা.এর পূর্বোক্ত আমলটিও যেহেতু সহীহ সনদে নেই, তাই দুটিই সমমানের হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এ কারণেই ইমাম ইবনুল মুনযির রহ. তার আল আওসাত গ্রন্থে ইবনে উমর রা. এর মাওকুফ বর্ণনাটি দুর্বল হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন,

وقد تكلم في حديث ابن عمر ، قيل : إن الذي يصح من حديث ابن عمر موقوف ، وحديث وائل بن حجر ثابت وبه نقول

অর্থাৎ ইবনে উমর রা. এর (মারফূ) হাদীসটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বলা হয়, ইবনে উমর রা. এর হাদীসটি মওকুফ হওয়াই সঠিক। আর ওয়াইল ইবনে হুজর রা.এর হাদীসটি প্রমাণিত। আমাদের মতও অনুরূপ। (৩/৩২৭)