দলিলসহ নামাজের মাসায়েল : (পর্ব ২৯)বিশেষ জ্ঞাতব্য : | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

বিশেষ জ্ঞাতব্য :

এ মাসআলায় আমাদের লা-মাযহাবী বন্ধু মুযাফফর বিন মুহসিন তার জাল হাদীছের কবলে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছালাত নামক বইটিতে বলেছেন:

‘জ্ঞাতব্য : রাফউল ইয়াদায়েনের সুন্নাতকে রহিত করার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনু জুবাইর, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ কয়েকজন ছাহাবীর নামে উক্ত হাদীছগুলো জাল করা হয়েছে।

কিন্তু ‘ঐ সাহাবীগণের নামে এসব হাদীস জাল করা হয়েছে’: একথা বলার পূর্বে লেখকের ইলমী পুঁজি কতটুকু তাও তার উচিৎ ছিল খতিয়ে দেখা। কারণ বুদ্ধিমান সেই যে অপদস্থ হওয়ার পূর্বে নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে খবর নেয়। এই লেখকই উক্ত গ্রন্থের ১৩৭ নং পৃষ্ঠায় জোহরের নামায সম্পর্কে আবূ যর গিফারী রা. বর্ণিত হাদীসটির অর্থ লিখেছেন, “তখন আবার বললেন, তালূল দেখা পর্যন্ত দেরি কর”। ছি ছি ছি! এই সহজ হাদীসটির অর্থ লিখতে তিনি এত মারাত্মক ভুল করলেন? এলেমের এই চালান নিয়ে আবার এতবড় আস্ফালন! সঠিক অর্থ হবে: অবশেষে আমরা (একথা বলছেন আবূ যর রা.) টিলার ছায়া দেখতে পেলাম।

হাদীস সংকলক মুহাদ্দিসগণ সনদ ও সূত্রসহ যে হাদীসগুলো উদ্ধৃত করেছেন, সেই সনদে যদি কোন মিথ্যুক রাবী থেকে থাকে, তাহলেই সাধারণত হাদীসটিকে জাল বলা হয়।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর হাদীসটি ইমাম আহমদ (স্বীয় মুসনাদে), ইবনে আবী শায়বা (স্বীয় মুছান্নাফে), আবূদাউদ, তিরমিযী ও নাসায়ী স্ব স্ব সুনান গ্রন্থে, আবূ ইয়ালা তার মুসনাদে এবং আরো অনেকে উদ্ধৃত করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে এটি আলকামা (বুখারী-মুসলিমের রাবী) বর্ণনা করেছেন। তার কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন আব্দুর রহমান ইবনুল আসওয়াদ (বুখারী-মুসলিমের রাবী), তার থেকে বর্ণনা করেছেন আসিম ইবনু কুলায়ব (মুসলিমের রাবী) তার কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন সুফিয়ান ছাওরী (বুখারী-মুসলিমের রাবী) তার থেকে বর্ণনা করেছেন ওয়াকী ইবনুল জাররাহ ও আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (তারাও বুখারী- মুসলিমের রাবী)। তাদের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন ইবনূ আবী শায়বা, আহমদ, হান্নাদ, মাহমূদ ইবনে গায়লান, সুয়াইদ ইবনে নাসর ও যুহায়র প্রমুখ। তাদের কাছ থেকেই বর্ণনা করেছেন আবু দাউদ তিরমিযী ও নাসায়ী প্রমুখ।

এখন এ হাদীসকে জাল বলতে হলে লেখককে অবশ্যই বলতে হবে তা কে জাল করেছে। সংকলকগণ? না সনদের অন্য কোন রাবী?

ইবনে মাসউদ রা. এর এ হাদীসকে সহীহ বলেছেন ইবনে হাযম জাহেরী তার আল মুহাল্লায়, আল্লামা আহমদ শাকের তার তিরমিযী শরীফের টীকায়, আলবানী সাহেব আবূ দাউদের টীকায়, শুআইব আরনাউত মুশকিলুল আছারের টীকায়, হুসায়ন সালীম আসাদ মুসনাদে আবূ ইয়ালার টীকায়। আর ইমাম তিরমিযী বলেছেন, এটি হাসান। এটি জাল হলে তারা সহীহ বা হাসান বললেন কিভাবে?

২নং হাদীস হিসাবে লেখক উল্লেখ করেছেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবু বকর ও উমর (রা.) এর সাথে ছালাত আদায় করেছি। কিন্তু তারা ছালাত আরম্ভের তাকবীর ছাড়া আর কোথাও হাত উত্তোলন করেন নি।

এরপর তিনি মন্তব্য লিখেছেন, বর্ণনাটি ভিত্তিহীন। এর কারণ হিসাবে তিনি বলেছেন, এর একজন রাবী মুহাম্মদ ইবনে জাবের সুহায়মী যঈফ। তাহলে তিনি এ হাদীসকে যঈফ বলতে পারেন। যয়ীফ আর ভিত্তিহীন কি এক কথা? এ হাদীসটি মুহাম্মদ ইবনে জাবের থেকে বর্ণনা করেছেন ইসহাক ইবনে আবূ ইসরাঈল। আর ইবনে আদী রহ. আল-কামিল গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে জাবেরের জীবনীতে লিখেছেন,

وعند اسحاق بن ابي اسرائيل عن محمد بن جابر احاديث صالحة وكان اسحاق يفضل محمد بن جابر على جماعة شيوخ هم افضل منه واوثق

অর্থাৎ মুহাম্মদ ইবনে জাবের থেকে ইসহাক ইবনে আবূ ইসরাঈলের নিকট ভাল ভাল কিছু হাদীস রয়েছে। ইসহাক রহ. মুহাম্মদ ইবনে জাবেরকে এমন অনেক শায়েখের উপর প্রাধান্য দিতেন যারা তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ছিলেন।

দারাকুতনী এ হাদীসটি উল্লেখ করার পর লিখেছেন,

قال اسحاق: به نأخذ فى الصلاة كلها

অর্থাৎ ইসহাক বলেছেন, আমরা সকল নামাযে এ অনুযায়ীই আমল করে থাকি। (১/২৯৫)

উল্লেখ্য যে, হাদীসটির বর্ণনাকারী ইসহাকের এ উক্তি প্রমান করে যে মুহাম্মদ ইবনে জাবেরের হাদীসটির উপর তার কতটা আস্থা ছিল।

ইবনে আদী তার উপরোক্ত বক্তব্যেও পর লিখেছেন-

وقد روى عن محمد بن جابر- كما ذكرت من الكبار ايوب وابن عون وهشام بن حسان وسفيان الثورى وشعبة وابن عيينة وغيرهم ولولا ان محمد بن جابر فى ذلك المحل لم يرو عنه هؤلاء الذين هو دونهم وقد خالف فى احاديث ومع ما تكلم فيه من تكلم يكتب حديثه.

অর্থাৎ মুহাম্মদ ইবনে জাবের থেকে বড়দের মধ্যে যারা বর্ণনা করেছেন তারা হলেন, আইয়্যূব, ইবনে আওন, হিশাম ইবনে হাসসান, সুফিয়ান ছাওরী, শোবা ও ইবনে উয়ায়না প্রমুখ। মুহাম্ম্দ ইবনে জাবের যদি সেই মানের না হতেন, তাহলে তার সূত্রে এমন মনীষী হাদীস বর্ণনা করতেন না। অথচ তিনি তাদের তুলনায় নি¤œমানের ছিলেন।

কতিপয় হাদীসে তিনি (বিশ্বস্তদের বর্ণনার) বিপরীত বর্ণনা করেছেন। তার ব্যাপারে যারা সমালোচনা করেছেন তাদের সমালোচনা সত্ত্বেও তার হাদীস লিপিবদ্ধ করা যায়।

এর সঙ্গে আবু হাতেম রাযী ও আবূ যুরআ রাযী উভয়ের কথাটি যোগ করুন, তারা বলেছেন,

واما اصوله فصحاح.

তার মূল হাদীসগ্রন্থগুলো সহীহ ছিল।

এ ধরনের বর্ণনাকারীর বর্ণনাকে যঈফ বলা যায়, ভিত্তিহীন বলা যায় না।

তাছাড়া মুহাম্মদ ইবনে জাবের একা নন। শক্তিশালী সূত্রে তার হাদীসটির সমর্থন পাওয়া যায়। ইমাম তাহাবী রহ. মুশকিলুল আছার গ্রন্থে লিখেছেন

حدثنا محمد بن النعمان السَقَطى نا يحيى بن يحيى النيسابورى نا وكيع عن سفيان عن عاصم بن كليب عن عبد الرحمن بن الاسود عن علقمة عن عبد الله عن النبى صلى الله عليه وسلم انه كان يرفع يديه فى اول تكبيرة ثم لايعود.

অর্থাৎ মুহাম্মদ ইবনুন নু‘মান আস সাকাতী আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন ইয়াহয়া ইবনে ইয়াহয়া আন নায়সাবূরী, তিনি বলেছেন আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন ওয়াকী রহ. সুফিয়ান এর সূত্রে আসিম ইবনে কুলাইব থেকে, তিনি আব্দুর রাহমান ইবনুল আসওয়াদ এর সূত্রে আলকামা থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ (ইবনে মাসউদ) রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু প্রথম তাকবীরের সময় হাত উত্তোলন করতেন, আর কখনো করতেন না। (হাদীস নং ৫৮২৬)

এ হাদীসটির সূত্র সম্পর্কে টীকাকার শুআয়ব আরনাউত লিখেছেন,

رجاله ثقات رجال الشيخين غيرعاصم بن كليب فمن رجال مسلم

অর্থাৎ এর বর্ণনাকারীগণ সকলে বিশ্বস্ত, বুখারী ও মুসলিমের রাবী, আসিম ইবনে কুলায়ব ছাড়া, তিনি মুসলিমের রাবী।

৩ নম্বরে লেখক বারা ইবনে আযিব রা. এর হাদীসটি উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘অতঃপর তিনি হাত তুলতেন না’ কথাটুকু উক্ত হাদীসের সঙ্গে পরবর্তীতে কেউ যোগ করেছে। আর ইমাম আবূ দাউদের ভাষ্য অনুযায়ী এটা কুফাতে হয়েছে। কারণ মুসলিম বিশ্বের কোথাও এমনটি ঘটে নি। যেমন ইমাম আবু দাউদ বলেন, (অনুবাদ) সুফিয়ান যাদের কাছে ইয়াযীদ থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন, যা পূর্বের শারীক বর্ণিত হাদীছের ন্যায়। কিন্তু ‘অতঃপর আর করতেন না’ একথা বলেন নি। সুফিয়ান বলেন, পরবর্তীতে কুফায় আমাদেরকে উক্ত কথা বলা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ইয়াযীদ থেকে এই হাদীছ বর্ণনা করেছেন হুশাইম, খালেদ ও ইবনু ইদরীস। কিন্তু ‘অতঃপর পুনরায় আর হাত তুলেন নি’ কথাটি উল্লেখ করেন নি। তাছাড়াও হাদীছটি যঈফ। এর সনদে ইয়াযীদ বিন আবূ যিয়াদ আছে, সে যঈফ রাবী। ইমাম আহমদ বলেন, হাদীসটি নিতান্তই যঈফ।

এরপর লেখক আরো লিখেছেন, আসলে বর্ণনাটি একেবারেই উদ্ভট; বরং একে জাল বলাই শ্রেয়। কারণ ‘পুনরায় আর করেন নি’ এই অংশটুকু কুফাতে কোন ব্যক্তি কর্তৃক সংযোজিত হয়েছে। মুহাদ্দিছ আবূ উমর বলেছেন, ইয়াযিদ একাকী বর্ণনা করেছে। অনেক মুহাদ্দিছ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন, কিন্তু কেউই ‘পুনরায় আর হাত তুলেন নি’ এই বক্তব্য উল্লেখ করেন নি। ইমাম ইবনু মাঈন বলেছেন, এই হাদীছের সনদ ছহীহ নয়। ইমাম আবূ দাউদ, ইমাম খাত্তাবী, ইমাম আহমাদ, বাযযার প্রমুখ মুহাদ্দ্ছি এই হাদীসকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। মূলকথা হল, শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিছগন এমর্মে একমত যে, হাদীছের শেষাংশে সংযোজিত বাড়তি অংশটুকু কোন মানুষের তৈরি, হাদীসের অংশ নয়। অতএব উক্ত বর্ণনা কোনক্রমেই গ্রহনযোগ্য হতে পারে না।

এ দীর্ঘ বক্তব্য পুরোটাই লেখকের অন্ধ অনুসরণ মাত্র। নিম্নে এসব বক্তব্যের পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো।

১- সুফিয়ান ইবনে উয়ায়না রহ. এর উপরোক্ত বক্তব্যটির উপরই ভিত্তি করে ইমাম শাফিঈ, আহমদ, হুমায়দী, বুখারী প্রমুখ একই কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বক্তব্যটির মধ্যে সমস্যা আছে। কারণ এখানে বলা হয়েছে সুফিয়ান কুফায় আগমনের পর ঐ বাড়তি অংশটুকু শুনতে পেয়েছেন। কুফার বাইরে মক্কায় যখন ইয়াযীদ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তখন ঐ বাড়তি অংশটুকু ছিল না। ইতিহাসের আলোকে এই কথাগুলি খাটে না। কারণ ইয়াযীদ ৪৭ হি. সনে কুফায় জন্মগ্রহন করেন এবং ১৩৫ হি. সনে কুফায়ই মৃত্যুবরণ করেন। আর সুফিয়ান ১০৭ হি. সনে কুফায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৬৩ হি. সনে মক্কায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭ হি. সনে মক্কায়ই তার ইন্তেকাল হয়। এতে দেখা যাচ্ছে, সুফিয়ান কুফায় ২৯ বছর বয়স পর্যন্ত ইয়াযীদকে পেয়েছেন। ইয়াযীদের মৃত্যুর ২৭ বছর পর তিনি মক্কায় চলে যান। সুতরাং ‘সুফিয়ান কুফায় ফিরে এসে দেখেন’ কথাটির কোন অর্থ থাকে না।

যদি এ কথাটি সত্য ধরেও নিই তবুও বলা যায়, সুফিয়ান ইবনে উয়ায়না হলেন ইয়াযীদের নবীন শিষ্য। তার প্রবীন শিষ্যরা যেমন সুফিয়ান ছাওরী, শারীক, শো‘বা ও হুশায়ম প্রমুখ অনেক পূর্বেই এই হাদীস শিখেছেন, তাতে ঐ বাড়তি অংশ রয়েছে। শারীকের বর্ণনা তো আবূ দাউদেই আছে। ছাওরীর বর্ণনা তাহাবীতে আছে । ইবনে আদীও আল কামিল গ্রন্থে লিখেছেন

وراه هشيم وشريك وحماعة معهما عن يزيد باسناده وقالوا فيه ثم لم يعد

অর্থাৎ হুশায়ম, শারীক ও তাদের সঙ্গে এক জামাত রয়েছেন, যারা ইয়াযীদ থেকে উক্ত সনদে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন, সেখানে তারা ‘অতঃপর আর হাত তুলেন নি’ কথাটি উল্লেখ করেছেন। ৯/১৬৫

দেখুন, তাদের কথার মধ্যে কত পার্থক্য। আবূ দাউদ প্রমুখ বলেছেন হুশায়মের বর্ণনায় ঐ বাড়তি অংশ নেই। আর ইবনে আদী বলেছেন আছে। ছাওরী ও শারীকের বর্ণনায় তো আছেই। সুতরাং এমন কথা বলে হাদীসটি বাদ দেওয়া কি ইনসাফপূর্ণ হবে? খাত্তাবী বলেছেন, শারীক একাই এমনটি বর্ণনা করেছেন তাই এটি গ্রহনযোগ্য হবে না। আবার আবূ উমর (ইবনে আব্দুল বার) বলেছেন, ইয়াযীদ একাই এমনটি বর্ণনা করেছেন তাই গ্রহনযোগ্য হবে না। কোনটা ঠিক? খাত্তাবীর কথা না আবূ উমরের কথা? ইবনে আদীর বক্তব্য থেকেই পরিস্কার বোঝা গেল যে, শারীক একা বর্ণনা করেন নি, আরো অনেকে করেছেন। ইয়াযীদও একা বর্ণনা করেন নি। বরং ইমাম আবূ দাউদ নিজেই আরেকটি সুত্রে এটি উদ্ধৃত করেছেন। সুত্রটি হলো, আবূ দাউদ বর্ণনা করেছেন হুসাইন ইবনে আব্দুর রাহমান থেকে, তিনি ওয়াকী থেকে, তিনি ইবনে আবূ লায়লা থেকে, তিনি আপন ভ্রাতা ঈসা থেকে, তিনি হাকাম থেকে, তিনি আব্দুর রাহমান ইবনে আবূ লায়লার সুত্রে বারা ইবনে আযিব রা. থেকে। হাদীসটি আমাদের মুযাফফর ভাই ৫ নম্বরে উল্লেখ করেছেন।

এরপর তিনি মন্তব্য করেছেন, হাদীসটি যঈফ। এর সনদে ইবনু আবী লায়লা নামক যঈফ রাবী আছে। ইমাম বায়হাকী বলেন, তার হাদীছ দ্বারা দলীল গ্রহন করা যায় না। তাছাড়া ইমাম আবূ দাউদ হাদীসটি উল্লেখ করে বলেন:هذا الحديث ليس بصحيح. এই হাদীছ ছহীহ নয়।

কিন্তু ইবনে আবূ লায়লা সম্পর্কে আবু দাউদ ও বায়হাকীর কথাই চূড়ান্ত কিছু নয়। অনেকে তাকে বিশ্বস্তও বলেছেন। ইজলী বলেছেন,

صدوق ثقة তিনি সাদূক ও বিশ্বস্ত। দারাকুতনী তার সুনানে (১/১২৪) বলেছেন, ثقة فى حفظه شئ তিনি বিশ্বস্ত তবে তার স্মৃতিতে কিছু সমস্যা ছিল। সকলের মতামত সামনে রেখে যাহাবী তার তাযকিরাতুল হুফফায গ্রন্থে বলেছেন,

حديثه فى وزن الحسن ولا يرتقى الى الصحة لانه ليس بالمتقن عندهم

অর্থাৎ তার হাদীস হাসান মানের, সহীহ’র মানে তা উন্নীত হবে না। কারন তিনি মুহাদ্দিসগনের দৃষ্টিতে সুদৃঢ় ছিলেন না।

এ হিসাবে এ বর্ণনাটি কমপক্ষে হাসান স্তরের। সুতরাং ঢালাওভাবে তার হাদীসকে যঈফ বলে দেওয়া সঙ্গত হবে না। যদি যঈফ বলে ধরেও নিই, তবুও পূর্বের সনদের সমর্থক হিসাবে এটা অবশ্যই গ্রহনীয় হবে। সারকথা ইয়াযীদ একা বর্ণনা করেন নি, বরং অন্য সূত্রেও এটি বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং আবূ উমরের কথাটিও ঠিক রইল না।

২- ইয়াযীদ ইবনে আবূ যিয়াদ সম্পর্কে মুযাফফর বিন মুহসিন লিখেছেন, তাছাড়াও হাদীছটি যঈফ। এর সনদে ইয়াযীদ বিন আবূ যিয়াদ আছে। সে যয়ীফ রাবী। (পৃ.১৮৯)

এটা পক্ষপাতদুষ্ট মন্তব্য। ইয়াযীদের যঈফ হওয়ার ব্যাপারে সকল মুহাদ্দিস একমত হন নি। অনেকে তার ব্যাপারে উচ্চ প্রশংসাও করেছেন। ইমাম মুসলিম তাকে মধ্যম সারির রাবীদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যারা যঈফও নয়, আবার খুব উচ্চমান সম্পন্নও নয়। ইজলী রহ. বলেছেন, ثقة جائز الحديث. বিশ্বস্ত ও তার হাদীস চলার মতো। আজুররী ইমাম আবূ দাউদের মন্তব্য এভাবে উল্লেখ করেছেন, ثبت لا اعلم احدا ترك حديثه وغيره احب الى তিনি মজবুত, কেউ তার হাদীস বর্জন করেছেন বলে আমি জানি না। তবে তাঁর চেয়ে অন্যরা আমার বেশী পছন্দের। জারীর রহ. ও আহমদ র. বলেছেন, আতা ইবনুস সাইব ও লায়ছ ইবনে আবূ সুলায়মের তুলনায় তার হাদীস বেশী সঠিক হতো। ইবনে সা’দ বলেছেন,

كان ثقة فى نفسه الا انه اختلط فى اخر عمره فجاء بالعجائب

তিনি মূলত বিশ্বস্ত, তবে শেষ কালে তার হাদীস ওলট-পালট হয়ে গিয়েছিল, ফলে তিনি অবাক লাগার মতো কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনে হিব্বান তাকে ছিকাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। ইবনে শাহীন তার ছিকাত গ্রন্থে আহমাদ ইবনে সালেহ মিসরী’র এই মন্তব্য উল্লেখ করেছেন যে, يزيد ثقة لايعجبنى قول من يتكلم فيه ইয়াযীদ বিশ্বস্ত, যারা তার সমালোচনা করেছেন তাদের কথা আমার নিকট পছন্দনীয় নয়। ইমাম বুখারী তার তারীখে কাবীরে তার জীবনী উল্লেখ করেছেন, কিন্তু প্রশংসা ছাড়া বিরূপ কোন মন্তব্য উল্লেখ করেন নি। ইমাম তিরমিযী তার ইলালে কাবীরে ইমাম বুখারীর এই মন্তব্য উল্লেখ করেছেন, صدوق الا انه تغير باخره ইয়াযীদ সাদূক বা সত্যনিষ্ঠ, তবে শেষ জীবনে তার স্মৃতিতে পরিবর্তন এসেছিল। (পৃ.৩৯১) ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান (মৃত্যু ২৭৭ হি.) তার আল মা‘রিফা ওয়াত তারীখ গ্রন্থে বলেছেন,

ورأيت فى كتاب يحيى بن معين قال حديث البراء ان النبى صالله عليه وسلم كان يرفع يديه ليس هو بصحيح الاسناد. وظننت ان الذى حكى لم يضبط كلام يحيى لان يزيد بن ابى زياد وان كان قد تكلم االناس فيه لتغيره فى اخر عمره فهو على العدالة والثقة وان لم يكن مثل منصور والحكم والاعمش فهو مقبول القول ثقة اه

অর্থাৎ আমি ইয়াহয়া ইবনে মাঈনের কিতাবে দেখলাম, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রফয়ে ইয়াদাইন প্রসঙ্গে বারা রা. এর হাদীসটি সম্পর্কে বলেছেন, এটির সনদ সহীহ নয়। আমার যতটুকু ধারণা যিনি ইয়াহয়া’র বক্তব্যটি লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি তা সঠিকভাবে করতে পারেন নি। কেননা ইয়াযীদ ইবনে আবূ যিয়াদ সম্পর্কে যদিও অনেকে শেষ জীবনে তার স্মৃতিতে পরিবর্তন ঘটার কারণে আপত্তি তুলেছেন, তথাপি তিনি ন্যায়পরায়নতা ও বিশ্বস্ততার উপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। যদিও তিনি মানসূর, হাকাম ও আ‘মাশের মতো (উচ্চ মানের) ছিলেন না। কিন্তু তার কথা গ্রহণযোগ্য ছিল এবং তিনি বিশ্বস্ত ছিলেন। (৩/৮১)

ইমাম তিরমিযী ইয়াযীদের একাধিক হাদীসকে সহীহ আখ্যা দিয়েছেন, এবং টীকায় আলবানী সাহেব এর অনেকগুলোকে সহীহ বলেছেন। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, ইমাম তিরমিযীর নিকটও তিনি বিশ্বস্ত ছিলেন। হাদীসগুলির শুধু নম্বর তুলে ধরা হলো। ১১৪, ২৩৯৩, ৩৭৬৮।

ইমাম আহমাদ, দারাকুতনী ও ইবনুল কাত্তান ঐ বাড়তি অংশটুকু বাদ দিয়ে ইয়াযীদের হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। এতেও তো বোঝা যায়, ইয়াযীদ তাদের দৃষ্টিতে এমন মানের ছিলেন যার হাদীসকে সহীহ বলা যায়।

চার নম্বরে উক্ত লেখক লিখেছেন, আবু সুফিয়ান আমাদের কাছে উক্ত সনদে হাদীছ বর্ণনা করে বলেন যে, তিনি প্রথমবার দুইহাত উত্তোলন করেছেন। তাদের কেউ বলেন, মাত্র একবার। (আবূ দাউদ, হাদীস নং ৭৪১)

এরপর লেখক মন্তব্য করেছেন, একবার আমল করা যে কূফার আমল তা সুফিয়ান ছাওরী (রহ.) এর বর্ণনায় ফুটে উঠেছে। যা পূর্বের বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ইমাম বুখারী ও ইবনু আবী হাতেম এ সংক্রান্ত বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাছাড়া কারো ব্যক্তিগত আমল শরীয়তের দলীল হতে পারে না। (পৃ. ১৮৯)

লেখক আবু দাউদের কথা বোঝেন নি। এখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, শারীক যে সনদে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, সেই একই সনদে সুফিয়ান ছাওরীও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তবে তার বর্ণিত শব্দ ছিল, তিনি প্রথমবার দুই হাত উত্তোলন করেছেন। কিন্তু লেখক এটাকে সুফিয়ান ছাওরীর বক্তব্য বানিয়েছেন। তাছাড়া তিনি যে ব্যক্তিগত আমলের কথা বলেছেন সে কথাও ঠিক নয়। কারণ এখানে কারো ব্যক্তিগত আমলের কথা বলা হয় নি। বরং ইবনে মাসউদ রা. এর আমলের কথা বলা হয়েছে, যে আমলের মাধ্যমে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল তুলে ধরেছেন।

আর এখানে লেখক আবূ সুফিয়ান কোথায় পেলেন তা আল্লাহই ভাল জানেন। সহীহ তরজমা হবে সুফিয়ান। এমনিভাবে তিনি বলেছেন ‘ইবনু আবী হাতেম’, সঠিক কথা হবে আবূ হাতেম। লেখক কর্তৃক উদ্ধৃত ৬৮০ নং টীকাটি ভাল করে দেখলেই এটা পরিস্কার ধরা পড়বে।

বুখারী ও আবূ হাতেম প্রত্যাখ্যান করেছেন এ কথাটা না বলে টীকায় উদ্ধৃত আরবী অংশের তরজমা উল্লেখ করাই সমুচিত হতো যে, বুখারী ও আবূ হাতেম এ ভুলের (অর্থাৎ ইবনে মাসউদ রা. এর হাদীসে যে বলা হয়েছে প্রথম তাকবীরের পর আর কখনো হাত তুলেন নি এর) দায় চাপিয়েছেন সুফিয়ানের উপর। কিন্তু টীকাটি যেখান থেকে নেওয়া হয়েছে সেখানের পুরো কথাটি উল্লেখ করা হয় নি। সেখানে এরপর বলা হয়েছে,

وابن القطان وغيره يجعلون الوهم فيه من وكيع وهذا اختلاف يؤدى الى طرح القولين والرجوع الى صحة الحديث لوروده عن الثقات )نصب الراية ১/৩৯৬ (

অর্থাৎ আর ইবনুল কাত্তান প্রমুখ এ ভুলের দায় চাপিয়েছেন ওয়াকী’র উপর। তাই এ মতানৈক্যই বলে দেয় উভয় মতকেই পরিহার করতে এবং হাদীসটির বিশুদ্ধতা মেনে নিতে, কেননা হাদীসটি বিশ্বস্ত রাবীদের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে । (নাসবুর রায়াহ, ১/৩৯৬)

৬ নং হাদীসে বলা হয়েছে, ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন সালাত আরম্ভ করতেন, তখন দুই হাত উত্তোলন করতেন। অতঃপর আর তুলতেন না।

এর উপর মন্তব্য করে লেখক লিখেছেন, ইমাম বায়হাকী ও হাকেম বলেন, বর্ণনাটি বাতিল ও মিথ্যা।

কিন্তু কেন মিথ্যা আর কার কারণে বাতিল লেখক তা কিছুই বলেন নি। হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন ইমাম বায়হাকী তার আল খিলাফিয়াত গ্রন্থে। এর বর্ণনাকারীগণ সকলে বিশ্বস্ত। মুগলতাঈ রহ. বলেছেন لا بأس بسندهএর সনদে কোন সমস্যা নেই। যেহেতু এটি ইবনে উমর রা. এর প্রসিদ্ধ বর্ণনার বিরোধী সে কারণেই হয়তো হাকেম ও বায়হাকী এটাকে বাতিল ও মিথ্যা বলেছেন। কিন্তু আল্লামা আবেদ সিন্ধী রহ. বলেছেন,

قلت: تضعيف الحديث لايثبت بمجرد الحكم وانمايثبت ببيان وجوه الطعن وحديث ابن عمر هذا رجاله رجال الصحيح فما ارى له ضعفا بعد ذلك اللهم الا ان يكون الراوى عن مالك مطعونا. لكن الاصل العدم فهذا الحديث عندى صحيح لامحالة.

অর্থাৎ আমি বলবো, মন্তব্য করলেই একটি হাদীস দুর্বল প্রমাণিত হয় না। রাবীদের যেসব দোষত্রুটি আছে তা উল্লেখ করার দ্বারাই কেবল তা প্রমাণিত হতে পারে। ইবনে উমর রা. এর এ হাদীসটির রাবীগণ বুখারী বা মুসলিমের রাবী। তাই এতে কোন দুর্বলতা আমি দেখছি না। হ্যাঁ, ইমাম মালেক থেকে যিনি এটি বর্ণনা করেছেন তিনি কোন দোষে অভিযুক্ত হলে হতেও পারেন। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া তেমনটি না হওয়াই তো স্বাভাবিক। সুতরাং এ হাদীস নিঃসন্দেহে আমার দৃষ্টিতে সহীহ।

তিনি আরো বলেন,

وغاية ما يقال فيه : ان ابن عمر رأى النبى صلى الله عليه وسلم حينا يرفع فاخبر عن تلك الحالة واحيانا لايرفع واخبر عن تلك الحالة وليس فى كل من حديثيه ما يفيد الدوام والاستمرار على شئ معين منهما فلا سبيل الى تضعيفه فضلا عن وضعه والله اعلم.

অর্থাৎ খুব বেশি হলে এমনটা বলা যায় যে, ইবনে উমর রা. কখনো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রফয়ে ইয়াদাইন করতে দেখেছেন। আর তা সেভাবেই বর্ণনা করেছেন। আবার কখনো দেখেছেন রফা না করতে। একথাও তিনি সেভাবেই বর্ণনা করেছেন। তার দুটি হাদীসের কোন একটিতেও সার্বক্ষণিকতা বোঝায় এমন কোন নির্দেশনা নেই। সুতরাং উক্ত হাদীসকে জাল বলা তো দূরের কথা, যঈফ বলারই সুযোগ নেই। (দ্র. ইমাম ইবনে মাজাহ ওয়া কিতাবুহুস সুনান, পৃ. ২৫২)

ইবনে উমর রা. যে এই হাদীসটি সত্যিই বর্ণনা করেছেন, তার অনেক প্রমাণ আছে। তন্মধ্যে একটি প্রমাণ লেখক ৭ নম্বরে উল্লেখ করেছেন। সেখানে উল্লেখ আছে যে, মুজাহিদ বলেন, আমি ইবনু উমর (রা.) এর পিছনে ছালাত আদায় করলাম। তিনি প্রথম তাকবীর ছাড়া আর রাফউল ইয়াদায়ন করলেন না। (তাহাবী, হাদীস নং ১৩৫৭)

এরপর লেখক মন্তব্য করেছেন, বর্ণনাটি যঈফ। এর সনদে আবূ বকর ইবনু আইয়াশ নামে একজন রাবী আছে। ইমাম বুখারী সহ অন্যান্য মুহাদ্দিছ তাকে ত্রুটিপূর্ণ বলেছেন। এরপর টীকায় ৬৮৭ নম্বরে লিখেছেন, বায়হাকী, মারেফাতুস সুনান হাদীস ৮৩৭ এর বিশ্লেষণ দ্রঃ

وقد تكلم فى حديث ابى بكر بن عياش محمد بن اسماعيل البخارى وغيره من الحفاظ