দলিলসহ নামাজের মাসায়েল : (পর্ব ৫২)জানাযার নামায পড়ার পদ্ধতি | ইসলামী বিশ্বকোষ ও আল-হাদিস

জানাযার নামায পড়ার পদ্ধতি

হযরত ইমাম আবু হানীফা রহ. এর মত হচ্ছে, জানাযার নামাযে সূরা ফাতেহা পড়া সুন্নত নয়। বরং প্রথম তাকবীর বলে ছানা পড়বে, দ্বিতীয় তাকবীর বলে দুরূদ শরীফ পড়বে, তৃতীয় তাকবীর বলে দুআ পড়বে এবং চতুর্থ তাকবীর বলে সালাম ফিরাবে। হ্যাঁ, ছানা হিসেবে (অর্থাৎ ছানার পরিবর্তে) সূরা ফাতেহা ও পড়তে পারে, কেরাত হিসেবে নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণের আমল দ্বারাই একথা প্রমাণিত। এমতের পক্ষে দলিলগুলো নিম্নে প্রদত্ত হল:

মারফু হাদীস

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন,

سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ –صلى الله عليه وسلم- يَقُولُ إِذَا صَلَّيْتُمْ عَلَى الْمَيِّتِ فَأَخْلِصُوا لَهُ الدُّعَاءَ

অর্থ: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যখন তোমরা জানাযার নামায পড়বে, তখন তার জন্য একনিষ্ঠভাবে দুআ কর। (আবূ দাউদ শরীফ, ২খ, ৪৫৬পৃ)

সাহাবায়ে কেরামের আছার ও আমল

১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন,

لم يوقت لنا في الصلاة على الميت قراءة ولا قول كبر ما كبر الإمام وأكثر من طيب الكلام.

أورده الهيثمي في مجمع الزوائد وقال : رواه أحمد ورجاله رجال الصحيح

আমাদের জন্য জানাযার নামাযে কোন কিরাআত কিংবা কোন বাক্য নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় নি। ইমাম যখন তাকবীর বলে তখন তুমিও তাকবীর বল। আর অধিক পরিমাণে তার জন্য ভাল কথা বল। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস : ৪১৫৩) হায়ছামী বলেছেন, হাদীসটি ইমাম আহমদ উদ্ধৃত করেছেন এবং এর বর্ণনাকারীগণ সহীহ বুখারীর বর্ণনাকারী।

২. হযরত আলী রা. আমল :

عَنْ عَلِيٍّ ، أَنَّهُ كَانَ إذَا صَلَّى عَلَى مَيِّتٍ يَبْدَأُ بِحَمْدِ اللهِ وَيُصَلِّي عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ، ثُمَّ يَقُولُ : اللَّهُمَّ اغْفِرْ لأَحْيَائِنَا وَأَمْوَاتِنَا وَأَلِّفْ بَيْنَ قُلُوبِنَا وَأَصْلِحْ ذَاتَ بَيْنِنَا وَاجْعَلْ قُلُوبَنَا عَلَى قُلُوبِ خِيَارِنَا.

আলী রা. যখন কারো জানাযার নামায পড়তেন, তখন প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা পাঠ করেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরুদ পড়েন। এরপর বলেন,

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لأَحْيَائِنَا وَأَمْوَاتِنَا وَأَلِّفْ بَيْنَ قُلُوبِنَا وَأَصْلِحْ ذَاتَ بَيْنِنَا وَاجْعَلْ قُلُوبَنَا عَلَى قُلُوبِ خِيَارِنَا.

(মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ১১৪৯৪)

৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.এর আমল :

أن ابن عمر كان لا يقرأ في الصلاة على الميت

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. জানাযার নামাযে কেরাত পড়তেন না।

(মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ১১৫২২ )

ইমাম মালেক রহ. তাঁর মুয়াত্তায়ও হযরত ইবনে উমর রা.এর আছারটি বর্ণনা করেছেন। সেখানকার সনদ এমন : مالك عن نافع :أن عبد الله بن عمر অর্থাৎ ইমাম মালেক হযরত নাফে থেকে, তিনি হযরত ইবনে উমর সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। হাদীসের মূলনীতি সম্পর্কিত গ্রন্থাবলিতে এ সনদটিকে ‘সিলসিলাতুয যাহাব’ বা স্বর্ণশৃংখল বলে অভিহিত করা হয়। হাদীসটির বিশুদ্ধতা এ থেকে সহজেই অনুমেয়।

৪. হযরত আবু হুরায়রা রা.এর আমল :

আবু সাঈদ রহ. বলেন,

أنه سأل أبا هريرة كيف تصلي على الجنائز فقال أبو هريرة أنا لعمر الله أخبرك أتبعها مع أهلها فإذا وضعوها كبرت وحمدت الله وصليت على نبيه صلى الله عليه و سلم ثم أقول

তিনি আবু হুরায়রা রা.কে জিজ্ঞেস করেছেন, আপনি কিভাবে জানাযার নামায পড়েন? আবু হুরায়রা রা. বলেন, আল্লাহর কসম , আমি তোমাকে অবশ্যই তা জানাব। মৃতব্যক্তির পরিবারের সাথে আমি যাই। যখন (নামাযের জন্য) তারা তার লাশ রাখে, তখন আমি তাকবীর বলি ও আল্লাহর হামদ পাঠ করি, তার নবীর উপর দরূদ পড়ি অতঃপর (নিম্নোক্ত দুআটি) পড়ি ..........

اَللّهُمَّ عَبْدُكَ وَابْنُ عَبْدِكَ وَابْنُ اَمَتِكَ، كَانَ يَشْهَدُ اَنْ لا اِلهَ اِلا اَنْتَ وَاَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُكَ وَرَسُوْلُكَ، وَاَنْتَ اَعْلَمُ بِهِ، اَللّهُمَّ اِنْ كَانَ مُحْسِنًا فَزِدْ فِيْ اِحْسَانِهِ وَاِنْ كَانَ مُسِيْئًا فَتَجَاوَزْ عَنْهُ، اَللّهُمَّ لا تَحْرِمْنَا اَجْرَهُ وَلا تَفْتِنَّا بَعْدَهُ

(মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ৬৪২৫; মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ১১৩৭৭)

৫. হযরত উবাদা ইবনে সামেত রা. এর তালিম :

أنه سأل عبادة بن الصامت عن الصلاة على الميت فقال أنا والله أخبرك تبدأ فتكبر ثم تصلي على النبي صلى الله عليه وسلم ، وتقول اللهم إن عبدك فلانا كان لا يشرك بك شيئا ، أنت أعلم به ، إن كان محسنا فزد في إحسانه وإن كان مسيئا فتجاوز عنه ، اللهم لا تحرمنا أجره ولا تضلنا بعده.

তিনি সাহাবী হযরত উবাদা ইবনে সামেত রা.কে জানাযার নামায সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছেন। উত্তরে তিনি বলেছেন, আল্লাহর কসম, অবশ্যই আমি তোমাকে বলে দিব। তুমি তাকবীর বলে শুরু করবে, এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরুদ পাঠ করবে এবং পরে এই দোয়া পড়বে:

اللهم إن عبدك فلانا كان لا يشرك بك شيئا ، أنت أعلم به ، إن كان محسنا فزد في إحسانه وإن كان مسيئا فتجاوز عنه ، اللهم لا تحرمنا أجره ولا تضلنا بعده.

[সুনানে কুবরা বায়হাকী, ৪ খ-, ৪০ পৃষ্ঠা]

উল্লেখ্য, বর্তমান সময়ে যারা সূরা ফাতেহাকে জানাযার নামাজের জন্য জরুরী বলে থাকেন, তারা হযরত উবাদা ইবনে সামেত রা.এর বিখ্যাত হাদীসটি দিয়েই দলিল দিয়ে থাকেন। হাদীসটির ভাষ্য : لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب যে সূরা ফাতেহা পড়ে নি তার নামাযই হয় নি। (সহীহ বুখারী, হাদীস : ৭৫৬) অথচ উপরোক্ত বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে, স্বয়ং উবাদা ইবনে সামেত রা.ই সূরা ফাতেহা ছাড়া জানাযার নামাযের তালিম দিচ্ছেন।